মৃত্যুর মুখোমুখি হয়ে অবরুদ্ধ বঙ্গবন্ধুর পরিবারকে যেভাবে মুক্ত করেছিলেন অশোক তারা
(অসম সাহসিকতার জন্য বাংলাদেশ সরকার ভারতীয় সেনাবাহিনীর সাবেক কর্নেল অশোক তারাকে ‘বাংলাদেশ মৈত্রী সম্মাননা’ দেয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। সেদিনের তরুণ সেনা অফিসার আজ সত্তর বছর বয়সে দিল্লির কাছে নয়ডাতে সস্ত্রীক অবসর জীবন কাটাচ্ছেন। বাংলাদেশের সম্মাননা দেয়ার খবর তিনি পেয়েছেন সাংবাদিকদের কাছ থেকে। আর সেই সম্মাননা নিতে ঢাকায় গিয়ে তিনি তার নিজের হাতে তোলা আজকের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার একটি ছবি উপহার দেবেন। সেই ছবিতে ২৪ বছরের হাসিনা তার সন্তানকে কোলে করে দাঁড়িয়ে রয়েছেন। ছবিটি বড় করে সুদৃশ্য ফ্রেমে বাঁধিয়ে নিয়ে যাবেন ঢাকায়- এমন ইচ্ছাই প্রকাশ করেছেন তিনি। )
পরিতোষ পাল, কলকাতা থেকে: আজও সেদিনের ভয়ঙ্কর মুহূর্তগুলো তার চোখের সামনে ভেসে ওঠে। সাক্ষাৎ মৃত্যুর মুখোমুখি হয়ে নিরস্ত্র অবস্থায় ঝুঁকি নিয়ে অবরুদ্ধ বঙ্গবন্ধুর পরিবারকে মুক্ত করার শপথ নিয়েছিলেন। সেদিনের সেই ঘটনা জানিয়েছেন অবসরপ্রাপ্ত কর্নেল অশোক তারা। তার নয়ডার ফ্ল্যাটে বসে সাংবাদিকদের শুনিয়েছেন সেদিনের ঘটনার প্রতিটি মুহূর্ত। দিনটি ছিল ১৯৭১ সালের ১৭ই ডিসেম্বর। একদিন আগেই লেফটেন্যান্ট জেনারেল নিয়াজি আত্মসমর্পণ করেছেন। আর দু’দিন আগেই ঢাকা বিমানবন্দরের নিরাপত্তার দায়িত্ব দেয়া হয়েছে আগরতলা থেকে দু’সপ্তাহ ধরে যুদ্ধ করতে করতে ঢাকায় আসা ১৪ গার্ড কোম্পানিকে। তারই কোম্পানি কমান্ডার ছিলেন অশোক তারা। গঙ্গাসাগরে মুখোমুখি লড়াই করে এসেছেন। সেখানেই শহীদ হয়েছেন তারই কোম্পানির ব্রাভো ইউনিটের ল্যান্সনায়েক আলবার্ট এক্কা। ১৭ই ডিসেম্বর সকালে একজন রাজনৈতিক নেতা হন্তদন্ত হয়ে ছুটে গিয়েছিলেন তারার ব্যাটালিয়নের কমান্ডার বিজয় কুমার চান্নার কাছে। তিনি গিয়ে জানালেন, বঙ্গবন্ধুর পরিবার ধানমন্ডির বাড়িতে এখনও অবরুদ্ধ হয়ে রয়েছেন পাকিস্তানি বাহিনীর হাতে। সেখানকার পাক সেনারা খুবই অ্যাডামেন্ট। যে কোন মুহূর্তে মেরে ফেলা হতে পারে গোটা পরিবারকে। ধানমন্ডির সেই বাড়িতে অবরুদ্ধ ছিলেন বঙ্গবন্ধুর স্ত্রী, কন্যা হাসিনা ও রেহানা, হাসিনার সন্তান, বঙ্গবন্ধুর পুত্র রাসেল। চান্না সঙ্গে সঙ্গেই ডেকে পাঠিয়েছিলেন অশোক তারাকে। নির্দেশ দিয়েছিলেন ধানমন্ডিতে গিয়ে অবস্থা দেখে আসতে। সঙ্গে সঙ্গে তারা তিনজন জওয়ানকে সঙ্গে নিয়ে ছুটে গিয়েছিলেন ধানমন্ডিতে। সেখানে তখন এক অদ্ভুত দৃশ্য। বঙ্গবন্ধুর বাড়ির সামনের রাস্তার অদূরে কৌতূহলি মানুষের ভিড়। রাস্তায় একটি আধপোড়া গাড়ি পড়ে রয়েছে। তার মধ্যে একজন গুলিতে ঝাঁঝরা হয়ে পড়ে রয়েছেন। নিহত ব্যক্তি সম্ভবত একজন সাংবাদিক । তিনি বঙ্গবন্ধুর বাড়ি ঘিরে থাকা পাক সেনাদের নির্দেশ উপেক্ষা করেছিলেন বলেই তাকে হত্যা করা হয়েছিল বলে জানালেন একজন। আগের দিন রাতেও বঙ্গবন্ধুর বাড়ি পাহারা দেয়া পাক সেনাদের গুলিতে নিহত হয়েছিলেন এক মহিলাসহ ৫ জন। এ পরিস্থিতিতে মুহূর্তের জন্য কিছু ভাবলেন আশোক তারা। সেনানি কখনও মৃত্যুকে ভয় পায় না। মনে পড়ে না তাদের দূরে থাকা স্ত্রী ও শিশু সন্তানের কথা। আর তাই অশোক তারা প্রথমে ভাল করে দেখলেন বাড়িটি। নজর গেল ছাদের ওপর বালির বস্তা দিয়ে তৈরি বাঙ্কার থেকে বেরিয়ে রয়েছে মেশিনগানের নল। বাড়ির গেটের দু’পাশেও রয়েছে সেন্ট্রি। টেরাসেও রয়েছে বাঙ্কার। আর বাড়ির ওপরে উড়ছে পাকিস্তানি পতাকা। বুঝে নিলের সবার নিশানায় তিনি। তবে তিনজন জওয়ান নিয়ে অভিযান চালানো মানে নিশ্চিত মৃত্যুর মুখে ঝাঁপ দেয়া এবং বঙ্গবন্ধুর পরিবারকেও মৃত্যুর মুখে ঠেলে দেয়া। আর তাই নিজের স্টেনগানটি খুলে নিয়ে তুলে দিলেন রাস্তার অপর পাড়ে দাঁড়িয়ে থাকার সহকর্মী জওয়ানদের হাতে। বললেন, নির্দেশ না পেলে কেউ এগিয়ে আসবে না। এবার এগিয়ে গেলেন বাড়ির দিকে। রাস্তার মাঝে পড়ে থাকা পোড়া গাড়ির কাছে যেতেই বাড়ির ছাদ থেকে ভেসে এলো হুশিয়ারি । আর এক পা এগোলেই গুলি করা হবে। এবার জোরালো গলায় তারা চেঁচিয়ে জানালেন যে, তিনি ভারতীয় সেনাবাহিনীর একজন অফিসার। আমি কোন অস্ত্র ছাড়াই তোমার সামনে দাঁড়িয়ে রয়েছি। তারা আরও বললেন, আমি বিনা অস্ত্রে তোমার সামনে এসেছি অর্থই হলো তোমার বাহিনী আত্মসমর্পণ করেছে। তুমি তোমার অফিসারের কাছ থেকে জেনে নাও। গেটের সেন্ট্রি তাকে দাঁড়াতে বললেন। কিছুক্ষণের স্তব্ধতা। তারপর এক পাক সেনা চেঁচিয়ে জানালো, অফিসারের সঙ্গে যোগাযোগ করা যাচ্ছে না। পরে অবশ্য অশোক তারা জেনেছিলেন, পাক ক্যাপ্টেন তার বাহিনীকে ফেলে রেখে চলে গিয়েছিলেন। ফলে নিচু স্তরের জওয়ানদের কাছে আত্মসমর্পণের খবর গিয়ে সময় মতো পৌঁছায়নি। ঠিক সেই সময়ই একটি ভারতীয় সেনা হেলিকপ্টার আকাশে চক্কর কাটছিল। সেটির দিকে আঙুল তুলে তারা পাকরক্ষীদের বোঝানোর চেষ্টা করলো, ভারতীয় সেনা ঢাকায় ঢুকে পড়েছে। চারদিকে ভারতীয় সেনা। তারা এবার পাক সেনাদের আবেগে আঘাত দিতে বললো, তোমাদের পরিবার রয়েছে। স্ত্রী-সন্তান রয়েছে। তাই তোমরা যদি আত্মসমর্পণ করো তবে তোমাদের কোন ক্ষতি না করে পাঠিয়ে দেয়া হবে। এই বলতে বলতে গেটের সামনে যাওয়া মাত্রই এক পাক সেন্ট্রির বন্দুকের নল এসে ঠেকেছিল তারার বুকে। মৃত্যুর আশঙ্কায় মুহূর্তের জন্য চোখ বুজে এসেছিল। বাড়ির ভিতর থেকে এক মহিলার চিৎকার ভেসে এলো, আপনি যদি আমাদের না বাঁচান তবে ওরা আমাদের নিশ্চিত মেরে ফেলবে। ছাদের ওপর থাকা পাক সেনার সঙ্গে কথা বলতে বলতেই বুকের সামনে থেকে বন্দুকের নলটা আস্তে করে সরিয়ে দিলাম। তারা এই ৭০ বছর বয়সে এসে বললেন, সেদিনের জোশটাই ছিল আলাদা। ক’দিন আগেই গঙ্গাসাগরে মুখোমুখি যুদ্ধ জয় করে এসেছি। এরপরই পাক সেনারা বুঝতে পেরেছিল যে, তাদের কিছু করার নেই। তারা আত্মসমর্পণ করতে বাধ্য হলো। তাদের পাঠিয়ে দেয়া হলো ব্যারাকে। বাড়িতে ঢুকতেই বঙ্গবন্ধুর স্ত্রী তারাকে ধরে বললেন, তুমি আমার পোলা বাবা…। অশোক তারা ঘরের মধ্যে ঢুকে অবাক হয়েছিলেন। কোনও আসবাবপত্র ছিল না। মেঝেতেই শুতে হতো সকলকে। প্রতি মুহূর্তে ভয় তারা করতো তাদের। খাবার বলতে ছিল শুধু বিস্কুট। অবরুদ্ধ বঙ্গবন্ধুর পরিবারকে মুক্ত করার পর তারাকে মিজোরামে ফিরে যাবার নির্দেশ দেয়া হয়েছিল। তবে মুজিবের পরিবারের সকলে চেয়েছিলেন ক’দিন থেকে মুজিবের সঙ্গে দেখা করে যেতে। ততদিন জানা হয়ে গিয়েছিল, পাক কারাগার থেকে মুক্তি পেয়ে মুজিব দেশে ফিরছেন। বঙ্গবন্ধু ফিরে এলে পরিবারের সবাই শোনালেন মুক্তির সেই রুদ্ধশ্বাস কাহিনী। বঙ্গবন্ধু খুব প্রশংসা করলেন। একসঙ্গে ছবি তুললেন। দিলেন অটোগ্রাফ সম্বলিত ছবিও। আজও যা মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি হিসেবে তার অ্যালবামে রয়ে গেছে।মানবজমিন
- ওয়ার্ল্ড হিউম্যান রাইটস ডেভেলপমেন্ট ইউএসএর সাধারণ সম্পাদক ড. সাদিয়া আফরিন এরা
- চরমোনাই পীরের যুক্তরাষ্ট্র সফর উপলক্ষে নিউইয়র্কে দোয়া মাহফিল, কুরআন-সুন্নাহর আলোকে বয়ান
- New York Attorney General James Secures Reimbursements for T-Mobile Customers Whose Rates Were Unjustly Raised
- নিউইয়র্কে বাংলাদেশ সোসাইটির নির্বাচনে কুনু-ফিরোজ পরিষদের সাত দফা ইশতেহার ঘোষণা; কমিউনিটি সেন্টার প্রতিষ্ঠা, সাশ্রয়ী ফিউনারেল সেবা, বিমানের সরাসরি ফ্লাইট ও আর্থিক স্বচ্ছতায় অঙ্গীকার
- ফিলিস্তিনিদের আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকারের প্রতি বাংলাদেশের পূর্ণ সমর্থন: জাতিসংঘে রাষ্ট্রদূত আইরিন খান
- নিউইয়র্কে বাংলাদেশ সোসাইটির নির্বাচনে প্রথমবারের মতো বিতর্ক, গুরুত্ব পেল স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি
- New York Attorney General James Warns New Yorkers About AI-Generated Election Misinformation Ahead of November Elections
- Bangladesh calls for global treaty to protect victims of crimes against humanity