জাতিসংঘের বাংলাদেশ স্থায়ী মিশনে সাংবাদিকদের সাথে মতবিনিময় : রোহিঙ্গা ইস্যুতে সাফল্য অত্যন্ত আশাপ্রদ ও গুরুত্বপূর্ণ কিন্তু যথেষ্ট নয়
https://www.facebook.com/USANewsNY/videos/2022122057805583/
ইউএসএনিউজঅনলাইন.কম : জাতিসংঘে বাংলাদেশ স্থায়ী মিশনের ২০১৭ সালে সবচেয়ে বড় কূটনৈতিক চ্যালেঞ্জ ছিল রোহিঙ্গা সংকট মোকাবেলা। গত ২ জানুয়ারী মঙ্গলবার সন্ধ্যায় মিশনের বঙ্গবন্ধু মিলনায়তনে প্রবাসী সাংবাদিকদদের সঙ্গে ইংরেজি নববর্ষের শুভেচ্ছা ও মতবিনিময়কালে জাতিসংঘে বাংলাদেশের স্থায়ী প্রতিনিধি ও রাষ্ট্রদূত মাসুদ বিন মোমন একথা বলেন। মতবিনিময়কালে গত বছরের অর্জনসহ গুরুত্বপূর্ণ বিভিন্ন কর্মকান্ড প্রবাসী সাংবাদিকদের কাছে তুলে ধরা হয় মিশনের পক্ষ থেকে। এসময় লিখিত বক্তব্যে বলা হয়, রোহিঙ্গা সমস্যা সম্ভবতঃ স্বাধীনতার পর আমাদের সবচেয়ে বড় কূটনৈতিক চ্যালেঞ্জ এবং আমাদের সাধ্যমত এটি মোকাবেলায় আমরা প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি। এ পর্যন্ত যে সাফল্য আমরা পেয়েছি তা অত্যন্ত আশাপ্রদ ও গুরুত্বপূর্ণ কিন্তু যথেষ্ট নয়। জাতিসংঘের ও আন্তর্জাতিক মহলের সজাগ নজর ও সহানুভুতি আমরা এ সমস্যার উপর বজায় রাখতে এ পর্যন্ত সফলকাম হয়েছি। কিন্তু চূড়ান্ত সফলতা আসবে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের মধ্য দিয়ে। সে লক্ষ্যে আমাদের প্রচেষ্টা নতুন বছরে চলমান থাকবে।
হৃদ্যতাপূর্ণ পরিবেশে অনুষ্ঠিত এ শুভেচ্ছা-বিনিময় সভার শুরুতে স্বাগত বক্তব্য রাখেন রাষ্ট্রদূত মাসুদ বিন মোমন। মিশনের মিনিস্টার (প্রেস) নূর-ই এলাহী মিনার পরিচালনায় বিদায়ী বছরে জাতিসংঘে বাংলাদেশ মিশনের কর্মকান্ড তুলে ধরেন বাংলাদেশ মিশনে নিযুক্ত উপ-স্থায়ী প্রতিনিধি তারেক মোহাম্মদ আরিফুল ইসলাম। শুভেচ্ছা বক্তব্য রাখেন নিউইয়র্কে বাংলাদেশের কনসাল জেনারেল মোহাম্মদ শামীম আহসান। এ সময় বাংলাদেশ মিশনের সর্বস্তরের কর্মকর্তারও উপস্থিত ছিলেন।
পরে রাষ্ট্রদূত মোমেন উপস্থিত সাংবাদিকদের বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তর দেন এবং নতুন বছর উপলক্ষ্যে সবাইকে সাথে নিয়ে কেক কাটেন।
রাষ্ট্রদূত মাসুদ বিন মোমন তার বক্তব্যে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় সমস্যা রোহিঙ্গা সংকট নিয়ে বিভিন্ন সময়ে সচিত্র সংবাদ পরিবেশনের জন্য মূলধারার গণমাধ্যম নিউ ইয়র্ক টাইমসের ভূয়সী প্রশংসা করেন। তিনি বলেন, নিউ ইয়র্ক টাইমস সহ মূলধারার বিভিন্ন গণমাধ্যমে পরিবেশিত সংবাদ জাতিসংঘে রোহিঙ্গা বিষয়ে আমাদের কাজ অনেকটা ত্বরান্বিত করছে। তিনি বিদেশি গণমাধ্যমের যে সকল সাংবাদিক বাংলাদেশের রোহিঙ্গা বিষয়ে সংবাদ পরিবেশন করছে তাদের সকলকে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে ধন্যবাদ জানান। তিনি প্রবাসের বাংলাদেশি সাংবাদিকদের সহযোগিতা কামনা করে বলেন, ভবিষ্যতে সুযোগ হলে ওইসকল সাংবাদিকদের সরাসারি বাংলাদেশ মিশনে আমন্ত্রণ জানিয়ে ধন্যবাদ জানানো হবে।
রাষ্ট্রদূত উলে¬খ করেন, বিভিন্ন কর্মকান্ডের জন্যে জাতিসংঘে বাংলাদেশ এখন অনেক বেশী গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠেছে। অধিষ্ঠিত হয়েছে বিশেষ এক মর্যাদার আসনে। ধাবিত হচ্ছে অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির পথে। আর সেটি এখন অনেকের কাছেই বিস্ময়ের ব্যাপার।
মাসুদ বিন মোমেন বলেন, প্রবাসে সাংবাদিকদের সৃজনশীল যেকোন উদ্যোগে বাংলাদেশ মিশন পাশে থাকবে।
প্রশ্নোত্তর পর্বে রাষ্ট্রদূত মাসুদ বিন মোমেন বলেন, যুক্তরাষ্ট্র ও বাংলাদেশের মধ্যে বহু মাত্রিক সম্পর্ক বিরাজমান। তিনি জাতিসংঘ তথা আন্তর্জাতিক মহলের সহযোগিতায় রোহিঙ্গারা তাদের নিজ বাসভূমিতে ফিরে যেতে পারবেন বলে প্রত্যাশা ব্যক্ত করেন। আরেক প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, বাংলাদেশে সুষ্ঠু, অবাদ ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের ব্যাপারে জাতিসংঘ টেকনিক্যাল সাপোর্ট দিতে রাজী আছে।
মতবিনিময় অনুষ্ঠানে কনসাল জেনারেল শামীম আহসান সবাইকে নতুন বছরের শুভেচ্ছা জানিয়ে বলেন, নিউইয়র্ক ও লস এঞ্জেলেস কনস্যুলেট নিবিড়ভাবে বাংলাদেশ মিশন ও দূতাবাসের সাথে কাজ করছে।
উপ-স্থায়ী প্রতিনিধি তারেক মোহাম্মদ আরিফুল ইসলাম লিখিত বক্তব্যে গত সেপ্টেম্বরে জাতিসংঘের ৭২তম সাধারণ পরিষদে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার যোগদান, রোহিঙ্গা সমস্যা, জাতিসংঘের এসডিজি প্রসঙ্গ, নিরস্ত্রীকরণ কার্যক্রম, শান্তি রক্ষা কার্যক্রম, পিসবিল্ডিং কনফ্লিক্ট ও নিরাপত্তা, ইউএন রিফর্ম, কাউন্টারিং টেরোরিজম এন্ড প্রিভেন্টিং ভায়োলেন্ট এক্সিট্রিমিজম, জলবায়ু পরিবর্তন, অভিবাসন, বিভিন্ন থিমেটিক বিষয়ক আইনগত প্রক্রিয়ায় অংশগ্রহণ, ১৯৭১-এর গণহত্যা, নিরাপত্তা পরিষদের কার্যক্রম, কালচার অব পিস রেজুলেশন, আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস, সিএমডব্লিউ নির্বাচন, পাবলিক ডিপ্লোম্যাসি সহ জাতিসংঘে বাংলাদেশ মিশনের ২০১৭ সালের গুরুত্বপূর্ণ কার্যক্রম ও অর্জনের বিষয়গুলো তুলে ধরেন।
তিনি তার লিখিত বক্তব্যে ২০১৮ সালের জাতিসংঘের সম্ভাব্য তিনটি চ্যালেঞ্জের কথা উল্লেখ করেন, তা হচ্ছে কিছু কিছু রাষ্ট্রের বহুপাক্ষিক কূটনীতি থেকে সরে আসা এবং আসার ইঙ্গিত, জাতিসংঘে বাজেট হ্রাস এবং এসডিজি বাস্তবায়নে অর্থায়নের অপ্রতুলতা। তিনি বলেন, রোহিঙ্গাদের মানবিক সহায়তা প্রদানের ক্ষেত্রে প্রধানমন্ত্রীর মানবিক ও দায়িত্বশীল পদক্ষেপ উন্নয়নশীল দেশ হওয়া সত্ত্বেও বাংলাদেশকে বিশ্বের দরবারে উদার দেশ হিসেবে পরিচিতি দিয়েছে। বিশ্ব সম্প্রদায় বার বার বাংলাদেশকে ধন্যবাদ জানিয়েছে। যা বাংলাদেশকে আরেকটি নতুন পরিচয়ে অভিষিক্ত করেছে। কূটনৈতিকভাবে বাংলাদেশকে অধিকতর মর্যাদার আসনে আসীন করেছে।
লিখিত বক্তব্যে তিনি বলেন, ২৫ আগস্ট রাখাইন রাজ্যে সন্ত্রাসী ঘটনা ঘটার পরপরই আমরা জাতিসংঘে এ বিষয়ে কার্যক্রম শুরু করলেও প্রথম দিকে সমস্যার ব্যাপ্তি যে এ পর্যায়ে যেতে পারে তা অনুধাবন করতে পারিনি। প্রমদিকে আমরা নিউইয়র্কস্থ ওআইসির রোহিঙ্গা মুসলিম মাইনোরিটি গ্রুপের মাধ্যমে কূটনৈতিক তৎপরতা শুরু করি। সৌদি আরবের স্থায়ী প্রতিনিধির নেতৃত্বে আমরা আরো কয়েকটি দেশের স্থায়ী প্রতিনিধি একত্রে জাতিসংঘের মহাসচিব, নিরাপত্তা পরিষদের প্রেসিডেন্ট এবং সাধারণ পরিষদের প্রেসিডেন্টর সঙ্গে দেখা করে তাঁদেরকে সমস্যার বিষয়ে অবহিত করি এবং এর সমাধানে তাঁদের উদ্যোগ গ্রহণের অনুরোধ জানাই।
তিনি উল্লেখ করেন, রোহিঙ্গার বিষয়টি জাতিসংঘের বিভিন্ন পর্যায়ে এবং বৃহত্তর পরিসরে আলোচনায় আসতে শুরু করে। জাতিসংঘের মহাসচিবের রোহিঙ্গা বিষয়ে শক্ত অবস্থান এবং তাঁর নিজস্ব উদ্যোগ এক্ষেত্রে একটি বিরাট নিয়ামক হিসাবে কাজ করে।
আরিফুল ইসলাম উল্লেখ করেন, এবার নিরাপত্তা পরিষদে রোহিঙ্গা ইস্যুতে আমাদের বড় অর্জন হচ্ছে ২০০৯ সাল থেকে জাতিসংঘে মিয়ানমার বিষয়ে কোন মুক্ত আলোচনা হয়নি কিন্তু গত ২৮ সেপ্টেম্বর সেই আলোচনা হয়েছে। সব মিলিয়ে ২৫ আগষ্টের পর বিভিন্ন ফরম্যাটে নিরাপত্তা পরিষদে সাতটি সভা হয়েছে, বড় দু’টি পরাশক্তির বিরুদ্ধ মতের পরেও যা অভূতপূর্ব। যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান আমাদের পক্ষে পরিবর্তিত হয়েছে। নিরাপত্তা পরিষদ হতে এ পর্যন্ত রেজ্যুলেশন হয়নি ঠিক, তবে প্রেসিডেন্সিয়াল ষ্টেটমেন্ট পর্যন্ত হয়েছে। এগুলো সবই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ন ক্রমাগ্রসরমান পদক্ষেপ।
তিনি বলেন, গত বছর প্রধানমন্ত্রী ছাড়াও ঢাকা থেকে আসা স্পীকার, অর্থমন্ত্রী, পররাষ্ট্র বিষয়ক সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি ডা. দীপু মনি এমপি, জাতিসংঘ মহাসচিব ও অন্যান্য উচ্চ পর্যায়ের নেতৃত্বে সাথে রোহিঙ্গা বিষয় নিয়ে পৃথক বৈঠক করেছেন। মহাসচিব বার বারই বাংলাদেরশকে সময় দিয়েছেন, জাতিসংঘের বিভিন্ন উচ্চ পর্যায়ের প্রতিনিধি ও প্রতিনিধিদলকে আমরা কক্সবাজার সফর করিয়েছি। তাঁরা স্বচক্ষে রোহিঙ্গাদের অবস্থা দেখে তার উপর বিবৃতি দিয়েছেন, মহাসচিব ও নিরাপত্তা পরিষদকে অবহিত করেছেন। ফলশ্রুতিতে রোহিঙ্গাদের পক্ষে জনমত সুদৃঢ় হয়েছে। অনেক সদস্য রাষ্ট্রকে তাঁদের বহুপাক্ষিক স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন বিষয়ে সমর্থন দিয়েছি। সাধারণ অধিবেশন ও নিরাপত্তা পরিষদে আমাদের এ নিরন্তর, কৌশলী ও দ্বিমুখী শুধু নিউইয়র্কেই সীমাবদ্ধ ছিল না। আমরা বাংলাদেশে অবস্থিত বিদেশি দূতাবাসসমূহ এবং বিশ্বের বিভিন্ন দেশে অবস্থিত আমাদের মিশনগুলোকে এ জন্য কাজে লাগিয়েছি। জেনেভাতে মিয়ানমারের উপর একটি সেশন ৫ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত হয়েছে। সেখানেও একটি রেজ্যুলেশন বিপুল ভোটে গৃহীত হয়েছে। জেনেভাতে আমাদের স্থায়ী মিশন এ বিষয়ে বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। এজন্যই রোহিঙ্গা সমস্যা জাতিসংঘে এবার এতটা আলোচিত হয়েছে।
উপ-স্থায়ী প্রতিনিধি বলেন, জাতিসংঘের প্রাক্তন মহাসচিব বান কি মুন বাংলাদেশকে উন্নয়নের রোল মডেল আখ্যা দিয়েছেন। এরপর এসডিজি বাস্তবায়নে আমাদের অগ্রগতি উপস্থাপন করেছি। সবাই এর প্রশংসা করেছে। আমাদের নিজস্ব সম্পদ দিয়ে এসডিজি বাস্তবায়ন-প্রচেষ্টা বিশ্বমহলে বিশেষভাবে সমাদৃত হয়েছে।
তিনি বলেন, আমরা বছরব্যাপি চেষ্টা করেছি জাতিসংঘে আমাদের প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ কার্যক্রম, অবদান বা অর্জনকে মিডিয়ার মাধ্যমে সর্বসাধারণের নিকট পৌঁছাতে। গতবছর আমাদের এ প্রচেষ্টা বিগত অনেকগুলো বছরের তুলনায় বেশী ছিল। আমাদের পক্ষ হতে আরও মিডিয়া আউটরীচ করা উচিত ছিল যা আমরা এবছর করার চেষ্টা করবো। তিনি এ বিষয়ে মিডিয়ার প্রতি কৃতজ্ঞতা জানিয়ে আরও বেশী সহযোগিতা কামনা করেন।
https://www.facebook.com/USANewsNY/videos/2022066697811119/
ছবি : নিহার সিদ্দিকী
- Rohingyas Want to Return Home, Bangladesh Tells UN
- এক দশক ধরে বিপুল সংখ্যক রোহিঙ্গাকে আশ্রয় দেওয়া দেশের জন্য টেকসই নয়, রোহিঙ্গারাও নিজ দেশে ফিরে যেতে চায় : জাতিসংঘে বাংলাদেশ
- Bangladesh and UN Women pledge closer cooperation to advance women’s empowerment and the WPS agenda
- নিউইয়র্কে চিটাগং অ্যাসোসিয়েশন অব নর্থ আমেরিকা (মাকসুদ-মাসুদ) এর সংবাদ সম্মেলনে কুৎসা রটানোর প্রতিবাদ
- নারীর ক্ষমতায়ন এবং নারী, শান্তি ও নিরাপত্তা এজেন্ডা এগিয়ে নিতে বাংলাদেশ ও ইউএন উইমেনের ঘনিষ্ঠ সহযোগিতার অঙ্গীকার
- State Minister for Foreign Affairs Urges Stronger Global Action to Protect Civilians, Uphold Humanitarian Law and Support Rohingya Repatriation
- বেসামরিক জনগণের সুরক্ষা, আন্তর্জাতিক মানবিক আইন সমুন্নত রাখা ও রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে জোরালো বৈশ্বিক পদক্ষেপের আহ্বান পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামার
- মহররম মাসের গুরুত্ব ও ফজিলত!