হুমায়ূন আহমেদ সমাচার :শাওন যে আর দশটা সাধারণ মেয়ের মতো নয়, তা তো হুমায়ূন আহমেদকে বিয়ে করেই প্রমাণ করেছে

ব ঙ্গ বী র কা দে র সি দ্দি কী বী র উ ত্ত ম : এরই মধ্যে হুমায়ূন আহমেদকে নিয়ে বেশ কয়েকবার লিখেছি। ভদ্রলোক যথার্থই গুণী মানুষ ছিলেন। গুণীজনদের নিয়ে তাদের মৃত্যুর পরও টানাহেঁচড়া হয় যেটা হুমায়ূন আহমেদকে নিয়েও হচ্ছে। তবে হুজুগে বাঙালির মতো মনে হয় বড় বেশি হচ্ছে। সেদিন চট্টগ্রামের এক উকিল ভদ্রলোক তার স্ত্রী শাওন এবং অন্যপ্রকাশের স্বত্বাধিকারী মাজহারুল হকের নামে হত্যা মামলা রুজু করেছেন। মনে হয় জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত ভদ্রলোক হুমায়ূন আহমেদের কোনো বিষয়-আশয়ের খোঁজ-খবর করেননি। কিন্তু মৃত্যুর পর তার পক্ষে হত্যা মামলা করেছেন। একদিকে অবশ্য এর একটা মূল্য আছে। বিষয়টি একেবারে হেলাফেলা করার মতো নয়। অন্যদিকে কমবেশি ভুলত্রুটি যা-ই থাকুক, যারা সেবাযত্ন করেছে তাদের নামে এরকম মামলা ঠুকে দিলে ভবিষ্যতে আর কেউ কাউকে ভয়ে-ডরে দেখাশোনা করবে না। তখন ব্যাপারটা কেমন হবে? হুমায়ূন আহমেদ একজন বড় মানুষ, বড় মাথা তাই বড় ব্যথা। কিন্তু অসহায় গরিবের কী হবে? আগেই বলেছি, বিজ্ঞানের জমানায় এখন কোনো কিছুই চাপা থাকে না, সব বেরিয়ে আসে। অবহেলা যে কমবেশি হয়নি তা অস্বীকার করা যাবে না। কিন্তু মৃত্যুর পর আমরা যারা দরদি হয়েছি তারাই-বা জীবিতকালে কী করেছি! মৃত্যুর আগে খুব একটা খোঁজ-খবর কেউ করিনি। তার পরিবার পরিজনও করেনি। না করার যে কোনো কারণ ছিল না তাও নয়। আমাদের বাঙালি কৃষ্টি, সভ্যতা ও সামাজিকতার বিচারে হুমায়ূন আহমেদ খুব একটা সম্মানের পাত্র ছিলেন না। প্রচণ্ড মেধা, অভাবনীয় লেখনী শক্তি ছিল। তাই তার গুণকে সবাই কদর করে, তাকে নয়। কথায় আছে, পাপকে ঘৃণা কর, পাপীকে নয়। এক্ষেত্রেও কর্মকে সম্মান করা হয়েছে, কর্মীকে নয়। হৃদয় উজাড় করে বহু মানুষই তাকে ভালোবাসতে, শ্রদ্ধা করতে পারেনি। যে যতই বলুক মেয়ের বান্ধবীকে কেউ বিয়ে করলে তাকে বাঙালি সমাজ খুব একটা সম্মানের চোখে দেখে না। সব সমাজে সব ক্ষেত্রেই বড়দের বা ক্ষমতাবানদের সাত খুন মাফ। হুমায়ূন আহমেদের ক্ষেত্রেও তেমনই হয়েছে। একটা সাধারণ মানুষ ঘরে বউ থাকতে তিন নম্বর মেয়ের বান্ধবীকে বিয়ে করলে তাকে সমাজে বন্ধ দিত। পাড়া-প্রতিবেশীরা তার সঙ্গে সামাজিক আদান-প্রদান করত না। লেখার জগতে এত ক্ষমতাধর হওয়ার পরও তাকে যে তেমন যন্ত্রণা ভোগ করতে হয়নি তা নয়। একমাত্র মা ছাড়া আত্মীয়স্বজন অনেকেই তেমন যোগাযোগ রাখেনি। বউয়ের সঙ্গে ছাড়াছাড়ি হলেও চার-চারটি সন্তান, তাদের সঙ্গে তার কেন যোগাযোগ ছিল না? একজন মানুষের জন্য এর চাইতে চরম দুর্ভাগ্যের আর কী হতে পারে? তিনি যত জনপ্রিয়ই হোন, এক্ষেত্রে তার মতো দুর্ভাগা অসহায় মানুষ আর কেউ ছিল না। তবে তার মৃত্যুর পরও এমন হবে কিছুটা আন্দাজ করা গেলেও এতটা হবে তা কখনও ভাবিনি। এটা শুনে অবশ্যই বহু মানুষ আহত হয়েছে। একটা লাশ আনার সময়ও বিমানের ক্লাসের কথা চিন্তা করা হয়েছে। এক্সিকিউটিভ ক্লাসে একত্রে এতগুলো টিকিট পাওয়া যায়নি বলে লাশ আনতে দেরি হয়েছে। লাশের সঙ্গে আসতে গিয়েও যাদের ক্লাসের কথা মনে থাকে তারা কীভাবে মানুষের মধ্যে পড়ে? অসুস্থকে সম্পূর্ণ একা রেখে ঘণ্টার পর ঘণ্টা বাইরে থাকা, মলে গিয়ে বাজারঘাট করা—এটা কোনো আত্মীয়তার মধ্যে পড়ে না। যদিও অসুস্থ মানুষ যখন একেবারে অসহায় হয়ে পড়ে তাকে আত্মীয়স্বজন প্রিয়জনেরা কমবেশি সবসময়ই অবহেলা করে। যে পিতা শিশুসন্তানের জন্য রাতের পর রাত অনিদ্রায় কাটিয়ে বুকে করে রাখে সেই শিশু বড় হয়ে পিতা-মাতার যাবারকালে ওভাবে আগলে রাখে না। অসুস্থ গুরুকে একমাত্র ভক্তরাই হয়তো নিষ্ঠার সঙ্গে রাতদিন সেবাযত্ন করতে পারে বা করে, অন্য কেউ নয়। হুমায়ূন আহমেদের ক্ষেত্রে ব্যতিক্রম হবে কেন? প্রশ্ন উঠেছে, তিনি চেয়ার থেকে পড়ে গেলে সেকথা ডাক্তারকে বলা হয়নি। হতেই পারে স্বাভাবিকভাবেই বলেনি অথবা উদ্দেশ্য করে বলা হয়নি। তাতে কী যায় আসে? অমন উন্নত দেশে বললে বুঝতে পারবেন, না বললে পারবেন না এটা কেমন কথা! আমাদের দেশের হাতুড়ে ডাক্তাররাও তো অনেক কিছু আন্দাজ করতে পারে। চেয়ার থেকে পড়ে গিয়ে কী হয়েছিল এটা যদি আমেরিকার ডাক্তাররা ধরতে না পারে তাহলে আমাদের দেশের ডাক্তারদের তাচ্ছিল্য করে ফুটানি করতে উন্নত দেশে যাওয়া কেন? কথায় কথায় টাকাওয়ালারা চিকিত্সার জন্য বাইরে যান। আমেরিকায় গেলে তো অনেকে মনে করে তারা যেন আল্লাহর কাছে চলে গেছে। দরকার পড়লে হাসপাতাল থেকে নতুন মানুষ বানিয়ে আনবেন। তাদের যেসব আধুনিক চিকিত্সা যন্ত্রপাতি তাতে চেয়ার থেকে পড়া কেন, আসমান থেকে পড়লেও তাদের জানার বা বুঝার কথা। ভালো হাসপাতালে না নিয়ে খারাপ হাসপাতালে নেয়া হয়েছে। যদি তাদের টাকা না থেকে থাকে, হাসপাতালে যোগাযোগের সুযোগ না থেকে থাকে, এই কাজটি খুবই ভালো হতো শাওনের মতো ছোট্ট একটি মেয়ের হাতে এত বড় সাহিত্যিককে ছেড়ে না দিয়ে আমরাও যদি কিছু দায়িত্ব নিতাম; তাহলে এখন মামলা করা মানাতো। কোনো খোঁজখবরই করলাম না, এখন চাচার নামে একটা মামলা করে দিলাম—এটা কোনো জাতীয় দায়িত্ববোধের পরিচয় নয়। আসলে সরকারেরই ব্যাপারটা ভালোভাবে দেখা দরকার। শহীদ মিনারে লাশ আনা হলে ইলেক্ট্রনিক মিডিয়ায় গান বাজানো, কবর দেয়ার সময় গান বাজানো এগুলোতে সারা দেশের মানুষ ভীষণ অসন্তুষ্ট ও মর্মাহত হয়েছে। শুধু একা শাওনের জেদের কারণে নুহাশ পল্লীতে তাকে কবর দেয়া এটাও সাধারণ মানুষ তেমন পছন্দ করেনি। নুহাশ পল্লীতে দাফন করতে না দিলে শাওন আদালতে যাবে এবং যতদিন ফয়সালা না হবে লাশ হিমাগারে থাকবে, একথা যে কত বড় অন্যায় তা বলার মতো নয়। এতকিছুর পরও শাওনের পক্ষেও কিছু না কিছু যুক্তি তো অবশ্য আছে। শাওনের যে বয়স, শাওন যে ধরনের মেয়ে তাতে সে যতটুকু করেছে যথেষ্ট করেছে। তার কাছ থেকে এর চাইতে বেশি কিছু আশা করা যায় না। শাওন যে আর দশটা সাধারণ মেয়ের মতো নয়, তা তো হুমায়ূন আহমেদকে বিয়ে করেই প্রমাণ করেছে। চার-চারটি সন্তান এবং উপযুক্ত স্ত্রী থাকার পর সংসার ভেঙে নতুন করে সংসার গড়া কম সাহসের ব্যাপার নয়। সে সাহস তো অবশ্যই শাওন দেখিয়েছে। এমনিতেই বেশি বয়সী কোনো পুরুষকে বাচ্চা মেয়েরা বিয়ে করলে কথা শুনতে হয়। আর এখানে একেবারে ঘনিষ্ঠ বান্ধবীর বাবাকে বিয়ে করা যা তা ব্যাপার নয়। সে রকম একটি অভাবনীয় কাজ যার দ্বারা সম্ভব হয়েছে সে তো একটু আলাদা হবেই। শাওন না হয় ১৮-১৯ বছরের একটি বাচ্চা ছিল। হুমায়ূন আহমেদ তো বাচ্চা ছিলেন না। তিনি নিজেকে সঠিক পথে পরিচালিত করতে পারতেন। এক্ষেত্রে খুব একটা সফলকাম হননি। ইসলামী শরীয়ত মতে, একসঙ্গে চারটি বিয়ে চলে। তিনি তো মাত্র দুটি বিয়ে করেছিলেন। আমার বাবাও দুই বিয়ে করেছিলেন। উভয় ঘরেই সন্তান আছে। একসঙ্গেই ছিলাম এবং আছি। আমরা এখনও আপন পর বুঝি না। তিনি বিয়ে করে কোনো দোষের কাজ করেননি। কিন্তু দুই পরিবার একত্র রাখতে পারলেন না কেন? সব সন্তানের পিতা হতে পারলেন না কেন? যিনি হিমুর মতো কাল্পনিক চরিত্র সৃষ্টি করতে পারলেন বাস্তবে তিনি নিজে হিমুর মতো হলেন না কেন? হিমু চরিত্র উপহার দিয়ে সমাজের খুব একটা উপকার করেছিলেন, বুকে হাত দিয়ে বলা যাবে না। যেখানে বাকের ভাইয়ের ফাঁসির বিরুদ্ধে আন্দোলন হতে পারে, কেঁদে কেঁদে জারজার হওয়া যায় সেখানে বাস্তব জীবনে বাকের ভাইয়ের চাইতে চৌদ্দগুণ বেশি সংগ্রামী, ত্যাগী, জনদরদীদের জন্য আমরা কিছুই করি না। বাকের ভাইর চরিত্রের কারণে সন্ত্রাসী কমেনি, জনসেবা বাড়েনি। জিনিসগুলো একটু খতিয়ে দেখতে হবে। মানুষটি মরে গেছে, এখন তাকে শান্তিতে থাকতে দেয়াই উচিত। সেদিন পত্রিকায় নুহাশের পত্র দেখলাম। অনেক কথাই বলেছে। চিংড়ি মাছ খাওয়ার কথাও বাদ পড়েনি। একজন মুসলমান হিসেবে দু’একটি হাদিসের কথা বলি, একজন মুসলমান পিতা তার তিন কন্যাকে উপযুক্ত করে সত্পাত্রে পাত্রস্থ করতে পারলে সেই পিতাকে আল্লাহ বিনা প্রশ্নে বেহেশতবাসী করবেন। রসুলুল্লাহকে সাহাবীরা জিজ্ঞেস করেছিলেন, ‘হে রসুলে করীম (সা.), যদি কারও তিন কন্যা না থাকে, দুই কন্যা থাকে?’ রসুলে করীম (সা.) বলেছিলেন, ‘দুই কন্যা থাকলেও।’ সাহাবীরা আবার জিজ্ঞেস করেছিলেন, ‘যার দুই কন্যা নেই, যদি এক কন্যা থাকে?’ হজরত মোহাম্মদ (সা.) বলেছিলেন, ‘উপযুক্তভাবে ধর্মকর্ম শিখিয়ে এক কন্যাকে যে পিতা সত্পাত্রে পাত্রস্থ করতে পারবে তাকেও আল্লাহ রাব্বুল আল আমীন বিনা প্রশ্নে বেহেশতবাসী করবেন।’ পিতা-মাতার কর্তব্য যেমন সন্তান লালন পালন করে উপযুক্ত করে তোলা, ঠিক তেমনি সন্তানেরও পিতা-মাতার প্রতি আল্লাহ তায়ালা কিছু বিষয় নির্ধারণ করে দিয়েছেন। দুনিয়ার সবচাইতে ঘৃণার কাজ করলেও সন্তানের পিতা-মাতার প্রতি রুষ্ট হওয়ার বা তাদের খারাপ বলার কোনো অধিকার আল্লাহ তায়ালা সন্তানকে দেননি। সবার কাছে মা-বাবা অপরাধী হলেও সেই জঘন্য অপরাধীই সন্তানের কাছে একেবারে পুতপবিত্র, নিরপরাধ—একথা সব সন্তানের সবসময় মনে রাখা উচিত। আরও মনে রাখা উচিত, আল্লাহর নিচে রসুলুল্লাহর উপরে পিতা-মাতার স্থান। কোনো সন্তান সে যত বড় অলি, কামেল, গাউস, কুতুব হোন, মা-বাবার দোয়া ছাড়া আল্লাহ তায়ালা তাকে বেহেশেত নিবেন না। পিতা-মাতার পায়ের নিচে সন্তানের বেহশ্ত। বেশি করে মায়ের পায়ের নিচে। সন্তান হিসেবে এক্ষেত্রে হুমায়ূন আহমেদের সন্তানরা পিতার প্রতি সঠিক ব্যবহার করেছে কি? স্বামী-স্ত্রীর বিচ্ছেদ হতে পারে, কিন্তু পিতার সঙ্গে পুত্র-কন্যার বিচ্ছেদ হয় কী করে? এ বিচ্ছেদের তো কোনো পথ নেই। স্বামী-স্ত্রী বিবাহ-বন্ধন, এ একটি সামাজিক চুক্তি বা ব্যবস্থা। পিতা এবং মাতা কোনো চুক্তি নয়, এটা আল্লাহর দান। চুক্তি ভাঙা যায় কিন্তু আল্লাহর দান ফেরানো যায় না। এই নশ্বর পৃথিবীতে আমরা কেউ অবিনশ্বর নই। তাই ব্যাপারগুলো ভালো করে তলিয়ে দেখা উচিত। শুধু ভাবাবেগে অগ্রসর হলে চলবে না। যে ভদ্রলোক মামলা করেছেন সে ভদ্রলোক আগে-পিছের জিনিসগুলো যদি যথাযথ করতে পারতেন তাহলে তার মামলা মোকদ্দমার কোনো প্রয়োজন হতো না। আমরা আশা করব, মৃত্যু নিয়ে আর টানাটানি না করে আল্লাহর দরবারে হাজির হওয়ার জন্য তাকে প্রস্তুতির সময় দেয়া উচিত।আমার দেশ
সর্বশেষ সংবাদ
- ওয়ার্ল্ড হিউম্যান রাইটস ডেভেলপমেন্ট ইউএসএর সাধারণ সম্পাদক ড. সাদিয়া আফরিন এরা
- চরমোনাই পীরের যুক্তরাষ্ট্র সফর উপলক্ষে নিউইয়র্কে দোয়া মাহফিল, কুরআন-সুন্নাহর আলোকে বয়ান
- New York Attorney General James Secures Reimbursements for T-Mobile Customers Whose Rates Were Unjustly Raised
- নিউইয়র্কে বাংলাদেশ সোসাইটির নির্বাচনে কুনু-ফিরোজ পরিষদের সাত দফা ইশতেহার ঘোষণা; কমিউনিটি সেন্টার প্রতিষ্ঠা, সাশ্রয়ী ফিউনারেল সেবা, বিমানের সরাসরি ফ্লাইট ও আর্থিক স্বচ্ছতায় অঙ্গীকার
- ফিলিস্তিনিদের আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকারের প্রতি বাংলাদেশের পূর্ণ সমর্থন: জাতিসংঘে রাষ্ট্রদূত আইরিন খান
- নিউইয়র্কে বাংলাদেশ সোসাইটির নির্বাচনে প্রথমবারের মতো বিতর্ক, গুরুত্ব পেল স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি
- New York Attorney General James Warns New Yorkers About AI-Generated Election Misinformation Ahead of November Elections
- Bangladesh calls for global treaty to protect victims of crimes against humanity