Thursday, 29 October 2026 |
শিরোনাম
নিউ জার্সিতে উৎসবমুখর পরিবেশে দুর্গাপূজা উদযাপিত নিউইয়র্কের জেএমসির সম্প্রসারণ প্রকল্প রমজানের আগেই সম্পন্নের প্রত্যাশা, ফান্ডরেইজিংয়ে প্রায় ১০ লাখ ডলার সংগ্রহ, বাকি প্রয়োজন আরও ২০ লাখ New York Attorney General James Secures More Than $480,000 and Debt Relief for New York Homeowners এই জীবন চিরস্থায়ী নয়, একদিন মরে যাবো নিউইয়র্কে বাংলাদেশ সোসাইটির নির্বাচন নিয়ে অনিশ্চয়তা আরও বেড়েছে; ১৭ ডিসেম্বর উভয় পক্ষকে তথ্য-উপাত্ত জমার নির্দেশ নিউইয়র্কে নৃত্যশিল্পী ও সাংস্কৃতিক সংগঠক তাহসিন ফেরদৌসের অকালমৃত্যু, বাংলাদেশি কমিউনিটিতে শোকের ছায়া নিউইয়র্কে আবেয়া’র দ্বিবার্ষিক সম্মেলন ও ফ্যামিলি নাইট: প্রযুক্তি সেমিনার, জব ফেয়ার, বিজ্ঞান মেলা ও সাংস্কৃতিক উৎসব Global Anticipation Builds as Dr. Mostofa Sarwar’s Sunflower Wounds Debuts with Successful Houston Open House and Worldwide Pre-Order Milestone যুক্তরাষ্ট্রে ৭৫ দেশের অভিবাসী ভিসায় অনিশ্চয়তা, আদালতের নির্দেশের পরও কাটেনি জট Human Rights Must Be at the Heart of Economic Governance and Policies: Ambassador Irene Khan
সব ক্যাটাগরি

নিউইয়র্কের চিঠি

অনলাইন ডেস্ক পঠিত: 97 বার

প্রকাশিত: December 1, 2014 | 1:39 PM

শিবলী চৌধুরী কায়েস, নিউইয়র্ক  : স্বপ্নের সোনার হরিণের দেশ। যারা বসবাস শুরু করেছেন ও যারা বেড়াতে আসছেন এবং যাদের এখনো আসা হয়নি; তাদের প্রত্যেকের কাছে যুক্তরাষ্ট্রের অভিজ্ঞতার ভিন্নতা পাওয়া যায়। একেকজন কিংবা একেকটি পরিবারের কাছে এখানকার জীবন-যাপন এবং কঠিন বাস্তবতার চিত্র আলাদা ভাবে ফুটে উঠে। যারা এখানে দীর্ঘদিন ধরে বসবাস করছেন প্রতিনিয়তি তাদের জীবন ঘড়ি চলছে নিয়মের ছকে। আর পর্যটকদের কাছে বিনোদনের এক তীর্থস্থান। অন্যদিকে যারা আসতে পারেন নি তাদের কাছে এখনো স্বপ্নের দেশ আমেরিকা। আমাদের সময় ডটকমের বিশেষ প্রতিবেদনে উঠে আসে এখানকার খেটে-খাওয়া ও কর্মজীবী প্রবাসীদের পারিবারিক এবং সামাজিক জীবন।
এক সময় যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশি অভিবাসির প্রবেশ ঘটত বেশির ভাগই অবৈধ পথে। বলতে গেলে তখন পুরো আমেরিকা তথা নিউইয়র্কে বাংলাদেশিদের সংখ্যা ছিল হাতেগোনা। কিন্তু সময়ের সাথে সব কিছু যেন পরিবর্তন হয়ে যায়। বিশ্বের ক্ষমতাধর এই রাষ্ট্রের চালচিত্রও যেন পাল্টে গেছে। নব্বইয়ের দশকে যুক্তরাষ্ট্রের ওপি-ওয়ান ভিসা চালু হওয়ার পর এদেশে বাড়তে থাকে বাংলাদেশিদের সংখ্যা। পাশাপাশি ভিজিট ও প্রফেশনাল ক্যাটাগরিতেও অনেকেই পাড়ি জমান স্বপ্নের এই দেশে। অন্যান্য স্টেটের চেয়ে উত্তর আমেরিকা তথা নিউ ইয়র্ক সিটির প্রায় প্রতিটি ব্যুরোতে প্রবাসি বাংলাদেশিদের অবস্থান এখন অনেক শক্তিশালী। ম্যানহাটন-ডাউন টাউনের এলেন স্ট্রীট থেকে যাত্রা শুরু করে কুইন্সের জ্যাকসন হাইটস, জ্যামাইকা ও এস্টোরিয়া, ব্রঙ্কসের-পার্কচেস্টার, ব্রুকলিনের-ওজন পার্ক’সহ প্রায় সবখানেই দেখা মিলবে প্রবাসি বাংলাদেশিদের। যাদের অনেকেই পরিবার নিয়ে বসবাস করছেন।
প্রবাসি বাংলাদেশিদের বিস্তার লাভ করার সাথে পাল্লা দিয়েছে বেড়েছে দেশি পণ্যের নানা ধরণের ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের সংখ্যাও। আর টেকনাফ থেকে তেতুলিয়ার আবর্তে প্রায় সব ক’টি বিভাগীয় শহর-উপশহর, জেলা-উপজেলা, থানা এবং গ্রাম নামের আবর্তে একের অধিক সমিতির অবস্থান রেকর্ড সংখ্যক। যার প্রভাব আমেরিকায় বসবাসকারি অন্যান্য দেশ ও জাতির অভিবাসিদের মধ্যে নেই বললেও চলে। পাশের দেশ ইন্ডিয়া-পাকিস্তান কিংবা নেপাল-ভুটানের প্রবাসিদের কোন সংগঠনের আধিক্য এখানে দেখা যায় না; যতটা না বাংলাদেশিদের মাঝে বিদ্যমান।
যুক্তরাষ্ট্রে বসবাসকারি প্রবাসিদের কাছে পারিবারিক তথা সামাজিক বন্ধনের গুরুত্ব যতটা না বেশি তার চেয়ে বেশি হচ্ছে কমিউনিটির নামে বিভিন্ন সংগঠনের আধিপত্য নিয়ে। দেশের প্রায় সবক’টি জেলা-উপজেলার সংগঠনের কার্যক্রম চলছে এলাকা ভিত্তিক কয়েকজন প্রবাসি অভিবাসিদের নিয়ে। মতের অমিল হলে মাত্র কয়েকদিনের মাথায় সেটা ভেঙ্গে গড়ে উঠে নতুন আরেকটি সংগঠন। বিভিন্ন নামে শুরু হওয়ায় এসব সংগঠন আধিপত্য, কর্তৃত্ব ও অহমিকার দম্ভে ভেঙ্গে এক সংগঠন বেড়ে হচ্ছে কয়েকটি। নতুন নামে অ্যাসোয়িশেন কিংবা সমিতির দৌরাত্ম এখানে প্রকট আকার ধারণ করেছে। কে কাকে ঘায়েল করে নিজের অবস্থান জানান দিবে সেটাকেই বড় করে দেখছেন এখানকার প্রবাসি বাংলাদেশিরা। এছাড়াও বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের প্রভাবতো রয়েছেই। আর এসবের প্রভাব পড়ছে পরিবার তথা স্ত্রী-পুত্র সন্তানদের ওপর। বলতে গেলে এখানে বসবাসকারি বেশিরভাগ বাংলাদেশিরা ট্যাক্সি চালান কিংবা কোন রেষ্টুরেন্ট ও গিফটশপ এবং কমিউনিটি নির্ভর প্রতিষ্ঠানে কাজ করছেন। সকালে বেরিয়ে যা রোজগার করেন; রাতে এসে এলাকা ভিত্তিক সংগঠনের অফিস কিংবা জ্যাকসন হাইটস এসে চায়ের আড্ডায় গাল-গল্পে ব্যয় করেন। এসব ব্যস্ততার ফলে পরিবারের প্রতি অনেকটা উদাসীন হয়ে পড়েন। নেহাত প্রয়োজন ছাড়া পরিবারকে সময় দেয়া হয়নি তাদের। আর এসব সভা-সেমিনারে গুরুত্ব বেশি হওয়ায় কর্মক্ষম কর্তাব্যক্তিরা পরিবারের খোঁজ নেওয়ার সময় পাচ্ছেন না বলেও অভিযোগ রয়েছে। হোক সেটা সন্তান-স্ত্রী কিংবা বাবা-মা।
একটা সময়ে মনে হতো বাঙালী নিউইয়র্কে থাকেন অথচ জ্যাকসন হাইটস এ আসেননি কিংবা চিনেন না! তা অসম্ভব। জ্যাকসন হাইটস-এর ৭৩ নং স্ট্রীটকে এখন ৫৫০ বর্গহাতের একটি মিনি বাংলাদেশ বললে ভুল হবে না। এটা কোন উপন্যাসের কল্প-কাহিনী নয়; সত্যিকারে উদাহরণও বটে। বাস্তবে বাংলাদেশি অধ্যুষিত এলাকার নামই জ্যাকসন হাইটস। যেখানে গড়ে উঠেছে অসংখ্য দেশি পণ্যের গ্রোসারি, ফ্যাশন হাউজ ও রেস্টুরেন্ট। শুধু জ্যাকসন হাইটস নয়; প্রবাসিদের অবস্থান ধীরে ধীরে ছড়িয়ে পড়েছে ওজনপার্ক (ব্রকলিন), পার্কচেস্টার (ব্রঙ্কস), কুইন্সের এস্টোরিয়া এবং জ্যামাইকাতেও। প্রবাসি বাংলাদেশিদের আড্ডাস্থল এবং ঘনবসতি এলাকা বলতে এসব অঞ্চলকে বুঝায়। পাশাপাশি দেশি নাম ও ঐতিহ্যের স্বাদে গড়ে উঠেছে বিভিন্ন পন্য-প্রসাধন তথা রেস্টুরেন্টের ব্যবসা প্রতিষ্ঠান। যাদের কদরও রয়েছে বেশ। দূর-দূরান্তে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা নিউইয়র্কের প্রবাসি বাংলাদেশিরা ছুটে আসেন প্রিয়জনদের নিয়ে।
বাংলাদেশি অধ্যুষিত বিভিন্ন শহর-উপশহর কিংবা কাউন্টিতে বসবাস বেড়েছে বহুগুন। বাঙালীরা মুলত আড্ডা প্রিয়। অন্যদিকে পদপদবির জন্য বেশ তৎপরতাও রয়েছে। যার প্রমাণ সভা-সেমিনার এবং সমিতি সংগঠনের নেতৃত্ব। রাজনীতি, সমাজনীতি, ব্যবসানীতি, পরচর্চ্চা, পরনিন্দা, নারী, কবিতা, সাহিত্য, বিজ্ঞান, মঙ্গলগ্রহ, অভিযান-ভ্রমণ অবদি কিছুই বাদ যায় না এসব আড্ডায়। দেশি আড্ডার এই সংষ্কৃতি এখন ছড়িয়ে পড়েছে প্রবাসেও। কিন্তু পারিবারিক অবস্থার উন্নয়নতো দূরের কথা প্রবাসে কমিউনিটিকে মূলধারার সাথে সম্পৃক্ত করার মানসিকতার অভাব বেশ লক্ষ্যণীয়।
বিশেষ প্রতিবেদনে উঠে আসে প্রবাসি বাংলাদেশি বেশ কয়েকটি পরিবারের কঠিন বাস্তবতার করুণ জীবন। জ্যাকসন হাইটসের কাছাকাছি বেশ কয়েকটি আবাসিক ভবন পরিদর্শনে দেখা মেলে অসংখ্য মেস এবং বেইজমেন্টের একটি ফ্লাটে কিংবা ১ বেড রুমের বাসায় সাবলেটে একের অধিক বাংলাদেশি পরিবারের বসবাস। মূলত জ্যাকসন হাইটস কাছাকাছি হওয়ায় চায়ের আড্ডা এবং সভা-সমিতির সেমিনারে অংশ নিতে জ্যাকসন হাইটসকে বেছে নিচ্ছেন পরিবারের কর্মক্ষম ব্যক্তি। অত্র এলাকায় অতিরিক্ত ভাড়ার ফলে কয়েকটি পরিবার মিলে সাবলেটে বসবাস করছেন গাদাগাদি করে একই রুমে।
এরকম কয়েকটি পরিবার আমাদের সময় ডটকমের সাথে কথা বলেন ছবি না তোলার শর্তে। ছয় বছর আগে বাংলাদেশ থেকে নিউ ইয়র্কে স্বামীর কাছে ছুটে আসেন এক নারী। বিয়ের এক বছর পরেই ইমিগ্র্যন্ট হয়ে পাড়ি জমান স্বপ্নের দেশে। লেখাপড়া করতেন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে। এখন দু’সন্তানের জননী। স্বপ্ন ছিল পড়াশোনা শেষে অধ্যাপনা করার। কিন্তু বাবা-মায়ের ইচ্ছেতেই বিয়ে করেন আমেরিকান প্রবাসিকে। তিনি জানান, ‘‘আমার স্বামী মানুষ হিসেবে বেশ ভালো। তবে, পরিবার সংসারের ব্যাপারে উদাসীনতা রয়েছে তার। রাজনীতি, সমিতি এবং আড্ডা-গালগল্প ওনার প্রথম পছন্দ। কঠোর পরিশ্রম করে যা আয় করেন তার বেশীরভাগই বিলিয়ে দেন সমিতি ও সংগঠনের আড্ডায়। অন্যদিকে, বাংলাদেশেও শ্বশুর-শ্বাশুড়ির জন্য টাকা পাঠাতে হয়। ফলে অর্থ সঙ্কটে পরিবারের সাথে সাবলেটে হিসেবে বসবাস করছি। যা বাংলাদেশেও কখনো করিনি’’।
আবেগ তাড়িত কণ্ঠে তিনি আরো বলেন, ‘দেখুন আমার ইচ্ছে করছে দেশে চলে যাই। কিন্তু তাও সম্ভব নয়। দুটো সন্তান এখানে জন্ম। আর দেশে গিয়েও কী করবো? কারণ লেখা-পড়াও বন্ধ করে দিয়েছি বহু আগে। ৩ ফ্যামেলি মিলে একই চুলায় রান্না, একটা বাথরুম ব্যবহার অনেক কষ্টের। তবুও ভাবছি আমি নিজেই কাজ খুঁজে নিবো। সন্তানরা ছোট বলে এতোদিন করতে পারিনাই। তখন হয়তো একটা ভালো বাসায় উঠে যাবো’।
মূলত বিষয়টা পারিবারিক বিধায় গণমাধ্যমকে সব বলতে নারাজ অনেকে। কিন্তু বাস্তবতা তো আর চেপে রাখা যায় না; তার উদাহরণ অন্য আরেকটি পরিবার। বাংলা পত্রিকার সাথে আলাপকালে জনৈক মহিলা জানান, ‘আমি আসলে দীর্ঘ ত্রিশ বছর এখানে বসবাস করছি। আমার এই প্রবাস জীবনের ২০ বছর সাবলেটে কেটেছে। আমার স্বামী একটি সমিতির নেতা ছিলেন। তার কাছে এটাই ছিল বাংলাদেশের এমপি-মিনিস্টারের মত স্বপ্ন। আমি বারণ করেও তাকে ফেরাতে পারিনি। এখন অবশ্য বুঝতে পেরেছেন। কিন্তু ততক্ষণে অনেক দেরি হয়ে গেছে। আমার সন্তানরা তাদের বাবার প্রতি নাখোশ’।
এ আমাদের সময় ডটকমের সাথে কথা হয় মূল ধারার একজন কমিউনিটি অ্যাক্টিভিটসের। তিনি জানান, ‘আসলে কেউ যদি সংগঠনের নেতৃত্ব দিতে চান এটা ভালো দিক। কিন্তু দু:খ হচ্ছে একই এলাকার একাধিক সংগঠন মেনে নেয়া যায় না। যদি কারো টার্গেট থাকে মূলধারার রাজনীতিতে সম্পৃক্ত হওয়ার; তিনি তা পারেন। তবে, তার আগে নিজের পরিবার এবং সন্তানদের প্রতি শতভাগ খেয়াল রেখে। আমাদের প্রবাসি ভাইয়েরা তা না করে করেন উল্টোটা। উনারা মনে করেন যে বাংলাদেশের ছোট্ট একটা শহরের সভাপতি-সম্পাদক হলেও অনেক কিছু পেরে গেছেন। তা ঠিক নয়। আমাদের দেশের সন্তানেরা এখন আর নিজ কমিউনিটির সাথে মিশছে না। তারা অন্য জাতির সাথে বেড়ে উঠেছে ভাষাগত পরিবর্তন ঘটছে এসব দিক খেয়াল রাখতে হবে। জোর করে তাদের ওপর কিছু চাপিয়ে দেয়া যাবে না। একই নামের বিভিন্ন সংগঠন তরুণ প্রজন্মের মনে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। আর এর দায়ভার বাবা-মায়ের’।
তিনি আক্ষেপের সুরে আরো জানান, ‘দেখুন এসব সমিতির লক্ষ্য কী? স্থানীয় এমপি-মন্ত্রী ও নিজ এলাকার জেলা পর্যায়ের একজন নেতাকে সংবর্ধনা, বছরে একবার সমিতির সদস্যদের কাছ থেকে চাঁদা তুলে বনভোজন এর মধ্যেই সীমাবদ্ধ। এটাতো একটা জাতির জন্য মঙ্গল বয়ে আনবেনা। আপনি খেয়াল করলে দেখবেন এখানে অন্যান্য কোন দেশ কিংবা জাতিগোষ্ঠির এতগুলো সমিতি কিংবা সংগঠনের দৌরাতœ নেই। আমি মনে করছি এখন থেকে সচেতন না হলে আমাদের আগামী অন্ধকারে নিমজ্জিত হয়ে পড়বে’।
বাংলাদেশিদের আড্ডা আর সভা-সেমিনার এবং রাজনৈতিক কর্মসূচি মাথা ব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে জ্যাকসন হাইটস আবাসন বাসিন্দাদের। সম্প্রতি এ নিয়ে নড়েচড়ে বসে প্রশাসন’সহ সংশ্লিষ্টরা। দাবি উঠে জ্যাকসন হাইটসকে ঢেলে সাজানোর। আশঙ্কায় পড়ে বাংলাদেশি ব্যবসায়ীরা। অবশেষে ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের মালিক, ব্যবাসায়ী নেতা, প্রশাসন এবং আবাসিক বাসিন্দাদের সমঝোতায় জ্যাকসন হাইটস ইস্যুতে একটি সমাধানে পৌঁছায়। স্বস্তি নেমে আসে প্রবাসিদের মাঝে। তবে শর্ত হচ্ছে জুড়ে দেয়া হয় বেশ কয়েকটি। রাজনৈতিক সভা- সেমিনার শেষে হৈ-হুল্লোড় বন্ধ করা, বিকট শব্দে গাড়ি চালানো কিংবা হর্ণ বাজানো, আবাসিক বাসিন্দাদের ঘুমের ক্ষতি রাস্তা দাঁড়িয়ে আড্ডা না দেয়া, ফুটপাত দখল করে সিগারেট খাওয়া, রাস্তা দখল করে গাল-গল্প করা, দল বেঁধে আড্ডার ফলে মহিলাদের চলাচলে বিঘিœত না করা ইত্যাদি।
বাড়ছে পারিবারিক কলহ এবং বিবাহ বিচ্ছেদ:
আমাদের সময় ডটকমের বিশেষ প্রতিবেদনে উঠে এসেছে অনেক ঘটনা। এখানে বসবাসকারি শত শত প্রবাসি বাংলাদেশিদের দাম্পত্য কলহে ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে পুরো পরিবার। আর এর প্রভাব পড়ছে সমাজ তথা কমিউনিটির সন্তানদের ওপর। বাবা-মায়ের এ অবিশ্বাস জীবনের শিকার সন্তানরাও বাংলাদেশি বন্ধু, সহপাঠি কিংবা, ক্লাসমেটদের ওপর আস্থা রাখতে পারছে না। বাবা-মায়ের ভালোবাসা থেকে বঞ্চিত এসব সন্তানেরা তাই মিশে যাচ্ছেন ভিনদেশি নাগরিকদের সাথে। খোলামেলা চলাফেরার পাশাপাশি রাত কাটাচ্ছেন অন্যের সাথে। সপ্তাহের ভেকেশন উপভোগ করছে নাইট-পার্টি আর বারে। এখানকার আইনে তাদের জোর করে বেঁধে রাখাও কঠিন পরিবারের জন্য। আর এসব কারণে বিপাকে পড়ছেন কনজারভেটিভ পরিবারের সদস্যরা। তাই অনেকটা বাধ্য হয়ে বাংলাদেশি কমিউনিটি থেকে সন্তানদের দূরে রাখার চেষ্টা করছেন সচেতন বাবা মায়েরা। কিন্তু তার পরিণতিও ভালো ঠেকছে না। এমনটি বলেছেন সংশ্লিষ্টরা।
যাদের আর্থিক অবস্থান ভালো তারা স্ত্রী-সন্তানদের দেশে পাঠিয়ে মাধ্যমিক অবদি পড়িয়ে নিয়ে আসছেন। কারণ দেশিয় পরিবেশে বেড়ে উঠে উচ্চমাধ্যমিক লেভেল এখানে পড়লে অনেকটা পরিবারের আদর্শে বিশ্বাসী হয়ে উঠবেন সন্তানেরা। এমনিট মনে করছেন তারা। উডসাইডের বাসিন্দা ও বেশ কয়েকটি ক্যান্ডি শপের মালিক হাসান-সুমি দম্পতি আমাদের সময় ডটকমকে জানান, ‘আমাদের এক ছেলে দুই মেয়ে। দুই মেয়ে বড় আর ছোট ছেলে। আমরা বরাবরই চেষ্টা করছি সন্তানদের ইসলামী মূল্যবোধ তথা দেশীয় সংস্কৃতির সাথে সম্পৃক্ত রাখতে’।
সুমি বলেন, ‘আমাদের বাসার পাশে একজন ভদ্রলোক পরিবার’সহ থাকতেন। তিনি ছিলেন একটা সমিতির নেতা। সবসময় গর্ব করে আমার স্বামীকে বলতেন দেখুন আমার ছবি পত্রিকাতে আসছে খবর ছাপা হচ্ছে। আপনিও আমাদের সাথে যোগ দিন। আমার স্বামী উনার কথায় রাজি হয়নি বলে সম্পর্ক খারাপ হয়ে যায়। মাত্র ৮ বছরের ব্যবধানে আমি দেখতে পাই আমরাই সফল পরিবার। আর তথাকথিত সমিতির ঐ নেতা এখনো মানবেতর জীবন-যাপন করছেন। আমার প্রশ্ন হচ্ছে আপনারাও তো এসব নেতাদের অর্থের বিনিময়ে খবর ছাপছেন এবং মাথায় তুলে নাচছেন। প্রবাসে এসব সংগঠন করে কী লাভ বলুন’? উল্টো প্রশ্ন ছুড়ে দিলেন মিসেস সুমি।
এই দম্পতির কাছে প্রশ্ন ছিল আমাদের এখানকার সন্তানেরা কেন নিজে দেশিদের সাথে সংসার বাঁধতে অনীহা? তিনি জানান,‘আসলে এটা নির্ভর করে পারিবারিক শিক্ষার ওপর। অনেক বাবা মা বিশ্বাস করেন মেয়ে বড় হয়েছে সে এখানকার নাগরিক। তার জন্য প্রত্যাশা মাফিক পাত্র দরকার। বেশিরভাগ চান দেশি ছেলে হলেও কন্ডিশন হচ্ছে ডাক্তার অথবা ইঞ্জিনিয়ার। আমি এটা বিশ্বাস করি না। ভালো পাত্র, ভালো বংশের শিক্ষিত পাত্র হলে সমস্যা কোথায়? প্রত্যেক বাবা-মাই চায় সন্তানের মঙ্গল কিন্তু উচ্চাভিলাসী মনোভাব কখনো তার সমাধান হতে পারে না। তবে আমি আমার সন্তানদের বিয়ে ক্ষেত্রে প্রবাসি কোন রাজনীতিবিদ এবং সংগঠনের নেতা এবং এধরণের পরিবারে বিয়ে দেবো না।’
তবে বাংলাদেশি কমিউনিটির সাথে সম্পৃক্ত সবাই যে পরিবারের প্রতি উদাসীন তা কিন্তু নয়। অনেকেই আছেন সব কিছুর মাঝেও পরিবারের প্রাধান্য সবার আগে। সভা-সমিতির পাশাপাশি স্ত্রী-সন্তানদেরও সময় দিচ্ছেন। আলিশান বাড়ি নির্মাণ করে বসবাস করছেন। সন্তানদের পড়াচ্ছেন ভালো মানের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে। প্রবাসি অভিবাসি নিকট আত্মীয়দের বাসায় বেড়াচ্ছেন। ভেকেশন কিংবা ঈদ উদযাপন করছেন ভালো ভাবেই। ব্যবসায় সফলতাও রয়েছে। এরকম একজন ব্যবসায়ী বাংলা পত্রিকাকে জানান, ‘আসলে সভা-সমিতি কোন অপরাধ নয়। তবে একই এলাকার একাধিক প্রতিষ্ঠান শুধু আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠে সেটা ঠিক না। আমি মনে করি কমিউনিটির বৃহত্তর স্বার্থে যদি কোন সামাজিক, সাংষ্কৃতিক সংগঠন গড়ে উঠে সেটা দোষের নয়। শিক্ষামূলক প্রতিযোগিতার আয়োজন’সহ দেশের কৃষ্টি-কালচার নির্ভর কিছু সৃষ্টি হলে তার ভালো দিক ফুটে উঠবে আমাদের এ প্রজন্মের কাছে। যার প্রভাবে আমাদের সন্তানেরা একে অন্যের সাথে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক উন্নয়নে এগিয়ে যেতে পারবে’।
এ বিষয়ে কথা হয় কমিউনিটি একটিভিটস বেশ কয়েকজনের সাথে। আমাদের সময় ডটকমের সাথে আলাপকালে তারা বলেন, ‘আমাদের এখানে অনেক পাত্র আছেন যারা আমেরিকান সিটিজেন, ডিভি, প্রফেসনাল কিংবা ইমিগ্র্যান্ট হয়ে আসা এসব পাত্র এখানকার পাত্রীকে সংসার জীবনে চান না। এর কারণ হচ্ছে বেশির ভাগই স্কুল জীবনে খোলামেলা চলাফেরা কিংবা উন্মুক্ত মেলামেশা। তাদের মতে, অনেক মেয়েই স্টুডেন্ট ভিসা নিয়ে দীর্ঘদিন এখানে বসবাস করছেন, অথচ তাদের বৈধ কাগজ পত্র নেই। কিন্তু তাদের কোন বৈধ বাংলাদেশি ছেলের সাথে বিয়ে হলে সমস্যা মিটে যায়। যা ইন্ডিয়ান, পাকিস্তানি বিশেষ করে চীনাদের মধ্যে বেশ প্রচলিত। একই অবস্থা ছেলেদের ক্ষেত্রেও। পারিবারিক বন্ধন, পারস্পারিক বিশ্বাস এবং সামাজিক-সাংস্কৃতিক দায়বদ্ধতা প্রবাসি বাংলাদেশিদের মাঝে নেই বললেই চলে।
আমাদের সময় ডটকমের আলাপ কালে আরেকজন একজন প্রবাসি বলেন, বর্তমানে আমাদের কমিউনিটিতেও একাধিক বিয়ে এবং বিবাহবহির্ভূত সম্পর্ক বেড়েছে। কারো স্বামী কিংবা স্ত্রী দেশে তিনি আরেকজনের সাথে সম্পর্কে জড়িয়ে পড়ছেন। আবার কেউ মিথ্যে প্রলোভন দিয়ে বিয়ে করে বউকে নিয়ে আসছেন ঠিকই সম্পর্ক রাখছেন অন্যদের সাথে। তাই প্রবাসে শুধুমাত্র পদ-পদবি নিয়ে নয়; কমিউনিটির নেতাদের উচিত শিক্ষামূলক মেলার আয়োজন করা। পাশাপাশি ইসলামী মূল্যবোধে সেই যে ধর্মের হোক না কেন প্রত্যেক ধর্মে আদর্শিক কিছু দিক আছে তা তুলে ধরা উচিত এখানকার তৃতীয় প্রজন্মের কাছে। এটা এখন সময়ের দাবি। এছাড়াও বিদেশি নয়; দেশি ছেলে-মেয়েদের ছোট বেলা থেকেই মেলামেশা তথা খেলাধুলার সুযোগ গড়ে তোলা অতি জরুরি। সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, যুক্তরাষ্ট্রে তৃতীয় প্রজন্মকে এসব থেকে বিরত রাখতে সবচে বেশি দরকার বাবা-মায়ের পারিবারিক বন্ধন। এছাড়াও দেশের কৃষ্টি-কালচারের পাশাপাশি ইসলামী মূল্যবোধে বিশ্বাসী করে গড়ে তোলা।

বিজ্ঞাপন / স্পন্সরড কন্টেন্ট
ট্যাগ:
সর্বশেষ সংবাদ