নিউইয়র্কের জ্যাকসন হাইটসের বাউল দাদা দেশে চলে যাচ্ছেন
ইউএসএনিউজঅনলাইন.কম ডেস্ক : দীর্ঘ ৩৮ বছর পর জ্যাকসন হাইটসের বাউল দাদা দেশে চলে যাচ্ছেন। জীবনের শেষ সময়টুকু বাংলাদেশে পরিবারের সাথে কাটাতে চান তিনি। দিনক্ষণ চূড়ান্ত না হলেও আগামী কয়েক মাসের মধ্যেই বাংলাদেশে ফিরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন বাউল দাদা খ্যাত অশীতিপর আহমেদ সারোয়ার।
নিউইয়র্কে বাংলাদেশী অধ্যুষিত জ্যাকসন হাইটসের ৭৩ স্টিটে ব্যস্ত এলাকায় বহু বছর ধরে রাস্তার ধারে ঝালমুড়ি আর পান বিক্রি করে সবার নজর কেড়েছেন বাউল দাদা। রোদ-বৃষ্টি-শীত-বরফ উপেক্ষা করে বছরের পর বছর বাংলাদেশ প্লাজার সামনের জায়গাতে বাউল দাদার সরব অবস্থান। এই প্রবাসে তিন-চার ফুট পরিসরের এই খোলা জায়গাটিই যেন বাউল দাদার আপন আস্তানা। তবে তার এই প্রিয় স্থানটিতে সব সময় নিরাপদ-নিশ্চিন্তে থাকতে পারেনেনি তিনি। তার জন্য পোড়াতে হয়েছে অনেক কাঠ খোড়। কখনও কখনও তার ওপর নেমে এসেছে প্রশাসনের খড়গ। স্বদেশীরা তার প্রতিপক্ষ হয়েছেন কেউ কেউ। ফুটপাথ থেকে বারবার উচ্ছেদের শিকার হয়েছেন তিনি। ঝালমুড়ি ও পান বিক্রির সরঞ্জাম কেড়ে নিয়ে গেছে প্রশাসনের লোকজন। কমিউনিটি নেতৃবৃন্দ, নাগরিক অধিকার আন্দোলনের কর্মীদের সহায়তায় আবার তা ফিরেও পান তিনি। অনেক ঝড় ঝাপটা উপেক্ষা করেও এখনো ৭৩ স্ট্রিটের ওই জায়গাটুকু আঁকড়ে ধরে আছেন বাউল দাদা। দীর্ঘ সময় ধরে ৭৩ স্ট্রিটে ঝাল মুড়ি আর পান বিক্রি করছেন। এক সময়ে রেস্টুরেন্টে শেফের কাজ করেছেন। বৃদ্ধ বয়সে কেউ কাজে রাখতে চায় না। তাই বাধ্য হয়েই রোদ-বৃষ্টি-ঝড়, প্রচন্ড গরম ও ঠান্ডার মধ্যেও সপ্তাহে সাত দিন ঠায় দাঁড়িয়ে থেকে এ ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছেন।
বাউল দাদা খ্যাত আহমেদ সারোয়ার জানান, দীর্ঘ ৩৮ বছরের একাকী প্রবাস জীবনের অবসান ঘটিয়ে স্বেচ্ছায় দেশে ফিরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন তিনি। যুবক বয়সে উন্নত জীবনের স্বপ্ন নিয়ে তিনি আমেরিকায় এসেছিলেন। সে সময় কাজকর্মেরও সুযোগ ছিলো, পেয়েছিলেন ওয়ার্ক পাপরমিটও। কিন্তু পাননি এদেশে বসবাসের আইনি অধিকার। রাজনৈতিক আশ্রয় চেয়েছিলেন, তাতেও সফল হননি। শেষ জীবনে এসে ওয়ার্ক পারমিটও হারিয়েছেন আইনি জটিলতায় পড়ে। যে সোনার হরিণের জন্য এসেছিলেন সেটির নাগাল না পেয়ে অনেকটা মানবেতর জীবন যাপনকে বেছে নিতে হয়েছে তাকে। যে আমেরিকান স্বপ্নের জন্য স্ত্রী, সন্তানকে ছেড়ে আসলেন, সেই গ্রীণকার্ড নামক সোনার হরিণ না পেয়েই তাকে ফিরতে হচ্ছে নিজ দেশে। বললেন, এদেশে বেওয়ারিশভাবে মৃত্যুবরণ করতে চান না বাউল দাদা। জীবনের শেষ সময়টুকু স্ত্রী ও সন্তানদের সাথে কাটাতে চান। তার দেশে ফেরাসহ সব বিষয়ে সাহায্য করতে এগিয়ে এসেছে মানবাধিকার সংগঠন ড্রাম।
সানোয়ার আহমেদ ওরফে বাউল দাদার জন্ম সিলেটের মোলভী বাজারের দক্ষিণ বালিগ্রামে। বিয়ে করেছিলেন ১৯৭১ সালে। ৩৮ বছর আগে দালাল ধরে ভ্রমণ ভিসায় আমেরিকায় এসেছিলেন। সেই সময় দালালকে তিনি তিন লাখ টাকা দিয়েছিলেন। দেশে রেখে এসেছিলেন স্ত্রী ছায়া বেগম, দুই মেয়ে ছানারা বেগম, রায়না বেগম, ছেলে ছোবান মিয়া, পারভেজ মিয়া এবং মজনু মিয়া। এর মধ্যে ছেলে মজনু মিয়া নিখোঁজ রয়েছে। এক মেয়ের বিয়ে দিয়েছিলেন। ২০১১ সালে সড়ক দুর্ঘটনায় বড় মেয়ের স্বামী মারা যায়। সেই সময় তিনি অনুমতি নিয়ে বাংলাদেশে গিয়েছিলেন। ৩৮ বছরে এই একবারই স্ত্রী এবং সন্তানদের দেখার সুযোগ পেয়েছিলেন। দেশে ছিলেন সাড়ে ৪ মাস। আবারো চলে আসেন আমেরিকায়। অনেক দিন পর্যন্ত ওয়ার্ক পারমিট ছিলো, কিন্তু কয়েক বছর আগে তাও বাতিল হয়ে যায়। সিএসএস লুলাকে আবেদন করে অনেকে গ্রীণ কার্ড পেলেও তার ভাগ্যে তা জোটেনি। আবার কারো কারো পরামর্শে রাজনৈতিক আশ্রয়ও চেয়েছিলেন, কিন্তু তাতেও সফল হননি। বাউল দাদা জানান, ম্যানহাটানের ৬ স্ট্রিটের ক্যালকাটা রেস্টুরেন্ট, গান্ধি রেস্টুরেন্ট, রক ফেলার সেন্টারের বোম্বে মাসালায় শেফ হিসাবে কাজ করেছেন। পেনসিলভেনিয়া এবং মিনিসোটায় গান্ধিমহল রেস্টুরেন্টেও শেফের কাজ করেছেন তিনি। ৮ বছর আগে নিউইয়র্কে চলে আসেন। কাজ খুঁজেছেন, কিন্তু বয়সের কারণে কেউ তাকে কাজ দেয়নি। অবশেষে সংসার এবং জীবন চালাতে জ্যাকসন হাইটসের এ ফুটপাথে ঝালমুড়ি বিক্রি শুরু করেন সবার প্রিয় বাউল দাদা। জ্যাকসন হাইটসেরই একটি বেসমেন্টে থাকেন আরো কয়েকজনের সাথে শেয়ার করে।
তিনি জানান, এখন এই বুড়ো বয়সে খালি হাতে চলে যেতে হবে। দেশের বাড়িতে থাকার জন্য শুধু একটি ঘর করেছেন। তবে অন্যদের সহযোগিতায় পুরুষ ও মহিলাদের জন্য দুটো পৃথক মসজিদ করেছেন।
আহমেদ সারোয়ারের দেশে ফিরে যাওয়ার সব দায়িত্ব নিয়েছেন মানবাধিকার সংগঠন ড্রামের সাংগঠনিক পরিচালক কাজী ফৌজিয়া। তিনি জানান, বাউল দাদা জীবনের শেষ সময়টুকু বাংলাদেশে নিজ পরিবারের সাথে কাটাতে চান। তাই আমরাও তাকে সহযোগিতার সিদ্ধান্ত নিয়েছি। আগামী কয়েক মাসের মধ্যেই তিনি বাংলাদেশে চলে যাবেন।
বাউল দাদার বিদায়ের খবর শুনে অনেকেই আবেগপ্রবণ হয়ে উঠেছেন। তার সাথে দেখা করে তাদের সহানুভূতি জানাচ্ছেন।
এদিকে, বাউল দাদা দেশে যাওয়ার আগে সৃষ্টি করে যাচ্ছেন ইতিহাস। ব্রুকলিনের একটি মিউজিয়াম তার স্মৃতি সংরক্ষণের উদ্যোগ নিয়েছে। বাউল দাদার ব্যবহৃত খাটসহ অন্যান্য জিনিসপত্র যাচ্ছে ব্রুকলিনের ফুড এ্যান্ড ড্রিংকস মিউজিয়ামে। এগুলো সেখানেই সংরক্ষিত হবে। জানা গেছে, মিউজিয়াম কর্তৃপক্ষ ৩ জুলাই জিনিষপত্রগুলো তার কাছ থেকে গ্রহণ করে মিউজিয়ামে স্থায়ীভাবে সংরক্ষণের ব্যবস্থা করবে। কিভাবে এগুলো সংরক্ষিত হবে তার খসড়া নকশাও ইতোমধ্যে চূড়ান্ত হয়েছে। তার ৩৮টি বছর এদেশে বসবাস করেও বৈধ কাগজপত্র থেকে বঞ্চিত থাকার কাহিনী বিবৃত থাকবে এই মিউজিয়ামে। ২০ জুলাই সন্ধ্যা ৬ টায় মিউজিয়াম কর্তৃপক্ষ আয়োজন করবে বাউল দাদাকে নিয়ে একটি অনুষ্ঠানের। তিনি তার দৈনন্দিন কার্যক্রম কিভাবে পরিচালিত হতো সেই বিবরণী উপস্থাপন করবেন ওই অনুষ্ঠানে। অনুষ্ঠান শেষ হবে রাত ১০টায়।
কাজী ফৌজিয়া জানান, বাউল দাদার জীবনী নিয়ে একটি ডমুনেন্টারি তৈরী করেছেন ব্রিটেন থেকে আসা মোহাম্মদ আলিয়া রসম। দীর্ঘদিন ধরেই ব্রিটেনে ইমিগ্রান্ট বাঙালিদের কৃষ্টি-কালচার এবং জীবনী নিয়ে কাজ করা আলিয়া রসম গত বছর আমেরিকায় এসেছিলেন। তখন তিনি বাউল দাদাকে নিয়ে একটি ডকুমেন্টারি তৈরী করেন। এই ডকুমেন্টারী ব্রুকলিনের মিউজিয়ামে ২০ জুলাইয়ের অনুষ্ঠানে প্রদর্শিত হবে।
- Rohingyas Want to Return Home, Bangladesh Tells UN
- এক দশক ধরে বিপুল সংখ্যক রোহিঙ্গাকে আশ্রয় দেওয়া দেশের জন্য টেকসই নয়, রোহিঙ্গারাও নিজ দেশে ফিরে যেতে চায় : জাতিসংঘে বাংলাদেশ
- Bangladesh and UN Women pledge closer cooperation to advance women’s empowerment and the WPS agenda
- নিউইয়র্কে চিটাগং অ্যাসোসিয়েশন অব নর্থ আমেরিকা (মাকসুদ-মাসুদ) এর সংবাদ সম্মেলনে কুৎসা রটানোর প্রতিবাদ
- নারীর ক্ষমতায়ন এবং নারী, শান্তি ও নিরাপত্তা এজেন্ডা এগিয়ে নিতে বাংলাদেশ ও ইউএন উইমেনের ঘনিষ্ঠ সহযোগিতার অঙ্গীকার
- State Minister for Foreign Affairs Urges Stronger Global Action to Protect Civilians, Uphold Humanitarian Law and Support Rohingya Repatriation
- বেসামরিক জনগণের সুরক্ষা, আন্তর্জাতিক মানবিক আইন সমুন্নত রাখা ও রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে জোরালো বৈশ্বিক পদক্ষেপের আহ্বান পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামার
- মহররম মাসের গুরুত্ব ও ফজিলত!