USA

রাশিয়ার কাছে অতি গোপনীয় তথ্য প্রকাশ, চাপে ট্রাম্প


মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প রাশিয়ান পররাষ্ট্রমন্ত্রীর কাছে অতি গোপনীয় গোয়েন্দা তথ্য প্রকাশ করে দিয়েছেন। যুক্তরাষ্ট্র সফররত সের্গেই লাভরভের সঙ্গে এক বৈঠকে ট্রাম্প গোপন যে তথ্য প্রকাশ করেন তা মধ্যপ্রাচ্যের জঙ্গিগোষ্ঠী আইএস সম্পর্কিত। বিমানে ল্যাপটপ ব্যবহার সংক্রান্ত অতি গোপনীয় ওই তথ্য যুক্তরাষ্ট্র পেয়েছিল মধ্যপ্রাচ্যের একটি মিত্র রাষ্ট্র থেকে। ওই রাষ্ট্র তথ্যটি রাশিয়াকে জানানোর অনুমতি দেয়নি। কিন্তু ট্রাম্প সেটা রাশিয়ান পররাষ্ট্রমন্ত্রী সের্গেই ল্যাভরভকে জানিয়ে দেন। সাবেক ও বর্তমান দুই গোয়েন্দা কর্মকর্তার বরাতে এ খবর প্রকাশ করেছে ওয়াশিংটন পোস্ট।  
জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা এইচ আর ম্যাকমাস্টার হোয়াইট হাউসে সংবাদ সম্মেলন ডেকে এই প্রতিবেদনকে ‘মিথ্যা’ আখ্যা দিয়ে উড়িয়ে দেন। তবে খোদ ট্রাম্পই পরে বিষয়টি স্বীকার করে নিয়েছেন। তিনি টুইটার বার্তায় বলেন, ‘প্রেসিডেন্ট হিসেবে আমি রাশিয়ার সঙ্গে কিছু তথ্য শেয়ার করেছি, যা করার পূর্ণ অধিকার আমার রয়েছে। এসব তথ্য হলো সন্ত্রাসবাদ ও এয়ারলাইন ফ্লাইট সেফটি সম্পর্কিত।’ তিনি বলেন, ‘মানবিক কারণ আছে, পাশাপাশি আমি চাই আইএস ও সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে রাশিয়া আরো বেশি অগ্রসর হোক।’
কিন্তু গোয়েন্দা কর্মকর্তারা ওয়াশিংটন পোস্টকে বলেছেন, ট্রাম্প এসব তথ্য রাশিয়ার সঙ্গে শেয়ার করায় একজন গুরুত্বপূর্ণ সোর্সের জীবন বিপন্ন হয়ে উঠেছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক শীর্ষ গোয়েন্দা কর্মকর্তারা বলেন, ওই আলোচনা ছিল মূলত আইএস’র একটি ষড়যন্ত্র নিয়ে। আলোচনার সময় প্রেসিডেন্ট আগে থেকে ঠিক করে রাখা ধারা থেকে সরে এসে নিজের মতো খোলাখুলি কথা বলতে থাকেন। এরপর তিনি ওই ষড়যন্ত্রের নির্দিষ্ট ও বিস্তারিত সব তথ্য প্রকাশ করে দেন। যেমন, কীভাবে বিমানের ল্যাপটপ কম্পিউটার ব্যবহারের মাধ্যমে এই ষড়যন্ত্র বাস্তবায়নের পরিকল্পনা করা হয়েছে এবং কোন শহরকে টার্গেট করা হয়েছে, ইত্যাদি।
এই গোয়েন্দা তথ্য যুক্তরাষ্ট্র পেয়েছিল মধ্যপ্রাচ্যের একটি মিত্র দেশের কাছ থেকে। তথ্যটি এতটাই সংবেদনশীল যে, যুক্তরাষ্ট্র এই তথ্য রাশিয়া দূরে থাক নিজেদের অন্যান্য মিত্র দেশগুলোকেও জানানো থেকে বিরত ছিল। ট্রাম্প যখন রাশিয়ান পররাষ্ট্রমন্ত্রীকে এসব বলছিলেন, তখন উপস্থিত অন্যান্য কর্মকর্তারা বুঝতে পারেন বড় ধরনের ভুল হয়ে গেছে। তারা পরিস্থিতি সামাল দেয়ার জন্য দ্রুত বিষয়টি সিআইএ ও এনএসএ’কে অবহিত করেন।
প্রসঙ্গত, প্রেসিডেন্ট হিসেবে যেকোনো গোপনীয় তথ্য প্রকাশ করার কর্তৃত্ব ট্রাম্পের রয়েছে। তাই তিনি কোনো আইন ভঙ্গ করেননি। কিন্তু গোপনীয় তথ্য ব্যবস্থাপনায় গাফিলতির অভিযোগ উঠলো তার বিরুদ্ধে, যেই অভিযোগ তিনি নির্বাচনী প্রচারাভিযানের সময় প্রতিপক্ষ হিলারি ক্লিনটনের বিরুদ্ধে প্রায়শই করতেন। রাশিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে ট্রাম্পের এই বৈঠক এমন দিনে হলো, যার আগের দিন ট্রাম্প প্রচারশিবিরের সঙ্গে রাশিয়ার কথিত সম্পর্ক নিয়ে তদন্তরত প্রধান সংস্থা এফবিআই’র প্রধান জেমস কমিকে অকস্মাৎ বরখাস্ত করে তীব্র সমালোচনার জন্ম দেন ট্রাম্প।
তবে, ট্রাম্পকে নিয়ে মার্কিন গোয়েন্দা কর্মকর্তাদের আশঙ্কা ছিল আরো আগ থেকেই। জানুয়ারিতে মার্কিন গোয়েন্দা কর্মকর্তারা ইসরাইলি গোয়েন্দা সংস্থাকে বলেছিল, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের সঙ্গে অতি গোপনীয় গোয়েন্দা তথ্য ভাগাভাগিতে অতিরিক্ত সতর্কতা অবলম্বন করতে! ইসরাইলি পত্রিকা ইয়েদিওথ আহরোনোথ এই তথ্য প্রকাশ করেছিল। মার্কিন কর্মকর্তাদের আশঙ্কা ছিল, এই তথ্য রাশিয়ার কানে চলে যেতে পারে, আর রাশিয়া তা জানিয়ে দিতে পারে তাদের দুই ঘনিষ্ঠ মিত্র ইরান ও সিরিয়াকে, যাদেরকে আবার ইসরাইল শত্রু জ্ঞান করে। বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে, ট্রাম্প যে তথ্য রাশিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রীকে জানিয়েছেন তা ইসরাইল কিংবা জর্ডানের গোয়েন্দা সংস্থা থেকে আমেরিকা পেয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। জর্ডানের গোয়েন্দা সংস্থা মধ্যপ্রাচ্যে বেশ ক্ষমতাশালী। জঙ্গিগোষ্ঠী আইএস অভ্যন্তরীণ ‘মেকানিজম’ সম্পর্কে দেশটির গোয়েন্দাদের দখল অনেক গভীরে বিস্তৃত বলে ধারণা রয়েছে।  
ট্রাম্পের বিরুদ্ধে এই নতুন অভিযোগ আসার পর সিনেটের দ্বিতীয়-সর্বোচ্চ পদাধিকারী ডেমোক্রেট সদস্য ডিক ডারবিন বলেন, ট্রাম্পের এই কাণ্ড ‘বিপজ্জনক ও বেপরোয়া।’ প্রতিনিধি পরিষদের রিপাবলিকান দলীয় সিপকার পল রায়ান বলেন, ‘আমরা জানি না তিনি (ট্রাম্প) কি বলছেন, তবে দেশের গোপনীয় তথ্য সুরক্ষিত রাখা প্রধান কাজ। সিপকার প্রশাসনের কাছ থেকে পূর্ণ ব্যাখ্যা পাওয়ার আশা করছে।’ সিনেটের পররাষ্ট্র সম্পর্ক বিষয়ক কমিটির প্রধান বব কর্কার (রিপাবলিকান) বলেন, এই খবর সত্য হলে, এটি ‘খুব, খুবই যন্ত্রণাপ্রদ।’ তিনি আরো বলেন, ‘শৃঙ্খলার অভাব থেকে যে চরম বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হচ্ছে তা বেশ উদ্বেগজনক পরিস্থিতি তৈরি করছে।’ সিনেট ইন্টিলিজেন্স কমিটির শীর্ষ ডেমোক্রেট দলীয় নেতা মার্ক আর. ওয়ার্নার বলেন, ‘এটি গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর গালে চড় দেয়ার মতো। সোর্স ও কর্মপ্রক্রিয়া বিপন্ন করাটা অমার্জনীয় কাজ, বিশেষ করে যখন তা করা হয় রাশিয়ানদের সঙ্গে।’
সিনেটের ডেমোক্রেট দলীয় নেতা চাক শুমার বলেন, ‘এই খবর সত্য হলে, এটি খুবই উদ্বেগজনক। গোপনীয় তথ্য এই লেভেলে প্রকাশ করা খুবই বিপজ্জনক। এর ফলে আমেরিকান ও যারা আমেরিকার জন্য গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ করেন তাদের জীবন ঝুঁকিতে পড়ে যায়।’
উল্লেখ্য, ট্রাম্পের প্রচার শিবিরের সঙ্গে মস্কোর যোগাযোগ থাকার বিষয়টি কিছুতেই তার পিছু হটছে না। বর্তমানে একাধিক তদন্ত চলছে বিষয়টি নিয়ে, যদিও প্রেসিডেন্ট এসব অভিযোগকে ‘ফেক নিউজ’ হিসেবে উড়িয়ে দিয়েছেন। এমন সময় এই নতুন অভিযোগ এলো তার বিরুদ্ধে।মানবজমিন


Leave a Comment