স্মৃতির জাদুঘরে টেলিগ্রাম
সমীর কুমার দে :
আলেকজান্ডার গ্রাহাম বেল যখন টেলিগ্রাফ যন্ত্র আবিষ্কার করেন সারা পৃথিবীতে পড়ে যায় হৈ চৈ। এরপর প্রায় টানা ১৭০ বছর দোর্দণ্ড প্রতাপে বিশ্বজুড়ে খবর আদান-প্রদানে ব্যবহূত হয় এই মাধ্যম। কি আনন্দ, কি বেদনা সব সংবাদই মুহূর্তে পৌঁছে গেছে প্রাপকের কাছে। বহু সংবাদ টেলিগ্রাম নিজেই বয়ে নিয়ে গেছে বিশ্বের একপ্রান্ত থেকে আরেক প্রান্তে। তার আগমনবার্তা এক সময়ের ধীরগতির নিস্তরঙ্গ জীবনে ক্ষণিকের জন্য হলেও ভরিয়ে দিত শ্বাসরুদ্ধকর উত্তেজনায়। সেই টেলিগ্রাম এখন স্মৃতির জাদুঘরে।
এই জুলাইতে ভারতে শেষ হয়ে যাচ্ছে টেলিগ্রাম যুগ। আগামীকাল (১৪ জুলাই) ভারত থেকে সর্বশেষ টেলিগ্রামটি পাঠানো হবে। এরপর টেলিগ্রাম চলে যাবে জাদুঘরে। উপমহাদেশে টেলিগ্রামের গুরুত্ব বোঝা যায় বাংলা চলচ্চিত্রেও। ‘সপ্তপদী’ ছবিতে মায়ের মৃত্যুর সংবাদ টেলিগ্রামের মারফতই পেয়েছিলেন কৃষ্ণেন্দুর ভূমিকায় অভিনয় করা উত্তম কুমার। ‘ফাদার অর মাদার ক্রিটিক্যাল, কাম শার্প’ ছবির একেবারে মোক্ষম মুহূর্তে এমন টেলিগ্রাম না আনতে পারলে চিত্রনাট্যের মোড় কীভাবে ঘোরাবেন, ভেবে কূল পেতেন না সিনেমার দক্ষ পরিচালকরাও। সিনেমাতে বহু সিরিয়াস, ট্র্যাজিক এবং কমিক দৃশ্যের অবতারণা করেছে একটিমাত্র টেলিগ্রাম। অথবা মহাগুরুত্বপূর্ণ টেলিগ্রাম যথাসময়ে না আসাটাই গল্পের শেষ পর্বে অসামান্য নাটকীয়তা এনে দিয়েছে। সেই মূল্যবান টেলিগ্রাম আজ নতমুখে বিদায় নিচ্ছে।
ভারতে টেলিগ্রাম যুগ শেষ হলেও বাংলাদেশে কিন্তু এখনই শেষ হচ্ছে না। ভারতের মতো বাংলাদেশে ঘোষণা দিয়ে টেলিগ্রামের যুগের বিলুপ্তি ঘটানোর কোন ইচ্ছেও নাকি নেই সরকারের। নামমাত্র চললেও বহু আবেগ মিশে আছে এই টেলিগ্রামের সঙ্গে। ঢাকা সেন্ট্রাল টেলিগ্রাফ অফিসের প্রধান তত্ত্বাবধায়ক আবুল হোসেন ইত্তেফাকের সঙ্গে আলাপকালে বলেন, এক সময় আড়াই হাজারের মতো জনবল ছিল এই টেলিগ্রাফে। এখন আছে শ’তিনেকের মতো। তাও কাজ করেন অন্য দফতরে। বাংলাদেশে প্রায় ৮শ টেলিগ্রাফ অফিস ছিল। আর এখন ৬৪ জেলার আছে ৪০টির মতো অফিস। তাও চলছে ধিক ধিক করে। কোথাও ঘরটি পরিত্যক্ত হয়েছে। আর কোন ঘরে জমেছে ময়লা-আবর্জনার স্তূপ। তবে ওই ঘরগুলোতে এখন আর নেই টেলিগ্রাফের টরে টক্কা যন্ত্র। কোথাও আছে একটি ফ্যাক্স মেশিন, আবার কোথাও আছে একটি ল্যান্ড টেলিফোন।
আবুল হোসেন বলছিলেন, টরে টক্কা যন্ত্রগুলো কেজির দরে বিক্রি করে দেয়া হয়েছে। এখন আসলে কারা টেলিগ্রাম করেন—জানতে চাইলে তিনি বলেন, আবহাওয়া অধিদফতরই একমাত্র নিয়মিত গ্রাহক তাদের। এক-দেড় লাখ টাকা তাদের সেখান থেকে আয় হয়। সব জেলায় আবহাওয়া অফিস না থাকায় আবহাওয়া বার্তা পাঠানো হয় টেলিগ্রামের মাধ্যমে। এগুলো তারা টরে টক্কা যন্ত্র দিয়ে নয়, ফ্যাক্সের মাধ্যমে পাঠিয়ে দেন। যেখানে ফ্যাক্স নেই সেখানে পাঠানো হয় ল্যান্ডফোনের মাধ্যমে। সেনাবাহিনী ও বিজিবি সদস্যদের ছুটির জন্য এখনো কোথাও কোথাও টেলিগ্রামের দরকার হয়। কোন সদস্য ছুটিতে বাড়িতে যাওয়ার পর বিপদ-আপদে ছুটি বাড়াতে শরণাপন্ন হন টেলিগ্রামের। কিছুদিন আগ পর্যন্তও বাংলাদেশ ব্যাংকের গোপন তথ্য আদান-প্রদান হতো টেলিগ্রামেই। দেশ স্বাধীনের পর বাংলাদেশের শুরু থেকেই দাপটের সঙ্গে তথ্য আদান-প্রদান করেছে টেলিগ্রাম। ১৯৮১ সালে সৌদি সরকারের অনুদানে টেলিগ্রাফ অফিস থেকে টাইপ রাইটার তুলে দিয়ে বসানো হয় টেলিপ্রিন্টার। তখন এক অফিসে বসে কোড ব্যবহার করে মোর্স কি দিয়ে লিখলে সংশ্লিষ্ট অফিসে কয়েক শব্দের একটা লেখা বের হত। যদিও তাতে অনেক সময় ভুল হলেও পরে তা ঠিক করার ব্যবস্থাও ছিল। এভাবেই চলছিল সবকিছু। ২০০৩ সালে সেই টেলিপ্রিন্টারকেও জাদুঘরে পাঠিয়ে বসানো হয় ফ্যাক্স মেশিন। এখন তার ব্যবহারও প্রায় শূন্যের কোঠায়।
বাংলাদেশে এখনো টেলিগ্রাম চালু থাকলেও এর মূল প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ টেলিকমিউনিকেশন কোম্পানি লিমিটেড (বিটিসিএল) তাদের ওয়েবসাইটে টেলিগ্রামকে পাঠিয়ে দিয়েছে ‘জাদুঘরে’। টেলিগ্রামের বর্ণনা, এটি কী এবং এই সংক্রান্ত নানা তথ্য রাখা হয়েছে সংস্থাটির ওয়েবসাইটের ‘মিউজিয়াম’ লিংকে। সব অফিস থেকে এসব যন্ত্রপাতি কেজি দরে বিক্রি হলেও বিটিসিএলের উপ-পরিচালক (তার) মামলুকার রহমান ব্যক্তিগত আগ্রহে কিছু টরে টক্কা যন্ত্র সংগ্রহ করেছেন। ইত্তেফাককে তিনি বলেন, কখনো এর মিউজিয়াম হলে এই যন্ত্রগুলোর দরকার পড়বে। তখন টাকা হলেও এগুলো আর পাওয়া যাবে না। তাই অনেক কষ্ট করে বিটিসিএলের একটি কক্ষে এগুলো তিনি সংগ্রহ করে রেখেছেন। দরকার হলে তখন তিনি টরে টক্কা যন্ত্রগুলোকে জাদুঘরে দেবেন।
মনে করা হয়, শুধু দুঃসংবাদই আসতো টেলিগ্রামে। আসলে শুধু দুঃসংবাদ নয়, অনেক সুসংবাদেরও বাহক ছিল টেলিগ্রাম? ‘শুধু পিতামাতার অসুস্থতা বা প্রয়াণের খবর কেন, গেরস্তের ঘরে খোকা হওয়া, মেজ কুমারের বিলাত হইতে ফেরা কিংবা ছোটখোকার সায়েবি আফিসে চাকরি হওয়ার সুসংবাদও উড়তে উড়তে নিয়ে গেছে টেলিগ্রাম? বাড়ির সদর দরজায় হাসি হাসি মুখে অপেক্ষায় থেকেছেন বখশিস এবং মিষ্টান্ন প্রত্যাশী, গ্রামের বহু পুরাতন ডাকপিওন কাকারা। দীর্ঘ এক সময় জুড়ে হাতেলেখা চিঠি এবং মাসকাবারি মানি অর্ডারের মতোই সামাজিক জীবনের শরিক থেকেছে টেলিগ্রাম? কখনো যদি বিনা মেঘে বজ পাতের মতোই এসেছে সে? সন্তান প্রসবকালে বড়খুকির মারা যাওয়া অথবা পুরনো মামলায় হার হয়ে বসতবাড়িটুকু বৈরী শরিকের হস্তগত হওয়ার দুঃসংবাদ এনেছে।’
বাঙালির জন্য টেলিগ্রামের সবচেয়ে বড় গুরুত্বপূর্ণ ব্যবহার হয়েছে ১৯৭১ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধের সময়। এই টেলিগ্রামের মাধ্যমেই বিশ্ব দরবারে পৌঁছেছিল পাকিস্তানি বাহিনীর গণহত্যার খবর। আর্চার কে ব্লাড তখন ছিলেন বাংলাদেশে নিযুক্ত মার্কিন কূটনীতিক। ১৯৭১ সালে পূর্ব পাকিস্তানে তিনি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের দূতাবাসের কনসাল জেনারেল নিযুক্ত হয়েছিলেন। তিনি বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় যুক্তরাষ্ট্র সরকারকে তত্কালীন চলমান নৃশংসতা বন্ধে ব্যর্থ হওয়ায় কঠোর ভাষায় একটি টেলিগ্রাম বার্তা পাঠানোর জন্য বিখ্যাত। তার সেই বিখ্যাত টেলিগ্রাম বার্তা ‘ব্লাড টেলিগ্রাম’ নামে পরিচিত।
২৫ মার্চ মধ্যরাতে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী ঢাকা শহরে গণহত্যা শুরু করে। ৬ এপ্রিল ১৯৭১ ঐতিহাসিক মার্কিন দূতাবাস থেকে একটি তারবার্তা পাঠানো হয়েছিল ওয়াশিংটনে মার্কিন পররাষ্ট্র দফতরে। ঢাকায় কর্মরত মার্কিন কর্মকর্তারা ২৫ মার্চের ‘কলঙ্কিত রাতের’ গণহত্যা এবং সে বিষয়ে নিক্সন-কিসিঞ্জারের অন্ধ ইয়াহিয়া ঘেঁষা নীতির প্রতিবাদ জানাতে সংকল্পবদ্ধ হয়েছিলেন। তারা খুব ভেবেচিন্তে একটি তারবার্তা লিখেছিলেন যাতে স্বাক্ষর করেছিলেন ব্লাড ও তার ২০ জন সহকর্মী। তারা তাতে ঢাকায় ইয়াহিয়ার গণহত্যার প্রতি ওয়াশিংটনের অব্যাহত নীরবতার নিন্দা করেছিলেন। ব্লাড তাতে কেবল স্বাক্ষরই দেননি, বাড়তি এক ব্যক্তিগত নোটও দিয়েছিলেন। তিনি লিখেছিলেন, ‘আমি বিশ্বাস করি, পূর্ব পাকিস্তানে এখন যে সংগ্রাম চলছে, তার সম্ভাব্য যৌক্তিক পরিণতি হলো বাঙালিদের বিজয় এবং এর পরিণতিতে একটি স্বাধীন বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠা।’ হেনরি কিসিঞ্জার এই টেলিগ্রাম বা তারবার্তার জন্য আর্চার কেন্ট ব্লাডকে নির্বাসন দণ্ডও দিয়েছিলেন।
সম্প্রতি ভারতে টেলিগ্রামকে জাদুঘরে পাঠানোর প্রতিক্রিয়ায় একটি দৈনিককে সাহিত্যিক শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায় বলেছেন, ‘এখন মোবাইলের যুগ। টেলিগ্রামের কী দরকার! পুরোনোকে আঁকড়ে ধরে তো বিশেষ লাভ নেই। আমরা হ্যারিক্যানের আলোয় লেখাপড়া করেছি? এখন কি কেউ করবে?’ আপনি কখনো টেলিগ্রাম পেয়েছেন? পেয়েছি বই কী। বাবার চাকরির সূত্রে বারবার বাসা বদলেছি। টেলিগ্রাম তো আসতই। টেলিগ্রাফের পিওন দেখলেই বুক ঢিপঢিপ করত। এই বুঝি কোনো খারাপ খবর এল! তবে ভাল খবরও আসত কখনও সখনও। অনেক সময় ভুল ঠিকানায় টেলিগ্রাম চলে যেত। —বলেন শীর্ষেন্দু। টেলিগ্রামের মৃত্যুঘণ্টায় অতএব খুব একটা বিচলিত নন প্রবীণ এই লেখক। তার মতে, যার বিদায় নেয়ার কথা, সে তো বিদায় নেবেই?ইত্তেফাক
সর্বশেষ সংবাদ
- নিউইয়র্কে চিটাগাং অ্যাসোসিয়েশন অফ আমেরিকা’র সংবাদ সম্মেলন: সংগঠনের বিরুদ্ধে চলমান মামলার নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত কোন নির্বাচন নয়
- যুক্তরাষ্ট্র প্রবাসী বাংলাদেশীদের মূলধারার ব্যবসা-বাণিজ্য রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত হওয়ার আহ্বান প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা ড. তিতুমীরের
- নিউইয়র্কে বাংলাদেশ সেমিট্রির কবরে মরদেহ সমাহিত করা যাবে ১ জুলাই থেকে
- যুক্তরাষ্ট্রের বিনিয়োগকারীদের জন্যে বাংলাদেশ এখন সবচেয়ে কার্যকর ও উপযোগী দেশ: প্রধানমন্ত্রীর অর্থনীতি ও পরিকল্পনা উপদেষ্টা ড. তিতুমীর
- নিউ জার্সির আটলান্টিক সিটিতে মেয়র মার্টি স্মল সিনিয়র স্কলারশিপ প্রোগ্রাম, আবেদন জমা দেওয়ার শেষ সময় ১৫ জুন
- নিউইয়র্কে মুনার ঈদ পুনর্মিলনী
- নিউইয়র্কে বাংলাদেশী ডক্টর ফোরাম অব নর্থ আমেরিকা’র উদ্যোগে ডা. ডোনার ও ডা. হারুন সংবর্ধিত
- নিউইয়র্ক স্টেট ডেমোক্র্যাটিক প্রাইমারী নির্বাচনে এসেম্বলিম্যান প্রার্থী জাকির চৌধুরীর ‘কমিউনিটি র্যালি’