USA

নিউইয়র্কে সন্ত্রাসী হামলার শিকার বাংলাদেশী ইমাম কামাল উদ্দিন মুন্সী, দু’হামলাকারী গ্রেফতার


ইউএসএনিউজঅনলাইন.কম : নিউইয়র্কের বাংলাদেশী অধ্যুষিত ব্রঙ্কসে চার যুবকের অতর্কিত হামলার শিকার হলেন বাংলাদেশী ইমাম কামাল উদ্দিন মুন্সী। দাঁড়ি-টুপি-পায়জামা-পাঞ্জাবি পরিহিত কামাল উদ্দিন মুন্সীকে ওই সন্ত্রাসী যুবকরা এলোপাতারি কিল ঘুষি মেরে মারাত্মক জখম করে। স্টারলিং-বাংলাবাজারের কর্নার ঘেঁষে ইউনিয়ন পোর্ট রোড এলাকায় ঘটনাটি ঘটে স্থানীয় সময় গত ১৫ জুন বৃহস্পতিবার ইফতার পরবর্তী সময়ে। খবর পেয়ে পুলিশ গুরুতর আহত কামাল উদ্দিন মুন্সীকে হাসপাতালে এবং ঘটনাস্থল থেকে জড়িত দু’জনকে আটক করে নিয়ে যায়। ৩৯ বছর বয়সী কামাল উদ্দিন মুন্সী পার্কচেস্টারের ৫০২১ ইউনিয়ন পোর্ট রোডে স্ত্রী, ১ ছেলে ১ মেয়েসহ পরিবার নিয়ে বসবাস করেন। তার দেশের বাড়ি ঝালকাঠি জেলার নলচিঠির নাচনমহল গ্রামে। ঘটনাটিকে কমিউনিটি নেতৃবৃন্দ হেইট ক্রাইম বলে মন্তব্য করেন। এ ঘটনায় ব্রঙ্কসে বাংলাদেশী কমিউনিটিতে আতঙ্ক বিরাজ করছে।ভিকটিম কামাল উদ্দিন মুন্সী ইউএসএনিউজঅনলাইন.কমকে জানান, বৃহস্পতিবার ইফতার শেষে বাংলাবাজার জামে মসজিদে মাগরিবের নামাজ পড়ে ওই মসজিদের খতীব মাওলানা আবুল কাশেম এয়াহইয়াকে সঙ্গে নিয়ে স্টারলিং-বাংলাবাজারের প্রিমিয়াম সুইটস অ্যান্ড রেষ্টরেন্টে চা খেতে যান। সেখান থেকে একাকী বাসায় যাওয়ার পথেই কামাল উদ্দিন মুন্সী সন্ত্রাসী হামলার শিকার হন। স্টারলিং-বাংলাবাজারের কর্নার ঘেঁষে ইউনিয়ন পোর্ট রোডের ওপরে একটি সাদা প্রাইভেট কার থেকে আকস্মিকভাবে দু’যুবক তার ওপর হামলে পড়ে। কিছু বুঝে ওঠার আগেই আরো দু’যুবক তাদের সাথে যোগ দিয়ে হামলার উৎসবে মেতে ওঠেন। তাদের উপর্যপূরি আঘাতে গুরুতর আহত হন তিনি। এসময় তার আর্তচিৎকারে লোকজন এগিয়ে আসলে দু’যুবক প্রাইভেট কার নিয়ে পালিয়ে যায়। অন্য দু’যুবক ইউনিয়ন পোর্ট রোডের বাংলাদেশীয় মালিকানার ‘ফোন্স ক্ল্যাব’ নামের একটি মোবাইল ফোন দোকানে ঢুকে পড়েন। আহত কামাল উদ্দিন মুন্সী লোকজন নিয়ে হামলাকারীদের শনাক্ত করার জন্য ‘ফোন্স ক্ল্যাব’ দোকানে গেলে ওই দু’যুবক আবারও সবার সামনে তার ওপর হামলা চালায়। এসময় পুলিশে কল করা হলে তাৎক্ষণিক পুলিশ এসে ওই দু’যুবককে আটক করে নিয়ে যায়। আহত কামাল উদ্দিন মুন্সীকে ভর্তি করা হয় ব্রঙ্কসের জ্যাকবি হাসপাতালে।
হামলার ঘটনা সম্পর্কে ইউনিয়ন পোর্ট রোডের ‘ফোন্স ক্ল্যাব’র অন্যতম কর্ণধার সাফাত ইউএসএনিউজঅনলাইন.কমকে জানান, তিনি এসময় বাইরে ছিলেন। তার দোকানের ভেতর হামলার খবর শুনার পরপরই তিনি দোকানে এসে বাংলাদেশী ইমাম কামাল উদ্দিন মুন্সীর ওপর সন্ত্রাসীদের তান্ডব দেখতে পান। তাকে টেনে হিঁচড়ে বেধড়ক মারধোর করা হয়। ফোন্স ক্লাবের সিসিটিভিতে ধারণকৃত ফুটেজে দেখা যায় সাদা টি শার্ট পরিহিত দু’জন যুবক কামাল উদ্দিনকে জোরপূর্বক দোকানের বাইরে নিয়ে যাওয়ার দৃশ্য।
এদিকে, এ দূর্ঘটনার সংবাদ পেয়ে বাংলাদেশী কমিউনিটির অনেকেই ঘটনাস্থলে ছুটে আসেন। তারা গত বছরের ১৬ জুন রমজানে ব্রঙ্কসের পার্কচেস্টার ম্যাগ্রো এভিনিউর মসজিদে তারাবীর নামাজে যাওয়ার সময় বাংলাদেশি আতিক আশরাফের মারাত্মক জখমের ঘটনাসহ আরো বেশ ক’টি ঘটনার বিবরন তুলে ধরে তাদের আতঙ্ক ও ক্ষোভের কথা জানান। কয়েকজন মুসল্লী জানান, তাদের এখন পায়জামা-পাঞ্জাবী-টুপি পরতে রীতিমত ভয় হচ্ছে।
কামাল উদ্দিন মুন্সী ইউএসএনিউজঅনলাইন.কমকে জানান, হামলাকারী ওই চার যুবকের পরনে ছিল টিশার্ট ও শর্ট প্যান্ট। হামলাকারীদের আগে কখনো তিনি দেখেননি। তিনি জানান, রাতভর হাসপাতালে চিকিৎসা শেষে পরদিন শুক্রবার সকাল ১০ টায় তাকে এম্বুলেন্সে করে তার বাসায় পৌঁছে দেয়া হয়। তিনি হাসপাতালের চিকিৎসকদের উদ্ধিৃতি দিয়ে ইউএসএনিউজঅনলাইন.কমকে জানিয়েছেন তার নাকের হাড় ভেঙ্গে গেছে এবং মাথার আঘাত সম্পর্কে প্রাইমারী কেয়ার ডাক্তারের পরামর্শ নিয়ে আরো উচ্চতর পরীক্ষা-নিরীক্ষার করানোর জন্য জন্য বলেছে। কেন তার ওপর এ হামলা হয়েছে ইউএসএনিউজঅনলাইন.কম’র এমন প্রশ্নের জবাবে হামলার কারণ সম্পর্কে কিছুই জানাতে পারেননি কামাল উদ্দিন মুন্সী। তবে তিনি বলেন, যেহেতু হামলাকারীরা তার পকেট থেকে কিছুই নেয়নি এতে তার ধারণা দাঁড়ি-টুপি-পায়জামা-পাঞ্জাবি পরিহিত থাকার কারণে হামলাকারীদের টার্গেটে পরিণত হয়ে থাকতে পারেন তিনি। নিরাপরাধ ভিকটিম কামাল উদ্দিন মুন্সী ইউএসএনিউজঅনলাইন.কম’র মাধ্যমে তার ওপর এ সন্ত্রাসী হামলার সুবিচার চান। তিনি শুক্রবার বাংলাবাজার জামে মসজিদে জুমার নামাজ আদায় শেষে অতর্কিত হমলার বিবরণ তুলে ধরেন। কামাল উদ্দিন মুন্সী তার স্ত্রীর উদ্ধৃতি দিয়ে ইউএসএনিউজঅনলাইন.কমকে আরো জানান, শুক্রবার গভীর রাতে ঘুমের ঘোরে আবল-তাবল বলেছেন। ঘুমের মধ্যে তিনি (কামাল উদ্দিন মুন্সী) নাকি বলেছেন জামা-কাপড় দাও বাইওে চলে যাব.. ইত্যাদি। কামাল উদ্দিন মুন্সী আরো জানান, তার মাথায় ঝিম ঝিম করছে। নাকে ব্যথা হচ্ছে।এদিকে, বর্ণবৈষম্য হামলাসহ সকল সন্ত্রাসী কার্যকলাপ বন্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহনের জন্য প্রশাসনের প্রতি জোর দাবি জানিয়েছেন বাংলাবাজার জামে মসজিদের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি বিশিষ্ট ব্যবসায়ী আলহাজ্ব গিয়াস উদ্দিনসহ কমিউনিটি নের্তৃবৃন্দ। আলহাজ্ব গিয়াস উদ্দিন ইউএসএনিউজঅনলাইন.কমকে জানান, নিউইয়র্ক সিটি পুলিশ ডিপার্টমেন্টের ৪৩ পুলিশ প্রিসেনক্টের কমান্ডিং অফিসার ইন্সপেক্টর ফাস্টো বি পিসারডো ও এসেম্বলীম্যান লুইস সেপুলভেদা গত শুক্রবার বাংলাবাজার জামে মসজিদে এসে এঘটনার জন্য দু:খ প্রকাশ করে সুষ্ঠু বিচারের আশ্বাস প্রদান করেন। এ সময় ৪৩ পুলিশ প্রিসেনক্টের কমান্ডিং অফিসার ইন্সপেক্টর ফাস্টো বি পিসারডো তাৎক্ষণিক দু’হামলাকারীর গ্রেফতারের বিষয়টি জানিয়ে বলেন, এঘটনার সাথে জড়িতরা কেউই রেহাই পাবে না। অন্য দু’হামলাকারীকেও গ্রেফতারে পুলিশ জোর প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। তিনি জানান, নিউইয়র্ক পুলিশ ডিপার্টমেন্ট ব্রঙ্কসে বাংলাদেশী অধ্যুষিত বিভিন্ন এলাকায় নিরাপত্তাবিধানে বিশেষ ততপর রয়েছে। পুলিশ ডিপার্টমেন্ট রমজান উপলক্ষে বিশেষ টহল বাড়িয়েছে মসজিদ সংলগ্ন এলাকায়। যে কোন ক্রাইম ঘটার সঙ্গে সঙ্গে ৯১১ কল করে পুলিশকে সুনির্দিষ্ট ঠিকানাসহ প্রকৃত ঘটনা জানানোর পরামর্শ দেন তিনি। তাহলেই পুলিশ তাৎক্ষণিক কার্যকর ব্যবস্থা নিতে সক্ষম হবে। তিনি জনসাধারণের নিরাপত্তার বিষয়কে গুরুত্ব দিয়ে নির্ভয়ে পুলিশের সাথে একযোগে কাজ করার জন্য কমিউনিটি নের্তৃবৃন্দসহ সকলের সহযোগিতা কামনা করেন। কমিউনিটির নিরাপত্তা, মানবাধিকার সুরক্ষা ও হেইট ক্রাইম রোধকল্পে পুলিশের পক্ষ থেকে সম্ভাব্য সকল সহযোগিতার আশ্বাস প্রদান করেন তিনি।
এদিকে, গ্রেফতারকৃতরা পুলিশকে জানিয়েছে, কামাল উদ্দিন মুন্সী নাকি ‘ফোন্স ক্ল্যাব’র কর্মচারী। ‘ফোন্স ক্ল্যাব’ এ তার (কামাল উদ্দিন মুন্সী) সাথে মোবাইল ফোন সংক্রান্ত বাকবিতন্ডার জের ধরেই তারা এ ঘটনা ঘটিয়েছে। কামাল উদ্দিন মুন্সী জানান, তিনি এ দোকানের কেউ নন। তাদের (হামলাকারীদের) সাথে মোবাইল ফোন সংক্রান্ত বাকবিতন্ডার কোন প্রশ্নই ওঠেনা। রাস্তায় হামলার শিকারের পর লোকজন নিয়ে হামলাকারীদের শনাক্ত করার জন্য কেবল ওই ফোন দোকানে যান তিনি। ‘ফোন্স ক্ল্যাব’র অন্যতম কর্ণধার সাফাতও জানান, কামাল উদ্দিন মুন্সী তাদের কোন কর্মচারী নন।
এদিকে, এ ঘটনার পর তারাবি নামাজের জন্যে মসজিদে যাতায়াতে বিশেষ সতর্কতা অবলম্বনের পরামর্শ দিয়েছেন কেউ কেউ। কয়েকজন একসাথে মসজিদে যাওয়া এবং পায়জামা-পাঞ্জাবি-টুপিসহ ধর্মীয় পোশাক পরে নির্জন স্থানে একাকি চলাফেরায়ও যথাসম্ভব সতর্ক থাকার পরামর্শ তাদের।
ব্রঙ্কসের বাংলাদেশী অধ্যুষিত পার্কচেস্টার-স্টারলিং-বাংলাবাজার এভিনিউ এলাকায় বাংলাদেশীদের শক্ত অবস্থান থাকা সত্ত্বেও একের পর এক হামলার ঘটনা ভাবিয়ে তুলেছে পুরো কমিউনিটিকে। এ সন্ত্রাসী হামলার প্রতিবাদে প্রবাসী বাংলাদেশীরা বিক্ষোভ সমাবেশ আয়োজনের প্রস্তুতি নিচ্ছেন বলে জানা গেছে।