বাংলা কথাসাহিত্যে নারী-পুরুষের সম্পর্ক -হুমায়ূন আহমেদ
অলংকরণ: কাইয়ুম চৌধুরী I
[রশীদ করীমের প্রবন্ধ: উপন্যাসের স্ত্রী-পুরুষের সম্পর্ক] শিরোনামে সামান্য পার্থক্য থাকলেও বিষয় মূলত এক, আর হয়তো এ কারণেই প্রবন্ধ দুটিতে দৃষ্টিভঙ্গির একটা আশ্চর্য সাদৃশ্য ফুটে উঠেছে। নর-নারীর সম্পর্ক বলতে কী বোঝায়? যৌনতা অবশ্যই এর একটি বড় দিক এবং অবৈধ যৌন সম্পর্কও। কিন্তু এই কি সব? সম্পর্কের ব্যাপকতা তার অনস্বীকার্য বহুমাত্রিকতা কি কোনোই তাৎপর্য বহন করে না? নজিবর রহমানের আনোয়ারাতে আনোয়ারা এবং নুুরুল ইসলামের যে সম্পর্ক, তাকে কি নারী-পুরুষ সম্পর্ক বলব না? ফ্রয়েড সাহেব বলুক আর না-বলুক, যৌনতা নারী-পুরুষ সম্পর্কের একটি প্রধান দিক, তবে এ-ই সব নয়। নর এবং নারী শব্দ দুটিকে বিশেষ খণ্ডিত অর্থে গ্রহণ করলেও তা কেবল প্রেমিক ও প্রেমিকায় সীমাবদ্ধ থাকে না। হাসনা বেগম তাঁর কঠিন প্রবন্ধটিতে [বাংলা কথাসাহিত্যে নর-নারী সম্পর্ক] দ্বান্দ্বিক পদ্ধতি অনুসরণ করে তিনটি মতবাদের আলোকে কয়েকটি উপন্যাস বা উপন্যাসে বর্ণিত চরিত্রের উল্লেখ ও আলোচনা করেছেন। আলোচনার এ পদ্ধতি তত্ত্বের প্রতিষ্ঠা জোরালো করতে পারে, তবে তা সাহিত্য বিশ্লেষণে বা অনুধাবনে কতটুকু সহায়ক—এ নিয়ে প্রশ্নের অবকাশ আছে। জীবনের পর্যবেক্ষণ ও বিশ্লেষণ থেকে পাওয়া সাধারণ সত্যই একসময় তত্ত্বের স্বীকৃতি পায়। কথাসাহিত্যিক জীবন থেকেই উপাদান গ্রহণ করেন। ফলে তত্ত্বের সঙ্গে সাহিত্যের সংগতি অস্বাভাবিক কিছু নয়। তাই বলে জীবন বা সাহিত্য তত্ত্বের অনুসারী নয়; বরং উল্টোটাই সত্যি। অর্থাৎ, জীবন বা সাহিত্যই তত্ত্বের আশ্রয়। আলোচনার উপসংহারই তত্ত্বের সমর্থন সংস্থাপনের যোগ্যতম স্থান। এতে আলোচনা উন্মুক্ত থাকার অবকাশ পায়। ‘রক্তের সম্পর্ক বলে বিবেচিত’ সম্পর্কের ক্ষেত্রে ‘দৈহিক বিষয়ের অবতারণা’য় ‘সামাজিক বাধা-নিষেধে’র কথা মনে করে হাসনা বেগম এ দিকটি এড়িয়ে গেছেন, কিন্তু রশীদ করীম তাঁর প্রবন্ধ শুরু করেছেন ইডিপাসের সংকট উল্লেখ করে। এই সূচনাকে কি আমি ইঙ্গিত হিসেবে গণ্য করব? রশীদ করীম প্রবীণ কথাশিল্পী। অভিজ্ঞতা এবং অধ্যয়নে সমৃদ্ধ। তাঁর প্রবন্ধে উভয়েরই ছাপ আছে। এর চেয়েও বড় কথা, তাঁর তাত্ত্বিক আলোচনাও রস ও রসিকতায় ধন্য। যেখানে যৌনতা, বিশেষ করে অবৈধ যৌনতা প্রাধান্য পাবে, সেখানে মফিজন থেকে আলোচনা শুরু করে তিনি গভীর বোধের পরিচয় দিয়েছেন। মরহুম মাহবুব আলমের এই ছোট্ট উপন্যাসটি থেকেই সত্যিকার অর্থে এ দেশে জীবনের এই বিশেষ দিকটির রসোত্তীর্ণ রূপায়ণের সূচনা। তবে মফিজন যদিও যথার্থই স্ত্রী, খোকাকে কতটুকু পুরুষ বলে গণ্য করা চলে? নাকি অবৈধতার আরেকটি নতুন মাত্রা হিসেবেই এটি বিশেষ আকর্ষণীয়? জনাব করীমের সাহিত্যবোধ ও বিশ্লেষণ ক্ষমতা প্রশ্নাতীত। তবে তাঁর আলোচনায় আরোপের সীমা নিয়ে আমার কিছু দ্বিধা আছে। শওকত ওসমানের জননীর দরিয়া বিবির উত্তপ্ত দিনের দিবানিদ্রাকে ‘ধর্ষিতা হওয়ার আয়োজন’ মনে করাকে বাড়াবাড়ি বলেই মনে হয়েছে। উত্তপ্ত দিনেই অনভ্যস্তরাও দিবানিদ্রায় যায়। কারণটা মানসিক নয়, নেহাতই শারীরিক। শ্রদ্ধেয় রশীদ করীম তাঁর আলোচনায় আমার মতো অভাজনের একটি রচনাকে গ্রহণ করে ধন্য করেছেন এবং খানিকটা লজ্জায়ও ফেলে দিয়েছেন। তবে রানুর চিন্তায় ‘আমি যা খুশি করব, যার সঙ্গে ইচ্ছা তারই অঙ্কশায়িনী হব’ এমন কিছু কি দূরে কোথায় উপন্যাসটিতে আছে? স্ত্রী-পুরুষ সম্পর্কের ভিন্নতর সংকটই ছিল আমার রচনাটির উপজীব্য। জীবনের অন্যতম সত্য হিসেবে যৌনতাও হয়তো তার মধ্যে আছে, তবে কাহিনির প্রয়োজনেই অবৈধ যৌন সম্পর্কের অবতারণার দরকার হয়নি। এখানেও কি এই আরোপণ অপরিহার্য ছিল? নাকি তা না করলে চরিত্রটির আধুনিকতা ক্ষুণ্ন হতো? মাহমুদুল হক, হুমায়ূন আহমেদ ও ইমদাদুল হক মিলনের একটি করে উপন্যাসের কিছু নির্বাচিত অংশ বিশ্লেষণ করে লেখক তাঁদের প্রেম সম্পর্কিত বোধ ও বক্তব্যকে চিহ্নিত করতে চেয়েছেন। কিন্তু লেখক তো কখনো দাঁড়িয়ে থাকেন না। তিনি গতিশীল। তিনি সব সময় নতুন জীবনবোধের কথা বলতে চেষ্টা করেন। পুতুল নাচের ইতিকথায় নর-নারী সম্পর্কের যে দিকটির কথা মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় বলেছেন—দিবারাত্রির কাব্যেও কি তা-ই বলা হয়েছে? তবে সত্যের প্রতি সমাজের দৃষ্টিভঙ্গি পাল্টায়। আর সাহিত্য-শিল্প সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি মেনে এই প্রকাশের মাত্রার হেরফের ঘটায়। একজন লেখক বা শিল্প সমাজেরই সদস্য। তার দৃষ্টিভঙ্গিও বহুলাংশে সমাজ-নিয়ন্ত্রিত। স্ত্রী-পুরুষ সম্পর্কের ব্যাপারে তাই কিছুটা রাখঢাক আসে। স্বয়ং বঙ্কিমচন্দ্রকে তাঁর নায়ক এবং নায়িকার শুধু কথা বলার সুযোগ করে দেওয়ার জন্য ঝড়-বৃষ্টির রাত তৈরি করতে হয়েছে, বনের ভেতর নির্জন মন্দির তৈরি করতে হয়েছে। এই সমস্যা আজকের কথাশিল্পীদের নেই। তবে তাঁদের অন্য সমস্যা আছে। তাঁদের নায়কেরা নায়িকাদের সঙ্গে কথা বলেন, কিন্তু তাঁদের গায়ে হাত দিতে দ্বিধা বোধ করেন। অনেক ক্ষেত্রেই দ্বিধাটি নায়কের নয়, লেখকের নিজের। অথচ খুবই আশ্চর্যের ব্যাপার, সূচনা পর্বের প্রাচীন কবিতা বা চিত্র-ভাস্কর্যে অবাধ উন্মোচন আমরা লক্ষ করেছি। সমাজের তেমন কোনো নিয়ন্ত্রণ তখন ছিল না। আজকের গ্রাম্য গান, বিয়ের গান ও কিচ্ছা কাহিনিতে কিন্তু নর-নারী সম্পর্কের খোলামেলা বিষয়গুলো আছে। কিন্তু কথাসাহিত্যে আমরা এড়িয়ে যাচ্ছি। এটা কি এক ধরনের ‘সফিসটিকেশন’? রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর একসময় যেন হঠাৎ করে ‘হৈমন্তী’ গল্পে শরীরের কথা নিয়ে আসেন, ‘কবে যে তাহার সাদা মনটির উপর একটু রং ধরিল, চোখে একটু ঘোর লাগিল, কবে যে তাহার সমস্ত শরীর ও মন যেন উৎসুক হইয়া উঠিল…’ ব্যস, এই পর্যন্তই। হৈমন্তীর শরীর উৎসুকের অন্য কোনো বিবরণ তিনি দেননি। সেই ঐতিহ্যই কি আমরা এখনো লালন করছি? আজকের দিনে সমাজের নিয়ন্ত্রণ প্রায় ক্ষেত্রেই কঠোর থেকে কঠোরতর হচ্ছে, কিন্তু নর-নারীর সম্পর্কের ব্যাপারে উদার থেকে উদারতর হচ্ছে। কথাসাহিত্যে আমরা তারই প্রতিফলন দেখছি। সমকালীন বাংলা সাহিত্যে এই সম্পর্কের প্রতিফলন এ পরিবর্তনের আলোকেই বিশ্লেষিত হওয়া প্রয়োজন।প্রথম আলো
- ওয়ার্ল্ড হিউম্যান রাইটস ডেভেলপমেন্ট ইউএসএর সাধারণ সম্পাদক ড. সাদিয়া আফরিন এরা
- চরমোনাই পীরের যুক্তরাষ্ট্র সফর উপলক্ষে নিউইয়র্কে দোয়া মাহফিল, কুরআন-সুন্নাহর আলোকে বয়ান
- New York Attorney General James Secures Reimbursements for T-Mobile Customers Whose Rates Were Unjustly Raised
- নিউইয়র্কে বাংলাদেশ সোসাইটির নির্বাচনে কুনু-ফিরোজ পরিষদের সাত দফা ইশতেহার ঘোষণা; কমিউনিটি সেন্টার প্রতিষ্ঠা, সাশ্রয়ী ফিউনারেল সেবা, বিমানের সরাসরি ফ্লাইট ও আর্থিক স্বচ্ছতায় অঙ্গীকার
- ফিলিস্তিনিদের আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকারের প্রতি বাংলাদেশের পূর্ণ সমর্থন: জাতিসংঘে রাষ্ট্রদূত আইরিন খান
- নিউইয়র্কে বাংলাদেশ সোসাইটির নির্বাচনে প্রথমবারের মতো বিতর্ক, গুরুত্ব পেল স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি
- New York Attorney General James Warns New Yorkers About AI-Generated Election Misinformation Ahead of November Elections
- Bangladesh calls for global treaty to protect victims of crimes against humanity