মাতৃত্ব মেয়েদের এক নতুন পরিপূর্ণতা দেয়, নতুন অভিজ্ঞতা আর সৌন্দর্যে ঐশ্বর্যশালী করে তোলে
নতুন শিশুটির প্রতি যত্ন তো নেবেনই, মা হয়ে নিজের স্বাস্থ্য আর সৌন্দর্যের যত্নের কথা ভুলে যাবেন না। মেয়ে মিশেলকে নিয়ে নকশার আয়োজনে মডেল হয়েছেন অভিনয়শিল্পী বাঁধন। ছবি: কবির হোসেন I
তানজিনা হোসেন : মা হওয়ার ঘটনা একটি মেয়ের জীবনকে দুই অধ্যায়ে ভাগ করে দেয়। এ দুইয়ের মধ্যে বিস্তর ফারাক। মাতৃত্ব মেয়েদের এক নতুন পরিপূর্ণতা দেয়, নতুন অভিজ্ঞতা আর সৌন্দর্যে ঐশ্বর্যশালী করে তোলে। কিন্তু তার মানে এই নয়, মা হওয়ার পর নিজের সৌন্দর্য ও সুস্থতা সম্পর্কে উদাসীন হয়ে যেতে হবে। কিন্তু অধিকাংশ ক্ষেত্রেই মেয়েরা এ সময়টিতে নিজের প্রতি দেখান চরম অবহেলা আর অযত্ন, হয়ে পড়েন উদাসীন। এর ফলে এমন সব শারীরিক ও স্বাস্থ্যগত ক্ষতি হয়ে যেতে পারে, যার প্রভাব থাকে সারা জীবন। পরিবার ও পারিপার্শ্বিক পরিস্থিতিও এমন থাকে যে সবাই নতুন অতিথিকে নিয়েই ব্যস্ত হয়ে পড়ে, নতুন মায়ের দিকে কেউ আর তেমন খেয়াল করে না। কিন্তু এ সময় একজন নারী শারীরিক ও মানসিকভাবে খুব নাজুক অবস্থার মধ্যে থাকেন, তার জন্য চাই বাড়তি যত্ন, বাড়তি মনোযোগ আর বাড়তি সচেতনতা। তাই যাঁরা মা হচ্ছেন এবং নতুন মা হয়েছেন, নকশার এবারের আয়োজন তাঁদের জন্য।
প্রসব-পরবর্তী স্বাস্থ্যজ্ঞান থাকা জরুরি ঢাকা মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের স্ত্রীরোগ ও প্রসূতি বিভাগের সহকারী অধ্যাপক মুনা সালিমা জাহান দিয়েছেন নানা পরামর্শ। তিনি বলেন, প্রসব-পরবর্তী সময়ে বারবার প্যাড পরিবর্তন করে পরিষ্কার থাকা, অতিরিক্ত রক্তক্ষরণ বা দুর্গন্ধযুক্ত রক্তক্ষরণ হচ্ছে কি না, সে ব্যাপারে খেয়াল রাখতে হবে। অর্থাৎ জীবাণু-সংক্রমণের লক্ষণ বিষয়ে সচেতন থাকা, বারবার প্রস্রাব করে মূত্রথলি খালি রাখা এবং যাঁদের প্রসব স্থানে সেলাই দেওয়া হয়েছে, তাঁদের মাঝেমধ্যে কুসুম গরম পানিতে হিপ বাথ নেওয়া ইত্যাদি বিষয়ে নজর রাখতে হবে। প্রসবের অনেক আগে থেকেই পেলভিক ফ্লোর এক্সারসাইজ করা উচিত, যাতে পরবর্তী সময়ে মূত্রধারণক্ষমতায় সমস্যা না হয়। শিশুকে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব সঠিকভাবে স্তন্যপান শুরু করানো এবং স্তনের সঠিক যত্ন নেওয়া, স্তন পরিষ্কার রাখা ইত্যাদি শিখে নেওয়া উচিত। বেশির ভাগ মেয়েই এ সময় কোনো অন্তর্বাস পরেন না, যা একেবারেই উচিত নয়। আজকাল সামনে খোলা বড় স্ট্র্যাপযুক্ত নার্সিং অন্তর্বাস পাওয়া যায়, এগুলো ব্যবহার করতে পারেন। প্রসব বা সিজারিয়ানের পর কোষ্ঠকাঠিন্য হলে তার চিকিৎসা করতে হবে। না হয় অতিরিক্ত চাপের কারণে হার্নিয়া হয়ে যেতে পারে। পায়ে পানি থাকলে অধিকাংশ সময় পা উঁচু করে ঘুমালেই তা চলে যায়। স্বাভাবিক প্রসবের ক্ষেত্রে দেড় মাস এবং সিজারের ক্ষেত্রে দুই-তিন মাস ভারী কিছু ওঠানো বা ভারী কাজ নিষেধ। প্রসবের পর সঠিক জন্মবিরতি সম্পর্কেও জ্ঞান থাকতে হবে মায়েদের। যাঁদের গর্ভকালীন ডায়াবেটিস বা উচ্চ রক্তচাপ ছিল, তাঁদের সঠিক সময়ে আবারও চেকআপ করিয়ে নিতে হবে। পুষ্টিকর খাদ্য, পর্যাপ্ত ঘুম ও পরিচ্ছন্নতাজ্ঞান এ সময়টিতে সুস্থ থাকার জন্য খুবই জরুরি।
খেতে হবে প্রচুর পানি, আমিষ ও খনিজ শিশুকে বুকের দুধ খাওয়ানোর সময় একজন মায়ের গর্ভকালীন সময়ের চেয়েও বেশি ক্যালরির প্রয়োজন হয়। কিন্তু এই বাড়তি ক্যালরি আসবে মূলত প্রোটিন বা আমিষ থেকে; শর্করা বা ফ্যাট থেকে নয়। বললেন, বারডেমের প্রধান পুষ্টিবিদ আখতারুন নাহার আলো। তাঁর মতে, প্রতিবার স্তন্যপান করানোর আগে-পরে প্রচুর পরিমাণে পানি ও জলীয় পদার্থ খাওয়া উচিত। সারা দিনের এই তরলে পানি ছাড়াও দুধ, স্যুপ, ফলের রস, ঝোলের তরকারি ইত্যাদি থাকতে পারে। কোষ্ঠ পরিষ্কার রাখা ও ভিটামিনের অভাব পূরণের জন্য প্রচুর শাকসবজি ও ফলমূল খেতে হবে। ক্যালসিয়াম বেশি আছে ছোট ও গুঁড়া মাছ, শুঁটকি মাছ, ডাল ও দুধে। আয়রন আছে কাঁচকলা, কচু, কচুর শাক, বিট, পুদিনাপাতা, ধনেপাতা ইত্যাদিতে। টক ফলে আছে ভিটামিন ‘সি’ যা আয়রন রক্তে মিশতে সাহায্য করে। ফাস্টফুড, কোমলপানীয়, ভাজাপোড়া, অতিরিক্ত শর্করা খেলে ওজনই বাড়বে শুধু, কিন্তু পুষ্টিমান রক্ষা হবে না। তাই পুষ্টিকর খাবার খান, অতিরিক্ত খাবার নয়।
ধীরে ধীরে ওজন কমান গর্ভাবস্থায় এবং সন্তান জন্ম নেওয়ার পর মেয়েদের ত্বকে কিছু পরিবর্তন আসে, এর মধ্যে অন্যতম হলো স্ট্রেচমার্ক এবং মেলাজমা বা প্রেগন্যান্সি মাস্ক পড়া। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে হরমোনের ছন্দ ফিরে এলে এগুলো অনেকটাই কমে আসে; তবে কিছু ঘরোয়া উপায় সাহায্য করতে পারে। এ উপায়গুলো বলেছেন রূপবিশেষজ্ঞ কানিজ আলমাস খান। স্ট্রেচমার্কের জায়গায় নিয়মিত ভিটামিন ‘কে’ যুক্ত ক্রিম দিয়ে ম্যাসাজ করা, অ্যালোভেরা জেল বা ভিটামিন ‘ই’ ক্যাপের ভেতরের তরল দিয়ে ম্যাসাজ করলেও উপকার পাবেন। অ্যাপ্রিকট স্ক্রাব বা অ্যারোমা ম্যাসাজ করলেও দ্রুত উপকার পাওয়া যায়। নিয়মিত ব্যায়াম করলে স্টেচমার্ক পড়ার আশঙ্কা কমে যায়। মেলাজমা বা প্রেগন্যান্সি মাস্ক থেকে মুক্তি পেতে মায়েরা প্রতি রাতে ঘুমানোর আগে অলিভ অয়েল দিয়ে ম্যাসাজ করতে পারেন। প্রতিদিন দুবার করে সমপরিমাণে পেঁয়াজের রসের সঙ্গে অ্যাপেল সাইডার ভিনেগার মিলিয়ে ম্যাসাজ করতে পারেন। এর পাশাপাশি ভিটামিন ‘কে’ যুক্ত খাবার; যেমন: সবুজপাতাযুক্ত সবজি, টমেটো এবং দুগ্ধজাত খাবার খাবেন। বীজ ও বাদামজাতীয় খাবার খেতে হবে যথেষ্ট পরিমাণে। সন্তান জন্ম নেওয়ার পাঁচ-ছয় মাস পর থেকে চুল পড়তে শুরু করতে পারে। এটা খুবই স্বাভাবিক। তাই সন্তান জন্ম নেওয়ার আগে থেকেই মাসে দুবার করে নিয়মিত মাথার ত্বক ম্যাসাজ করাতে পারেন; এতে চুলের গোড়ায় রক্তসঞ্চালন নিয়মিত থাকবে। বেশি চুল পড়তে শুরু করলে চুল কেটে ছোট করে নিলেই বেশি ভালো হয়। বাচ্চার বয়স দেড় থেকে দুই মাস হলে নিয়মিত হালকা ব্যায়াম শুরু করুন। সন্তান ভূমিষ্ঠ হওয়ার পর খুব শক্ত ব্যায়াম ও খাবার নিয়ন্ত্রণ করে অতি দ্রুত ওজন কমিয়ে ফেলার চেষ্টা না করাই ভালো। কেননা, তাতে চর্বি ভেঙে শরীরে ও বুকের দুধের সঙ্গে একধরনের বিষাক্ত পদার্থ নির্গত হতে থাকে। তাই শ্রেষ্ঠ উপায় হলো, ধীরে ধীরে ওজন কমানো। স্বাভাবিক ডেলিভারি হলে পরদিন থেকেই হালকা হাঁটাচলা, উঠবস ও স্ট্রেচিং (অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ টানটান করে মাংসপেশি শক্ত করা) করা যায়। পরের সপ্তাহ থেকেই হালকা গতিতে ৩০ মিনিট পর্যন্ত হাঁটতে পারেন। ধীরে ধীরে সময় বাড়াতে পারেন। সিজারিয়ানের ক্ষেত্রে ছয় থেকে আট সপ্তাহ অপেক্ষা করাই শ্রেয়। তবে হালকা হাঁটাচলা সব সময়ই করা উচিত।
প্রয়োজন পরিবার ও স্বামীর সহযোগিতা প্রসবের পর পোস্ট পারটাম ব্লু বা বিষাদে আক্রান্ত হন এমন মেয়ের সংখ্যা খুব কম নয়। হরমোনের আকস্মিক ওঠানামা, শারীরিক পরিবর্তন, নতুন জীবনযাপন প্রণালির সঙ্গে অনভ্যস্ততা, ঘুমের ব্যাঘাত ইত্যাদি অনেক কিছু এর সঙ্গে জড়িত। এতে মা আবেগপ্রবণ হয়ে পড়েন, মন খারাপ করে থাকেন, অবসাদ ও বিষাদগ্রস্ত থাকেন, যখন-তখন কান্না পায়, কখনো খিটখিটে হয়ে পড়েন। হরমোনের ছন্দ ঠিক হয়ে গেলে আপনা আপনি এগুলো ঠিক হয়ে যায়। যদি তা না হয় এবং আরও কিছু খারাপ লক্ষণ দেখা দেয়, তবে চিকিৎসকের শরণাপন্ন হওয়া উচিত। কেননা, সে ক্ষেত্রে মা নিজের ও শিশুর দায়িত্ব নিতে অক্ষম হয়ে পড়বেন। তবে পোস্ট পারটাম ব্লু কাটিয়ে উঠতে পরিবার ও স্বামীর ভূমিকা অনেক। মায়ের কাজগুলো ভাগ করে নেওয়া, মাকে ঘুমাতে সাহায্য করা ও মায়ের পাশাপাশি থেকে তাঁকে আনন্দ দেওয়া উচিত এ সময় স্বামী, মা বা শাশুড়ি ও অন্যদের। এমন পরামর্শ দিলেন বিএসএমএমইউর মনোরোগবিশেষজ্ঞ নাফিয়া ফারজানা চৌধুরী।
ভেসে যান বাঁধহীন আনন্দ আর উচ্ছ্বাসে ‘আমি এখন স্বপ্ন দেখি যে আমি আর আমার মেয়ে এক রকম পোশাক পরব, এক রকম দেখতে হবে, একসাথে ঘুরে বেড়াব, একসাথে হাসাহাসি করব। মা বলেই আমি বুড়িয়ে যাব কেন? আমার ১০ মাসের মেয়েটি যখন তরুণ হবে তখনো আমি এমনই তারুণ্যে ভরপুর সজীব আর সুস্থ-সবল থাকতে চাই। আমার পেশার কারণেই এমনটি বলছি তা কিন্তু নয়, এ কথাটি সবার জন্য প্রযোজ্য।’ বলেন অভিনয়শিল্পী বাঁধন। ‘প্রথম তিন মাস জীবনের নতুন ধরন ও নতুন এক পরিবেশের সাথে খাপ খাওয়াতেই চলে গেছে। তারপর যখন একটু গুছিয়ে নিয়েছি তখন থেকেই খাবারদাবার ও নিজের যত্ন বিষয়ে সচেতন হয়ে উঠেছি। শক্ত ব্যায়াম বা না খেয়ে নয়, সন্তানকে এতটুকু বঞ্চিত করে নয়, বুকের দুধ খাইয়ে ও সন্তানকে পূর্ণ সময় ও মনোযোগ দিয়েই এটা করা সম্ভব। কেবল খাদ্য নির্বাচনে সচেতন হোন, ফ্যাট ও শর্করাজাতীয় খাবার এড়িয়ে ক্যালরিযুক্ত পুষ্টিকর খাবার যেমন সবজি, ফলমূল, স্যুপ, দুধ ইত্যাদি বেশি করে খান, প্রতিদিন সময় বের করে আধঘণ্টা হাঁটুন, অবকাশ পেলেই ঘুমিয়ে নিন।’ এই হলো মা হওয়ার পরও বাঁধনের এমন সতেজ, সুস্থ থাকার রহস্য। নতুন শিশুটির আগমনকে দারুণভাবে অভ্যর্থনা জানান। মাতৃত্বকে দারুণভাবে উপভোগ করুন। এই আনন্দ আর খুশির ছাপ পড়বে আপনার চেহারায়, ত্বকে, লাবণ্যে ও সুস্থতায়। দেখবেন মা হওয়ার ঘটনাটি বরং আপনাকে আগের চেয়ে আরও সুন্দর আরও স্বাস্থ্যবান আরও সজীব করে তুলেছে।প্রথম আলো
- ওয়ার্ল্ড হিউম্যান রাইটস ডেভেলপমেন্ট ইউএসএর সাধারণ সম্পাদক ড. সাদিয়া আফরিন এরা
- চরমোনাই পীরের যুক্তরাষ্ট্র সফর উপলক্ষে নিউইয়র্কে দোয়া মাহফিল, কুরআন-সুন্নাহর আলোকে বয়ান
- New York Attorney General James Secures Reimbursements for T-Mobile Customers Whose Rates Were Unjustly Raised
- নিউইয়র্কে বাংলাদেশ সোসাইটির নির্বাচনে কুনু-ফিরোজ পরিষদের সাত দফা ইশতেহার ঘোষণা; কমিউনিটি সেন্টার প্রতিষ্ঠা, সাশ্রয়ী ফিউনারেল সেবা, বিমানের সরাসরি ফ্লাইট ও আর্থিক স্বচ্ছতায় অঙ্গীকার
- ফিলিস্তিনিদের আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকারের প্রতি বাংলাদেশের পূর্ণ সমর্থন: জাতিসংঘে রাষ্ট্রদূত আইরিন খান
- নিউইয়র্কে বাংলাদেশ সোসাইটির নির্বাচনে প্রথমবারের মতো বিতর্ক, গুরুত্ব পেল স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি
- New York Attorney General James Warns New Yorkers About AI-Generated Election Misinformation Ahead of November Elections
- Bangladesh calls for global treaty to protect victims of crimes against humanity



