‘এই জঙ্গীরা দুইটা সুরাও কিন্তু মুখস্ত বলতে পারবে না’ : নিউইয়র্কে অভিনেত্রী ও নাট্যনির্দেশক ফাল্গুনী আহমেদ
মনিজা রহমান : যার অভিনয় দেখে বড় হয়েছি, সেই ফাল্গুনী আহমেদের পাশে বসে, একসঙ্গে আড্ডা দিচ্ছি, ভাবতেই মনটা আনন্দে ভরে গেল। বড় মানুষেরা বুঝি এভাবেই ছোটদের কাছে টেনে নেন। তবে ওনাকে দেখে বোঝা যায় না, জীবনের এতগুলি ফাল্গুন মাস পার হয়ে এসেছেন। মনে হল ফাল্গুনী আছে সেই আগের মতোই।
আনন্দ আড্ডাটা এক সময় মোড় নিল সিরিয়াস আড্ডায়। উঠে গেল সাম্প্রতিক অনেক গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু। আর বাংলাদেশে বর্তমান জঙ্গী সমস্যার চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু আর কি হতে পারে! ফাল্গুনী আহমেদ তাঁর স্পষ্ট উচ্চারণে বলে উঠলেন, ‘আমি নিশ্চিত, ওই জঙ্গীদের কেউ দুইটা সুরা মুখস্ত বলতে বললে, পারবে না। ওদের শুধু শেখানো হয় আল্লাহ আকবর। আর এটা বলেই ওরা মানুষের কল্লা কাটতে উদ্যত হয়।’
টেলিভিশন ও সিনেমার এক সময়ের সাড়া জাগানো অভিনেত্রী ফাল্গুনী আহমেদ। বর্তমান ব্যস্ততা নাটক রচনা ও পরিচালনা নিয়ে। তবে আগের মতো অত ব্যস্ত নন। অবসর পেলে স্বামী ইফতেখার আহমেদকে নিয়ে বেরিয়ে পড়েন দেশ ঘুরতে। তিন ছেলেমেয়ের দুইজন অস্ট্রেলিয়ায় আর একজন দুবাইয়ে আছে।
এবার ফাল্গুনী-ইফতেখার দম্পতি নোঙ্গর ফেলেছেন নিউইয়র্ক শহরে। এখানে প্রিয় বন্ধু রচি, রাগিব আর কিরণের সাহচর্যে আছেন, ঘুরছেন এদিক-ওদিক। তাদের সূত্র ধরেই সেদিন পরিচয় হল জ্যাকসন হাইটসের এক রেস্টুরেন্টে। বাঙ্গালী মানেই আড্ডাপ্রিয়। নানা প্রসঙ্গে এল বাংলাদেশের চলমান ‘জঙ্গী সমস্যা’। ফাল্গুনী স্পষ্ট সুরে বললেন, ‘১৮/২২ বছরের কোমলমতি তরুণদের জঙ্গী বানানো হচ্ছে। দেখুন এদের কারো বয়স কিন্তু ৩০/৩২ নয়। তারমানে এই ছেলেগুলোকে ব্রেইনওয়াশ করা হচ্ছে। এটা কোন সুস্থ-স্বাভাবিক ধারা নয়।’
ক্রমে আড্ডা জমে আরো গাঢ় হল। ফাল্গুনী আহমেদ তাঁর স্বামীকে পাঠালেন পান কিনতে। ‘আমার জন্য একটা পান নিয়ে এসো তো। চমন বাহার দিতে বোলো। আর বাবা জর্দাও।’ কি যে আদুরে স্বরে ফাল্গুনী আহমেদ বললেন তাঁর স্বামী ইফতেখার আহমেদকে! স্বামীকে পানের দোকান চেনাতে আবার সঙ্গে গেলেন বন্ধু রাগিব আহসান।
জ্যাকসন হাইটসের এই রেস্টুরেন্টে এসে তারা ফিরে পেলেন ৩০ বছর আগে ঢাকার শাহবাগের সেই দিনগুলি। যখন শাহবাগে রাগিব আহসানের ‘রেখায়নে’ দিনরাতের আড্ডায় যোগ দিতে আসেনি এমন কেউ শিল্প-সংস্কৃতি অঙ্গনে ছিল না! ফ্ল্যাশব্যাকে তারা ফিরে গেলেন সোনালী সেই দিনগুলিতে।
খুলনার মেয়ে ফাল্গুনী। সংস্কৃতিমনা পরিবারের কন্যা বলেই সেই পূর্ব পাকিস্তান আমলে ছিলেন খুলনার একাডেমি অব ফাইন আর্টসের নাচের শিক্ষার্থী। তাও যে সে নাচ না, ক্ল্যাসিকাল নাচ। ১৯৬৮ সালে নৃত্যে খুলনা জেলার হয়ে স্বর্ণপদক জেতেন। বিয়ে হয় নাটক পাগল মানুষ ইফতেখার আহমেদের সঙ্গে। যার নিজ শহর কুমিল্লায় ছিল ‘যান্ত্রিক’ নামে এক নাট্যগোষ্ঠি। আর সেই নাট্যদল দিয়েই ফাল্গুনীর অভিষেক নাট্যজগতে।
ইফতেখার আহমেদের ঘনিষ্ঠ বন্ধু মোজাম্মেল। ওনার মাথাতেই প্রথম আসে, ভাবীকে দিয়ে নাটকের একটা চরিত্র করানোর কথা। তখন নারী চরিত্রের জন্য কোন মেয়ে পাওয়া যেত না। অগত্যা সবাই শরনাপন্ন হন ফাল্গুনীর। উনিও বেশ ভাব নিয়ে বললেন, ‘দেখা যাক।’
প্রথম বলেই হয়ত সব কিছু এখন মানসপটে অতি উজ্জ্বল, দ্যুতিময় । ফাল্গুনী স্মৃতি হাতড়ে বলে যান সেই সব দিনের স্মৃতি, ‘নাটকের নাম চারদিকে যুদ্ধ। আমার চরিত্র একজন পুরুষ মনোরঞ্জনকারীর। যে বাসে করে শহরে যায়। নাটকের প্রথম শো-এর কথা আমার আজও স্পষ্ট মনে আছে। আমার জন্য নিজের হাতে গেথে বেলী ফুলের মালা নিয়ে এসেছিলেন আমার শ্বাশুড়ী।’
এমন সৌভাগ্য বাংলাদেশের কয়জন পুত্রবধুর হয়। ঘরের বউ মঞ্চে নাটক করবে। আর শ্বাশুড়ী বসে আছেন দর্শক সারির একদম সামনে। তার হাতে গাছ থেকে পেড়ে এনে গাথা, টাটকা বেলী ফুলের মালা। ওই চরিত্রের মেকাপের জন্য মালাটা ছিল একদম মানানসই।
স্বামী-শ্বাশুড়ি যখন রাজী, তখন আর কি চিন্তা ! বিটিভিতে অডিশন দেন ফাল্গুনী। ‘চারদিকে যুদ্ধ’ নাটকের সংলাপ গড়গড় করে বলে দিয়ে মাত করে বিচারকদের। প্রথম টেলিভিশন নাটক ছিল আতিকুল হক চৌধুরীর ‘যদিও দূরের পথ’। তারপর ধারাবাহিক, এক পর্বের মিলে কত যে নাটক- ঢাকায় থাকি, তমা, সময় অসময়, স্বপ্নের শহর; হুমায়ুন আহমেদের ঈদের নাটক- ‘বিবাহ’; নজরুল জয়ন্তীতে বিশেষ নাটক- ‘বনের পাপিয়া’।
ফাল্গুনীর সিনেমা ক্যারিয়ারের বয়স মাত্র দশ বছর। কিছুটা পরিণত বয়স তখন তাঁর। এই সময়েও তিনি যে সব চরিত্রে অভিনয় করেছেন, সেটা আজও সবার মুখে মুখে ফেরে। নায়ক রাজ রাজ্জাকের বিপরীতে ‘ঢাকা ৮৬’ সিনেমায়, মমতাজ আলীর ‘সোহরাব রুস্তম’, সুভাষ দত্তের ‘সহধর্মিনী’, দেলোয়ার জাহান ঝন্টুর ‘শিমুল পারুল’, শিবলী সাদিকের ‘দুর্ণাম’, খান আতার ‘এখন অনেক রাত’– এরমধ্যে উল্লেখযোগ্য। যে পরিচালকের সঙ্গেই কাজ করেছেন, সবার একটাই আক্ষেপ ছিল- ‘তোমাকে কেন তরুণ বয়সে পাইনি।’ আর ফাল্গুনী বলেন, আমারও দুর্ভাগ্য- কেন পায়নি!
তবে একটা সময় ফাল্গুনী নিজেকে সরিয়ে নেন অভিনয় থেকে। গ্ল্যামার জগতের ঝলমলে আলোর পরিবর্তে সময় দেন আপন সংসারে। তিন ছেলে মেয়ে তখন বেড়ে উঠছে। ওদেরকে সময় দেয়াটা বেশী গুরুত্বপূর্ণ মনে করেন। এখন ওরা সবাই দেশের বাইরে প্রতিষ্ঠিত।
অত:পর, অভিনেত্রী ফাল্গুনীর অভিনয় জগতে প্রত্যাবর্তন ঘটে নাট্যকার ও পরিচালক হয়ে। ্রবিন্দ্রনাথ এর ছোট গল্প ‘ একটি মুসলমানির গল্প’ দিয়ে নাটক বানান ‘মেহেরজান’। তবে নাট্যকার ও পরিচালক হিসেবে তাঁর উল্লেখযোগ্য কাজ- ‘নওয়াব ফয়জুন্নেসা’। ঢাকার এক শীর্ষ টিভি চ্যানেলে প্রচারিত হলে নাটকটি ব্যাপক জনপ্রিয়তা পায়।
স্বামী ইফতেখার আহমেদ আগে বিটপিতে কাজ করতেন। এখন একটি নামকরা টিভি চ্যানেলের হেড অব মার্কেন্টিং। ভালোই আছেন দুজন। অন্ধকারের মধ্যে আলোর সন্ধান করেন। একদিন ‘যান্ত্রিক নাট্যগোষ্ঠি’ নতুন নাটক মঞ্চায়ন করতে গেলে মেয়ে পেত না, এখন ছোট শহর কুমিল্লাতেও শত শত মেয়ে আসে অডিশন দিতে, ওয়ার্কশপে অংশ নিতে। শিল্প-সংস্কৃতির প্রতি মানুষের মানুষের আগ্রহ ও ভালোবাসা যে আগের তুলনায় বেড়েছে, এই বিষয়টা দারুণভাবে মুগ্ধ করে ফাল্গুনী ও ইফতেখার দম্পতিকে।
নিউইয়র্কে অবস্থানকালে ফাল্গুনী আহমেদ সাউথ এশিয়ান মিউজিক সোসাইটি আয়োজিত এক প্রীতি সম্মিলনে যোগ দেন। এই সময় নবাব ফয়জুন্নেসার জীবন নিয়ে তাঁর রচনা এবং নির্দেশনায় বিশেষ সিরিজ নাটকের নির্বাচিত অংশ প্রদর্শিত হয়। সাউথ এশিয়ান মিউজিক সোসাইটিতে এসে পৌঁছালে তাঁকে অন্যান্যের ভেতর স্বাগত জানান পরিচালক মাহবুবে খুদা রুমী এবং মিনহাজ আহমেদ।
- নিউইয়র্কে বাংলাদেশ ল’ সোসাইটি ইউএসএ ইনকের শরৎ উৎসব ও ফ্যামিলি নাইট
- নিউইয়র্কে বাংলাদেশ কনস্যুলেট জেনারেলে ‘কল সেন্টার’ চালু
- নিউইয়র্ক বাংলাদেশি আমেরিকান লায়ন্স ক্লাবের নয়া কমিটির বর্ণাঢ্য অভিষেক এবং ১৩তম চার্টার বার্ষিকী উদযাপন
- New York Attorney General James Warns New Yorkers About Student Loan Scams
- Justice, equality and human rights essential to building a lasting culture of peace: Irene Khan
- ন্যায়বিচার, সমতা ও মানবাধিকারই টেকসই শান্তির সংস্কৃতি গড়ার ভিত্তি: জাতিসংঘে বাংলাদেশের স্থায়ী প্রতিনিধি আইরিন খান
- যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের সঙ্গে কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক সম্পর্ক জোরদার করতে চায় : স্টেট ডিপার্টমেন্টের দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়া বিষয়ক ব্যুরোর ভারপ্রাপ্ত পরিচালক সারাহ
- নিউইয়র্কে মুসলিম কমিউনিটি ও আহলে সুন্নাতুল জামাতের ঈদে মিলাদুন্নবী (সা.) মাহফিল