USA

নিউইয়র্কে গাঙচিল এর ৭৭ তম আসরে ইবাইস বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য্য


ইউএসএনিউজঅনলাইন.কম ডেস্ক, নিউইয়র্ক : প্রবাসের সাহিত্য,সঙ্গীত, আবৃত্তি ও অভিনয় চর্চা বিষয়ক সংগঠন গাঙচিল সাহিত্য-সংস্কৃতি পরিষদের আয়োজনে ৭৭ তম আসর অনুষ্ঠিত হয়েছে গত ২রা জুলাই রোববার। অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন ঢাকার উত্তরাস্থ ইবাইস বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠাতা এবং ভারপ্রাপ্ত উপাচার্য্য প্রফেসর ড: জাকারিয়া লিংকন। সভাপতিত্ব করেন গাঙচিল এর সভাপতি কবি নিখিল কুমার রায়। নিউইয়র্কের বাঙালী পাড়া বলে খ্যাত জ্যাকসন হাইটসের (৭১-২৪ রুজভেল্ট এভিন্যু) নিজস্ব মিলনায়তনে আয়োজিত হয় অনুষ্ঠানমালা। সহ সভাপতি চিত্রশিল্পী প্রবীর গুন এর উপস্থাপনায় আলোচনা, কবিতা ও গানে তুলে ধরা হয় একটি ব্যতিক্রমী আসর।প্রধান অতিথি ড: জাকারিয়া লিংকন ঘোষণা বলেন, নিউইয়র্কে এসেও গাঙচিল সদস্যদের আয়োজনে এত চমৎকার অনুষ্ঠান উপভোগ করতে পারবো ভাবিনি। বাংলা সাহিত্য-সংস্কৃতি বিকাশে গাঙচিল এর কর্মকান্ড স্মরণীয় হয়ে থাকবে। তিনি বলেন, জাতির জনকের বর্ণাঢ্য রাজনৈতিক জীবন এবং ৭১ উত্তর বাংলাদেশের পরিস্থিতি নিয়ে রচিত ঐতিহাসিক নাটক: বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব গ্রন্থখানা তাদের বিশ্ববিদ্যালয়ে ইংরেজী সাহিত্য বিভাগে পাঠ্যপুস্তক করা হচ্ছে। তিনি আরও বলেন, নবাব সিরাজউদ্দৌলা এবং বেঈমান মীর জাফরের ইতিহাস আমরা ভুলে যেতাম, যদি কিনা এবিষয়ে নাট্যগ্রন্থ রচিত না হতো। কোমলমতি শিক্ষার্থীদের হৃদয়ে গেঁথে দেবার জন্য বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে একটি নাট্যগ্রন্থ সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পাঠ্য-পুস্তক থাকা উচিত। যেমনটি আছে নীলদর্পন বা সিরাজউদ্দৌলা। দেশ স্বাধীনের পর ৪৭টা বছর পার হয়ে গেলো কিন্তু কোন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে এধরনের একটি গ্রন্থকে পাঠ্য-পুস্তক হিসেবে সিলেবাসে কেন যে আজও অন্তর্ভূক্ত করা হলোনা এটা আমার বোধগম্য নয়। খান শওকত দীর্ঘ প্রায় দুই যুগ গবেষণার পর এমন একটি চমৎকার গ্রন্থ বাঙ্গালী জাতিকে উপহার দিয়েছেন। গ্রন্থটির মুখবন্ধে: নাট্যব্যক্তিত্ব ও মাননীয় সংস্কৃতিক মন্ত্রী আসাদুজ্জামান নূর, বঙ্গবন্ধু গবেষক এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের চেয়ারম্যান ড: মুনতাসীর মামুন এবং ২১শে পদকপ্রাপ্ত নাট্য-ব্যক্তিত্ব জামালউদ্দীন হোসেন যেভাবে উচ্ছ্বসিত প্রশংসা করেছেন তা পড়ে আমি আকৃষ্ট হয়েছি। এমনকি নিউইয়র্কে এনাটকের ২টি প্রদর্শনীতে প্রধান অতিথী হিসেবে উপস্থিত হয়েছিলেন বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের দুজন কেন্দ্রীয় নেতা সাবেক আইনমন্ত্রী এ্যাডভোকেট আব্দুল মতিন খসরু এবং সাবেক পররাষ্ট্র মন্ত্রী ড: দীপু মনি। বাংলাদেশ থেকেই আমি অবগত হয়েছি: আসন্ন জাতীয় শোক দিবসের (১৫ই আগষ্ট) দিনে এ নাটকটি বাংলাদেশ বেতারের সব ক’টি কেন্দ্র থেকে একযোগে প্রচারিত হবে, এবং আগামী বছরে কলকাতায় অনুষ্ঠিতব্য নাট্য সম্মেলনে মানিক তলা দলছুট থিয়েটার-এর শ্রীমতি মিথু দে-র পরিচালনায় এনাটকের প্রদর্শনী হবে। তারা পশ্চিমবঙ্গ সরকারের সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের ছাড়পত্রও যোগাড় করেছে। বাংলাদেশে বিভিন্ন নাট্যগোষ্ঠি ইতিমধ্যেই এ নাটকটি নিয়ে কাজ শুরু করে দিয়েছে।প্রধান অতিথি ড: জাকারিয়া লিংকন আরও বলেন, এনাটকের সার সংক্ষেপ হচ্ছে ঃ মূল ঘটনা পাকিস্তানের সাথে আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধ এবং বাংলাদেশের জাতির জনক বঙ্গবন্ধুর অবদান ও জীবনী নিয়ে রচিত এ নাটক। দেশের মানুষ বঙ্গবন্ধুর নির্দেশে যুদ্ধ করে দেশ স্বাধীন করলো, এরপর কিছু স্বার্থপর বেঈমান পাকিস্তানিদের সাথে হাত মিলিয়ে আমাদের প্রাণপ্রিয় নেতাকে হত্যার ষড়যন্ত্র করতে থাকে। এই কথা নেতার কাছে পৌঁছে দিলে তিনি হেঁসে উড়িয়ে দিয়ে বলেন: বাংলার মানুষের হাতে আমার মৃত্যুর কোন ভয় নাই। কিন্তু তার ধারণা ভুল। তার ধারণা পাল্টে দিয়ে শুধু তাকে নয়, তার গোটা পরিবারকে এদেশের জন্য জীবন দিতে হলো। তার দুই কন্যা বিদেশে ছিলেন বলে প্রাণে বেঁচে যান। এভাবেই এক পর্যায়ে নাটকটির সমাপ্তি ঘটে। এনাটকে অনেক ঐতিহাসিক তথ্য বিভিন্ন চরিত্রের মাধ্যমে চমৎকারভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে। বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পর দীর্ঘ ২১ বছর যাবৎ যারা এদেশের ইতিহাসকে ভিন্নখাতে প্রবাহের চেষ্টা করেছে, তাদের অপচেষ্টা আজও অব্যাহত রয়েছে। নতুন প্রজন্মের কাছে মহান মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস, স্বাধীনতার ঘোষণা এবং বঙ্গবন্ধুকে হত্যার বিষয়ের অজানা তথ্যাদি তুলে ধরা দরকার। তাই ঐতিহাসিক নাটক: বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব গ্রন্থখানা ইবাইস বিশ্ববিদ্যালয়ে ইংরেজী সাহিত্য বিভাগে পাঠ্য-পুস্তক করা হচ্ছে।

গাঙচিল এর সহ সভাপতি চিত্রশিল্পী প্রবীর গুন বলেন, জনশ্রুতি আছে জিয়াকে ডিঙ্গীয়ে শফিউল্লাহকে সেনাপ্রধান করায় বঙ্গবন্ধু হত্যায় জড়িত হন মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমান। বঙ্গবন্ধুকে হত্যার ৯ দিন পর ১৯৭৫ এর ২৪ আগষ্ট তারিখে জিয়াকে সেনা প্রধান করেন খন্দকার মোশতাক আহমেদ। ১৯৭৪ সালে কুমিল¬া সেনা-নিবাসে শৃঙ্খলা ভঙ্গের ঘটনায় ২২ জন সেনা-সদস্যকে চাকরী থেকে বাধ্যতামূলক অবসর দেন বঙ্গবন্ধু। ১৯৭৫ এর ১৫ই আগষ্টে তারাই ঘটিয়েছিলো নারকীয় হত্যাকান্ড। বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পর হত্যাকারী ১৭জন সেনা কর্মকর্তাকে ১৯৭৫ এর ৩রা নভেম্বরে বিভিন্ন দূতাবাসে নিয়োগ দেয়া হয় মোশতাক আমলে। ১৯৭৭ এর মে মাসে মেজর নূর চৌধূরী, মেজর ডালিম, মেজর শাহরিয়ার, মেজর রাশেদ চৌধূরী সহ বঙ্গবন্ধুর হত্যাকারীদেরকে সেনা-বাহিনীর চাকুরীতে ফিরিয়ে আনা হয় জিয়া আমলে। বঙ্গবন্ধু এবং তার পরিবারের সদস্যদের হত্যাকান্ডের বিচার বন্ধের জন্য ১৯৭৯ সালের ৯ই জুলাই তারিখে ইনডেমনিটি বিলটি সংবিধানে সংযুক্ত করা হয় জিয়া আমলে। অশান্ত সময়ের সেনা রাজনীতির এমন অনেক অজানা প্রসঙ্গ উঠে এসেছে ‘বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব’ নাটকে।

খান শওকত বলেন,  ১৯৮৫ থেকে ২০১৬, দীর্ঘ ২১ বছরের ধারাবাহিক কষ্টের ফসল আমার এ নাট্যগ্রন্থ ‘বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব’। এটি ইতিহাস আশ্রিত নাটক। নাটকে বিশুদ্ধ ইতিহাস তুলে ধরা যায় না। এতে কল্পনা, আবেগ, কাব্য, সাহিত্য ও অভিনয় তুলে ধরতে হয়। রবীন্দ্রনাথ বলেছেন-“কাব্য হিসাবে সর্বাঙ্গ সুন্দর করিতে হইলে সমগ্র ইতিহাসকে অবিকৃতভাবে গ্রহণ করা যায় না। নাটক ইতিহাস নয়। নাটক সাহিত্য। সাহিত্যের সত্য আর ইতিহাসের সত্য এক নয়”। আমার নাটকটিও সেই একই নিয়মে রচিত হয়েছে। ঐতিহাসিক ঘটনার সাথে কল্পনা মিলিয়ে কিছু সত্য চরিত্র ও কিছু কাল্পনিক চরিত্র এনে এটা রচিত হয়েছে। ১৯৭৫ এর পর দীর্ঘ ২১ বছর এদেশে বঙ্গবন্ধুর পক্ষে কথা বলার সুযোগ ছিলোনা। ১৯৯৬ সালে যাদের বয়স ৩০ এর নীচে ছিলো, তারা ইতিহাসের অনেক সত্য বিষয় জানবার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হয়েছেন। এজন্য নতুন প্রজন্মের সামনে এ নাটকটি তুলে ধরা দরকার।

ঐতিহাসিক নাটক: বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব গ্রন্থখানা ইবাইস বিশ্ববিদ্যালয়ে ইংরেজী সাহিত্য বিভাগে পাঠ্য-পুস্তক করার জন্য: গাঙচিল এর পক্ষ থেকে ড: জাকারিয়া লিংকন-কে ধন্যবাদ জানান সভাপতি কবি নীখিল কুমার রায়, সহ সভাপতি চিত্রশিল্পী প্রবীর গুন এবং খান শওকত। দর্শকরা মুগ্ধ চিত্তে পিন-পতন নীরবতায় আলোচনা উপভোগ করেন এবং করতালি দিয়ে অভিনন্দিত করেন। সবশেষে কবি নিখিল কুমার রায় সকলকে ধন্যবাদ জানিয়ে অনুষ্ঠানের সমাপ্তি ঘোষনা করেন। বরাবরের মতো প্রতিমাসের ১ম রোববার হিসেবে আগামী ৬ই আগষ্ট তারিখে জ্যাকসন হাইটসে (৭১-২৪ রুজভেল্ট এভিন্যু, দোতলা) অনুষ্ঠিত হবে গাঙচিল এর ৭৮তম নিয়মিত আসর। অংশ গ্রহণে আগ্রহীদেরকে ৯১৭-৮৩৪-৮৫৬৬ এবং ৬৩১-২৯০-১০৪৫ নং এ যোগাযোগের আহ্বান জানানো হয়েছে।


Leave a Comment