Wednesday, 28 October 2026 |
শিরোনাম
নিউইয়র্কে নৃত্যশিল্পী ও সাংস্কৃতিক সংগঠক তাহসিন ফেরদৌসের অকালমৃত্যু, বাংলাদেশি কমিউনিটিতে শোকের ছায়া নিউইয়র্কে আবেয়া’র দ্বিবার্ষিক সম্মেলন ও ফ্যামিলি নাইট: প্রযুক্তি সেমিনার, জব ফেয়ার, বিজ্ঞান মেলা ও সাংস্কৃতিক উৎসব Global Anticipation Builds as Dr. Mostofa Sarwar’s Sunflower Wounds Debuts with Successful Houston Open House and Worldwide Pre-Order Milestone যুক্তরাষ্ট্রে ৭৫ দেশের অভিবাসী ভিসায় অনিশ্চয়তা, আদালতের নির্দেশের পরও কাটেনি জট Human Rights Must Be at the Heart of Economic Governance and Policies: Ambassador Irene Khan বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার স্বদেশ প্রত্যাবর্তন বাস্তবায়ন উপলক্ষে নিউইয়র্কে সমাবেশ, আগামী ডিসেম্বরে শেখ হাসিনার সঙ্গে দেশে ফেরার প্রত্যয় আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের অর্থনৈতিক নীতিনির্ধারণের কেন্দ্রে মানবাধিকারকে রাখতে হবে: জাতিসংঘে বাংলাদেশের স্থায়ী প্রতিনিধি আইরিন খান নিউইয়র্কে হিউম্যান সাপোর্টের বিনামূল্যে ফ্লু টিকাদান কর্মসূচি New York Attorney General James Announces Election Protection Hotline Ahead of November General Election ASAAL’s 19th Annual Convention Draws Nearly 500, Calls for Stronger Civic Engagement and Workers’ Rights
সব ক্যাটাগরি

ইন্টারনেটে দ্রুত বদলাচ্ছে বাংলা ভাষা!

অনলাইন ডেস্ক পঠিত: 53 বার

প্রকাশিত: March 26, 2014 | 12:10 PM

ফেসবুক, টুইটার, ইউটিউবসহ জনপ্রিয় সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যম সাইটগুলোর প্রতীক এখন শিশুদের কাছেও পরিচিত। ছবিটি প্রতীকী।পৃথিবীর সর্বত্রই প্রযুক্তির জয়গান। প্রযুক্তির অগ্রগতির সঙ্গে সঙ্গে দ্রুত বদলে যাচ্ছে মানুষের জীবন যাপনের ধরন। ভাষায়ও এর প্রভাব কম নয়। এমনিতেই ভাষা প্রবহমান নদীর মতো, যার হাজারো বাঁক। বাঁকে বাঁকে পরিবর্তনের ছোঁয়া। কিন্তু প্রযুক্তির প্রভাবে ভাষা যেন দিন দিন ভাঙা-গড়ার আরও খরস্রোতা নদী। কিন্তু এই নদী কোন পথে প্রবাহিত হবে, ভাঙবে কোন কূল আর গড়বেই বা কাকে?
প্রতিদিন সারা পৃথিবীতে অগণিত মানুষ ইন্টারনেট বা অন্তর্জালের সংস্পর্শে আসছেন। এই অন্তর্জালই অদ্ভুত মায়াজালে বেঁধে রেখেছে পৃথিবীর নানা প্রান্তের অসংখ্য মানুষকে। অদ্ভুত এ মায়াজালে আছে নানা বিষয়ের বিপুলসংখ্যক ওয়েবসাইট। আছে নানা সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যম— ফেসবুক, টুইটার, হাইফাইভ, ইউটিউব, ব্লগস্টার প্রভৃতি। এসব সামাজিক যোগাযোগ সাইটগুলো তৈরি করেছে এক ‘ভারচুয়াল’ সামাজিক বাস্তবতা, যার প্রভাবে মানবীয় সম্পর্কগুলোতেও আসছে নতুন মাত্রা। আর এই পরিবর্তনের অন্যতম বড় প্রভাবক হচ্ছে ভাষা।

ইন্টারনেটে ভাষার ব্যবহার এমনই বহুমাত্রিক যে পাশ্চাত্যে এ নিয়ে রীতিমতো গবেষণা শুরু হয়েছে। ইউরোপের  ভাষাবিজ্ঞানী ও গবেষক ডেভিড ক্রিস্টাল ‘ইন্টারনেট লিঙ্গুইস্টিক’ (আন্তর্জাতিক ভাষাবিজ্ঞান) নামে নতুন এক বিষয়ের অবতারণা করেছেন। তিনি মনে করেন, একাডেমিক শৃঙ্খলায় একটি নতুন বিষয়ের সংযোজন করা খুব সহজ নয়, কিন্তু  ইন্টারনেটের আবির্ভাব ভাষাকে এতটাই প্রভাবিত করেছে যে ইন্টারনেটের ভাষা নিয়ে গবেষণা একান্ত প্রয়োজন।

কিন্তু সদা পরিবর্তনশীল ইন্টারনেটের ভাষা নিয়ে গবেষণা কতটুকু কার্যকর হতে পারে। এ প্রসঙ্গে  ভাষাবিজ্ঞানী ও ইউনিভার্সিটি অব লিবারেল আর্টসের অধ্যাপক ইমেরিটাস ড. রফিকুল ইসলাম বলেন, ‘একুশ শতকে তথ্যপ্রযুক্তির যে বিপ্লব ঘটছে তার জন্য সব ভাষাতেই বড় ধরনের প্রভাব পড়ছে। একসময় টেলিগ্রামের ব্যাপক ব্যবহারের ফলে এক ধরনের ভাষা ডেভেলপ করেছিল। কিন্তু তা আর এখন টিকে নেই। ইন্টারনেট দ্রুত পরিবর্তনশীল। ইন্টারনেটের প্রভাবে নতুন নতুন শব্দ আসছে। যার কিছু টিকে থাকছে, কিছু থাকছে না। তাই ইন্টারনেট লিঙ্গুইস্টিক কতটুকু ফলপ্রসূ হবে, তা ভবিষ্যত্ই বলে দেবে।’

‘সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমে’ বাংলা ভাষা

‘একটা ফাটাফাটি মুভি দেখলাম। সেইরাম  ব্যাপুক feeling বিনুদুন।’ সামাজিক যোগাযোগের অন্যতম জনপ্রিয় মাধ্যম ফেসবুকে ঠিক এভাবেই স্ট্যাটাস দিয়েছে আবির ( ছদ্মনাম)।

‘কাইলকা পরীক্ষা, কিছুই পড়িনাইক্যা। হে আল্লাহ আমাকে তুইল্যা নাও, নয়তো উপ্রে থেইক্যা দড়ি ফেলাও আমি উইঠ্যা যাই।’ পরীক্ষার আগের রাতে এই ছিল রনির ( ছদ্মনাম) স্ট্যাটাস।

কয়েক বছর আগেও বাংলাদেশে লাইক, কমেন্ট, স্ট্যাটাস  শব্দগুলোর এত বিপুল ব্যবহার ছিল না। আর এখন এগুলো হরহামেশাই উচ্চারিত হচ্ছে। যেন নিজস্ব শব্দ, একেবারে বাংলা ভাষার মতোই ব্যবহার হচ্ছে। এ তো গেল ইংরেজি শব্দ। বাংলা শব্দেরও বিচিত্র ব্যবহার রয়েছে, যা রনি কিংবা আবিরের স্ট্যাটাসেও কিছু আছে। 

বাংলাদেশে ফেসবুক ও ব্লগ এখন ব্যাপক জনপ্রিয়। অনেকদিন ধরেই ব্যবহার বাড়ছে ইউটিউবের, ধীরে ধীরে জনপ্রিয় হচ্ছে টুইটারও। তবে এগুলোর কোনোটিই ফেসবুকের মতো জনপ্রিয় নয়। ফেসবুকে বাংলা লেখার ধরনও অদ্ভুত। আগে কেবল রোমান হরফে বাংলা লেখা হলেও বাংলা ইউনিকোডের কল্যাণে বাংলা বর্ণমালা ব্যবহার করে লেখার হার বাড়ছে ক্রমশ। পাশাপাশি রোমান হরফ তো আছেই। লেখার ধরন সম্পর্কে দুয়েকটা উদাহরণ দেওয়া যেতে পারে।

১. ইংরেজি বাক্য বা শব্দকে সংক্ষিপ্ত করে ব্যবহার যেমন- OMG (Oh My God),

HBD ( Happy Birth Day ), BTW ( By The Way), congratz, (congrats), r8 ( right) LOL (Laughing Out Loud বা Laugh Out Loud)  ইত্যাদি।

২. শব্দের বিকৃত বানান ও উচ্চারণ। যেমন- বেসম্ভব (অসম্ভব), নাইচ (নাইস), কিন্যা (কিনে), গেসে (গেছে) দ্যাশ (দেশ)। এ রকম অসংখ্য বিকৃত ব্যবহার চলছে সব সময়ই। 

৩. বাক্য বা শব্দগুচ্ছ একত্র ও সংক্ষিপ্ত করার প্রবণতা— ভাল্লাগসে (ভালো লেগেছে), মুঞ্চায় (মন চায়) মাইরালা (মেরে ফেলো) ইত্যাদি।

৪. বাংলা, হিন্দি, ইংরেজি মিলিয়ে বহুভাষিক পরিস্থিতি তৈরি করা— মাগার, টাস্কিভূত, ও I was feeling হতভম্ব, সম্ভাবিলিটি, বিন্দাস। প্রভৃতি ব্যাপকভাবে ব্যবহূত শব্দ।

ভাষারীতির নাটকীয় ও হুজুগে বদল

সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমগুলোতে চর্চিত এই বাংলা ভাষা এবং এই মিশ্র ভাষা পরিস্থিতিকে তুলনা করা যেতে পারে গত শতকের নব্বইয়ের দশকে মাঝামাঝি সময়ের সঙ্গে। যখন একের পর এক বেসরকারি টেলিভিশন এবং রেডিও অনুষ্ঠান সম্প্রচার শুরু করল এবং বাংলাদেশ টেলিভিশন ও বাংলাদেশ বেতারের একচেটিয়া ভাষারীতি আর থাকল না। ইতিবাচক বা নেতিবাচক যাই হোক না কেন বেসরকারি টেলিভিশন ও এফএম রেডিওতে মিশ্র ভাষারীতির ব্যবহার এবং বিকৃত উচ্চারণে অনুষ্ঠান প্রচারের হিড়িক ছিল চোখে পড়ার মতো। তখন থেকেই কথ্য বাংলার এমন ব্যবহার বহুল সমালোচিতও হয়েছে।

এরপর বাংলার লিখিত রূপের নাটকীয় বদলের বড় ঢেউটি আসে মূলত গত দশকের শেষভাগে। যখন থেকে বাংলা ভাষায় ব্লগ জনপ্রিয় হতে শুরু করে। এর আগে সাহিত্যচর্চায় ভাষা নিয়ে লেখকদের পরীক্ষা-নিরীক্ষা থাকলেও তা এত ব্যাপক আকারে কখনোই সাধারণ মানুষের এত বড় অংশের কাছে পৌঁছেনি। বিভিন্ন ব্লগে বিপুলসংখ্যক ব্লগার বলা চলে অনেকটা যার যার নিজস্ব রীতিতেই লিখে থাকেন। কিংবা অনেক ক্ষেত্রেই আসলে কোনো রীতিই মানেন না। একই রচনায়ও থাকে না কোনো রীতিরই সমন্বয়।

হালে ফেসবুকের মতো তুমুল জনপ্রিয় সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমে বাংলা ব্লগের এই ভাষাচর্চার প্রভাব এসে মিলেছে ফেসবুকে ভাষাচর্চার বৈশ্বিক নানান রীতি-নীতির সঙ্গে। এ দুয়ে মিলে তৈরি করেছে ভাষাচর্চার নাটকীয় ও হুজুগে বদলের এক মারাত্মক পরিস্থিতি। পাশাপাশি আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রভাবকের কাজ করেছে কম্পিউটার, মোবাইল ফোনসহ নানান যন্ত্র থেকে ইন্টারনেটে বাংলা লেখার নানান জটিলতা। 

মোটের ওপর এটা বলা চলে যে, ইন্টারনেট সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমগুলোতে চর্চা করা ভাষা প্রমিত বাংলা যেমন নয়, তেমনি আঞ্চলিক বাংলাও নয়। আবার এই মিশ্র ভাষারীতি কিন্তু কেবল সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমেই সীমাবদ্ধ নয়। ইন্টারনেটে ব্যবহূত শব্দগুচ্ছ বা ভাষা আমাদের বাস্তব জীবনের ভাষা ব্যবহারকে বদলে দিচ্ছে ধীরে ধীরে। হরহামেশাই আমরা নানা শব্দ প্রয়োগ করি কথা বলার ক্ষেত্রে, যা একান্তই ইন্টারনেটের ভাষা। সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমে ভাষার এই পরিবর্তনে বদলে যাচ্ছে বাংলা ভাষা। আবির্ভাব ঘটছে এক মিশ্র প্রকৃতির ভাষারীতি।

ভাষা ব্যবহারে সচেতনতা বাড়ুক সবার

ভাষায় নতুন শব্দ আসবে, ভাষার পরিবর্তন হবে এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু ভাষার জন্য যা ক্ষতিকর তা হলো, একই সঙ্গে দুটি বা তার চেয়ে বেশি ভাষার মিশ্রণে কথা বলা বা লেখা। ভাষাবিজ্ঞানী রফিকুল ইসলাম বলেন, ‘অন্তর্জালে বাংলা ভাষার যে মিশ্রণ তা ভয়াবহ। প্রমিত বাংলার সঙ্গে আঞ্চলিক, ইংরেজির সঙ্গে হিন্দি, বাংলালিপির সঙ্গে রোমানলিপি। এভাবে মিশ্রণের ফলে যে জগাখিচুড়ি ভাষা সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমগুলোতে ব্যবহার হচ্ছে—তা দুঃখজনক।’

একজন ফেসবুক ব্যবহারকারী জানিয়েছেন, ‘সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমগুলো হচ্ছে একটি বিনোদনের জায়গা, এখানে সবাই অবসর কাটায়। তাই ভাষা ব্যবহারেও এই মানসিকতার প্রভাব পড়ে। বাংলা ভাষাকে বিকৃতির উদ্দেশ্য এর পেছনে কাজ করে না। যে যার নিজের মতো করে ভাষা ব্যবহার করে এই যা।’

ইন্টারনেট এখন যোগাযোগের অত্যন্ত শক্তিশালী মাধ্যম। আর ইন্টারনেটের সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমগুলোর ব্যবহারও কেবল বিনোদনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক-সাংস্কৃতিক বিতর্ক, জনমত তৈরি, দাবি আদায়সহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে এখন ব্যাপকভাবে ভূমিকা রাখছে এটি। সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমের প্রভাবে পালটাতে শুরু করেছে আমাদের সামগ্রিক জীবনযাত্রা। ফেসবুক, ব্লগ প্রভৃতিতে চলছে বাংলা ভাষায় সাহিত্যচর্চাও। ইন্টারনেটে একদিকে যেমন বাংলার বিকৃত ব্যবহার বাড়ছে অন্যদিকে প্রমিত ও শুদ্ধ বাংলার ব্যবহারও রয়েছে। এভাবেই ভালো-মন্দে সারা বিশ্বে ছড়িয়ে যাচ্ছে ইন্টারনেটের বাংলা ভাষা।

ভাষা ব্যবহারে তাই আমাদের সবারই সচেতন হওয়া প্রয়োজন। আর এটাও অনুধাবন করা দরকার যে, ভাষার বিতর্কটা কেবলই তথাকথিত ‘শুদ্ধ’ বা ‘অশুদ্ধ’ রীতির নয়। একটা দেশে, সমাজে বা সারা দুনিয়ায় কোন কোন ভাষায় কেমন রীতিতে মানুষ কথা বলবে, লিখবে সেই প্রশ্নটা একই সঙ্গে খুবই রাজনৈতিক। ফলে আমাদের ভাষাচর্চা শেষ বিচারে কোন সংস্কৃতিকে কোন রাজনীতিকে এগিয়ে নিচ্ছে, কোনটাকে পিছিয়ে দিচ্ছে—তাও ভাবা দরকার সবারই।প্রথম আলো 

বিজ্ঞাপন / স্পন্সরড কন্টেন্ট
ট্যাগ:
সর্বশেষ সংবাদ