USA

বাংলাদেশে কওমী মাদ্রাসার সনদ-স্বীকৃতি ও রাজনীতির তাপ-পরিতাপ


আহমেদ মূসা : এক. কওমী মাদ্রাসার সঙ্গে সরকারের সাম্প্রতিক বন্দোবস্ত নিয়ে বাংলাদেশে এখন তুমুল বিতর্ক চলছে। আওয়ামী লীগ বলছে তারা কওমী শিক্ষার কারিকুলাম আধুনিক করে কওমী শিক্ষার্থীদের মূলধারায় নিয়ে আসবে। সেই লক্ষ্যে তারা কওমী মাদ্রাসার দাওরায়ে হাদিস সনদকে মাস্টার্স ডিগ্রীর সমমান ঘোষণা করে ‘মূলধারার ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন’ করেছে।
এই একটি ইস্যুতে বিএনপির সুর-স্বরও আমরা অভিন্ন দেখি। বিএনপির বিগত সরকার আমলের শেষের দিকে দাওরায়ে হাদিস সনদকে মাস্টার্স ডিগ্রীর সমমান ঘোষণা করে গ্যাজেট প্রকাশিত হয়েছিল, যদিও তা কার্যকর করার সময় তারা পায় নি। এ ছাড়া গত ১১ মে বিএনপি চেয়ারপার্সন বেগম খালেদা জিয়া দলের ‘ভিশন ২০৩০’ ঘোষণার সময় বলেন, “মাদ্রাসা শিক্ষাকে আরো আধুনিক ও যুগোপযোগী করা হবে। তাদের কারিকুলামে পেশাভিত্তিক ও বৃত্তিমূলক বিভিন্ন বিষয়কে অন্তর্ভুক্ত করা হবে। এই সংস্কারে ধর্মীয় শিক্ষার পাশাপাশি বিজ্ঞান-প্রযুক্তি ও আইটি এবং ইংরেজিসহ বিভিন্ন ভাষা শিক্ষার ব্যবস্থা থাকবে।”
বিএনপির আগের উদ্যোগটি কাগুজে পর্যায়েই থেকে গিয়েছিল । তবে আওয়ামী লীগেরটি হয় তো ‘কাজীর গরু’র দশায় না পড়ে কাগজে-গোয়ালে সমভাবেই বিদ্যমান থাকবে । কিন্তু এখানে দুই দলই বিষয়টিকে ‘অসীম ছাওয়াব হাসিল’ বা ‘বেহেস্তে বুকিং’ পাবার আশায় করছে না, তাদের নজর নির্বাচন কেন্দ্রের বুথ পর্যন্ত; কারণ, ভোট সন্নিকট।
অন্যদিকে গত ৯ মে আহমদ রফিক, কামাল লোহানী,অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী, যতীন সরকার, সৈয়দ হাসান ইমাম, হাসান আজিজুল হকসহ দেশের শীর্ষস্থানীয় ৪০৮ জন বুদ্ধিজীবী এক দীর্ঘ বিবৃতি দেন সবাইকে সতর্ক করতে। বিবৃতির অংশ-বিশেষে তাঁরা বলেন, ‘ক্ষমতায় থাকার জন্য অথবা যাওয়ার জন্য ধর্মকে ব্যবহার করা এবং মৌলবাদী সাম্প্রদায়িক গোষ্ঠীকে সঙ্গে রাখার যে অশুভ প্রতিযোগিতা শুরু হয়েছে তা দেশকে এক ভয়াল অন্ধকারে নিয়ে যাবে।’
এই বিবৃতিতে তারা পাঠ্যপুস্তকে সাম্প্রদায়িককরণ, পয়লা বৈশাখের ওপর আক্রমণ, অপপ্রচার, ভাস্কর্য অপসারণ,কওমী মাদ্রাসাকে অন্যায্য মর্যাদাদানসহ উগ্র ধর্মান্ধ গোষ্ঠীর কাছে সরকারের আত্মসমর্পণের প্রতিবাদ জানিয়ে বলেন, ‘আমরা সরকারকে এই আত্মঘাতি খেলা থেকে বের হয়ে আসার আহবান এবং এই অশুভ তৎপরতার বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ প্রতিরোধ গড়ে তোলার জন্য দেশপ্রেমিক, গণতান্ত্রিক, অসাম্প্রদায়িক ব্যক্তি ও গোষ্ঠীর প্রতি উদাত্ত আহবান জানাই। ’
বুদ্ধিজীবীদের বিবৃতিতে আরো অনেকগুলি ইস্যুর সঙ্গে কওমী মাদ্রাসার সনদ-স্বীকৃতি বিষয়টিতেও উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে । শুধুমাত্র এই একটি ইস্যুতে বিবৃতি দিলে তারা হয় তো কওমী মাদ্রাসার পাঠ্যপুস্তক সংস্কার ও তাদের মূধারায় নিয়ে আসার বিকল্প রাস্তা তুলে ধরে সরকারকে পরামর্শ দিতেন। সে-ক্ষত্রে একমাত্র বিকল্প কওমী মাদ্রসাগুলি বন্ধ করে দেওয়ার পরামর্শ তারা অবশ্যই দিতেন না, কারণ প্রগতিশীল বলে বিবেচিত কুদরত-এ খুদা শিক্ষা কমিশনের রিপোর্টেও কওমী মাদ্রাসা বন্ধ করতে বলা হয় নি।
অবশ্য সনদ-স্বীকৃতির অংশটুকু সম্পর্কেও বুদ্ধিজীবীদের আশঙ্কা অমূলক হবে না, যদি সমস্যাটিকে সাবধানতার সঙ্গে মীমাংসার দিকে নিয়ে নেওয়া না যায় বা শুধুমাত্র ভোটের অংকে সমাধানকে কনভার্ট করা হয়।
কয়েকদিন আগে দৈনিক ডেইলি স্টারের সঙ্গে এক সাক্ষাৎকারে ড. সলিমুল্লাহ খান অনুমান করেছেন, কওমী শিক্ষার্থীর সংখ্যা ১৪ লাখের মতো হবে। ড. আলী রীয়াজ বলেছেন আরো বেশি হবে। জীবদ্দশায় প্রায় একদশক আগে মনীষী আমদ ছফা উল্লেখ করেছিলেন ১০ লাখের কথা। আর কওমী মাদ্রার প্রয়াত নেতা মুফতি ফজলুল হক আমিনি বলেছিলেন ৫০ লাখ বলে। এই সংখ্যা অতিরঞ্জিত সন্দেহ নেই। সনদের বিষয়টি কার্যকরী করতে মাদ্রাসাগুলি নিবন্ধিত হলে আমরা সঠিক সংখ্যা অবশ্যই পেয়ে যাব। এখন ধরে নিলাম কওমী শিক্ষার্থীর সংখ্যা ১৮ লাখ। পৃথিবীতে বেশ কিছু দেশ আছে যাদের মোট জনসংখ্যা ১৮ লাখের কম। ওদের সনদের স্বীকৃতি দিয়ে পাঠ্যতালিকা যুগোপযোগী করে মূলধারায় আনা না হলে বিকল্পটা কি? মাদ্রাসাগুলি বন্ধ করে দেওয়া? কিংবা এভাবেই চলতে দিয়ে বাংলাদেশের জাতীয় সঙ্গীত ও পতাকা বা মাতৃভাষা কিংবা যে ভাষাটি এখন শুধু ভাষামাত্র নয়, প্রযুক্তিরও অংশ, সেই ইংরেজি ভাষা উপেক্ষার নিদর্শন জারি রেখে দেশের ভেতরে ‘আরেকটি দেশ’ গড়াতে দেওয়া অব্যাহত রাখা? স্বীকৃতি-সনদের বিরোধিতা যারা করছেন গ্রহণযোগ্য বিকল্পও তুলে ধরা তাদের দায়িত্ব নয় কি? এখানে আমাদেরকে আরো স্মরণে রাখা প্রয়োজন, আলীয়া মাদ্রাসা তার শিক্ষার্থীদের মূলধারায় এনে তাদের কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হতে দিতে পারলে কওমী শিক্ষার্থীদের ক্ষেত্রে কেন তা নয়?
উদ্ভূত পরিস্থিতির কারণেই বিষয়টি সম্পর্কে আমি কিছু বলতে চাই। এটাকে আমার আগের একটি লেখার ফলোআপও বলা যেতে পারে। কারণ ব্যাপারটি নিয়ে চার বছর আগে লিখেছিলাম। লেখাটি ঢাকার অনলাইন দৈনিক আমাদের সময়ডটকমসহ নিউইয়র্কের পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছিল এবং আমার গ্রন্থ ‘যেমন দেখেছি ওয়ান ইলেভেন’-এ আরো কয়েকটি নিবন্ধের সঙ্গে সন্নিবেশিত রয়েছে। এখন আমার নতুন কিছু বলার আগ্রহ এ কারণে জন্মেছে যে, আমার আগের লেখা প্রকাশের পর বেশ কিছু ঘটনা ঘটে গেছে যার কিছু অংশ উপরে উল্লেখ করেছি এবং আরো কিছু কথা উল্লেখ করা প্রয়োজন মনে করছি।
স্কুল-কলেজ প্রতিষ্ঠার আগে এদেশের বাঙালী মুসলমানদের শিক্ষার জন্য মাদ্রাসা-মক্তবের বিকল্প ছিল না। যেমন বিকল্প ছিল না সনাতন বা হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের জন্য টোল-মন্দির ও বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীদের জন্য মঠ প্রভৃতি। কিন্তু হিন্দু-বৌদ্ধরা শিক্ষার প্রশ্নে মঠ-মন্দির থেকে যেভাবে বের হয়ে এসেছে মুসলমানরা সেভাবে পারে নি। বরং অনেক ক্ষেত্রে পিছিয়েছে। বাংলাদেশে অধোগতি দ্রুততর হয়েছে এরশাদের আমলে।
অন্যদিকে, বর্তমান পাকিস্তানে কিছু মাদ্রাসা পরিণত হয়েছে বিভীষিকায়। আফগান যুদ্ধের আগে পাকিস্তানে মাদ্রাসার সংখ্যা যেখানে ছিল ছয় থেকে আট হাজার সেখানে এখন মাদ্রাসার সংখ্যা ৩৫ থেকে ৪০ হাজার ( সম্প্রতি নির্মিত ডকুমেন্টারি ‘এ্যামং দ্য বিলিভার্স’ দ্রষ্টব্য। এটি নেটফ্লেক্সে পাওয়া যাচ্ছে। কওমী মাদ্রাসা-সংশ্লিষ্ট বিষয়ের সঙ্গে জড়িত বা উৎসাহীদের এটি দেখার অনুরোধ করছি)। পাকিস্তানে ১৯৮০ সাল থেকে লামসজিদ মাদ্রাসা মধ্যমনি হয়ে সারাদেশে বিরামহীনভাবে উৎপাদন করেছে হাজার হাজার তালেবান, আমেরিকার অর্থে ও পাকিস্তানী সেনাবাহিনীর সহায়তায়। পাকিস্তানী তালেবানদের নিয়তির পরিহাস হচ্ছে, ফ্রাঙ্কেনেস্টাইন হয়ে দাঁড়ানোতে তারা এখন আমেরিকা এবং পাকিস্তানী বিভিন্ন বাহিনী উভয় পক্ষেরই গুলি-বোমার শিকার হচ্ছে। তালেবানরাও পাল্টা আঘাত হানায় প্রায় যুদ্ধাবস্থা বিরাজ করছে পাকিস্তানে। লালমসজিদ মাদ্রাসায় সেনাবাহিনীর আক্রমণের পর থেকে আরো মরিয়া হয়ে উঠছে তারা। পাকিস্তানে ২০০৭ থেকে ২০১৪ সাল পর্যন্ত ৩৭০০ সন্ত্রাসী আক্রমণ করেছে তালেবানরা, যাতে ধ্বংস হয়েছে ১২০০ স্কুল এবং জীবন গেছে প্রায় ৫০ হাজার মানুষের। বোরখা না পড়ায় পাকিস্তানের কায়েদে আযম বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রীদের মুখে এসিড মারার হুমকিও দিয়েছে তারা। রাষ্ট্র হিসেবে পাকিস্তানের অস্তিত্ব ধরে টান দিয়েছে তালেবানরা। এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশের সঙ্গে পাকিস্তানের গুণগত পার্থক্য আছে। বহু সূচকে বাংলাদেশ পাকিস্তান থেকে অনেক এগিয়েও। কিন্তু আমাদের কওমী মাদ্রাসাগুলির সিলেবাস বা দৃষ্টিভঙ্গি পাকিস্তানী কওমীদের থেকে খুব একটা ভিন্ন নয়। আসল ভয়টা এখানেই। সে কারণেই আমাদের কওমী শিক্ষার্র্থীদের দ্রুত মূলধারায় নিয়ে আসা জরুরী।
আমার আগের লেখা প্রকাশের পর আরো একটি ক্ষেত্রে বড় একটি পরিবর্তন দেখতে পাচ্ছি। আগে ভাবা হতো যে কেবলমাত্র মাদ্রাসায়ই বুঝি জঙ্গী তৈরি হয়। এখন দেখা যাচ্ছে কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়েও হচ্ছে, বিশেষ করে বেসরকারী বিশ্ববিদ্যালয়ে। তাই দ্রুত সমাধানের দিকে যাওয়ার তাগিদ এখন আরো বেশি।
দুই.
এবার আমি আমার ২০১৩ সালের মে মাসে লেখা এবং ‘মাদ্রাসা শিক্ষা ঃ দায়-দরদ বনাম ধিক্কার-বিদ্রুপের কথা’ শিরোনামে
প্রকাশিত নিবন্ধটি সংক্ষিপ্ত আকারে তুলে ধরছি :
বাঙালি মুসলমানদের মূলধারার বুদ্ধিজীবীদের মধ্যে যারা বাংলাদেশের ধর্মপ্রাণ মুসলিম, বিশেষ করে মাদ্রাসার শিক্ষার্থীদের প্রতি গভীর সহানুভূতির দৃষ্টি নিয়ে তাকিয়েছেন, তাদের অন্যতম একজন মনীষীর নাম আহমদ ছফা। তার ‘বাঙালি মুসলমানের মন’ প্রবন্ধ গ্রন্থে শুধু নয়, অন্যান্য রচনায় বা গ্রন্থেও রয়েছে এর ছাপ। ‘মাদ্রাসা শিক্ষার কথা’, ‘মাদ্রাসা ছাত্রদের ভবিষ্যত কি,’ কিংবা ‘আত্মহনন চিন্তার বিচিত্র প্রক্রিয়া’, প্রভৃতি নিবন্ধে আমরা সাক্ষাৎ পাই সেই সহানুভূতির। এখানে ‘আত্মহনন চিন্তার বিচিত্র প্রক্রিয়া’ নিবন্ধটির কিয়দংশ তুলে ধরতে চাই।
আহমদ ছফা লিখেছেন, “বোধহয় নব্বই সালের দিকে হবে। ঢাকাতে মাওলানা সাহেবরা একটি মিছিল বের করেছিলেন। ওটাকে খন্ড মিছিল বলা যাবে না। ওলামায়ে কেরামেরা তো অংশ নিয়ে ছিলেনই। তার সঙ্গে যোগ দিয়েছিল আরো প্রায় হাজার দেড়েক মাদ্রাসার ছাত্র। সকলেই এক হিন্দু ভদ্রলোকের ফাঁসি দাবি করছিল। মিছিলটা দেখে আমার খুব কৌতূহল জন্ম নিয়েছিল। সেই বায়তুল মোকারমের কাছ থেকে পেছন-পেছন অনুসরণ করে প্রেসক্লাব অবধি এসেছিলাম। কেন এসেছিলাম তার একটি কারণ আছে। সাধারণত মাওলানা সাহেবরা যখন কারো ফাঁসির দাবি করেন আপনি নির্ঘাত জেনে যাবেন ওই ব্যক্তিটি হবে মুসলমান। “….কিন্তু ওই মিছিলটিকে, খুবই অবাক হয়ে দেখলাম তারা একজন হিন্দু ভদ্রলোককে ফাঁসিতে লটকাবার কথা বলছে। এই হিন্দু সন্তানের এত কি সৌভাগ্য যে মাওলানা সাহেবরা তাকে ফাঁসিতে দেয়ার দাবিতে মাঠে নামতে পারেন? সে জন্য মিছিলটার পেছন পেছন আমি প্রেস ক্লাব অবধি আসছিলাম। প্রেস ক্লাব এসে আমি শ্রশ্রুহীন একজন মাদ্রাসা ছাত্রের সঙ্গে আলাপ করি । তার সঙ্গে আমার যে বাৎচিত্ত হয়েছিল সেটা এখানে বয়ান করি। আমি খুব বিনয় সহকারে জিজ্ঞেস করেছিলাম, হযরত, আপনারা কোন হিন্দুর ফাঁসি চাইছেন? এবং কেন? উনি খুব চেতে গিয়ে বললেন, আপনি এখনো খবর পাননি। আমি অপরাধ স্বীকার করে বললাম, না এখনো খবরটা পাইনি। তিনি জানালেন, এক হারামজাদা হিন্দু আমাদের নবী (সা:)-এর নামে খারাপ কথা লিখেছে। তার জন্য ফাঁসি না চেয়ে কি জেল চাইব? আমি বললাম, …মেহেরবানী করে নামটা বলুন। তালেবে এলেমটি থেমে থেমে বললেন,‘নগেন্দর নাথ, নগেন্দ্রনাথই হওয়া উচিত। তালেবে এলেম রফলাটি উচ্চারণ করতে পারেননি বলেই নগেন্দর নাথ হয়ে গেছে। আমি ‘নগেন্দর নাথ’ বলে কোনো হিন্দু লেখকের নাম শুনিনি। আমি হাঁটতে হাঁটতে পাবলিক লাইব্রেরীতে চলে এসেছিলাম। লাইব্রেরিয়ান ছিলেন আমার বন্ধু। কথায় কথায় ফাঁসির প্রসঙ্গটি আমি উত্থাপন করি। লাইব্রেরিয়ান সাহেব আমাকে জানালেন, আপনি জানেন না নগেন্দ্রনাথ বসু অনেকদিন আগে এনসাইক্লোপেডিয়া ইসলাম সম্পর্কে অথবা ইসলামের এনসাইক্লোপেয়িা এই শিরোনামে একটি কেতাব লিখেছিলেন। ঐ ভদ্রলোক ১৮৮৪ সালে ইন্তেকাল করেছেন। হালে ঐ কেতাবটি কলকাতায় নতুন করে ছাপা হয়েছে এবং তা মাওলানা সাহেবদের কারো চোখে পড়েছে। তাই এই মিছিল, তাই এত আওয়াজ, তাই এই নিঃশর্ত ফাঁসির দাবি । মানুষটা, বেঁচে আছে কিনা সেটা ভেবে দেখার কথাও কারো মনে এলনা।’ (আহমদ ছফা রচনাবলী -৮, প্রকাশক, খান ব্রাদ্রার্স এন্ড কোম্পানী, সম্পাদনা নূরুল আনোয়ার। পৃষ্ঠা-১৪০)।
দ্বিতীয় ঘটনাটি ২০১৩ সালের ৩ এপ্রিলের। হেফাজতে ইসলামের সমাবেশ শেষে বা যোগদিতে কয়েকজন মাদ্রাসা ছাত্র শাহবাগ জাগরণ মঞ্চের কাছ দিয়ে যাচ্ছিলেন। এ সময় ইমরান এইচ সরকার ও তার কয়েকজন বন্ধু তাদের দিকে এগিয়ে গিয়ে কুশল বিনিময়ের পর জানতে চাইলেন সেই ছাত্ররা কার বিরুদ্ধে আন্দোলন করছেন। ছাত্ররা জানালেন তারা ব্লগারদের বিরুদ্ধে আন্দোলন করছেন। তাদের কাছে যখন জানতে চাওয়া হলো ব্লগ কি তারা জানেন কী না। ছাত্ররা অকপটে স্বীকার করলেন যে, না তারা ব্লগ সম্পর্কে কিছু জানেন না। দেখা গেল তারা ইমরান সরকারকে চেনেনওনা, নামও শোনেননি। ( প্রথম আলো, ৩ এপ্রিল ২০১৩, অনলাইন সংস্করণ) ।
এ ধরনের উদাহরণ অসংখ্য আছে। এমন কি যারা ছাত্রদেরকে আন্দোলনের আহ্বান জানিয়ে আসছেন তাদেরও অনেকের ধারণা ব্লগার মানেই নাস্তিক। ব্লগার আর নাস্তিক্য তাদের কাছে একাকার। অথচ অসংখ্য ইসলামী ব্লগ ও ব্লগার বিদ্যমান। ব্লগ রয়েছে ইসলামী পন্ডিতদেরও। গ্যাপ আরো নানান জায়গায় রয়েছে। এই গ্যাপ নেতাদের সঙ্গে শিক্ষকদের, শিক্ষকদের সঙ্গে ছাত্রদের, অভিভাবকদের সঙ্গে শিক্ষালয়েরসহ নানামুখী।
২০১৩ সালের এপ্রিলে ঢাকার শাপলা চত্ত্বরে হেফাজতে ইসলামের অবস্থান ও সরকারের দমননীতি সম্পর্কে দৈনিক কালের কন্ঠ ৭ মে লিখেছ, ‘ফরিদপুরের একটি কওমি মাদ্রাসার ছাত্র আব্দুর রহিম। মতিঝিলে হেফাজতে ইসলামের কর্মসূচিতে এসে মাথায় আঘাত পেয়েছে সে। পুলিশের সহযোগিতায় ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি হয়। হাসপাতাল ছেড়ে যাওয়ার সময় কালের কণ্ঠ প্রতিবেদকের সঙ্গে রহিমের পিতা আক্কাস আলী ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘গরিব বলে ছেলেকে মাদ্রাসায় পড়তে দিয়েছি। মনে করেছি, সেখানে লেখাপড়া করে বড় মাওলানা হবে। ..কিন্তু বিপদের মধ্যে তাদের ফেলে দিয়ে উনারা চলে গেছেন’ ।
‘হাসপাতালের জরুরি বিভাগ থেকে ১০৩ নম্বর ওয়ার্ডে গিয়ে দেখা যায়, ১১ নম্বর বেডে শুয়ে আছে কিশোর রাশিদুল ইসলাম (১৪)। .. পুলিশের রাবার বুলেটে আঘাতপ্রাপ্ত হয়ে তার কোমর থেকে হাঁটু পর্যন্ত অসাড় হয়ে যায়। ..রাশিদুলের বড় ভাই মোতালেব হোসেন বলেন, ‘পরিবারের সবার ছোট রাশিদুল। ওকে মাওলানা বানাতেই মাদ্রাসায় ভর্তি করানো হয়। কিন্তু .. এখন আমার ভাইয়ের জীবন নিয়েই টানাটানি।’ ‘কল্যাণপুর বাসস্ট্যান্ডে ..খাজা মার্কেটের নিচতলায় হানিফ কাউন্টারের সামনে ছেলে আয়নাল হোসেনকে নিয়ে বসে আছেন বাবা মো. আলাউদ্দিন; ক্ষুব্ধ কণ্ঠে বলেন, হুজুররা ছোট ছোট বাচ্চাকে হুমকির মধ্যে ফেলে দিচ্ছে।..এ সময় ছেলে আয়নাল হোসেন বাবাকে জড়িয়ে ধরে বলে, ‘বাবা, আমি আর মাদ্রাসায় পড়ব না, তুমি আমাকে স্কুলে ভর্তি কইরা দিও।’
কালের কন্ঠে আরো লেখা হয়, ..‘অনুসন্ধানে জানা গেছে, পুলিশ, র‌্যাব ও বিজিবির সম্মিলিত বাহিনী মতিঝিলের শাপলা চত্বরে হেফাজতের অবস্থানে অভিযান চালানোর পর হেফাজতের নেতা ও শিক্ষকরা মাদ্রাসার আহত শিক্ষার্থীদের পাশে ছিলেন না। অভিযানের আগে কিংবা পরপরই হাজার হাজার কর্মীকে ফেলে তাঁরা দ্রুত অবস্থানস্থল ত্যাগ করেন। .. অনেক মাদ্রাসাছাত্রই জানায়, আল্লাহ ও রাসুলের (সা.) বিরুদ্ধে যারা মাঠে নামছে, তাদের বিরুদ্ধে ওয়াজ হবে- এমন কথা বলেই শিক্ষকরা তাদের ঢাকায় নিয়ে আসেন।”
যে ক’টি ঘটনার উল্লেখ করা হলো তাতে মাদ্রাসা ছাত্র বা তাদের অভিভাবকদের অজ্ঞতা নিয়ে কেউ কেউ ব্যঙ্গ করতে পারেন, ধিক্কারও জানাতে পরেন কেউ কেউ। কিন্তু শুধু ব্যঙ্গ-ধিক্কারই কি তাদের প্রাপ্য! আর কিছু নয়? এই অজ্ঞতা ও পশ্চাদপদতাজনিত পরিণামের দায়-ভার আর কারো ছিল না, বা এখনো নেই? আর চাইলেই কি এদের তুড়ি মেড়ে উড়িয়ে দেওয়া যাবে!
বাংলাদেশে আলীয়া ও কওমী ঘরানার মাদ্রাসাগুলির মোট ছাত্রসংখ্যার বস্তুনিষ্ঠ পরিসংখ্যান নেই। বস্তুনিষ্ঠ পরিসংখ্যানের প্রধান অন্তরায় কওমী মাদ্রাসাগুলি। তারা সরকারের সাহায্য নেয় না, নিবন্ধিত নয়। তাদের রুটিন-সিলেবাসও আলাদা। কওমী-ওয়াহাবী মাদ্রাসার প্রতিষ্ঠাতারা যে সিলেবাস তৈরি করেছিলেন এখন তা-ই অনুসৃত হয়। তৈরির সময় উদ্যোক্তারা আবার অনুসরণ করেছিলেন আওরঙ্গজেবের আমলের সিলেবাস।
১৮৬৬ সালে প্রতিষ্ঠার পর থেকে দেওবন্ধ ঘরানার কওমী-ওয়াহাবীরা সুদীর্ঘকাল ব্রিটিশ-বিরোধী আন্দোলন করেছেন। সিপাহী বিদ্রোহের ঘটনা তাদের কাছে ছিল বড় প্রেরণা। তাদের এক অংশ ভারত-বিভাগ চাননি। এদের ব্যালেন্স করতে প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে ওয়ারেন হেস্টিংস-এর তত্ত্বাবধানে প্রতিষ্টা করা হয় আলীয়া মাদ্রাসা। সে কারণে কওমীরা আলীয়া মাদ্রাসাকে প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকেই সন্দেহ-তিরস্কার করে আসছেন। আলীয়া মাদ্রাসা সরকারের সাহায্য নেয়, ইংেরজি-গণিত পড়ায়, এখান থেকে ডিগ্রি নিয়ে ছাত্রদের অনেকে কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়েও ভর্তি হন। বাংলাদেশে এদের অনেকেই জামায়াতে ইসলামী ও ছাত্র শিবিরের সঙ্গে জড়িত। কিন্তু কওমী মাদ্রাসার ছাত্ররা কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হতে পারেন না সনদের স্বীকৃতি নেই বলে। তাদের মাদ্রাসাগুলিতে পত্রিকা-রেডিও-টিভিও নেই। এরা স্বদেশে পরবাসীর মতো বাস করেন, সম্পূর্ণ বাস্তব-বিচ্ছিন্ন হয়ে। সিলেবাস যত প্রাচীন, তাদের কাছে সেটা তত কৌলিন। অথচ এদের মেধাকে অবমূল্যায়নেরও সুযোগ নেই। কোরোনে হাফেজরা দীর্ঘ কোরআন শরীফ অল্প সময়ে মুখস্ত করে মেধারই পরিচয় দেন। বাল্যকালথেকেই তাদের পরিশ্রম ও কৃচ্ছতাকেও খাটো করে দেখার বিষয় নয়। এরা কোনো রাজনৈতিক দলের সঙ্গে যুক্ত নয়। যদিও লালবাগ, কামরাঙ্গির চর প্রভৃতি কওমী মাদ্রাসার হুজুরদের কেউ-কেউ রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত থেকেছেন। মরহুম হাফেজী হুজুর, মাওলানা আজিজুল হক, ফজলুল হক আমিনী প্রমুখ সরাসরি রাজনীতি করেছেন। তবে কওমী মাদ্রাসার আর দু’টি বড় স্তম্ভ হাটহাজারী ও পটিয়া মাদ্রাসার সঙ্গে রাজনৈতিক দলের সংশ্লিষ্টতার জোরালো ভূমিকা এর আগে এভাবে দেখা যায়নি। এখন তারা জড়িয়ে পড়েছেন রাজনীতিতে। অবশ্য খেলোয়াড় হিসেবে নাকি ক্রীড়নক হিসেব তা এখনো পরিস্কার নয়। এদের অতিক্ষুদ্র অংশ জামায়াতের সঙ্গে জড়িত বলে সন্দেহ করা হয়। যদিও এরা প্রবলভাবে মওদুদীর ভাবাদর্শ-বিরোধী।
আলীয়া ওয়ালারা জাগতিক-পারলৌকিক সব ধরনের সুযোগ নিচ্ছেন রাষ্ট্রের কাছ থেকে। তাদের ধূর্ততম অংশ হচ্ছেন জামায়াত-শিবির। তারা নিকট-অতীতে রাষ্ট্রক্ষমতার অংশীদারিত্ব পেয়েছেন এবং আরো বড় পরিসরে অংশিদারিত্ব চাচ্ছেন। এরাই আবার জামায়াতের ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের চাকরি এবং ইসলামী ব্যাংকের মূলধন বা কর্জে হাসানা হাসিল করে চলেছেন নিত্যদিন। রাষ্ট্রক্ষমতার অংশীদায়িত্ব পেয়ে পেশাজীবী সংগঠনগুলিতেও ব্যাপকহারে প্রাধান্য বিস্তার করেছেন তারা। তাই যুদ্ধাবপারাধীদের বাঁচাবার গরজ এদের অস্তিত্বের সঙ্গে জড়িত। এদের রুটি রুজি জড়িত এখানে। কিন্তু কওমী ওয়ালাদের চিত্র ভিন্ন। সাধারণ ভাবে এরা নিজেদের ধর্মীয় দল হিসেবে তুলে ধরেন। হেফাজতে ইসলামের জন্ম ২০১০ সালে, নারীনীতিকে কেন্দ্র করে। তারা যে ১৩ দফা তুলে ধরেছেন, এটি নতুন কিছু নয়। এসব দাবি তারা প্রায়শই তুলে থাকেন, কোনো রাজনৈতিক দল হিসেবে নয়, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান হিসেবে। কিন্তু এবার, অনেকটা তালগোল পাকিয়েছে। অভিযোগ উঠেছে টাকার খেলারও।
কাঁচপুর থেকে যাত্রাবাড়ি পর্যন্ত মাত্র আট মাইলে ২৬টি কওমী মাদ্রাসার শিক্ষার্থীর সংখ্যা ৫০ হাজারেরও বেশি। ঢাকার লালবাগ, কামরাঙ্গির চরসহ অন্যান্য মাদ্রাসায়ও শিক্ষার্থী অসংখ্য। এদের রাজনৈতিক ভাবে কেউ ব্যবহারের সুযোগ পেলে যে ভয়ঙ্কর অবস্থা হতে পারে তা আমরা দেখতে শুরু করেছি।
হাটহাজারি, পটিয়া, লালবাগ, কামরাঙ্গির চর এবং ঢাকার আলীয়া মাদ্রাসা প্রভৃতির বাইরে, বাংলাদেশের গ্রামে-গঞ্জে-পাড়ায় মহল্লায় হাজার হাজার মাদ্রাসা রয়েছে। তাতে কারা পড়ে? পড়ে একেবারে গরীবের সন্তানেরা। আর গরীব যদি এতিম হয় তা হলে তো কথাই নেই। মাদ্রাসা ছাড়া তার উপায় নেই। এদের অভিভাবকরা শুধু যে সওয়াব হাসিলের জন্য সন্তানদের মাদ্রাসায় পাঠান তা নয়, পাঠান অসহায় হয়ে। স্কুলে পাঠাতে পারেন না তারা। বর্তমানে প্রাথমিক বিদ্যালয়ে বই বেতন না লাগলেও পেটে তো কিছু দিয়ে যেতে হয়। বহু মাদ্রাসায় শিক্ষার্থীদের পেটের অন্নও জোগানো হয়। জামায়াত-শিবির কর্মীদের জন্য অর্থের সঙ্গে সঙ্গে জোগায় জীবিকাও, আর কওমীরা জোগায় অন্ন। গরীব অভিভাবকরা জানেন না তার সন্তানরা আলীয়া ঘরানায়, নাকি কওমী ঘরানায় পড়ছেন। তাদের জানার কথাও নয়। দরিদ্রের সন্তান খেয়ে-পরার পরও কিছু বিদ্যা অর্জন করতে পারছে এটাই তাদের বড় সান্তনা। আর শহরগুলিতে মাদ্রাসা অনেক গরীব পরিবারের কাছে শস্তার ডে-কেয়ার ব্যবস্থাও। ছোট সন্তানদের মাদ্রাসায় রেখে মা-বাবারা কাজে যান। আমাদের এনজিও-বিলাসীদের দৃষ্টি এরা আকর্ষণ করতে পারেন না।
কিছু স্বচ্ছল পরিবারের সন্তাতও মাদ্রাসায় পড়েন। দেখা যায় কোনো পরিবারের অভিভাবক অন্তত একজন সদস্যকে হলেও পাঠান মাদ্রাসায়, তাদের চিন্তামতে, আল্লাহর রাস্তায়। এক্ষেত্রে বেছে নেওয়া হয় পরিবারের সবচেয়ে অ-মেধাবী সদস্যাটিকে। তবে স্বচ্ছল পরিবার থেকে মাদ্রাসায় পড়ানো সদস্যদের সংখ্যা খুব কম। জামায়াত-শিবিরের কোনো নেতার সন্তানই মৃদ্রাসায় পড়ার কথা শোনা যায় না।
আরেক শ্রেণীর মানুষও সন্তানদের মাদ্রাসায় পাঠান, যারা মনে-প্রাণে বিশ্বাস করেন, মাদ্রাসা শিক্ষাই উত্তম। এদের সংখ্যাও নগন্য। এদের একাংশ দরিদ্র মাদ্রাসা-শিক্ষকদেরই সন্তান। এই ক্ষুদ্রাংশ ছাড়া মাদ্রসার বহু চতুর প্রতিষ্ঠাতা বা শিক্ষকরা সন্তানদের কখনো মাদ্রাসায় পড়ান না।
কিন্তু এখানে মূল্য প্রশ্নটি হলো, যারা সন্তানদের মাদ্রাসায় পাঠান বা যারা মাদ্রাসায় পড়তে যান তাদের কী জ্ঞানের আকাক্সক্ষা নেই? আলোকিত হওয়ার স্বপ্ন নেই? আকাক্সক্ষা কি নেই শিক্ষার সঙ্গে জীবিকার সমন্বয়ের? অবশ্যই আছে, কিন্তু তারা জানেন না সেটি কোন পথে হবে, কার দ্বারা হবে। যোগেন্দ্রনাথের ফাঁসি চেয়ে যারা সেøাগান দিলেন, মিছিলে নেতৃত্ব দিলেন, তাদের কেউ-ই জানতেন না শতাধিক বছর আগে লোকটির মৃত্যু হয়েছে। ইমরান সরকার ও তার সঙ্গীদের সঙ্গে যে-সব মাদ্রাসা ছাত্রের কথা হয়েছে, তারা জানেন না ব্লগ কি। অথচ প্রাণপাত করছেন ব্লগারদের বিরুদ্ধে। শাপলা চত্ত্বরে নরসিংদীর এক মাদ্রসার নিহত ছাত্রটির পরিবারও জানেন না, হেফাজত বা ১৩ দফা কি। এসব অজ্ঞতার দায় কার? শত্রু বলি আর প্রতিপক্ষ বলি, শত্রু-প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে আওয়াজ তুলতে হলে বা তাদের প্রতিরোধে শহীদ পর্যন্ত হওয়ার প্রস্তুতি নেওয়া হলে, তার আগে কি প্রতিপক্ষ বা শত্রু সম্পর্কে কিংবা তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ সম্পর্কে সবাইকে অবগত করা উচিত নয়? এটা না করা হলে এই অজ্ঞতা ও ধূর্ততা কি ভয়াবহ পরিণাম ডেকে আনতে পারে তা আমরা অতীতেও দেখেছি, এখনো দেখছি। এই অজ্ঞতার শরীকানা তারা ভোগ করতে বাধ্য করছেন গোটা জাতিকে, গোটা দেশকে। এটাই প্রধান সমস্যা। এই অজ্ঞতার কারণেই বিভিন্ন জিগির তুলে ফায়দা নিচ্ছে ধূর্তরা। বিক্রি হয়ে যাচ্ছে শিক্ষাথীদের ত্যাগ। তাই আজ প্রধানভাবে নজর দিতে হবে সত্যকে উপলব্ধির প্রয়োজনীয় শিক্ষার দিকে। কওমীরা মূলধারায় আসতে চান না বলে একটি প্রচলিত প্রচার রয়েছে। ঢাকাস্থ মার্কিন দূতাবাস থেকেও এ সম্পর্কিত একটি প্রচেষ্টায় কথা আমরা জানতে পারি উইকিলিস-এর মাধ্যমে। কওমীওয়ালাদের সবাই কিংবা কোনো অংশ যদি তাদের সিলেবাস পরিবর্তন করতে না চান ভাল কথা, এমন উদাহরণ খ্রীষ্ট ধর্মেও রয়েছে Ñ ক্যাথালিক ও প্রটেস্টান্টরা কোথাও কোথাও আলাদা শিক্ষা প্রতিষ্ঠান চালায়। কিন্তু বাংলাদেশে কওমী-শিক্ষার্থীদের মূলধারায় আনার কোনো উদ্যোগই নেওয়া হয়নি। উদ্যোগ নেওয়ার চেষ্টা কয়েকবার হলেও সেগুলি ছিল অসম্পূর্ণ। আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু কওমীদের প্রতিনিধিত্ব সেখানে রাখা হয়নি। তাদের যথাযথ প্রতিনিধিত্ব রেখে আধুনিকায়নের চেষ্টা করা হলে সবাই না হোক, একটি বড় অংশ যে ইতিবাচক সাড়া দেবে তাতে সন্দেহ নেই। কারণ কওমী মাদ্রাসার গড়ে ওঠার পেছনে কেন্দ্রীয় কওমীদের গভীর কোনো পরিকল্পনা বা সমন্বয় নেই। গ্রামে-গঞ্জে এগুলি গড়ে উঠছে নানা স্বার্থ ও হিসেব থেকে।
বাংলাদেশে প্রতিনিয়ত কওমী মাদ্রাসা বৃদ্ধির পেছনে তাদের জীবিকার আপাত নিশ্চয়তাসহ বহুবিধ বিষয় কাজ করে। কওমী শিক্ষার্থীদের জীবিকা সীমাবদ্ধ। মাদ্রাসার শিক্ষক, মক্তবের হুজুর, স্কুলের ধর্মীয় শিক্ষক, মুয়াজ্জিন, ইমাম, মৃতের সৎকার, ফাতেহা পাঠ, ওয়াজ-মাহফিল, দোয়া পাঠ, পশু কোরবানী প্রভৃতির বাইরে তাদের জীবিকা তেমন নেই। আলীয়া মাদ্রাসা হলে উলা-টাইটেল পড়ে কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে যায় একাংশ। কওমীদের সে সুযোগ নেই। তাই শিক্ষাজীবন শেষ হলেই তারা নিজের গ্রামে-পাড়ায়-মহল্লায় আরেকটি মাদ্রাসা করার উদ্যোগ নেন। কোনো ধনাঢ্য ব্যক্তির মা-বাবার নামে মাদ্রাসা করার প্ররোচনা দেন তারা। কাউকে না কাউকে পেয়েও যান, বিশেষ করে সেই-সব ধনাঢ্য ব্যক্তিদের, যাদের উপার্জন বিতর্কিত এবং সঙ্গত কারণেই যারা পরকাল নিয়ে উদ্বিগ্ন। অনেক সমাজসেবকও মাদ্রাসা করাকেই প্রধান্য দেন।
আবার বাংলাদেশের আমলাদের একাংশের মধ্যেও নিজ এলাকায় মাদ্রাসা করার প্রবল ঝোঁক দেখা যায়। কারণ, সুনামের এটি সহজ উপায়। নানা মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে যোগাযোগ ভাল বলে যেসব কাজে লাগিয়ে মাদ্রাসা স্থাপন করে এক ধরনের চাঁদাবাজী বা ভিক্ষাবৃত্তি চালিয়ে তারা মাদ্রাসার সংখ্যাবৃদ্ধি করেন। এসব বিষয়গুলিকেও নজরে আনা দরকার যাতে যত্রতত্র অপ্রয়োজনীয় মাদ্রাসা না বাড়ে, অর্থাৎ শিক্ষার্থীদের জন্য যতোটা প্রয়োজন তার বাইরে নয়।
কওমী মাদ্রাসার শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের কাছে কাছে এটা পরিস্কার করা দরকার যে, সিলেবাসে প্রয়োজনীয় আধুনিকতা আনা হলে তাদের জীবিকার ক্ষেত্র প্রসারিত হবে, পরজীবীর দুর্নাম ঘুচে যাবে। এতে একটি অংশ রাজী হলে এর সুফল দেখে অন্যরাও আলোকিত হতে এগিয়ে আসবে। যেখানে আলোর অভাব সেখানে আরো আলোই দরকার, ব্যঙ্গ-ধিক্কার নয়। দরিদ্র ঘরের কওমী শিক্ষার্থীদের জন্য সম্প্রতি আরো একটি ভাল জীবিকার ক্ষেত্র উন্মোচিত হয়েছে। দরিদ্র বলে তারা অর্থ দিয়ে মধ্যপ্রাচ্যে কাজ করতে যেতে পারেন না। অথচ তারা আরবী ভাষায় দক্ষ। এদের সরকারের বর্তমান উদ্যোগের সঙ্গে জড়িত করে ন্যূনতম ইংরেজি শিখিয়ে ও প্রশিক্ষণ দিয়ে বিদেশে পাঠানোর ব্যবস্থা করা হলে উত্তম মানব সম্পদে পরিণত হবেন, বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যে ও অন্যান্য ধনী মুসলিম দেশে। আগে আমরা চেষ্টা করে দেখিনি। আহমদ ছফার ভাষায় ‘কেউ তাদের দরজায় করাঘাত করে না।’
ওদের পেছনে রেখে সামনে যাওয়া সম্ভব কি? এর জবাব রবীন্দ্রনাথে পাব; ‘যারে তুমি নিচে ফেল/ সে তোমারে বাধিবে যে নিচে /পশ্চাতে ঠেলিছ যারে সে/ তোমারে পশ্চাতে টানিছে।’
বাংলাদেশ যদি দরদ দিয়ে ওদের দেখে, যদি ওদের আসল অসহায়ত্বকে উপলব্ধি করে, যদি কোনোদিন বাংলাদেশ গড়ে ওঠে কল্যাণ রাষ্ট্র হিসেবে, সেদিন ওরাও মাথা তুলে বাঁচতে পারবেন Ñ সাচ্চা মুসলমানের গৌরব অক্ষুন্ন রেখেও। তাদের রাজনৈতিক ভাবে ব্যবহারের পথ বন্ধ হবে। সর্বোপরি বহুকালের, বহুজনের, বহু প্রপঞ্চের দায়-দেনাও তারা পরিশোধ করতে পারবেন।
তিন.
যেসব কারণে বাংলাদেশে নক্সালদের রাজনীতি ব্যর্থ হয়েছে, অভিন্ন কারণে জামায়াতে ইসলামী বা সে ধরনের দলের রাজনীতি বাংলাদেশে ব্যর্থ হতে বাধ্য। কোনো উগ্র ঝোঁকসম্পন্ন রাজনীতিই বাংলাদেশে সফল হওয়ার সুযোগ নেই। বাংলাদেশের মাটি ও মানুষ সেই ধাচেরই। কারণ, বাংলাদেশের মানুষ প্রয়োজনে কঠোর-কঠিন হলেও তারা অন্তর্গতভাবে শান্তিবাদী, সমন্বয়বাদী। যারা তাদেরকে ভালোবাসার নামে অতীতে আহ্বান জানিয়েছেন বালাদেশের মানুষ তাদের আহ্বানেই সাড়া দিয়েছেন। সপ্তম শতাব্দীর প্রথম ভাগ থেকে অহিংস বৌদ্ধ ধর্ম ভারতবর্ষের অন্যান্য স্থান থেকে যখন বিতাড়িত-প্রায়, তখন সমতট গৌড়-পুন্ড্র-বঙ্গে ঠাঁই পেয়েছে সমাদরের সঙ্গে। সেনদের আমলকে বিচ্ছিন্ন ধরা চলে। এদেশে ইসলামও এসেছিল শান্তি ও সাম্যের বার্তা নিয়। শান্তি-সাম্যের প্লাবনে ভেসেছে এই ভূমি। চৈতন্যদেব সফল হয়েছিলেন ভালবাসারই আহ্বান জানিয়েই। শেরেবাংলা-ভাসানী-মুজিব-জিয়া প্রমুখের কর্মপদ্ধতি গভীরভাবে বিশ্লেষণ করলে সেখানে ভালবাসা এবং সমন্বয়েরই নির্যাস পাওয়া যাবে। মানুষকে তাঁরা আহ্বান জানিয়েছেন ভালবাসারই নামে। সফলও হয়েছেন। কারণ, বাংলাদেশের মানুষকে তারা অনুভব করতে পেরেছিলেন। বাংলাদেশের মানুষ ধর্ম-প্রাণ, কিন্তু ধর্মান্ধ নয়। ধর্ম ব্যবসায়ীদেরও তারা সুনজরে দেখেন না। তারা ওয়াজ শুনে কাঁদেন, আবার দোতারার গান বা পালা শুনেও কাঁদেন। বাঙালি মধ্যবিত্ত একই পাঞ্জাবী পরে জুমার নামাজ আদায় করে, আবার সেটি পরেই যায় সঙ্গীতানুষ্ঠান বা পহেলা বৈশাখের অনুষ্ঠানে। সাধারণ মানুষ চিরকালই অসাম্প্রদায়িক। বাংলাদেশের নিম্নবিত্ত পরিবারের নারীরা শহরে যেভাবে গার্মেন্টস প্রভৃতিতে কাজ করেন, গ্রামে কাজ করেন মাটি কাটারও। গো-সম্পদ তারা নিজেরা পালন করেন। এরাই কোথাও বেড়াতে গেলে ব্যবহার করেন বোরখাও। তাদের আচরিক জীবন বাস্তবের কঠিন মাটিতে প্রোথিত। মোল্লা-পুরুতদের রক্ত চক্ষুকে ওরা থোড়াই কেয়ার করেন তারা। জামায়াত-হেফাজতিদের কর্মসূচী তাই এদেশে পরিপূর্ণভাবে কায়েম সম্ভব নয়। মাদ্রাসার শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা এখনো নিজেরাই পরজীবী। মধ্যপ্রাচ্যসহ বিভিন্ন দেশ থেকে অর্থ আসে গুটিকয়েক মাদ্রাসায় মাত্র, বাকীগুলি চলে স্থানীয়দের দান-অনুদানে। পরজীবীরা কখনো মূলধারার নেতৃত্বে আসতে পারেন না। কারণ আসতে গেলে তাদের রগে টান পড়বে। মাদ্রাসায় পড়েন গরীবেরা, কিন্তু এগুলির প্রতিষ্ঠাতা বা কমিটির গুরুত্বপূর্ণ পদগুলিতে রয়েছেন আওয়ামী লীগ-বিএনপি বা অন্য রাজনৈতিক দলের সমর্থকরা। কোথাও বা নির্দলীয় প্রভাবশালীরা।
মাদ্রাসা কখনো শাহবাগীদের প্রতিযোগী-প্রতিদ্বন্দ্বীও নয়। শাহবাগ আন্দোলন-চেতনায় যারা জড়িত ভবিষ্যতে তারা হবেন প্রকৌশলী, বিজ্ঞানী, ডাক্তার, শিল্পী, রাজনীতিবিদ, ব্যবসায়ী প্রভৃতি। মাদ্রাসা শিক্ষিতদের জীবিকা কি হতে পারে আগেই উল্লেখ করেছি। তবে জামায়াত-শিবিরের ধূর্ততম অংশ আধুনিক উচ্চ শিক্ষা নিয়ে আধুনিক জীবিকায় ভাগ বসালেও তাদের সংখ্যা অতি সামান্য। জামায়াতের অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠান থেকে এরা মাসোহারা, অনুদান ও কর্জে হাসানা নিয়ে আঁখের গড়েন। তাদের কর্জে হাসানা এমন এক ঋণ যা শোধ না করতে পারলেও তেমন অসুবিধা হয় না।
জামায়াতে ইসলামী একটি রাজনৈতিক দল হিসেবে পরিচিত হলেও বৃহৎ অর্থে এটি একটি এনজিও। চাকরি ও ঋণ দিয়ে তারা অধিকাংশ কর্মীকে বেঁধে রেখেছে। ইসলামী ব্যাংকের ব্যবসাপাতি, ইসলামী হাসপাতালের যন্ত্রপাতি বা কোচিং সেন্টারের গাইড বইয়ের মতো ইসলামও তাদের কাছে রাজনৈতিক হাতিয়ার বই কিছু নয়। সে কারণে ক্ষমতার জন্য কথিত সেকুলার আওয়ামী লীগের পদাঙ্ক অনুসরণে যেমন তাদের আপত্তি নেই, তেমনি আপত্তি নেই কথিত জাতীয়তাবাদীদের সঙ্গে গাঁটছাড়া বাঁধায়। আবার মওদুদী-ওয়াহাবী জামায়াত-শিবিরের চিরবৈরী কওমী-ওয়াহাবীদের সঙ্গ পেতে বা তাদের ব্যবহার করতেও ওদের আপত্তি দেখা যাচ্ছে না। এক কালের বহু কমিউনিস্ট-বামকে খাম সরবরাহেও তাদের দ্বিধা নেই। একটি রাজনৈতিক দল এনজিও হয়ে পড়লে তার সামনে বহু সীমাবদ্ধতা উপস্থিত হয় এবং ক্রমনিঃস্বায়নের দিকে যেতে থাকে। বাংলাদেশে জামায়াতের ঘাঁড়ে আছে আরো অনেক বড় বোঝা, যুদ্ধাপরাধীদের বোঝা। এ বোঝা অতিশয় ভারী যা ঝড়-জলোচ্ছ্বাসেও নাড়াতে পারবে না। সবচেয়ে বড় কথা, যে দলের কর্মীদের উত্তেজিত করতে চাঁদে মুখ দেখতে পাওয়ার গুজব ছড়াতে হয় কিংবা কাবা শরীফের গিলাফ নিয়ে জালিয়াতি করতে হয় সে দল পানি ঘোলা থাকা পর্যন্তই সজীব থাকতে পারে, সব সময় নয়।
দু’টি ছোট ঘটনা উল্লেখ করতে চাই, প্রাসঙ্গিক বলে। গত শতকের সত্তরের দশকের শেষভাগে আমি যখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র, ছাত্র শিবিরের রাজনীতি সেখানে তখনো প্রকাশ্য হয়নি। একদিন আমার পরিচিত একজন অন্য এক গরীব ছাত্রের বর্ণনা আমার কাছে তুলে ধরলো। ঘটনাটি এরকমঃ- তার ডিপার্টমেন্টের কিছু ছাত্র হঠাৎ একদিন গরীব ছাত্রটিকে পিকনিকে যাওয়ার আমন্ত্রণ জানালো। আর্থিক কারণে প্রত্যাখ্যান করায় সেই ছাত্ররা বিনা চাঁদায়ই জোর করে তাকে নিয়ে গেল। সেখানে দেখা গেল আরো অনেক গরীব ছাত্রকে একইভাবে আনা হয়েছে। উদ্যোক্তারা কোনো রকম রাজনৈতিক আলাপ করা থেকে বিরত থাকলেও খাবার সময় ঘটলো অদ্ভুত ঘটনা। দেখা গেল প্লেটে আগেই পোলাও সাজানো রয়েছে, ওপরে রোস্ট ও কাবাব। খাবার শেষ হওয়ার পর দেখা গেল, প্লেটের তলায় লেখা ‘সৌজন্যে, ইসলামী ছাত্র শিবির।’ ব্যাপারটা যাদের পছন্দ হয়নি, তাদেরও কিছু করার ছিল না। কারণ এর মধ্যে ‘নুন’ খাওয়া হয়ে গেছে।
দ্বিতীয় ঘটনাটি এ রকম। ১৯৯৬ সালের সাধারণ নির্বাচনের আগে নির্দলীয় বলে পরিচিত একটি পরিবারের এক গৃহিনীর সঙ্গে দুপুরের দিকে দেখা করতে এলেন এক ভদ্রমহিলা। এসে সালাম দিয়ে ‘মুসাফা’ করার জন্য হাত বাড়িয়ে দিলেন। গৃহিনীও হাত বাড়ালেন সৌজন্য রক্ষায়। কিন্তু আগত মহিলা গৃহিনীর হাত চেপে ধরে বারবার জামায়াতের প্রাথীর পক্ষে ভোট চাইতে লাগলেন। গৃহিনী বিব্রত। এ অবস্থায় হাত ছাড়ার পর দেখা গেল আগত মহিলার হাতে ছোট একটি কোরআন শরীফ, যা মুসাফা বা হ্যান্ডশেকের আগে দেখা যায়নি। সেই মহিলা বার বার বলতে লাগলেন, আপনি কোরআন ছুঁয়ে আমার কথা শুনেছেন। সম্মতি দিয়েছেন, ভোট না দিলে কিন্তু আল্লাহ নারাজ হবেন। সেই পরিবারটি নির্দলীয় হলেও জামায়াত-বিরোধী ছিল। কিন্তু মনের খটকায় সেই গৃহিনী জামায়াত প্রার্থীকেই ভোট দেন।
দু’টি ধ্রুপদী উদাহরণই অনেক কিছুই তুলে ধরে। এভাবেই একদিকে ইহ ও পরকালব্যাপী প্রলোভন, অন্যদিকে ধূর্ততাকে ধর্মের নামে সর্বোতভাবে ব্যবহার করে কচ্চপের মতো ধীরে ধীরে এগিয়েছে জামায়াত। কিন্তু এসব অসাধুতা কখনো দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব ফেলে না। বাংলাদেশেও ফেলেনি। জামায়াতী অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠানগুলিই দলের মূল নিয়ামক। এ ধরনের ‘নিয়ামক’ অন্যকোনো দলে নেই। এ কারণে কখনো অর্থনেতিক রগে টান পড়লে অনেক চমকদার ঘটনাও ঘটবে। এ ছাড়াও দলের ভেতরের ‘হ্যাভ ও হ্যাভনটদের’ ক্ষোভ এক সময় বিক্ষোভে রূপান্তরিত হয়ে সঙ্কট তৈরি করবে।
বাংলাদেশই পৃথিবীতে একমাত্র দেশ যেখানে ইসলামের বিভিন্ন ফেৎনায় বিভক্ত চিরবৈরী কিছু-দলগ্রুপ সাময়িকভাবে একিত্রত হয়েছে। তারা খুবই জাগতিক লোভে একত্রিত হয়েছে। ইসলাম এখানে তাদের সবারই হাতিয়ার মাত্র, মতাদর্শ বা সংগ্রাম নয়। কওমী-দেওবন্দীদের প্রতিপক্ষ হচ্ছে, আলীয়া ঘারানা ও আহলে সুন্নাত ওয়া জামায়াত, আহলে হাদিস, আহমদিয়া, শিয়া প্রভৃতি। আহলে সুন্নাতের প্রতিপক্ষ হচ্ছে দেওবন্দী, তাবলিগ, আহমদিয়া, আহলে হাদিস, শিয়া প্রভৃতি। মওদুদীর উত্থানের পর দেওয়াবন্দীরা পিছু হটলেও হাল ছাড়েননি। পাকিস্তান-আফগানিস্তানে দেওবন্দী-ওয়াহাবীদের অংশই তালেবান হয়ে রক্তক্ষয়ী সংগ্রামে লিপ্ত। বাংলাদেশে দেওবন্দী ওয়াহাবীদের কওমী গ্রুপের ফসল হচ্ছে হেফাজতে ইসলাম যারা ঐতিহাসিকভাবে জামায়াত-বিরোধী । আরেক জামায়াত-বিরোধী আহলে সুন্না ওয়া জায়ামায়েত, যাদের তরিকা পীর ও মাজার কেন্দ্রিক। তারা ইতিমধ্যেই জামায়াত-হেফাজতের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে গেছে। কিন্তু চলতি পর্বে হেফাজত জামায়াতের সঙ্গে কন্ঠ মিলিয়ে মাঠে নেমেছে এবং জামায়াত দ্বারা ব্যবহৃত হচ্ছে। ব্যবহারের চেষ্টা করছে বিএনপিও। হেফাজতিদের এই রহস্যময় উত্থান-কর্মকান্ড অচিরেই মতাদর্শগত কারণে নৈতিক সংকট সৃষ্টি করবে সন্দেহ নেই। কারণ, রহস্যজনক আচরণের মধ্যদিয়ে হেফাজতকে জামায়াত-বিএনপির আন্দোলনের মিত্র হিসেবে ব্যবহারের পেছনে হেফাজতের কিছু লোক জড়িত থাকতে পারে, সবাই নয়। অন্যদিকে নাস্তিক-ব্লগারকেন্দ্রিক যে আন্দোলন গড়ে ওঠেছে তার ন্যায্য দাবিগুলি ইতিমধ্যে আংশিকভাবে পূরণ ও পূরণযোগ্য অন্যগুলি বাস্তবায়নের আশ্বাস সত্ত্বেও এই আন্দোলন টেনে নিতে চাইলে গোঁজামিলের প্রয়োজন হবে। বাংলাদেশের মানুষ ধর্মপ্রাণ, কিন্তু ধর্মান্ধ নয় এবং ধর্মাশ্রয়ী বা ধর্মব্যবসায়ী দলগুলির প্রতিও অনুরক্ত নয়। তাদের সম্মিলিত ভোটের সংখ্যাও বেশি নয়।
যে’কজন ব্লগার ইসলাম ধর্ম ও মহানবী (সা:) এর অবমাননা করেছেন বাংলাদেশের ধর্মপ্রাণ প্রতিটি মানুষই তাদের এই তৎপরতার বিরুদ্ধে। তাদের বিচারেরও পক্ষে মানুষ। তাদের হটকারিতায় ইতিমধ্যে যথেষ্ট ক্ষয়-ক্ষতি হয়েছে। কিন্তু যে-সব মহল ঢালাও ভাবে অন্য মতাদর্শের সবাইকে ‘নাস্তিক’ আখ্যা দিয়ে রাজনৈতিক ফায়দা হাসিলের চেষ্টা করছে, এদেশের ধর্মপ্রাণ মানুষ তাদেরও সুনজরে দেখছে না। ‘নাস্তিক’ শব্দটি এখন যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের পক্ষের সবার ওপর চাপিয়ে দেওয়ার একটা মতলবাজী প্রচারণার সমানতালে চলছে । যে চেষ্টা ব্যর্থ হতে বাধ্য। এই পর্বে এমন কিছু লোকও আস্তিকের ধ্বজা নিয়ে সমাজের সামনে হাজির হয়েছেন যারা কেবলামুখি হয়ে আছাড়ও খান না, যাদের ব্যক্তিজীবন খুবই কোরআন-সুন্নাহ বিরোধী। আস্তিক্য-নাস্তিক্যকে তারা ফ্যাসনে পরিণত করে নির্দলীয় হেফাজতের জমায়েত দেখে তৃপ্তির ঢেঁকুর তুলছেন। তাদের স্বপ্ন ভঙ্গ হওয়াও এখন সময়ের ব্যাপার মাত্র। কারণ রাজনৈতিক পন্থায় ক্ষমতায় যাওয়া বা ক্ষমতায় যাওয়ার নির্ভরযোগ্য সিড়ি হতে গেলেও রাজনৈতিক দল-আদর্শ দরকার – যা কওমী-হেফাজতিদের নেই বা সে ইচ্ছাও হয়তো তাদের নেই। কওমীরা রাজনৈতিক শক্তি নয়। তাদেরকে সেইসব রাজনৈতিক দলই রাজনৈতিক স্বার্থে ব্যবহার করতে চাইছে যারা ইতিমধ্যে দেউলিয়া হয়ে গেছে, রাজপথ থেকে কানাগলিতে ঢুকে গেছে এবং ধাবিত হচ্ছে চোরাবালীর দিকে।
সরকার কওমী-ওহাবী ও আহলে সুন্নাত ওয়া জামায়াতের মধ্যে ভারসাম্যের যে চেষ্টা করছে তার ফলাফলও শুভ হওয়ার কথা নয়, পাকিস্তানে শুভ হয়নি। সবচেয়ে বড় কথা, ধর্মাশ্রয়ী দল দিয়ে ধর্মাশ্রয়ী দলকে ঠেকাতে গেলে সুদূর ভবিষ্যতে লাভবান হবে জামায়াতে ইসলামী। কারণ ইসলাইমের সবচেয়ে মডার্ণ ইন্টারপ্রিটেনশন জামায়াতীরাই করে থাকে।
আহমদ ছফা অনেক আগে লিখেছিলেন ‘আওয়ামী লীগের যারা বুদ্ধিজীবী তাদের অনেকেই ধর্মপ্রাণ মুসলমান সমাজের গ্রহণযোগ্য ভাষায় কথা বলতে জানেন না।’
কিন্তু হলের ঘটনায় মনে হচ্ছে রূপান্তর আসছে আওয়ামী লীগেও। অবশ্য প্রয়োজনে নিজেদের বিরুদ্ধেও খন্ডকালীন লড়াই সংগ্রামের মহড়া তারা দেন। এটা তারা অন্যদের অস্ত্রগুলি নিজেদের গোলায় তোলার জন্যও করে থাকেন।
চার.
শাহবাগের মঞ্চ ভেঙ্গে দেওয়া হলেও তাদের বারে বারে ফিরে আসতে হবে, আরো গণমুখী কর্মসূচি নিয়ে, আরো নির্দলীয় হয়ে কিংবা নতুন কোনো রাজনৈতিক শক্তি হয়ে; বাঙালি মুসলমানদের মনোভূমি পাঠ করে তাদের দরদী হয়ে; নাস্তিক্য-প্রচারকারী, বিতর্কিত ও হটকারীদের বাদ নিয়ে। সর্বোপরি মুক্তিযুদ্ধের মহান চেতনা ধারণ করে স্বাধীনতার ঝান্ডা হাতে। তাদেরই প্রতীয়মান করতে হবে যে, ইসলাম ও মুক্তিযুদ্ধের মধ্যে কোনো বিরোধ আগেও ছিল না, এখনো নেই। এদেশের ধর্ম-প্রাণ মানুষেরাই মুক্তিযুদ্ধ করেছেন। অতি অল্প-সংখ্যক লোকই তখন বিশ্বাসঘাতকতা করেছে Ñ কেউ ইসলামের নামে, কেউ স্বার্থের কারণে। বিচার অপরাধীদেরই হচ্ছে, যা স্বাভাবিক। অপরাধীদের বিচার না হলে অপরাধ কখনো বন্ধ হবে না। দেরী হলেই বিচার তামাদি হয়ে যায় না। বিচারের নামে কেউ দলীয় স্বার্থ হাসিল বা কোনো পক্ষকে ব্ল্যাকমেইলিং করতে চাইলে তরুণদেরই দাঁড়াতে হবে তাদেরও বিরুদ্ধে।
তরুণরা আমাদের ন্যায় প্রবীণদের মতো ভাবুক বা কাজ করুক তা আশা করি না। কারণ সেটা করতে গেলে আর আশা থাকে না। তরুণরা হবেন আপসহীন, সাহসী ও স্বপ্নের ফেরিওয়ালা। এ দেশে স্বপ্ন দেখানোর সাহসী লোক নেই। এই শাহবাগই সব সময়ই আলো দেবে ভবিষ্যতকে, কখনো জোনাকীর মতো, কখনো তারকার মতো, কখনো চাঁদের মতো, কখনো সূর্যের মতো। আলো তাদের দিতেই হবে। কারণ, আর কারো হাতে আর আলোর মশাল নেই।
নিউইয়র্ক, মে ২০১৩
সংযোজন ও পরিমার্জন নিউইয়র্ক, ১৫ মে ২০১৭
আহমেদ মূসা লেখক-সাংবাদিক-নাট্যকার ।


Leave a Comment