যুক্তরাষ্ট্রের খ্যাতনামা থিঙ্কট্যাংকগুলোর বিরুদ্ধে অভিনব পন্থায় চাঁদাবাজির চাঞ্চল্যকর তথ্য : নিউইয়র্ক টাইমস এবং নিউ ইংল্যান্ড সেন্টার ফর ইনভেস্টিগেটিভ রিপোর্টিং
এনআরবি নিউজ, নিউইয়র্ক : স্বাধীন ও নিরপেক্ষ সংস্থার লেবাস লাগিয়ে চাঁদাবাজির অভিনব কৌশল অবলম্বন করেছে যুক্তরাষ্ট্রের খ্যাতনামা থিঙ্ক ট্যাংকগুলো। যারা মোটা অংকের অনুদান দেয়, তাদের ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রশংসাসূচক মতামত/মন্তব্য প্রদান করা হয়। জরিপের নামেও একই প্রক্রিয়া অবলম্বন করা হয়। শুধু তাই নয়, বিভিন্ন দেশের মানবাধিকার অথবা গণতান্ত্রিক অধিকার কিংবা অর্থনৈতিক কার্যক্রমসহ সর্বসাধারণের জীবনমান সম্পর্কিত বিবৃতিও একই আলোকে দেয়া হয়। আর এমন চাঞ্চল্যকর তথ্য উদঘাটিত হয়েছে ‘নিউইয়র্ক টাইমস’ এবং ‘নিউ ইংল্যান্ড সেন্টার ফর ইনভেস্টিগেটিভ রিপোর্টিং’ কর্তৃক। ‘রিসার্চার্স অর করপোরেট এ্যালিজ? থিঙ্ক ট্যাঙ্কস ব্লার দ্য লাইন’ শিরোনামে চলতি মাসে চাঞ্চল্যকর এ কেলেংকারির তথ্য প্রকাশ করে নিউইয়র্ক টাইমস। এরপর তা নিয়ে সর্বত্র নানা গুঞ্জন উঠেছে। রাজনীতিকরাই শুধু দুর্নীতি করেন, আমলারাই শুধু ঘুষ-দুর্নীতিতে লিপ্ত-এমন ঢালাও বদনামের সাথে এখন যুক্ত হলো থিঙ্কট্যাংকগুলোও-এমন অপ্রিয় সত্য উচ্চারিত হচ্ছে সুধীজনে।
বিশ্বে সবচেয়ে সমাদৃত এবং পুরনো থিঙ্কট্যাংক হচ্ছে ‘ব্রুকিংস ইন্সটিটিউশন।’ এর সিনিয়র ফেলো হিসেবে নিয়োগ পেয়েছেন কফি বোনের। তিনি হচ্ছেন ক্যালিফোর্নিয়ার সানফ্রান্সিসকো উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নের দায়িত্বপ্রাপ্ত গৃহ-নির্মাণের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ‘লেনার কর্পোরেশন’র নির্বাহী কর্মকর্তা। উল্লেখ্য, ১৯০৬ সালের ভূমিকম্পে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত সান ফ্রান্সিসকো-কে সোজা হয়ে দাঁড়াতে ফেডারেল ও স্টেট গভর্নমেন্টের বিশেষ মনোযোগ রয়েছে। তারই অংশ হিসেবে ৮ বিলিয়ন ডলারের একটি প্রকল্পে ঠিকাদার নিযুক্ত করা হয়েছে ‘লেনার কর্পোরেশন’কে।
২০১০ সালের জুলাই মাসে ‘ব্রুকিংস ইন্সটিটিউশন’র ভাইস প্রেসিডেন্ট ব্রুস ক্যাটজ এক চিঠিতে ‘লেনার কর্পোরেশন’কে প্রেরিত এক পত্রে লিখেছেন, ‘এটি হতে পারে কার্যকর এবং পরস্পরের স্বার্থ সংরক্ষণের সম্পর্ক।’ আর এ চিঠি দেয়া হয় ‘লেনার কর্পোরেশন’র আরেকটি ডিভিশন থেকে ৪ লাখ ডলারের ডনেশন পাবার পর। শুধু এই চিঠিই নয়, লেনার কর্পোরেশনের ব্যবসা-বানিজ্য এগিয়ে নেয়ার স্বার্থে যতটা সম্ভব তা করতে শুরু করে ব্রুকিংস। উদঘাটিত তথ্যের প্রসঙ্গ উল্লেখ করে নিউইয়র্ক টাইমস ব্রুকিংস’র এহেন আচরণকে ‘বেপরোয়া’ হিসেবে অভিহিত করেছে। ‘লেনার কর্পোরেশন’র কার্যক্রমের উচ্ছ্বসিত প্রশংসা করতে জাতীয় সংবাদ মাধ্যমকেও তারা প্রভাবিত করে। ২০১৪ সালে ব্রুকিংস’র একটি গোপন নথিতে দেখা যায়, ‘তিনি (কফি বোনের) হতে পারেন (ব্রুকিংস’র) বিশ্বস্ত উপদেষ্টা।’ আর এ মন্তব্য আসে লেনার কোম্পানী থেকে আরো এক লাখ ডলারের ডনেশন পাবার পরই।
নিউইয়র্ক টাইমস তার বিশেষ প্রতিবেদনে উল্লেখ করেছে, ‘ছাত্র-ছাত্রীর বালাই নেই, তবুও তারা নিজেদের ইউনিভার্সিটি হিসেবে দাবি করে এই থিঙ্ক ট্যাংক এবং তাদের রয়েছে সরকারের নীতি-নির্দ্ধারনীতে প্রভাব, কারণ তারা নিজেদের স্বাধীন ও নিরপেক্ষ গবেষক হিসেবেও উপস্থাপন করে আসছেন। যদিও তারা ডনেশন প্রদানকারি সংস্থা/প্রতিষ্ঠান/ রাজনৈতিক দলের সাফাই গেয়ে থাকেন। শুধু তাই নয়, এসব ব্যবসা প্রতিষ্ঠান অথবা রাজনৈতিক দল কিংবা কর্পোরেশনের এজেন্ডা এগিয়ে নিতে ‘দালালী’র ভূমিকায় অবতীর্ণ হচ্ছেন। তারা অলাভজনক সংস্থা হিসেবে তালিকাভুক্ত হওয়ায় ডনেশন প্রদানকারিরাও ট্যাক্স মওকুফ পেয়ে থাকেন। অনেক সময় ব্রুকিংস ইন্সটিটিউশন মোটা অর্থ ডনেশন গ্রহণের পরও কোন কোন কর্পোরেশনের তালিকা জনসমক্ষে প্রকাশ করেনি। আর এভাবেই তারা ঐসব কর্পোরেশনের ব্যবসায়িক স্বার্থকে প্রাধান্য দিচ্ছে।
যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় ব্যাংক জেপিমর্গ্যান চেজ, গ্লোবাল ইনভেস্টমেন্ট ফার্ম ‘কে,কে.আর’, সফটওয়ার জায়ান্ট ‘মাইক্রোসফ্্ট’, জাপানের ‘হিটাচি’ প্রভৃতি কর্পোরেশনের কাছে থেকে নিয়মিতভাবে ডনেশন পাচ্ছে ব্রুকিংস। বিনিময়ে এসব সংস্থার ব্যবসায়িক এজেন্ডার গুণগান করার পাশাপাশি আন্তর্জাতিক অঙ্গনে আরো বেশী গ্রহণযোগ্যতা এনে দেয়ার কাজ করছে। একইধরনের প্রক্রিয়ায় আরো কয়েকটি থিঙ্ক ট্যাংক ডনেশন নিচ্ছে ব্যবসায়িক সংস্থার কাছে থেকে। বিদেশে অস্ত্র বিক্রি থেকে শুরু করে আন্তর্জাতিক বানিজ্য, সড়ক ও মহাসড়ক ব্যবস্থাপনা, রিয়েল এস্টেট ডেভেলপমেন্ট খাতে উকালতি করছে ডনেশন গ্রহণের পর। উদ্ভাবিত পণ্য জনপ্রিয় করার ক্ষেতেও গুরুত্বপূর্ণ ভুমিকায় অবতীর্ণ হয় কোন কোন থিঙ্ক ট্যাংক।
ওয়ালস্ট্রিট কর্তৃক বিপুল অর্থ ডনেশন হিসেবে পাচ্ছে থিঙ্ক ট্যাংকগুলো। মিলিয়ন ডলার ডনেশনের পর বিলিয়ন ডলারের ফায়দা পাচ্ছে ওয়ালস্ট্রিট। এমন নগ্ন অভিযোগ বরাবরই করছেন ইউএস সিনেটর এলিজাবেথ ওয়ারেন (ম্যাসেচুসেট্্স, ডেমক্র্যাট)। চাঁদার বিনিময়ে থিঙ্কট্যাংকগুলোর এহেন দালালির কঠোর সমালোচনা করে আবারো বলেছেন, ‘কয়েক মিলিয়ন ডলারের বিনিময়ে ওয়াশিংটন প্রশাসনের ওপর প্রভাব খাটিয়ে তারা বিলিয়ন ডলারের ব্যবসা পাচ্ছে। তাহলে ডনেশন দিতে কার্পণ্য করবে কেন?’
ওয়াশিংটন ডিসিভিত্তিক অনেক থিঙ্কট্যাংকই এখন ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানের দালালে পরিণত হয়েছে। ব্রুকিংস’র বার্ষিক বাজেট দ্বিগুন হয়েছে গত দশকে। এখন তা ১০০ মিলিয়ন ডলার। এর বয়স এখন ১০০ বছর। অর্থনীতি, মেট্রপলিটন পলিসি, সুশাসন, গ্লোবাল ইকনোমি এবং ডেভেলপমেন্ট, সমাজবিজ্ঞানে গবেষণা ও শিক্ষা নিয়ে কাজ করছে এটি। একইসাথে যুক্তরাষ্ট্রের গণতন্ত্র, অর্থনৈতিক কর্মকান্ড এবং সমাজকল্যাণমূলক কাজকে এগিয়ে নেয়ার ক্ষেত্রে অবদান রাখছে। যুক্তরাষ্ট্রের সকল অধিবাসীর নিরাপত্তা ও ভাগ্য প্রসার, মুক্ত বিশ্ব গড়ার ক্ষেত্রে পরামর্শ প্রদান করছে এই ব্রুকিংস। এর রয়েছে ৫টি গবেষণা প্রোগ্রাম। এগুলো হচ্ছে ইকনোমিক স্টাডিজ, ফরেন পলিসি, গভর্ণ্যান্স স্টাডিজ, গ্লোবাল ইকনোমি এ্যান্ড পেভেলপমেন্ট এবং মেট্রপলিটন পলিসি। রয়েছে ৩টি আন্তর্জাতিক সেন্টার। কাতারের দোহা, চীনের বেইজিং এবং ভারতের নয়াদিল্লীতে এগুলো অবস্থিত।
ইউনিভার্সিটি অব পেনসিলভেনিয়া ২০১৫ সালের বিশ্বব্যাপী কর্মরত ‘থিঙ্কট্যাংক’গুলোর মধ্যে ব্রুকিংসকে ‘থিঙ্কট্যাংক অব দ্য ইয়ার’ এবং ‘বেস্ট থিঙ্কট্যাংক ইন দ্য ওয়ার্ল্ড’ হিসেবে অভিহিত করেছে। শুধু তাই নয়, যুক্তরাষ্ট্রেও সেরা থিঙ্কট্যাংকের খেতাব পেয়েছে ব্রুকিংস। নিউইয়র্ক টাইমস তার প্রতিবেদনে আরো উল্লেখ করেছে, ডনেশনের নামে নীরব চাঁদাবাজির অর্থকে অনেক সময়েই কর্পোরেশনগুলো সমাজ কল্যাণমূলক প্রকল্পে অনুদান হিসেবে চালিয়ে নেয়। এ পন্থায় কর্পোরেশনগুলো ট্যাক্স মওকুফ পেয়ে থাকে। অর্থাৎ থিঙ্কট্যাংকগুলোকে ডনেশনের বিনিময়ে ব্যবসায়িক ফায়াদা আদায়ের পাশাপাশি বোনাস হিসেবে সরকার থেকেও ট্যাক্স রিবেট পাচ্ছে।
ওয়াশিংটনভিত্তিক থিঙ্কট্যাংক ‘দ্য সেন্টার ফর ইন্টারন্যাশনাল পলিসি’র নির্বাহী পরিচালক বিল গুডফেলো টাইমসের অনুসন্ধানী এ প্রতিবেদনের ভিত্তিতে বলেছেন, ‘সর্বসাধারণ ভেবে থাকে যে, থিঙ্কট্যাংকগুলো নিরপেক্ষভাবে দায়িত্ব পালন করে সামগ্রিক কল্যাণের লক্ষ্যে, তারা কখনো কারো সাথে আপোষ করে না, রাজনীতিকদের মত কোন কিছুর বিনিময়ে বিক্রি হয় না। ডনেশন প্রদানকারিদের কোন ধরনের প্রভাব বিস্তারেরও সুযোগ নেই। কিন্তু এখন বলতে বাধ্য হচ্ছি যে, থিঙ্কট্যাংক জগতও রাজনৈতিক জগতের ন্যয় দুর্নীতিগ্রস্ত হয়ে পড়েছে। এবং এখন আমাদের সকলকে এ ব্যাপারে সজাগ ও সতর্ক হওয়া জরুরী হয়ে পড়েছে।’
ব্রুকিংস, সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক এ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজ (সিএসআইএস) সহ আরো কয়েকটি থিঙ্কট্যাংক দাবি করেছে যে, তাদের স্কলারদের স্বাধীন ও নিরপেক্ষ মতামতের ভিত্তিতেই সকল রিপোর্ট প্রকাশ করার একটি নীতিমালা রয়েছে এবং সে ভিত্তিতেই সবকিছু করা হয়।সিএসআইএস’র প্রধান নির্বাহী জন জে হ্যামার বলেন, ‘আমরা অত্যন্ত দৃঢ়ভাবেই বিশ্বাস করি যে, আমরা দেশের সবচেয়ে জটিল সমস্যার সমাধানে আমাদের বিদ্যমান মডেলকেই অনুসরন করে আসছি।’
- ওয়ার্ল্ড হিউম্যান রাইটস ডেভেলপমেন্ট ইউএসএর সাধারণ সম্পাদক ড. সাদিয়া আফরিন এরা
- চরমোনাই পীরের যুক্তরাষ্ট্র সফর উপলক্ষে নিউইয়র্কে দোয়া মাহফিল, কুরআন-সুন্নাহর আলোকে বয়ান
- New York Attorney General James Secures Reimbursements for T-Mobile Customers Whose Rates Were Unjustly Raised
- নিউইয়র্কে বাংলাদেশ সোসাইটির নির্বাচনে কুনু-ফিরোজ পরিষদের সাত দফা ইশতেহার ঘোষণা; কমিউনিটি সেন্টার প্রতিষ্ঠা, সাশ্রয়ী ফিউনারেল সেবা, বিমানের সরাসরি ফ্লাইট ও আর্থিক স্বচ্ছতায় অঙ্গীকার
- ফিলিস্তিনিদের আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকারের প্রতি বাংলাদেশের পূর্ণ সমর্থন: জাতিসংঘে রাষ্ট্রদূত আইরিন খান
- নিউইয়র্কে বাংলাদেশ সোসাইটির নির্বাচনে প্রথমবারের মতো বিতর্ক, গুরুত্ব পেল স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি
- New York Attorney General James Warns New Yorkers About AI-Generated Election Misinformation Ahead of November Elections
- Bangladesh calls for global treaty to protect victims of crimes against humanity