বাংলাদেশের রাজনীতিতে পরষ্পরের প্রতি শ্রদ্ধাবোধের যে অভাব তা মোটেই কাম্য নয় : নিউইয়র্কে আ ফ ম মাহবুবুল আলমের শোক সভায় ড. আলী রিয়াজ
ইউএসএনিউজঅনলাইন.কম ডেস্ক, নিউইয়র্ক : মহান মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠন, বাংলাদেশ সমাজতান্ত্রিক দল (বাসদ) একাংশের আহ্বায়ক আ ফ ম মাহবুবুল হক স্মরণে আয়োজিত সর্বজনীন শোক সভায় বক্তারা বলেছেন, মহান মুক্তিযুদ্ধ সহ অনেক জাতীয় ইস্যুতে ঐক্যমত না হওয়ায় স্বাধীনতার ৪৬ বছরেও বাংলাদেশের জনগনের প্রত্যাশা অর্জিত হয়নি। আর প্রয়াত মাহবুবুল হকদের মতো নেতারা যথাযথ মর্যাদা পাননি বলেই বাংলাদেশে দূরবস্থা বিরাজমান। বক্তারা বলেন, আ ফ ম মাহবুবুল হক ছিলেন একজন মেধাবী, সৎ, ব্যক্তিত্ব সম্পন্ন আদর্শবান নেতা। তিনি কখনো ব্যক্তিগত স্বার্থ বা ক্ষমতার স্বাদকে বড় করে দেখেননি। ছিলেন সাহসী আর অনলবর্শী বক্তা। তিনি আজীবন মানুষের মুক্তির জন্য সংগ্রাম করে গেছেন, কমিটমেন্টের রাজনীতি করেছেন। তার মৃত্যুতে দেশ ও জাতি একজন সত্যিকারের আদর্শবান নেতাকে হারিয়েছে। বক্তারা তার বিপ্লবের আদর্শ নিজেদের মধ্যে চর্চার পাশাপাশি নতুন প্রজন্মের মাঝে ছড়িয়ে দেয়ার উপর গুরুত্বারোপ করেন।
সদ্য প্রয়াত আ ফ ম মাহবুবুল হক স্মরণে যুক্তরাষ্ট্র প্রবাসী বাংলাদেশীদের উদ্যোগে নিউইয়র্কের জ্যাকসন হাইটসের জুইস সেন্টার মিলনায়তনে গত ২ ডিসেম্বর শনিবার সন্ধ্যায় আয়োজিত সর্বজনীন শোক সভায় সভাপতিত্ব করেন বাসদ ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় সংসদের সাবেক সভাপতি শাহাব উদ্দীন। সভায় প্রধান আলোচক ছিলেন বিশিষ্ট লেখক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক, ইলিয়ন ষ্টেট ইউনিভার্সিটির রাজনীতি ও সরকার বিভাগের অধ্যাপক ড. আলী রিয়াজ। অন্যান্য আলোচক ছিলেন প্রবীণ সাংবাদিক সৈয়দ মোহাম্মদ উল্লাহ ও মাহবুবুর রহমান, সাপ্তাহিক ঠিকানা’র প্রধান সম্পাদক মুহাম্মদ ফজলুর রহমান ও বাসদ ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় সংসদের সাবেক ভারপ্রাপ্ত সভাপতি মোহাম্মদ সিরাজ উদ্দিন। খবর ইউএনএ’র।
সভার শুরুতে প্রয়াত আ ফ ম মাহবুবুল হক সহ মহান মুক্তিযুদ্ধে সকল শহীদদের বিদহী আতœার শান্তি কামনায় দাঁড়িয়ে এক মিনিট নিরবতা পারণ করা হয়। শোক সভায় প্রয়াত মাহবুবুল হকের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জনিয়ে অন্যান্যের মধ্যে আলোচনায় অংশ নেন সাপ্তাহিক আজকাল সম্পাদক মনজুর আহমদ, সাপ্তাহিক বাংলা পত্রিকা সম্পাদক ও টাইম টেলিভিশন-এর সিইও আবু তাহের, যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধা আবু তালেব, বাংলাদেশ সোসাইটি’র সাবেক সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ হোসেন খান, সৈয়দ টিপু সুলতান ও ফখরুল আলম, অধ্যাপক আবুল কালাম আজাদ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলামনাই এসোসিয়েশনের সাবেক সভাপতি একে আজাদ তালুকদার, জসিম উদ্দিন ও তাজুল ইসলাম, কমিউনিটি নেতা এমাদ চৌধুরী, এডভোকেট মজিবুর রহমান, এডভোকেট মুজিবুর রহমান, খন্দকার ফরহাদ, জামান তপন, সাংবাদিক-লেখক আহমেদ মাজহার, জালালাবাদ এসোসিয়েশন অব আমেরিকা’র সাবেক সাধারণ সম্পাদক মঈনুল হক চৌধুরী, সাংবাদিক মুজাহিদ আনসারী, প্রগ্রেসিভ ফোরামের জাকির হোসেন, মোশাররফ আলী, অরূন দাস গুপ্ত প্রমুখ। এছাড়াও স্বরচিত কবিতা পাঠ করেন সাংবাদিক ইব্রাহীম চৌধুরী খোকন। অনুষ্ঠান উপস্থানায় ছিলেন গাজী সামসুদ্দীন ও সাঈদা আক্তার লিলি।
সভায় ড. আলী রিয়াজ প্রয়াত মাহবুবুল হককে গভীর শ্রদ্ধায় স্মরণ করে বলেন, বাংলাদেশের রাজনীতিতে পরষ্পর পরষ্পরের মতামতের প্রতি শ্রদ্ধাবোধের যে অভাবের সংস্কৃতি চলছে তা মোটেই কাম্য নয়। এই সংস্কৃতি থেকে আমাদেরকে বেরিয়ে আসতে হবে। বিরোধী মতকে সম্মান জানাতে হবে, শ্রদ্ধা জানাতে হবে। তিনি বলেন, আমরা যে যেই আদর্শ বিশ্বাস বা লালন করি না কেন, সেই আদর্শকে জীবনের সকল ক্ষেত্রেই বাস্তবায়িত করতে হবে। তিনি বলেন, বাংলাদেশে কমিটমেন্টের রাজনীতির বড় প্রয়োজন। মাহবুবুল হক কমিটমেন্টের রাজনীতি করেছেন। রাজনীতিতে কৌশলগত পরিবর্তন হবে পারে, কিন্তু কমিটমেন্ট থাকতে হবে। তিনি বলেন, সবার সাথেই যে আমাদের মতের মিল থাকবে, আদর্শ ঠিক থাকবে তা নয়, কিন্তু কিছু কিছু জাতীয় স্বার্থে কিছু কিছু মৌলিক প্রশ্নে ঐক্যমতে আসতে পারতাম, তাহলে অনেক বিভক্তিকেই দূর করা যেতো। তিনি বলেন, আমাদের পার্থক্যগুলোকে বড় করে না দেখে, মিল আর কমিটমেন্টের জায়গাগুলো বড় করে দেখা উচিৎ।
সৈয়দ মোহাম্মদ উল্লাহ তার বক্তব্যে মাহবুবুল হকের মতো মানুষদের স্মরণ সভায় বক্তার সংখ্যা কম করে অতিথি আলোচকদের বক্তব্য রাখার সুযোগ করে দেয়ার উপর গুরুত্বারোপ করে বলেন, তাতে আলোচনা যেমন সমৃদ্ধ হবে, তেমনী সংশ্লিষ্টদের সম্পর্কে আমরা ভালো করে জানতে পারবো। প্রসঙ্গত তিনি বলেন, কেন জাসদ-এর সৃষ্টি হলো, পরবর্তীতে কি কি ঘটলো তা বিচার-বিশ্লেষনের দাবী রাখে।
মাহবুবুর রহমান বলেন, মাহবুবুল হক কখনো হালুয়া-রুটির ভাগাভাগি বা ক্ষমতায় যাওয়ার সুবিধাবাদীর রাজনীতি করেননি। তিনি ছিলেন, সৎ, আদর্শবাদী, ত্যাগী, বিপ্লবী রাজনীতিক। অথচ তার অনেক সহযোগী রাজনীতিকরা সুবিধাবাদীর রাজনীতি করছেন, যা দু:খজনক। প্রসঙ্গত তিনি বলেন, তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনু কানাডার টরন্টো সফর করার সময় মন্ত্রীর সতির্থরা অসুস্থ মাহবুবুল হককে দেখতে যাওয়ার কথা বলতে তিনি (মন্ত্রী) দেখতে যাননি। এই খবরে আমি খুব কষ্ট পেয়েছি।
মুহাম্মদ ফজলুর রহমান বলেন, আদর্শের কথা বলা যত সহজ, তা গ্রহণ করা তত সহজ নয়। আমরা আদর্শের কথা বলি, অথচ আদর্শ ধারণ করি না। তিনি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ঐতিহাসিক সাতই মার্চের ভাষণের কথা উল্লেখ করে বলেন, তাঁর ভাষণে স্বাধীনতা আর মুক্তির কথা বলেছেন। কেন বলেছেন, তা ভাবতে হবে। স্বাধীনতা পেলেই যে মুক্তি আসবে তার কোন গ্যারান্টি নেই। তিনি বলেন, মহান মুক্তিযুদ্ধের কথা বলে মাহবুবুল হকরা কখনো মন্ত্রী হননি।
মোহাম্মদ সিরাজ উদ্দিন বলেন, তার অনুপস্থিতিতে বাসদ ছাত্রলীগের ভারপ্রাপ্ত সভাপতির দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে মাহবুবুল হককে খুব কাছে থেকে দেখার সুযোগ হয়েছে। তার মতো নেতা হয় না। তিনি একজন মেধাবী ছাত্রনেতা ও রাজনীতিক ছিলেন। সিরাজ উদ্দিন তার বক্তব্যে মাহবুবুল হকের জীবনের বিভিন্ন দিক তুলে ধরে বলেন, মেধাবী ছাত্র হিসেবে তাঁর বাবা তাকে সিএসপি অফিসার হিসেবে দেখতে চেয়েছিলেন। কিন্তু তিনি সেই পথ ছেড়ে রাজনীতির পথ ধরেছিলেন।
মনজুর আহমেদ বলেন, মাহবুবুল হক ছিলেন একজন আদর্শবাদী মানুষ। যে আদর্শ সারাজীবন লালন করেছেন। তার আদর্শই আমাদেরকে সঠিক পথ দেখাতে পারে। বাংলাদেশের বর্তমান রাজনীতির প্রেক্ষপটে মাহবুবুল হকের আদর্শ আর নীতির রাজনীতির কারণে তাকে স্যালুট জানাতেই হবে।
আবু তাহের বলেন, বাংলাদেশে রাজনীতি আছে কিন্তু নীতি নেই। তিনি বলেন, কথায় বলে ‘রাজনীতিতে শেষ কথা বলে শেষ নেই’ এটি ঠিক নয়। আ ফ ম মাহবুবুল হক ছিলেন আমাদের চেতনার পুরুষ। মাহবুবুল হকরা সব সময় নীতির কথাই বলেছেন, আদর্শে অবিচল থেকেছেন। যা আমাদেরকে অনুপ্রাণিত করে। তিনি বাংলাদেশের রাজনীতিতে ‘আদর্শবান রাজনীতিকের প্রতীক’।
মোহাম্মদ হোসেন খান বলেন, আদর্শের রাজনীতির জায়গায় প্রয়াত মাহবুবুল হক ছিলেন নম্বার ওয়ান। তাকে বাঁচিয়ে রাখতে হলে তার রাজনৈতিক কর্মকান্ডকে বাঁচিয়ে রাখতে হবে। তিনি বলেন, বাংলাদেশকে সবার বাংলাদেশে পরিণত করতে হলে চায়নাপন্থী, মস্কোপন্থী, ভারতপন্থী, বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্র এসব বাদ দিয়ে সবাইকে এক হতে হবে। আমাদের তীর্থ জায়গা হচ্ছে শোষণহীন সমাজ ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা। সেই লক্ষ্যে সবাইকে এক হয়ে কাজ করতে হবে। তিনি বলেন, অমাদের লক্ষ্যে পৌঁছার জন্য তাত্বিক কোন সমস্যা নেই, সমস্যা কৌশলগত। তাঁকে যথাযথ সম্মান দেখাতে হলে তার আদর্শ বাস্তবায়ন ছাড়া অন্য কোন পথ নেই।
সৈয়দ টিপু সুলতান বলেন, মাহবুবুল হক শোসণহীন সমাজ কায়েমের জন্য তিনি সারাজীবন সংগ্রাম করেছেন। তার সংগ্রাম বৃথা হতে পারে না। তিনি তার বক্তব্যে মাহবুবুল হককে একজন মানবতাবাদী নেতা হিসেবে উল্লেখ করেন এবং কানেকটিকাট বিশ্ববিদ্যালয়ে জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের স্মরণে চেয়ার প্রতিষ্ঠায় সবার সহযোগিতা কামনা করেন।
ফখরুল আলম বলেন, প্রয়াত মাহবুবুল হক সাহসী আার নির্ভিক মানুষ ছিলেন। তিনি তার রাজনৈতিক জীবনে কমিটমেন্ট থেকে একচুলও নড়েননি। আমরা মুখ এক কথা বলি, চিন্তায় আরেকটা করি। আসলে আমরা পলায়নপর, সুবিধাবাদী মানুষ।
অধ্যাপক আবুল কালাম আজাদ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে তার সাথে মাহবুবুল হকের স্মৃতিচারণ করেন।
সভাপতির বক্তব্যে শাহাব উদ্দীন বলেন, প্রয়াত অ ফ ম মাহবুবুল হক আমাদের কাছে থাই পাহাড়ের চেয়েও ভারী। তিনি শোককে শক্তিতে পরিণত করে মাহবুবুল হকের আদর্শে লড়াই করার জন্য সবার প্রতি আহ্বান জানান।
- নিউইয়র্কে বহির্বিশ্বের সবচেয়ে বড় মুসলিম করবস্থান স্কচটাউন বাংলাদেশ সেমিট্রির যাত্রা শুরু
- নিউইয়র্কে মুন্সিগঞ্জ-বিক্রমপুর অ্যাসোসিয়েশনের বর্ণিল অভিষেক
- Bangladesh Calls for Stronger Support for LDCs Ahead of Doha Midterm Review
- নিউইয়র্কে জাতিসংঘে স্বল্পোন্নত দেশগুলোর জন্য আরও আন্তর্জাতিক সহায়তার আহ্বান জানিয়েছে বাংলাদেশ
- Rohingyas Want to Return Home, Bangladesh Tells UN
- এক দশক ধরে বিপুল সংখ্যক রোহিঙ্গাকে আশ্রয় দেওয়া দেশের জন্য টেকসই নয়, রোহিঙ্গারাও নিজ দেশে ফিরে যেতে চায় : জাতিসংঘে বাংলাদেশ
- Bangladesh and UN Women pledge closer cooperation to advance women’s empowerment and the WPS agenda
- নিউইয়র্কে চিটাগং অ্যাসোসিয়েশন অব নর্থ আমেরিকা (মাকসুদ-মাসুদ) এর সংবাদ সম্মেলনে কুৎসা রটানোর প্রতিবাদ