সুপ্রিম কোর্ট যদি ট্রাম্পের আপিলের বিপক্ষে রায় দিয়ে বসে তাহলে ..
ড. জিল্লুর রহমান খান : ২০১৬ সালের জুন-জুলাইতে ভয়েজ অব আমেরিকাকে আমি বলেছি, ট্রাম্পের যে বক্তব্য আমি শুনছি, তাতে তার নির্বাচিত হওয়ার কোনো সম্ভাবনাই নেই। এরপর ট্রাম্প যখন নির্বাচনের মাত্র দেড় সপ্তাহ আগে ফ্লোরিডাতে নির্বাচনী প্রচারণায় এলেন, তখন আমি ভয়েজ অব আমেরিকাকে আরেকটি সাক্ষাত্কারে বললাম, আমি চার মাসে আগে বলেছিলাম জয়ের ব্যাপারে ট্রাম্পের কোনো সম্ভাবনাই নেই, কিন্তু এই কটি মাসে যা দেখেছি, তাতে মনে হচ্ছে ট্রাম্প দান উল্টে দিতে পারেন। তিনি আমেরিকার নিম্নবিত্ত ও নিম্নমধ্যবিত্ত শ্বেতাঙ্গদের যেভাবে মন্ত্রমুগ্ধ করছেন, তাতে ভোটের হাওয়া ঘুরে যেতে পারে।
ট্রাম্প তিন-চারটে বিশেষ ইস্যু নিয়ে এগিয়েছেন। একটি হচ্ছে, অভিবাসন। ট্রাম্প মেক্সিকো সীমান্তে দেয়াল তুলতে চেয়েছেন আবার সেই দেয়াল তোলার খরচ মেক্সিকোর কাছ থেকে উঠাতেও চেয়েছেন। এতে আমেরিকানদের বড় একটি অংশ খুব খুশি। দ্বিতীয়ত, অভিবাসনের সঙ্গে তিনি যুক্ত করেছেন সন্ত্রাসবাদকে। আর সন্ত্রাসবাদের সঙ্গে যুক্ত করেছেন মুসলিমদের। টুইন টাওয়ার হামলার পর ইসলামি জঙ্গিবাদের ব্যাপারে আমেরিকানদের একটি অংশের ভেতরে ইসলাম-ভীতি আগেই ঢুকেছিল। তার সঙ্গে গত কয়েক বছরে ইউরোপের কয়েকটি দেশে কিছু জঙ্গি হামলা এবং আইএসের ভীতিপ্রদ ভিডিও ফুটেজের কারণে কিছু আমেরিকানের মনে ইসলাম-ফোবিয়া তৈরি হয়েই ছিল। সেই ফোবিয়াকে উস্কে দিয়েছে ট্রাম্প। সেটাকে তার মতো করে নির্বাচনে কাজে লাগানোর চেষ্টা করেছেন।
তৃতীয়ত, হেল্থকেয়ার। ওবামা যে হেল্থকেয়ার অর্থাত্ ওবামাকেয়ার চালু করেছিলেন, সেটার প্রথম চেষ্টা আমরা দেখতে পাই ১৯৯৩-৯৪ সালে। ওই ধরনের একটি হেল্থকেয়ার নীতি চালু করতে চেয়েছিলেন তত্কালীন ফার্স্ট লেডি হিলারি ক্লিনটন। কিন্তু কংগ্রেস থেকে ওই স্বাস্থ্যনীতি অনুমোদন করাতে পারেননি তিনি।
ওবামাকেয়ার সম্পর্কে আমি যতটুকু জানি, তাতে মনে হয়েছে এর অনেক কিছুই নেওয়া হয়েছে হিলারি ক্লিনটনের স্বাস্থ্যনীতি থেকে। ওবামাকেয়ারে কিছু পূর্ব-শর্ত খুব সাংঘাতিক। এর একটি হলো, কারো যদি কোনো অসুখ থাকে বিমা কোম্পানি তার বিমা করতে অস্বীকার করতে পারবে না। আরেকটি হলো, কারো চাকুরি না থাকলে ২৬ বছর বয়স পর্যন্ত মা-বাবাসহ হেল্থকেয়ার পাবে। এটা দারুণ জিনিস। ট্রাম্প ওবামাকেয়ার বাদ দিলেও এই আভাস দিয়েছেন যে, এই দুটো ভালো জিনিস তিনি নতুন হেল্থকেয়ারে ফিরিয়ে আনবেন। কিন্তু ট্রাম্প চান বিমা কোম্পানিদের ভেতরে হেল্থকেয়ারের ব্যাপারে প্রতিযোগিতা। ট্রাম্প মনে করেন, কোনো কিছুর ভেতরে কম্পিটিশিন না থাকলে সেখানে মূল্য বেড়ে যায়। তার মতে, ওবামাকেয়ারে বিমা কোম্পানিদের মধ্যে প্রতিযোগিতা হারিয়ে গেছিল বলেই বিমার প্রিমিয়াম ২৫ থেকে ৩০ শতাংশ বেড়ে গেছে। মধ্যবিত্তের কাছে ট্রাম্পের এমন প্রস্তাব দারুণ মনে হলো। মধ্যবিত্তরা ভাবলেন, ট্রাম্প যদি প্রিমিয়াম কমিয়ে আনতে পারেন, তবে ট্রাম্পকে কেন সমর্থন করব না? অথচ আরেকটি বড় ব্যাপার কেউ তোয়াক্কা করল না। তা হলো, গরিবের গরিব লোকগুলো ওবামার হেল্থকেয়ারে প্রবেশ করতে পারল। এটা একটা দারুণ ব্যাপার। নিম্নবিত্তের ভেতরে অভিবাসীদের সংখ্যা বেশি হওয়ায় মূলত তারাই ওবামাকেয়ারের সুফল পাচ্ছিলেন। আর এটাও বর্ণবাদী শ্বেতাঙ্গের কাছে খুব বেশি মনঃপুত হলো না।
ট্রাম্পের একটি বিরাট ইস্যু হচ্ছে আমেরিকার নিরাপত্তা। এই নিরাপত্তার জন্য ট্রাম্প দায়ী করছে আইএস এবং মধ্যপ্রাচ্যকে। কিন্তু ট্রাম্পের গৃহীত পদক্ষেপের ভেতরে একটা বড় ধরনের স্ববিরোধিতা আছে। এক দিকে আইএস-কে ট্রাম্প দমন করতে চান, অন্যদিকে ইরানের ব্যাপারে কঠোর আচরণ করছেন। ইরানের ব্যাপারে ওবামা যেমনটি পদক্ষেপ নিয়েছিলেন, ইরান যদি পরমাণু-অস্ত্র রোহিতকরণে এগিয়ে আসে তাহলে ইরানের ওপর থেকে যুক্তরাষ্ট্র অবরোধ তুলে নেবে। কিন্তু ট্রাম্প যে সাতটি মুসলিমপ্রধান দেশের ওপর যুক্তরাষ্ট্রে ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞা জারি করলেন, সেই তালিকায় ইরানকেও রাখলেন। ইরানের ব্যাপার ওবামার ইতিবাচক পদক্ষেপের ওপরও হস্তক্ষেপ করলেন ট্রাম্প। কিন্তু মধ্যপ্রাচ্যে আইএস যেভাবে উঠে এসেছে, তাকে দমন করতে সবচেয়ে বেশি সহযোগিতা করেছে ইরান। আইএস যতটুকু পিছু হটেছে তার নেপথ্যে রয়েছে ইরানের সহযোগিতা এবং বাশার আল আসাদের মরণপণ চেষ্টা। তাহলে ব্যাপারটা কী দাঁড়াল? আইএস-কে ট্রাম্প দমন করতে চান, অথচ যারা আইএস দমনে সবচেয়ে বড় সহযোগী, তাদের প্রতি রাখা হচ্ছে তীব্র বৈরী মনোভাব।
আমেরিকায় ‘চেক অ্যান্ড ব্যালেন্স’ খুব বড় একটি ব্যাপার। ট্রাম্প সাতটি মুসলিমপ্রধান দেশের ভ্রমণের ওপর নিষেধাজ্ঞার যে নির্বাহী আদেশ দিলেন, ফেডারেল বিচারকরা সেই আদেশের বিরুদ্ধে রায় দিয়ে বললেন—এমন আদেশ অসাংবিধানিক। এই ব্যাপারটি সুপ্রিম কোর্ট পর্যন্ত চলে যেতে পারে। ট্রাম্প ভাবতে পারেন, রিপাবলিকানদের মনোনীত সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতি তার পক্ষেই রায় দেবেন। কিন্তু বাস্তবতা অন্য। সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতিরা এমন একটি গ্রুমিংয়ের ভেতর দিয়ে বিচারকের আসনে বসেন, যেখানে তারা বুঝতে পারেন—আমেরিকার বৃহত্ স্বার্থটাই শেষ কথা।
এখন সুপ্রিম কোর্ট যদি ট্রাম্পের আপিলের বিপক্ষে রায় দিয়ে বসে তাহলে ট্রাম্পের আগামী কয়েক মাসের মধ্যে অভিশংসন ঘটতে পারে। আর যদি ট্রাম্পের অভিসংশন হয়, তবে সেটা হবে আমেরিকার কোনো প্রেসিডেন্টের জন্য বিশেষ ধরনের অভিশংসন। প্রেসিডেন্টের বিরুদ্ধে হাউস অব কংগ্রেসের সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্য যদি অভিশংসনের পক্ষে রায় দেয়, তবে সেটা কার্যকর করতে প্রয়োজন হয় সিনেটের দুই-তৃতীয়াংশের সম্মতি। বিল ক্লিনটনকে যখন ১৯৯৮-৯৯ সালে অভিশংসিত করা হয় তখন সিনেটে সেটা দুই-তৃতীয়াংশের সম্মতি আদায় করতে ব্যর্থ হয়। ১৮৬৫ সালে আততায়ীর হাতে আব্রাহম লিঙ্কনের মৃত্যুর পর প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব নেওয়া অ্যানড্রু জনশনকে অভিশংসিত করা হয়েছিল। কিন্তু সিনেটে তাকে দোষী করা যায়নি।
তবে ট্রাম্প একের পর এক অসাংবিধানিক নির্বাহী আদেশ দিচ্ছেন, তাতে করে তার রিপাবলিকান দলের অনেকেই তার প্রতি বিরূপ মনোভাব পোষণ করছেন। আমেরিকা হলো অভিবাসীদের দেশ। এমনকী ট্রাম্পের বাবা-মাও অভিবাসী ছিলেন। তার তৃতীয় স্ত্রী ফার্স্ট লেডি মেলানিয়াও অভিবাসী। সুতরাং ট্রাম্প যা করছেন, সেটা তার নিজের ক্ষেত্রেও স্ববিরোধিতাপূর্ণ। আগের দুজন প্রেসিডেন্ট অভিশংসিত হলেও শেষ পর্যন্ত সিনেটে দোষী হননি। কিন্তু ট্রাম্পের ক্ষেত্রে সেই সৌভাগ্য নাও ঘটতে পারে।
লেখক : যুক্তরাষ্ট্রের উইসকনসিন বিশ্ববিদ্যালয়ের ইমিরেটাস প্রফেসর, ইন্টারন্যাশনাল পলিটিক্যাল সায়েন্স এসোসিয়েশন আর.সি-৩৭-এর চেয়ারম্যান, বাংলাদেশ ফাউন্ডেশন, ইউএসএ’র প্রেসিডেন্ট www.bangladesh-foundation.org
সর্বশেষ সংবাদ
- Rohingyas Want to Return Home, Bangladesh Tells UN
- এক দশক ধরে বিপুল সংখ্যক রোহিঙ্গাকে আশ্রয় দেওয়া দেশের জন্য টেকসই নয়, রোহিঙ্গারাও নিজ দেশে ফিরে যেতে চায় : জাতিসংঘে বাংলাদেশ
- Bangladesh and UN Women pledge closer cooperation to advance women’s empowerment and the WPS agenda
- নিউইয়র্কে চিটাগং অ্যাসোসিয়েশন অব নর্থ আমেরিকা (মাকসুদ-মাসুদ) এর সংবাদ সম্মেলনে কুৎসা রটানোর প্রতিবাদ
- নারীর ক্ষমতায়ন এবং নারী, শান্তি ও নিরাপত্তা এজেন্ডা এগিয়ে নিতে বাংলাদেশ ও ইউএন উইমেনের ঘনিষ্ঠ সহযোগিতার অঙ্গীকার
- State Minister for Foreign Affairs Urges Stronger Global Action to Protect Civilians, Uphold Humanitarian Law and Support Rohingya Repatriation
- বেসামরিক জনগণের সুরক্ষা, আন্তর্জাতিক মানবিক আইন সমুন্নত রাখা ও রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে জোরালো বৈশ্বিক পদক্ষেপের আহ্বান পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামার
- মহররম মাসের গুরুত্ব ও ফজিলত!