USA

মুক্তিযোদ্ধা ম. আ. মোক্তাদির এবং আদর্শবোধ জাগ্রত রেখে টিকে থাকার শিক্ষা


শাহাব উদ্দিন : আমাদের যৌবনের নায়ক ছিলেন। সুরমা নদীর পার থেকে উঠে আসা এক বোহেমিয়ান বিপ্লবী আমাদের মনযোগ আকর্ষন করেছিলেন তাঁর অমিত তেজ উদ্দামতা দিয়ে। সদ্য স্বাধীন দেশে সমাজ পরিবর্তনের লড়াইকে বুকে ধারণ করে রাজপথে যিনি জীবনের রঙ খুঁজে পেয়েছিলেন, সেই ম আ মুক্তাদির আমাদের কাছে এক চেতনার নাম। বেদনার নিঃশ্বাসে উচ্চারিত এক নাম- আজীবন আপোষহীন সংগ্রামী, বীর মুক্তিযোদ্ধা ম আ মোক্তাদির।১৯৯৭ সালের ১৪ সেপ্টেম্বর লন্ডনে তাঁর অকাল মৃত্যু ঘটে। ২০তম মৃত্যুবার্ষিকীতে অগ্রজ লোকমান আহমেদের নির্দেশে নিজেই লিখবো ভাবছিলাম। ম আ মুকতাদিরের আরেক সতীর্থ বন্ধু ইব্রাহীম চৌধুরী খোকনের পরামর্শে লিখার ভাবনাটি বদলে যায়। আমাদের জানা তথ্যমতে সুরমা পারের ম আ মুক্তাদির তাঁর কৈশোরে ঘর থেকে বেরিয়েছিলেন অগ্রজ মুক্তিযোদ্ধা রফিকুল হকের হাত ধরে। এক সময়ের তুখুড় রাজনীতিবিদ রফিকুল হকও আজ জীবনের বেলাভুমিতে। সিদ্ধান্ত হলো, রফিকুল হকের সাথে আলোচনা করেই লিখাটি সাজাবো।

রফিকুল হক ম আ মুক্তাদিরের প্রতিবেশী এবং অগ্রজ হওয়ার কারণে ছোট বেলা থেকেই তিনি মোক্তাদির ভাইকে সাথে সাথে রাখতেন। রফিকুল হক জানান, ম আ মোক্তাদির কৈশোরেই চঞ্চল ছিলেন। ফুটবল খেলায় পারদর্শিতা ছিল। তিনি যখন ষষ্ঠ শ্রেণীর ছাত্র রফিক ভাই একজোড়া বুট কিনে দিয়েছিলেন। রফিকুল হক নিজেও ফুটবল খেলতেন। ম আ মোক্তাদির ফরোয়ার্ডে খুব ভালো খেলতেন। একসাথে বহু টিমে খেলে সুনাম অর্জন করেন।রাজা জি. সি হাইস্কুলের ক্যাপ্টেন হিসেবে রফিক ভাই তখন নেতৃত্ব দিচ্ছিলেন ফুটবল দলের। ৩/৪ বছর জুনিয়র হিসেবে মোক্তাদির ভাইও তার সাথে সাথে ছিলেন। মোক্তাদির ভাই রাজাস্কুলে দাপটের সাথে খেলাধুলা ও লেখাপড়া চালিয়ে যান। ১৯৬৭-৬৮ সালে ‘দেশ ও কৃষ্টি’র আন্দোলনে মোক্তাদির ভাইয়ের  সংগ্যামী জীবন শুরু হয়।  ১৯৬৮ সালে তিনি এস. এস. সি. পাশ করলে রফিক ভাই তাকে মদন মোহন কলেজে ভর্তি করান। ম আ মুক্তাদির মদন মোহন কলেজে প্রথম চালু হওয়া বিজ্ঞান শাখায় প্রথম ছাত্র ছিলেন। এ সময়ে তিনি ছাত্র ইউনিয়নের রাজনীতির সাথে যুক্ত ছিলেন কিছুদিন।

রফিক ভাইয়ের সাথে তার উঠাবসা ছিল সব সময়। ১৯৭০ সালে  এইচ. এস. সি. পাশ করে এম. সি. কলেজে ভর্তি হন ম আ মুক্তাদির। ইতিমধ্যে তাঁর রাজনৈতিক দূরদর্শিতা, সংগ্রামী চেতনার কাজকর্ম, পোস্টার ও দেয়ালে লিখন দিয়ে ম আ মুক্তাদির সকলের মনযোগ আকর্ষণ করতে সক্ষম হন। ৬৯’এর গণ উভু্যৃত্থান, ’৭০ সালের নির্বাচনের সময়েও বিভিন্ন মিছিলে সক্রিয় অংশ গ্রহণ থাকত ম আ মুক্তাদিরের।

রফিকুল হক জানান, ’৭১ সালের উত্তাল দিনগুলোতে মোক্তাদির আমার নিত্যসঙ্গী। ’৬৯-৭০ সালে ছাত্রসংসদের সাধারণ সম্পাদক হিসেবে নেতাদের সাথে সিলেটের বিভিন্ন জায়াগায় যাই। পথসভা সহ সব কর্মকান্ডে অংশ গ্রহণের সময় মোক্তাদির আমার নিত্য সঙ্গী।  ’৭১ সালের ২৬ মার্চ রেজিস্টারী মাঠ থেকে লাঠি মিছিল বের করার জেলার বিরাট কর্মসুচিকে সফল করার লক্ষ্যে আমি মোক্তাদিরকে সাথে  ঝাপিয়ে পড়ি। রফিকুল হক স্মরণ করেন, দক্ষিণ সুরমার নেতা হাজী রশিদ উল্লা, ইসমাইল মিয়া সহ আমরা দাউদপুর, হিলালপুর সহ দক্ষিণ সুরমা সংগঠিত করে রাত ২টায় আমার ঘরে শুয়ে পড়ি। কারণ সকাল ৬টায় উঠে আমাদের বেরিয়ে যেতে হবে। সেই সময় যোগাযোগের অভাবের কারণে শহরে কি হচ্ছে আমরা কিছুই জানতাম না। নেতাদের কথা মতো সকাল ৬টায় বের হয়ে লাঠি মিছিলের কাজে যাচ্ছি। তখন কদমতলী বাসস্ট্যান্ডের এদিকে থেকে বারী মিয়া দৌড়ে এসে বলেন, এই তোমরা কই যাও। জান না, কারফিউ হয়েছে। মিলিটারী সমস্ত শহর দখল করে আছে। তখন আমি ও মোক্তাদির নেতাদের খোঁজে বের হই।মানুষ ফজরের নামাজে যাচ্ছেন। ঝালপড়ার সামনে কিছু চামড়া ব্যবসায়ী এবং শ্রমিক নিয়ে রাস্তায় ব্যারিকেড সৃষ্টি করি। দেখতে পাই সার্কিট হাউজ থেকে একটি আর্মির জীপ কিন্ ব্রিজে উঠছে। তখন আমরা প্রাণ ভয়ে দৌড়ে এসে তাহির বক্সের বাড়িতে আশ্রয় নেই। যখন আমরা দেখি আর্মি আমাদেরকে খুঁজতেছে, তখন আমরা চৌকির নিচে আশ্রয় নেই। আমাদের অনেক খুঁজে না পেয়ে লোকদের চড়্-থাপ্পড় মেরে চলে গেলে আমরা কাপড় বদলিয়ে গ্রামের দিকে হেঁটে বের হই। খোজার খলার তরী ভাইর বাড়িতে এসে নেতাদের খুঁজি। তারপর চান্দাই আনা মিয়ার বাড়িতে এসে দেওয়ান ফরিদ গাজি, ইসমত চৌধুরী, এবং আং মুনিম (আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক)’কে পাই। সেখানে গাজী সাহেব নির্দেশ দিলেন মুনিম ভাই, আমি, মোক্তাদির, তিনজন লাতু বর্ডারের আনছার কমান্ডার মছব্বির মিয়াকে নিয়ে বিএসএফ’র সাথে আলাপ করি। অনুরোধ করি, বর্ডার খুলে দেয়ার ব্যবস্থা করার  জন্য। পাক সেনারা তখন হত্যাযজ্ঞ শুরু করেছে, সমস্ত মানুষ মেরে ফেলছে, নেতার নির্দেশানুযায়ী মুনিম ভাইকে নিয়ে যাই। বিএসএফ’এর সাথে আলাপ করে কোন ভাবেই বুঝাতে পারলাম না। তারা বললো, এম. এন. এ.’কে নিয়ে আসার জন্য। পরে আমরা আবার সিলেটে এসে গাজী সাহেব এবং ইসমত ভাইকে নিয়ে ২৮ মার্চ বর্ডারে গিয়ে তাদের পরিচয় (এম. এন. এ.) পরিচয় করিয়ে দেই। সে সময় ম আ মুক্তাদির আমার সার্বক্ষনিক সঙ্গী। বি. এস. এফ, অফিসারসহ উনারা করিম গঞ্জে হাই অফিসিয়ালদের সাথে মিটিং করার পর সব বর্ডার খুলে দেয়া হয়। এরপর আমি মোক্তাদিরকে নিয়ে আবার কদমতলিতে ফিরে আসি। মানুষকে সহযোগিতা দিয়ে ভারতে নিয়ে যাওয়া এবং মুক্তিযুদ্ধে অংশ গ্রহণ করা ছিল আমাদের লক্ষ্য। একাত্তরের যোদ্ধা ম আ মুক্তাদিরের স্মৃতি স্মরণ করে বলেন,  আমরা যখন জহির বক্স বাড়িতে থেকে প্রতিরোধের কাজ করছিলাম, তখন পাঞ্জাবীরা আমাদের উপস্থিতি জেনে জহির বক্সের বাড়ি পুড়িয়ে দেয়। আমরা প্রাণভয়ে দৌড়ে পালাই। এদিন থেকে মোক্তাদির ও আমি বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ি। তারপর আমি ভারতে গিয়ে নেতাদের সাথে দেখা করে দেরাদুনে বিএলএফ ট্রেনিং নেই। সেখানে মূলত ছাত্রলীগের সিনিয়র নেতাকর্মীদের নিয়ে যাওয়া হতো। এবং অস্ত্র ট্রেনিং ছাড়াও রাজনীতির ট্রেনিং হতো যেখানে ক্লাশ নিতেন হাসানুল হক ইনু, শরীফ নুরুল আম্বিয়া, আ.ফ.ম. মাহাবুবুল হকসহ ছাত্রলীগের মধ্যে বিল্পবী ধারার নেতৃবৃন্দ। আমরা ট্রেনিং শেষে যুদ্ধে ঝাপিয়ে পড়ি।

খবর পাই মোক্তাদির হাফলং’এ ট্রনিং নিয়ে ৪ নং সেক্টরের সাব সেক্টর কমান্ডার মাহবুবুর রব সাদীর নেতৃত্বে আটগ্রাম ব্রিজ, শেওয়া, জামালপুর, মোগলাবাজারসহ বিভিন্ন জায়াগায় দুর্দান্ত সাহসিকতার সাথে যুদ্ধ করছে। দীর্ঘ নয় মাস জীবন বাজি রাখা যুদ্ধ স্বাধীনতার সূর্য উদয়ের পূর্ব মুহুর্তে ১১ ডিসেম্বর  ফেঞ্চুগঞ্জের দিক থেকে ম আ মুক্তাদির ১০/১৫ জনের দল নিয়ে শহর অভিমূখে আসতে দেখি। দীর্ঘ নয়মাস পর, ম আ মুক্তাদিরকে দেখে তখন চেনা দায়। মুখ ভর্তি দাড়ি, লম্বা চুল। আমরা আবার একসাথে হয়ে সিলেট শহর এবং এ অঞ্চলে পাক হানাদার এবং তাদের দুসরদের নিশ্চিহ্ন করার প্রয়াস নেই। ১৬ ডিসেম্বর আমরা বিজয়ের পতাকা উড়াই। এ ছিল অবিস্মরণীয় দিন।

এ পর্যন্ত স্মরণ করে রফিকুল হক থামেন। বলেন, ম আ মুক্তাদির সহ আমরা জানতাম পতাকা  উঠালেই দেশ স্বাধীন হয়না। ১৬ ডিসেম্বর পরবর্তি অপারেশন ছিল ঘাতকদের নির্মূল করার। ম আ মুক্তাদির সে সময় ঘাতক, শান্তিবাহিনী আর রাজাকারদের কাছে এক আতঙ্কের নাম। রফিকুল হক বলেন, ম আ মুক্তাদিরকে, এ কাজটি তখন করতে দেয়া হয়নি। কিছুদিন পরই টের পাওয়া গেলো ঘাতকদের নির্মূল না করার পরিনাম-। বলে আবার থামলেন রফিকুল হক।

পরের ইতিহাস ম আ মুক্তাদিরের ক্রমাগত লড়ে যাওয়ার ইতিহাস। প্রাক যৌবনে মুক্তিযুদ্ধে  অস্ত্র হাতে নেয়া মুক্তাদিরের তখন সমাজতান্ত্রিক লড়াইয়ে ঝাপিয়ে পড়েন। শোষনহীম সমাজ প্রতিষ্টার এ লড়াইয়ে তখনকার কুয়াশা ঢাকা রাজনৈতিক বাস্তবতায় স্বপ্ন বিলাসী ম আ মুক্তাদির জনতার মুক্তর লড়াইয়ে নিজেকে বিলিয়ে দেন।

তাঁর এ লড়াই আমৃত্যু থামেনি। জনতার সাথে থেকেই লন্ডনে তাঁর অকাল মৃত্যু ঘটে হার্ট এটাকে। তাঁর মৃত্যুর পর অনেক সতীর্থ, সহযোদ্ধাদের বিলাপ শুনা গিয়েছিল। দেশে বিদেশে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়া এসব সতীর্থ, সহযোদ্ধারা তাদের নিত্যদিনের লড়াইয়ের চেতনায় ম আ মুক্তাদিরকে লালন করলেও তাঁকে নিয়ে প্রকাশ্য কোন চর্চা ম্রিয়মান ছিল।

২০১৬ সালে দেশে গিয়ে অকালে হারিয়ে যাওয়া বিপ্লবী ম আ মুক্তাদিরের স্মৃতি রক্ষায় আমি ম আ মুক্তাদির ট্রাস্ট গঠন করি। সুরমা পারের শান্ত সবুজ মাঠে প্রায় হারিয়ে যাওয়া কবর চিহ্নিত করে তাতে ফলক লাগানো হয়েছে।স্মৃতি কল্যান ট্রাস্টের মাধ্যেম মহান বিপ্লবী ম আ মুক্তাদিরের স্মৃতিকে ধরে রাখার চেষ্টা। তাঁকে নিয়ে চর্চা করা, তাঁকে স্মরণ করা আমাদের স্বার্থেই প্রয়োজন বলে আমরা মনে করেছি। রাজনীতির আজকের ধ্বশে পরা বাস্তবতায় ম আ মুক্তাদির আমাদের কাজে দেদীপ্যমান হয়ে উঠেন।নীতি আর আদর্শের জন্য ব্যক্তিগত লোভ লালাসা ত্যাগ করে ন্যায় ভিত্তিক সমাজের জন্য, মানুষের অধিকার আদায়ের জন্য সর্বস্ব দেয়া বিপ্লবী ম আ মুক্তাদিরের এ স্মৃতি রক্ষায় এগিয়ে এসেছেন, সহযোগিতা করছেন তাঁর সতীর্থ, শুভানুধ্যায়ী, অনুরাগী,স্বজনরা। ট্রাস্টি গঠন করা হয়েছে। আহবায়ক  ডাঃ মইনুল ইসলাম ,সদস্যরা হচ্ছেন রফিকুল হক, লোকমান আহমেদ, এমাদুল্লা শহিদুল ইসলাম শাহীন, আব্দুল মান্নান,সাব্বির আহমেদ, নিজাম উদ্দিন এবং মশীন আলী চুন্নু। উদ্যোগে সমৃক্ত হয়েছেন দেশ বিদেশের অনেকেই।

যে স্বপ্নচারী মানুষটি নিজের জীবন দিয়ে গেছেন অকাতরে, তাঁর স্মৃতি রক্ষার্থেও এগিয়ে এসেছেন সমাজ নিয়ে ভাবিত অগ্রসর মানুষের এক ঝাক প্রতিনিধিরা। আমাদের যৌবনের স্বপ্নচারী ম আ মুক্তাদিরের স্মৃতি রক্ষার এ উদ্যোগের সাথে সমাজ সচেতন অগ্রসরজন এগিয়ে আসবেন, আরো সম্পৃক্ত হবেন, এ আমার বিনীত প্রত্যাশা।

১৪ সেপ্টেম্বর আসে, যায় বছরের পর বছর। ২০টি বছর চলে গেছে। ম আ মুক্তাদিরের নামে নিত্যদিন যে বেদনার হাহাকার উঠে, তা বয়ে বেড়চ্ছি। যে লড়াইয়ে তাঁর হাত ধরে নেমেছিলাম, লড়াইতো আজো থামেনি। ভিন্ন বাস্তবতায়, অসাম্যের বিরুদ্ধে, ন্যায় প্রতিষ্টার সংগ্রামতো চলমান। এ চলমান লড়াইয়ে আদর্শবোধ জাগ্রত রেখে টিকে থাকার শিক্ষা দিয়েছিলেন ম আ মুক্তাদির। তাঁর ২০তম মৃত্যু দিবসে স্মৃতির প্রতি রক্তিম অভিবাদন।

(শাহাব উদ্দিন, যুক্তরাষ্ট্র প্রবাসী সাবেক ছাত্রনেতা এবং ট্রাস্টি, ম আ মুক্তাদির স্মৃতি কল্যান ট্রাস্ট)