বাংলাদেশে দুর্নীতির শীর্ষে রাজনৈতিক দল, পুলিশ ও বিচার বিভাগ
বাংলাদেশে দুর্নীতি বেড়েছে এবং রাজনৈতিক দলগুলো ও পুলিশ বিভাগ সবচেয়ে দুর্নীতিগ্রস্ত। এর পরই রয়েছে বিচার বিভাগের নাম। গত দুই বছরে বাংলাদেশে দুর্নীতি বেড়েছে বলে ৬০ শতাংশ মানুষ ধারণা করে। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল অব বাংলাদেশ (টিআইবি)-এর প্রতিবেদন বলছে, ৯৩ শতাংশ তথ্যদাতার ধারণায় বাংলাদেশে সর্বোচ্চ দুর্নীতিপ্রবণ প্রতিষ্ঠান হলো রাজনৈতিক দল। টিআইবি’র প্রতিবেদনে এই প্রথম রাজনৈতিক দল দুর্নীতিতে সর্বোচ্চ ধাপে উঠে এসেছে। এছাড়া দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে সরকারি সেবা গ্রহণে কোন না কোন একটি সেবায় ঘুষ বা নিয়মবহির্ভূত অর্থ দেয়া হয় ভারতে। এ অবস্থানে বাংলাদেশ দ্বিতীয় অবস্থানে। গতকাল ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল (টিআই)-এর ‘গ্লোবাল করাপশন ব্যারোমিটার ২০১২’- শীর্ষক এক প্রতিবেদনে এ তথ্য প্রকাশ করা হয়। এদিন বিশ্বব্যাপী একযোগে প্রকাশিত হয় গ্লোবাল করাপশন ব্যারোমিটার। এ উপলক্ষে বাংলাদেশেও ব্র্যাক সেন্টারে টিআইবি বাংলাদেশ এ সংক্রান্ত প্রতিবেদন প্রকাশ করে। এদিকে প্রতিবেদনটি তৈরি করতে প্রতিষ্ঠানটির ২১ লাখ টাকা ব্যয় হয়েছে বলে জানানো হয়। প্রতিবেদনে বলা হয়, ধারণার বিচারে বাংলাদেশে দুর্নীতি সার্বিকভাবে বেড়েছে তবে প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা অনুযায়ী সরকারি সেবাখাতে ঘুষ দেয়ার হার ‘সামান্য’ কমেছে। টিআইবি জানায়, বাংলাদেশের ৬০ শতাংশ উত্তরদাতার ধারণায় ২০১১-১২ সালে বাংলাদেশে দুর্নীতি বেড়েছে। তবে একই জরিপে তথ্যদাতাদের ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী ২০১০ সালের তুলনায় সরকারি ৮টি সেবা খাতে ঘুষের হার কিছুটা কমেছে। এই ৮টি খাত হলো: পুলিশ, বিচার ব্যবস্থা, ভূমি-সেবা, রেজিস্ট্রেশন ও পারমিট সেবা, স্বাস্থ্য ও চিকিৎসা, শিক্ষা, পরিষেবা ও কর। বার্লিনভিত্তিক টিআই ১০৭টি দেশের ১ লাখ ১৪ হাজার ২৭০ জনের ধারণা ও অভিজ্ঞতার ওপর এই জরিপ পরিচালনা করে। বাংলাদেশে ১৮২২টি খানার নির্বাচিত তথ্যদাতাদের কাছ থেকে ১৩ই ফেব্রুয়ারি থেকে ১৫ মার্চ পর্যন্ত তথ্য সংগৃহীত হয়। সংবাদ সম্মেলনে বৈশ্বিক প্রতিবেদনের বাংলাদেশের অবস্থান তুলে ধরেন টিআইবি’র গবেষণা ও পলিসি বিভাগের পরিচালক রফিকুল হাসান এবং প্রোগ্রাম ম্যানেজার শাহনূর রহমান। অনুষ্ঠানে অন্যান্যের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন টিআইবি’র নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান ও উপ-নির্বাহী পরিচালক ড. সুমাইয়া খায়ের। ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, বাংলাদেশের জন্য আশার বিষয় হচ্ছে- জনগণ দুর্নীতির বিরুদ্ধে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণে আগ্রহী। কিন্তু তারা এ বিষয়ে সরকারের কাছ থেকে সক্রিয় সাড়া বা সহযোগিতা পাচ্ছে না। আমরা মনে করি জনগণ, সরকার এবং রাজনীতিবিদদের সক্রিয় অংশগ্রহণের মাধ্যমেই বাংলাদেশের দুর্নীতি প্রতিরোধ সম্ভব। রাজনৈতিক দলগুলো দুর্নীতিগ্রস্ত হিসেবে প্রথম স্থান দখল করার কারণ জানতে চাইলে তিনি বলেন, সরকারিসহ সব সেক্টরে রাজনৈতিক প্রভাব খাটানোর চেষ্টা করা হয়। ৯৩ শতাংশ তথ্যদাতার ধারণায়, বাংলাদেশে সর্বোচ্চ দুর্নীতিপ্রবণ প্রতিষ্ঠান হলো রাজনৈতিক দল ও পুলিশ এবং ৮৯ শতাংশ তথ্যদাতার ধারণায় এর পরের অবস্থান বিচারের। অন্যদিকে অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, শীর্ষ ঘুষগ্রহীতা খাতগুলো হলো: পুলিশ (৭২ শতাংশ), বিচার ব্যবস্থা (৬৩ শতাংশ) ও ভূমি সেবা (৪৪ শতাংশ)। উল্লেখ্য, ঘুষ প্রদানের কারণ হিসেবে ৫৮ শতাংশ মানুষ মনে করেন, সেবা পাওয়ার ক্ষেত্রে এটাই একমাত্র পথ। টিআইবি পরিচালিত জাতীয় খানা জরিপ ২০১০-এর তুলনায় ২০১২-তে সেবাখাতে ঘুষ বা নিয়মবহির্ভূত অর্থ দেয়ার হারও তুলনামূলকভাবে কমেছিল। উত্তরদাতাদের ৭৬ শতাংশ বাংলাদেশে সরকারি খাতের দুর্নীতিকে খুবই গুরুতর সমস্যা বলে মনে করেন। বাংলাদেশের ৪০ শতাংশ উত্তরদাতা মনে করেন সরকারি সেবা খাতে ব্যক্তিগত সম্পর্ক ও যোগাযোগ খুবই গুরুত্বপূর্ণ। অন্যদিকে ৯০ শতাংশ উত্তরদাতার মতে, সরকার বিশেষ মহল, বিশেষত রাজনৈতিক দল বা কর্মী এবং বিশেষ ব্যবসায়িক গোষ্ঠী দ্বারা বিভিন্ন মাত্রায় প্রভাবিত হয়ে থাকে। বাংলাদেশের তথ্যদাতাদের ৯২ শতাংশ মনে করেন, সাধারণ জনগণ দুর্নীতি প্রতিরোধে ভূমিকা রাখতে পারে এবং তথ্যদাতাদের বেশির ভাগই কোন না কোনভাবে দুর্নীতিবিরোধী কার্যক্রমে ভূমিকা রাখতে চান। দুর্নীতির ঘটনা জানানোর ক্ষেত্রে উত্তরদাতাদের ৩১.৪ শতাংশ জনপ্রতিনিধির ওপর আস্থাবান। ১৮.৮ শতাংশের জনের আস্থা নিয়ে ২য় অবস্থানে রয়েছে দুর্নীতি সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান। দুদকের কাছে জানাতে চান ১১.৪ শতাংশ। জরিপ অনুযায়ী, বাংলাদেশের তথ্যদাতাদের ৩২ শতাংশের অভিমত হল দুর্নীতি প্রতিরোধে সরকারি পদক্ষেপ অকার্যকর। উল্লেখ্য, ২০১০ সালের জরিপে ৫০ শতাংশ উত্তরদাতা মনে করতেন দুর্নীতি প্রতিরোধে সরকারি পদক্ষেপ কার্যকর ভূমিকা পালন করে থাকে। ২০১২ সালের জরিপে দুর্নীতি প্রতিরোধে সরকারি পদক্ষেপের ওপর আস্থা রেখেছেন মাত্র ২৬ শতাংশ উত্তরদাতা। সংবাদ সম্মেলনে সরকারের প্রতি টিআইবি’র পক্ষ থেকে প্রাতিষ্ঠানিক, নীতি-নির্ধারণী পর্যায় এবং সচেতনতা, প্রচারণা ও অ্যাডভোকেসি বিষয়ে বিভিন্ন সুপারিশমালা তুলে ধরে গণতন্ত্রের মৌলিক প্রতিষ্ঠানগুলোর কার্যকরিতা বৃদ্ধির মাধ্যমে আস্থা ও বিশ্বাস উদ্ধারের উদ্যোগ গ্রহণের আহ্বান জানানো হয়। বাংলাদেশে ৩৯ শতাংশ মানুষ ঘুষ দেয়: বিশ্বে দুর্নীতি আরও ভয়াবহ রূপ নিয়েছে বলে জানিয়েছে সংস্থাটি। গত বছর বিশ্বে চার জন মানুষের মধ্যে এক জনই কোন না কোন সরকারি কর্মকর্তাকে ঘুষ দিয়েছেন। গত বছর বাংলাদেশের মোট ৩৯ শতাংশ মানুষ ঘুষ দিয়েছেন। দক্ষিণ এশিয়ার অন্য দেশগুলো যেমন: ভারত (৫৪ শতাংশ), পাকিস্তান (৩৪ শতাংশ), শ্রীলঙ্কা (১৯ শতাংশ), নেপাল (৩১ শতাংশ), মালদ্বীপের (৩ শতাংশ) ঘুষ দেয়ার রেকর্ডও খুব ভাল নয়। তবে ঘুষ দেয়ার তালিকায় শীর্ষ দেশগুলো হলো আফ্রিকার দেশ সিয়েরা লিওন (৮৪ শতাংশ), লাইবেরিয়া (৭৫ শতাংশ), ইয়েমেন (৭৪ শতাংশ), কেনিয়া (৭০ শতাংশ)। অন্যদিকে কম ঘুষ দেয়ার রেকর্ডে থাকা তালিকার দেশগুলো হলো- ডেনমার্ক, ফিনল্যান্ড, জাপান এবং অস্ট্রেলিয়া। এসব দেশে ঘুষ দেয়ার রেকর্ড মাত্র এক শতাংশ। উল্লেখ্য, গ্লোবাল করাপশন ব্যারোমিটার ২০১২তে দুর্নীতির ধারণার মধ্যে ক্ষুদ্র, বৃহৎসহ সব ধরনের দুর্নীতি এবং গণমাধ্যম ও বিশেষজ্ঞ মতামত অন্তর্ভুক্ত। অন্যদিকে দুর্নীতির অভিজ্ঞতা বলতে ক্ষুদ্র আকারের দুর্নীতি সংক্রান্ত প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতাকে বোঝানো হয়েছে। প্রশ্নোত্তরে: এদিকে প্রতিবেদন প্রকাশের পর সাংবাদিকদের বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তর দেন টিআইবি’র নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান। এক প্রশ্নে তিনি বলেন, দেশে বিরাজনীতিকরণের কোন উদ্দেশ্য টিআইবি’র নেই। বরং দেশের গণতন্ত্র আরও বেশি কার্যকর, দুর্নীতিমুক্ত ও দৃঢ় হোক এটাই তাদের লক্ষ্য। তিনি বলেন, আমরা নয় বরং রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ যেসব কাজ করছেন তাতেই বিরাজনীতির সুযোগ তৈরি করছে। বিরাজনীতিকীকরণের বিভিন্ন উপাদান মাথাচাড়া দিয়ে উঠছে। তিনি বলেন, রাজনৈতিক অঙ্গনে যত বেশি দুর্নীতি প্রতিরোধ করা যাবে দেশে তত বেশি দুর্নীতি কমবে। মূলত রাজনৈতিক দল, প্রশাসন ও ব্যবসায়ী- এই ত্রিমুখী শক্তির আঁতাতের কারণে দুর্নীতি বাড়ছে।মানবজমিনসর্বশেষ সংবাদ
- ওয়ার্ল্ড হিউম্যান রাইটস ডেভেলপমেন্ট ইউএসএর সাধারণ সম্পাদক ড. সাদিয়া আফরিন এরা
- চরমোনাই পীরের যুক্তরাষ্ট্র সফর উপলক্ষে নিউইয়র্কে দোয়া মাহফিল, কুরআন-সুন্নাহর আলোকে বয়ান
- New York Attorney General James Secures Reimbursements for T-Mobile Customers Whose Rates Were Unjustly Raised
- নিউইয়র্কে বাংলাদেশ সোসাইটির নির্বাচনে কুনু-ফিরোজ পরিষদের সাত দফা ইশতেহার ঘোষণা; কমিউনিটি সেন্টার প্রতিষ্ঠা, সাশ্রয়ী ফিউনারেল সেবা, বিমানের সরাসরি ফ্লাইট ও আর্থিক স্বচ্ছতায় অঙ্গীকার
- ফিলিস্তিনিদের আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকারের প্রতি বাংলাদেশের পূর্ণ সমর্থন: জাতিসংঘে রাষ্ট্রদূত আইরিন খান
- নিউইয়র্কে বাংলাদেশ সোসাইটির নির্বাচনে প্রথমবারের মতো বিতর্ক, গুরুত্ব পেল স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি
- New York Attorney General James Warns New Yorkers About AI-Generated Election Misinformation Ahead of November Elections
- Bangladesh calls for global treaty to protect victims of crimes against humanity