চার্লস এইচ রিভকিন : গত সপ্তাহে এশিয়া ভ্রমণে গিয়ে বাংলাদেশ সফর করলাম। এ দেশ সফরে গিয়ে আমার মনে অনুকূল ধারণা সৃষ্টি হয়েছে। দেশটির অর্থনৈতিক অগ্রগতি বিশ্বে তাক লাগিয়ে দিয়েছে। মার্কিন সরকার বাংলাদেশের সঙ্গে ব্যবসা-বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সম্পর্ক জোরদার করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। আমি বিষয়টিতে গুরুত্বারোপ করেছি, এতে আমরা বাংলাদেশকে তার সফলতা ধরে রাখতে ও তার সম্পদ দেশের পরিশ্রমী ও সংকল্পবদ্ধ মানুষদের কাছে পৌঁছে দিতে সহায়তা করতে পারি।
আমাদের তরফ থেকে পররাষ্ট্রমন্ত্রী জন কেরি যখন শেয়ার্ড প্রসপারিটি এজেন্ডার কথা বলেছিলেন, তখন তিনি এ ব্যাপারটি মাথায় রেখেই কথাটা বলেছিলেন। আমিও আমার ভ্রমণে বেইজিং থেকে শুরু করে ঢাকা ও মুম্বাই থেকে দিল্লি পর্যন্ত একই বার্তা ছড়িয়ে দিয়েছি।
বাংলাদেশ সরকারের কর্তা, গার্মেন্টসের মালিক, শ্রমিকনেতা ও অন্যদের সঙ্গে আলাপ করার সময় আমরা অভিন্ন অর্থনৈতিক উন্নয়নে দৃষ্টি নিবদ্ধ করেছি।
তৈরি পোশাকশিল্পের সফলতার ওপর ভিত্তি করে কীভাবে এগিয়ে যাওয়া যায়, সে বিষয়ে আমরা কথা বলেছি। এই তৈরি পোশাকশিল্প বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন, কর্মসংস্থান, আয় বৃদ্ধি, দক্ষতা উন্নয়ন ও দারিদ্র্য বিমোচনে ব্যাপক অবদান রেখেছে। একই সঙ্গে তা নারীর ক্ষমতায়ন ও সঠিক সময়ে সহস্রাব্দ উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জনেও বাংলাদেশকে অনেক দূর এগিয়ে দিয়েছে।
আমরা বুঝতে পেরেছি, শ্রমিকদের নিরাপত্তা ও অধিকার নিশ্চিত হলে বৈশ্বিক কোম্পানি এখানে বিনিয়োগ করবে। ফলে কোনো সরকারই পরিবর্তন থেকে মুখ ফিরিয়ে থাকতে পারে না।
আমাদের মধ্যে মতৈক্য হয়েছিল, বাংলাদেশ শ্রমিকদের অধিকার নিশ্চিত করেছে, এ মর্মে শক্তিশালী ‘ব্র্যান্ড বাংলাদেশ’ ভাবমূর্তি গড়ে তুলতে পারলে বিদেশি বিনিয়োগকারীরা আকৃষ্ট হবে। ভবিষ্যতের উন্নয়নের জন্য এটা খুব জরুরি। আরও কঠোরভাবে শ্রমিক অধিকার বাস্তবায়ন, কার্যকর শ্রম সম্পর্ক ও ভবন নিরাপত্তাসহ অন্যান্য সম্পর্কিত বিষয়ে নজর দিলে আরও বৃহত্তর পরিসরে বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধি নিশ্চিত হবে। দেশে একটি মধ্যবিত্ত শ্রেণি তৈরি হবে। বৈশ্বিক পরিসরে প্রতিযোগিতা করা ও মূল্য সংযোজন শৃঙ্খলের আরও ওপরে যাওয়ার জন্য এটা জরুরি।
ঢাকা সফরে আমি বলেছিলাম, বাংলাদেশের গত ২৫ বছরের উন্নয়নে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সহায়ক ভূমিকা পালন করতে পারায় আমরা গর্বিত। যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের অন্যতম বৃহত্তম বিদেশি বিনিয়োগকারী, আমাদের বাণিজ্যিক সম্পর্ক যথেষ্ট সম্ভাবনাময়। দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য গত দুই বছরে ৫০ ভাগেরও বেশি বেড়েছে, চার বিলিয়ন ডলার থেকে তা ছয় বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে গেছে।
শ্রমিক অধিকার বাস্তবায়নে অগ্রগতি হলে আরও বেশি মার্কিন কোম্পানি এখানে বিনিয়োগ করবে। আমাদের বাণিজ্যিক সম্পর্কে আরও ভরসা আসবে। এতে এ অঞ্চলে ও এমনকি তারও বাইরে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ভূমিকা আরও উজ্জ্বল হবে। আরও গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার হচ্ছে, এর ফলে দেশের সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ অর্থাৎ শ্রমজীবী মানুষের কার্যকারিতা ও উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি পাবে।
দুই দেশের হিস্যাই কম হওয়ার কথা নয়। মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা জোর দিয়ে বলেছেন এ বাজার মার্কিন জনগণের সমৃদ্ধির জন্য কতটা গুরুত্বপূর্ণ। মার্কিন ফার্মগুলো বাংলাদেশের সম্ভাবনা সম্পর্কে অবগত, তারা সেখানে ব্যবসা করতেও আগ্রহী। গত সেপ্টেম্বরে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশনের সময় বিজনেস কাউন্সিল ফর ইন্টারন্যাশনাল আন্ডারস্ট্যান্ডিং বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীকে দাওয়াত দিয়ে তাঁর সঙ্গে বৈঠক করেছে, এতে তারা গর্বিত।
বাংলাদেশে বিপুলসংখ্যক তরুণ তাঁদের অর্থনৈতিক ভবিষ্যৎ সুরক্ষার চেষ্টায় আছেন। এ দেশের প্রবৃদ্ধির হারও ৫ থেকে ৬ শতাংশের মধ্যে ওঠানামা করছে। ফলে শ্রমিকদের কর্মক্ষেত্রের নিরাপত্তা ও শ্রমিকদের অধিকার রক্ষা করা বাংলাদেশের ১৬ কোটি মানুষের জন্যই জরুরি হয়ে উঠেছে।
বাংলাদেশ সরকার কিছু ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছে। নিরাপত্তা পরিদর্শন, শ্রম আইন সংশোধনী পাস, ইউনিয়ন নিবন্ধন-প্রক্রিয়া সহজীকরণ, আন্তর্জাতিক শ্রমমান অনুসরণ ও জিএসপি-সুবিধা পুনরুদ্ধারে দেশটি যথেষ্ট অগ্রগতি অর্জন করেছে। বাংলাদেশ আরও বুঝতে পেরেছে যে শ্রম অধিকার পরিপালন উন্নততর হলে সেটা কার্যকর হবে তখনই, যখন বাংলাদেশ আরও বৃহত্তর অর্থে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া গ্রহণ করবে এবং প্রাতিষ্ঠানিকীকরণ প্রক্রিয়া আরও সংহত হবে। মতামতের স্বাধীনতা নিশ্চিত ও বিচার বিভাগের স্বাধীনতাও এর জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
কিন্তু পথ শেষ হয়নি, আরও বহুদূর যেতে হবে। যেমন ২০০৬ ও ২০১৩ সালের বাংলাদেশ শ্রম আইনের সংশোধনী বাস্তবায়ন, শ্রমিকদের অন্যায় শ্রম-আচরণ থেকে রক্ষা করার লক্ষ্যে মধ্যস্থতার প্রক্রিয়া চালু করা, হয়রানি, ভয়-ভীতি ও অধিকসংখ্যক পরিদর্শক নিয়োগ করা। তদুপরি রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চলে কর্মরত শ্রমিকদের অন্য শ্রমিকদের মতোই অধিকার লাভ করা উচিত।
শুধু তৈরি পোশাকশিল্প বাংলাদেশকে উন্নতির পরবর্তী ধাপে পৌঁছে দিতে পারবে না, যদি বাণিজ্য থেকে প্রাপ্ত সুবিধা সমাজের সবার কাছে না পৌঁছায়। বাংলাদেশকে টেকসই ও বৃহত্তর পরিসরে উন্নয়নের সম্ভাবনা কাজে লাগাতে হলে সরকার, পোশাক মালিক, ৪০ লাখ শ্রমিক, নতুন ও স্বাধীন ট্রেড ইউনিয়ন নেতাদের সম্মিলিত প্রচেষ্টা দরকার হবে। শ্রমিকেরা যাতে ন্যায্য মজুরি ও তাঁদের নিরাপত্তার জন্য দর-কষাকষি করতে পারেন, সে লক্ষ্যে তাঁদের ক্ষমতায়ন করতে হবে। উল্লিখিত সম্ভাবনার ক্ষেত্রে তা হবে একটি বড় পদক্ষেপ। সেটা হলে বিনিয়োগকারীরাও তাদের বার্তা পেয়ে যাবে।
আগামী দিনগুলোয় তৈরি পোশাক খাত পরিবর্তনে ও অন্যান্য ক্ষেত্রে বাংলাদেশের অগ্রগতি হয়েছে, এ খবর শুনতে চাই। একই সঙ্গে বাংলাদেশের উন্নতির বিষয়টি আমি মার্কিন সরকার ও ব্যবসায়ী নেতাদের জানাতে চাই।
ইংরেজি থেকে অনুবাদ: প্রতীক বর্ধন
চার্লস এইচ রিভকিন: ব্যবসা ও অর্থনৈতিক বিষয়-সংক্রান্ত মার্কিন সহকারী পররাষ্ট্রমন্ত্রী।প্রথম আলো