নিউইয়র্কে শ্রীকান্ত-জয়তীর দ্বৈরথ কিংবা একটি সন্ধ্যার গল্প…
হাসানুজ্জামান সাকী : আট মাস আগে ঠিক এই মঞ্চেই গান করেছিলেন তিনি। সেদিনও পরনে ছিল হলুদ পাঞ্জাবি। পার্থক্য শুধু এতটুকু- সেবার মঞ্চের পিছনে ছিলেন অর্ণা শীল। যুক্তরাস্ট্রের পিএইচডিধারী এই নারী শ্রীকান্তের সাজানো জীবনের নেপথ্যের কারিগর। এবার মঞ্চে পাশাপাশি জয়তী, সহশিল্পী। জয়তী পরেছিলেন নীল শাড়ি। আজ শ্রীকান্ত যদি হলুদ না পরতেন তবেই বরং বেমানান মনে হতো। নীলের সাথে হলুদটা বেশ মানানসই। এ নিয়ে খানিকটা রসিকতা করেই অনুষ্ঠান শুরু করলেন কলকাতার ধীমান সংগীতশিল্পী শ্রীকান্ত আচার্য্য। তাঁর সাথে মঞ্চ শেয়ার করছেন যিনি তিনি ওপারেরই দর্শক-শ্রোতাদের দারুণ প্রিয় শিল্পী জয়তী চক্রবর্তী।
২৪ জুলাই রোববার। ফ্লাশিং, নিউইয়র্ক। হিন্দু মন্দির কমিউনিটি সেন্টারের ঘড়িতে আটটা পেরিয়েছে মাত্র। আনন্দধ্বনির আয়োজনে আজকের যে অনুষ্ঠান সেই সংগঠনের চৌদ্দজন শিল্পী মঞ্চে এলেন। গাইলেন ‘আনন্দলোকে মঙ্গলালোকে বিরাজ সত্য সুন্দর…’ এবং ‘আমার মুক্তি আলোয় আলোয়…’। বৈশ্বিক বাস্তবতায় গান দুটি যথার্থ হয়ে উঠলো যেন। খানিক বাদে অনুষ্ঠানের উপস্থাপিকা গার্গী মুখার্জী যখন বললেন, চারিদিকে কেউ দেয়াল তুলে দিতে চায়, কেউ ছড়ায় অন্ধকার-উন্মাদনা, তখন বিষয়টি আরো পরিস্কার হয়। আয়োজক গোলাম সারওয়ার হারুন মঞ্চে এসে গার্গীর কথাকেই টেনে নিয়ে যান।
অনুষ্ঠানের নাম ‘কাল আজ ও আগামীকালের গান’। আর তাতে এ অন্ধকার তাড়াবার যত আয়োজন। দর্শক সারিতে তখন শ পাঁচেক অন্ধকারবিনাশী মানুষ, নি:শব্দ অপেক্ষায়Ñ কখন গেয়ে উঠবেন প্রিয় শিল্পীযুগল।
রবীন্দ্রনাথ দিয়ে যে শুরু হবে তা তো জানাই ছিল। শত শত দর্শকের মনের চাওয়াকে কেবল জেনে নিয়ে জয়তী চক্রবর্তী গাইলেন, ‘আমার পরাণ যাহা চায়…’। কণ্ঠ মেলালেন শ্রীকান্ত আচার্য্য। এই না হলে দ্বৈত সন্ধ্যা! এরপর সেই সন্ধ্যার আবেশে জড়ালেন সবাইÑ তারই গল্প বলছি।
সুন্দর দিনের প্রত্যাশায় জয়তীর কণ্ঠে এবার ‘সুখদিন নিশিদিন পরাধীন হয়ে ভ্রমিছ দীনপ্রাণে…’। শ্রীকান্ত আর কি গাইবেনÑ ধরলেন, ‘আজি ঝড়ের রাতে তোমার অভিসার, পরাণসখা বন্ধু হে আমার…’।
একেকটি গান শেষ হয় আর দুই শিল্পী কথা বলেন। তাতে কত কিছুই না জানা যায়। শ্রীকান্তকে আজকাল কলকাতায় নাকি ‘বিষু পাগল’ বলে ডাকেন কেউ কেউ। শ্রীকান্ত যখন গাইছিলেন তখনই জয়তীর মনে পড়ে ‘রক্ত করবী’ নাটকে রবীন্দ্রনাথ বিষু পাগলের কণ্ঠে যে গান তুলে দিয়েছিলেন সেই গান ‘তোমায় গান শোনাব তাই তো আমায় জাগিয়ে রাখ, ওগো ঘুম-ভাঙানিয়া…’।
ততক্ষণে রবীন্দ্রনাথে আচ্ছন্ন সবাই। তা ভাঙতেই যেন শ্রীকান্ত গাইলেন তাঁর বিখ্যাত হেমন্তের গান ‘কেন দূরে থাক শুধু আড়াল রাখ, কে তুমি কে তুমি আমায় ডাক…’। জানা গেল ‘শেষ পর্যন্ত’ ছবির এই গানটিতে ঠোঁট মিলিয়েছিলেন বিশ্বজিৎ চ্যাটার্জী। বাংলা ছবির এ সময়ের জনপ্রিয় নায়ক প্রসেনজিৎ চ্যাটার্জীর বাবা বিশ্বজিৎ ছিলেন সে সময়ে বাংলা ও হিন্দি ছবির নামকরা অভিনেতা।
শ্রীকান্ত বলতে থাকেন। বাংলা গানের, রবীন্দ্র সংগীতের প্রতি এই প্রেম তাঁকে কলকাতা কিংবা ঢাকার কথা মনে করিয়ে দেয়। আর একটা বিশেষ মিল খুঁজে পান। বাঙালির রসনা বিলাসে। এই সাত সমুদ্দুর তেরো নদী পেরিয়েও জয়তী যে খেয়েদেয়ে বেশ তৃপ্তির ঢেঁকুর তুলছেন তা ইনিয়ে বিনিয়ে হাসির ছলে জানিয়ে দেন শ্রীকান্ত। এ নিয়ে কপট রাগ দেখান জয়তী। যাই হোক, শ্রীকান্তের কাছে এসব কারণেই তাই নিউ ইয়র্ক বা নিউ জার্সিকে মনে হয় কলকাতা কিংবা ঢাকা।
ঢাকার প্রসঙ্গ যেহেতু এলোই, জয়তী তাই ঢাকার গান করেনÑ ‘ভালো আছি ভালো থেকো আকাশের ঠিকানায় চিঠি লিখো, দিও তোমার মালা খানি, বাউলের এই মনটারে, আমার ভিতরে বাহিরে অন্তরে অন্তরে আছো তুমি হৃদয় জুড়ে…’। বাংলাদেশের রুদ্র মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ সেই কবে ঢাকায় বসে যে গান লিখেছিলেন তা কলকাতায়ও ভীষণ জনপ্রিয়।
ঢাকা হলে কলকাতাই বা বাদ থাকবে কেন? কিংশুকের কথায় রূপঙ্করের সুরে তাই এ সময়ের ফোক ধাঁচের একটি গান জয়তীর কণ্ঠেÑ ‘মন মাঝিরে সোহাগ চাঁদ ভাসে যমুনায়…’।
এরপর শ্রীকান্তের কণ্ঠে চিরচেনা সেই গান ‘বধুয়া আমার চোখে জল এনেছে হায় বিনা কারণে…’।
রবীন্দ্রনাথের সুরে লালনের প্রভাবের কথা কেউ কেউ বলে থাকেন। জয়তীও বললেন, ‘কোথায় যেন রবীন্দ্রনাথ আর বাউল গানে মিল পাই।’ আবার রবীন্দ্রনাথে ফেরা হলো। জয়তী গেয়ে ওঠেন, ‘মাঝে মাঝে তব দেখা পাই, চিরদিন কেন পাই না…’। ওই যে বলছিলেন, বাউল গানের সাথে মিলের কথা। জয়তী তাই ধরেন, ‘ওরে ছেড়ে দিলে সোনার গৌর আমরা আর পাব না, তোমায় হৃদ মাঝারে রাখিবো ছেড়ে দেবো না…’। এই গান শুনতে শুনতেই শ্রীকান্ত পৌঁছে যান সেই পরমেশ্বরের কাছে। রবীন্দ্রনাথই যেন সেই পরমেশ্বর। সেই কবে দেবব্রত বিশ্বাস কিংবা ঋত্বিক কুমার ঘটক গেয়েছিলেন, আর বায়ন্ন বছর বয়সে গানটি লিখেছিলেন রবীন্দ্রনাথ, আজ সেই বয়সে এসেই শ্রীকান্ত গাইলেন সেই গানÑ ‘যে রাতে মোর দুয়ারগুলি ভাঙল ঝড়ে, জানি নাই তো তুমি এলে আমার ঘরে…’। এবার জয়তীরও একটি গান মনে পড়ে যায়। মনের গহীনে কার যেন আসা-যাওয়া টের পান তিনি। বললেন, ‘শ্রীকান্তদা’র গান ইমোশনাল করে দিয়েছে আমাকে।’ শ্রীকান্ত জুড়ে দিয়ে বলেন, ‘ইমোশন না থাকলে গান-বাজনার থাকলো কী!’
জয়তীর কণ্ঠে পরের গান ‘মেঘের পরে মেঘ জমেছে…’ শুনে দর্শক-শ্রোতারাই কী কেবল বিমোহিত হয়েছিলেন? শ্রীকান্ত যে বাড়িয়ে দিলেন মুগ্ধতার হাত! দুজন দুজনের হাত যেই ধরলেন, কিবোর্ডের কি’তে শুভেন্দু দাসের আঙুল পড়তেই সুর বেজে উঠল। হেসে দিলেন জয়তী। শ্রোতারাও ধরে ফেললেন। আর ধরতে পারবেনই না বা কেন? এ যে শ্রীকান্তেরই বিখ্যাত গান ‘আমার সারাাঁ দিন মেঘলা আকাশ, বৃস্টি তোমাকে দিলাম…’। এরপর সুধীন দাশগুপ্তের কথা ও সুরে শ্রীকান্ত যে গানটি ধরলেন ‘মহানগর’ ছবিতে তাতে কণ্ঠ মিলিয়েছিলেন উত্তম কুমারÑ ‘কে প্রথম কাছে এসেছি, কে প্রথম চেয়ে দেখেছি, কিছুতেই পাই না ভেবে, কে প্রথম ভালবেসেছি, তুমি না আমি…’। ঘটনাচক্রে এদিনটিই মহানায়কের মহাপ্রস্থানের দিন, তা জেনে আরো বেশি আপ্লুত হলেন দর্শক-শ্রোতা।
এবার খানিক বিরতি নিতে হল। ফিরে এসে উত্তম কুমারেই থাকলেন শ্রীকান্তÑ ‘এই পথ যদি না শেষ হয়, তবে কেমন হতো তুমি বল তো…’ কিংবা হারানো সুর ছবির গান ‘তুমি যে আমার ওগো তুমি যে আমার…’।
এতো সহজ কথা, সহজ সুর তবুও কী তুমুল জনপ্রিয় এ গানগুলো। শ্রীকান্ত জানালেন, একবার কিশোর কুমারকে কেউ একজন জিজ্ঞেস করেছিলেনÑ ‘গান কিভাবে হিট হয়?’ জবাবে কিশোর বলেছিলেন, ‘হিট হোতি নেহি, হিট বানজাতা হ্যায়।’
হেমন্ত-উত্তম জুটির গান চলছেই। শ্রীকান্ত গাইছেনÑ ‘এই যে পথের এই দেখা, হয়তো পথেই শেষ হবে, তবুও হৃদয় মোর বলে, সঞ্চয় কিছু যেন রবে…’।
শ্রীকান্ত নিজেই বলেন, ‘এগুলো বিষাক্ত সুর। এমন ভাবে আক্রান্ত হই, আক্রান্ত করে ফেলে যে এর থেকে প্রতিকার পাওয়া কঠিন।’ প্রতিকার পেতেও যেন মন চায় না শ্রোতাদের। রাত যে এগারটা ছুই ছুই, কারো যে সে খেয়াল নেই! শ্রীকান্ত যেন বুঝে-শুনেই মোক্ষম ছোবলটা মারেনÑ ‘নয় থাকলে আরো কিছুক্ষণ, নয় রাখলে হাতে দুটি হাত, নয় ডাকলে আরো কিছু কাছে, দেখ জোছনা ভেজা এই রাত…’, এরপর আরো গেয়ে উঠেন তিনি মান্না দে’র ‘আমি যে জলসা ঘরে…’।
মাঝে দুজন কয়েকটি হিন্দি গানও গেয়ে শোনালেন। শ্রীকান্ত একটি হিন্দি গানের টান দিলে জয়তী গেয়ে ওঠেন ‘লাম্বি জোদাই…’। তা শেষ হতেই শ্রীকান্ত আবার ধরেন ‘আ হিসতা আ হিসতা…’।
আবারো স্বাদ বদল। শ্রীকান্ত বললেন, তারা তিন ভাই- শ্রীকান্ত, জয় ও সৃজাত। তিনজনেরই পছন্দ গজল। জয় মিউজিক করছে। সৃজাত কলকাতার এখন বিখ্যাত কবি, গীতিকার, চিত্রনাট্যকার। গজলের ফর্মটুকু ঠিক রেখে সৃজাত কিছু গান লিখেছেন। শ্রীকান্ত তার দুয়েকটি যখন গেয়ে শোনাচ্ছিলেন তখন এ শহরেরই কাছে কোথাও সৃজাত ছিলেন। এ মাসেই অনুষ্ঠিত বঙ্গ সম্মেলনে এসে এখন ঘুরে বেড়াচ্ছেন কাছে-দূরে। স্বাদ যখন বদল হলোই তখন গজল-ধাঁচ থেকে ফোকে গেলেন জয়তী। তিনি গাইলেন, সিলেটের রাধা রমনের বিখ্যাত গান ‘ভ্রমর কইও গিয়া শ্রী-কৃষ্ণ বিচ্ছেদের অনলে অঙ্গ যায় জ্বলিয়ারে ভ্রমর কইও গিয়া…’। এরপর ‘তুই ফেলে এসেছিস কারে, মন, মনরে আমার…’। জয়তী যখন আবার গেয়ে ওঠেন, ‘ভেবেছিলেম ঝরবে না আর আমার চোখের জল’ তার পরের লাইনটা ধরেন শ্রীকান্তÑ ‘হঠাৎ দেখা পথের মাঝে, কান্না তখন থামে না যে…’, এরপর দুজনই একসঙ্গে গেয়ে ওঠেন, ‘যখন ভাঙল মিলন মেলা…’। রাত তখন সাড়ে এগারটা পেরিয়েছে।
আসর যখন ভেঙেই দিলেন তখন আর গান চলে না। তবুও, ওই যে শুরুতে, আনন্দধ্বনির শিল্পীদের গানে গানে আর গার্গী-হারুন যুগলের সুন্দর পৃথিবী দেখার স্বপ্ন নিয়ে শুরু হয়েছিল অনুষ্ঠান, শেষও হলো সেই প্রত্যয় নিয়েইÑ ‘আগুনের পরশমনি ছোঁয়াও প্রাণে, এ জীবন পুণ্য কর দহন দানে…’।
নিজে পুণ্য হলেই তো জগতের মঙ্গল।
পরিশিস্ট:
শ্রীকান্ত আচার্য্য ও জয়তী চক্রবর্তীর দ্বৈত সংগীত সন্ধ্যায় যন্ত্রানুসঙ্গে ছিলেনÑ তবলায় সুবীর চক্রবর্তী, গিটারে সুব্রত ব্যানার্জী, কি-বোর্ডে শুভেন্দু দাস, অক্টোপ্যাডে সৌমেন দাস ও বেইজ গিটারে তন্ময় শী। শুরুতে কিছুটা সময় তবলা এবং অক্টোপ্যাডে খানিকটা সমস্যা দেখা দিলেও পুরো আয়োজনে চমৎকার সাউন্ড করেছেন তানভীর শাহীন। সুন্দর সাউন্ডের জন্য প্রস্তুতিতেও পর্যাপ্ত সময় রাখা চাইÑ এটা আয়োজকদের বিবেচ্য হওয়া উচিত। সবচেয়ে ক্রিস্টাল ক্লিয়ার ছিল শ্রীকান্ত-জয়তীর ভয়েজ। তাই তারা দুজনেই মঞ্চে ডেকে এনে বিশেষ ধন্যবাদ দিলেন শাহীনকে। অনুষ্ঠানে ইভেন্ট ম্যানেজমেন্টের দায়িত্বে ছিলেন কামাল হোসেন মিঠুর নেতৃত্বে আনন্দধ্বনি ও ঢাকা ড্রামার সদস্যরা। তাদের স্বেচ্ছাশ্রম অনুষ্ঠানটিকে সুন্দর ও পরিচ্ছন্ন করেছে। আয়োজনে মিডিয়া পার্টনার ছিল আজকাল, বাঙালী ও টিবিএন২৪।আজকাল
- নিউইয়র্কে ন্যাশনাল ইমিগ্র্যান্টস ডে উদ্যাপন; বিভিন্ন ক্ষেত্রে অবদানের স্বীকৃতি, সাত বিশিষ্ট ব্যক্তিকে সম্মাননা প্রদান
- জাতিসংঘে বাংলাদেশের কূটনৈতিক সাফল্য; এলডিসি উত্তরণের প্রস্তুতিকাল বাড়ল আরও ৩ বছর
- নিউ জার্সিতে উৎসবমুখর পরিবেশে দুর্গাপূজা উদযাপিত
- নিউইয়র্কের জেএমসির সম্প্রসারণ প্রকল্প রমজানের আগেই সম্পন্নের প্রত্যাশা, ফান্ডরেইজিংয়ে প্রায় ১০ লাখ ডলার সংগ্রহ, বাকি প্রয়োজন আরও ২০ লাখ
- New York Attorney General James Secures More Than $480,000 and Debt Relief for New York Homeowners
- এই জীবন চিরস্থায়ী নয়, একদিন মরে যাবো
- নিউইয়র্কে বাংলাদেশ সোসাইটির নির্বাচন নিয়ে অনিশ্চয়তা আরও বেড়েছে; ১৭ ডিসেম্বর উভয় পক্ষকে তথ্য-উপাত্ত জমার নির্দেশ
- নিউইয়র্কে নৃত্যশিল্পী ও সাংস্কৃতিক সংগঠক তাহসিন ফেরদৌসের অকালমৃত্যু, বাংলাদেশি কমিউনিটিতে শোকের ছায়া