ENGLISH

সময়ের পরশ পাথর


: ড. মোহাম্মদ আমীন সম্পাদিত :

ভূ মি কা
ভূমিকা গ্রন্থের সারসংক্ষেপ। বড় কিছু ছোট করে প্রকাশ করা কঠিন কাজ। একটি বাক্যে যখন অনেক কথা, অনেক জ্ঞান, অনেক তথ্য ও গভীর দর্শন প্রকাশ পায়Ñ তখন সেটি বাণী হয়ে ওঠে। মূল বক্তব্য সহজবোধ্য করে প্রকাশ করার ক্ষেত্রে বাণীর ভূমিকা সর্বজন স্বীকৃত। সে হিসেবে ভূমিকা গ্রন্থের বাণী। ছয় শতাধিক পৃষ্ঠার এ গ্রন্থটিকে কয়েক পৃষ্ঠায় নিয়ে আসার চিন্তা আরও ছয় হাজার পৃষ্ঠার একটি বই রচনার চেয়ে সময়সাপেক্ষ ও শ্রমসাধ্য। ভূমিকায় গ্রন্থের সারসংক্ষেপ প্রকাশের মত দক্ষতা আমার নেই। তাই নিজের অদক্ষতা আড়াল করার জন্য শুধু পটভূমিতে বিবরণ সীমাবদ্ধ রাখলাম।

২০০৫ খ্রিস্টাব্দের এক শীতের কথা। পিকনিকে গিয়েছি। সরকারি কর্মকর্তা, রাজনীতিবিদ, শিক্ষক, সাহিত্যিক, কবি, নাট্যকার, প্রকৌশলী, চিকিৎসক, সাংবাদিক, আইনবিদ, বিচারক, জনপ্রতিনিধি, ব্যবসায়ী, চিত্রশিল্পী, অভিনেতা, গায়কসহ বিভিন্ন পেশার জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ের পাঁচ শতাধিক নারী-পুরুষে জমজমাট। স্পটে পৌঁছার পর এক অংশগ্রহণকারী একটা নতুন প্রতিযোগিতার ধারণা দিলেন। এখনও জীবিত এমন লোকের মধ্যে কে কার ‘প্রিয় মানুষ ও আদর্শ ব্যক্তিত্ব’ এবং কেনÑতা সংক্ষেপে লিখতে হবে। বিচারকমণ্ডলী শ্রেষ্ঠ বিবেচনায় তিনজনকে বিজয়ী ঘোষণা করবেন।

আমি এমন কখনও ভাবিনি। শিশু বেলায় আমার প্রিয় মানুষ ও আদর্শ ব্যক্তিত্ব ছিলেন মা-বাবা। কলেজে এসে আহমদ ছফা। বিশ্ববিদ্যালয়ে আদর্শ মানুষ ও প্রিয় ব্যক্তিত্বের ধারণা আরও ব্যাপকতা পায়। যাকেই পড়ি শ্রেষ্ঠ মনে হয়। কর্মজীবনে এসে তা আরও বিস্তৃত হয়। রবীন্দ্রনাথ নাকি নজরুল; সেক্সপিয়র নাকি ফ্রান্সিস বেকন, বঙ্গবন্ধু নাকি আব্রাহাম লিংকন, সক্রেটিস নাকি আইনস্টাইন, মহাত্মা গান্ধী নাকি মাদার তেরেসা, কনফুসিয়াস না গৌতম বুদ্ধ! সবাই গত। বঙ্গবন্ধু জীবিত নেই। তাহলে লিখে দিতাম বঙ্গবন্ধু। এখন কার নাম বলি! বেশিক্ষণ ভাবতে হয়নি। কয়েক মিনিটের মধ্যে জীবিত ব্যক্তিদের মধ্যে আমার প্রিয় মানুষ ও ব্যক্তিত্ব নির্ধারণ করে নিলাম।

আমার ‘প্রিয় মানুষ ও আদর্শ ব্যক্তিত্ব’ বাংলাদেশের বিশিষ্ট শিক্ষানুরাগী ও সহনশীল রাজনীতির প্রবক্তা, বিশিষ্ট শিল্পপতি, দানবীর ও লেখক সৈয়দ আবুল হোসেন। কেন তিনি আমার প্রিয় মানুষ ও আদর্শ ব্যক্তিত্ব তা লিখতে মোটেও বেগ পেতে হল না। লিখেছিলাম: ‘তিনি স্ববিকশিত অনুপ্রেরণা। সুন্দর অবয়ব, চমৎকার ব্যবহার। ব্যক্তিত্বে আকর্ষণীয়, সদাহাস্যে অনুপম। অহঙ্কারের লেশমাত্র নেই। সমস্যা ও কারণ দুটোই দ্রুত এবং যথার্থ প্রত্যুৎপন্নমতিত্বে চিহ্নিত করতে পারেন। বুদ্ধিমান, ধীর ও স্থির। তাঁর রাজনীতি, চিন্তা-চেতনা ও আর্থ-সামাজিক দর্শন সার্বজনীন মূল্যবোধের নির্লোভ মমতায় সৌরালোকের মত উদ্ভাসিত ও বাতাসের মত প্রসারিত। তিনি প্রকৃতির মত সহনশীল, শিশুর মত সরল, জ্ঞানের মত বিশাল আর বৃষ্টির মত নির্লোভ। ক্ষমাশীলতার নান্দনিক ছন্দে আলোড়িত; বুদ্ধি, প্রখর দৃষ্টিভঙ্গীÑ তাঁর রাগ, ক্ষোভ, ঘৃণা ও বিমর্ষতাকে চিরতরে মুছে দিয়েছে। তিনি বঙ্গবন্ধুর ভক্ত, বঙ্গবন্ধুর আদর্শ বাস্তবায়নের মাঝে আনন্দ খুঁজে পান। দান তাঁর পেশা, শিক্ষাবিস্তার নেশা। তিনি দেশপ্রেমিক, দেশের জন্য যুদ্ধ করেছেন। রাজনীতিকে ব্যক্তিস্বার্থে নয়, ত্যাগের মহিমায় লাস্যময় করার প্রতিযোগিতায় নিবেদিত। প্রত্যন্ত এলাকার মানুষের প্রতি অপরিসীম মমতায় তিনি সদা সচেতন। কারও সাথে দুর্ব্যবহার করেন না। ধমনীতে উচ্চবংশীয় পবিত্র রক্তের প্রবাহ। তিনি সফল ব্যবসায়ী, খ্যাতিমান রাজনীতিবিদ, বিশ্লেষণধর্মী লেখক, তুলনাহীন দাতা, অনাবিল শিক্ষানুরাগী। তিনি পরিশ্রমী, তেজি ও আত্মপ্রত্যয়ী। শত্র“কে বন্ধু বানিয়ে বিনাশ করেন। তিনি ধর্মপ্রাণ কিন্তু অসাম্প্রদায়িক, ধনী কিন্তু নিরহঙ্কারী। শিক্ষিত কিন্তু উন্নাসিক নন। চিত্ত ও বিত্ত দুটোই তার উচ্চ শিক্ষার মত সমৃদ্ধ। বাংলাদেশের আর কোন জীবিত ব্যক্তি নেই যিনি এতগুলো প্রত্যয় ও বিশেষণে ঋদ্ধ। এসব গুণাবলীর পরিপূর্ণতা তাঁকে হৃদযোগীতে পরিণত করেছেন। তাই সৈয়দ আবুল হোসেন আমার প্রিয় ব্যক্তিত্ব।’

প্রতিযোগিতায় আমি প্রথম হয়েছিলাম। সেদিনই আমি সৈয়দ আবুল হোসেনকে নিয়ে একটি গ্রন্থ লেখার সিন্ধান্ত নিই। ভেবেছিলাম পূর্ণাঙ্গ জীবনী লিখব। বন্ধুবর ওসমান গণির পরামর্শে তা আপাতত স্থগিত রেখে সৈয়দ আবুল হোসেনের পরিচিত বিভিন্ন ব্যক্তির লেখা নিয়ে একটি সংকলন প্রকাশ করব তা স্থির করি। আমার শিক্ষক ও চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তন উপাচার্য ড. আবদুল করিমের পরামর্শ নিয়ে কাজ শুরু করি ২০০৬ সাল থেকে। কয়েক জনের লেখাও সংগ্রহ করি। তবে ওয়ান-ইলেভেন আমার কাজ পিছিয়ে দেয়। দেশের স্বাভাবিক অবস্থা ফিরে এলে আবার শুরু করি। বিভিন্ন সময়ে অনেকের কাছ থেকে লেখা সংগ্রহ করে একত্রিত করি। এ সংগ্রহের কাজ চলে ২০১২ সাল পর্যন্ত। এই ৬ বছরের সাধনার ফসল এ সংকলন। লেখা সংগ্রহের সময় যাঁরা যে পদে আসীন ছিলেন বইটির লেখক পরিচিতিতে সেই পদমর্যাদাই ব্যবহার করা হয়েছে।

এটি ব্যক্তি নিয়ে বিবর্ধিত আমার প্রথম সংকলন। ভেবেছিলাম সহজ কাজ। কাজে নেমে বুঝলাম সহজ নয়। বিশেষ করে, জীবিত ব্যক্তির ওপর স্মারকগ্রন্থ প্রকাশ করা কত যে কঠিন তা ভুক্তভোগী ছাড়া কেউ বুঝতে পারবেন না। গ্রন্থে নির্ধারিত ব্যক্তির চিন্তা-চেতনা, দর্শন ও দৃষ্টিভঙ্গীর প্রতিফলন ও অবিকলন উপস্থাপন আবশ্যক। নইলে তিনি নিজেই এটি প্রত্যাখ্যান করবেন। অধিকন্তু সৈয়দ আবুল হোসেনের মত অতি উঁচু মননশীলতার একজন ব্যক্তিত্বকে তাঁর জীবদ্দশায় আমার মত সাধারণ একজনের প্রয়াসে বিকশিত করাÑ পুরো পৃথিবী উল্টে দেয়ার মতই অসাধ্য ব্যাপার। তবু সাহস করলাম, ষাট শতাংশ নম্বর পেলেই তো প্রথম বিভাগ!

কত জনের কাছে কত জায়গায় যেতে হল। কালকিনি ঘুরলাম, কত জনের সাক্ষাৎকার নিলাম তার ইয়ত্তা নেই। সৈয়দ আবুল হোসেনের আত্মীয়-স্বজন, শিক্ষক, স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়, ব্যবসায়ী, রাজনীতিক, সংসদ সদস্য ও মন্ত্রিজীবনের সহকর্মী এবং নিকটতম লোক ছাড়াও অনেকের সাথেÑ এমনকি তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বী অনেকের সাথেও কথা বলেছি। প্রায় সবাই সহযোগিতা করেছেন, উৎসাহ দিয়েছেন। কেউ বা আবার এড়িয়ে গিয়েছেন। দু’একজন নিরুৎসাহিতও করেছেন। আমি হতাশ হইনি। হতাশ না হওয়ার কৌশলটা আমি সৈয়দ আবুল হোসেনের কাছ থেকে রপ্ত করেছি।

যদি কেউ অন্যের অভাব কিংবা কষ্টে নির্বিকার থাকেন, তখন লোকে তাকে নিষ্ঠুর, কৃপণ ইত্যাদি কু-বিশেষণে বিশেষায়িত করে। আবার যদি উদার হাতে এগিয়ে আসেন তখন বলে, প্রচারের জন্য করছে, নাম-লোভী। এটি বাঙালি চরিত্রের অন্যতম বৈশিষ্ট্য। আমার এ সংকলনকে অনেকে তোষামোদ বলে ভাবতে পারেন। প্রত্যেকের নিজস্ব ভাবনার অলঙ্ঘনীয় স্বাধীনতা আছে। কারও ভাবনা নিয়ে আমার কোন মাথাব্যথা নেই। আমার চোখে যেটি সুন্দর, মোহনীয় সেটি উচ্ছ্বসিত ভাবালুতায় প্রকাশ করতে কোন অবস্থাতে দ্বিধা করব না, পিছিয়ে যাব না।

সৈয়দ আবুল হোসেন আমার প্রিয় মানুষ ও আমার চোখে তিনি শ্রেষ্ঠ ব্যক্তি। তাই আমি তাঁকে নিয়ে সংকলনটি প্রকাশ করলাম। এখানে কারও প্রশংসার প্রত্যাশা যেমন করি না, তেমনি করি না নিন্দার শঙ্কা। আমার প্রিয় মানুষকে আমি প্রকাশ করব আমার আনন্দের জন্য। এ ছাড়াও সংকলন প্রকাশের অন্য একটি উদ্দেশ্য আছে। সেটি হল, যে দেশে গুণীর কদর নেই, সে দেশে গুণী জন্মায় না। দেশে অনেকের স্মারকগ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে; তাদের কয়জনই বা সার্বিক বিবেচনা ও চূড়ান্ত বিশ্লেষণে সৈয়দ আবুল হোসেনের মত চিত্ত-বিত্ত ও মননশীলতায় তাঁর কাছাকাছি হবার যোগ্যতা রাখেনÑ সে বিষয়ে আমার ভাল ধারণা আছে। যে সকল গুণ মানুষের শ্রেষ্ঠত্বের পরিচায়কÑ তার সবগুলো গুণ সৈয়দ আবুল হোসেনে বর্তমান।

অনেকে বলেন, মানুষ সর্বশ্রেষ্ঠ প্রাণী। কথাটা আমি পুরোপুরি মেনে নিতে সংশয় বোধ করি। আমার মতে, ব্যক্তিবিশেষ বুদ্ধিমান হতে পারেন, সামষ্টিকভাবে মনুষ্য জাতি শ্রেষ্ঠ নয়। পৃথিবীতে এখনও অনেক মানুষ আছেন যারা বুদ্ধিমত্তা, দৃষ্টিভঙ্গী ও চিন্তাচেতনায় পশুর চেয়ে অধম। ধর্মীয় উন্মাদনায় হায়ে না। মানুষ যদি বুদ্ধিমান প্রাণী হত তাহলে নিউটন, আর্কিমিডিস, সক্রেটিস, এরিস্টটল, আইনস্টাইন, সেক্সপিয়র, রবীন্দ্রনাথ কিংবা স্টিফেন হকিং-এর পাশে ভূত-প্রেত বা ঝাড়-ফুঁকে বিশ্বাসীদের অবস্থান দেখা যেত না। বাংলাদেশের মত তৃতীয় বিশ্বের নিরক্ষরাধিক্য দেশে তা আরও প্রবল। হয়ত তাই সৈয়দ আবুল হোসেন শিক্ষা বিস্তারের আন্দোলনে নেমেছেন। শিক্ষাকে সবার দোরগোড়ায় পৌঁছে দিয়ে তিনি মানুষকে প্রকৃত অর্থে সৃষ্টির সেরা জীবে পরিণত করার প্রত্যয়ে উদ্দীপ্ত।

সৈয়দ আবুল হোসেনের সাথে ঘনিষ্ঠ এমন অনেককে তাঁর সম্পর্কে কিছু লিখতে অনুরোধ করেছি। প্রচুর সাড়া পেয়েছি। অনেক লেখা এসেছে। তা থেকে বাছাই করে কয়েকটি মাত্র প্রকাশ করা হয়েছে। হাতে গোনা কয়েকজন আমাকে পরোক্ষভাবে উপহাস করেছেন। একজন নিজেকে সৈয়দ আবুল হোসেনের বন্ধু দাবি করেন। তিনি বরেণ্য শিক্ষাবিদ। তাকে একটা লেখা দেয়ার জন্য অনুরোধপত্র দিয়েছিলাম। অনেকদিন হয় জবাব না পেয়ে ফোন করলাম। বললেন, সময় নেই। অথচ বাংলা সাহিত্যের জীবন্ত কিংবদন্তী সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়কে চিঠি দেয়ার তিন দিন পর তিনি লেখা পাঠিয়ে দেন।

খুব উঁচু পদে আছেন এমন একজন বললেন, এত লোক থাকতে সৈয়দ আবুল হোসেন আপনার প্রিয় ব্যক্তিত্ব হল কেন? সবিনয়ে বলেছিলাম, আমার বিবেচনা আমার কাছে। বলেছিলাম, এমন একটি সদ্গুণের কথা বলেন যেটি সৈয়দ আবুল হোসেনের নেই, এমন একটি ক্ষেত্রের কথা বলেন যেখানে তাঁর শ্রেষ্ঠত্ব নেই এবং এমন একটি দোষের কথা বলেন যেটি সৈয়দ আবুল হোসেনের আছে। তিনি অনেকক্ষণ ভেবে বললেন, ‘আমি আপনাকে যাচাই করার জন্য এটি বলেছি। আপনি সঠিক। তাকে আবার আমার কথা বলবেন না যেন।’ আমি বলেছিলাম, আমি তার কাছ থেকে এমন দীক্ষা পাইনি। সৈয়দ আবুল হোসেনের চেয়ে শ্রেষ্ঠ কোন ব্যক্তি না পাওয়া পর্যন্ত তিনি আমার জীবনে জীবিত ব্যক্তিদের মধ্যে প্রিয় মানুষ ও শ্রেষ্ঠ ব্যক্তি হয়ে থাকবেন। তাঁর সম্মাননা গ্রন্থ আমাকে এক বার নয় বারবার, হাজার বার চয়ন করতে হবে।

সৈয়দ আবুল হোসেন সম্মাননা গ্রন্থ প্রকাশ করছি জেনে অনেকে আমাকে বাহবা দিয়েছেন। অনেকে আবার মুখটা কালো করে ফেলেছেন। দুটোই আমার কাছে ভাল লেগেছে। যারা বাহবা দিয়েছেন তারা সৈয়দ আবুল হোসেনকে শ্রেষ্ঠ হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছেন। যারা এড়িয়ে গেছেন তারা এটি করেছেন ঈর্ষাবশত। তার মত হতে না পারার যাতনায় মুখটা কালো করে ফেলেছেন। দুটোই সৈয়দ আবুল হোসেনের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণ করেছে। আমি উভয় দলের চোখেমুখে সৈয়দ আবুল হোসেন যে একজন অতুলনীয় ব্যক্তিত্ব তার স্বীকৃতি পেয়েছি। এটি আমার প্রয়াসকে যথার্থ প্রমাণিত করেছে। দ্বিতীয় দলের প্রতি আমার নিবেদন, বড় হওয়ার মধ্যে কোন লজ্জা নেই। সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের ভাষায়, যোগ্য ব্যক্তিকে যোগ্য সম্মান প্রদর্শন মহানুভবতার পরিচায়ক। যারা মহানুভব তারাই কেবল এ কাজটি করতে পারেন।

সংকলনটি প্রণয়নে যাঁরা আমাকে লেখা, ছবি, সাক্ষাৎকার, তথ্য, বুদ্ধি ও পরামর্শ দিয়ে সহায়তা করেছেন তাদের সবার প্রতি রইল কৃতজ্ঞতা। বিভিন্ন ব্যক্তির লেখার সমন্বিত প্রয়াস বলে পুনরাবৃত্তি লক্ষণীয়। লেখকের লেখার প্রতি সম্মান জানিয়ে তা মেনে নেয়া হয়েছে। তথ্যগত বিভ্রান্তি থাকাও অস্বাভাবিক কিছু নয়। তাছাড়া মুদ্রণজনিত প্রমাদ অনেকটা মানব জীবনের ভুলের মতই অবশ্যম্ভাবী! এ সব বিষয়ে সদাশয় পাঠকের কাছ থেকে ক্ষমা, পরামর্শ ও সঠিক তথ্য প্রার্থনা করছি।

ড. মোহাম্মদ আমীন
ইস্কাটন রোড, ঢাকা

দ্বি তী য় সং স্ক র ণে র ভূ মি কা

সময়ের পরশ পাথর গ্রন্থের প্রথম সংস্করণ ইতোমধ্যে শেষ হয়ে গিয়েছে। বইটি এত তাড়াতাড়ি শেষ হয়ে যাবে ভাবা যায়নি। পত্রপত্রিকায় সৈয়দ আবুল হোসেনকে নিয়ে যত লেখালেখি হয়েছে; যত আলোচনা-সমালোচনা হয়েছে তাতে কিন্তু এমনটি ভাবাই উচিত ছিল। যার বিরুদ্ধে এত সমালোচনা তার অনুকূলে কী প্রশংসা থাকতে পারে, সময়ের পরশ পাথর গ্রন্থে এমন কী পরশ আছে; অন্যদিকে যিনি দেশের একজন অদ্বিতীয় দানবীর, ৩টি বিশ্ববিদ্যালয় কলেজসহ শতাধিক শিক্ষালয়ের প্রতিষ্ঠাতা তার বিরুদ্ধে এত সমালোচনা কতটুক যৌক্তিক সে সম্পর্কে সবার আগ্রহই ছিল গ্রন্থটির মূল আকর্ষণ। সৈয়দ আবুল হোসেনের সমালোচকরা গ্রন্থটি নিয়েছেন। তেমনি নিয়েছেন বন্ধু, শুভানুধ্যায়ী, আলোচক এবং সাধারণ মানুষ। প্রথম আলো পত্রিকাসহ বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় বইটি নিয়ে আলোচনা হয়েছে, সমালোচনা হয়েছে। যা অনেককে গ্রন্থটির প্রতি আগ্রহ সৃষ্টি করেছে। একজন বিচারপতি (প্রাক্তন), কয়েকজন সামরিক-বেসামরিক উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা; সাহিত্যিক, কলামিস্ট, শিক্ষক, আইনজীবী, ব্যবসায়ী, রাজনীতিবিদ, সাংবাদিক, পেশাজীবী ফোন করে বইটি সংগ্রহের ইচ্ছা প্রকাশ করেছেন। অনেকে পত্র দিয়েছেন, মেইল করেছেন, ফোন করেছেন, ব্লগে লিখেছেন। কেউ করেছেন প্রশংসা। অনেকে বইটির বিভিন্ন দিক পর্যালোচনা করে চমৎকার পরামর্শ দিয়েছেন। এদের সবার প্রতি আমি কৃতজ্ঞ।

পৃথিবীতে কোন কিছু পরিপূর্ণ নয়। তাই সমালোচনা অনিবার্য। কিন্তু সমালোচনা অনেকে সহ্য করতে পারেন না। তবে সমালোচনা কখনও খারাপ নয় বরং কল্যাণকর। এ জন্য বিশ্ব জ্ঞানমণ্ডলে সমালোচনা একটি সাহিত্যকর্ম হিসেবে স্বীকৃত। একটি কথা খেয়াল রাখা দরকার, হিংসা, বিদ্বেষ কিংবা উদ্দেশ্যপ্রসূত বক্তব্য কখনও সমালোচনা নয়। সমালোচনাকে অনেকে নিন্দা বা কুৎসার সমার্থক মনে করে থাকেন। তবে সমালোচনা আর কুৎসার পার্থক্য আকাশ পাতাল। সমালোচনা গবেষণাময় পর্যবেণের অভিক্ষেপ এবং যুক্তির ভাবার্থ। অন্যদিকে নিন্দা অবিবেচনাপ্রসূত মন্তব্য; যার উৎস রাগ আর ঈর্ষা।

গ্রন্থটির সমালোচনা করতে গিয়ে প্রথম আলো পত্রিকায় শওকত হোসেন লিখেছেন- “সৈয়দ আবুল হোসেনের সব সময়ের সঙ্গীদের কথা বইটিতে আছে। কিন্তু টিসিবিতে চাকরিকালীন কোনো সহকর্মীর স্মৃতিচারণ এখানে নেই।” এটি অত্যন্ত যৌক্তিক সমালোচনা। অনেক খুঁজে এমন একজনকে পাওয়া গেল। তিনি হচ্ছেন মার্কিন প্রবাসী টিসিবির প্রাক্তন পরিচালক ও জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের সদস্য জনাব মোবারক এ মোল্লা। তার কাছে সময়ের পরশ পাথর গ্রন্থটির একটি কপি ও প্রথম আলোর সমালোচনা পাঠিয়ে মন্তব্য করার অনুরোধ জানানো হয়। তিনি ই-মেইলে একটি মন্তব্য পাঠান। প্রাসঙ্গিক বিবেচনায় প্রথম আলোর সমালোচনা ও মোবারক এ মোল্লার মন্তব্য দ্বিতীয় সংস্করণে প্রদান করা হল। অনেকগুলো মন্তব্য, সমালোচনা ও আলোচনা পেয়েছি। কলেবর বৃদ্ধি রোধ করার লক্ষ্যে ইচ্ছা থাকা সত্বেও এ সব পত্রস্থ করা সম্ভব হল না। তবে প্রফেসর ফারজানা জে চৌধুরীর ই-মেইলটা দেয়ার লোভ সম্বরণ করতে পারলাম না।

এ সংস্করণের জন্য লেখা আহবান করা না হলেও ইতোপূর্বে প্রাপ্ত অনেক লেখা জমা হয়েছিল। তারপরও অনেক লেখা পেয়েছি। কিন্তু কলেবর বৃদ্ধি প্রতিহত করার জন্য অনেক উত্তম লেখাও যুক্ত করা সম্ভব হয়নি। এগুলোর জন্য আর একটি নতুন বই প্রকাশ করতে হবে। তবে পাঠকদের সমালোচনা ও পারিপার্শ্বিকতা বিবেচনায় কবি অসীম সাহার “অপরাধী জানিল না কি বা অপরাধ তারÑ বিচার হইয়া গেল”, অর্ণব রায় এর “শুধু তার বেলা কেন?” এবং সাংবাদিক নির্মল চক্রবর্তীর ‘সৈয়দ আবুল হোসেন, পদ্মাসেতু ও বিশ্বব্যাংক’ শিরোনামের তিনটি রচনা নতুনভাবে যুক্ত করা হয়েছে। অনেকে ছাপার ভুলগুলো সংশোধন করার তাগিদ দিয়েছেন। অনেকে ফোন করে কোথায় ছাপার ভুল হয়েছে তা বলে দিয়েছেন। গ্রন্থে দৃশ্যমান বানান কিংবা কারণিক ত্র“টিগুলো সংশোধন করার চেষ্টা করা হয়েছে। তারপরও যদি কোন ভুলভ্রান্তি থেকে যায় তা সহৃদ্যতয়র সাথে ক্ষমা সুন্দর দৃষ্টিতে দেখার নিবেদন করছি। আশা করি প্রথম সংস্করণের ন্যায় দ্বিতীয় সংস্করণেও গ্রন্থটি পাঠক প্রিয়তা পাবে।

যে সকল মহৎপ্রাণ ব্যক্তির লেখা দিয়ে গ্রন্থটির অবয়ব গ্রন্থের অবয়ব অখণ্ড একটি বিষয় চয়ন করা চরিত হয়েছে এখানে শব্দ ব্যবহার শুদ্ধ নয় এটা রচনা নির্মাণ গঠন জাতীয় শব্দ দিলে সঙ্গত হত। হয়েছে তাদের প্রতি আবারও রইল কৃতজ্ঞতা। যারা গ্রন্থটি নিয়ে আলোচনা-সমালোচনা করেছেন, ব্যক্তিগতভাবে ফোন কিংবা ই-মেইল বা সামনা-সামনি উপদেশ দিয়েছেন তাদের ঋণ শোধ করা সম্ভব নয়। সবার প্রতি রইল শ্রদ্ধা। গ্রন্থটি সম্পর্কে যে কোন পরামর্শ ও সমালোচনা কৃতজ্ঞতার সাথে গৃহীত হবে।

ড. মোহাম্মদ আমীন
তারিখ : ৩০ মার্চ ২০১৩ নিউ সার্কুলার রোড
ঢাকা

সূ চি প ত্র

প্র থ ম অ ধ্যা য় : সৈয়দ আবুল হোসেন : জীবন ও কর্ম ……………………..
ড. মোহাম্মদ আমীন

সৈয়দ আবুল হোসেনের জন্মস্থান কালকিনির ইতিকথা ২৩
কালকিনির ইতিহাস ২৭
কালকিনির জনমিতি ও ঐতিহ্য ৪১
আধুনিক কালকিনির জনক ৪৮
সৈয়দ আবুল হোসেনের বংশ পরিচয় ৫২
সৈয়দ আবুল হোসেনের বংশলতিকা ৬০
সৈয়দ আতাহার আলী ও সৈয়দা সুফিয়া খাতুন ৬৪
সৈয়দ আবুল হোসেনের শিক্ষাজীবন ৬৯
সৈয়দ আবুল হোসেনের পারিবারিক ও কর্মজীবন ৭৯
সৈয়দ আবুল হোসেনের কৃতিত্ব, অবদান ও স্বীকৃতি ৮৩
জনতার চোখে সৈয়দ আবুল হোসেন ৯৩
সৈয়দ আবুল হোসেনের জীবনের মহামানবীয় কয়েকটি ঘটনা ১০০
সৈয়দ আবুল হোসেন : তেজময় সিংহপুরুষ ১০৬
আলাপচারিতায় দার্শনিক নান্দনিকতা ১১২

দ্বি তী য় অ ধ্যা য় : সময়ের পরশপাথর …………………………………………

সৈয়দ আবুল হোসেনের জন্য শুভেচ্ছা কবীর চৌধুরী ১২৫
ধন্যবাদ সৈয়দ আবুল হোসেন বেগম সুফিয়া কামাল ১২৮
শুভেচ্ছা আনিসুজ্জামান ১৩০
নিপাট ভদ্রলোক সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় ১৩১
আমার ভালোলাগা একজন আবদুল মান্নান সৈয়দ ১৩৩
সৈয়দ আবুল হোসেন : ব্যক্তিগত মূল্যায়ন হাসনাত আবদুল হাই ১৩৯
অপরাধী জানিল না কি বা অপরাধ তারÑ 
বিচার হইয়া গেল অসীম সাহা ১৪৪
সৈয়দ আবুল হোসেন, মান্যবরেষু ইমদাদুল হক মিলন ১৫০
পদ্মা সেতু প্রকল্প এবং আমাদের করণীয় আইনুন নিশাত ১৫২
সৈয়দ আবুল হোসেন গভীর ষড়যন্ত্রের শিকার নির্মল চক্রবর্তী ১৫৭
সুশোভিত সুমন আতাউর রহমান খান কায়সার ১৬৯
পদ্মা সেতু প্রকল্পের প্রাসঙ্গিক বাস্তবতা মো. মোশাররফ হোসেন ভুঁইয়া ১৭৪
সৈয়দ আবুল হোসেন : আপনাকে মো. মোজাম্মেল হক খান ১৯৩
বলতে চাই তারই কথা ড. এম এ মাননান ১৯৭
কিছু স্মৃতি কিছু কথা শফিক আলম মেহেদী ২০১
একজন স্বয়ংসিদ্ধ মানুষ সম্পর্কে আবদুল গাফফার চৌধুরী ২০৪
সৈয়দ আবুল হোসেনের রাজনীতিক দর্শন ড. আবদুল করিম ২০৬
সততাই সর্বোৎকৃষ্ট পন্থা এম মতিউর রহমান ২১৬
বন্ধু আমার উদার নিদাঘ আকাশ আবুল হাসান চৌধুরী ২২২
বিশ্বব্যাংকের পিঠটান : 
বাংলাদেশের উত্থান মুন জনি ২৩২
শুধু তার বেলা কেন? অর্ণব রায় ২৩৬
মহাঋত্বিক মোস্তফা ফারুক মোহাম্মদ ২৪৬
যেমন তাকে দেখেছি সৈয়দ আলমগীর ফারুক চৌধুরী ২৫৩
মননে উদ্ভাসিত অনুজপ্রতীম এম আজিজুর রহমান ২৫৭
একটি দরদি হাত রয়েছে বাড়ানো অজয় দাশগুপ্ত ২৬২
বোয়াও ফোরাম ফর এশিয়া ও 
সৈয়দ আবুল হোসেন অজিত সরকার ২৭৭
মিসরের আসওয়ান বাঁধ এবং পদ্মা সেতু মেজর জেনারেল এ কে
মোহাম্মাদ আলী শিকদার (অব.) ২৮৬
আমার আলেকজান্ডার অধ্যক্ষ আলহাজ্ব মো. 
তমিজ উদ্দিন ২৯২
সৈয়দ আবুল হোসেন, 
পদ্মা সেতু ও বিশ্বব্যাংক মোবেশ্বের হোসেন ৩০৪
অবগুণ্ঠনে খুঁজে ফিরি কে এম ইফতেখার হায়দার ৩১৪
আবুল হোসেনের সৌভাগ্য বনাম 
পদ্মা সেতুর দুর্ভাগ্য গোলাম মাওলা রনি এমপি ৩১৭
পদ্মা সেতু উপাখ্যান : সত্য বনাম কল্পনা ড. মোজাম্মেল খান ৩২২
সতত বিভাময় মোহাম্মদ মোস্তফা ৩২৬
বহুমাত্রিক প্রজ্ঞা সিরাজ উদ্দীন আহমেদ ৩৩৩
সময়ের বরপুত্র ড. হাসমত আলী ৩৩৭
ম্যাগনেটিক ব্যক্তিত্ব ফরহাদ রহমান ৩৪০
পঞ্চমণি ড. মো. আবদুল জলিল ৩৪৬
পদ্মা সেতু প্রকল্প বৃত্তান্ত জামিলুর রেজা চৌধুরী ৩৫৩
শতাব্দীর স্মৃতি আব্দুল কাদের ৩৫৭
বিশাল মনের মাটির মানুষ মজিবর রহমান ৩৬৫
মহান এক মানুষ ওসমান গণি ৩৬৮
সৈয়দ আবুল হোসেনকে যেমন দেখেছি তরুন তপন দেওয়ান ৩৭২
অসাম্প্রদায়িক চেতনার এক অনন্য ব্যক্তিত্ব অধ্যক্ষ হযরত মৌলানা 
মো. ইউনুস আলী ৩৭৬
এক আদর্শ সংসদ সদস্যের কথা অধ্যাপক মোহাম্মদ ওয়ালীউল্লাহ ৩৮৩
মহাকালের যাত্রী দুলাল সরকার ৩৯০
মনের মুকুরে আবদুল আজিজ হাওলাদার ৩৯৬
নেতার মতো নেতা আলহাজ্ব উপাধ্যক্ষ মুহাঃ 
জালাল উদ্দিন ৪১১
আধুনিক কালকিনির বিনির্মাতা অধ্যক্ষ মো. খালেকুজ্জামান ৪১৮
আমার ভাই আমার আদর্শ ড. সৈয়দ এ হাসান ৪২৪
সার্বজনীন রাজনীতিবিদ ড. একেএম আখতারুল কবীর ৪৩৪
নিজস্ব অর্থায়নে পদ্মা সেতু অধ্যাপক ইবনে হাসান আলম ৪৪০
আমার বাল্যবন্ধু মো. লাল মিয়া ৪৪৩
প্রেরণাদায়ী সহধর্মিনী খাজা নার্গিস আহমদ হোসেন বীরপ্রতীক ৪৪৯
ছাত্রনং অধ্যয়নং তপোঃ মো. শামশুল আলম মিয়া ৪৫৫
আমার দেখা সৈয়দ আবুল হোসেন অধ্যক্ষ মো. জসিম উদ্দিন ৪৫৯
খুঁজে বেড়াই তারে অধ্যাপক মনোরঞ্জন দাশ ৪৭০
মহানুভব এক মহানায়ক অধ্যক্ষ প্রকাশ চন্দ্র নাগ ৪৭৪
মননশীল ভাষা বিজ্ঞানী নির্মল চন্দ্র পাল ৪৮৪
পরিশ্রমী এবং করিৎকর্মা একজন 
ব্যক্তির প্রতিকৃতি ফোরকান বেগম ৪৮৮
সৈয়দ আবুল হোসেন : কাছ থেকে দেখা সমীর রঞ্জন দাস ৪৯৩
গধহ ড়ভ ফুহধসরংস, ঢ়ৎঁফবহপব ধহফ 
ধংংরফঁড়ঁং অযসঁফঁষ ঐধংধহ ৪৯৭
সৈয়দ আবুল হোসেন কলেজ খোয়াজপুর মো. রফিকুল ইসলাম কোতোয়াল ৫০৪
কালকিনি সৈয়দ আবুল হোসেন 
বিশ্ববিদ্যালয় কলেজ জিয়াউল হাসান ৫০৯
ডি কে সৈয়দ আতাহার আলী 
একাডেমি এন্ড কলেজ মো. শফিউল আজম ৫১৪
দার্শনিক নান্দনিকতা শফিকুল ইসলাম ইউনুস ৫২০
সময়ের পরশপাথর মোহাম্মদ আমীন ৫৩০
সৈয়দ আবুল হোসেনের বাণী এস এম আবীর চৌধুরী মীম ৫৪৭

তৃ তী য় অ ধ্যা য় : সৈয়দ আবুল হোসেনকে নিবেদিত কবিতাগুচ্ছ …………

মানবাধিকার অরুণাভ সরকার ৫৫৭
এক স্বপ্নজয়ী মানুষের জন্য আসাদ মান্নান ৫৫৮
তুমি মো. মনিরুজ্জামান ৫৬০
চিরগঙ্গাতীরে মুহম্মদ নূরুল হুদা ৫৬১
ভালো মানুষ আলম তালুকদার ৫৬২
মুঠোগুলো খাঁচা হয়ে যায় মাহমুদ কামাল ৫৬৩
ধৃতিতত্ত্ব রহমান হেনরী ৫৬৪
এই এখনো নাসির আহমেদ ৫৬৫
সেদিন প্রকাশ চন্দ্র নাগ ৫৬৬
যাঁর মন আছে এস এম নুর মোহাম্মদ ৫৬৭
তোমার নি®প্রাণ ছবিটি মো. বরকত উল্লাহ্ পাঠান ৫৬৮
হে শ্রদ্ধাভাজন রোমেনা আফরোজা ৫৬৯
সুহৃদ প্রাজ্ঞ বিদগ্ধ জন ফয়সল শাহ ৫৭০
হৃদ্যিক চয়ন সিন্থিয়া অণুপ্রভা ৫৭১
অনিমেষ সদাসয় আহম্মদ কামাল ৫৭২
পহেলা আগস্ট এস এম আবীর চৌধুরী মীম ৫৭৩
মহামহিম রফিকুল ইসলাম ৫৭৪

চ তু র্থ অ ধ্যা য় : সৈয়দ আবুল হোসেনের কলম থেকে ……………………

বঙ্গবন্ধু ও ইসলাম ৫৭৭
খেলার সাথী থেকে জীবন সাথী ৫৮২
অন্তরঙ্গ আলোকে শেখ হাসিনা ৫৮৫
নেতৃত্ব ও উন্নয়ন ৫৯২
তারুণ্য ও শিক্ষা ৫৯৫
একুশের নতুন প্রেক্ষিত : ভাষা নীতির স্বপক্ষে ৬০১
সত্য ও ন্যায়ের দাঁড়িপাল্লায় আমি নির্দোষ ৬০৪
কালকিনি : আমার প্রেম ৬২৯

গ্রন্থালোচনা ৬৩৪

প্র থ ম অ ধ্যা য়

সৈয়দ আবুল হোসেন : জীবন ও কর্ম

ড. মোহাম্মদ আমীন

সৈয়দ আবুল হোসেনের জন্মস্থান 
কালকিনির ইতিকথা

কালকিনির নামকরণ প্রবাদ
১৯৫১ খ্রিস্টাব্দের ১ আগস্ট মাদারীপুর জেলার কালকিনি উপজেলার ডাসার গ্রামে সৈয়দ আবুল হোসেন জন্মগ্রহণ করেন। আলহাজ্ব সৈয়দ আবুল হোসেনের জন্মস্থান নদীলালিত কালকিনি ভূখন্ডটির প্রাচীন নাম কি ছিল, তা সঠিকভাবে বলা যায় না। তবে ঐতিহাসিক বিশ্লেষণে দেখা যায় কৃষ্ণনগর, গোপালপুর, গোপাল সেন, লক্ষিপুর, বিভাগদি, রামনগর ইত্যাদি এ অঞ্চলের প্রাচীন নামসমূহের অন্যতম। রাঢ় গোষ্ঠীভুক্ত জনসংখ্যার বসতির জন্য কালকিনি একসময় রাঢ় বা আড়–য়াকান্দি নামেও পরিচিত ছিল। কোনো কোনো ঐতিহাসিক এ অভিমত ব্যক্ত করেছেন যে, পুয়ালি বর্তমান কালকিনি অঞ্চলের একটি প্রাচীন নাম। পুণ্ড্র শব্দের আঞ্চলিক অপভ্রংশ পোদ বা পুয়া হতে পুয়ালি শব্দের উৎপত্তি। এ অঞ্চলে পুণ্ড্রগণ বসতি স্থাপন করায় নাম হয় পুয়ালি। বস্তুত, তখন পুরো মাদারীপুর অঞ্চলটিই পুয়ালিভিত্তিক ছিল। কালকিনির আর একটি প্রাচীন নাম ভাটবিলা, বর্তমানে যা ভাটবালি নামে পরিচিত। মাগধ জনগোষ্ঠীভুক্ত লোক ভাট নামে পরিচিত ছিল। মাগধ জনগোষ্ঠীভুক্ত লোকজন যে এলাকায় বসতি স্থাপন করত তা ভাটবিলা বা মাগধ জনগোষ্ঠীভুক্ত লোকের এলাকা নামে পরিচিত হতো।
ব্রিটিশ বিরোধি আন্দোলন প্রতিহত এবং নদীবিধৌত দুর্গম এলাকায় সরকারি নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে ব্রিটিশ সরকার আড়িয়াল খাঁ নদীর তীরে খেজুরতলা নামক স্থানে একটি থানা প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেন। তৎকালীন ধনাট্য ব্যবসায়ী আবদুল করিম সরদার থানা প্রতিষ্ঠার যৌক্তিকতা তুলে ধরে প্রশাসনের ঊর্ধ্বমহলের সাথে বহুদিন যাবৎ আলোচনা করে আসছিলেন। প্রয়োজনীয় জমি ও অবকাঠামোর প্রতিষ্ঠার ব্যয়ভার তিনি নিজে বহন করেন। ফলে থানাঞ্চলের নাম রাখা হয় করিমগঞ্জ।
কালকিনির বর্তমান নামকরণ নিয়ে বিভিন্ন প্রবাদ প্রচলিত। ১৯১৮ খ্রিস্টাব্দের চর পলার্দি নদীর পশ্চিম তীরে চর পাঙ্গাশিয়া, চর বিভাগদি ও ঝাউতলা সমন্বয়ে একটি থানা প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়। জেলা ম্যাজিস্ট্রেট ক্যালির নামানুসারে স্থানটির নাম কালকিনি হয়েছে মর্মে একটি প্রবাদ প্রচলিত আছে। মিস্টার ক্যালি ১৮৭০-১৮৭১ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত ফরিদপুরের জেলা ম্যাজিস্ট্রেট ছিলেন। কিন্তু থানা করা হয় ১৯১৮ খ্রিস্টাব্দে। সুতরাং তাঁর নামে নামকরণের কোনো যৌক্তিকতা খুঁজে পাওয়া যায় না। অধিকন্তু ক্যালি হতে কালকিনি হবার সম্ভাবনা প্রায় অবিশ্বাস্য। সর্বোপরি কালকিনি নাম ১৯১৮ খ্রিস্টাব্দের অনেক পূর্বে, এমনকি সুলতানি আমলেও ছিল। সুতরাং এটি নিছক প্রবাদ মনে হয়।
অনেকে মনে করেন, রানী কঙ্কাবতী হতে কালকিনি নামের উৎপত্তি। এটিরও কোনো ভিত্তি নেই। আবার অনেকের মতে, কোলাহাকানি শব্দ হতে কালকিনি শব্দের উৎপত্তি। কোলাহা শব্দের অর্থে নদীর কোণে অবস্থিত। কানি শব্দের অর্থ ভূখণ্ড বা ভূমি। নদীর কোণে অবস্থিত ভূখণ্ড তাই নাম কোলাহকানি, যার অপভ্রংশ কালকিনি। ‘কাল কাহিনী’ শব্দ হতে কালকিনি শব্দের উৎপত্তি হবার কথাও অনেকে বলে থাকেন। কাল শব্দের অর্থ সময়, আবার কালো বর্ণকেও বোঝানো হয়ে থাকে। ধ্বংসকারীকে কাল বলা হয়। এলাকাটি যমুনা নদীর কোলঘেঁষে বিদ্যমান ছিল। বাকলা, ত্রিপুরা, ফরিদপুর ও বিক্রমপুরÑ এ চারটি প্রভাবশালী রাজ্য ও উন্নত সভ্যতার মধ্যিখানে ছিল কালকিনি। এ তিন রাজ্যের বহু কালের বহু কাল-কাহিনীর সাথে জড়িত ভূখণ্ডটি কাল-কাহিনী নামে পরিচিত। এ ভূখণ্ডটি নিয়ে প্রভাবশালী রাজ্যগুলোর মধ্যে লড়াই লেগেই থাকত। রাজায় রাজায় যুদ্ধ হত, কাল হতো জনগণের। কাল বা ধ্বংসের কাহিনী হতে নাম হয় কালকিনিÑ এটি অনেকের ধারণা।
কারও কারও মতে, কুলিক শব্দ হতে কালকিনি নামের উৎপত্তি। কারুশিল্পীদের বলা হয় কুলিক এবং কানি মানে স্থান। কুলিক সম্প্রদায়ের লোকজন এ স্থানে প্রথম নিবাস গড়ে তোলেন। তাই নাম কুলিককানি এবং অপভ্রংশে কালকিনি। অনেকে মনে করেন, কিঙ্কিণী শব্দ হতে কালকিনি। কিঙ্কনী শব্দের অর্থ হচ্ছে প্রাকৃতিক লাস্যে বহুমাত্রিক শব্দ দ্যোতনায় বিভূষিত নৃত্যময় সঙ্গীতের যোজনা। কালকিনির প্রাকৃতিক পরিবেশের বহুমাত্রিক যোজনা তথা পাখির গানের সাথে নদী-সবুজের অনাবিল সুরে স্বর্গীয় সুরের সৃষ্টি করত বলে এটি কিঙ্কনী নামে পরিচিতি পায়, যা কালক্রমে কালকিনি।
কালকিনি একসময় পাটের ব্যবসাকেন্দ্র হিসেবে বিখ্যাত ছিল। কলকাতা হতে পাট ব্যবসায়ীরা (মাড়–য়া) পাটক্রয়ের জন্য মাদারীপুরের বর্তমান কালকিনি নামে পরিচিত আড়িয়াল খাঁ নদীর তীরে আসত। মাড়–য়ারা টাকা শেষ হলে পাট কিনতে পারত না। পাটবিক্রেতারা পাট ক্রয়ের জন্য অনুরোধ জানালে তারা বলত: আজ নেহি, কাল কিনে গা। অনেকে মনে করেন, এ ‘কাল কিনে গা’, শব্দ হতে কালকিনি নামের উৎপত্তি।
বিভিন্ন ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট, বাকেরগঞ্জ, চন্দ্রদ্বীপ, বিক্রমপুর, ময়মনসিংহ, বরিশাল ও ত্রিপুরার প্রাচীন ইতিহাস পর্যালোচনা করে দেখা যায়, কলকনি নাম হতে কালকিনি নামের উৎপত্তি হয়েছে। সদ্য উত্থিত চরের পাশে ছিল একটি নদী। গঙ্গার জল একদিক হতে অন্যদিকে গিয়ে আবার গঙ্গার শাখায় পতিত হতো। নদীর কলকল শব্দে চারিদিক মুখরিত হত। লোকে চরটির নাম তাই দিয়েছে কলকনি। অধিকাংশ লোকের মতে, এই কলকনি শব্দ হতে কালকিনি নামের উৎপত্তি।

সৈয়দ আবুল হোসেনের গ্রাম ‘ডাসার’
দেশখ্যাত শিল্পপতি, রাজনীতিবিদ ও লেখক বর্তমান যোগাযোগ মন্ত্রী সৈয়দ আবুল হোসেনের নিবাস হিসেবে খ্যাত ডাসার ইউনিয়ন কালকিনি উপজেলার একটি বিখ্যাত ইউনিয়ন। ডাসার একটি বিখ্যাত এলাকা। শাহ আলী বোগদাদী ও হযরত শাহ বোরহান লাহোরী এ অঞ্চলে আগমন করেন। শাহ আলী বোগদাদীর পুত্র হযরত শাহ সৈয়দ ওসমান। তিনি এমন কামেল ছিলেন যে, যে কোনো দায় বা বিপদাপদ থেকে মুক্তির লক্ষ্যে তার কাছে এলে সেরে যেত। তাই লোকে দায়সারার জন্য তার কাছে ছুটে যেতেন। তাই এলাকাটির নাম হয়ে ওঠে দায়সার, যার অপ্রভ্রংশ ডাসার। অনেকে মনে করেন, এখানে এক ধরনের বাঁশ পাওয়া যেত। এর নাম ছিল ডাসা বাঁশ। এ ডাসা বাঁশ হতে এলাকাটির নাম ডাসার হয়।
ডাসার ইউনিয়নের গ্রামগুলো হলো- গোপাল সেন, পশ্চিম কমলাপুর, ডোমরা, পূর্ব-কমলাপুর, আইসার, পূর্বদর্শনা, আড়–য়াকান্দি, পশ্চিম দর্শনা, ধামুসা, উত্তর খিলগ্রাম, দক্ষিণ খিলগ্রাম, ডাসার, বাকাই, বেতবাড়ি এবং পূর্ব বনগ্রাম।
কমলাপুর ডাসার ইউনিয়নের একটি বিখ্যাত গ্রাম। অতীতে এটি ছিল ব্যবসায়িক স্থান। হিন্দু দেবী লক্ষ্মীর অপর নাম কমলা। সে সময় দেবী লক্ষ্মী স্থানীয়ভাবে কমলা নামে বেশি পরিচিত ছিল। তার নামানুসারে স্থানটির নাম হয় কমলাপুর। তবে অনেকে মনে করেন, দনুজমর্দন দেবর চতুর্থ অধস্তন ছিলেন জয়দেব, পিতা হরিবল্লভ। জয়দেবের কোনো পুত্রসন্তান ছিল না। তিনি মারা গেলে ত্বদীয় কন্যা কমলা দেবী কিছুদিন রাজ্য পরিচালনা করেন। কমলা ছিলেন অত্যন্ত প্রজাপ্রিয়। তাঁর নামানুসারে এলাকাটির নামকরণ করা হয় কমলাপুর। আবার কেউ কেউ মনে করেন, কালকিনি অঞ্চলে অনেক বিল ছিল। ঐ সকল বিল কুমলাবন ও বেতালোহায় সমাকীর্ণ ছিল। গ্রামীণ গরিব গৃহস্থগণ বিল হতে কুমলাবন সংগ্রহ করে খড়ের ঘর নির্মাণ করত। ঐ কুমলাবন হতে কমলাপুর। আধুনিক গবেষণায় জানা যায়, পর্তুগিজরা কালকিনি অঞ্চলে কমলা চাষের প্রচলন করে। এখানে এক পর্তুগিজ স্থায়ী নিবাস করে বিশাল এক কমলা বাগান সৃজন করে। তাই এলাকাটির নাম হয় কমলাপুর।
বাঁক শব্দ হতে বাকাই। নদীর বাঁকের গ্রাম। তাই নাম বাকাই। কাজি বংশের প্রতিষ্ঠাতা হযরত শাহ বোরহান লাহোরি নদীর বাঁকে বসতি স্থাপন করার পর বাকাই নাম পায়। বেতবাড়ি নামে পরিচিত অঞ্চলটি বেতালোহা ও বেত-এর জন্য বিখ্যাত ছিল। তাই নাম বেতবাড়ি। অনেকে মনে করেন, এখানে এক সময় বেত দিয়ে বাড়ি তৈরি করা হতো তাই বেতবাড়ি। খিল শব্দের অর্থ চাষাবাদের অযোগ্য জমি বা চাষাবাদে আংশিক যোগ্য কিন্তু চাষ করা হয় না, এরূপ অপেক্ষাকৃত উঁচু ভূমিকে বোঝায়। এরূপ খিলভূমিতে বসতিস্থাপন করায় নাম হয় খিলগ্রাম। খিলগ্রামের উত্তরাংশ উত্তর খিলগ্রাম এবং দক্ষিণাংশ দক্ষিণ খিলগ্রাম।
অনেকে মনে করেন, আড়–য়াকান্দি নামটি নাকি আড়াইয়াকান্দি হতে সৃষ্ট। আড়াইটি কান্দি নিয়ে এটি গঠিত। তাই আড়াইয়াকান্দি, অপভ্রংশে আড়ুয়াকান্দি। তবে এটি ঠিক নয়। বস্তুত রাঢ় গোষ্ঠীভুক্ত জনসংখ্যার বসতির জন্য কালকিনি একসময় রাঢ় বা আড়–য়াকান্দি নামে পরিচিত ছিল। দর্শন হতে দর্শনা নামের উৎপত্তি। এলাকাটিতে প্রাচীন পুরকীর্তিময় অনেক ঐতিহাসিক দর্শনীয় স্থান ছিল। এগুলো দর্শন করার জন্য প্রচুর লোকজন আসত। তাই নাম দর্শনা। বন হতে গ্রাম, তাই বনগ্রাম। বন কেটে গ্রামের পত্তন ঘটানো হয়েছিল বলে বনগ্রাম। মুসলমান সুলতানগণ প্রায় শতাধিক বছর বাংলাদেশে তাদের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করতে পারেননি। এ সময় সেন বংশের বিভিন্ন রাজকুমার ও উত্তরাধিকারীগণ বাংলাদেশের বিভিন্ন অংশে শাসনকার্য পরিচালনা করেন। সেন রাজাদের প্রতিনিধি হিসেবে গোপাল সেন নামক এক রাজকুমার মাদারীপুর-কালকিনি অঞ্চল শাসন করতেন। পুরো ফরিদপুর ছিল তার শাসনক্ষেত্র। তিনি প্রথমে ইদিলপুর ও পরবর্তীকালে গৈলা-ফুল�শ্রীতে রাজধানী স্থাপন করেন। গোপাল সেন-এর নামানুসারে এলাকাটির নাম হয় গোপাল সেনপুর। গোপালপুর ইউনিয়নও তার নামানুসারে হয়েছে।

কালকিনির ইতিহাস
খ্রিস্টপূর্ব ৩২৭ অব্দের মধ্যভাগে বাকলা অঞ্চল মৌর্য শাসনের অন্তর্ভুক্ত হয়। চতুর্থ শতকে কালকিনি গুপ্ত সাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত হয়। বৃহত্তর ফরিদপুর ও বিক্রমপুরের বিভিন্ন এলাকায় সমুদ্রগুপ্তের (৩৪০-৩৮০ খ্রি.) এলাহাবাদ স্তম্ভের শিলালিপি ও দ্বিতীয় চন্দ্রগুপ্তযুগের স্বর্ণমুদ্রা আবিষ্কার হয়েছে। এ আবিষ্কার কালকিনিতে গুপ্ত রাজবংশের শাসন প্রতিষ্ঠার প্রমাণ বহন করে। কোটালীপাড়ায় আবিষ্কৃত দ্বিতীয় চন্দ্রগুপ্ত আমলের স্বর্ণমুদ্রা গুপ্ত সাম্রাজ্যের অস্তিত্বকে আরও সুদৃঢ় করে। বৃহত্তর ফরিদপুর ও বিক্রমপুরের বিভিন্ন এলাকায় যে সকল তাম্রলিপি আবিষ্কৃত হয়েছে, তাতে প্রতীয়মান হয় যে, ষষ্ঠ শতকে কালকিনি ধর্মাদিত্যের বিশাল সাম্রাজ্যের আওতাধীন ছিল। ধর্মপ্রাণ ও দয়ালু সম্রাট ধর্মাদিত্য প্রজাদের পানীয়জলের সুবিধার জন্য কালকিনিতে অনেক পুকুর খনন করেছিলেন। চিনা পরিব্রাজক হিউয়েন সাং-এর ভ্রমণ বিবরণ অনুযায়ী সপ্তম শতকে কালকিনি ও আশেপাশের এলাকা রাজা শশাঙ্ক ও হর্ষবর্ধনের রাজ্যভুক্ত ছিল। তৎকালীন কালকিনিসহ বর্তমান বৃহত্তর ফরিদপুরের বিভিন্ন এলাকায় তাদের রাজ্য ও শাসনের বিভিন্ন স্মৃতিচিহ্ন এখনও দেখা যায়। গোপালগঞ্জ জেলার কোটালীপাড়া হতে তিন চতুর্থাংশ মাইল দূরে গোয়াখোলা গ্রামের সোনাকান্দুরী মাঠ খননকালে প্রাপ্ত মুদ্রা এ সব তথ্য প্রমাণের নির্ভরযোগ্যতার স্মারক।
৮১৫ খ্রিস্টাব্দ হতে কালকিনি এলাকায় বৌদ্ধ রাজত্ব শুরু হয়। বৌদ্ধদের রাজ্য শাসন দশম শতকের শেষ প্রান্ত পর্যন্ত বলবৎ ছিল। প্রায় দুইশত বছর কালকিনি বৌদ্ধ রাজত্বের অধীনে ছিল। ভাটি অঞ্চলে বৌদ্ধ রাজবংশের প্রভাবশালী কেউ নিবাস গড়ে তোলার প্রয়াস নেয়নি।। বৌদ্ধ শাসকেরা পুরোনো হিন্দু কর্মচারী দিয়ে রাজ্য পরিচালনা করেছেন। কয়েকটি এলাকায় বৌদ্ধ রাজকর্মচারীদের কেউ কেউ অস্থায়ী নিবাস গড়ে তুললেও পরবর্তীকালে হিন্দু রাজাদের আমলে রাজরোষের কারণে এলাকা ত্যাগ করে নিরাপদ স্থানে চলে যেতে বাধ্য হয়। ঢাকা জেলার বিক্রমপুরে বৌদ্ধ রাজাদের রাজধানী ছিল। তাঁরা চন্দ্র নামে খ্যাত ছিল। ইদিলপুর ও কেদারপুরে বৌদ্ধযুগের চন্দ্র আমলের তাম্রলিপি পাওয়া গেছে।১ হিন্দু আগ্রাসনের কারণে দশম শতকের শেষভাগে বৌদ্ধ যুগের অবসান ঘটে। এরপর ক্ষমতায় আসে বর্মণ রাজবংশ। ৯৮৯ খ্রিস্টাব্দে কালকিনি এলাকায় ব্রাহ্মণ রাজাদের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠিত হয়। ঐতিহাসিক বিশ্লেষণে দেখা যায়, ১০৫৭ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত কালকিনিতে ব্রাহ্মণদের নিয়ন্ত্রণ অক্ষুণœ থাকে। পরবর্তী ৯৩ বছর কালকিনি বিভিন্ন সামন্ত রাজা ও জমিদারদের অধীনে খণ্ড-বিখণ্ড হয়ে শাসিত হয়। এ সময় কোনো একক রাজা বা ভূ-স্বামী কালকিনির ওপর একক কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করতে পারেনি।
১১৫০ খ্রিস্টাব্দে সেন রাজবংশ ক্ষমতা দখল করার কিছুকাল পর, ফরিদপুরসহ কালকিনিতে সেনবংশের একক কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠিত হয়। ১১৫০ খ্রিস্টাব্দ হতে ১২৫০ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত কালকিনি প্রথমে সেন এবং পরে পাল রাজাদের অধীনে শাসিত হয়। ১২০৪ খ্রিস্টাব্দে লক্ষ্মণ সেনকে পরাজিত করে ইখতিয়ার উদ্দিন মোহাম্মদ বিন বখতিয়ার খিলজি বঙ্গদেশ দখল করে নদিয়ায় রাজধানী স্থাপন করেন। নদিয়ায় সেনবংশের পতন ঘটলেও কালকিনি বখতিয়ার খিলজির নিয়ন্ত্রণের সম্পূর্ণ বাইরে ছিল। সে সময় কালকিনি লক্ষ্মণ সেনের অনুগত সামন্তশাসক দ্বারা শাসিত হতে থাকে। নদিয়া হতে লক্ষণ সেনের রাজ দরবারের অনেক অমাত্য কালকিনি অঞ্চলে আশ্রয় নিয়েছিলেন।
বখতিয়ার খিলজির হাতে বাংলায় মুসলিম যুগের সূচনা। এরপর বাংলাদেশের ইতিহাসে মুহম্মদ তুঘলক, ফখরুদ্দিন মোবারক শাহ, শামসুদ্দিন ইলিয়াশ শাহ, সিকান্দর শাহ, আজম শাহ, মাহমুদ শাহ প্রমুখ মুসলিম শাসকগণ বঙ্গদেশে কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করলেও, ভাটি অঞ্চল কালকিনির প্রতি তাদের কোনো আগ্রহ ছিল না। আগ্রহ থাকলেও দুর্গম যোগাযোগ ব্যবস্থা, প্রশাসনিক সংকট ও নিরাপত্তার কারণে বাংলার মুসলিম শাসকগণ কালকিনিতে একচ্ছত্র প্রভাববলয় প্রতিষ্ঠা করতে পারেনি। ফলে ১৪৮৭ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত তারা বঙ্গদেশ শাসন করলেও কালকিনি সেন ও পাল বংশ প্রভাবিত বিভিন্ন হিন্দু জমিদার ও সামন্ত প্রভুদের নিয়ন্ত্রণে থেকে গিয়েছিল।
আরব বংশোদ্ভুত হুসাইন শাহ শাসন ক্ষমতা অধিকার করার পর ভাটি অঞ্চলের দিকে নজর দেন। ব্লককম্যানের ভাষ্য মতে, হুসাইন শাহ সিংহাসনে (১৪৯৩ খ্রিঃ-১৫১৯ খ্রিঃ) আরোহনের কিছুদিন পর ফরিদপুর দখল করে নেন। কয়েক মাসের মধ্যে মাদারীপুর হয়ে কালকিনি পর্যন্ত কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করেন। এটি ১৪৯৩ খ্রিস্টাব্দের ঘটনা। এরপর এখানে মুসলমানদের আনাগোনা ও নিবাস গড়ে তোলার প্রক্রিয়া জোরেসোরে শুরু হয়। ইতোমধ্যে ফতেয়াবাদ (বর্তমান নাম ফরিদপুর) দখল করে হুসাইন শাহ নতুন মুদ্রা চালু করেন। ক্ষমতাকে সুসংহত করার সাথে সাথে তিনি তাঁর ও তাঁর ভাইদের নামে খুলনা, যশোর, পাবনা, ফরিদপুর ও মাদারীপুরের বিভিন্ন পরগনার নামকরণ করেন। বৃহত্তর ফরিদপুর ও কালকিনির বিভিন্ন এলাকায় হুসাইন শাহের আত্মীয়স্বজনের নামকরণ সংবলিত এলাকা এখনও বিদ্যমান। তৎকালীন ফতেয়াবাদ ছিল হুসাইন শাহের অন্যতম প্রধান শহর। পরবর্তীকালে জালাল উদ্দিন ফতেহ শাহ ফরিদপুর, মাদারীপুর, শরীয়তপুর, কালকিনি, ঢাকা ও বাকেরগঞ্জের কিয়দংশ, দক্ষিণ শাহবাজপুর এবং সন্দ্বীপ-হাতিয়া নিয়ে একটি সরকার গঠন করেন। উল্লেখ্য ‘সরকার’ বলতে বর্তমান বিভাগের মর্যাদাস¤পন্ন প্রশাসনিক এলাকা বোঝাত। নবরতেœর অন্যতম আবুল ফজল বিরচিত আইন-ই-আকবরি গ্রন্থের ভাষ্যমতে-এ সরকার অঞ্চলটির নাম ছিল মাহমুদাবাদ। সরকার মাহমুদাবাদে বৃহত্তর ঢাকা জেলা, ফরিদপুর, কালকিনি ও কুষ্টিয়া অন্তর্ভুক্ত ছিল।
এরপর কালকিনিতে মোগল যুগের সূচনা ঘটে। আকবরনামা অনুসারে, ১৫৭৪ খ্রিস্টাব্দে মোগল সেনাপতি মুরাদ খান ফতেয়াবাদ ও সরকার বাকলা (বাকেরগঞ্জ) আক্রমণ করে কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করেন। তিনি বর্তমান ফরিদপুর, মাদারীপুর ও শরীয়তপুর অঞ্চলকে মোগল সাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত করে নেন। মুরাদ খান ফতেয়াবাদ হতে তেরো মাইল দূরে খানখানাবাদ গ্রামে আবাসস্থল নির্মাণ করেছিলেন। ছয় বছর পর তিনি খানখানাবাদ প্রাসাদে মারা যান। প্রবাদ আছে, ভূষণা ও ফতেয়াবাদের হিন্দু জমিদার মুকুন্দ দাওয়াত করেন মুরাদ খানকে । মুরাদ খান সপরিবারে দাওয়াত গ্রহণ করে মুকুন্দ রায়ের বাড়িতে এলে ষড়যন্ত্রমূলকভাবে তাঁদের হত্যা করা হয়। সম্রাট আকবরের শাসনামলে কালকিনিতে আলহাজ্ব সৈয়দ আবুল হোসেনের পূর্বপুরুষ শাহ ওসমানের আগমন ঘটে।
মোগল সম্রাট আকবর উপমহাদেশে বিশাল সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠা করলেও তাঁর শাসনের মধ্যভাগ পর্যন্ত বঙ্গদেশের সর্বত্র আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করতে পারেননি। ষোড়শ শতকে বারো ভুঁইয়া নামে পরিচিত বারোজন জমিদার বঙ্গদেশকে বারোটি ভাগে বিভক্ত করে প্রায় স্বাধীনভাবে শাসন করতে শুরু করেন। বারো ভুঁইয়াদের অন্যতম চাঁদ রায় এবং কেদার রায় তাদের রাজ্যসীমা ঢাকার রাজবাড়ি হতে শুরু করে কালকিনি হয়ে শরীয়তপুর জেলার পালং থানার অন্তর্ভুক্ত কেদারবাড়ি পর্যন্ত বিস্তৃত করতে সক্ষম হয়েছিলেন।
সম্রাট আকবরের পর সম্রাট জাহাঙ্গীর (১৬০৬-১৬২৭খ্রি.) দিল্লির সিংহাসনে আরোহণ করেন। বঙ্গদেশে নিয়োজিত গভর্নর ইসলাম খান পূর্ববঙ্গে মোগল শাসনকে সুসংহত ও বিস্তৃত করে সার্বভৌমত্ব প্রতিষ্ঠা করার প্রয়াস নেন। বস্তুত ইসলাম খানই প্রথম ফরিদপুর-কালকিনি অঞ্চলে মোগল সাম্রাজ্যের একচ্ছত্র আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হয়েছিলেন। এর পূর্বে বঙ্গদেশে মুসলিম সম্রাটগণ রাজ্য শাসন করলেও বঙ্গের অন্তর্ভুক্ত কালকিনি ছিল মুসলমান সম্রাটদের নিয়ন্ত্রণের বাইরে। এখানে হিন্দু জমিদারেরাই ছিল প্রকৃত শাসক। ইসলাম খান গভর্নর হয়ে আসার স্বল্প সময়ের মধ্যে ফরিদপুর দখল করে নেন। এরপর তিনি অতি দ্রুত বৃহত্তর ফরিদপুর এলাকার সর্বত্র ক্ষমতা সুসংহত করে নিতে সক্ষম হন। তখন হতে কালকিনি এলাকা প্রকৃত অর্থে মুসলমান শাসকদের নিয়ন্ত্রণে আসে। সম্রাট জাহাঙ্গীরের পর থেকে মোগলদের পতন পর্যন্ত কালকিনি মোগল শাসকদের নিয়ন্ত্রণে ছিল।

ইংরেজ ও পাকিস্তান আমল
আলিবর্দি খান (১৭৪০-১৭৫৬ খ্রিস্টাব্দ) দেশে রাজনীতিক স্থিতিশীলতা আনতে ব্যর্থ হন। ব্রিটিশ, ফারসি ও ডাচ বণিকেরা তাঁর শাসনকে দুরূহ করে তোলে। পলাশির যুদ্ধে সিরাজউদৌল্লা পরাজয় বরণ করার পর বঙ্গদেশে ইংরেজ শাসন প্রসারিত হওয়ার পথ সুগম হয়। মীর জাফর ১৭৫৭ খ্রিস্টাব্দের ২০ ডিসেম্বর ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানিকে চব্বিশ পরগণা অঞ্চলটি উপহার দেন। চব্বিশ পরগণার জমিদারি লাভের পর ইংরেজরা এলাকার ঐশ্বর্য বিশেষ করে কাষ্ঠ সম্পদের প্রতি প্রবলভাবে আকৃষ্ট হয়ে পড়ে। চব্বিশ পরগণার কালেক্টর ক্লড রাসেল ও টিলম্যান হেঙ্কেলসহ আরও কয়েকজন ইংরেজ শাসক কালকিনি এলাকার অনাবাদি জমি আবাদের উদ্যোগ নেন। ক্লড রাসেল ১৭৭০ হতে ১৭৭৩ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে কিছু জমি লিজ দেন। জঙ্গলাবৃত জমি জমিদারদের মধ্যে বিতরণ করা হয়। ১৭৮৩ খ্রিস্টাব্দে হেঙ্কেলের নেতৃত্বে কালকিনির জমিকে ছোট ছোট প্লটে বিভক্ত করে কৃষকদের মধ্যে বিতরণের প্রস্তাব দেয়া হয়। হেঙ্কেল কালকিনির জমিগুলোকে ভবিষ্যৎ যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন সম্ভাবনায় বিশেষ গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করেন। জঙ্গল পরিষ্কার করে যারা চাষাবাদ শুরু করবেন হেঙ্কেল তাদের অগ্রাধিকার দেয়ার কথা ঘোষণা করলে অনাবাদি জমি চাষের প্রতি কৃষকদের আগ্রহ বৃদ্ধি পায়। হেঙ্কেলের অনুমোদন নিয়ে অধীনস্তরা জমি বিলিবণ্টন করা শুরু করেন। বণ্টিত জমিকে খাস আবাদ তালুক ও হেঙ্কেলের তালুক বলা হতো। তালুকগুলোর শাসন ও রাজস্ব সংগ্রহের জন্য চৌকি স্থাপন করা হয়। ১৭৮৪ খ্রিস্টাব্দে হেঙ্কেলের প্রস্তাব গভর্নর জেনারেলের অনুমোদন লাভ করে। প্রস্তাবে প্রথম তিন বছরের জন্য জমি চাষে কোনো রাজস্ব আরোপ করা হয়নি। চতুর্থ বছর বিঘা প্রতি দু’আনা দু’সিক্কা রাজস্ব নির্ধারিত হয়। বছর বছর রাজস্ব বৃদ্ধি করার পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়।
১৭৫৭ খ্রিস্টাব্দে নবাব সিরাজউদৌল্লাার পরজয়ের পর বঙ্গদেশে ইংরেজ শাসনের সূত্রপাত ঘটে। তবে ১৭৭২ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি নিরঙ্কুশ কর্তৃত্ব স্থাপন করতে পারেনি। ১৭৫৭ খ্রিস্টাব্দের ২৯ জুন লর্ড ক্লাইভ মীর জাফর আলী খানকে গদিতে বসান। সপ্তাহব্যাপী রাজনৈতিক শূন্যতায় রাষ্ট্রীয় কোষাগার ও অন্যান্য সম্পদের ব্যাপক লুটতরাজ হয়। সিরাজউদৌল্লার পতনের পর মুসলমানগণের প্রভাব ও আভিজাত্য হ্রাস পেতে থাকে। 
১৭৬০ খ্রিস্টাব্দের ২৭ সেপ্টেম্বর ইংরেজ কোম্পানি মীর জাফরের জামাতা মীর কাশিমের সাথে গোপন আঁতাত করে একটি চুক্তি সম্পাদন করেন। চুক্তি অনুযায়ী সিংহাসনের পরিবর্তে বর্ধমান, মেদিনীপুর ও চট্টগ্রাম এ তিনটি জেলার বিনিময়ে নবাবের কাছে পাওনা অর্থ পরিশোধ হয়েছে মর্মে ঘোষণা করা হয়। ১৭৬০ খ্রিস্টাব্দের ২০ অক্টোবর মীর কাশিম নবাব ঘোষিত হয় কিন্তু তিনি পুতুল নবাব হিসেবে থাকার পাত্র ছিলেন না। ইংরেজদের সাথে তাঁর দ্বন্দ্ব শুরু হয়। ১৭৬৪ খ্রিস্টাব্দের ২৩ অক্টোবর বক্সারের যুদ্ধে সেকেলে রণকৌশল ও প্রাচীন অস্ত্রাধিকারী সম্মিলিত বিশাল বাহিনী স্বল্প সংখ্যক অথচ আধুনিক রণকৌশল ও মারণাস্ত্রের অধিকারী ইংরেজদের হাতে পরাজয় বরণ করে। ইংরেজগণ মীর জাফরকে পুনরায় নবাবের গদিতে বসায়। ১৭৬৫ খ্রিস্টাব্দে লর্ডক্লাইভ দিল্লি গিয়ে বাদশাহ শাহ আলমকে প্রচুর নজরানা ও রাজস্ব আদায়ের লোভ দেখিয়ে এলাহাবাদ দিওয়ানি চুক্তি স্বাক্ষর করিয়ে নেয়। চুক্তির ফলে ইংরেজগণ বাংলা, বিহার ও উড়িষ্যার দেওয়ানি লাভ করে।
লর্ড ক্লাইভ সৈয়দ মোহাম্মদ রেজা খানকে দিওয়ানি শাসন পরিচালনার পূর্ণ ক্ষমতা প্রদান করেন। ১৭৬৬ খ্রিস্টাব্দের ৮ মে নবাব নাজমউদৌল্লার মৃত্যু হয়। নতুন নবাব সাইফউদৌল্লাহ অপ্রাপ্ত বয়স্ক ছিলেন। এ অজুহাতে তাঁর ভাতা হ্রাস করা হয়। ১৭৭০ খ্রিস্টাব্দে সাইফউদৌল্লাাহ মারা গেলে অপ্রাপ্ত বয়স্ক মোবারকউদৌল্লা নবাব হন। ব্রিটিশ আধিপত্যকে কলকাতা-মুর্শিদাবাদ হতে দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে বিস্তারের লক্ষ্যে ১৭৬৯ খ্রিস্টাব্দের ১৬ আগস্ট প্রতি জেলায় একজন করে ইউরোপীয় সুপারভাইজার নিয়োগের সিদ্ধান্ত হয়। যশোর জেলায় মিস্টার হেঙ্কেলকে নিয়োগ দেয়া হয়। উল্লেখ্য, এ সময় গোয়ালন্দ মহকুমা ও গোপালগঞ্জের কিছু অংশ যশোর জেলার অধীন ছিল।
নবাবের সঙ্গে কোম্পানির ক্ষমতা ভাগাভাগির ফলে দেশে নৈরাজ্যের সৃষ্টি হয়। জমিদারগণ ইচ্ছেমতো খাজনা আদায় ও প্রজাদের ওপর শোষণ চালাতে থাকে। প্রশাসন ভেঙে পড়ে, জনজীবন হয়ে ওঠে দুর্বিসহ। চাষাবাদসহ আর্থনীতিক কর্মকাণ্ডে স্থবিরতা নেমে আসে। কোম্পানির কর্মচারীরা ব্যক্তিগত ব্যবসার প্রসারের জন্য রাজনীতিক ক্ষমতার অপব্যবহার শুরু করে। তারা নিজেদেরকে আইনের ঊর্ধ্বে গণ্য করে মফস্বলে ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করে। তাদের সাথে যোগ দেয় জমিদার ও স্বার্থান্বেষী দেশীয় কিছু লোক। ফলে ১৭৬৯-৭০ খ্রিস্টাব্দে দেখা দেয় মহাদুর্ভিক্ষ। কালকিনির এক তৃতীয়ংশ লোক দুর্ভিক্ষে মৃত্যুবরণ করে। ইংরেজরা দুর্ভিক্ষের জন্য রেজা খানকে দায়ী করে। ১৭৭২ খ্রিস্টাব্দের ২৭ এপ্রিল রেজা খানকে বহিষ্কার করে দুর্নীতির দায়ে বন্দি করা হয়। নায়েব দিওয়ানের পদ বিলুপ্ত করে দিওয়ানি দপ্তর কলকাতায় স্থানান্তর করা হয়। দিওয়ানি শাসন সরাসরি পরিচালনার জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়। ১৭৭২ খ্রিস্টাব্দ হতে মুর্শিদাবাদের মসনদ প্রহসনে পরিণত হয়। নবাব ক্ষমতাহীন সাজসর্বস্ব পুতুল হয়ে যায়। ১৭৭১ খ্রিস্টাব্দের আগস্ট হতে প্রশাসন থেকে দেশীয় কর্মকর্তাদের উচ্ছেদ করে ইউরোপীয় কর্মকর্তা নিয়োগের প্রক্রিয়া শুরু হয়। ১৭৭২-৭৩ খ্রিস্টাব্দে ওয়ারেন হেস্টিংস রেজা খানসহ দেশীয় উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের বরখাস্ত করে ইউরোপীয়ানদের সমন্বয়ে একটি প্রশাসনিক কাঠামো নির্মাণ করেন। তিনি প্রতি জেলায় একজন ইউরোপীয় কালেক্টর ও কয়েকজন ইউরোপীয়ান কর্মকর্তা নিয়োগ করে ইংরেজ শাসনকে আরও সুসংহত করেন। প্রতি জেলায় ইউরোপীয়দের পাশাপাশি সমমর্যাদার একজন দেশীয় দিওয়ান পদ সৃষ্টি করে রাজস্ব আদায়ের ব্যবস্থা করা হয়।
১৭৭৩ খ্রিস্টাব্দে রেগুলেটিং এ্যাক্ট-এর অধীনে ভারতে কোম্পানির বিষয়াদি নিয়ন্ত্রণের জন্য একজন গভর্নর জেনারেল নিয়োগ করা হয়। গভর্নর জেনারেলকে সভাপতি করে চার সদস্যবিশিষ্ট কাউন্সিল গঠন করা হয়। কাউন্সিলের সিদ্ধান্ত মোতাবেক ১৭৭৫ খ্রিস্টাব্দে রেজা খানকে মুক্তি দিয়ে নায়েব সুবা ও নায়েব দিওয়ান নিযুক্ত করা হয়। ফৌজদারি আদালত পুনরায় কলকাতা হতে মুর্শিদাবাদে স্থানান্তর করে মুর্শিদাবাদকে সুবার রাজধানী হিসেবে স্বীকৃতি দেয়া হয়। রেজা খান এবার আগের মতো স্বাধীনচেতা হওয়ার সাহস দেখাতে পারলেন না, সার্বিক পরিস্থিতি বিবেচনায় বাস্তবতাকে মেনে নিতে বাধ্য হন। ১৭৮০ খ্রিস্টাব্দে ওয়ারেন হেস্টিংস দিওয়ানি ও নেজামত ক্ষমতা পূর্ণমাত্রায় প্রয়োগ করতে শুরু করেন। ১৭৬৯ খ্রিস্টাব্দে জেলা সুপারভাইজার নিয়োগের মাধ্যমে প্রশাসনে প্রথম শ্বেতাঙ্গদের অনুপ্রবেশ ঘটে। ১৭৮০ খ্রিস্টাব্দ হতে পুনরায় ইউরোপীয় প্রশাসক নিয়োগ শুরু হয়। ১৭৮৬ খ্রিস্টাব্দে কর্নওয়ালিস সকল দেশীয় কর্মকর্তাকে বরখাস্ত করে ইউরোপীয় কর্মকর্তা নিয়োগ দেন। জেলা কালেক্টরকে জেলার রাজস্ব, পুলিশ ও বিচার বিভাগের ক্ষমতা দেয়া হয়। ব্রিটিশ স্টার্লিং হারে একজন জেলা কালেক্টরের বেতন ছিল মাসিক দুই হাজার úাউন্ড, যা ব্রিটেনের সর্বোচ্চ সচিবের বেতনের দ্বিগুণ।
১৭৯৩ খ্রিস্টাব্দে চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত প্রবর্তন করা হয় এবং নির্দিষ্ট সময়ে রাজস্ব প্রদানে ব্যর্থ হলে তাদের জমিদারি নিলামে বিক্রির ব্যবস্থা করে সূর্যাস্ত আইন জারি করা হয়। এ নীতিতে কালকিনির অনেক জমিদারের জমিদারি হস্তচ্যুত হয়। ১৭৯৩ খ্রিস্টাব্দে লর্ড কর্ণওয়ালিসের ব্যবস্থায় নবাবের ফৌজদারি ক্ষমতা সম্পূর্ণ রহিত করে তাঁকে পেনশন ভোগীতে পরিণত করা হয়। চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের দশ বছরের মধ্যে বর্ধমান রাজার জমিদারি ব্যতীত বঙ্গদেশের সকল বড়বড় জমিদারি এস্টেট নিলামে ওঠে। কালকিনির জমিদারগণের অর্ধেকের বেশি জমিদারি নিলামে ওঠে এবং অল্প সময়ের মধ্যে অস্বাভাবিক দ্রুততায় তারা অনেকে প্রায় নিঃস্ব হয়ে পড়ে। লাখেরাজ সম্পত্তি ব্যতীত অনেক জমিদারের আর কিছুই অবশিষ্ট থাকে না। তারপরও ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি কালকিনিসহ বঙ্গদেশে যথাযথ কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠায় ব্যর্থ হয়। তারা বুঝতে পারে যে, সরকারি রাজস্বের বেশির ভাগ মাদাদ-ই মাআশ নামের ফন্দিবাজ জমিদারেরা বাগিয়ে নিচ্ছে। ১৭৯৯ খ্রিস্টাব্দে সপ্তম আইন জারির মাধ্যমে জমিদারগণকে খাজনা আদায়ের জন্য কৃষকদের মালামাল, গরুবাছুর, শস্য ইত্যাদি ক্রোক করার ক্ষমতা প্রদান করা হয়। কোনো কোনো ক্ষেত্রে জমিদারগণ গ্রেফতারের অধিকারও লাভ করে। ১৮১২ খ্রিস্টাব্দে প্রজাকে গ্রেফতারের ক্ষমতা রহিত করা হলেও ফসল আটকের ক্ষমতা বহাল থাকে। ১৮৪১ খ্রিস্টাব্দে সূর্যাস্ত আইন পাশ করা হয়। এ আইন অনুসারে ৩০ চৈত্রের মধ্যে বার্ষিক রাজস্ব খাজনা প্রদানের সর্বশেষ তারিখ নির্ধারণ করা হয়। এ আইন জারির ফলে জমিদারগণ যে কোনো উপায়ে প্রজাদের নিকট হতে খাজনা আদায় করে রাজস্ব প্রদানের ব্যবস্থা করতেন। ফলে প্রজা সাধারণ আরও নিগৃহীত হতে থাকে।
১৮৮৫ খ্রিস্টাব্দে কংগ্রেস গঠিত হয়। মুসলমানগণ ক্রমশ সচেতন হয়ে ওঠে এবং নিজেদের অধিকার আদায়ের লক্ষ্যে বিভিন্ন সংগঠন গড়ে তোলার প্রয়াস নেয়। ১৯০১ খ্রিস্টাব্দে নবাব আহসানউল্যার মৃত্যুর পর তাঁর পুত্র নবাব সলিমুল্লাহ এস্টেটে গদিনশিন হন। মুসলমানদের সহানভূতির প্রত্যাশায় সরকার তাঁর প্রতি যথেষ্ট অনুকূল ব্যবস্থা গ্রহণ করে। ১৯০৩ খ্রিস্টাব্দে বঙ্গভঙ্গের প্রস্তাব ঘোষণার পরপরই কংগ্রেসের নেতৃত্বে হিন্দু সম্প্রদায় আন্দোলন শুরু করে। ১৯০৫ খ্রিস্টাব্দে বঙ্গভঙ্গ করা হলে বঙ্গভঙ্গ বিরোধী আন্দোলন আরও জোরদার হয়ে ওঠে। কংগ্রেস ও হিন্দুসম্প্রদায় বঙ্গভঙ্গ রোধ করার জন্য আন্দোলন শুরু করে এবং ব্রিটিশ পণ্যবর্জনের ডাক দেয়। মুসলমানেরা বঙ্গভঙ্গের পক্ষে অবস্থান নিলে দুই সম্প্রদায় মুখোমুখি হয়। কালকিনির হিন্দু সম্প্রদায় অর্থবিত্ত ও শিক্ষাদীক্ষায় মুসলমানদের থেকে অনেক এগিয়ে থাকায় হিন্দুদের সাথে পেরে ওঠা কষ্টকর হচ্ছিল। ইতোমধ্যে বঙ্গভঙ্গবিরোধী আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে ১৯০৬ খ্রিস্টাব্দে মুসলিম লিগ গঠন করা হয়। কালকিনির অনেক প্রভাবশালী লোক কংগ্রেস ছেড়ে মুসলিম লিগে যোগদান করেন। হিন্দু জমিদারগণের অত্যাচার ও নিপীড়নে অতিষ্ঠ মুসলমানেরা মুসলিম লিগে আশ্রয় নিয়ে নিজেদের মুক্তির পথ খোঁজে।
১৯০৭ খ্রিস্টাব্দে বঙ্গভঙ্গকে কেন্দ্র করে হিন্দু মুসলমান দাঙ্গা শুরু হয়। দেশের বিভিন্ন এলাকায় দাঙ্গা চরম আকার ধারণ করে। কিন্তু কালকিনির মুসলমানগণ পরম ধৈর্যে পরিস্থিতি অবলোকন করে। হিন্দু জমিদারগণ মুসলমানদের বঙ্গভঙ্গ রদের বিপক্ষে আন্দোলন না-করার জন্য চাপ প্রয়োগ করতে থাকে। জমিদারগণ কৃষকদেরকে আন্দোলন হতে বিরত না-থাকলে উচ্ছেদ করার হুমকি দেয়। অনেকে ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও বঙ্গভঙ্গের পক্ষে প্রকাশ্যে আন্দোলন করা হতে বিরত থাকতে বাধ্য হয়। হিন্দুরা বন্দেমাতরম ধ্বনি দিয়ে মুসলমানদের ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে গিয়ে বিদেশি পণ্য বিক্রয়ে বাধা প্রদান করে। এ অবস্থায় কালকিনির নেতৃবৃন্দ সংগঠিত হয়ে ‘আল্লাহু আকবর’ শ্লোাগানের মাধ্যমে অধিকার আদায়ের প্রয়াস নেন। জামালপুরে মুসলমানদের আন্দোলন তীব্র রূপ নেয়। বকশীগঞ্জ হতে প্রকাশিত একটি বিজ্ঞপ্তি বাংলাদেশের অনেক জায়গায় প্রচার করা হয়। এতে লেখা ছিল-

“মুসলমান ভাইদের এতদ্বারা বলা হচ্ছে যে, তারা সকলে জানে কি করে জামালপুরের মুসলমানেরা আহূত হয়ে স্বদেশী আন্দোলনে নিযুক্ত হিন্দুদের দমন করেছে। হে মুসলমান ভাইয়েরা, তোমরা কি জানো যে, সরকার এবং নবাব সলিমুল্লাহ সাহেব সম্পূর্ণভাবে আমাদের সমর্থক? সুতরাং, আমরা আর কার পরোয়া করবো? লাঠি ধর, হিন্দুদের বিতাড়িত কর, খামা হিন্দুদের মাথা ভেঙ্গে দাও এবং ধুলায় মিশিয়ে দাও। যে এ বিজ্ঞপ্তি ছিড়বে সে তার মাকে অপহরণ করেছে বলে সাব্যস্ত করা হবে।” 
এতকিছুর পরও কালকিনির কোনো মুসলমান হিন্দুদের ওপর কোনো আক্রমণাত্মক ব্যবহার করেনি।
১৯৩৭ খ্রিস্টাব্দে কৃষক প্রজা পার্টির নেতা এ কে ফজলুল হক বাংলার মুখ্যমন্ত্রী নিয্ক্তু হন এবং ১৯৪১ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত ক্ষমতায় থাকেন। ১৯৪১ খ্রিস্টাব্দে ফজলুল হকের নেতৃত্বে দ্বিতীয় মন্ত্রিসভা গঠিত হয় এবং ১৯৪৩ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত বহাল থাকেন। এরপর নাজিমুদ্দিন মুখ্যমন্ত্রী হন। তিনি ১৯৪৩ খ্রিস্টাব্দ হতে ১৯৪৫ পর্যন্ত মুখ্যমন্ত্রী থাকার পর ১৯৪৬ খ্রিস্টাব্দে হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর নেতৃত্বে নতুন মন্ত্রিসভা গঠিত হয়। তিনি ১৯৪৭ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত থাকেন। ১৯৪৩ হতে ১৯৪৭ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত মুসলিম লিগ বাংলাদেশে ক্ষমতাসীন থাকে। ফজলুল হক মুখ্যমন্ত্রী থাকাকালে ১৯৩৮ খ্রিস্টাব্দে বঙ্গীয় প্রজাস্বত্ব আইন ও কৃষিখাতক আইন; ১৯৪০ খ্রিস্টাব্দে মহাজনি আইন এবং ১৯৩৯ খ্রিস্টাব্দে বঙ্গীয় চাকুরি নিয়োগ বিধি বা সম্প্রদায়ভিত্তিক বণ্টনবিধি আইন জারি করে সাধারণ মানুষের প্রভূত কল্যাণ সাধন করেন। প্রজাস্বত্ব আইন পাশ করে জমিদারদের জমি হস্তান্তর সংক্রান্ত ফি, জমিদারদের জমি ক্রয়ের ক্ষেত্রে অগ্রাধিকার, সার্টিফিকেট প্রথার মাধ্যমে খাজনা আদায় ও চাষিদের কাছ থেকে বিভিন্ন ধরনের অবৈধ আদায় বা আবওয়াব প্রথা বাতিল করা হয়। বিশ বছর সময় অতিক্রান্ত হওয়ার আগে মাত্র চার বছরের খাজনা পরিশোধ করে চাষিরা সিকস্তি জমি পুনরুদ্ধারের সুযোগ লাভ করে। বকেয়া খাজনার ওপর ধার্যকৃত সুদের হার ১২.৫% হতে ৬.২৫% নামিয়ে আনা হয়। জমির ওপর খাজনা বৃদ্ধি দশ বছরের জন্য স্থগিত ও ঋণসালিসি বোর্ড গঠন করা হয়। বঙ্গীয় মহাজনি আইন পাশ করে সুদের হার স্থির করে দিয়ে সকল মহাজনের জন্য ট্রেড লাইসেন্স বাধ্যতামূলক করা হয়। সাম্প্রদায়িক বণ্টনবিধি অনুসারে ৫০% চাকুরি মুসলমানদের জন্য সংরক্ষিত করা হয়। এসব আইনে সাধারণ কৃষক প্রজাগণ সন্তুষ্ট হলেও প্রভাবশালী মহল কৃষক প্রজাপার্টির উপর নাখোশ হয়। ফলে এ কে ফজলুল হক ও কৃষক প্রজাপার্টির বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র শুরু হয়। পরবর্তী নির্বাচনে কৃষক প্রজাপার্টি পরাজিত হয়।
তৎকালীন সামাজিক প্রেক্ষাপটের ওপর লেখা কয়েকটি গ্রন্থ ও প্রবীণ ব্যক্তিবর্গের বক্তব্য বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, ত্রিশ-চল্লিশের দশকেও কালকিনিতে মুসলমানগণের আর্থ-সামাজিক অবস্থা শোচনীয় ছিল। জমিদার ও অভিজাত হিন্দুদের নিপীড়ন, নির্যাতন, অবহেলা ও অত্যাচারের বিরুদ্ধে কোনো প্রতিবাদ করার সুযোগ ছিল না। সিরাজউদৌল্লার পতনের পর হতে আস্তে আস্তে মুসলমানদের সামাজিক মর্যাদা ও আর্থনীতিক অবস্থার পতন হতে হতে বিশের দশকে সর্বনিম্ন পর্যায়ে চলে আসে। জমিদারগণ কৃষকদের নিকট হতে নির্ধারিত খাজনা ছাড়াও প্রতিনিধির বকশিস, খালবন্দি (বাঁধ খরচ), দাখিলা খরচ (খাজনা আদায় খরচ), পোল খরচ (সেতু তৈরি), ডাক খরচ, ভাণ্ডারি খরচ (হাটবাজারের রক্ষণাবেক্ষণ), শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খরচ, চিকিৎসালয় ও বেগার খরচ (মজুরিবিহীন শ্রম) ইত্যাদিসহ আরও বহুবিধ খাজনা আদায় করতেন। এছাড়া ব্যক্তিগত পালকি ব্যবহারের অনুমতি লাভের জন্য ১০ হতে ২৫ টাকা, ছাতা ব্যবহারের জন্য ২ হতে ৫ টাকা, হাতিতে চড়ার অনুমতি লাভের জন্য ৩০ হতে ৪০ টাকা, পুকুর খনন করার অনুমতির জন্য ২০ হতে ৪০ টাকা, কোনো বড় অনুষ্ঠান করার অনুমতির জন্য ১৫ টাকা খাজনা প্রদান করতে হতো। এক কথায়, মুসলমান কৃষকদের সর্বপ্রকার সামন্তবাদী বৈষম্যমূলক নিপীড়ন বিনা প্রতিবাদে সহ্য করতে হতো। জমিদারগণের আইন অমান্য করলে বেত কিংবা জুতো দিয়ে পেটানো হতো। ফরিদপুর কালেক্টরেটের জমির মালিকানা দলিল পর্যবেক্ষণ করে দেখা যায়, ১৯৩০ খ্রিস্টাব্দে কালকিনিতে ১৩৫টি গ্রামে ৮৯০ জন গাঁতিদারের মধ্যে মুসলমান গাঁতিদার ছিল মাত্র ১৯৭ জন। তাও ক্ষুদ্র গাঁতিদার। জমির পরিমাণ বিবেচনায় সমস্ত জমির মধ্যে মুসলমানগণের মালিকানাধীন জমির পরিমাণ ছিল মাত্র ১৪.০৯ শতাংশ। অধিকাংশ মুসলমান ছিল হিন্দু মালিকদের জমির ভাগচাষি ও দিনমজুর। হিন্দুরা মুসলমানদের নিম্নশ্রেণির হিন্দু হতে ধর্মান্তরিত হিসেবে গণ্য করত। নিচু শ্রেণি হতে মুসলমান ধর্ম গ্রহণ করে আরও নিচুশ্রেণিতে পরিণত হওয়ায় তাদের সামাজিক মর্যাদা বলে কিছু ছিল না। জমিদারগণ হিন্দু ডোমদের চেয়েও মুসলমানদের নিকৃষ্ট মনে করতেন। কোনো মুসলমান ব্রাহ্মণের বাড়ির পাশ দিয়ে হাঁটতে পারত না।
শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে মুসলমান ছাত্রদের পেছনের ভাঙা বেঞ্চে বসতে দেয়া হতো। হিন্দু ছেলেরা তাদেরকে চণ্ডালের চেয়েও ঘৃণার চোখে দেখত। কয়েকজন হিন্দু জমিদার দাড়ির জন্য প্রতি বছর ২ টাকা খাজনা আদায় করতেন। যারা খাজনা দিতেন না, তাদের দাড়িতে গরম আলকাতরা লাগিয়ে শাস্তি দেয়া হতো। গ্রামে প্রকাশ্যে কোনো গরু জবাই করতে দেয়া হতো না। জমিদার বাড়িতে কোনো অনুষ্ঠানের দাওয়াতে মুসলমান গাঁতিদারদের নিচু শ্রেণির হিন্দু দিনমজুরদের সাথে মাদুরে বসতে দেয়া হতো; অন্যদিকে মুসলমান কৃষকদের মাটিতে কিংবা শুকনো ঘাসের উপর বসতে দিত। কোনো বিশেষ অনুষ্ঠানে গরু জবাই করতে হলে জমিদারকে প্রায়শ্চিত্য স্বরূপ ৩০ টাকা খাজনা দিতে হতো। তাও সহজে অনুমতি পাওয়া যেত না। জমিদার বাড়ির সামনে দিয়ে জুতো পায়ে ও ছাতা মাথায় চলা নিষিদ্ধ ছিল। কেউ আদেশ অমান্য করলে জমিদার বাড়ির অন্ধ কুটিরে বন্দি করে রাখা হতো। অন্ধকুটিরে প্রজাদের বন্দি করে বিভিন্ন কায়দায় শাস্তি দেয়া হতো। জমিদারগণ ধর্মের ষাঁড় ছেড়ে মুসলমান প্রজাদের ক্ষেত খাইয়ে দিত। প্রতিবাদ করলে তাঁকে উচ্ছেদ করার হুমকি দেয়া হতো।
পাকিস্তান হওয়ার পর মুসলমান সম্প্রদায় এরূপ নির্যাতন হতে মুক্তি পাওয়ার প্রত্যাশায় আনন্দ উচ্ছ্বাসে উদ্বেল হয়ে ওঠে। ১৯৪৭ খ্রিস্টাব্দের ১৪ আগস্ট মধ্য রাতে পাকিস্তান রাষ্ট্র ঘোষণা হওয়ার সাথে সাথে রাত বারোটায় কালকিনির হাজার হাজার লোক ঘরবাড়ি ছেড়ে নারায়ে তাকবির- আল্লাহু আকবর মিছিল সহকারে বাড়ি হতে বেরিয়ে আনন্দ উল্লাস প্রকাশ করে। আনন্দ উচ্ছ্বাসবহুল মিছিল-সমাবেশ সপ্তাহব্যাপী বহাল থাকে। ঘরে ঘরে মিষ্টি ও শিরনি বিতরণ করা হয়। মহিলারাও গ্রামে গ্রামে নিজস্ব পরিমণ্ডলে আনন্দ শুরু করে। আবালবৃদ্ধবণিতার চোখে মুখে ফুটে ওঠে স্বস্তির নিশ্বাস। এতদিন পর কালকিনির মানুষের মুখে হাসি ফোটে। বিপুল সংখ্যক উঁচু বর্ণের হিন্দু কালকিনি ত্যাগ করে পশ্চিমবঙ্গ চলে যায়। নিচু বর্ণের অনেক হিন্দুও ভারত চলে যায়। এখানে প্রবল প্রতাপ ও সহায় সম্পদ থাকার পরেও সামাজিক পরিস্থিতি, ধর্মীয় ব্যবস্থাপনা, রাষ্ট্রীয় দৃষ্টিভঙ্গির শঙ্কা এবং পূর্বেকার আচরণের কথা ভেবে তারা বাংলাদেশ ত্যাগ করে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানসমূহে সিংহভাগ শিক্ষক ছিল হিন্দু। তাদের গণহারে দেশত্যাগের ফলে অনেক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান শিক্ষক ও ছাত্রশূন্য হয়ে পড়ে। অনেকগুলো মাধ্যমিক বিদ্যালয় বন্ধ হয়ে যায়। মুসলমানদের মধ্যে এমন শিক্ষিত ছিল না, যাদের দিয়ে স্কুল পরিচালনা করা সম্ভব। অভিজাত হিন্দুদের গণহারে দেশত্যাগের পর চিকিৎসা ও শিক্ষা ব্যবস্থায় একটি বিরাট শূন্যতা সৃষ্টি হয়। তবু মানুষ সামাজিক নিপীড়ন ও ধর্মীয় বাস্তবতায় উদ্বেল হয়ে ওঠে। তাদের অতীত বিষাক্ত, ভবিষ্যতের স্বপ্নীল প্রত্যাশার ডাক বিভোর করে রাখাটা অপ্রত্যাশিত কিছু ছিল না।
অল্পদিনের মধ্যে মানুষের আনন্দ উচ্ছ্বাস আফসোসে পরিণত হয়। অত্যাবশ্যকীয় জিনিসপত্রের দাম হু হু করে বেড়ে যেতে থাকে। বেড়ে যেতে থাকে বেকারত্ব। অনেক মুসলমান পশ্চিমবঙ্গ হতে এখানে চলে আসে। হাজার হাজার রিফিউজি কালকিনির বিভিন্ন খাস ও পরিত্যক্ত জমি দখল নিয়ে বসতবাড়ি গড়ে তোলে। পশ্চিমবঙ্গে যারা চাকুরি করত তারা চাকুরি ছেড়ে এখানে চলে আসে। দেশ বিভাগের পূর্বে নেতৃবৃন্দ যে প্রতিশ্র“তি দিয়েছিলেন তা সোনার হরিণে পরিণত হয়। প্রতিষ্ঠালগ্ন হতে ১৯৭১ খ্রিস্টাব্দে মুক্তিযুদ্ধের পূর্ব পর্যন্ত অধিকাংশ সময় জুড়ে পাকিস্তান ছিল সামরিক বাহিনীর নিয়ন্ত্রণে। ১৯৫৮ খ্রিস্টাব্দের ৭ অক্টোবর আনুষ্ঠানিকভাবে সামরিক আইন জারি করা হলেও, এর পূর্বে বেসামরিক প্রশাসনকে সহায়তা প্রদানের জন্য বেশ কয়েকবার স্থানীয় পর্যায়ে স্বল্পমেয়াদী সামরিক আইন জারি করা হয়েছিল। শাসকশ্রেণি পূর্ব পাকিস্তান তথা বাংলাদেশকে উপনিবেশ হিসেবে শাসন করতে শুরু করে। প্রথমে আঘাত হানে ভাষার ওপর। ১৯৪৮ খ্রিস্টাব্দে রাষ্ট্রভাষা নিয়ে তারা ষড়যন্ত্র শুরু করে। ১৯৫২ খ্রিস্টাব্দের ২১ ফেব্র“য়ারি ভাষার জন্য শহিদ হয় অনেকে। এখনকার মতো তখন এত পত্রিকা ছিল না। রাজধানীর পত্রিকার মধ্যে কালকিনি আসত শুধু দৈনিক আজাদ। ইত্তেফাক তখনও সাপ্তাহিক। মাঝে মাঝে আসত। শিক্ষিতদের কেউ কেউ স্টেটসম্যান পড়তেন। রেডিওতে আন্দোলনের কোনো খবর আসত না। তবু কালকিনিবাসী বিভিন্নভাবে খবর সংগ্রহ করে নেয়। ২১ ফেব্র“য়ারি কালকিনিতে পরিপূর্ণ হরতাল পালিত হয়। পাকিস্তানি উপনিবেশ হতে মুক্তি পাওয়ার লক্ষ্যে প্রত্যেকটি আন্দোলনে কালকিনির নেতৃবৃন্দ সক্রিয় হয়ে ওঠে। ১৯৭১ খ্রিস্টাব্দের ২৬ মার্চ বঙ্গবন্ধু স্বাধীনতা ঘোষণা করেন।

প্রশাসনিক বিবর্তন
ব্রিটিশ শাসনামলের প্রারম্ভে ফরিদপুরের উত্তর-পশ্চিমাংশ রাজশাহী জমিদারির আওতাভুক্ত করা হয়েছিল। অন্যদিকে কালকিনিসহ ফরিদপুরের বাকি অংশ একজন নায়েব সুবেদার বা নায়েব নাজিমের আওতায় “ঢাকা নিয়াবত”-এর অধীনে রাজস্ব আদায়ের ব্যবস্থা করা হয়। ১৭৯৩ খ্রিস্টাব্দে চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত প্রচলন হলে গোয়ালন্দ ও গোপালগঞ্জের অধিকাংশ এলাকা যশোর প্রশাসনিক এলাকার সাথে যুক্ত করা হয়। বৃহত্তর ফরিদপুরের বাকি অংশ ঢাকা-জামালপুর জেলার সঙ্গে যুক্ত করা হয়। ঢাকাকে সদর দপ্তর করে ঢাকা, বাকেরগঞ্জ ও ফরিদপুরের অংশ নিয়ে ঢাকা-জামালপুর জেলা গঠন করা হয়। ১৭৯৭ খ্রিস্টাব্দে বাকেরগঞ্জকে ঢাকা-জামালপুর হতে বিচ্ছিন্ন করে নতুন জেলা গঠন করা হয়। অন্যদিকে, ১৮০৭ খ্রিস্টাব্দে ঢাকা-জামালপুর থেকে সদর দপ্তর ফরিদপুরে স্থানান্তর করা হয়। এ সময় ঢাকা শহর ও ঢাকা জেলাকে ‘ঢাকা-জামালপুর’ জেলা হতে বিচ্ছিন্ন করা হয়। একই সাথে ফরিদপুর জেলার পশ্চিমাংশের কিয়দংশ যশোর জেলা হতে বিচ্ছিন্ন করে ফরিদপুর জেলার সাথে যুক্ত করা হয়। ১৮১৫ খ্রিস্টাব্দে ফরিদপুর জেলাকে নতুন কালেক্টরেট অঞ্চলের মর্যাদায় উন্নীত করে একজন সহকারী কালেক্টরের অধীনে ফরিদপুর জেলার শাসন ন্যস্ত করা হয়। ১৮৫৯ খ্রিস্টাব্দে ফরিদপুর জেলাকে পূর্ণাঙ্গ জেলার মর্যাদায় উন্নীত করে একজন জেলা ম্যাজিস্ট্রেট ও কালেক্টরেট নিয়োগ প্রদান করা হয়।
১৮৫৪ খ্রিস্টাব্দে মাদারীপুর মহকুমা প্রতিষ্ঠা করা হয়। নবগঠিত মাদারীপুর মহকুমাকে বাকেরগঞ্জ হতে আলাদা করে ১৮৭৩ খ্রিস্টাব্দে ফরিদপুর জেলার সাথে যুক্ত করা হয়। ১৮৭৫ খ্রিস্টাব্দে ফরিদপুর জেলায় পূর্ণাঙ্গ জেলা জজ নিয়োগ করা হয়। সদর মহকুমা থেকে মকসুদপুর থানাকে, মাদারীপুর মহকুমা হতে গোপালগঞ্জ ও কোটালীপাড়াকে বাদ দিয়ে ১৯০৯ খ্রিস্টাব্দে গোপালগঞ্জ মহকুমা গঠন করা হয়। ১৮৫৪ খ্রিস্টাব্দে বর্তমান শরীয়তপুর জেলাকে মাদারীপুর মহকুমার অংশ গণ্য করে বাকেরগঞ্জ জেলার অধীনে ন্যস্ত করা হয়। কোটালীপাড়া ও গোপালগঞ্জ মাদারীপুর মহকুমার অন্তর্ভুক্ত ছিল। ১৯০৯ খ্রিস্টাব্দে মাদারীপুর মহকুমা গোপালগঞ্জ, গোয়ালন্দ ও ফরিদপুর সদরকে নিয়ে ফরিদপুর জেলা গঠন করা হয়। মাদারীপুর, কালকিনি, শিবচর, রাজৈর, পালং, জাজিরা, নড়িয়া, ভেদরগঞ্জ ও গোসাইরহাট নিয়ে মাদারীপুর মহকুমা গঠিত হয়েছিল। মহকুমা সদর দপ্তর মাদারীপুরে স্থাপন করা হলেও এটি পূর্বাঞ্চল ও পশ্চিমাঞ্চল নামের দু’টি অঞ্চলে বিভক্ত ছিল। প্রশাসনিক সুবিধার্থে দু’জন আইসিএস অফিসার দ্বারা এ মহকুমার প্রশাসনিক কার্যক্রম পরিচালনা করা হত।
বাংলাদেশ স্বাধীন হবার পর বাংলাদেশের অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে কালকিনির জনগণ প্রথম পূর্ণ স্বাধীনতার স্বাদ অনুভব করেন। ১৯৭১ খ্রিস্টাব্দের ১৬ ডিসেম্বর স্বাধীনতার ঘোষণা শোনার সাথে সাথে কালকিনির হাজার হাজার জনগণ জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে পথে নেমে আনন্দ উল্লাস শুরু করেছিল। ১৯৭৫ খ্রিস্টাব্দে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান মাদারীপুর মহকুমাকে জেলায় উন্নীত করেন। ভেদরগঞ্জ উপজেলার এডভোকেট আবিদুর রেজা খান এমপি-কে জেলা গভর্নর নিয়োগ করা হয়। তবে, ১৯৭৫ খ্রিস্টাব্দের ১৫ আগস্ট কালোরাত্রির নৃশংস ঘটনার পর মাদারীপুর জেলাকে পুনরায় মহকুমায় পরিণত করা হয়। কালকিনি থানা পুনরায় ফরিদপুর জেলার আওতায় চলে যায়। ১৯৭৮ খ্রিস্টাব্দে মাদারীপুর মহকুমার পালং, নড়িয়া, ভেদরগঞ্জ, ডামুড্যা, গোসাইরহাট থানা নিয়ে শরিয়তপুর মহকুমা গঠিত হয়। ১৯৮৪ খ্রিস্টাব্দের ১ আগস্ট মাদারীপুর ও শরিয়তপুর দুটি পৃথক জেলায় উন্নীত হয়। কালকিনি সঙ্গতকারণে প্রথম বারের মত মাদারীপুর জেলা প্রশাসনের আওতায় চলে আসে। জনাব আবদুর রশীদকে মাদারীপুর জেলার প্রথম জেলাপ্রশাসক নিয়োগ করা হয়। তিনি ১৯৮৪ খ্রিস্টাব্দের ১ মার্চ হতে ১৯৮৭ খ্রিস্টাব্দের ৯ এপ্রিল পর্যন্ত মাদারীপুর জেলার জেলাপ্রশাসক হিসেবে দায়িত্ব পালনকরেন।
বর্তমান কালকিনি নামে পরিচিত উপজেলা ভূখণ্ডটির আয়তন ২৭৯.৯৮ বর্গ কিলোমিটার। উত্তরে মাদারীপুর সদর ও শরিয়তপুর সদর উপজেলা, দক্ষিণে গৌরনদী এবং মুলাদি উপজেলা, পূর্বে গোসাইরহাট, মুলাদি ও ডামুড্যা উপজেলা, পশ্চিমে কোটালীপাড়া ও গৌরনদী উপজেলা। প্রধান নদী পদ্মা ও আড়িয়াল খাঁ। বর্তমান কালকিনি থানা যেখানে অবস্থিত, সেটি এর পূর্বে খাজুরতলা নামে পরিচিত ছিল। ওখানে প্রচুর খেজুরগাছ ছিল বলে এলাকাটি খাজুরতলা নাম পায়। ১৯৩০ খ্রিস্টাব্দে কালকিনি থানা প্রতিষ্ঠা হয় এবং ১৯৮৩ খ্রিস্টাব্দের ১৯ অক্টোবর উপজেলায় উন্নীত হয়। আনোয়ার হুসাইন কালকিনি উপজেলার প্রথম উপজেলা নির্বাহী অফিসার। তিনি ১৯৮৩ খ্রিস্টাব্দের ১৯ অক্টোবর হতে ১৯৮৫ খ্রিস্টাব্দের ৭ আগস্ট পর্যন্ত কালকিনির উপজেলা নির্বাহী অফিসারের দায়িত্ব পালন করেন। বিখ্যাত আড়িয়াল খাঁ নদীর ঐশ্বর্যময় বাঁকে ৮টি ও পলারদি নদীর পশ্চিম পারের ৬টি মোট ১৪টি ইউনিয়ন নিয়ে বর্তমান কালকিনি উপজেলার অবয়ব। উপজেলাগুলো হচ্ছে: ১নং কয়ারিয়া, ২নং সাহেবরামপুর ইউনিয়ন, ৩নং রমজানপুর, ৪নং চরদৌলত খান ইউনিয়ন, ৫নং শিকারমঙ্গল ইউনিয়ন ৬নং বাঁশগাড়ি ইউনিয়ন, ৭নং লক্ষ্মীপুর ইউনিয়ন, ৮নং এনায়েতনগর ইউনিয়ন, ৯ নং আলীনগর ইউনিয়ন, ১০নং গোপালপুর ইউনিয়ন, ১১ নং ডাসার ইউনিয়ন, ১২ নং নবগ্রাম ইউনিয়ন, ১৩ কাজি বাকাই ইউনিয়ন এবং ১৪নং বালিগ্রাম। ১৯৯৭ খ্রিস্টাব্দে কালকিনিতে একটি পৌরসভা প্রতিষ্ঠা পায়।

১. মাদারীপুর জেলা পরিচিতি, আবদুল জাব্বার মিয়া, প্রকাশকাল: ২৬ সেপ্টেম্বর ১৯৯৪, পৃষ্ঠা: ৭।

কালকিনির জনমিতি ও ঐতিহ্য

২৭৯.৯৮ বর্গকিলোমিটার আয়তন বিশিষ্ট কালকিনি উপজেলার মোট জনসংখ্যা ২,৭২,১২০, তন্মধ্যে পুরুষ ও মহিলা যথাক্রমে ১,৩৮,৫৮০ ও ১,৩৩,৫৪০ এবং মোট পরিবার ৫৩,১৪০। ১৮ বছরের ঊর্ধ্বে বয়স্ক লোকের সংখ্যা ১,৩৫,৯৮০। মোট জনসংখ্যার মাত্র ১২.৩ ভাগ লোক শহরে বাস করে।১ ১৯৯০ সালে কালকিনির লোকজনের শিক্ষার হার ছিল ২৮ ভাগ; সৈয়দ আবুল হোসেনের একক প্রচেষ্টায় যা ২০০১ খ্রিস্টাব্দে ৪৪.৮৯ এবং ২০০৮ খ্রিস্টাব্দে ৭৪ ভাগে এসে দাঁড়ায়।
কালকিনি পৌরসভার মোট ৬,৫৬০টি পরিবারের লোকসংখ্যা ৩০,৬৬০। তন্মধ্যে পুরুষ ১৫,৫৮০ এবং মহিলা ১৫,০৮০। পৌরবাসীর মধ্যে ৬৮.১৬ ভাগ পরিবার নিজ মালিকানাধীন বাসায় এবং ১৭.৭২ ভাগ লোক ভাড়া বাসায় বসবাস করে। ভাড়াহীন বাসায় থাকেন ১.৯০ ভাগ। গ্রামীণ পরিবারের মধ্যে ৯৬.৮২ ভাগ লোক নিজ মালিকানাধীন বাসায় এবং ০.৭০ ভাগ লোক ভাড়া বাসায় এবং ১.৪৫ ভাগ লোক ভাড়াহীন বাসায় বসবাস করেন। পৌরসভা এলাকায় ৪৯.৫৪ ভাগ লোকের এবং গ্রাম এলাকায় ৭৬.৫৪ ভাগ লোকের নিজস্ব কৃষি জমি আছে।
গ্রামীণ পরিবারের মধ্যে ৯৬.৮২ ভাগ লোক নিজ মালিকানাধীন বাসায়, ০.৭০ ভাগ লোক ভাড়া বাসায় এবং ১.৪৫ ভাগ লোক ভাড়াহীন বাসায় বসবাস করেন। শহর এলাকায় ৪৯.৫৪ ভাগ এবং গ্রাম এলাকায় ৭৬.৫৪ ভাগ লোকের নিজস্ব কৃষি জমি আছে। ১৯০১ খ্রিস্টাব্দে কালকিনি উপজেলার জনসংখ্যার ঘনত্ব ছিল প্রতি বর্গমাইলে ১৯০ জন এবং ১৯১১ খ্রিস্টাব্দে তার ২১০- এ এসে দাঁড়ায়।২ ১৯০১ খ্রিস্টাব্দে কালকিনির জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার ছিল ০.৮৭, ১৯২১ খ্রিস্টাব্দে ০.৫২, এবং ১৯৩১ খ্রিস্টাব্দের ০.৬৮। তবে ১৯৪১ খ্রিস্টাব্দের তা ১.৬৫ এ উন্নীত হয়। ১৯৯১ খ্রিস্টাব্দের আদমশুমারি অনুযায়ী জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার ছিল ১.৯৯, যা ২০০১ খ্রিস্টাব্দের আদমশুমারিতে ১.৫৩ মর্মে দেখা যায়। এ উপজেলায় ০-৪ বছর বয়স্ক শিশু মোট জনসংখ্যা শতকরা ১৩.১ ভাগ। ৫-৯ বছর বয়স্ক জনসংখ্যার শতকরা ১৩.৬; ১০-১৪ বছর বয়স্ক জনসংখ্যা শতকরা ১২.৮। অন্যদিকে ২৫-২৯, ৩০-৩৪, ৩৫-৩৯ এবং ৪০-৪৪ বছর বয়স্ক জনসংখ্যা শতকরা যথাক্রমে ৮.৭, ৭.১, ৬.৫ এবং ৫। এ উপজেলায় সত্তরোর্ধ্ব জনসংখ্যার হার মোট জনসংখ্যা মাত্র শতকরা ২.৭ ভাগ।৩
কালকিনি উপজেলার শহর এলাকার ৮.৫০ ভাগ লোক ট্যাপ-এর পানি, ৭৭.৩৮ ভাগ লোক নলকূপের পানি, ১০.৬০ ভাগ লোক গভীর নলকূপের পানি, ০.৪৫ ভাগ লোক পুকুরের পানি এবং ৩.০৭ ভাগ লোক অন্যান্য উৎস হতে প্রাপ্ত পানি পান করে। গ্রাম এলাকার ০.২০ ভাগ লোক ট্যাপ, ৯১.৩৪ ভাগ লোক নলকূপ, ৪.৩২ ভাগ লোক গভীর নলকূপ, ১.১৭ ভাগ লোক পুকুর এবং ২.৯৭ ভাগ লোক অন্যান্য উৎস হতে প্রাপ্ত পানীয় জল ব্যবহার করেন। কালকিনি উপজেলার শহর এলাকায় ৫৫.৭৪ ভাগ এবং গ্রাম এলাকার ২৮.০০ ভাগ লোক বিদ্যুৎসুবিধা ভোগ করেন।
কালকিনির বাতাসের গড় গতিবেগ ঘণ্টায় ৭.৯ কিলোমিটার এবং আদ্রতা সর্বনিু ৩৯% এবং সর্বোচ্চ ৮৫%। বৃষ্টিপাতের সর্বনিু ও সর্বোচ্চ পরিমাণ যথাক্রমে ২৭২০ মিলিমিটার ও ৪৭৯৪ মিলিমিটার। তাপমাত্রার পূর্বাপর রেকর্ড বিশ্লেষণে কালকিনির আঞ্চলিক তাপমাত্রা এ পর্যন্ত ৩৮.৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস অতিক্রম করেনি দেখা যায়। সর্বনিু তাপমাত্রা ৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত রেকর্ড হয়েছে। বৃষ্টিপাত, তাপমাত্রা, আদ্রতা ও বাতাসের স্বাভাবিক গতিবেগ বিবেচনায় কালকিনির আবহাওয়া মানুষের মন ও স্বাস্থ্যের অনুকূলে। তবে ভূগর্ভস্থ পানির লবণাক্ততা মানুষের রঙকে কিছুটা মলিন করে দেয়। ১২.৭ হতে সর্বোচ্চ ৩৩ ফুট গভীরে ভূ-গর্ভস্থ পানির স্তর বিন্যাস বিন্যস্ত। গড় স্তর দৈর্ঘ্য ২০ ফুট। তাই গভীর এবং অগভীর উভয় প্রকার নলকূপ এখানে স্বল্পব্যয়ে কার্যকর ও ক্রিয়াশীল।
ব্রিটিশ আমলে সারা উপমহাদেশে কালকিনি বিশেষ মর্যাদার অধিকারী ছিল। তাদের স্বাধিকার চেতনা ও দেশপ্রেম ব্রিটিশ সরকারকে তটস্থ রাখত। জনসাধারণের শিক্ষা, সংস্কৃতি, রাজনীতিক ঐতিহ্য, মানবসম্পদ উন্নয়ন, দেশপ্রেম ইত্যাদি কালকিনিকে বিখ্যাত করে তুলেছিল। আর্থ-সামাজিক কর্মকাণ্ডের গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রসমূহে কালকিনিবাসী মেধা-শ্রম ও মননশীলতার মাধ্যমে নিজেদের পরিপূর্ণ মাত্রায় বিকশিত করতে সক্ষম হয়েছিল। স্বাধীনতাপূর্ব ভারতবর্ষে ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনের সূতিকাগার হিসেবে খ্যাত গোপালপুর ও ডাসার দ্বিতীয় চাঁটগা হিসেবে খ্যাত ছিল। উপমহাদেশের বিখ্যাত বিপ্লবীদের অনেকে আত্মগোপন কিংবা আত্মগোপনরত বিপ্লবীদের নিকট হতে দীক্ষা নেয়ার জন্য কালকিনি এসেছিলেন। মাস্টারদা সূর্যসেন, অধ্যাপক পুলিন দে, বাঘা যতীন, সুভাষ বসু, সরোজিনি নাইডু ও জওহরলাল নেহেরুর মত নেতাগণ এখানে অবস্থান করেছেন বলে প্রবাদ আছে। উৎস হিসেবে কালকিনি উপজেলার অধিকাংশ লোক বিক্রমপুর, ঢাকা, চাঁদপুর, বরিশাল, ফরিদপুর, চট্টগ্রাম, ত্রিপুরা ও দেশের বিভিন্ন উপকূলীয় অঞ্চল হতে বিভিন্ন সময় বিভিন্ন কারণে এসে বসতি গড়ে তুলেছে। এলাকাভিত্তিক অবস্থান অভিবাসন প্রক্রিয়া বহুলাংশে নিয়ন্ত্রণ করত। কালকিনি উপজেলায় বরিশাল, ত্রিপুরা ও চাঁদপুর অঞ্চলের লোক বেশি।
উপজেলার বিভিন্ন অংশে বিক্রমপুর, ঢাকা ও ফরিদপুর অঞ্চলের লোকেরা অধিক সংখ্যায় নিবাস গড়ে তুলেছে। পৌরসভার আশেপাশের সবগুলো অঞ্চলের লোকের নিবাস লক্ষ করা গেলেও বিক্রমপুর, ফরিদপুর, বরিশাল ও চাঁদপুরের লোকদের প্রাধান্য অধিক। আন্তঃসাম্প্রদায়িক সৌহার্দ্য ও সম্প্রীতি কালকিনি উপজেলার অধিবাসীদের অন্যতম বৈশিষ্ট্য। ১৯৪৬ খ্রিস্টাব্দে কিংবা স্বাধীনতার পূর্বে দেশে কয়েকবার হিন্দু-মুসলমান দাঙ্গা সংঘটিত হয়েছিল। দাঙ্গায় বহু হিন্দু পরিবার দাঙ্গাবিধ্বস্ত এলাকা হতে কালকিনি উপজেলাকে নিরাপদ ভেবে আশ্রয় গ্রহণ করে স্থায়ী নিবাস গড়ে তোলে। হিন্দু-মুসলিম দাঙ্গা সারা দেশে ছড়িয়ে পড়লেও কালকিনিতে কোনো প্রভাব ফেলতে পারেনি। অধিবাসীদের সহনশীলতা ও বহুজাতিক বৈশিষ্ট্যের কারণে এখানে সাম্প্রদায়িকতা কোনো সময় মাথাচাড়া দিয়ে ওঠার অবকাশ পায়নি। তবে ১৯৪৭ খ্রিস্টাব্দে দেশ বিভাগের কারণে কিছু বনেদি হিন্দু পরিবার কালকিনি ত্যাগ করে ভারতে চলে যায়। 
মানসিক বিকাশ ও চেতনা বিবেচনায় কালকিনি এলাকার অধিবাসীরা সাধারণত প্রতিভাবান ও প্রখর স্মৃতিশক্তির অধিকারী। দৈনন্দিন জীবন পরিচালনায় প্রয়োজনীয় মৌলিক চাহিদা অন্নের সহজলভ্যতার কারণে লোকজন প্রকৃতিগতভাবে শ্রমকাতর। তবে যারা পরিশ্রমী তারা যেমন মেধাবী তেমনি অধ্যবসায়ী। শ্রম, মেধা, আভিজাত্য, জনপ্রিয়তা ও সাফল্য বিবেচনায় সৈয়দ আবুল হোসেন কালকিনিবাসীর গর্ব।
পদ্মা-মেঘনার মোহনা, কীর্তিনাশা ও আড়িয়াল খাঁ-এর কোলঘেঁষে গড়ে ওঠা নদী ‘দুলালী’ কালকিনি যেন প্রকৃতির এক অপূর্ব কেতন। অবস্থানগত কারণে ঘুর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস ও মাটিধস ইত্যাদি কালকিনির নৈমিত্তিক প্রাকৃতিক দুর্যোগ। প্রতি বছর বিভিন্ন প্রাকৃতিক দুর্যোগ তথা ছোট বড় জলোচ্ছ্বাস, ঘূর্ণিঝড়, বন্যা বা ভূমিধ্বস কালকিনিকে আঘাত করে। ভূমি-ক্ষয় নদীবেষ্টিত কালকিনির স্বাভাবিক প্রাকৃতিক প্রক্রিয়ার মত জনজীবনকে বিষিয়ে রাখে। অনবরত ভাঙনের ফলে আয়তন ও আকার পরিবর্তন কালকিনির অন্যতম ভূ-প্রাকৃতিক বৈশিষ্ট্য। চর এলাকার মানুষ ভাঙনকে ভয় পেলেও অস্বাভাবিক মনে করে না।
কালকিনি অঞ্চলের মাটি পলিমিশ্রিত বলে প্রাকৃতিকভাবে উর্বর। অধিকাংশ জমি দুই ফসলি। অতি সহজে প্রচুর পরিমাণ ধান ও অন্যান্য ফসলাদি উৎপন্ন হয়। ভাটি এলাকা বলে অধিকাংশ চাষযোগ্য জমি বছরের ৫ মাস পানির নিচে থাকে। মাটি যে কোনো ফসলের জন্য উপযুক্ত। চতুর্দিকে ছড়িয়ে প্রচুর সবুজ বৃক্ষ। তবে প্রাচীনকালের বয়স্ক কোনো বৃক্ষের অস্তিত্ব চোখে পড়ে না। ঝড় এবং ভাঙন সব শেষ করে দিয়েছে। প্রতিটি বৃক্ষ-লতাই ঘন সবুজ ও পুষ্ট। এখানকার নারিকেল দেশের অন্যান্য এলাকার নারিকেলের তুলনায় আকারে বড় ও সুস্বাদু। বিভিন্ন প্রজাতির মাছের সহজলভ্যতা প্রাকৃতিক গর্ব। এটি স্রষ্টার অনবদ্য নৈবদ্য হিসেবে কালকিনিকে সমৃদ্ধতর করে রেখেছে।
জনসংখ্যার ৮০ ভাগ কৃষিজীবী ও মৎস্যজীবী। মূলত কৃষি ও মাছ কালকিনির আর্থ-সামাজিক কাঠামোর মূল বুনিয়াদ। প্রচুর সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও এখানে কোনো শিল্পকারখানা নেই। এমনকি কুটিরশিল্পও তেমন একটা চোখে পড়ে না। অথচ অভ্যন্তরীণ প্রায় আড়াই লক্ষ লোকের নিজস্ব প্রয়োজনে মাঝারি আকারের শিল্প কারখানা পর্যাপ্ত লাভজনক বলে গবেষণায় দেখা যায়। নদীভাঙন ও কষ্টকর যাতায়াত ব্যবস্থার কারণে শিল্পকারখানা গড়ে উঠছে না। কালকিনির বিভিন্ন লোক দেশের অন্যান্য অঞ্চলে শিল্পকারখানা গড়ে তুললেও নিজ এলাকার দিকে নজর দিচ্ছে না। যোগাযোগ ব্যবস্থার কারণে এখানে শিল্প কারখানা গড়ে ওঠার সুযোগ তৈরি হচ্ছে না। ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও কাঁচা-মাল ও বিদ্যুতের অভাবে শিল্প কারখানা গড়ে তোলা যাচেছ না বলে যোগ্যতাস¤পন্ন ও ইচ্ছুক কয়েকজন শিল্পপতি জানান। অনেক শিল্পপতি বিদ্যুৎ ও যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নতি ঘটানো সম্ভব হলে এখানে শিল্প প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন। 
মাদারীপুরের অধিকাংশ লোক দরিদ্র। তবে ঢাকার ন্যায় চরম দারিদ্র্য সীমার নিচে অবস্থান করে এমন লোক নেই বললে চলে। অল্প পরিশ্রমে দৈনিক খরচের আয় উঠে আসে বলে কাউকে উপোস থাকতে হয় না। তাই এরা প্রকৃতিগতভাবে অলস ও সুখপ্রিয়। আর্থিক দীনতার কারণে ৪০% গার্ডিয়ান সন্তানদের বিদ্যালয়ে পাঠানোর চেয়ে ক্ষেতে বা জাল নিয়ে নদীতে পাঠিয়ে দিতে উৎসাহী। তবে সৈয়দ আবুল হোসেনের শিক্ষা প্রসার কালকিনির শিক্ষার হারকে দ্রুত বৃদ্ধি করছে। নারী শিক্ষায় এখনও কালকিনিবাসীর অবস্থান অনেক পিছিয়ে। শিক্ষার নিুহারের কারণে বহুবিবাহ, যৌতুকপ্রথা, অল্পবয়সে বিবাহ ও পারিবারিক বিবাদ সামাজিক জীবনকে অক্টোপাশের মত আঁকড়ে রেখেছে। কুসংস্কার যেন ৮০ভাগ শরীয়তপুরবাসীর সংস্কৃতি। জিন, ভূতপ্রেত ও ঝাড়ফুকের কবলে নিপতিত কালকিনিবাসীর গড় বয়স জাতীয় মাত্রার চেয়ে ৫ বছর কম। অথচ প্রাকৃতিক নির্মলতা ও প্রোটিন প্রাপ্তির সহজলভ্য উৎস বিবেচনায় গড়আয়ু জাতীয় হারের চেয়ে ১২ বছর বেশি হওয়াই ছিল সংগত। ধর্মীয় বিশ্বাসের সাথে গোঁড়ামিও লক্ষণীয়। তবে এ গোঁড়ামি অসাম্প্রদায়িক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি না করলেও নিজেদের আর্থ-সামাজিক ও স্বাস্থ্যগত ব্যবস্থার প্রতি হুমকিস্বরূপ।
কালকিনির আর্থ-সামাজিক কর্মকাণ্ডের বুনিয়াদ মূলত কমবেশি ৩০০ পরিবারের আয়ত্ত্বে। কৃষি, মৎস্য ও যানবাহন সেক্টরসহ আর্থ-সামাজিক প্রক্রিয়ার প্রায় সবকিছু মুষ্টিমেয় কয়েকটি পরিবারে সীমাবদ্ধ। এ তিনশ’ পরিবার কালকিনির মূল নিয়ন্ত্রক ও সামাজিক ব্যবস্থার প্রভাবক। বাকিরা তাদের প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ ইশারায় তাড়িত হয় বা হতে বাধ্য হয়। অধিকাংশ লোক মুসলিম, হিন্দুও রয়েছে। তবে এলাকায় কোনো ধর্মীয় সহিংসতা বা সাম্প্রদায়িকতা নেই। বিগত ৫০ বছরে এখানে কোনো ধর্মীয় হানাহানি হয়নি। লোকজন ধর্মভীরু। মাদ্রাসাভিত্তিক শিক্ষা ব্যবস্থার তুলনামূলক প্রাধান্য লক্ষণীয়।
প্রাচীনকাল হতে কালকিনির অধিবাসীরা স্বাধীনচেতা। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয় তারা অনাদিকাল হতে রাজনীতিকভাবে সচেতন ও দেশপ্রেমে উদ্বেল চেতনার অধিকারী ছিল। এ কারণে মোগলদের মতো শক্তিশালী পরাশক্তিও তাঁদেরকে সহজে পরাভূত করতে পারেনি। ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনে যে সকল অঞ্চল প্রথম গর্জে উঠেছিল তন্মধ্যে কালকিনি প্রথম সারিতে। এ এলাকার জনগণের রাজনীতিক সচেতনতা ব্রিটিশরাজ পর্যন্ত সমীহ করে চলত। প্রাকৃতিক প্রতিবন্ধকতা তাদেরকে যেমন সাহসী তেমনি আত্মপ্রত্যয়ী করে তুলেছে। আর্থ-সামাজিক অবস্থার মতো কালকিনির রাজনীতিও কয়েকটি পরিবারে সীমাবদ্ধ। জমিদারি প্রথা না-থাকলেও এখনও তার পুরনো রেশ নতুন মাত্রায় ক্রিয়াশীল। সাধারণ মানুষের আর্থ-সামাজিক অবস্থার উন্নয়নের কোনো কার্যকর পরিকল্পনা বৃহৎ পরিসরে নেয়া হয়নি। এলাকার রাজনীতিক কর্মকাণ্ডের প্রভাবও স¤পদশালী কয়েকটি পরিবারকে কেন্দ্র করে আবর্তিত। সারাদেশের ন্যায় এখানেও রাজনীতিক বিভক্তি আছে। তবে সুখের কথা যে, রাজনীতিক হানাহানি তেমন মারাত্মক রূপ পরিগ্রহ করে না। মাঝে মাঝে রাজনীতিক হানাহানির ঘটনা ঘটলেও তার মাত্রা নগণ্য। বলা যায় সহনীয়।
প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও প্রতিকূল আবহাওয়া কালকিনিবাসীর সাহস ও ধীশক্তির উৎস। দেশের প্রধান প্রধান শহরগুলোতে কালকিনির বহুলোক সমৃদ্ধ অবস্থানে অবস্থান করছে। চট্টগ্রাম ও ঢাকাসহ দেশ-বিদেশের বিভিন্ন এলাকায় কালকিনিতে জন্মগ্রহণকারী ১০৮ জন কোটিপতি বসবাস করছে। অধিকাংশ লোক সহজ-সরল ও অতিথিপরায়ণ। প্রত্যন্ত এলাকার অনেক লোক এত সহজ-সরল যে, পিতার নাম পর্যন্ত মনে রাখা প্রয়োজন বোধ করে না। প্রত্যন্ত চর এলাকায় পরিচালিত একটি জরিপে দেখা যায়, ২০ বছর হতে ৬৫ বছর বয়সী ১০০ জন লোকের মধ্যে ১১ জন তাদের জন্মদাতার নাম বলতে পারেনি। স্মরণ করিয়ে দিতে হয়েছে তিন জনকে। এর মধ্যে ২ জন সম্পূর্ণ ভুলে গেছে পিতার নাম। বয়স বলতে পারেনি ৫৬ জন। মহাজন এবং মৎস্য দাদনের যাঁতাকলে দরিদ্র মৎস্যজীবীরা কুরে কুরে মরছে। এখানে বিদ্যার্জন ও আর্থিক সচ্ছলতা আভিজাত্য অর্জনের পূর্ব শর্ত। ‘জন্ম নয়, কর্মই বড়’ নীতি দ্বারা অভিজাত-অনভিজাত নির্ধারিত হয়। সহজে গাড়ি প্রবেশে সক্ষম পুরুষ ও মহিলাদের জন্য আলাদা পায়খানার ব্যবস্থা সমন্বিত সামনে-পেছনে পুকুরওয়ালা বড় রাস্তার পাশে পাকা বা টিনের বাড়ি অভিজাত বাড়ি বলে পরিচিত। অভিজাত বাড়ির মালিক আভিজাত্যের মর্যাদা ভোগ করে থাকেন। তবে জমির অভাবে আর্থিক সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও অভিজাত বাড়ি তৈরি করা দুঃসাধ্য। অভিজাত পরিবারের সাথে স¤পর্ক স্থাপন করাও আভিজাত্যের সোপান। অভিজাত-অনভিজাত বৈবাহিক স¤পর্ক এখন আগের মতো কড়াকড়ি না-হলেও বিষয়টি গুরুত্ব সহকারে বিবেচনা করা হয়। এমন অনেক পরিবার আছে যারা বৈবাহিক স¤পর্ক স্থাপনে আভিজাত্য তথা পূর্বপুরুষদের সামাজিক মর্যাদাটাকে বেশ গুরুত্ব দিয়ে থাকেন। আবার অনেকে মনে করেনÑ কর্ম ও বর্তমান অবস্থানই মূল বিষয়।
১৯৫০-এর দশকেও কেউ চরে বাড়ি করলে তাঁকে অনভিজাত ও চউররা বলে আখ্যায়িত করা হতো। বর্তমানে কিন্তু ‘চউররা’ বলে মুখ সিটকানোর বা অনভিজাত ভাবার দিন শেষ। এখন অভিজাতদেরও চরে বাড়ি না-করে উপায় নেই। মলঙ্গী এবং তেলীদেরকে মুসলমানদের মধ্যে নিচুজাত ভাবা হতো। অতীতে সারেং, ঘাটসারেং, সুকানী প্রমুখদের যথেষ্ট মর্যাদা ছিল। ১৯২০ খ্রিস্টাব্দের দিকে অবশ্য সারেং সুকানীদের মর্যাদা কমে যায়। চাকুরির সুলভতা, কতিপয় নাবিকের বিলাসিতা ও অসামাজিক আচরণ এর জন্য দায়ী। এখানে অনেকে জন্মসূত্রে অভিজাত দাবি করেন। জন্মসূত্রে অভিজাত দাবিদারেরা নিজেদেরকে মোগল বংশোদ্ভুত কিংবা মোগল শাসনামলে শাসক কর্তৃক জায়গির প্রাপ্ত সৈনিকদের বংশধর বলে মনে করেন। তবে সবচেয়ে অভিজাত সৈয়দ পরিবার। বিক্রমপুর কিংবা ত্রিপুরা জমিদারের বংশধর অথবা চাঁদরায় কেদার রায় এর রাজত্বে গুরুত্বপূর্ণ পদে আসীনদের উত্তর পুরুষগণও অভিজাত বলে স্বীকৃত। তাছাড়া আরব বংশোদ্ভুত পরিবারগুলোও সবচে অভিজাত হিসেবে চিহ্নিত।
ফরায়েজি আন্দোলন, ওহাবি আন্দোলন, ১৮৫৭ খ্রিস্টাব্দের স্বাধীনতা আন্দোলন (সিপাহী বিদ্রোহ), সন্ত্রাসবাদী আন্দোলন, ১৯০৫ খ্রিস্টাব্দের বঙ্গভঙ্গ ও বঙ্গভঙ্গ রদ আন্দোলন, ১৯২০ খ্রিস্টাব্দের খেলাফত আন্দোলন, অসহযোগ আন্দোলন, হিন্দু-মুসলিম ঐক্য প্রয়াস, ১৯০৬ খ্রিস্টাব্দের মুসলিম লিগ গঠন, ১৯৪০-১৯৪৬ খ্রিস্টাব্দে পাকিস্তান আন্দোলন, ১৯৪৬ খ্রিস্টাব্দে কলিকাতার দাঙ্গা হতে শুরু করে ১৯৪৭ খ্রিস্টাব্দে স্বাধীনতা অর্জন পর্যন্ত ব্রিটিশ বিরোধী প্রতিটি আন্দোলনে কালকিনিবাসীর অবদান ছিল অনন্য। ১৯৫২ খ্রিস্টাব্দের ভাষা আন্দোলনেও কালকিনিবাসী গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছিল। ১৯৫৪ খ্রিস্টাব্দে যুক্তফ্রন্ট সাধারণ নির্বাচনে কালকিনির জনগণের রাজনীতিক সচেতনতা ছিল বিস্ময়কর। ১৯৫৪ খ্রিস্টাব্দে অ্যাডভোকেট আদিল উদ্দিন যুক্তফ্রন্টের মন্ত্রী নির্বাচিত হয়েছিলেন। তবে কলকাতায় শপথ গ্রহণের পরপরই প্রেসিডেন্ট মন্ত্রিপরিষদ বিলুপ্ত করায় দায়িত্ব গ্রহণ করতে পারেননি। তিনি ছিলেন কালকিনি প্রথম অধিবাসী, যিনি মন্ত্রী হয়েছিলেন। দ্বিতীয় সৈয়দ আবুল হোসেন। ১৯৬২ ও ১৯৬৫ খ্রিস্টাব্দের নির্বাচন ও ১৯৬৬ খ্রিস্টাব্দের ছয় দফা আন্দোলন হতে শুরু করে ১৯৬৮-৬৯ খ্রিস্টাব্দের গণআন্দোলনে কালকিনিবাসীর সচেতন জনগণের দেশপ্রেম অনন্য স্বকীয়তায় বিকশিত হয়েছিল। ১৯৭০ খ্রিস্টাব্দের সাধারণ নির্বাচন ও ১৯৭১ খ্রিস্টাব্দের স্বাধীনতা যুদ্ধে কালকিনিবাসী সাহসী জনগণের প্রত্যক্ষ ভূমিকা ছিল দেশপ্রেম ও স্বাজাত্যবোধের উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।

১. ২০০১ খ্রিস্টাব্দের আদমশুমারি।
২. Estimated from Population Census, 2001.
৩. Population Census, 2001.

আধুনিক কালকিনির জনক
ডাসার একটি প্রত্যন্ত ইউনিয়ন, তবে এখন থানা। উল্লেখ্য গত ২ মার্চ ২০১৩ মাননীয় প্রধান মন্ত্রী শেখ হাসিনা ডাসারকে থানায় উন্নীত করেন। এ জেলায় জনবসতির আগমন সম্পর্কে জানা গেছে, সুদূর অতীতে প্রখ্যাত আউলিয়া হযরত শাহ আলী বোগদাদী (র.)-এর জ্যেষ্ঠ সন্তান শাহ ওসমান (র.) বাঘের পিঠে চড়ে ডাসার এলাকায় শুভাগমন করে প্রথম বসতি স্থাপন করেছিলেন। সময়ের স্রোতে এ গ্রামে বিখ্যাত ব্যক্তিবর্গের জন্ম হতে থাকে, যাঁরা দেশ-বিদেশে মেধা ও প্রজ্ঞার মাধ্যমে খ্যাতিমান হয়েছেন। তবে শিক্ষার দিক হতে এলাকাটি পশ্চাতে পড়ে থাকে। যারা বড় হয়েছেন তারা আর গ্রামে থাকেননি, গ্রামের দিকে তাকাননি। উৎসমূলকে অবহেলায় রেখে শহরে চলে গেছেন জৌলুসময় জীবনে। তবে সৈয়দ আবুল হোসেন বড় হলেও গ্রামকে ভোলেননি। যে গ্রামের আলো-হাওয়ায় তিনি মানুষ, সে গ্রামকে যিনি ভুলে যান, অবহেলা করেন তিনি কখনও মহৎ হতে পারেন না। কালকিনির অপরূপ নৈসর্গিক সৌন্দর্য আর উন্নয়নের সম্ভাবনাকে ত্বরান্বিত করার লক্ষ্যে সৈয়দ আবুল হোসেন সম্পূর্ণ নিজ অর্থায়নে কালকিনিতে একের পর এক নির্মাণ করেছেন রাস্তাঘাট। গড়ে তুলেছেন স্কুল-কলেজ, ক্লাব, কর্মমুখী শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। মানুষের বিভিন্ন অভাব-অভিযোগের তাৎক্ষণিক সমাধানার্থে উদার হস্তে ব্যয় করেছেন অর্থ, সময় ও প্রজ্ঞা।
কালকিনির উন্নয়নে সৈয়দ আবুল হোসেনের অবদানের কথা বলতে গিয়ে কালকিনি বিশ্ববিদ্যালয় কলেজের অধ্যক্ষ মো. খালেকুজ্জামান সাহেব বলেন, ‘পদ্মা, আড়িয়াল খাঁ, পলারদি বিধৌত ফরায়েজি আন্দোলনের প্রাণপুরুষ হাজি শরিয়তল্লাাহর স্মৃতি বিজড়িত ও উপমহাদেশের প্রখ্যাত সুফি শাহ মাদারের পুণ্যভূমি মাদারীপুর জেলার একটি প্রত্যন্ত উপজেলা-জনপদ কালকিনি। এটি সমুদ্র উপকূলবর্তী উপজেলা। নদীমাতৃক হওয়ায় বাংলাদেশের অন্যান্য অঞ্চল হতে অপেক্ষকৃত নিচু। ভৌগোলিক কারণেই এলাকাটি ঝড়, জলোচ্ছ্বাস ও বন্যার মতো প্রাকৃতিক অভিশাপে অভিশপ্ত। তাছাড়া রাজনৈতিক কারণেই এলাকাটি দীর্ঘ দিন জাতীয় উন্নয়নের সার্বিক অবস্থা থেকে অনেক অনুন্নত এবং পিছিয়ে। স্বাধীনতা-পূর্ববর্তী বা পরবর্তীকালে সৈয়দ আবুল হোসেনের পূর্বে কালকিনি উপজেলার কোনো অধিবাসী সংসদ সদস্য ছিলেন না। অন্য এলাকার লোক সংসদ সদস্য ছিলেন। ফলে প্রত্যন্ত এ জনপদটির উন্নয়নের লক্ষ্যে আন্তরিকভাবে কাজ করার, এলাকার সমস্যা সম্পর্কে জাতীয় পর্যায়ে কথা বলার মতো কেউ ছিল না। সংগত কারণে কালকিনি দেশের অন্যান্য এলাকা, এমনকি পার্শ্ববর্তী অঞ্চলের চেয়েও শিক্ষাদীক্ষা, যোগাযোগ, অবকাঠামো এবং আর্থ-সামাজিক কর্মকাণ্ডে অনেক পিছিয়ে পড়েছিল। কালকিনির এ ক্রান্তিকালে প্রচণ্ড প্রতাপের সাথে আবির্ভূত হলেন চিরভাস্বর একটি নক্ষত্র, যাঁর নাম আলহাজ্ব সৈয়দ আবুল হোসেন।১
বিশ বছর আগেও কালকিনি ছিল সাংঘাতিক প্রত্যন্ত একটি পশ্চাদপদ গ্রাম। বিগত শতকের নব্বই-এর দশক হতে সৈয়দ আবুল হোসেনের একক প্রচেষ্টায় কালকিনি আবার সমন্বিত যোগাযোগ ব্যবস্থার আওতায় চলে আসে। বিশ শতকের নব্বই-এর দশকের আগে কালকিনি কেমন ছিল তা কালকিনির অধিবাসী ছাত্রনেতা জনাব ইকবাল হোসেনের জবানিতে শোনা যাক- ‘হারিকেনই ছিল আমাদের বিদ্যুৎ। কেরোসিন আনতে মাইলের পর মাইল হাঁটতে হতো। বিদ্যুৎ জ্বলবে এটি ভাবতেও পারতাম না। জলে কুমির ডাঙায় বাঘ- এ ছিল কালকিনি।’ কালকিনি কীভাবে পশ্চাদপদতা ছেড়ে আধুনিকতার আবহে চলে আসে তাও ইকবাল হোসেনের জবানিতে শোনা যেতে পারে-‘এ রকম একটা প্রত্যন্ত এলাকা সৈয়দ আবুল হোসেনের মায়াময় ছোঁয়ার মধুর স্পর্শে আমার চোখের সামনে আধুনিক বিশ্বের যে কোনো মফস্বলের সাথে পাল্লা দেয়ার যোগ্যতা অর্জন করল। আধুনিক জীবনযাত্রার সকল উপাদানে পরিপূর্ণ হয়ে উঠল মধ্যযুগের কালকিনি। দশ বছর আগের কালকিনি আর বর্তমানের কালকিনির তুলনা করতে গিয়ে আমি অবিশ্বাসে হতবাক না-হয়ে পারি না। শিক্ষা, যোগাযোগ, বিদ্যুৎ, বিনিয়োগ, উৎপাদন, ঐক্য, প্রগতি, সাহিত্য-সংস্কৃতি, চিকিৎসা, বস্ত্র, বাসস্থানÑ এক কথায় বলতে গেলে আদর্শ জীবনযাপনের জন্য যা যা প্রয়োজন, সৈয়দ আবুল হোসেনের বদান্যতায় তার সব কিছু এখন কালকিনি-মাদারীপুরের জনগণের দোরগোড়ায়। কালকিনির লোক এখন ঢাকায় এসে অবাক হন না, বরং ঢাকার লোক কালকিনি গিয়ে অবাক হন।’
আলহাজ্ব সৈয়দ আবুল হোসেন দানে হাজি মহসিন, শিক্ষানুরাগে এক অনন্য ব্যক্তিত্ত্ব। আগের দিনে হিন্দু শিক্ষানুরাগীরা শিক্ষা প্রতিষ্ঠান নির্মাণ করতেন। বিশেষ করে, হিন্দু জমিদারদের অনেকে নিজ নিজ অধিকারভুক্ত জমিদারিতে একটি-দুটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান স্থাপন করতেন। সৈয়দ আবুল হোসেন তার চেয়ে বেশি। তিনি জমিদার নন, তবু নিজের শ্রমে অর্জিত অর্থ ব্যয় করে গড়ে তুলেছেন একের পর এক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। একটি নয়, দু’টি নয়- অসংখ্য, অগণিত। শিক্ষা বিস্তারে সৈয়দ আবুল হোসেন যে উদারতার পরিচয় দিয়েছেন তা বাংলাদেশে বিরল। অল্প বয়সে তিনি ব্যবসা করে ধনবান হয়েছেন। তিনি শুধু ধনবান নন, মনবান এবং চরিত্রবানও বটে। তাঁর চরিত্র মহামানবের মতো মহীয়ান।
অন্যায় অবিচারের বিরুদ্ধে তাঁর আপোসহীন মনোভাব, সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে বলিষ্ঠ পদক্ষেপ, স্বজনপ্রীতিহীন আপাদমস্তক নির্ভেজাল চিন্তা-চেতনা এবং সমাজে এর সঠিক বাস্তবায়ন- কালকিনি এলাকায় প্রশংসনীয় শান্তি বিরাজ করছে। অথচ এই এলাকা একদিন ছিল সন্ত্রাসীদের চারণভূমি, সর্বহারাদের শক্তঘাঁটি। তাঁর এই নিরপেক্ষতার কারণে, পূত-পবিত্র স্বচ্ছ চিন্তাধারার ফলে এলাকার মানুষ দলাদলি, হানাহানি ভুলে এক দলে পরিণত হয়েছে, এক ব্যানারে সমবেত হয়েছে। আর সে ব্যানার হচ্ছে- শান্তির ব্যানার, উন্নতির ব্যানার, প্রগতির ব্যানার, ভ্রাতৃত্বের ব্যানার এবং অহিংসার ব্যানার। সহনশীলতা, নিরপেক্ষতা, উদারতা, দানশীলতা, পরোপকারে নিজেকে সবসময় ব্যস্ত রাখা, আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল থাকা, মূল্যবোধ, নিয়মানুবর্তিতা, নিরহঙ্কার মনোভাব, ধর্মীয় চেতনায় সমৃদ্ধ নির্ভেজাল সংস্কৃতির পৃষ্ঠপোষকতা- এ সমস্ত দুর্লভ ও প্রশংসনীয়।
শিক্ষা জাতির মেরুদণ্ড। মানুষ সর্বশ্রেষ্ঠ প্রাণী। শিক্ষার মাধ্যমে একটি গ্রাম, সমাজ তথা জাতিকে যত দ্রুত সামনের দিকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া সম্ভব, অন্য কোনো কিছু দিয়ে তা সম্ভব নয়। সংখ্যায় অল্প হলেও শিক্ষা বিস্তারের মাধ্যমে জাতীয় উন্নয়নে অবদান রাখর লক্ষ্যে কিছু শিক্ষানুরাগী মহাপ্রাণ ব্যক্তি নিরলস ও আত্মনিবেদিতভাবে কাজ করেনÑ মাননীয় যোগাযোগ মন্ত্রী আলহাজ্ব সৈয়দ আবুল হোসেন এমপি তেমনই একজন। তাঁর নির্বাচনী এলাকাসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় প্রায় দুই শতাধিক শিক্ষা-প্রতিষ্ঠান স্থাপন বা পৃষ্ঠপোষকতা করেছেন এবং করছেন। শুধু তাই নয়, প্রতিষ্ঠিত শিক্ষাঙ্গনগুলোতে নিবিড় তত্ত্বাবধানের মাধ্যমে শিক্ষার সুষ্ঠু পরিবেশ বজায় রাখতে সক্ষম হয়েছেন। বাংলাদেশের আর্থ-সামাজিক ও রাজনীতিক প্রেক্ষাপটে এটি অসম্ভব বলে মনে করা হতো। ফলে প্রায় বছরই বোর্ড পরীক্ষায় তঁাঁর প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা মেধা তালিকার শীর্ষস্থানসমূহের উল্লেখযোগ্য সংখ্যক স্থান লাভ করতে সক্ষম হয়েছে। ডি কে আইডিয়াল সৈয়দ আতাহার আলী একাডেমি এন্ড কলেজ তাঁরই পৃষ্ঠপোষকতায় প্রতিষ্ঠিত এরূপ একটি কলেজ। এটি তিনি তাঁর পিতার স্মৃতির প্রতি উৎসর্গ করেছেন। ডাসারের মতো প্রত্যন্ত এলাকায় প্রতিষ্ঠিত হলেও এটি আজ প্রত্যন্ত নয়, স্বীয় সাফল্যে শিক্ষার নির্বাণ আলো ছড়িয়ে সারা দেশে বিখ্যাত হয়ে আছে।
এক সময় যে কালকিনিতে পায়ে হাঁটা পথেরও অভাব ছিল, সে কালকিনি এখন আধুনিক রাস্তাঘাটে সুসজ্জিত। জনস্বার্থে যেখানে যা প্রয়োজন, তা নিরলস প্রচেষ্টায় করে যাচ্ছেন সৈয়দ আবুল হোসেন-সরকারি সহযোগিতার জন্য বসে না থেকে নিজের অর্জিত অর্থ দিয়ে সংস্কার ও নির্মাণ করছেন রাস্তাঘাট, ব্রিজ ও কালভার্ট। অধ্যক্ষ মো. খালেক্জ্জুামানের ভাষায়, ‘সৈয়দ আবুল হোসেন এককভাবে কালকিনির উন্নয়নের জন্য যে অবদান রেখেছেন তা আবুল হোসেনকে বাদ দিয়ে কালকিনির সকল জনগণের পক্ষেও সম্ভব হতো না। এলাকার উন্নয়নে তাঁর ইচ্ছা, প্রয়াস ও গতি যেমন অবিরাম, তেমন নিবিড় ও নিরলস। কালকিনিকে তিনি দিয়েছেন অনেক, দিয়ে যাচ্ছেন অবিরল।’ বস্তুত কালকিনিতে সৈয়দ আবুল হোসেন নামক মানুষটি জন্ম না-নিলে কালকিনি কখনও আধুনিকতার ছোঁয়া পেত না। তিনি এবং কেবল তিনিই আধুনিক কালকিনির বিনির্মাতা।
আজকের কালকিনি আগের সে প্রত্যন্ত কালকিনি নয়। আজকের কালকিনি আবুল হোসেনের কালকিনি, শিক্ষা, যোগাযোগ, উন্নয়ন, অবকাঠামো আর সমৃদ্ধির কালকিনি। সারা দেশের মধ্যে একটি অন্যতম উন্নত ও খ্যাতনামা উপজেলা। আর আলহাজ্ব সৈয়দ আবুল হোসেন নিষ্কলুষ গগনের মত চির উন্নত শিরে অনির্বাণ দিনমণি।২

১. অধ্যক্ষ খালেকুজ্জামান, আধুনিক কালকিনির বিনির্মাতা।
২. সৈয়দ আবুল হোসেন : আধুনিক কালকিনির বিনির্মাতা অধ্যক্ষ খালেকুজ্জামান, কালকিনি 
বিশ্ববিদ্যালয় কলেজ।

সৈয়দ আবুল হোসেনের বংশ পরিচয়
সৈয়দ আবুল হোসেন মাদারীপুর জেলার কালকিনি উপজেলার ডাসার গ্রামে ১৯৫১ খ্রিস্টাব্দের ১ আগস্ট জন্মগ্রহণ করেন। পিতা আলহাজ্ব সৈয়দ আতাহার আলী ও মা আলহাজ্ব সুফিয়া খাতুনের তিন কন্যা ও তিন ছেলের মধ্যে সৈয়দ আবুল হোসেন তৃতীয়। আতাহার আলী ও সুফিয়া খাতুনের সন্তান-সন্ততিগণ হচ্ছেন যথাক্রমে সৈয়দা শামসুন নাহার, সৈয়দ আবুল কাশেম, সৈয়দ আবুল হোসেন, সৈয়দা জাহানারা বেগম, সৈয়দা মনোয়ারা বেগম এবং সৈয়দ হাসান। ডাসারকে এখন যতই প্রত্যন্ত এলাকা বলা হোক, চতুর্দশ শতকে পলার্দি-আড়িয়াল খাঁ তীরবর্তী এ জনপদটি ছিল জলপথে একটি উত্তম যোগাযোগ ব্যবস্থাসমৃদ্ধ উন্নত এলাকা। সাবলীল যোগাযোগ ব্যবস্থার সূত্র ধরে ডাসার ‘গঞ্জ’ হিসেবে প্রতিষ্ঠা পেয়েছিল। সমৃদ্ধ এলাকা হিসেবে এখানে নিবাস গড়ে তুলেছিলেন শাহ ওসমান। শাহ ওসমান কে? কী তার পরিচয়? তিনি কোত্থেকে এসেছেন? এ সব জানার আগে শাহ আলী বোগদাদীকে জানা প্রয়োজন। কারণ শাহ ওসমানের পিতা হচ্ছেন শাহ আলী বোগদাদী। যিনি বাংলাদেশে আগত সৈয়দ আবুল হোসেনের প্রথম বংশধর এবং বর্তমানে মিরপুর মাজারে শায়িত।
সিরাজ উদ্দীন আহমেদ মাদারীপুর জেলার ইতিহাস গ্রন্থে লিখেছেন, “শাহ আলী বোগদাদী ইরাকের রাজধানী বাগদাদের ফোরাত নদীর তীরে কসবায় জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতার নাম শাহ ফখরুদ্দিন রাযী। শাহ আলী বোগদাদীর বংশধর অধ্যাপক সৈয়দ আলী আহসান একটি বংশ তালিকা দিয়েছেন এবং শাহ আলী বোগদাদীর জন্ম তারিখ নির্ণয় করেছেন।১ শাহ আলী বোগদাদী ১৩৯৩ খ্রিস্টাব্দে বাগদাদে জন্মগ্রহণ করেন। ১৪১৯ খ্রিস্টাব্দে জনৈকা ধর্মানুরাগী রমণীর সাথে তাঁর বিয়ে হয়। ১৪২১ খ্রিস্টাব্দে তিনি এক কন্যা সন্তানের পিতা হন। ১৪৩৭ খ্রিস্টাব্দে বাগদাদের বিখ্যাত সৈয়দ বংশের সদস্য সৈয়দ হাবিবুল্লাহর সাথে কন্যার বিয়ে দেন। ইতোমধ্যে শাহ আলী বোগদাদীর প্রথম স্ত্রী মৃত্যুবরণ করেন। প্রথম স্ত্রীর মৃত্যু তাকে মানসিকভাবে বিপর্যস্ত করে দেয়। তিনি সংসার কর্মে অনেকটা উদাসীন হয়ে পড়েন। এ অবস্থায় পিতা তাকে দিল্লি গিয়ে ধর্মপ্রচারে মনোনিবেশের পরামর্শ দেন। মানসিক উত্তরণে পিতার পরামর্শ অত্যন্ত কার্যকর মনে করে শাহ আলী বোগদাদী ইরাক ত্যাগ করে দিল্লি যাবার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন।”২
পিতার অনুমতি নিয়ে শাহ আলী বোগদাদী ১৪৪৩ খ্রিস্টাব্দে চল্লিশজন সঙ্গী সমভিব্যাহারে দিল্লি আগমন করেন। চল্লিশ জন সহচরের মধ্যে অন্যতম ছিলেন শাহ ওসমান। দলে হযরত শাহ আলী বোগদাদীর পর শাহ ওসমানের স্থান ছিল। উভয়ে ছিলেন পরস্পর আত্মীয় এবং একই বংশের। দিল্লির সুলতান সৈয়দ আলাউদ্দিন আলম শাহ (১৪৪৫-১৪৫১ খ্রি.) তাদের সাদরে গ্রহণ করেন। শাহ আলী বোগদাদীর চারিত্রিক মাধুর্যে মুগ্ধ হয়ে সুলতান আলাউদ্দিন আলম শাহ স্বীয় কন্যা আয়েশাকে তার হাতে সমর্পণ করার প্রস্তাব দেন। ১৪৪৪ খ্রিস্টাব্দে সুলতান আলাউদ্দিন আলম শাহ-এর কন্যা আয়েশার সাথে হযরত শাহ আলী বোগদাদীর শুভ বিবাহ সুসম্পন্ন হয়। ১৪৪৫ খ্রিস্টাব্দে দিল্লিতে শাহ আলী বোগদাদীর ঔরসে এবং সুলতান তনয়া আয়েশার গর্ভে এক পুত্র সন্তান জন্মলাভ করেন। তার নাম রাখা হয় সৈয়দ শাহ ওসমান। সুলতান আলাউদ্দিন আলম শাহের কন্যা আয়েশার গর্ভে ও শাহ আলী বোগদাদীর ঔরসে জন্মগ্রহণকারী এ শাহ ওসমানই হচ্ছেন ডাসারের শাহ ওসমান, যিনি আলহাজ্ব সৈয়দ আবুল হোসেনের অন্যতম পূর্বপুরুষ।
সন্তান জন্মদানের পর সুলতান তনয়া আয়েশা অসুস্থ হয়ে পড়লে শাহ আলী বোগদাদী ১৪৪৫ খ্রিস্টাব্দে দিল্লির বিখ্যাত ব্যবসায়ী গুল মুহাম্মদ সওদাগরের কন্যা বুজুর্গ বিবিকে বিয়ে করেন। এ বিয়েতে সুলতানের মত ছিল কিনা সে বিষয়ে বিতর্ক রয়েছে। তবে আয়েশা এ নিয়ে তেমন উচ্চবাচ্য করেননি। অবশ্য তখন পুুরুষের একাধিক বিয়েতে আপত্তি বা উচ্চবাচ্য করার কোনো রেওয়াজ ছিল না। পুরুষের বিয়েকে বিনা বাক্যে মেনে নেয়াই ছিল পুণ্য রমণীগণের অনিবার্য দায়িত্ব।
১৪৫১ খ্রিস্টাব্দের পূর্ব হতে অভ্যন্তরীণ কোন্দল ও লোদী বংশের সিংহাসন দখল করার প্রচেষ্টা রাজ্যে অরাজক পরিস্থিতি সৃষ্টি করেছিল। এ অবস্থায় সুলতান পরাজয় শঙ্কায় আত্মীয় পরিজনদের দিল্লি ত্যাগের পরামর্শ দেন। সুলতানের নির্দেশে ১৪৫১ খ্রিস্টাব্দে শাহ আলী বোগদাদী তার দুই স্ত্রী, পুত্র সৈয়দ শাহ ওসমান, ভাগিনা সৈয়দ হাবিব এবং বাগদাদ হতে আগত চল্লিশ সহচরের অন্যতম শাহ ওসমানসহ আরও কয়েকজন অনুচর নিয়ে নৌপথে ফরিদপুর চলে আসেন। পাঠক একটু খেয়াল করলে বুঝবেন, এ দলে ওসমান নামের দুইজন ছিলেন। একজন শাহ আলী বোগদাদীর ছয় বছর বয়সী শিশুপুত্র এবং অন্যজন তার প্রধান সহচর। তারা ফরিদপুর এসে গেরদায় বসতি স্থাপন করেন। দিল্লির সুলতান আলাউদ্দিন আলম শাহ জামাতা শাহ আলী বোগদাদীকে ১২০০০ বিঘা লাখেরাজ ভূমি দান করেছিলেন।৩ ফলে তাদের সচ্ছল জীবন যাপনের পথে কোনো বাধা থাকল না।
গেরদায় বসতি স্থাপনের অল্প কিছুদিন পর লোদী বংশ সিংহাসন দখল করে নিলে সুলতান বাদায়ুনে আশ্রয় নেন। গেরদায় আসার পর ১৪৫২ খ্রিস্টাব্দে শাহ আলী বোগদাদীর ঔরসে এবং গুল মুহাম্মদ সওদাগরের কন্যা বুজুর্গ বিবির গর্ভে এক পুত্র সন্তান জন্মগ্রহণ করেন। তার নাম রাখা হয় সৈয়দ মোহাম্মদ হানিফ। আয়েশার গর্ভে জন্মগ্রহণকারী শাহ ওসমান শাহ আলী বোগদাদীর দ্বিতীয় স্ত্রীর গর্ভে জন্মগ্রহণকারী সৈয়দ মোহাম্মদ হানিফ হতে সাত বছর বড়। উল্লেখ্য, দিল্লি হতে ফরিদপুর আসার পথে অসুস্থ আয়েশা বেগম মৃত্যুবরণ করেছিলেন। ছয় বছর বয়স্ক শিশু শাহ ওসমান মাতৃহীন হয়ে বিমাতার হাতে পড়ে।
বৈমাত্রেয় ভাই হানিফ সৈয়দ শাহ ওসমানকে ভালোভাবে গ্রহণ করতে পারছিলেন না। হানিফের বয়স বাড়ার সাথে সাথে বড় ভাইয়ের প্রতি রুঢ় আচরণ ক্রমশ বেড়ে যাচ্ছিল। শাহ ওসমান ছিলেন অত্যন্ত ভদ্র, বিনয়ী, নির্লোভ ও ধৈর্যশীল। বিমাতা আর সৎ ভাইয়ের অত্যাচার দিন দিন বাড়লেও তিনি তা নীরবে সহ্য করে পারিবারিক বন্ধন অটুট রাখার চেষ্টা করে যাচ্ছিলেন।
তৎকালে ঢোল সমুদ্র পদ্মা নদীর সাথে সংযুক্ত ছিল। কথিত আছে, একজন ব্রাহ্মণ কন্যা ঢোল সমুদ্রে ডুবে যাচ্ছে দেখতে পেয়ে শাহ আলী বোগদাদী তাকে উদ্ধার করেন। কিন্তু মুসলমান দ্বারা স্পর্শিত হওয়ায় হিন্দু সমাজ ব্রাহ্মণ কন্যাকে গ্রহণ করতে অস্বীকার করে। এ অবস্থায় শাহ আলী বোগদাদী অসহায় মেয়েটিকে বিয়ে করে নিজের ঘরে নিয়ে যান। কারও কারও অভিমত, হরিশচন্দ্র শাহ আলী বোগদাদীর গুণে মুগ্ধ হয়ে স্বীয় কন্যাকে তার সাথে বিয়ে দেন এবং তিনি নিজেও ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেন।৪
মজলিশ আবদুল খানের কন্যার সাথে সৈয়দ শাহ ওসমানের বিয়ে হয়। বুজুর্গ বিবির পুত্র তথা বৈমাত্রেয় ভাই হানিফ ও তার পুত্রদের সাথে সুলতানের কন্যা আয়েশা বিবির পুত্র সৈয়দ শাহ ওসমানের বিরোধ ক্রমশ বাড়তে থাকে। বিভিন্নভাবে চেষ্টা করেও পিতা শাহ আলী বোগদাদী বিরোধ মেটাতে ব্যর্থ হন। সৈয়দ শাহ ওসমান ছিলেন ইসলামি জ্ঞানে ঋদ্ধ আধ্যাত্মিক প্রকৃতির একজন নিরীহ মানুষ। বিমাতার জন্য তিনি ঘরে শান্তি পেতেন না। তাই অধ্যয়নের মাধ্যমে অশান্তি ভুলে থাকার চেষ্টা করতেন। এ জন্য ছোট বয়সেই তিনি ইসলামি জ্ঞানে পারঙ্গমতা অর্জন করেন। বিষয় সম্পত্তির প্রতি তার কোনো আকর্ষণ ছিল না। তবু সৎ ভাইগণ তাকে শত্র“ ভাবতেন। ভ্রাতৃবিরোধ শাহ ওসমানকে অতিষ্ঠ ও বিষণœ করে তোলে। পিতা সৈয়দ শাহ আলী বোগদাদীও পুত্রদের বিরোধ মেটাতে না-পেরে মনোকষ্টে ভুগছিলেন। এ অবস্থায় শাহ আলী বোগদাদী প্রিয় সহচর শাহ ওসমানের ওপর গেরদার দায়িত্ব অর্পণ করে মিরপুর চলে যান। সাথে নিয়ে যান তার প্রিয় জ্যেষ্ঠ সন্তান শাহ ওসমানকে। মিরপুর এসে তিনি ধর্ম প্রচারে আত্মনিয়োগ করেন।
শাহ আলী বোগদাদী গেরদা ত্যাগ করার কয়েক বছর পর ত্বদীয় সহচর শাহ ওসমান মৃত্যুবরণ করেন। গেরদায় তাকে সমাহিত করা হয়। পাঠক, এখানে আর একবার একটু দৃষ্টি দেয়ার অনুরোধ করছি। গেরদায় যে ওসমান শায়িত, তিনি শাহ আলী বোগদাদীর পুত্র নন, সহচর। ডাসারে যে ওসমান শায়িত, তিনি শাহ আলী বোগদাদীর পুত্র। যার মায়ের নাম আয়েশা বিবি। দিল্লির সুলতান আলাউদ্দিন আলম শাহ ডাসারে শায়িত শাহ ওসমানের মাতামহ।
শাহ আলী বোগদাদী সংসার ধর্ম হতে অনেক দূরে চলে যান। তিনি মিরপুর চিল্লায় সারাক্ষণ ধ্যানমগ্ন থাকতেন। কথিত হয়, চিল্লায় অবস্থায় একদিন শাহ আলী বোগদাদীর কক্ষ হতে সংঘর্ষের আওয়াজ ও আর্তচিৎকার শুনে কিছু ভক্ত দৌড়ে যান। দরজা খুলে দেখেন, শাহ আলী বোগদাদীর শরীর ছিন্নভিন্ন অবস্থায় পড়ে আছে। দেখে মনে হয় জঙ্গল হতে বাঘ এসে তাকে হত্যা করেছে। অনেকে মনে করেন, আল্লাহর ধ্যানে তার দেহ খণ্ড-বিখণ্ড হয়ে গেছে। যাই হোক তার মৃত্যু রহস্যাবৃত থেকে যায়। এ বিষয়ে আরও বিভিন্ন মত রয়েছে। এর একটি এখানে উল্লেখ করা হলো: কথিত আছে, প্রায় চারশো বছর আগে শাহ আলী নামে বাগদাদের এক রাজপুত্র সংসারের প্রতি আকর্ষণ হারিয়ে চারজন শিষ্যসহ নানাদেশে ঘুরে ঘুরে ঢাকা মিরপুরের ছোট্ট একটি মসজিদে আশ্রয় নেন। একটি নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত মসজিদের দ্বার রুদ্ধ করে ধ্যানমগ্ন থাকেন। নির্দিষ্ট সময় পূর্ণ হওয়ার একদিন আগে শিষ্যরা অস্পষ্ট শব্দ শুনে মসজিদের দ্বার খুলে দেখেন শাহ আলী সেখানে নেই। একটি পাত্রে রক্তমাংস পড়ে আছে। শিষ্যরা শাহ আলীর কণ্ঠে নির্দেশ পেল-পাত্রের রক্তমাংস সমাধিস্থ করার। হযরত শাহ আলীর সে সমাধিস্থলই মিরপুরের শাহ আলীর দরগা নামে পরিচিত।৫
বুজুর্গ বিবির পুত্র সৈয়দ মোহাম্মদ হানিফ, সৈয়দ হানিফের পুত্র সৈয়দ শাহনুর, ত্বদীয় পুত্র সৈয়দ শাহ ভিখ। সৈয়দ শাহ ভিখের পুত্র শাহ রাখি। সৈয়দ হানিফের উত্তর পুরুষগণের কয়েকজন ফরিদপুরের গেরদায় বসবাস করতে থাকেন। কয়েক জন যশোর চলে যান। গেরদা মসজিদের সংলগ্ন উত্তরে সৈয়দ হানিফ ও বুজুর্গু বিবির মাজার আছে। সৈয়দ শাহ আলী বোগদাদীর মৃত্যুর পর সৈয়দ শাহ ওসমান মিরপুর হতে গেরদা ফিরে আসেন। বৈমাত্রেয় ভাইয়ের সাথে কোন্দল আরও তীব্র হয়ে ওঠে। এ অবস্থায় সৈয়দ শাহ ওসমান গেরদা ত্যাগ করে স্ত্রীপুত্রদের নিয়ে কালকিনির ডাসার গ্রামে নিবাস গড়ে তোলেন। এখানেই তিনি ইন্তেকাল করেন। ডাসারে তাঁর মাজার রয়েছে।
উপরে বর্ণিত আলোচনায় দেখা যায়, সৈয়দ আবুল হোসেন দিল্লির সুলতান আলাউদ্দিন আলম শাহ এবং শাহ আলী বোগদাদীর রক্তাধিকারী। শাহ আলী বোগদাদীর পূর্বপুরুষের পরিচয় ও বংশলতিকা পরিশিষ্ট দ্রষ্টব্য। আগ্রহী পাঠকগণ তা অবলোকন করতে পারেন। বংশলতিকায় দেখা যায়, হযরত শাহ আলী বোগদাদী হযরত মোহাম্মদ (সঃ)-এর চাচা হযরত আবু তালিবের পুত্র হযরত আলীর অধস্তন। হযরত আলীর স্ত্রী ছিলেন নবী তনয়া ফাতিমা। কথিত হয় শাহ ওসমান বাঘের পিঠে চড়ে ডাসার গ্রামে এসেছিলেন। সৈয়দ ওসমান সম্পর্কে বাংলাদেশ গেজেটীয়ারে লেখা আছে- অ ংধরহঃ ভৎড়স অৎধনরধ, ঝুবফ টংসধহ পধসব ঃড় ঃযরং ারষষধমব ধহফ ংবঃঃষবফ যবৎব. ওঃ রং ংধরফ যব ঁংবফ ঃড় ৎরফব ড়হ ঃরমবৎ. ঐরং মৎধাব রং ষড়পধঃবফ ধঃ উধংধৎ.৬
শাহ আলী বোগদাদীর বংশধর সৈয়দ আলী আহসানের বংশ লতিকায় দেখা যায়, শাহ আলী বোগদাদীর পুত্র সৈয়দ শাহ ওসমান দুই পুত্র ও এক কন্যা সন্তানের জনক হন। প্রথম পুত্র সৈয়দ আবদুল ওয়াহিদ নিঃসন্তান অবস্থায় মারা যান। দ্বিতীয় পুত্র সৈয়দ আবদুল কাদিরের একমাত্র পুত্র সৈয়দ আবদুর রশীদ। আবদুর রশীদের পুত্র সৈয়দ শাহ মোহাম্মদ যাকের একজন কামেল দরবেশ ছিলেন। মোহাম্মদ যাকের বিবাহিত জীবনে চার সন্তানের জনক হন। তার সন্তানগণ হচ্ছেন যথাক্রমে সৈয়দ মুহাম্মদ সাবের, সৈয়দ মুহাম্মদ হুসাইন, সৈয়দ মুহাম্মদ সাকের এবং সৈয়দ মুহাম্মদ হাফিজ।৭
যুবক হবার পর পৈত্রিক উত্তরাধিকারজাত সম্পত্তি দেখাশুনার জন্য সৈয়দ মুহাম্মদ সাবের, সৈয়দ মুহাম্মদ হুসাইন ও সৈয়দ মুহাম্মদ হাফিজ বাংলাদেশে তাদের প্রথম পিতৃনিবাস গেরদা চলে যান। তারা সেখানে স্থায়ীভাবে বসবাস করতে থাকেন। অন্যদিকে সৈয়দ মুহাম্মদ সাকের পিতা সৈয়দ শাহ ওসমানের সাথে ডাসার থেকে যান। গেরদার সৈয়দ বশারত আলী শাহ মোহাম্মদ যাকেরের অন্যতম এক অধস্তন। তার পুত্র শাহ ওয়াজেদ আলী কলকাতায় স্থায়ী নিবাস গড়ে তোলেন। তিনি কামেল দরবেশ হিসেবে সারা কলকতায় খ্যাত ছিলেন। পাবনার শাহ সুফি এনায়েতপুরী তার শিষ্য ছিলেন। তিনি তার নিকট হতে দীক্ষা নিয়ে বাংলাদেশে চলে আসেন। তার বংশধরগণ এখন এনায়েতপুরী নামে পরিচিত। সৈয়দ আবুল হোসেনের স্ত্রী খাজা নার্গিস এনায়েতপুর দরবার শরিফের পির খাজা কামাল উদ্দিনের কন্যা।
শাহ আলীর সাথে দিল্লী হতে গেরদায় আগত ভাগ্নে শাহ হাবিব মামার মৃত্যুর পর ফরিদপুরের বোল মন্দিরায় বসতি স্থাপন করেন। এ বংশের অন্যতম অধস্তন পুরুষ সরোয়ারজান বরিশালের বামনার জমিদার ছিলেন। হযরত শাহ আলী বোগদাদীর সাথে শাহ হুসাইন তেগ বরহানা ও ত্বদীয় পুত্র শাহ হাবিবুল্লাও দিল্লী হতে ফরিদপুর এসেছিলেন। শাহ হাবিবুল্লা কামেল ছিলেন। তার সাথে ১৪৩৭ খ্রিস্টাব্দে শাহ আলী বোগদাদীর কন্যার বিয়ে হয়। বর্তমানে তার বংশধরগণ বনমালীতে বসবাস করছেন। শাহ আলী বোগদাদীর অধস্তন সৈয়দ শাহ সাবের-এর বংশধরদের একটি প্রশাখা গেরদার নিকটবর্তী গটটি এলাকায় বসতি গড়ে তোলেন। আওয়ামী লীগ নেত্রী সৈয়দা সাজেদা চৌধুরী এ বংশের একজন বংশধর।
শাহ আলী বোগদাদীর মৃত্যুর ঘটনার ন্যায় মৃত্যু তারিখ নিয়েও মতভেদ ও রহস্য রয়েছে। ড. মোহাম্মদ এনামুল হকের মতে, শাহ আলী বোগদাদী পনেরো শতকে জীবিত ছিলেন এবং ১৪৮০ খ্রিস্টাব্দের পূর্বে মৃত্যুবরণ করেন। তবে মিস্টার বি.সি এলেন, ড. আহম্মদ হাসান দানি ও ড. মাহমুদুল হাসান মনে করেন শাহ আলী বোগদাদী ১৪৭৭ খ্রিস্টাব্দে মৃত্যুবরণ করেন। গেরদায় বসবাসকারী শাহ আলী বোগদাদীর কুরছিনামা অনুযায়ী ১৪৫১ খ্রিস্টাব্দে মতান্তরে ১৪৩৪ খ্রিস্টাব্দে ফরিদপুর আসেন এবং ১৫১৭ খ্রিস্টাব্দে মৃত্যুবরণ করেন। পারিবারিক বৃত্তান্ত অনুযায়ী শাহ আলী বোগদাদী ১২৪ বছর জীবিত ছিলেন। এত লম্বা সময় বেঁচে থাকার বর্ণনা স্বাভাবিক দৃষ্টিতে অবিশ্বাস্য। এ অবস্থায় ড. মোহাম্মদ এনামুল হকের মন্তব্য যথার্থ মনে হয়। অর্থাৎ শাহ আলী বোগদাদী ১৪৮০ খ্রিস্টাব্দের পূর্বে মৃত্যুবরণ করেছেন। সার্বিক বিবেচনায় ইতিহাসবেত্তাগণ এ মর্মে সিদ্ধান্তে এসেছেন যে, তিনি সম্ভবত ১৪৭৭ খ্রিস্টাব্দে বাঘের আক্রমণে মারা গিয়েছেন।৮
কুরছিনামা অনুসারে দেখা যায়, শাহ আলী বোগদাদীর পুত্র সৈয়দ শাহ ওসমান ভাঙ্গার মজলিশ আবদুল্লাহ খানের কন্যাকে বিয়ে করেছেন। মজলিশ আবদল্লাহ খানও বাগদাদ হতে এসে এখানে বসতি গড়ে তুলেছিলেন। তার সাথে শাহ ইসমাইল ও শাহ ইউসুফও বাগদাদ হতে এদেশে এসেছিলেন। সুলতান আলাউদ্দিন আলম শাহ (১৪৯৩-১৫১৯ খ্রিস্টাব্দ) মজলিশে আউলিয়া মসজিদ নির্মাণ করেন। এ হিসেবেও দেখা যায়, শাহ আলী বোগদাদী ১৪৮০ খ্রিস্টাব্দের পূর্বে মৃত্যুবরণ করেন।
ঐতিহাসিক বিবরণ ও গবেষণা কর্মে সাধারণত ৪ পুরুষে একশ বছর গণনা করা হয়। সৈয়দ শাহ আলী বোগদাদী হতে বর্তমান কাল পর্যন্ত চৌদ্দ পুরুষ চলছে। এ হিসেবে শাহ আলী বোগদাদী ১৭ শতকের প্রথমভাগে জীবিত ছিলেন বলে অনুমান করা হয়। সম্রাট জাহাঙ্গীরের শাসনামলে(১৬০৫-১৬২৭) বঙ্গদেশে প্রচুর মুসলিম ধর্মপ্রচারক ও আউলিয়া দরবেশের আগমন ঘটে। গেরদা মসজিদের শিলালিপিতে ১৬০৪ খ্রিস্টাব্দ খোদিত। এ হিসেবে মনে করা যায়, শাহ আলী বোগদাদী সম্রাট আকবরের রাজত্বকালে ১৬ শতকে গেরদা আসেন এবং ১৭ শতকের প্রথমার্ধ পর্যন্ত জীবিত ছিলেন।
মাদারীপুর জেলার ইতিহাস গ্রন্থে সিরাজ উদ্দীন আহমেদ লিখেছেন-‘ অনেকে বলেন, সৈয়দ ওসমান বড়পির আবদুল কাদের জিলানি ও হযরত শাহ আলী বোগদাদীর বংশধর। তারা বলেন সৈয়দ ওসমান হযরত শাহ আলীর পুত্র। সৈয়দ শাহ আলীর দুই পুত্র শাহ ওসমান ও হানিফ। দুই ভাইয়ের মাজার ফরিদপুর সদর থানার গেরদায় অবস্থিত। লেখক গেরদায় গমন করে দুই ভাইয়ের মাজার দেখেছেন। ডাসারের সৈয়দ ওসমান ও গেরদার শাহ ওসমান এক ব্যক্তি নয়। শাহ আলী বোগদাদীর বংশতালিকায় সৈয়দ ওসমানের উল্লেখ নেই। এক হতে পারে সৈয়দ ওসমান শাহ আলী বোগদাদীর বংশধর। অথবা তার সাথে তিনি এ অঞ্চলে ইসলাম ধর্ম প্রচার করতে আসেন।
লেখক এখানে শাহ ওসমানের পিতা নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেছেন। অধিকন্তু জনাব সিরাজ উদ্দীন আহমেদ দুই ভাইয়ের মাজার দেখেছেন না-বলে সৈয়দ ওসমান ও সৈয়দ হানিফের মাজার দেখেছেন বললে যথার্থ হতো। কারণ তিনি পরে লিখেছেন, “সৈয়দ ওসমান শাহ আলীর বংশধর হতেও পারে আবার নাও হতে পারে।”শাহ আলী বোগদাদীর বংশ তালিকায় সৈয়দ শাহ ওসমানের নাম নেই উল্লেখ করা হলেও একই গ্রন্থের ১২৫ পৃষ্ঠায় প্রদত্ত শাহ আলী বোগদাদীর বংশ তালিকায় শাহ ওসমানের নাম রয়েছে। 
বস্তুত ডাসার এর সৈয়দ শাহ ওসমানই শাহ আলী বোগদাদীর পুত্র এবং গেরদায় শায়িত শাহ ওসমান শাহ আলীর সঙ্গী ছিলেন। উপরোক্ত আলোচনায় আমরা এ সিদ্ধান্তে আসতে পারি যে, আলহাজ্ব সৈয়দ আবুল হোসেন শাহ আলী বোগদাদীর একজন উত্তরপুরুষ।
. মাদারীপুরের ইতিহাস, সিরাজ উদ্দীন আহমেদ, পঞ্চম অধ্যায় পৃষ্ঠা ১১৯।
২. মাদারীপুরের ইতিহাস, সিরাজ উদ্দীন আহমেদ, পঞ্চম অধ্যায় পৃষ্ঠা ১২০।
৩. মাদারীপুরের ইতিহাস, সিরাজ উদ্দীন আহমেদ।
৪. মাদারীপুরের ইতিহাস, সিরাজ উদ্দীন আহমেদ, পঞ্চম অধ্যায় পৃষ্ঠা ১১৯।
৫. ৬৪ জেলা ভ্রমণ, লেয়াকত হোসেন খোকন, অনিন্দ্য প্রকাশ, দ্বিতীয় বর্ধিত সংস্করণ, 
ফেব্র“য়ারি, ২০০৯; পৃষ্ঠা-৩০।
৬. মাদারীপুরের ইতিহাস, সিরাজ উদ্দীন আহমেদ, লেখকের কথা।
৭. মাদারীপুরের ইতিহাস, সিরাজ উদ্দীন আহমেদ।
৮. সৈয়দ সুলতানা বানু- পঁচাশি ও হযরত শাহ আলী বোগদাদীর জীবনী।

সৈয়দ আবুল হোসেনের বংশলতিকা ১
১. মাদারীপুর জেলার ইতিহাস, সিরাজ উদ্দীন আহমেদ, পির-আউলিয়ার দেশ ফরিদপুর-
মাদারীপুর, পৃষ্ঠা ১২৫-১২৬, প্রকাশকাল-২০০৬।

সৈয়দ আতাহার আলী ও সৈয়দা সুফিয়া খাতুন
সৈয়দ আলহাজ্ব আতাহার আলী (র) ১৯১৫ খ্রিস্টাব্দের ১১ এপ্রিল মাদারীপুর জেলার কালকিনি উপজেলার ডাসার গ্রামে বিখ্যাত সৈয়দ পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা হযরত সৈয়দ আজমত আলী এবং মা সৈয়দা লালমন। বংশগতভাবে ধর্মীয় ঐতিহ্য ও মর্যাদাময় রক্তাধিকারী সৈয়দ আতাহার আলী ইসলামি জ্ঞানে অত্যন্ত ঋদ্ধ ছিলেন। তিনি আলহাজ্ব সৈয়দ আবুল হোসেনের পিতা।
দেশ বিভাগের পূর্বে সৈয়দ আতাহার আলী বর্ধমান জেলায় সেটেলমেন্ট বিভাগে চাকুরি করতেন। সেটেলমেন্ট বিভাগের চাকুরি ছিল অত্যন্ত লোভনীয়। এ বিভাগের চাকুরেদের প্রচুর অর্থ উপার্জনের সুযোগ ছিল। তবে তা অবৈধ পন্থায়। সৈয়দ আতাহার আলী ছিলেন অন্যরকম। তিনি কোনোদিন এক পয়সাও অবৈধভাবে অর্জন করেননি। ঘুষ গ্রহণকে অত্যন্ত ঘৃণার চোখে দেখতেন। সেটেলমেন্ট বিভাগে চাকুরি করলেও সৈয়দ আতাহার আলী ছিলেন অত্যন্ত সৎ এবং বিনয়ী। এ গুণগুলো পরিবাহিত হয়েছে তাঁর সুযোগ্য পুত্র-কন্যা ও নাতি-নাতনিদের ওপর। দেশ বিভাগের পর চাকুরি ছেড়ে দিয়ে তিনি পাটের ব্যবসা করেন। তখন পাটের ব্যবসা ছিল যেমন সম্মানার্হ তেমনি লাভজনক। সৈয়দ আতাহার আলী পাটের ব্যবসা করে কিছু অর্থ জমা করেন। ঐ অর্থ দিয়ে গ্রামে কিছু জমিজমা ক্রয় করেন। অতঃপর পাট ব্যবসা ছেড়ে দিয়ে কৃষি খামারে মনোনিবেশ করেন।১
উপমহাদেশে মুসলিম যুগের সূচনা ও বিস্তারে কালকিনির সৈয়দ পরিবারের ভূমিকা অপরিসীম। সৈয়দ আতাহার আলীর পূর্বপুরুষগণ আরব হতে বঙ্গদেশে ধর্মপ্রচারের জন্য এদেশে এসেছিলেন। মুসলিমগণ উপমহাদেশে শাসন ক্ষমতায় বরিত হবার সূচনালগ্ন হতে ডাসারের সৈয়দ পরিবারের পূর্বপুরুষেরা সম্রাট ও সুলতানগণের দপ্তরে গুরুত্বপূর্ণ ও সম্মানজনক পদে অধিষ্ঠিত ছিলেন। তার ১১তম পূর্বপুরুষ শাহ আলী বোগদাদী ছিলেন দিল্লির সুলতান আলাউদ্দিন আলম শাহের (১৪৪৫-১৪৫১) দরবারের একজন প্রভাবশালী উপদেষ্টা এবং সুলতানের কন্যা আয়েশা বিবির স্বামী।২
সৈয়দ আতাহার আলীর পিতার নাম সৈয়দ আজমত আলী। তার পিতার নাম সৈয়দ কালু মিয়া মতান্তরে কান্দু মিয়া। সৈয়দ কালু মিয়ার ছেলে সৈয়দ হউদ বদু। তিনি এলাকায় সমাজসেবী ও সংস্কারক হিসেবে খ্যাত ছিলেন। সৈয়দ হউদ বদুর পিতার নাম ছিল সৈয়দ মুহাম্মদ গনি এবং তার পিতার নাম মুহাম্মদ সাকের। মুহাম্মদ সাকের ছিলেন সৈয়দ শাহ মোহাম্মদ যাকেরের চার সন্তানের মধ্যে তৃতীয়। সৈয়দ শাহ মোহাম্মদ যাকের-এর পিতার নাম আবদুর রশীদ এবং পিতামহের নাম আবদুল কাদির। আবদুল কাদির সৈয়দ শাহ ওসমানের দ্বিতীয় পুত্র এবং সৈয়দ শাহ ওসমানের পিতা হযরত শাহ আলী বোগদাদী। তিনি হযরত আলীর ছেলে হযরত ইমাম হুসাইনের অধস্তন।৩
সৈয়দ আতাহার আলী ছিলেন অত্যন্ত দয়ালু ও দানবীর। ইসলামের চতুর্থ খলিফা হযরত আলী ও বিশ্বনবীর প্রিয়তমা কন্যা হযরত ফাতেমার পবিত্র রক্তের প্রবাহ যার শরীরে তিনি অমন না-হয়ে পারেন না। নবিজির মতো হযরত আতাহার আলীও ভিক্ষুকদের নিয়ে খেতেন। মাঝে মাঝে ভিক্ষুকের সংখ্যা এতো বেড়ে যেত যে নিজের ক্ষিদে মেটাতে পারতেন না। এ প্রসঙ্গে একটি ঘটনা বলা যায়। রমজান মাস। বাড়ির সদস্যসংখ্যা হিসেব করে ইফতারি তৈরি করা হলো। সৈয়দ আতাহার আলী ইফতার করে মাগরিবের নামাজ আদায় করতেন। একদিন বাইরে হাঁটতে গিয়ে মসজিদ হতে নামাজ আদায় করে বাসায় আসেন, সাথে পাঁচজন ভিক্ষুক। স্ত্রী সুফিয়া খাতুন শুধু একজনের ইফতারি রেখেছিলেন। পাঁচজন অতিরিক্ত লোক দেখে সুফিয়া আলী বললেন, ‘ইফতারি আছে এক জনের, ছয়জন কীভাবে খাবেন?’ আল্লাহ বরকত দেবেন বলে ইফতার শুরু করেন সৈয়দ আতাহার আলী। আশ্চর্যের বিষয়, সবাই ঐ দিন তৃপ্তি সহকারে ইফতার করেছিলেন। কারও কম হয়নি।
ভিক্ষুকদের প্রতি এত দয়া কেন প্রশ্ন করলে তিনি বলতেন, ‘আল্লাহপাক পরীক্ষা করার জন্য আমার কাছে ভিক্ষুক পাঠান। আল্লাহ আমাকে অনেক দিয়েছেন। স্ত্রী-পুত্র, সহায়-সম্বল, জমি-জিরাত সব অল্লাহর অনুগ্রহের দান। তা যদি হয় তো আমি কেন সামান্য বস্তু আল্লাহর জন্য ব্যয় করতে পারব না! সামান্য অসুখ হলে যেখানে আমরা কাড়ি কাড়ি টাকা খরচ করতে বিন্দুমাত্র দ্বিধা করি না; সেখানে ভিক্ষুককে এক পয়সা না-দেয়ার জন্য বলি, ‘মাফ করেন’। এটি বড় লজ্জার, বড় আফশোসের।’ প্রতিবেশীরা সৈয়দ আতাহার আলীকে উদারতা বিবেচনায় হাতেম তাই-এর সাথে তুলনা করতেন। গ্রামের কেউ বিপদে পড়লে তিনি জাতি-ধর্ম-বর্ণ এবং শত্র“-মিত্র নির্বিশেষে সাহায্যের হাত নিয়ে এগিয়ে যেতেন। তিনি বলতেন, ‘মানুষ মাত্র সমান। কে ভালো কে খারাপ, কে বেহেশতি এবং কে জাহান্নামিÑ এটি আল্লাহ বিচার করবেন। আমি তার নগণ্য বান্দা মাত্র।’ গরিব ও অসহায় পরিবারের ছেলেমেয়েদের লেখাপড়ার জন্য তিনি সাহায্য করতেন। গ্রামের দুস্থদের সৎকার, ছেলে-মেয়ের বিয়ে ও রোগশোকে তিনি ছিলেন সবার অভিভাবক। সেকালে ডাসার ছিল সর্বহারাদের নিরাপদ স্থল। তবে ডাসার গ্রামে সর্বহারা দল তেমন বেশি অত্যাচার করতে পারত না। সৈয়দ আতাহার আলীকে তারাও শ্রদ্ধার চোখে দেখতেন। তিনি বলতেন, ‘একদিন এ গ্রাম সর্বহারা মুক্ত হবে।’ তার দোয়া সফল হয়েছে। তারই সুযোগ্য পুত্র সৈয়দ আবুল হোসেন কালকিনি হতে সর্বহারাদের অস্তিত্ব নির্মূল করতে সক্ষম হয়েছে। তবে অস্ত্র দিয়ে নয়, পিতা আলহাজ্ব সৈয়দ আতাহার আলীর মতো ভালোবাসা দিয়ে।
সৈয়দ আতাহার আলী ছিলেন মহান ধর্মপ্রাণ ব্যক্তি। মানুষ তাকে বুজুর্গ জ্ঞানে শ্রদ্ধা করতেন। তবে তিনি নিজেকে মনে করতেন, একজন সাধারণ মানুষ। প্রতিদিন অনেক লোক তার দোয়া নেয়ার জন্য আসতেন। অনেকে আসতেন পানি-পড়া নিতে। তিনি বলতেন: আমি আপনাদের মতো সাধারণ মানুষ। পবিত্র মনে সৃষ্টিকর্তার প্রার্থনা করুন। সফলকাম হতে পারবেন। আল্লাহর রহমত পেতে হলে তার সৃষ্টির প্রতি রহমত-পরায়ণ হতে হয়।
সৈয়দ আতাহার আলী ছিলেন ইসলামি দর্শনের একজন বোদ্ধা। তিনি বলতেন, আমি আসছি খালি হাতে যাবও খালি হাতে। দুনিয়া আমার শস্যক্ষেত্র। এখানে যা ফলাব আখিরাতে তাই আমার সম্বল হবে। বাকিটুক শূন্য। তিনি তার অর্জিত ভূসম্পত্তির প্রায় সবই এলাকার শিক্ষা বিস্তারের জন্য উৎসর্গ করে দিয়েছেন। আতাহার আলী ইবতেদায়ি মাদ্রাসা, আতাহার আলী প্রাথমিক বিদ্যালয়, ডি কে সৈয়দ আতাহার আলী একাডেমি এন্ড কলেজ এবং শেখ হাসিনা একাডেমি এন্ড ইউমেন্স কলেজে তার পুরো সম্পত্তি দান করে দেয়া হয়েছে।
সৈয়দ আতাহার আলীর স্ত্রীর নাম সুফিয়া আলী। তিনি ১৯২৮ খ্রিস্টাব্দে বরিশাল জেলার বর্তমান আগৈলঝারা উপজেলার গৈলা ইউনিয়নের সেরেল গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি ছিলেন পর্দানশীন ও ধর্মপ্রাণ মহিলা। তাঁর দুই ভাই যথাক্রমে আরজ আলী মল্লিক ও রাজ্জাক মল্লিক। প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা তাঁর বেশি ছিল না। তবে প্রাকৃতিক শিক্ষায় তিনি ছিলেন যেমন ঋদ্ধ তেমনি উদার। সাধারণ মানুষ যা কল্পনা করতে পারতেন না, তা তিনি সহজে বাস্তবে পরিণত করতে পারতেন। সবকিছু ধীর মস্তিষ্কে পরিকল্পনা মাফিক করতে পারঙ্গম ছিলেন। তিনি ছিলেন পর্দানশীন এবং অত্যন্ত পরহেজগার। তাঁর বড় ছেলে চেয়ারম্যান ছিলেন, মেজ ছেলে মন্ত্রী, সেজো মেয়ে মনোয়ারা বেগম ঢাকা বোর্ডে এসএসসি পরীক্ষায় মেয়েদের মধ্যে প্রথম হয়েছেন, ছোট ছেলে সৈয়দ আবুল হাসান চক্ষু বিশেষজ্ঞ। সন্তান-সন্ততিদের এ অবস্থা দেখে তিনি খুশি হয়েছেন কিন্তু অবাক হননি। তিনি বলতেন, এতে অবাক হবার কিছু নেই। আমি আমার ছেলেদের ওভাবে গড়ে তুলেছি। কারও অনুগ্রহে নয় বরং যোগ্যতা আছে বলে তারা এ অবস্থানে।’৪ তাঁর মেজো ছেলে সৈয়দ আবুল হোসেন বড় ব্যবসায়ী। পরবর্তীকালে এম পি হয়েছেন; মন্ত্রী হয়েছেন। তার উত্তরণ দেখে মা সুফিয়া আলী অসম্ভব খুশি হয়েছেন। তবে অবাক হননি। বলতেন, ‘এটা আমার কাছে অপ্রত্যাশিত কিছু নয়। আমি জানতাম আমার মেজো ছেলে অনেক বড় হবে। সে যা হয়েছে এর চেয়ে ঢের বড় হবার যোগ্যতা আমার আবুল হোসেনের আছে।৫
প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা বেশি না-হলেও সুফিয়া আলী ছিলেন অত্যন্ত বিচক্ষণ ও সুজ্ঞানী। ছেলেমেয়েদের লেখাপড়ার প্রতি ছিল কড়া নজর। তার কনিষ্ঠপুত্র ড. সৈয়দ আবুল হাসানের ভাষায়, ‘মা আমাদের লেখাপড়ার ব্যাপারে অত্যন্ত সতর্ক ছিলেন। ঠিক সময়ে খাইয়ে-দাইয়ে স্কুলে পাঠিয়ে দিতেন। স্কুল হতে আসলে খাতাপত্র গুছিয়ে রাখতেন। স্কুলের পড়া ঠিকমতো করেছি কিনাÑ সর্বদা সেদিকে নজর দিতেন। নারী শিক্ষার প্রতি তিনি ছিলেন অত্যন্ত সচেতন। বলতেন, ‘নারীপুরুষ সবার জন্য বিদ্যা অর্জন ফরজ। লেখাপড়ার জন্য আমাদের কাউকে তেমন বকা খেতে হয়নি। আমরা ভাইবোন সবাই লেখাপড়ার ব্যাপারে সজাগ ছিলাম।’
সুফিয়া আলী ছিলেন আকর্ষণীয় ব্যক্তিত্বের অধিকারী। কোনো লোকের চোখের দিকে তাকালে ঐ লোককে সুফিয়া আলীর প্রতি শ্রদ্ধায় আনত হয়ে যেতে হতো । তিনি অনুচ্চস্বরে মায়া ভরা কণ্ঠে কথা বলতেন। কোনোদিন উঁ”ু কণ্ঠে কথা বলেননি। তাঁর কথার মধ্যে এমন একটি অলৌকিক গাম্ভীর্য থাকত যা কার্যকর করা ছাড়া শ্রোতার অন্য কোনো উপায় থাকত না। তিনি জীবনে কোনোদিন নামাজ ক্বাজা করেননি। বুদ্ধি হবার পর হতে মৃত্যু পর্যন্ত প্রতি ওয়াক্ত নামাজ যথাসময়ে আদায় করেছেন।৬ সুফিয়া আলী ছিলেন নারী শিক্ষার প্রতি অত্যন্ত আগ্রহী। জীবিতকালে তিনি ডি কে সৈয়দ আতাহার আলী একাডেমি এন্ড কলেজের দুই জন মহিলা শিক্ষককে দীর্ঘদিন নিজের কক্ষে রেখেছিলেন। উভয়ে ছিলেন হিন্দু ধর্মাবলম্বী। তিনি তাদের সাথে একত্রে খেতেন, ঘুমোতেন। উভয়কে নিজের কন্যার মতো স্নেহ করতেন। এ ঘটনায় সুফিয়া আলীর উদার মনমানসিকতা ও অসাম্প্রদায়িক চেতনার যে পরিচয় পাওয়া যায়, তাতে সহজে অনুভব করা যায় তিনি কত বড় ও কত উচ্চমানের মহিলা ছিলেন।
১৯৮৫ খ্রিস্টাব্দের ২৮ সেপ্টেম্বর রোজ শনিবার আলহাজ্ব হযরত সৈয়দ আতাহার আলী (র.) ঢাকায় ৭১ বছর বয়সে ইন্তেকাল করেন। তাকে ডাসারে পারিবারিক গোরস্থানে দাফন করা হয়। তার স্ত্রী সৈয়দা সুফিয়া আলী ২০০০ খ্রিস্টাব্দের ১০ নভেম্বর শুক্রবার ঢাকায় ৭২ বছর বয়সে ইন্তেকাল করেন। ডাসারে স্বামীর কবরের পাশে তাকে দাফন করা হয়। সংসার জীবনের মতো মরণের পরও উভয়ে পাশাপাশি অনন্ত শয্যায় শায়িত। অষধিুং নব হরপব ঃড় ুড়ঁৎ পযরষফৎবহ নবপধঁংব ঃযবু ধৎব ঃযব ড়হবং যিড় রিষষ পযড়ড়ংব ুড়ঁৎ ৎবংঃ যড়সব.
সৈয়দ আবুল হোসেনের পিতামাতা উভয়ে সন্তানদের অত্যন্ত ভালোবাসতেন। সৈয়দ আতাহার আলীর মাজার এখন পুণ্যার্থীদের কাছে তীর্থস্থান। পিতা-মাতার ইচ্ছানুসারে সৈয়দ আবুল হোসেন পিতার মাজারের পাশে এক গম্বুজ বিশিষ্ট একটি মসজিদ নির্মাণ করে দিয়েছেন। প্রতি পাঁচ ওয়াক্ত আজান পড়ে মসজিদে। সৈয়দ আতাহার আলী ও তার প্রিয়তমা স্ত্রী আলহাজ্ব সুফিয়া আলীর অন্তিম শয়ান আজানের পবিত্র দোলায় স্বর্গীয় মুর্ছনার আকাশ হয়ে ওঠে। তাঁদের সন্তান সৈয়দ আবুল হোসেনের পুণ্যময় কাজ তাদের নেকির খাতায় অনবরত পুণ্য যোগ করে যাচ্ছে এবং অনুরূপ যোগ করে যাবে অনন্তকাল।

১. সৈয়দ আতাহার আলীর কনিষ্ঠ সন্তান সৈয়দ এ হাসান। ৮/৬/২০১০ খ্রিস্টাব্দ তারিখ 
এক সাক্ষাৎকারে।
২. মাদারীপুর জেলার ইতিহাস, সিরাজ উদ্দীন আহমেদ।
৩. মাদারীপুর জেলার ইতিহাস, সিরাজ উদ্দীন আহমেদ।
৪. সুত্র: ড. সৈয়দ এ হাসান।
৫. সূত্র: ড. সৈয়দ আবুল হাসানের সাথে সাক্ষাৎকার, ৮/৬/২০১০ খ্রিস্টাব্দ।
৬. সূত্র: ড. সৈয়দ আবুল হাসানের সাথে সাক্ষাৎকার, ৮/৬/২০১০ খ্রিস্টাব্দ।
সৈয়দ আবুল হোসেনের শিক্ষাজীবন
জন্মস্থান ডাসার গ্রামের পাশে অবস্থিত নবগ্রাম প্রাইমারি স্কুলে সৈয়দ আবুল হোসেনের প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা শুরু। ১৯৫৬ খ্রিস্টাব্দে তিনি এ স্কুলে প্রথম শ্রেণিতে ভর্তি হন। পিতা সৈয়দ আতাহার আলী তাঁকে ভর্তি করার জন্য স্কুলে নিয়ে গিয়েছিলেন। জীবনের প্রথম শিক্ষালয়ের অবস্থান হিসেবে নবগ্রামের স্মৃতি সৈয়দ আবুল হোসেনের জীবনের বর্ণীল ইতিহাস। প্রাথমিক শিক্ষা জীবনের প্রথম দুই বছর এ বিদ্যালয়ে অতিবাহিত হয়। নবগ্রামের কথা উঠলে তিনি বলে থাকেন- জন্ম ডাসারে, অক্ষর জ্ঞান নবগ্রামে।
নবগ্রাম প্রাইমারি স্কুলে দ্বিতীয় শ্রেণি পর্যন্ত অধ্যয়ন করে তিনি ডাসার প্রাইমারি স্কুলে তৃতীয় শ্রেণিতে ভর্তি হন। এ স্কুল থেকে চতুর্থ শ্রেণি পাশ করে বর্তমান আগৈলঝারা উপজেলায় অবস্থিত মেধাকুল হাই স্কুলে পঞ্চম শ্রেণিতে ভর্তি হন। মেধাকুল হাই স্কুল সৈয়দ আবুল হোসেনের শিক্ষা জীবনের আরেকটি স্মরণীয় পর্ব। এ স্কুল থেকে তিনি সপ্তম শ্রেণি পাশ করে গৌরনদী উপজেলায় অবস্থিত বিখ্যাত গৈলা হাই স্কুলে অষ্টম শ্রেণিতে ভর্তি হন। গৈলা হাই স্কুল থেকে কৃতিত্বের সাথে এসএসসি পাশ করে সৈয়দ আবুল হোসেন তৎকালীন মেধা পরিস্ফুটনের কেন্দ্র হিসেবে খ্যাত গৌরনদী কলেজে ভর্তি হন। 
নোয়াখালী নিবাসী দুই যমজ ভাই ডাসার গ্রামে থাকতেন। জ্যেষ্ঠ জনের নাম ছিল ক্বারি বোরহান উদ্দিন। তিনি ডাসার প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ধর্মীয় শিক্ষক ছিলেন। কনিষ্ঠ জনের নাম শামসুল আলম। তিনি সাধারণ্যে শামশু হুজুর নামে পরিচিত ছিলেন। বাংলা, আরবি, উর্দু ও ফার্সি ভাষায় তার বিশেষ দক্ষতা ছিল। ইংরেজিও মোটামুটি জানতেন। শামসু হুজুর সৈয়দ আবুল হোসেনের বাড়িতে থেকে নবগ্রাম প্রাইমারি স্কুলে শিক্ষকতা করতেন। নোয়াখালী নিবাসী ছোট যমজ হুজুরের নিকট সৈয়দ আবুল হোসেনের আনুষ্ঠানিক হাতেখড়ি। হাতেখড়ির দিন পিতা-মাতা শিশু আবুল হোসেনকে ইসলামি শরিয়া মতে যতœসহকারে গোসল করিয়ে নতুন কাপড় পরিয়ে নতুন পাটিতে বসিয়ে দেন। ছোট হুজুর এসে তালপাতায় লিখিয়ে শিশু সৈয়দ আবুল হোসনকে হাতেখড়ি দেন। এ স্মৃতি তিনি এখনও রোমন্থন করেন: “পাটিতে বসিয়ে এবং তালপাতায় লিখিয়ে ছোট যমজ হুজুর বিছমিল্লাহহ বলে হাতেখড়ি দিয়েছিলেন।” হাতেখড়ির পূর্বে তিনি বাড়িতে মা-বাবা ও অন্যান্য বড়জনদের কাছে ধর্মীয় পাঠ এবং বাংলা-ইংরেজি বিষয়ে প্রাথমিক অক্ষরজ্ঞান রপ্ত করে নিয়েছিলেন। শামশু হুজুরের অনুরোধে সৈয়দ আবুল হোসেনের পিতা-মাতা তাকে নবগ্রাম প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ভর্তি করিয়েছিলেন।
ডাসার প্রাথমিক বিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষক আবদুর রাজ্জাক হাওলাদার সৈয়দ আবুল হোসেনের প্রাথমিক বিদ্যালয় জীবনের স্মৃতিচারণ প্রসঙ্গে বলেছেন, ‘সৈয়দ আবুল হোসেন আমার শ্রদ্ধাভাজন সুফিসাধক হযরত আতাহার আলীর সন্তান। সে কথা বলতে শেখার আগে আরবি শেখে। তাদের বাড়ির নারীপুরুষ সবাই ছিলেন পরহেজগার। আতাহার আলী এবং সুফিয়া আলী নিজেদের তত্ত্বাবধানে ছেলেমেয়েদের পড়াতেন। তাদের বাড়িতে শামসু হুজুর লজিং থাকতেন। হুজুর সৈয়দ আবুল হোসেনকে নবগ্রাম প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ভর্তি করিয়ে দেন। নবগ্রাম ডাসার থেকে তিন কিলোমিটার। আমি সৈয়দ আতাহার আলী সাহেবকে বলেছিলাম, নবগ্রাম অনেক দূর, আবুল হোসেনকে আমার স্কুলে ভর্তি করান। সৈয়দ সাহেব হেসে বলেছিলেন, শামসু হুজুর শিশু আবুলকে হাতেখড়ি দিয়েছেন, তার ইচ্ছা সে নবগ্রাম প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পড়–ক। দূরের পথ হেটে কষ্টসহিষ্ণু হোক। যাই হোক, দুই বছর পর আমি আবুল হোসেনকে আমার স্কুলে পেয়েছিলাম। সে আমার ছাত্র ছিল। তার আলোয় আজ কালকিনি আলোকিত। অবহেলিত ডাসার প্রাথমিক বিদ্যালয় সারা দেশে পরিচিত। আমি তার শিক্ষক ছিলাম, এটি আমার গর্ব। ভর্তি হবার আগে সৈয়দ আবুল হোসেন তার বড় ভাই সৈয়দ আবুল কাশেমের সাথে মাঝে মাঝে স্কুলে আসত। ১৯৫৬ সালের জানুয়ারি মাসে সে আনুষ্ঠানিকভাবে নবগ্রাম প্রাথমিক বিদ্যালয়ে প্রথম শ্রেণিতে ভর্তি হয়। দুই বছর সেখানে পড়ে ডাসার প্রাইমারি স্কুলে তৃতীয় শ্রেণিতে ভর্তি হয়। যেদিন ডাসার প্রাইমারি স্কুলে ভর্তি হয়, সেদিনের কথা এখনও আবছা মনে পড়ে। আতাহার আলী সাহেব আবুল হোসেনকে আমার হাতে তুলে দিয়ে বলেছিলেন, ‘আমার কলিজা। তাকে দেখিও, তোমার হাতে দিয়ে গেলাম।’১
সৈয়দ আবুল হোসেন ছাড়া তাঁর অন্য ভাইবোন ডাসার প্রাথমিক বিদ্যালয়ে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা শুরু করেছিলেন। তিনি ১৯৬০ খ্রিস্টাব্দে পঞ্চম শ্রেণি পাশ করেন। মেধাকুল হাই স্কুলে তিনি ষষ্ঠ থেকে সপ্তম শ্রেণি পর্যন্ত অধ্যয়ন করে অষ্টম শ্রেণিতে ভর্তি হন। তবে দুই মাস অধ্যয়ন করার পর ১৯৬৪ খ্রিস্টাব্দের মার্চ মাসের প্রথম সপ্তাহে গৈলা উচ্চ বিদ্যালয়ে অষ্টম শ্রেণিতে ভর্তি হন। এ প্রসঙ্গে সৈয়দ আবুল হোসেনের ছোট ভাই ড. এ হাসান বলেন, ‘আমার মামার বাড়ি বরিশাল জেলার গৈলার সেরেল গ্রামে। মামারা দুই ভাই, আরজ আলী মল্লিক ও রাজ্জাক মল্লিক। দাদা ডাসার প্রাথমিক বিদ্যালয় হতে চতুর্থ শ্রেণি পাশ করে মেধাকুল হাই স্কুলে ভর্তি হন। সেখানে তিন বছর পড়েন। তারপর গৈলা হাইস্কুল। দাদা মামা বাড়ি থেকে গৈলা হাইস্কুলে পড়তেন। মামা বাড়ির সবাই তাঁকে খুব স্নেহ করতেন। গৈলা হাই স্কুল থেকে তিনি এসএসসি পাশ করেন। দাদা ছিলেন যেমন পড়–য়া তেমন সময়নিষ্ঠ ও অধ্যবসায়ী। মেধাকে তিনি শ্রমের সন্তান মনে করতেন। বড় মামা আরজ আলী মল্লিকের ছেলে মান্নান ভাই ছিলেন দুষ্টের শিরোমণি। লেখাপড়ায় মোটেও মনোযোগী ছিলেন না। দাদা মামাবাড়ি থেকে লেখাপড়া করবেন জানতে পেরে মামা-মামি খুব খুশি হয়েছিলেন। দাদা ছিলেন ভালো ছাত্র। তার দেখাদেখি মান্নান ভাইও ভালোভাবে লেখাপড়া শুরু করবেন- এটি ছিল তাদের আনন্দের বিষয়।’২
১৯৬৬ খ্রিস্টাব্দে তিনি আগৈলঝারা উপজেলার বিখ্যাত গৈলা উচ্চ বিদ্যালয় হতে কৃতিত্বের সাথে এসএসসি পাশ করে গৌরনদী কলেজে বাণিজ্য বিভাগে আইকম ক্লাশে ভর্তি হন। ১৯৬৮ খ্রিস্টাব্দে ঐ কলেজ হতে কৃতিত্বের সাথে আই কম পাশ করার পর একই কলেজে বাণিজ্য বিভাগে বিকম ক্লাশে ভর্তি হন। সৈয়দ আবুল হোসেনের সহপাঠী আব্দুল কাদের এ প্রসঙ্গে বলেন, ‘১৯৬৮ সালে আবুল ভাই আর আমি এইচএসসি পাশ করি। আমাদের ভাগ্য ভালো যে, এর দু বছর আগে ১৯৬৬ সালে গৌরনদী কলেজে কলা ও বাণিজ্য বিভাগ অনুমোদন লাভ করে। পূর্বের ন্যায় উভয়ে বাণিজ্য বিভাগে ডিগ্রি ক্লাশে ভর্তি হই।৩ গৌরনদী কলেজের তৎকালীন অধ্যক্ষ তমিজ উদ্দিন সাহেবের ভাষায়, ‘১৯৬৮ সনের জুলাই মাসে কলা ও বাণিজ্য শাখা দিয়া গৌরনদী কলেজে ডিগ্রি ক্লাশ শুরু হইল। সৈয়দ আবুল হোসেন কলেজ, খোয়াজপুর-এর মহান প্রতিষ্ঠাতা আলহাজ্ব সৈয়দ আবুল হোসেন ডিগ্রি ক্লাশের ১৯৬৮ ব্যাচের বাণিজ্য বিভাগের ছাত্র ছিলেন।৪ ১৯৭০ খ্রিস্টাব্দে সৈয়দ আবুল হোসেন গৌরনদী কলেজ হতে বিকম পাশ করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ব্যবস্থাপনা বিভাগে ভর্তি হন এবং ১৯৭২ খ্রিস্টাব্দে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় হতে ব্যবস্থাপনা বিষয়ে মাস্টার্স ডিগ্রি অর্জন করেন। ৫
প্রাথমিক বিদ্যালয় জীবনে সৈয়দ আবুল হোসেন
সৈয়দ আবুল হোসেন ডাসার প্রাইমারি স্কুলে তৃতীয় শ্রেণিতে ভর্তি হন এবং চতুর্থ শ্রেণি পাশ করে মেধাকুল হাই স্কুলে চলে যান। ডাসার প্রাথমিক বিদ্যালয়ে অধ্যয়নকালীন শিশু আবুল হোসেন কেমন ছিলেন তা ঐ স্কুলের তৎকালীন প্রধান শিক্ষক আবদুর রাজ্জাক হাওলাদার সাহেব সুন্দরভাবে বর্ণনা করেছেন- ‘পাঁচ/ছয় বছর বয়সের শিশুরা স্বভাবতই চঞ্চল থাকে। শিশু আবুল হোসেন ছিল ধীর-স্থির। সে স্কুল কামাই করেছে এমন ঘটনা মনে পড়ে না। লেখাপড়ায় ছিল একাগ্র। এক সাথে সবগুলো বই নিয়ে স্কুলে আসত। কোনো ছাত্র বই না-আনলে তাকে সাহায্য করত। প্রতিটা বই আগাগোড়া মন দিয়ে পড়ত। পাঁচ বছরে আমি কোনোদিন তাকে কারও সাথে ঝগড়া করতে দেখিনি। কোনো রকম গালমন্দ, অশোভনীয় কথা মুখ দিয়ে বের হতো না। বকা দিলে মুখটা সামান্য মলিন করে হাসত। মলিন মুখটা সুন্দর হাসিতে আরও উদ্ভাসিত হয়ে উঠত। সে কোনো দিন মিথ্যা বলেনি।৬
ছোট-বেলা হতে সৈয়দ আবুল হোসেন সবসময় পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন থাকতেন। বই, খাতা ও জামা-কাপড় সবসময় পরিষ্কার ঝকঝকে থাকত। শিশু আবুল হোসেন নিজে জামাকাপড় পরিষ্কার রাখতেন। বাড়িতে মা-বাবা ব্যস্ত থাকলে নিজ হাতে খাবার নিয়ে খেতেন। পড়ার টেবিল সবসময় থাকত সাজানো-গোছানো। নিজেই প্রতিদিনের পাঠ স্বেচ্ছায় শিখে নিতেন। স্কুলে আসা-যাবার পথে আবুল হোসেন খুব মার্জিতভাবে চলাফেরা করত। মুরুব্বিদের দেখলে সুন্দরভাবে সালাম দিয়ে পথের এক পাশে দাঁড়িয়ে পথ ছেড়ে দিতেন। শিক্ষক, ছাত্র, মুরুব্বি সবাই তাকে স্নেহ করতেন। তাঁর বাংলা লেখার চেয়ে ইংরেজি লেখা ছিল সুন্দর। খুব ভালো ইংরেজি জানত। অন্য ছেলেরা যখন দুষ্টমি এবং খেলায় মগ্ন থাকত সৈয়দ আবুল হোসেন তখন বসে বসে ওয়ার্ড মুখস্থ করত। যে সকল সহপাঠী লেখাপড়ায় কাঁচা ছিল তাদেরকে সে পড়া বুঝিয়ে দিত।৭
সৈয়দ আবুল হোসেনের প্রাথমিক বিদ্যালয় জীবনের সহপাঠী লাল মিয়ার ভাষায়, ‘স্কুলে যাবার পথে আমরা অনেক দুষ্টমি করতাম। প্রতিবেশীর গাব গাছে ঢিল- সুযোগ পেলে আম, জাম ইত্যাদি চুরি করে খেতে সংকোচ করতাম না, বরং চুরি করে খেতে পারলে গর্ব হতো। তবে আমাদের বন্ধু সৈয়দ আবুল হোসেন চুরি বা অন্য কোনো রকম দুষ্টমি সম্পূর্ণ এড়িয়ে চলত। সে কোনো দিন কারও গাব গাছে ঢিল ছুঁড়েনি, আম পাড়েনি। আমরা ভাবতাম আবুল হোসেন বোকা। সে বলত, ‘চুরি করা পাপ, চুরির জিনিস খেলে কেউ বড় হয় না।’ তার মধ্যে একটা সম্মোহন ছিল। সে ছিল স্কুলের সবচেয়ে সুন্দর। ছোট বড় সবাই তাকে স্নেহ করত। তার ব্যক্তিত্ব আমাদের মোহিত করত। মুরুব্বিরা আমাদেরকে সৈয়দ আবুল হোসেনের মতো হতে উপদেশ দিতেন।৮
প্রাইমারি স্কুল জীবনে তিনি মনোরঞ্জনের জন্য সময় নষ্ট করতেন না। গ্রামে তখন যাত্রা, পালাগান ইত্যাদি দেখার জন্য শিশুরা কান্নাকাটি করত কিন্তু শিশু সৈয়দ আবুল হোসেনের এসব নিয়ে কোনো আগ্রহ ছিল না। তার আগ্রহ ছিল শুধু বই, বই আর বই।৯ ঠিক মার্ক টোয়েনের মতো।
মাদারীপুর ইউনাইটেড স্কুলে ভর্তি হবার ইচ্ছা এক সময় তাঁর কাছে প্রবল হয়ে উঠেছিল। সে সময় ঐ স্কুলটি এলাকার ঐতিহ্যবাহী শিক্ষা প্রতিষ্ঠান হিসেবে পরিচিত ছিল। এ সময় তিনি মামা বাড়ি বেড়াতে যান। মামাত ভাইয়ের সাথে গৈলা হাই স্কুলে যান। ক্লাশে হানিফ নামের এক শিক্ষক ইংরেজিতে একটি প্রশ্ন করেন। ক্লাশের প্রথম ছাত্রটির অনেক আগে সৈয়দ আবুল হোসেন প্রশ্নটির উত্তর দিয়ে দেন। হানিফ স্যার অভিভূত হয়ে সৈয়দ আবুল হোসেনকে প্রধান শিক্ষকের রুমে নিয়ে গিয়ে বলেছিলেন, একটি মেধাবী ছেলে আমাদের স্কুলে ভর্তি হতে এসেছে। তাকে বিশেষ মনযোগ দিয়ে দেখতে হবে। এরপূর্বে তিনি ইউনাইটেড স্কুল দেখতে গিয়েছিলেন। কেউ তাকে এমন অনুপ্রাণিত করেননি বা অমন কোন ঘটনাও ঘটেনি। গৈলা হাই স্কুলের ঘটনা তাকে উদ্বেল করে। তার মন থেকে ইউনাইটেট স্কুল মুছে যায়, তিনি গৈলা হাই স্কুলে ভর্তি হয়ে যান।

উচ্চ বিদ্যালয়ে জীবনে সৈয়দ আবুল হোসেন
উচ্চ বিদ্যালয়ে ভর্তি হবার পর সৈয়দ আবুল হোসেনের চারিত্রিক সৌন্দর্য আরও বিকশিত হতে থাকে। আব্দুল কাদের সৈয়দ আবুল হোসেনের উচ্চ বিদ্যালয় ও কলেজ জীবনের বন্ধু। বন্ধু সম্পর্কে স্মৃতিচারণ করতে শতাব্দীর স্মৃতি প্রবন্ধে আব্দুল কাদের লেখেন- আবুল ভাই মাটির দিকে তাকিয়ে হাঁটতেন। তাঁর হাঁটার ভঙ্গী ছিল চমৎকার, মার্জিত এবং ব্যক্তিত্বময়। চলাফেরায় গতি ছিল, তবে কোনো চঞ্চলতা বা অস্থিরতা ছিল না। ছোটবড় সবার সাথে তিনি ভাল ব্যবহার করতেন। প্রতিটা কথা ছিল সাজানো, পরিমিত এবং সুরুচির পরিচায়ক। আধুনিক সাহিত্যের মতো ছোট ছোট সহজ বাক্যে তিনি কথা বলতেন। এটি ছিল তার অভ্যাস। কণ্ঠ ছিল মোলায়েম। বাক্যের প্রতিটা শব্দ স্পষ্টভাবে শোনা যেত। চড়া গলায় কখনও কথা বলতেন না। বিনয় মিশ্রিত ব্যক্তিত্ব ছিল তার কথাবার্তার অলঙ্কার। লেখাপড়া ছাড়া অন্য কিছুতে তেমন আগ্রহ ছিল না, তবে বিকেলে মাঝে মাঝে হাঁটতেন। বিল-ঝিল, নদীনালা, পাখি ইত্যাদি আনন্দের সাথে উপভোগ করতেন। প্রকৃতি হতে তিনি আহরণ করেছেন সৌন্দর্যবোধ ও পরিপাটিত্য এবং অধ্যয়ন হতে অর্জন করেছেন পরিমিতি বোধ ও সহনশীলতা।’
আবুল হোসেনের স্মরণশক্তি ছিল অত্যন্ত প্রখর। হাই স্কুল জীবনেই তিনি ইংলিশ-টু বেঙ্গলি অভিধানের প্রায় পুরোটা মুখস্থ করে নিয়েছিলেন। তাঁর এত বেশি ইংরেজি ওয়ার্ড মুখস্থ ছিল যে, প্রধান শিক্ষক শ্রীযুক্ত জর্জ অশ্র“ বাবু তাকে চলন্ত অভিধান ডাকতেন। কোনো শব্দের অর্থ নিয়ে সংশয় দেখা দিলে প্রধান শিক্ষক আবুল ভাইকে ডাকতেন। বলতেন, ‘হ্যালো মিস্টার ডিকশনারি, হোয়াট ইজ দ্যা মিনিং অব দিজ ওয়ার্ড?’১০
তিনি ছিলেন অত্যন্ত পড়–য়া এবং সময়নিষ্ঠ। কোনো অবস্থাতে অবহেলায় সময় নষ্ট করতেন না। তিনি কত সময়নিষ্ঠ ছিলেন তা একটি ঘটনা দ্বারা অনুধাবন করা যায়। সেরেলের মামাবাড়িতে সারাক্ষণ লোকজন আর সরগোল লেগে থাকত। ছুটির দিন তিনি ডাসার থাকলে বাড়িতে যখন ইচ্ছা তখন পড়তে পারতেন, মনোযোগ নষ্টের কোনো কারণ ঘটত না। মামা বাড়িতে দিনের বেলা সারাক্ষণ লোক গমগম করত। সরগোলের জন্য লেখাপড়ায় মনোযোগ দিতে পারতেন না। এক বন্ধের দিন তাঁকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছিল না। মামা-মামি অস্থির হয়ে পড়েন; আবুল হোসেন কোথায়! দুপুর গড়িয়ে গেল। তবু দেখা নেই। অনেক্ষণ খুঁজাখুঁজির পর মামাবাড়ির পাশের জঙ্গলে তাঁকে পাওয়া গেল। তিনি জঙ্গলের মাঝখানে এক টুকরো জমি পরিষ্কার করে পাটি বিছিয়ে একাগ্র মনে পড়ছেন। ছুটির দিন বৃষ্টি না-হলে তিনি অধ্যয়ন করার জন্য পাটি নিয়ে শন খেতে চলে যেতেন।১১
প্রাথমিক বিদ্যালয় জীবনের মতো কলেজ জীবনেও তাঁর কোনো বদভ্যাস ছিল না। তিনি পান কিংবা বিড়ি সিগারেট কোনো দিন স্পর্শ করেও দেখেননি। প্রতিদিন পাঁচওয়াক্ত নামাজ পড়তেন এবং আকর্ষণীয় ছাত্র হিসেবে সর্বমহলে পরিচিত ছিলেন।১২

কলেজ জীবনে সৈয়দ আবুল হোসেন
১৯৬৬ সালে গৈলা উচ্চ বিদ্যালয় হতে আবুল হোসেন এসএসসি পাশ করে সদ্য প্রতিষ্ঠিত গৌরনদী কলেজে বাণিজ্য বিভাগে এইচএসসি ক্লাশে ভর্তি হন। ১৯৬৬ খ্রিস্টাব্দ হতে ১৯৬৮ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত ঐ কলেজে অধ্যয়ন করেন। আবুল হোসেন কলেজের অনতিদূরে স্বাস্থ্য বিভাগের অর্ধনির্মিত একটি কমিউনিটি সেন্টারে ওঠেন। কমিউনিটি সেন্টারের পাশে কলেজের অধ্যক্ষ মো. তমিজ উদ্দিন স্যারের বাসা। তাঁর বন্ধু আবদুল কাদেরের ভাষায়, ‘অধ্যক্ষের কাছাকাছি থাকার জন্যই আবুল হোসেন কমিউনিটি সেন্টারে উঠেছিলেন।’ এসএসসি পাশ করার পর তিনি ঢাকা কলেজে ভর্তি হবার সব প্রক্রিয়া প্রায় সম্পন্ন করে ফেলেছিলেন। কিন্তু গৌরনদী কলেজের প্রথম অধ্যক্ষ তমিজ উদ্দিন তাকে এতই প্রভাবিত করেছিলেন যে, তিনি ঢাকা কলেজে ভর্তি না হয়ে গৌরনদী কলেজে ভর্তি হন। তমিজ সাহেবের স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে সৈয়দ আবুল হোসেন বলেন: একদিন তিনি পড়শি আনিস মামার সাথে তমিজ উদ্দিন সাহেবের বাসায় যান। দেখেন, একজন লোক বাগানে পানি দিচ্ছে। আনিস স্যার পায়ের জুতো খুলে সালাম দিলেন আমিও পায়ের জুতো খুলে তাকে সালাম দিলাম। পরে জানলাম তিনিই অধ্যক্ষ তমিজ উদ্দিন।
গৌরনদী কলেজে ভর্তি হবার অল্প কয়েকদিনের মধ্যে সকল শিক্ষক তাঁর ব্যবহারে মুগ্ধ হয়ে গেলেন। ছাত্র হিসেবেও আবুল হোসেন মনোযোগী ও মেধাবী ছিলেন। ব্যবস্থাপনার শিক্ষক মো. মাকসুদ আলী সৈয়দ আবুল হোসেনের আগ্রহ দেখে কমিউনিটি সেন্টারে গিয়ে বিনা বেতনে পড়াতেন।১৩ অধ্যক্ষ তমিজ উদ্দিনের ভাষায়, “আবুল হোসেন ছিলেন অধ্যয়নমুখী সতত সচেতন একজন তুলনাহীন চরিত্রের অধিকারী আদর্শ ছাত্র- মেধাবী, একাগ্র ও ভদ্র। ছাত্র হিসাবে গৌরনদী কলেজে তিনি এত ভালো গুণের অধিকারী ছিলেন যে, কেহ তাঁহাকে ভালো না-বাসিয়া পারিতেন না। ইংরেজি শিক্ষক আবদুল খালেক বলিতেন, সৈয়দ আবুল হোসেন ইংরেজির ডিপো। এমন কোনো ইংরেজি ওয়ার্ড নাই যা সে জানে না।’ তিনি ছিলেন পা হতে মাথা পর্যন্ত একজন আদর্শ ছাত্র। কলেজ পরিচালনা পরিষদ তাঁর ব্যবহারে অভিভূত ছিলেন তাই পুরষ্কারস্বরূপ তার সকল বেতন মওকুফ করে দেয়া হয়েছিল।”১৪
১৯৬৮ খ্রিস্টাব্দে সৈয়দ আবুল হোসেন আইকম পাশ করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হবার আবেদন করেন। পুরো গৌরনদী কলেজের দুই জন ছাত্র বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হবার সুযোগ পান। তন্মধ্যে একজন সৈয়দ আবুল হোসেন, অন্যজন হলেন শাহ আলম। ভর্তির প্রক্রিয়া প্রায় সমাপ্তের পথে। এ সময় একদিন গৌরনদী কলেজের অধ্যক্ষ তমিজ উদ্দিন এবং হিসাব বিজ্ঞানের শিক্ষক ঢাকায় চলে আসেন। তারা সৈয়দ আবুল হোসেন ও শাহ আলমকে গৌরনদী কলেজে ডিগ্রি শ্রেণিতে ভর্তি করার জন্য নিয়ে যেতে এসেছিলেন। সৈয়দ আবুল হোসেন ছিলেন শিক্ষক অন্তপ্রাণ। যে দুজন শিক্ষক তাদের নিয়ে যেতে এসেছেন তারা উভয়ে তার প্রিয় শিক্ষক। তাদের কথা তিনি ফেলতে পারেননি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি না হয়ে তিনি গৌরনদী কলেজে ভর্তি হন। অবশ্য শাহ আলম ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়েছিলেন। 
ডিগ্রি ক্লাশে ওঠার পর মার্চের দিকে সৈয়দ আবুল হোসেন পুরোনো আবাসস্থল ছেড়ে গৌরনদী থানার নিকটবর্তী ভেটেরনারি বিভাগের একটি কমিউনিটি সেন্টারে গিয়ে ওঠেন। তাঁর সাথে ওঠেন পিঙ্গুলাকাটির নুরু। তাঁরা একত্রে নিজেরা রান্নাবান্না করতেন। একই রুমে থাকলে অনেক সময় রান্নাবান্না বা ছোটখাটো বিষয় নিয়ে মনোমালিন্য হওয়া অস্বাভাবিক কিছু নয়। আবুল ভাই ছিলেন অন্য রকম। তাঁর সাথে নুরুর কোনোদিন কোনো মনোমালিন্য হয়নি। নুরু বলতেন, ‘আবুল ভাইয়ের মেনে নেয়ার ক্ষমতা এবং বন্ধুবাৎসল্য সব কিছুর ঊর্ধ্বে। তাঁর মত রুমমেট পাওয়া ভাগ্যের ব্যাপার।’১৫
কলেজ জীবনে অনেকে রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়ে, আবার অনেকে উচ্ছৃঙ্খল জীবনে অভ্যস্ত হয়ে পড়ে। সৈয়দ আবুল হোসেন ছিলেন এসব হতে যোজন মাইল দূরে। তাঁর কলেজ জীবন কত সুশৃঙ্খল এবং হৃদয়গ্রাহী ছিল তা কলেজের তৎকালীন অধ্যক্ষ তমিজ উদ্দিন সাহেবের জবানিতে বিধৃত করা হলো, ‘সেই সময় আবুল হোসেন ষোল-সতের বয়সের কিশোর। রবীন্দ্রনাথ এই বয়সকে বালাই বলিয়াছেন। এই বয়স ছিল দুষ্টামির বয়স। অন্য ছেলেরা কত দুষ্টুমি করিত, কোলাহল করিত, মিছিল করিত, ঝগড়া করিত। আবুল হোসেনকে আমি কোনোদিন এই সবের কাছাকাছিও যাইতে দেখি নাই। তিনি কলেজের নিয়মকানুন এবং শিক্ষকগণের উপদেশ অক্ষরে অক্ষরে মানিয়া চলিতেন। শিক্ষকগণের উপদেশ-নির্দেশ তাঁহার কাছে ছিল অলঙ্ঘনীয়। ঐ বয়সে তিনি নিয়মিত পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়িতেন। ছাত্র রাজনীতির আড়ালে রাজনীতিক দলের লেজুড়বৃত্তি সৈয়দ আবুল হোসেন পছন্দ করিতেন না। তিনি বলিতেন, ‘আগে লেখাপড়া তারপর অন্য কিছু।’১৬ ছাত্ররাজনীতি তিনি পছন্দ করতেন না কারণ অধিকাংশ ছাত্ররাজনীতির আড়ালে দলের লেজুড়বৃত্তি করে এবং ছাত্র রাজনীতি বিভিন্ন কারণে লেখাপড়া ছেড়ে দিয়ে অনৈতিক কাজে লিপ্ত হবার ইন্ধন যোগায়। অবশ্য ছাত্রদের রাজনীতি যদি তাদের সামষ্টিক অধিকার সংরক্ষণ এবং ভবিষৎ নেতা হিসেবে গড়ে ওঠার লক্ষ্যে প্রশিক্ষণ হিসেবে পরিচালনা করা যায়, তাহলে সেরূপ ছাত্ররাজনীতিকে তিনি সানন্দে বরণ করে নেন।

বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে সৈয়দ আবুল হোসেন
বিশ্ববিদ্যালয়ে আসায় সৈয়দ আবুল হোসেনের প্রাথমিক, উচ্চ ও কলেজ জীবনের মার্জিত আচরণ এবং আকর্ষণীয় জীবনযাত্রা আরও শানিত হয়ে ওঠে। তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ে আসেন একজন আদর্শ ছাত্র হিসেবে। বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের প্রথম ক্লাশটি নিয়েছিলেন প্রফেসর দূর্গা দাস। কলেজ জীবনে দূর্গা দাসের গ্রন্থ পড়ে আই কম, বিকম পাশ করেছেন। দিব্য-চোখে এমন জ্ঞানী মানুষটাকে দেখে তার অনুভূতি শ্রদ্ধায় অবনত হয়ে পড়েছিল। এটি তাঁর জীবনের একটি স্মরণীয় ঘটনা। বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ তাঁকে আদর্শ ছাত্রের সাথে সাথে একজন আদর্শ মানুষ হিসেবে পরিণত করার উপাদানে বিভূষিত করে তোলে। বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে তাঁর দৈনন্দিন জীবন ও দৃষ্টিভঙ্গি সম্পর্কে বলতে গিয়ে তৎকালীন সহপাঠী ও বন্ধু ড. আবদুল মাননান বলেন, ‘সৈয়দ আবুল হোসেন প্রচার-বিমুখ একজন নীরব বন্ধু, ব্যক্তিগত আড্ডায় ঝলমলে হাসিমাখা উচ্ছল এক দীপ্তি, নিজ এলাকায় গরীব-দুঃখীর কাছে বিনম্র মায়াভরা ভালোবাসার প্রতীক, আপামর জনগণের সুখে-দুঃখে বিপদে-আপদে একজন দানশীল সহযোগী, প্রসন্ন চিত্তের ও নিরহংকারী বিত্তের সমাহারে একজন বিনয়ী সুহৃদ। তিনি অক্লান্ত পরিশ্রমী, সৎ, কর্মনিষ্ঠ ও বিশ্বস্ত এবং বন্ধুবৎসল। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যবস্থাপনার কৃতি ছাত্র আমার সহপাঠী কালকিনির সৈয়দ বংশের কৃতিসন্তান, এনায়েতপুরের খ্যাতিমান পীর বংশের জামাতা সৈয়দ আবুল হোসেনের বিশ্ববিদ্যালয় জীবন ছিল অনুকরণীয় ব্যক্তিত্ব ও আভিজাত্যময় এবং বর্ণীল। একজন ছাত্রকে আদর্শ ছাত্র হতে হলে, যা যা করা প্রয়োজন কিংবা যে সকল কার্যাবলি হতে বিরত থাকা অপরিহার্য, তিনি তা অক্ষরে অক্ষরে এবং স্বতঃস্ফূর্তভাবে পালন করতেন।১৭
তখনকার বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে সৈয়দ আবুল হোসেন বলেন, “একদিন ক্যাম্পাস থেকে বের হয়ে আসছি। একটা ছেলে আমাকে দেখে তড়িঘড়ি চোখ থেকে সানগ্লাস খুলে পকেটে ঢুকিয়ে রাখলো। ছেলেটির এমন আচরণের কারণ প্রথমে বুঝতে পারিনি। পরে বুঝলাম। ছেলেটি ছিল আমার জুনিয়র। সানগ্লাস পড়ে সিনিয়রদের সামনে দিয়ে হাঁটা শোভনীয় নয়। তাই তড়িঘড়ি সানগ্লাস খুলে ফেলেছিলো। ছেলেটির বাড়ি ছিল গোপালগঞ্জ। শিক্ষালয়ের বর্তমান অবস্থার দিকে তাকালে এখনও আমার গোপালগঞ্জের সে ছেলেটির কথা মনে পড়ে। বিশ্ববিদ্যালয়ের সে অনিন্দ্যসুন্দর শ্রদ্ধা ও স্নেহময় দিনগুলো বড় গভীর আবেগে টানে।”
বিশিষ্ট দার্শনিক অধ্যাপক মনোরঞ্জন দাশ বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে সৈয়দ আবুল হোসেনের একটি ঘটনার কথা উল্লেখ করে বললেন, সৌম্যকান্ত চেহারা, অনেকটা আমাদের সবচেয়ে সুদর্শন দেবতা কার্তিকের মতো। গোলাকার মুখে হাসি পুরো লেফটে। চোখে নিষ্পাপ যোজনায় সারল্যের মুখরতা। টিএসসি-র একটি আড্ডায় প্রথম তাঁকে দেখি। আলাপের ফাঁকে ফাঁকে তাঁকে লক্ষ্য করছিলাম। আভিজাত্যময় ভঙ্গিতে ধীরস্থির হয়ে বক্তব্য শুনছেন। তার স্থিরতা দেখে অবাক না হয়ে পারলাম না। এটি ব্যক্তিত্বের লক্ষণ। এমন ধীরস্থিরগণই শেষ পর্যন্ত সাফল্যের বরমাল্যে ভূষিত হন। ঐ বয়সে আমার সাথে তাকে তুলনা করলাম। আকাশ পাতাল তফাৎ। প্রথম দর্শনে সে আমাকে আকৃষ্ট করতে সক্ষম হলো। আমি বুঝলাম একটি কথা না বলেও মানুষ মানুষকে আর্কষণের জালে জড়িয়ে নিতে পারে। এ জন্য বলা হয়, ফেইস ইজ দ্যা ইনডেক্স অব মাইন্ড।১৮
মনোরঞ্জন দাশ আরও বলেছিলেন, ‘আমি আবুল হোসেনকে কিছু বলার জন্য অনুরোধ করলাম। প্রথমে রাজি না-হলেও সবার অনুরোধে রাজি হলেন। সেদিন তিনি কী বলেছিলেন তা হুবহু বলতে পারব- এমন বলাটা মিথ্যা হবে। তবে যা বলেছিলেন তা আমরা মুগ্ধ হয়ে শুনেছিলাম। গ্রাম হতে সদ্য ঢাকায় আসা একটি ছেলে আমাদের মতো পোড় খাওয়া সিনিয়রদের অবাক করে দিয়েছিলেন। আমরা অবাক হয়ে তার কথা শুনেছিলাম। বক্তব্য শেষে প্রচন্ড তালিতে তাকে স্বীকৃতি দিয়েছিলাম। তিনি খুব বেশি একটা আড্ডায় আসতেন না, তবে কোনো প্রস্তুতি ছাড়া যে কোনো বিষয়ে ইংরেজি ও বাংলায় সমান অনর্গলতায় বলে যেতে পারতেন।১৯

১. আমার ছাত্র আমার শিক্ষক, আবদুর রাজ্জাক হাওলাদার।
২. আমার সহোদর, আমার আদর্শ, ড. এ হাসান।
৩. শতাব্দীর স্মৃতি, আব্দুল কাদের।
৪. আমার আলেকজান্ডার, আলহাজ্ব অধ্যক্ষ তমিজ উদ্দিন।
৫. পঞ্চম জাতীয় সংসদ সদস্য প্রামাণ্য গ্রন্থ, সম্পাদনা আহমাদ উল্লাহ, পৃষ্ঠা- ২১৯।
৬. আমার ছাত্র আমার শিক্ষক, আবদুর রাজ্জাক হাওলাদার, সাবেক প্রধান শিক্ষক, ডাসার 
প্রাথমিক বিদ্যালয়।
৭. মাঠ জরিপ।
৮. মো. মফিজুল হক মেম্বার, সৈয়দ আবুল হোসেনের প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহপাঠী।
৯. মো. মফিজুল হক মেম্বার, সৈয়দ আবুল হোসেনের বাল্যবন্ধু ও ডাসার প্রাথমিক 
বিদ্যালয়ের সহপাঠী।
১০. শতাব্দীর স্মৃতি, আবদুল কাদের।
১১. আমার সহোদর, আমার আদর্শ; ড. এ হাসান; আলহাজ্ব সৈয়দ আবুল হোসেনের কনিষ্ঠ 
ভ্রাতা।
১২. অজয় দাশগুপ্ত ও আবদুল কাদের সাহেবের সাথে সাক্ষাৎকার।
১৩. আবদুল কাদের-এর সঙ্গে সাক্ষাৎকার ও শতাব্দীর স্মৃতি প্রবন্ধ।
১৪. আমার আলেকজান্ডার, অধ্যক্ষ তমিজ উদ্দিন।
১৫. আবদুল কাদের।
১৬. আমার আলেকজান্ডার, অধ্যক্ষ তমিজ উদ্দিন।
১৭. ড. এম এ মান্নান: অধ্যাপক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, ব্যবস্থাপনা বিভাগ এবং সৈয়দ আবুল 
হোসেনের বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের বন্ধু।
১৮. খুঁজে বেড়াই তারে, অধ্যাপক মনোরঞ্জন দাশ: সাবেক অধ্যাপক, লেখক, কলামিস্ট ও 
গবেষক।
১৯. খুঁজে বেড়াই তারে, অধ্যাপক মনোরঞ্জন দাশ: সাবেক অধ্যাপক, লেখক, কলামিস্ট ও 
গবেষক।

সৈয়দ আবুল হোসেনের পারিবারিক ও কর্মজীবন

পারিবারিক জীবন
১৯৭৮ খ্রিস্টাব্দের ২০ অক্টোবর সৈয়দ আবুল হোসেনের সাথে উপমহাদেশের প্রখ্যাত সুফিসাধক খাজা বাবা এনায়েতপুরী (রঃ)-এর সেজো ছেলে গদিনশিন সেজো হুজুর খাজা কামালউদ্দিন (রঃ)-এর সেজো কন্যা খাজা নার্গিসের শুভবিবাহ সম্পন্ন হয়। সৈয়দ আবুল হোসেন ও খাজা নার্গিসের দাম্পত্য জীবন পারস্পরিক বোঝা-পড়ার অনাবিল উপন্যাস। এখানে শুধু হৃদয় নয়, আছে পরস্পর নৈকট্য লাভের আকুলতা, যা সবুজাভ অরণ্যের মতো অধরা-মাধুরী আর বিহ্বল ঐশ্বর্যে কাণায় কাণায় ভর্তি। শত ব্যস্ততার মাঝেও সৈয়দ আবুল হোসেন সকালের নাস্তা, দুপুরের খাবার আর রাতের ডিনার বাসায় স্ত্রী-কন্যাদের সাথে সারেন। এটি কাজের সাথে সংসারের প্রতিও সৈয়দ আবুল হোসেনের ঐকান্তিক আকর্ষণের একটি প্রমাণ। স্ত্রী-কন্যা; যাদের সময় নিয়ে সৈয়দ আবুল হোসেন এত বড় প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলেছেন, এত বিখ্যাত হয়েছেন- তাদের প্রতি তাঁর কৃতজ্ঞতার সীমা নেই, ভালোবাসার অন্ত নেই। এখানেই স্বার্থক খাজা নার্গিস। এটি অনুধাবন করতে পারেন বলেই খাজা নার্গিস তাঁর স্বামীর প্রতি এত ঐকান্তিক। এখানেই সৈয়দ আবুল হোসেনের স্বার্থকতা।১
ব্যক্তিগত জীবনে আলহাজ্ব সৈয়দ আবুল হোসেন অত্যন্ত ধর্মপ্রাণ। অমায়িক, ভদ্র, সজ্জন, পরোপকারী, দয়ালু ও দানশীল ব্যক্তিত্ব হিসেবে সমাদৃত। তাঁর সহধর্মিণী বেগম খাজা নার্গিস হোসেন উপমহাদেশের প্রখ্যাত আধ্যাত্মিক ব্যক্তিত্ব সুফিসাধক হযরত খাজা এনায়েতপুরী (রঃ)-এর পৌত্রী ও এনায়েতপুর দরবার শরীফের বর্তমান গদিনশিন হুজুর পাক হযরত খাজা কামাল উদ্দিন সাহেবের কন্যা। সৈয়দা রুবাইয়াত হোসেন ও সৈয়দা ইফফাত হোসেন নামে তাঁদের দু’টি কন্যা সন্তান রয়েছে। তারা উভয়ে অত্যন্ত মেধাবী এবং আমেরিকার খ্যাতিমান বিশ্ববিদ্যালয় হতে উচ্চ ডিগ্রিধারী।
তাঁর বিনয় ও সৌজন্যবোধের বর্ণনা দিতে গিয়ে মো. মোজাম্মেল হক খান বলেছেন, সদাচরণের ক্ষেত্রে তিনি এক অনন্য মহান ব্যক্তিত্ব। জন্মগতভাবে ঐতিহ্যবাহী পারিবারিক শিক্ষা এবং পরবর্তীকালে সামাজিকীকরণের অন্যান্য মাধ্যমে অর্জিত বিভিন্ন গুণের সমাহার তার চারিত্রিক মাধুর্যকে আরও বিকশিত করেছে। পদমর্যাদায় তাঁর কাছেও নেই এমন মানুষকে যে ভাষায় এবং আচরণে তিনি মোহবিষ্ট করছেন তার দৃষ্টান্তও বিরল। তাঁর অকল্পনীয়, অসাধারণ, মুগ্ধকর ব্যবহারের কৌশল ও সৌন্দর্য অবলোকন করার সুযোগ যারা পেয়েছেন তাদের অভিভূত হওয়া ছাড়া উপায় নেই। রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ কিংবা তাঁর সাফল্যে ঈর্ষান্বিত কোনো ব্যক্তিকে (যাঁদেরকে তিনি চেনেন) অথবা গর্হিত অপরাধ করে ফেলেছেন এমন কাউকেও কটু কথা বলতে শেখেননি। কি করে কথার যাদুতে তিনি বিরুদ্ধাচারীকেও বশীভূত করেন তা দেখে তাজ্জব বনে যেতে হয়। আমার সৌভাগ্য চাকুরির সুবাদে আমাকে প্রতিদিনই এগুলোর সাক্ষী হতে হচ্ছে। তাঁর সাহায্য প্রার্থনার জন্য এসেছেন এমন দর্শনার্থীকেও সিঁড়ির/লিফটের গোড়া পর্যন্ত গিয়ে অভ্যর্থনা ও বিদায় জানানোর যে কাজটি তার নিত্যকার ঘটনা তা আমার ২৮ বছরের চাকুরি জীবনে আর দ্বিতীয়টি চোখে পড়েনি।২
মো. মোজাম্মেল হক আরও বলেন, ‘সৌজন্য প্রদর্শন, শ্রদ্ধাবোধ, প্রটোকল এ গুলো ঊর্ধ্বগামী। যাদের থেকে এগুলো উৎসারিত, ত্যাগের আনন্দ ছাড়া বাকি সুফলগুলো বড়রাই ভোগ করেন। এখানেও তিনি ব্যতিক্রম। বয়স, পদমর্যাদা নির্বিশেষে এখানেও তিনি শুধু দাতা, ভোক্তা নন। ছোটদের প্রতিও স্বভাবসুলভ হাসি, আন্তরিকতা এবং যথোপযুক্ত শব্দসম্ভার প্রয়োগ করে তিনি মিথস্ক্রিয়াকে প্রাণবন্ত ও দীপ্তিমান করে তোলেন। ফলে সহযোগীদের কর্মস্পৃহা, পারস্পরিক সমঝোতা ও কর্মসহায়ক পরিবেশ সৃষ্টিতে তা খুবই ফলদায়ক হয় । যার সুফল মন্ত্রণালয় ও আমরা প্রতিনিয়ত ভোগ করছি।৩
এ প্রসঙ্গে হাসনাত আবদুল হাই-এর বর্ণনা আরও হৃদয়গ্রাহী, ‘সৈয়দ আবুল হোসেন প্রথম দৃষ্টিতেই নিকটের একজন হয়ে যান কোনো সচেতন প্রচেষ্টা ছাড়াই। তাঁর চারিত্রিক মাধুর্য, বিনয়ী ব্যক্তিত্ব এবং সদা হাস্যময় মুখ তাঁকে প্রিয় করে তোলে প্রথম পরিচয়েই। বয়সে, সামাজিক অবস্থানে এবং অন্যান্য পার্থক্য না-মনে রেখেই তিনি আলাপচারিতা করেন সবার সঙ্গে একইভাবে, প্রীতি, ভালোবাসা এবং শ্রদ্ধার সঙ্গে। এমন অমায়িক, সরল ও আন্তরিক ব্যক্তিত্ব সহজেই মানুষকে কাছে টানে, সৈয়দ আবুল হোসেনের জীবনেও তাই হয়েছে এটা নিঃসন্দেহে বলা যায়। তার মধুর ব্যবহারে মুগ্ধ হয়নি, আন্তরিকতার স্পর্শে বিহ্বলতা জাগেনি, সহমর্মিতার অনুভবে একাত্মতার সম্পর্ক স্থাপিত হয়নি, এমন অভিজ্ঞতায় তাঁকে যারা জেনেছেন ও চিনেছেন তাদের কারো হয়েছে এ কথা বলা দুষ্কর।’৪
সৈয়দ আবুল হোসেন রবীন্দ্র সংগীতের ভক্ত। এক সময় প্রচুর গান শুনতেন। এখন ইচ্ছা থাকলেও সময় পান না। অধ্যয়ন তাঁর নেশা, দান তাঁর পেশা। খ্যাতিমান ব্যক্তিদের জীবনী তাঁর প্রিয় পাঠ্যবিষয়। শিক্ষা বিস্তার এবং মানবসেবাই তার শখ।৫ দেশের প্রতি, দেশের মানুষের প্রতি সৈয়দ আবুল হোসেনের আত্মনিবেদন দেখে আমার আপন মন বার বার বলে ওঠে: ও ৎবধষরুব ঃযধঃ ঢ়ধঃৎরড়ঃরংস রং হড়ঃ বহড়ঁময. ও সঁংঃ যধাব হড় যধঃৎবফ ড়ৎ নরঃঃবৎহবংং ঃড়ধিৎফং ধহুড়হব.

কর্মজীবন
মাস্টার্স পাশ করার পর আবুল হোসেন টিসিবি-তে কর্মকর্তা হিসেবে যোগদান করলেও অল্পসময় পর চাকুরি ছেড়ে দিয়ে ব্যবসায় মনোনিবেশ করেন। তখন সুতো ও সুতো-সম্পর্কিত রাসায়নিক দ্রব্যাদি টিসিবি-এর মাধ্যমে আমদানি করে বিসিক কর্তৃক তাঁতিদের মধ্যে বণ্টন করা হতো। ঢাকায় সুতোর গুদাম ছিল মিটফোর্ড হাসপাতালের পেছনে নলগোলা নামক স্থানে। ১৯৭৪ সালের বন্যায় গুদামে পানি ঢুকে সুতো নষ্ট হয়ে যায়। এ অবস্থায় ‘বঙ্গবন্ধু সরকার’ সুতো আমদানি সবার জন্য উন্মুক্ত করে দেন। অন্যদিকে নলগোলা গুদামের সুতো টেন্ডারে বিক্রির সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। সৈয়দ আবুল হোসেন, পাবনার আবদুল মান্নান ও আলহাজ্ব টেক্সটাইলের মালিক আবদুল হাই সম্মিলিতভাবে নলগোলা গুদামের সুতো ক্রয়ের টেন্ডার দেন। ভাগ্য ভালো তারা টেন্ডার পেয়ে যান। এ প্রাপ্তি আবুল ভাইয়ের জীবনের একটি মাইল ফলক। সুতো বিক্রি করে তিনি প্রচুর লাভ করেন। কিছু নগদ অর্থ হাতে আসে এবং এ অর্থ দিয়ে তিনি ১৯৭৫ খ্রিস্টাব্দে সাকো ইন্টারন্যাশনাল নামের একটি ব্যবসা প্রতিষ্ঠান খোলেন।৬
তিনি ব্যবসায় দ্রুত সফলতা লাভ করেন এবং উত্তরোত্তর এর শ্রীবৃদ্ধি ঘটতে থাকে। তাঁর ব্যবসায় সফলতার কারণ সম্পর্কে বলতে গিয়ে ১৯৭৬ খ্রিস্টাব্দ হতে পরবর্তী সাত বছর এক নাগাড়ের বাণিজ্য সচিবের দায়িত্বপালনকারী এম মতিউর রহমান বলেন, ‘প্রথম যখন আবুল হোসেনের সাথে আমার পরিচয় হলো তখন তিনি এত বড় ব্যবসায়ী ছিলেন না। ব্যবসা শুরু করেছিলেন মাত্র। পুঁজিও ছিল যৎসামান্য অধিকন্তু তিনি ছিলেন অত্যন্ত সৎ ও নীতিবান। তাহলে কীভাবে তিনি এত বড় ব্যবসা প্রতিষ্ঠান গড়ে তুললেন? উত্তর, অনেস্টি ইজ দ্যা বেস্ট পলিসি। আসলে সততার মতো বড় মূলধন আর নেই। তাঁর আর্থিক পুঁজি কম ছিল, এটা ঠিক, তবে তাঁর এমন কিছু পুঁজি ছিল যা পৃথিবীর সকল অর্থ একত্রিত করলেও হার মানবে। এ পুঁজি হচ্ছে পরিশ্রম, সততা, সময়নিষ্ঠা আর ভদ্রতা।
পেশাগতভাবে সৈয়দ আবুল হোসেন ছিলেন অত্যন্ত সৎ ও স্বচ্ছ। ব্যবহারে ছিলেন ব্যক্তিত্বময়, বিনয়ে পরিপূর্ণ মার্জিত। তিনি মিথ্যা বলতে পারেন- এমন কেউ ভাবতে পারত না। তাই সৈয়দ আবুল হোসেন যা বলতেন তা সবাই কোনোরূপ দ্বিধা ছাড়া সত্য মর্মে মেনে নিত। শুধু বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে নয়, পুরো সচিবালয়ে এবং যাদের সাথে তিনি ব্যবসা করতেন, যারা তাঁর কাছে আসতেন-যেতেন, কথা বলতেন, কথা শুনতেন সবার কাছে তিনি ছিলেন একজন আদর্শ মানুষের পূর্ণ প্রতিচ্ছবির আদর্শিক নান্দনিকতায় গড়ে ওঠা একজন সৎ ব্যবসায়ী। সংগত কারণে তিনি পুরো সচিবালয়ে ছোটবড় সবার এবং পরিচিত সব মহলের প্রিয়পাত্র হয়ে উঠেছিলেন। আমি মনে করি সৈয়দ আবুল হোসেনের বড় হবার পেছনে এটি কারণগুলোর মধ্যে অন্যতম।
ঢাকা বাণিজ্য ও শিল্প অনুষদ এবং ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের সাথে আলহাজ্ব সৈয়দ আবুল হোসেন সক্রিয়ভাবে জড়িত ছিলেন। তিনি ন্যাশনাল ম্যানেজমেন্ট এসোশিয়েশন, বাংলাদেশ এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ব্যবস্থাপনা বিভাগ এলাম নাই এসোশিয়শনের প্রতিষ্ঠাতা মহাসচিব। তিনি সাকো ডেভেলপমেন্ট সেন্টার নামে একটি বেসরকারি স্বেচ্ছাসেবী সাহায্য সংস্থার প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি। এ বেসরকারি সংস্থার মাধ্যমে তিনি হাজার হাজার দুঃস্থ নরনারীকে স্বনির্ভর ও দক্ষ মানব হিসেবে গড়ে তোলার জন্য অসংখ্য কার্যক্রম হাতে নিয়েছেন। এ সংস্থাটি সম্পূর্ণভাবে তাঁর নিজস্ব অর্থায়নে পরিচালিত।
সৈয়দ আবুল হোসেন পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ ব্যাপকভাবে ভ্রমণ করেছেন। ১৯৯৪ সালে যুক্তরাষ্ট্রের কলম্বাসে অনুষ্ঠিত বিশ্ববাণিজ্য সম্মেলনে তিনি বাংলাদেশের বেসরকারি খাতের প্রতিনিধিত্ব করেন। একই বছর জাপানে অনুষ্ঠিত বিশ্ব সোস্যাল ডেমোক্র্যাট সম্মেলনে তিনি জননেত্রী শেখ হাসিনার সফরসঙ্গী হিসেবে তাঁর মিডিয়া কভারেজের সার্বিক দায়িত্ব পালন করে দেশব্যাপী বিপুল সাড়া জাগান। বিরোধী দলে থাকা অবস্থায় আওয়ামী লীগের উদ্যোগে আন্তর্জাতিক পর্যায়ের বিশেষজ্ঞদের সমন্বয়ে আয়োজিত শিশু সংক্রান্ত সেমিনারের তিনি সফল উদ্যোক্তা। তিনি সমাজসেবা ও শিক্ষানুরাগিতার স্বীকৃতিস্বরূপ বহু জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পুরস্কারে ভূষিত হয়েছেন। তাঁর কর্ম, অধ্যবসায়, দেশপ্রেম ও সততার পুরস্কারস্বরূপ জননেত্রী শেখ হাসিনা তাঁকে দুই বার মন্ত্রী- একবার প্রতিমন্ত্রী এবং বর্তমানে পূর্ণমন্ত্রী পদে ভূষিত করেন।

১. প্রেরণাদায়িনী খাজা নার্গিস; আহমদ হোসেন বীরপ্রতীক: বীর মুক্তিযোদ্ধা, স্বাধীনতা 
যুদ্ধে অসামান্য অবদানের জন্য বীরপ্রতীক খেতাবপ্রাপ্ত। তিনি এনায়েতপুরের গদিনশিন 
পির হযরত খাজা কামালউদ্দিনের অসংখ্য ভক্ত-শিষ্যদের একজন।
২. সৈয়দ আবুল হোসেন- আপনাকে, মো. মোজাম্মেল হক খান, সচিব, সড়ক ও রেলপথ 
বিভাগ।
৩. ঐ
৪. সৈয়দ আবুল হোসেন: ব্যক্তিগত মূল্যায়ন, হাসনাত আবদুল হাই।
৫. পঞ্চম জাতীয় সংসদ সদস্য প্রামাণ্য গ্রন্থ, সম্পাদনা আহমাদ উল্লাহ, পৃষ্ঠা- ২১৯।
৬. শতাব্দীর স্মৃতি, আবদুল কাদের।

সৈয়দ আবুল হোসেনের কৃতিত্ব, অবদান ও স্বীকৃতি
মানুষের জীবনে কর্ম, মর্ম, সফলতা, সুনাম ও খ্যাতির যতগুলো অভিধা রয়েছে তার সব ক্ষেত্রে সৈয়দ আবুল হোসেনের কৃতিত্ব ঈর্ষণীয় সাফল্যের অমিয় সুধায় কানায় কানায় পরিপূর্ণ। তিনি একজন ধনাঢ্য ব্যবসায়ী, খ্যাতিমান রাজনীতিবিদ, দূরদর্শী সমাজ সংস্কারক, জনপ্রিয় নেতা, বিচক্ষণ আইন প্রণেতা, মহান দাতা, চৌকষ মন্ত্রী। দেশখ্যাত শিক্ষানুরাগীই শুধু নন, ভদ্রতা, অমায়িক ব্যবহার, সৌজন্যবোধ, উচ্চ শিক্ষা, অতি উঁচুমানের বংশমর্যাদা এবং শারীরিক অবয়বেও অতীব মনোহর একজন অসাধারণ ব্যক্তি। ইকবাল হোসেনের ভাষায়, ‘আমার নেতা সৈয়দ আবুল হোসেন বাংলাদেশের একজন শীর্ষস্থানীয় ব্যবসায়ী, শীর্ষস্থানীয় রাজনীতিক, শীর্ষস্থানীয় শিক্ষাবিদ, খ্যাতিমান লেখক। পারিবারিক ঐতিহ্য এমনকি চেহারা বিবেচনায়ও বাংলাদেশে আমার নেতার সাথে তুলনা করার মতো লোক খুব বেশি নেই। কেউ হয়ত বড় রাজনীতিক কিন্তু বড় ব্যবসায়ী নন; কেউ বড় দানবীর কিন্তু বড় ব্যবসায়ী বা রাজনীতিক নয়; কেউ-বা হয়ত রাজনীতিক, ব্যবসায়ী এবং দাতা কিন্তু পারিবরিকি ঐতিহ্য নেই, শিক্ষা নেই। কিন্তু আমার নেতা সৈয়দ আবুল হোসেন এমন একজন রাজনীতিবিদ যিনি সবদিক দিয়ে পরিপূর্ণ। মানব চেতনার এমন কোনো শ্রেষ্ঠত্ব নেই যা আমার নেতার কাছে নেই। তাই তিনি তুলনাহীন এবং অনন্য। আমার নেতা নিঃসন্দেহে তুলনাহীন মর্যাদার অধিকারী এক মহান ব্যক্তি।’১
আল্লাহ তাকে দিয়েছেন উজাড় করে। তিনিও মানুষকে দিয়ে যাচ্ছেন উদার হস্তে। ১৯৮০ খ্রিস্টাব্দের প্রাকৃতিক দুর্যোগে উড়িরচর ও মানিকগঞ্জ জেলার সাটুরিয়ার দুর্গত মানুষদের তিনি যে উদার সাহায্য করেছেন তা এখনও সেখানকার মানুষের স্মৃতিপটে দেদীপ্যমান। পার্থিব বা অপার্থিব যাই হোক- মানুষ কোনো না কোনো উদ্দেশ্য নিয়ে দান করেন। তবে দানের পশ্চাতে সৈয়দ আবুল হোসেনের কোনো পার্থিব উদ্দেশ্য ছিল না। দুর্গত মানুষের কান্না তাঁর আত্মাকে বিগলিত করেছিল। অসহায় মানুষের সেবার মাধ্যমে সৃষ্টিকর্তার সন্তুষ্টি অর্জনই ছিল তাঁর উদ্দেশ্য। ১৯৮৮ খ্রিস্টাব্দে মহাপ্লাবনের সময় মাদারীপুরের দুর্গত মানুষকে নিজের পরিবারের মতো নিবিড় মমতায় বুকে টেনে নিয়েছিলেন। দুর্গত মানুষের দৈনন্দিন প্রয়োজন মেটানোর জন্য যা প্রয়োজন, তা বিলিয়েছেন অকাতরে। এখানেও তাঁর রাজনীতিক বা পার্থিব অন্য কোনো উদ্দেশ্য ছিল না। ১৯৯১ খ্রিস্টাব্দের প্রলয়ঙ্করী ঘূর্ণিঝড়ে সৈয়দ আবুল হোসেন দুর্গতদের পাশে এসে দাঁড়িয়েছেন। অসহায় মানুষকে তিনি যেভাবে সহায়তা করেন, তা কারও বিত্তের সাথে চিত্তের সুবিশাল সমন্বয় না-ঘটলে কখনও সম্ভব নয়।
দেশে আধুনিক শিক্ষার প্রসার ও নিরক্ষরতা দূরীকরণে সৈয়দ আবুল হোসেনের ভূমিকা রূপকথার গল্পের মতো। বলা হয়ে থাকে, দেশে আর দশজন সৈয়দ আবুল হোসেন জন্ম নিলে বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থার আমূল পরিবর্তন ঘটত। তাঁর একক প্রচেষ্টায় যতগুলো শিক্ষা প্রতিষ্ঠান হয়েছে, বাংলাদেশে আর কারও একক প্রচেষ্টায় এত শিক্ষা প্রতিষ্ঠান হয়নি। ১৯৮৩ খ্রিস্টাব্দে তিনি তাঁর পিতার নামে সৈয়দ আতাহার আলী প্রাথমিক বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেন। ১৯৮৫ খ্রিস্টাব্দে প্রয়াত পিতার নামে প্রতিষ্ঠা করেন সৈয়দ আতাহার আলী ইবতেদায়ি মাদ্রাসা। ১৯৮৯ খ্রিস্টাব্দে মাদারীপুরের খোয়াজপুরে প্রতিষ্ঠা করেন সৈয়দ আবুল হোসেন কলেজ। শিক্ষার মান, অবকাঠামো, পরিবেশ ও সফলতা বিবেচনায় তাঁর প্রতিষ্ঠিত প্রত্যেকটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশের যে কোনো শ্রেষ্ঠ কলেজের সাথে পাল্লা দেয়ার সকল যোগ্যতার অধিকারী। বিশেষ করে, সৈয়দ আবুল হোসেন কলেজ, খোয়াজপুর-এর লেখাপড়ার মান এত উন্নত ছিল যে, প্রথম ব্যাচের একজন ছাত্র বাণিজ্য বিভাগে প্রথম স্থান এবং আর একজন চতুর্থ স্থান অধিকার করে।
মাদারীপুর জেলা লিগ্যাল এইড-এর প্রাক্তন কর্মকর্তা, বর্তমানে সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ও শিক্ষাবিদ ড. একেএম আখতারুল কবীর বলেছেন, ‘আলহাজ্ব সৈয়দ আবুল হোসেন কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত কলেজগুলো এত সুনাম অর্জন করেছিল যে, মাদারীপুর এলাকার প্রত্যেক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান পুরোনো নাম পরিবর্তন করে সৈয়দ আবুল হোসেনের নামে নামকরণ করার জন্য উদগ্রীব হয়ে উঠেছিল। সবার মনে এমন বিশ্বাস জাগ্রত হয়ে উঠেছিল যে, সৈয়দ আবুল হোসেন কলেজের দায়িত্ব নিলে শিক্ষার্থীরা জাতীয় মেধা তালিকায় স্থান পাবে। তিনি শিক্ষক নিয়োগে এত নিরপেক্ষতা পালন করতেন যে, তার কলেজে মেধাবী শিক্ষকই সবসময় নিয়োগ পেত। সংগতকারণে ছাত্রছাত্রী ও শিক্ষার পরিবেশও থাকত মেধাময়।’২
কালকিনি সৈয়দ আবুল হোসেন বিশ্ববিদ্যালয় কলেজ দেশের শিক্ষা ব্যবস্থায় একটি গর্ব। ১৯৯২ খ্রিস্টাব্দে তিনি এ কলেজটি নতুন আঙ্গিকে প্রতিষ্ঠা করেন। এমন চমৎকার পরিবেশ ও আভিজাত্যময় অবকাঠামো এবং আদর্শ ক্যাম্পাস বাংলাদেশের আর কোথাও নেই। এ কলেজের শিক্ষার মান ও সার্বিক অবস্থা বিবেচনায় সরকার কলেজটিকে বিশ্ববিদ্যালয় কলেজে উন্নীত করেছে। উল্লেখ্য, থানা পর্যায়ে বেসরকারি কলেজের মধ্যে এটি প্রথম বিশ্ববিদ্যালয় কলেজে উন্নীত হবার গৌরব অর্জন করে।
নিজ গ্রাম ডাসারে পিতার পুণ্য স্মৃতি রক্ষার্থে প্রতিষ্ঠিত ডি কে আইডিয়াল একাডেমিকে আলহাজ্ব সৈয়দ আবুল হোসেন নিজ অর্থে কলেজে উন্নীত করেছেন। এ প্রতিষ্ঠানটির বর্তমান নাম ডি কে আইডিয়াল সৈয়দ আতাহার আলী একাডেমী এন্ড কলেজ। পুরো মাদারীপুর জেলার মধ্যে এটাই একমাত্র কলেজ যেখানে বিজ্ঞান, বাণিজ্য ও মানবিক শাখা ছাড়াও ব্যবসায় ব্যবস্থাপনা কোর্স চালু করা হয়েছে। গ্রামের একটি কলেজের এতদূর উন্নীত হবার পুরো কৃতিত্ব সৈয়দ আবুল হোসেনের।
কালকিনির প্রাথমিক শিক্ষার প্রসারে সৈয়দ আবুল হোসেনের নাম কেউ মুছে দিতে পারবে না। তিনি মনে করেন, প্রাথমিক শিক্ষা সারা জীবনের শিক্ষার ভিত। এটি বিস্তৃত করা না-গেলে জাতিকে স্থবিরতা হতে মুক্তি দেয়া সম্ভব নয়।’ প্রাথমিক শিক্ষা বিস্তারের লক্ষ্যে তিনি ১০০টির অধিক প্রাথমিক বিদ্যালয় স্থাপন করেছেন। স্থানীয় অংশগ্রহণকারীদের অংশ হিসেবে প্রতিটি প্রাথমিক বিদ্যালয় স্থাপনে যত টাকা প্রয়োজন জনগণের পক্ষ হতে সমুদয় অর্থ সৈয়দ আবুল হোসেন একা পরিশোধ করেছেন। তাঁর এ অবদান কয়েক বছরের মধ্যে কালকিনির শিক্ষার হার ও মান দুটোকে বহুগুণে বর্ধিত করেছে। এক হিসেবে দেখা গেছে, তিনি এ পর্যন্ত প্রায় দুই শতেরও অধিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠায় প্রত্যক্ষভাবে অবদান রেখেছেন।
ধর্মীয় শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, মসজিদ ও উপাসনালয় প্রতিষ্ঠাতেও তাঁর অবদান অপরিসীম। সৈয়দ আবুল হোসেন তাঁর পিতার মাজার সংলগ্ন মসজিদ ও মাদ্রাসা ছাড়াও কালকিনি ও মাদারীপুরের বিভিন্ন এলাকায় ৩৭টি মাদ্রাসা ও ৪৫টি মসজিদ প্রতিষ্ঠায় অবদান রেখেছেন। তাঁর অর্থানুকূল্যে ২৯টি মাধ্যমিক স্তরের শিক্ষা প্রতিষ্ঠান হারিয়ে যাবার হাত হতে রক্ষা পেয়েছে। ব্যক্তিগত ও সমষ্টিগত সব দিকে তিনি শিক্ষার উন্নয়নে উদার। হাজার হাজার দরিদ্র মেয়ে তার দানে সংসার খুঁজে পেয়েছে।
তাঁর এলাকায় তিনি শতাধিক প্রাথমিক বিদ্যালয়ও স্থাপন করেছেন। এসব বিদ্যালয়ের কমিউনিটি পার্টিসিপেশনের অংশ হিসেবে প্রতিটি বিদ্যালয়ের জন্য নির্ধারিত সমুদয় অর্থ এলাকার জনগণের পক্ষ থেকে তিনি নিজ তহবিল থেকে দান করেছেন। পিতার নামে প্রতিষ্ঠিত কলেজটির ছাত্রাবাস ও শিক্ষকদের বাসস্থানও নিজ অর্থে প্রতিষ্ঠা করেছেন।
১৯৮৯ খ্রিস্টাব্দে তিনি গরিব ও মেধাবী ছাত্রছাত্রীদের বৃত্তি প্রদানের নিমিত্ত ‘সৈয়দ আবুল হোসেন কল্যাণ ট্রাস্ট’ প্রতিষ্ঠা করেন।৩ এক গবেষণায় দেখা যায়, সৈয়দ আবুল হোসেন এ পর্যন্ত ৩৪১২ জন অসহায় দরিদ্র মহিলার বিয়েতে আর্থিক সাহায্য দিয়েছেন। গত বিশ বছরে সৈয়দ আবুল ১৯৪৬৫ জন ছাত্রছাত্রীকে লেখাপড়ার জন্য সাহায্য করেছেন। তাঁর অর্থানুকূল্যে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে বৃত্তিপ্রাপ্ত ছাত্রছাত্রীর সংখ্যা ৩৭০০-এর অধিক।৪
শিক্ষা বিস্তারের কথা শুনলে সৈয়দ আবুল হোসেনের মন আপনা-আপনি উদার হয়ে যায়। তিনি সব কিছু বিলিয়ে দেয়ার জন্য প্রস্তুত থাকেন। তিনি মনে করেন, শিক্ষার চেয়ে ভালো বিনিয়োগ আর নেই। এটি অবিনশ্বর। এ প্রসঙ্গে সৈয়দ আবুল হোসেনের একটি উদ্ধৃতি স্মর্তব্য-“আমি আমার মরহুম পিতা সৈয়দ আতাহার আলীর নামে ডাসার গ্রামে একাডেমি কলেজ, খোয়াজপুর কলেজ, কালকিনি বিশ্ববিদ্যালয় কলেজ, ডাসার শেখ হাসিনা একাডেমি কলেজ প্রতিষ্ঠা করি। দক্ষিণ বাংলার অনেক মেয়ে উচ্চ শিক্ষা থেকে বঞ্চিত। অর্থের অভাবে তাদের কলেজে পড়া হয় না। নারী শিক্ষা বিস্তারে আমি দেশরতœ শেখ হাসিনা একাডেমি কলেজ প্রতিষ্ঠা করি। শত শত গরিব মেয়ে শেখ হাসিনা একাডেমিতে পড়ার সুযোগ পাচ্ছে। উচ্চ শিক্ষা গ্রহণে তারা এগিয়ে যাচ্ছে। খোয়াজপুর কলেজ থেকে হাজার হাজার ছেলেমেয়ে উচ্চ মাধ্যমিক পাশ করে উচ্চ শিক্ষা গ্রহণের সুযোগ পাচ্ছে। কালকিনি বিশ্ববিদ্যালয় কলেজে অনার্স ও এমএ পড়ানো হয়। মফস্বলে বাংলাদেশে প্রথম অনার্স ও স্নাতকোত্তর ক্লাস মাদারীপুর জেলার কালকিনিতে শুরু হয়। নিরক্ষরতা দূরীকরণের জন্য আমার চেষ্টায় অনেক বেসরকারি প্রাথমিক প্রাইমারি ও মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।”৫
সৈয়দ আবুল হোসেনের শিক্ষানুরাগিতার কথা বলতে গিয়ে কালকিনি বিশ্ববিদ্যালয় কলেজের অধ্যক্ষ খালেকুজ্জামান বলেন, ‘কালকিনির এই রতœ আলহাজ্ব সৈয়দ আবুল হোসেনের সবচেয়ে বড় সাফল্য কালকিনি অঞ্চলের শিক্ষা প্রসারে সীমাহীন অবদান। তিনি বিশ্বাস করেন, যে জাতি বা অঞ্চল যত বেশি শিক্ষিত সে অঞ্চল তত বেশি উন্নত। তাই সামর্থ্য অর্জনের সাথে সাথে তিনি শিক্ষার প্রসারে নিজেকে নিবেদিত করে দিয়েছেন। একক প্রচেষ্টায় ১৯৮৯ সালে মাদারীপুর থানাধীন অনুন্নত অঞ্চল খোয়াজপুরে প্রতিষ্ঠা করেছেন দেশের উচ্চ মাধ্যমিক পর্যায়ের অন্যতম খ্যাতিসম্পন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান সৈয়দ আবুল হোসেন কলেজ। অতঃপর কালকিনি উপজেলা সদরে তৎকালীন ক্ষীণপ্রভার কালকিনি কলেজ তাঁর সার্বিক তত্ত্বাবধানে আধুনিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে। এর সুরম্য ভবনের খ্যাতি দেশজোড়া। কালকিনি সৈয়দ আবুল হোসেন কলেজ এখন কোনো সাধারণ কলেজ নয়, দক্ষিণ বঙ্গের অন্যতম খ্যাতিসম্পন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান হিসেবে প্রতিষ্ঠা পেয়েছে। এ ছাড়া উপজেলাধীন ডাসার গ্রামে সৈয়দ আতাহার আলী একাডেমি এন্ড কলেজ, শেখ হাসিনা একাডেমি এন্ড উইমেন্স কলেজ প্রতিষ্ঠিত করে প্রত্যেকটিকে খ্যাতি, অবয়ব ও শিক্ষার মান ও মননে শীর্ষে তুলে দিয়েছেন। তাঁর উদারতার ছোঁয়ায় উজ্জ্বল হয়ে উঠেছে শশীকর শহিদ স্মৃতি মহাবিদ্যালয়, সাহেবরামপুর কবি নজরুল ইসলাম কলেজ প্রভৃতির সার্বিক উন্নয়ন। এ বছরেই আড়িয়ালখাঁর অপর পাড়ের প্রত্যন্ত জনপদের শিক্ষা বিস্তারের জন্য প্রতিষ্ঠা করেছেন খাসেরহাট সৈয়দ আবুল হোসেন কলেজ। কলেজ ছাড়াও উপজেলার সব মাধ্যমিক বিদ্যালয় ও প্রাথমিক বিদ্যালয় তাঁরই তত্ত্বাবধানে পরিচালিত হচ্ছে। এ ছাড়া তিনি শতাধিক স্বল্পব্যয়ী প্রাথমিক বিদ্যালয় ও মাধ্যমিক বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেছেন। মাদরাসা শিক্ষার প্রসারেও তাঁর ভূমিকা অনন্য। তাঁর একক প্রচেষ্টা সমগ্র অঞ্চলকে নিরক্ষরতা মুক্ত আলোকপ্রাপ্ত অঞ্চলে পরিণত করেছে।’৬
‘কালকিনি মুক্তিযোদ্ধা সংসদ ভবন’ তৈরিতে সৈয়দ আবুল হোসেনের একক অবদান সবচেয়ে বেশি।৭ কালকিনি উপজেলা এখন আধুনিক যোগাযোগ ব্যবস্থার আওতাভুক্ত। যে কালকিনিতে নৌকা ছাড়া চলাচল অবিশ্বাস্য ছিল, সৈয়দ আবুল হোসেনের ছোঁয়ায় তার আমূল পরিবর্তন ঘটেছে। গত ১৫ বছরে তিনি কালকিনি উপজেলা সদর হতে বিভিন্ন ইউনিয়নে যোগাযোগ নিরবিচ্ছিন্ন করার লক্ষ্যে ১৪ টি সড়ক প্রতিষ্ঠা ও উন্নয়ন করেছেন। স্থাপন করেছেন অসংখ্য রাস্তা, ব্রিজ ও কালভার্ট। যুব সমাজের নৈতিক ও সাংগঠনিক শ্রীবৃদ্ধির লক্ষ্যে তিনি অনেকগুলো পাঠাগার, ক্লাব, সামাজিক প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠা করেছেন ও প্রতিষ্ঠায় সাহায্য করেছেন।৮ কালকিনির আর্থ-সামাজিক ও রাজনীতিক উন্নয়নে এমন কোনো ক্ষেত্র নেই, যা সৈয়দ আবুল হোসেনের উদারতায় সমৃদ্ধ হয়নি।
প্রত্যন্ত অঞ্চলের শিক্ষা বিস্তারে সৈয়দ আবুল হোসেনের প্রতিজ্ঞা ও প্রয়াস দুটোই আমাদের দেশের প্রেক্ষাপটে অত্যন্ত গুরুত্ববহ। সৈয়দ আবুল হোসেন এ প্রসঙ্গে বলেছেন, ‘গ্রামই আমাদের আসল ঠিকানা। অথচ এই গ্রাম আজ অবহেলিত। শহরে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অভাব নেই। কিন্তু গ্রামের লোকের লেখাপড়ার প্রতি কারও তেমন মনোযোগ নেই। গ্রামের জনগোষ্ঠীর শিক্ষার বিপুল চাহিদা মেটানের লক্ষ্যেই আমার এ প্রয়াস।’৯
লেখক ও সম্পাদক হিসেবেও সৈয়দ আবুল হোসেন স্মরণীয় ও বরণীয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নকালীন তিনি ‘দি পলিটিসিয়ান’ নামক একটি মাসিক পত্রিকা সম্পাদনা করতেন। দেশের বিভিন্ন দৈনিক পত্রিকায় তিনি নিয়মিত লিখতেন এবং এখনও লেখেন। আলহাজ্ব সৈয়দ আবুল হোসেন বোদ্ধা সমাজে দূরদর্শী রাজনীতিক বিশ্লেষক হিসেবে পরিচিত। তিনি কবি সাহিত্যিকের পৃষ্ঠপোষকতার জন্যও খ্যাত। তার অর্থানুকূল্যে অনেকের রচিত বই আলোর মুখ দেখেছে।১০
সৈয়দ আবুল হোসেন একজন বিশিষ্ট মুক্তিযোদ্ধা। তিনি ৯ নং সেক্টরের আওতায় থেকে হানাদারের বিরুদ্ধে বেশ কটি সম্মুখ যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছেন। একবার তিনি গ্রেনেডসহ গৌরনদীতে ধরা পড়েন। তবে ভাগ্যক্রমে রক্ষা পান।১১ তবে হানাদার বাহিনী তাঁর ওপর নির্যাতন চালায়। মুক্তিযোদ্ধারা কোথায় আছেন তা বলে দেয়ার জন্য নির্যাতন। তিনি বলেননি, দেশপ্রেমের অনুভূতি সব নির্যাতনকে ফুলেল ভালোবাসায় আরও তেজি করেছে। রাজাকার-আলবদরগণের নির্যাতনে সৈয়দ আবুল হোসেনের বাম হাত ভেঙে গিয়েছিল। এখনও হাতে সে চিহ্ন আছে। এটি যাতে দেখা না যায় এ জন্য তিনি সবসময় ফুলশার্ট পরে তা ঢেকে রাখেন।১২
সৈয়দ আবুল হোসেন এসডিসি নামক একটি এনজিও-এর প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি। এর প্রধান অফিস মাদারীপুর জেলার কালকিনি থানার ডাসার গ্রামে অবস্থিত। এ প্রতিষ্ঠানটির মাধ্যমে তিনি প্রত্যন্ত এলাকার শিক্ষার মান উন্নয়ন, নারীর ক্ষমতায়ন, পরিবেশের উন্নয়ন, গরিব ও মেধাবী ছাত্রছাত্রীদের বৃত্তি প্রদান, কর্মমুখী প্রশিক্ষণ, স্বাস্থ্য সচেতনতা, যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়নসহ আর্থসামাজিক কর্মকাণ্ডে ব্যাপক অবদান রেখে যাচ্ছেন। শুধু দেশে নয়, আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রেও তাঁর অবদান রয়েছে। তিনি গণচিনভিত্তিক আন্তর্জাতিক বাণিজ্য সংগঠন বোয়াও ফোরামের প্রতিষ্ঠাতা সদস্য।

লেখক সৈয়দ আবুল হোসেন
সৈয়দ আবুল হোসেন লেখক হিসেবে কেমন? এ প্রশ্নের উত্তর দিতে গিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের খ্যাতিমান শিক্ষক ড. এ মাননান বলেন, দ্বিধাহীন কণ্ঠে বলতে চাই, তিনি একজন মননশীল সৃজনশীল চিন্তাবিদ, চিন্তনে-লিখনে যাঁর রয়েছে অগাধ ব্যুৎপত্তি। লেখায় যাঁর সাবলীলতা ঈর্ষণীয় বিষয়। যাঁর লেখায় পাওয়া যায় কান্নার সুর, যখন তিনি কালির আঁচড়ে বলেন স্বাধীনতার জনক জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুর লড়াকু জীবন আর দেশদ্রোহী ঘাতকদের হাতে নির্মমভাবে শহিদ হওয়ার কাহিনি। যাঁর লেখনীর গুণে জীবন্ত হয়ে উঠেছে বাংলাদেশের স্বপ্নদ্রষ্টা ও স্্রষ্টা কোটি কোটি বাঙালির প্রাণ-পুরুষ সিংহ-হৃদয় ‘বাংলার মুজিব’-এর সংগ্রামী জীবন, তাঁর জীবনের বঞ্চনার কাহিনী, নৃশংসভাবে তাঁকে সহ তাঁর পরিবারের শাহাদাত-বরণের কথা। আমি তাঁরই কথা উচ্চকণ্ঠে বলতে চাই, যাঁর লেখায় দীপ্ত হয়ে উঠেছে বাংলার জনগণের চরম বিপদে সদা-সর্বদা সংগ্রামী মন নিয়ে আপোসহীন এগিয়ে থাকা বঙ্গবন্ধু-তনয়া সংগ্রামী জননেত্রী শেখ হাসিনার প্রতিকৃতি যিনি প্রবল বিরূপতার মধ্যে থেকেও সততার চরম পরাকাষ্ঠা দেখিয়ে জাতিকে নেতৃত্ব দিয়েছেন ও দিচ্ছেন। আমি তারই কথা বিনা দ্বিধায় বলতে চাই যাঁর শানিত লেখায় বাক্সময় হয়ে উঠেছে বঙ্গজননী বেগম ফজিলাতুন্নেছার সংগ্রামময় পারিবারিক জীবন এবং শত কষ্টের মধ্যেও বঙ্গবন্ধুর জেল-জীবনের সময়ে মাসুম সন্তানদের গড়ে তোলার ইতিকথা। শ্রেষ্ঠত্ব তাঁর এখানেই, তাঁর লেখার মধ্যে।
আলহাজ্ব সৈয়দ আবুল হোসেন একজন মননশীল গ্রন্থকার হিসেবে লব্ধ প্রতিষ্ঠিত। লেখক ছাড়াও তিনি সাহিত্যানুরাগী হিসেবে অনেক কবি-সাহিত্যিককে গ্রন্থ প্রকাশে সহায়ত করেছেন। রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সমাজ চিন্তামূলক অনেক গ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে। তন্মধ্যে নিম্নলিখিত গ্রন্থগুলো উল্লেখযোগ্য :

১. স্বাধীনতার জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান;
২. শেখ হাসিনা সংগ্রামী জননেত্রীর প্রতিকৃতি;
৩. গণতন্ত্র, নেতৃত্ব ও উন্নয়ন;
৪. গণতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থার সংকট;
৫. আওয়ামী লীগের নীতি ও কৌশল- শিল্পায়ন ও অভ্যন্তরীণ সম্পদ সমাবেশ;
৬. শেখ হাসিনার অক্ষয় কীর্তি- পার্বত্য শান্তি চুক্তি;
৭. বঙ্গজননী বেগম ফজিলাতুন্নেছা মুজিব;
৮. শেখ হাসিনার অসামান্য সাফল্য এবং
৯. বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ সুবর্ণ জয়ন্তী স্মারকগ্রন্থ।

সৈয়দ আবুল হোসেনের গ্রন্থের সমালোচক ড. আবদুল জলিল বলেছেন, তাঁর প্রতিটি গ্রন্থ ভিন্ন স্বাদ ও ব্যতিক্রমী যোজনায় পরিসজ্জিত। রাজনীতি, স্বাধীনতা, আর্থ-সামাজিক কর্মকাণ্ড, পররাষ্ট্র ও ব্যক্তিগত জীবন পরম্পরায় মানবিক মূল্যবোধ উন্মোচনের মধ্য দিয়ে জীবনের সামগ্রিক কর্মকাণ্ডের বিস্তারিত কণিকা সৈয়দ আবুল হোসেনের লেখায় অপূর্ব ব্যঞ্জনায় দ্যোতিত। আবেশিত লেখা বাস্তবতার কোড়কে পরিশুদ্ধ করা গেলে তা কী পরিমাণ কার্যকর হয়, তা পাঠকমাত্রই অনুধাবন করতে পারেন। সৈয়দ আবুল হোসেনের গ্রন্থগুলোও এর ব্যতিক্রম নয়। মনের মাধুরী মিশিয়ে অনেক বড় বড় গ্রন্থ লেখা যায়, কিন্তু বাস্তবতার লেশমাত্র পাওয়া যায় না। সে বিবেচনায় সৈয়দ আবুল হোসেন ব্যতিক্রমী। গ্রন্থগুলোকে লেখক তথ্য, ঐতিহাসিক ঘটনার সূত্র, গ্রহণযোগ্য উদ্ধৃতি দিয়ে সত্যিকার অর্থে মণির মতো আকর্ষণীয় আলেখ্যে উদ্ভাসিত করেছেন। চোখ বুলালে বোঝা যায়, প্রতিটি বই লিখতে সৈয়দ আবুল হোসেনকে প্রচুর পড়তে হয়েছে। কিছু কিছু বিষয় আরও চমৎকার, যা পড়ে অর্জন করা যায় না। এগুলো জীবনের তিক্ত অভিজ্ঞতার মধুর প্রাপ্তির প্রগাঢ় অনুভব ছাড়া হয় না। পরিসরে ছোট হলেও তথ্য-তত্ত্ব ও বিষয়াবলিতে বেশ সুস্বাদু ব্যঞ্জনায় সমৃদ্ধ প্রতিটি বই, যা পাঠকের মনে দাগ কাটতে বাধ্য।১৩

স্বীকৃতি
সাহিত্য, সমাজ, রাষ্ট্র ও দেশের বিভিন্ন ক্ষেত্রে অবদান এবং শিক্ষা প্রসারের জন্য সৈয়দ আবুল হোসেন জাতি ও আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে বহু পুরস্কারে ভূষিত হয়েছেন। শিক্ষা ও আর্থসামাজিক উন্নয়নে অসামান্য অবদান রাখার জন্য তিনি শেরে বাংলা পদক, মোতাহার হোসেন পদক এবং জাতীয় স্বীকৃতিসহ অসংখ্য সম্মানে ভূষিত হয়েছেন। জাতীয় ও আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে সার্বিক অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ আমেরিকার বায়োলজিক্যাল ইন্সটিটিউট তাঁকে ‘ম্যান অব দ্যা মিলেনিয়াম’ পদকে সম্মানিত করে। সেবামূলক কাজে অসামান্য অবদানের জন্য তিনি ১৯৮৮ খ্রিস্টাব্দে অতীশ দীপঙ্কর শ্রীজ্ঞান পুরস্কার লাভ করেন।১৪ তাঁর বন্ধু ও সাকো ইন্টারন্যাশনাল-এর প্রাক্তন কর্মকর্তা জনাব আব্দুল কাদিরের ভাষায়, সৈয়দ আবুল হোসেন কমপক্ষে বাইশটি জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পুরস্কার বা সম্মাননা পেয়েছেন।
জীবনের প্রথম সংসদ নির্বাচনে তিনি মাদারীপুর-৩ নির্বাচনী এলাকা হতে ১৯৯১ খ্রিস্টাব্দে অনুষ্ঠিত জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি প্রার্থী অ্যাডভোকেট আবদুল মতিন মোল্লাকে ৩৬ হাজার ভোটে পরাজিত করে আওয়ামী লীগের মনোনয়নে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। তার প্রাপ্ত ভোটের সংখ্যা ছিল ৬২ হাজার।১৫ ঐ নির্বাচনের সময় তিনি শুধু একবার নির্বাচনী এলাকায় গিয়েছিলেন। তাও আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনার সাথে। তবু তিনি জয়ী হয়েছেন। কারণ তিনি ক্ষমতার জন্য নির্বাচনে যাননি, জনসেবার প্রাতিষ্ঠানিক ভিতকে মজবুত করে জনকল্যাণে শক্তিশালী ভূমিকা রাখার ক্ষেত্রকে প্রসারিত করার জন্য নির্বাচনে অংশগ্রহণ করেছিলেন। এ ক্ষেত্রে জনগণের কাছ হতে ভোট চাওয়ার চেয়েও জনগণের মনের গভীরে তার অবস্থান কতটুকু রেখাপাত করেছে তা সর্বাগ্রে জানা প্রয়োজন। তাঁর ভাষায়: “আমি সমাজ উন্নয়নের সাথে শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ রাজনীতিতে জড়িত আছি। জনগণের আহবানে নির্বাচনে অংশ নিয়েছি। আওয়ামী লীগের প্রার্থী হিসেবে আমি ১৯৯১, ১৯৯৬, ২০০১ এবং ২০০৮ সালের নির্বাচনে কালকিনি উপজেলা ও মাদারীপুর উপজেলার ৫টি ইউনিয়ন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়ে আসছি।”১৬
২০১২ খ্রিস্টাব্দের ফেব্র“য়ারি মাসে গ্রন্থটি যখন প্রকাশিত হয় তখন সৈয়দ আবুল হোসেন প্রতিষ্ঠিত বিশ্ববিদ্যালয় কলেজের সংখ্যা ছিল একটি। এখন তিনটি। এ কয়েক মাসের মধ্যে তিনি স্বীয় একক প্রচেষ্টায় প্রত্যন্ত গ্রাম অঞ্চলে আরও দুটি কলেজকে বিশ্ববিদ্যালয় কলেজে উন্নীত করেছেন। বাংলাদেশে এমন আর কোন নজির নেই। কালকিনি সৈয়দ আবুল হোসেন বিশ্ববিদ্যালয় কলেজ ছাড়া তিনি যে দুটি কলেজকে বিশ্ববিদ্যালয় কলেজে উন্নীত করেছেন সে দুটি কলেজ হলো : (১) মাদারীপুর সদর থানার খোয়াজপুর গ্রামে অবস্থিত সৈয়দ আবুল হোসেন কলেজ এবং কালকিনি উপজেলার ডাসার গ্রামে অবস্থিত শেখ হাসিনা একাডেমি এন্ড উইমেন্স কলেজ। সরকার যখন কলেজ দুটিকে বিশ্ববিদ্যালয় কলেজে উন্নীত করে তখন সৈয়দ আবুল হোসেন মন্ত্রী ছিলেন না; কলেজ দুটির সামগ্রিক অবকাঠামো, অবয়ব, শিক্ষার মান ও অনবদ্য পরিবেশ বিবেচনায় নীতিমালার আলোকে বিশ্ববিদ্যালয় কলেজে উন্নীত করা হয়েছে। কাজ করতে হলে মন্ত্রী হওয়া যে অত্যাবশ্যক নয় তার জলন্ত প্রমাণ সৈয়দ আবুল হোসেন। তিনি মন্ত্রীত্ব হতে পদত্যাগ করার পরও দেশ ও জাতির শিক্ষা ব্যবস্থায় অনবদ্য অবদান রেখে তিনি প্রমাণ করে দিয়েছেন যে, ব্যক্তি আবুল হোসেন মন্ত্রী আবুল হোসেনের চেয়ে অনেক বেশি যোগ্য, সামর্থ্যবান ও কর্মোদ্যম।
শুধু শিক্ষা কেন, প্রশাসনিক উন্নয়নের ক্ষেত্রেও সৈয়দ আবুল হোসেন আপন আলোয় চিরন্তন।মন্ত্রীত্ব হতে পদত্যাগ করার পর তার জনকল্যাণমূলক কাজের গতি কোনভাবে কমেনি। বইটি প্রকাশকালে ডাসার ছিল একটি ইউনিয়ন। সৈয়দ আবুল হোসেনের প্রচেষ্টায় ডাসার এখন পূর্ণাঙ্গ থানা। গত ২০১৩ খ্রিস্টাব্দের ২ মার্চ মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নবগঠিত ডাসার থানার শুভ উদ্বোধন ঘোষণা করে সৈয়দ আবুল হোসেনের অনবদ্য কৃতিত্বের স্বীকৃতি প্রদান করেন। 
সৈয়দ আবুল হোসেনের নির্বাচনী এলাকা মাদারীপুর-৩ কালকিনি উপজেলা এবং মাদারীপুর সদর উপজেলার ৫টি থানা যথা : মোস্তফাপুর, খোয়াজপুর, কেন্দুয়া, ঘটমাঝি এবং ঝাউদি ইউনিয়ন নিয়ে বিস্তৃত। তাঁর নির্বাচনী এলাকার আইনÑশৃঙ্খলা, যোগাযোগ অবকাঠামো, অধিবাসীগণের জীবনযাত্রার মান এবং মৌলিক চাহিদার প্রাচুর্য্য দেশের অনুরূপ অন্যান্য এলাকার চেয়ে যে কোন বিবেচনায় সন্তোষজনক। সৈয়দ আবুল হোসেনের বিচক্ষণ নেতৃত্ব ও নিঃস্বার্থ জনকল্যাণমূলক কাজের ফলে তার পুরো নির্বাচনী এলাকা আধুনিকতার মহারথে সাবলীল গতিতে এগিয়ে। নিরাপত্তা ও শান্তি বিবেচনায় তার নির্বাচনী এলাকা আদর্শস্থানীয় হিসেবে বিবেচিত।

১. আমার নেতা, তুলনাহীন মর্যাদা, ইকবাল হোসেন।
২. ড. আখতারুল কবীর, তার চেম্বারে এক সাক্ষাৎকারে; তারিখ- ৩/৬/২০১০ খ্রিস্টাব্দ। 
৩. পঞ্চম জাতীয় সংসদ সদস্য প্রামাণ্য গ্রন্থ, সম্পাদনা আহমাদ উল্লাহ, পৃষ্ঠা- ২১৯।
৪. মাঠ জরিপে প্রাপ্ত তথ্য।
৫. সিরাজ উদ্দীন আহমেদ-এর মাদারীপুর জেলার ইতিহাস গ্রন্থে সৈয়দ আবুল হোসেনের 
লেখা ভূমিকায়।
৬. সৈয়দ আবুল হোসেন: আধুনিক কালকিনির বিনির্মাতা অধ্যক্ষ খালেকুজ্জামান, কালকিনি 
বিশ্বদ্যিালয় কলেজ।
৭. ফরহাদ হোসেন, সাবেক জেলাপ্রশাসক, মাদারীপুর, তিনিই এ শহিদ মিনারটি ১৯৯১ 
খ্রিস্টাব্দে উদ্বোধন করেছিলেন।
৮. কালকিনি উপজেলা প্রশাসনের নথি হতে সংগৃহীত।
৯. গণতন্ত্র নেতৃত্ব ও উন্নয়ন, সৈয়দ আবুল হোসেন, পৃষ্ঠা- ৮০ তারুণ্য ও শিক্ষা।
১০. সিরাজ উদ্দীন আহমেদ, মাদারীপুর জেলার ইতিহাস, পৃষ্ঠা ৪৫৯।
১১. পঞ্চম জাতীয় সংসদ সদস্য প্রামাণ্য গ্রন্থ, সম্পাদনা আহমাদ উল্লাহ, পৃষ্ঠা- ২১৯।
১২. সৈয়দ আবুল হোসেন নিজ এবং কালকিনির যুদ্ধকালীন কমান্ডার ও কমান্ডার কালকিনি 
উপজেলা কমান্ড এস্কান্দার শিকদার।
১৩. ড. মো : আবদুল জলিল: সহযোগী অধ্যাপক, আন্তর্জাতিক ইসলামি ইউনিভার্সিটি, 
মালেশিয়া; গবেষক ও লেখক।
১৪. পঞ্চম জাতীয় সংসদ সদস্য প্রামাণ্য গ্রন্থ, সম্পাদনা আহমাদ উল্লাহ, পৃষ্ঠা- ২১৯।
১৫. পঞ্চম জাতীয় সংসদ প্রামাণ্য গ্রন্থ, সুচয়ন প্রকাশন, আগস্ট- ১৯৯২, পৃষ্ঠা ২১৯।
১৬. সিরাজ উদ্দীন আহমেদ-এর মাদারীপুর জেলার ইতিহাস গ্রন্থে সৈয়দ আবুল হোসেনের 
লেখা ভূমিকায়।

জনতার চোখে সৈয়দ আবুল হোসেন
আমরা জানি, সৈয়দ আবুল হোসেন একজন প্রতিষ্ঠিত ব্যবসায়ী, শিল্পপতি, ব্যাংকার। নিজ হাতে গড়া সাকো ইন্টারন্যাশনাল দেশের পরিধি ছড়িয়ে আন্তর্জাতিক পরিধিতে বিস্তৃত। তিনি রাজনীতিক, এমপি এবং মন্ত্রী। বিত্ত ও চিত্তে আকাশের মতো উদার। খ্যতিমান প্রাবন্ধিক, বিচক্ষণ বিশ্লেষক। বংশে বড়, কর্মে পরিচ্ছন্ন। চৌকষ কাজে, বিনয়ী ব্যবহারে। দর্শনে স্বচ্ছ। যারা সৈয়দ আবুল হোসেনকে কাছ হতে দেখেন তারা তাঁকে এভাবে মূল্যায়ন করেন। যে সকল মানুষ, বিশেষ করে, তাঁর নির্বাচনী এলাকার সাধারণ মানুষ, যাঁরা তাঁকে কাছ হতে দেখার সুযোগ বেশি পাননি সে সকল মানুষের দৃষ্টিতে সৈয়দ আবুল হোসেন কেমন তা জানা প্রয়োজন ছিল। এটি জানার জন্য তাঁর নির্বাচনী এলাকার প্রত্যন্ত অঞ্চলে একটি গবেষণা জরিপ পরিচালনা করা হয়। এ জরিপে কৃষক, কুলি, মজুর, জেলে, রিক্সাচালক ও ভিক্ষুক হতে শুরু করে শিক্ষক, ছাত্র, পেশাজীবী, রাজনীতিবিদ ও জনপ্রতিনিধিগণও অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। জরিপে প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে আলোচ্য অধ্যায় চয়িত।
মাদারীপুর জেলা শাখার যুবলীগ নেতা এমদাদুল হক সর্দার। তার কাছে সৈয়দ আবুল হোসেন একজন অসাধারণ নেতা। কেন? এ প্রশ্নের উত্তরে তিনি বললেন: সৈয়দ আবুল হোসেন জাতিকে শিক্ষিত করার প্রত্যয়ে অনড়। যে কাজ গত ৫০০ বছরে কালকিনির সব লোক সম্মিলিতভাবে পারেননি, সৈয়দ আবুল হোসেন তা দশ বছরে একাই সম্পন্ন করতে সক্ষম হয়েছেন। তাই তিনি আমার কাছে অসাধারণ নেতা। নেতার সব গুণাবলী তাঁর মধ্যে রয়েছে। কালকিনির ইতিহাসে তাঁর মতো দেশপ্রেমিক আর জন্মায়নি। ভবিষ্যতেও জন্মাবে কিনা সন্দেহ।
কালকিনি সার্কিট হাউজের নৈশ প্রহরী উজ্জ্বল। সৈয়দ আবুল হোসেনের নাম শুনে শ্রদ্ধায় মাথাটা অবনত করে বললেন: তার মতো লোক আমি দেখিনি। তিনি ভোরে উঠে নামাজ পড়েন। মন্ত্রীরা ক্ষমতার দাপট দেখায়, সন্ত্রাসী লালন করে। সৈয়দ আবুল হোসেনকে ক্ষমতার দাপট দেখাতে কখনও দেখিনি। আমাদের মতো সাধারণ লোকের সাথেও তিনি বিনয়ের সাথে কথা বলেন। কেয়ার-টেকার রেজাউল করিমের ভাষায়: সৈয়দ আবুল হোসেনকে আমি কোনোদিন রাগতে দেখিনি, বড় করে কথা বলতেও দেখিনি। আমাদের দিকে তাকিয়ে হেসে হেসে কথা বলেন। গরিব-দুঃখীদের জন্য তাঁর হাত সবসময় অবারিত থাকে। তিনি কালকিনিবাসীর সার্বজনীন গার্ডিয়ান।
লুৎফর রহমান জেলা পর্যায়ের একজন নেতা। সৈয়দ আবুল হোসেন সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বললেন: কালকিনির মাটি ও মানুষের সাথে তাঁর সম্পর্ক নিবিড়। কালকিনির জনগণ তাঁকে কত ভালোবাসে, তা তিনি নিজেও জানেন না। কালকিনি সৈয়দ আবুল হোসেনকে বেশি দিয়েছে নাকি সৈয়দ আবুল হোসেন কালকিনিকে বেশি দিয়েছে? এর উত্তরে লুৎফর সাহেব বললেন: কালকিনিকেই সৈয়দ আবুল হোসেন বেশি দিয়েছেন। ১৯৮০ খ্রিস্টাব্দ হতে কালকিনির জন্য, কালকিনির জনগণের জন্য যে অর্থ তিনি ব্যয় করেছেন তা ব্যবসায় লাগালে তিনি আরও তিনটি সাকো প্রতিষ্ঠা করতে পারতেন। অথচ এ দানের পেছনে তাঁর কোনো রাজনীতিক উদ্দেশ্য ছিল না। তিনি কোনো দিন এমপি হতে চাননি। কালকিনির আপামর জনগণ অনশন করে তাকে এমপি ইলেকশনে রাজি করিয়েছে।
একজন ক্যান্সার আক্রান্ত রোগী। নাম প্রকাশ না-করে বললেন: আমি বর্তমান প্রধানমন্ত্রী ও তৎকালীন বিরোধীদলীয় নেত্রী শেখ হাসিনার বডিগার্ড ছিলাম। এখন ক্যান্সারে আক্রান্ত। আমার চিকিৎসার জন্য সৈয়দ আবুল হোসেন আমাকে নগদ এক লক্ষ টাকা দিয়েছেন। এ কথা আমি ভুলব না। আমি হয়ত বাঁচব না কিন্তু সৈয়দ আবুল হোসেন আমার মৃত্যুকে তাঁর দয়া দিয়ে জীবনের আলোয় ভরিয়ে দিয়েছেন। শুধু আমাকে নয়, অনেক লোককে তিনি এমন সাহায্য করেছেন। তিনি তাঁর দানকে গোপন রাখতে চান। এমনভাবে দান করেন যেন, দাতা আর গ্রহীতা ছাড়া আর কেউ জানতে না-পারেন।
শেখ হাসিনা উইমেন্স কলেজ এন্ড একাডেমি-এর বাবুর্চি লুৎফর রহমান হাওলাদার। তার কাছে প্রশ্ন ছিল: সৈয়দ আবুল হোসেন কেমন মানুষ? আবেগাপ্লুুত কণ্ঠে তিনি বললেন, ‘সৈয়দ আবুল হোসেন মানুষ নন, ফেরেশতা। কলেজ পরিদর্শনে আসলে আমাদের রান্নাঘরে চলে আসেন। মাথায় হাত দিয়ে জিজ্ঞাসা করেন, কোনো অসুবিধা হচ্ছে না তো!’ শিক্ষার জন্য তিনি নিজের সর্বস্ব বিলিয়ে দিতে প্রস্তুত থাকেন।
খুলনা নিবাসী শেখ হাসিনা উইমেন্স কলেজ এন্ড একাডেমির পদার্থ বিজ্ঞানের অধ্যাপক শিবপদ মণ্ডলের মতে, সৈয়দ আবুল হোসেন একজন আদর্শ মানুষ। তাঁর চরিত্রে যে গুণাবলী রয়েছে তার সহস্রাংশও কারও মধ্যে প্রকাশ পেলে তিনি মহামানব হয়ে উঠতে পারেন। নারী শিক্ষার প্রতি সৈয়দ আবুল হোসেনের দৃষ্টিভঙ্গি অত্যন্ত বাস্তবসম্মত। সৈয়দ আবুল হোসেন বলেন, আমি চাই না নারীরা শুধু পাশ করুক; আমি চাই পাশের সাথে সাথে তারা কিছু জেনে পাশ করুক। তাদের পাশ যেন শুধু অলংকার না হয়, পাশ যেন তাদের সত্যিকার ক্ষমতায়নে সহায়ক এবং স্বনির্ভর হিসেবে গড়ে তুলতে পারে।
মো. মোস্তাফিজুর রহমান শেখ হাসিনা একাডেমি এন্ড উইমেন্স কলেজের ইসলামিক স্টাডিজের শিক্ষক। বাড়ি কুষ্টিয়া। তাঁর মতে সৈয়দ আবুল হোসেন শিক্ষার আলো, বিশেষ করে, নারী শিক্ষাকে প্রত্যন্ত এলাকায় ছড়িয়ে দেয়ার জন্য অজপাড়া গায়ে মহিলা কলেজ প্রতিষ্ঠা করেছেন। এ কলেজের ছাত্রছাত্রীদের হোস্টেলে থাকা-খাওয়া হতে, এমনকি ক্ষেত্র বিশেষে যাবতীয় ব্যয় তিনি বহন করেন। এটি আমাকে বিমোহিত করেছে। আমি নিজ দেশ ছেড়ে এখানে পড়ে আছি। তাঁর মহান কাজের সহযোগী হতে পারায় নিজেকে ধন্য মনে হচ্ছে। এমন লোকের সহযোগী হতে পারা যে কোনো মানুষের জন্য ভাগ্যের ব্যাপার।
সৈয়দ আলমগীর কালকিনি উপজেলা ভূমি অফিসের এমএলএসএস। তাঁকে সৈয়দ আবুল হোসেন সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করতেই তিনি শ্রদ্ধায় নুইয়ে পড়েন। জোরালো কণ্ঠে বললেন, ‘আমি একজন জঘন্য খারাপ লোক ছিলাম। সৈয়দ আবুল হোসেন আমাকে মানুষ করেছেন। তাঁর বদান্যতায় আমার এক ছেলে এখন গ্র্যাজুয়েট। সৈয়দ আবুল হোসেন কালকিনিতে জন্ম না নিলে আমার ছেলের মতো হাজার হাজার ছেলে উচ্চ শিক্ষা হতে বঞ্চিত হত। আমি প্রত্যহ পাঁচ বার নামাজ পড়ে তাঁকে দোয়া করি।’
মীরা বাড়ির আনিসুর রহমানের বয়স পঁয়ষট্টি। কোনো কাজ করতে পারেন না। লুঙ্গি পরে রাস্তার পাশে চায়ের দোকানের সামনে একটি টুলে বসে বিড়ি টানছিলেন। তাকে জিজ্ঞাসা করা হলো: সৈয়দ আবুল হোসেনকে আপনার কেমন লাগে? তিনি বললেন, ভালো লাগে। কেন? এ প্রশ্নের উত্তরে আনিসুর রহমান বললেন, তিনি ভালো লোক তাই ভাল লাগে। তিনি এত ভালো যে কেন ভালো লাগে বলতে পারব না। তিনি আমাদের চামড়ার মতো, আমাদের মাংশের মতো, আমাদের রক্তের মতো, চোখের মতো। এ রাস্তা, এ দোকান, এ কলেজ সব আবুল হোসেনের অবদান। তাঁকে বাদ দিলে কালকিনি আমার মতো অথর্ব এক বুড়ো। আল্লাহ্ তাঁকে আরও বড় করুক।
আবু সাইদ মো. দিদারুল আলম ডি কে সৈয়দ আতাহার আলী একাডেমি এন্ড কলেজের শিক্ষক। ডাক নাম মুরাদ। তিনি বললেন: শিক্ষকের প্রতি সৈয়দ আবুল হোসেনের শ্রদ্ধা অপরিসীম। ঢাকায় তাঁর সাথে দেখা করতে গেলে যতই ব্যস্ত থাকুন, সব ব্যস্ততা ছেড়ে আমাদের সময় দেন। শিক্ষকদের প্রতি তাঁর সম্মান, শ্রদ্ধা ও মমত্ব প্রবাদপ্রতীম। তিনি বলেন: শিক্ষা জাতির মেরুদণ্ড, শিক্ষার মেরুদণ্ড শিক্ষক। তাই শিক্ষাকে কার্যকরভাবে পরিব্যাপ্ত করতে হলে শিক্ষককের যথাযথ মর্যাদা নিশ্চিত করতে হবে। অন্যথায় জাতি মূর্খ হয়ে থাকবে। শিক্ষকের প্রতি সৈয়দ আবুল হোসেনের এমন শ্রদ্ধা আমাকে অভিভূত করে, শিক্ষকের মর্যাদা রক্ষায় উদ্বুদ্ধ করে। শিক্ষক নিয়োগে তিনি মেধা ও যোগ্যতা ছাড়া আর কিছু চিন্তা করেন না।
আলমগীর সর্দারের বাড়ি পাঙ্গাসিয়া। তিনি একজন দিনমজুর। কথায় কথায় এক ফাঁকে বলে ওঠেন: সৈয়দ আবুল হোসেন ছাড়া আর কেউ এখানে এমপি হবে না। তিনি যদি মারা যান তার ছেলেকে আমারা এম পি বানাব। তার কোনো ছেলে নেই বলতে আলমগীর সর্দার বললেন: ছেলেমেয়ে একই কথা। তার বংশের কলাগাছ দাঁড়ালেও এমপি হবে। তিনি কি আপনার কোনো উপকার করেছেন? এ প্রশ্নের জবাবে তিনি বললেন, দেশের উপকার করাই আমার উপকার। তিনি না থাকলে আমি কি এ রাস্তা পেতাম, আপনি কি গাড়ি চড়ে ঢাকা হতে আসতে পারতেন? আমি দিনমজুর কিন্তু আমার মেয়ে কলেজে পড়ে। তিনি আমার মেয়ের শিক্ষা সংক্রান্ত সব খরচ বহন করছেন।
এনায়েতনগর ইউনিয়নের মাঝেরকান্দির মনির হোসেন একজন সাধারণ লোক। তাকে জিজ্ঞাসা করা হলো: আপনি সৈয়দ আবুল হোসেনকে চেনেন? আকাশের দিকে তাকিয়ে তিনি বললেন, ‘ঐ দেখুন আকাশ। ওটাকে চেনেন? তিনি আমাদের জীবনের আকাশ, আমাদের বাতাস। তাকে ছাড়া আমরা কিছু বুঝি না।’ মনির হোসেনের কাছে এমন উপমা অবিশ্বাস্য। আসলেই কালকিনির মানুষের কাছে সৈয়দ আবুল হোসেন আকাশের মতো বিশাল।
দেলোয়ার হোসেন কালকিনি সৈয়দ আবুল হোসেন বিশ্ববিদ্যালয় কলেজের হিসাব বিজ্ঞান বিভাগের প্রভাষক। বাড়ি ঝিনাইদহ। তিনি বললেন, কোনো বেসরকারি কলেজে তদ্বির ছাড়া, ঘুষ ছাড়া চাকুরি হয় এটা আমি বিশ্বাস করতাম না। ঝিনাইদহ হতে এসে এখানে কোনো তদ্বির ছাড়া শুধু মেধার জোরে চাকুরি পেলাম। এটি এখনও বিশ্বাস করতে কষ্ট হয়। সৈয়দ আবুল হোসেন আমার ধারণা পাল্টে দিয়েছেন। তেমনি পাল্টিয়ে দিয়েছেন আমার মতো অনেকের সনাতন ধারণা। তাঁর মতো সৎ, নির্লোভ ও শিক্ষানুরাগী ব্যক্তি বাংলাদেশে আর আছে কিনা জানি না।
সবুজ হোসেন একজন গ্র্যাজুয়েট। গরিব ঘরের ছেলে। সৈয়দ আবুল হোসেন সম্পর্কে তিনি বললেন, ‘এ লোকটি আমাদের ত্রাণকর্তা। তিনি জন্মগ্রহণ না-করলে আমি গ্র্যাজুয়েট হতে পারতাম না। তিনি কলেজ প্রতিষ্ঠা না করলে আমি পিতা-মাতার মতো আমিও মূর্খ থেকে যেতাম। আমি প্রাইমারি স্কুলের শিক্ষকের চাকরির জন্য দরখাস্ত করেছিলাম। লিখিত পরীক্ষায় পাশ করেছি। মন্ত্রী মহোদয়কে বলবেন, আমার জন্য যেন একটু দোয়া করেন। আমি যেন প্রাইমারি স্কুলের শিক্ষকতার চাকুরিটা পেয়ে যাই। বলবেন তো!
আবুল বাশার, বাড়ি রাজদি, পেশা শিক্ষকতা। আবুল হোসেনের সাথে তার কোনোদিন কথা হয়নি। দূর হতে দেখেছেন। তবু তিনি সৈয়দ আবুল হোসেনের ভক্ত। তিনি বললেন, বর্তমান যুগে তাঁর মতো মানুষ হয় না। সৈয়দ আবুল হোসেনের হিংসা নেই, প্রতিহিংসা নেই। শত্র“কে বন্ধু বানিয়ে চিরদিনের মত অবসান ঘটান শত্র“তার। রমজানপুরে আওয়ামী লীগ- বিএনপি-এর মধ্যে একবার তুমুল সংঘর্ষ হয়েছিল। আওয়ামী লীগের সদস্যরা সৈয়দ আবুল হোসেনকে বিএনপি-এর লোকদের উচিত শাস্তি দেয়ার অনুরোধ করেন। সৈয়দ আবুল হোসেন ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাকে বললেন, ‘এমনভাবে মীমাংসা করবেন যাতে বিএনপি-দলীয় লোকজন নিজেদের বঞ্চিত না ভাবেন। আমার দলের লোক বঞ্চিত ভাবলে আমার আপত্তি নেই। কারণ তারা ক্ষমতাসীন। বিএনপি-র লোকজন ন্যায় বিচার হতে যেন বঞ্চিত না-হয়। আইন অনুযায়ী কাজ করবেন।’
পাঙ্গাসিয়ার জাহিদুর রহমান সৈয়দ আবুল হোসেনের একজন ভক্ত। সৈয়দ আবুল হোসেনের বক্তব্য তাঁকে মন্ত্রমুগ্ধ করে রাখে। তার ভাষণ খুব সুন্দও, প্রতিটি কথা হৃদয় কেড়ে নেয়ার মতো। বক্তব্যে সৈয়দ আবুল হোসেন নিন্দুকদের উদ্দেশে একটি কথা প্রায় বলে থাকেন। সেটি হলো: নিন্দুকেরে বাসি আমি সবার চেয়ে ভালো, যুগ জনমের বন্ধু আমার আঁধার ঘরের আলো। তিনি শুধু বক্তব্যে নয়, কাজের মধ্য দিয়েও এটি প্রমাণ করেন। যারা এক সময় তাঁর ঘোর বিরোধী ছিল, তারা এখন তাঁর বন্ধু। সৈয়দ আবুল হোসেন ভালোবাসা দিয়ে সকল শত্র“কে বন্ধু বানিয়ে নিয়েছেন।
পাঙ্গাসিয়ার সেকান্দর আলী উকিল একজন নিরীহ মানুষ। বয়স পঁচাত্তর। ভালোভাবে কথা বলতে পারেন না। অস্পষ্ট কণ্ঠে বললেন: সৈয়দ আবুল হোসেন গরিবের বন্ধু। জনারদন্দির মোশাররফ হোসেন হাওলাদার-এর বক্তব্য অবাক করার মতো, ‘সৈয়দ আবুল হোসেন এত বড় মানের মানুষ যে, তাঁর সম্পর্কে মন্তব্য করার মতো জ্ঞান আমার নেই। কালকিনির তিন লক্ষ লোক সম্পর্কে বলা সম্ভব হতে পারে কিন্তু সৈয়দ আবুল হোসেন সম্পর্কে নয়। কারণ তিনি কালকিনির তিন লক্ষ লোকের অভিভাবক।’ তিনি কালকিনিতে জন্মগ্রহণ না-করলে কালকিনির বর্তমান উন্নয়ন আরও একশ বছরেও হতো না। তিনি আমাদের কমপক্ষে একশ বছর এগিয়ে দিয়েছেন।
দক্ষিণ রাজর্দির আবদুল মালেক একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা। সৈয়দ আবুল হোসেনকে তিনি শান্তির পায়রা অভিহিত করে বললেন, ‘কালকিনি এক সময় ছিল সন্ত্রাসী এলাকা। সর্বহারাদের ভয়ে কেউ বের হতে পারত না। দিন-দুপুরে খুন হতো। এখন কালকিনি সন্ত্রাসবিহীন এলাকা। চাঁদাবাজি নেই, টেন্ডারবাজি নেই, নেই মারামারি ও সর্বহারার উৎপাত। এখানে সব দলের নেতা-কর্মীরা সৌহার্দ্যময় পরিবেশে পরম সম্প্রীতিতে বাস করেন। গত দশ বছরের আইন শৃঙ্খলার খতিয়ান দেখলে সহজে বোঝা যাবে, এ উপজেলার অপরাধ কত কমেছে।’ এগুলো করার জন্য সৈয়দ আবুল হোসেন কাউকে হাজতে দেননি। শুধু ভালোবাসা দিয়েছেন।
তিনি মুক্তিযোদ্ধা। আওয়ামী লীগ সমর্থক নন, তারপরও আবুল হোসেনকে শ্রদ্ধা করেন। নাম প্রকাশ না-করার শর্তে বললেন, আবুল হোসেন একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা। স্বাধীনতা যুদ্ধে তাঁর অবদান অসামান্য। মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন তিনি মুক্তিযোদ্ধাদের প্রভূত সাহায্য সহযোগিতা করেছেন। একদিন রাজাকারদের সহায়তায় পাক সেনারা তাঁকে ধরে নিয়ে যায়। মু্িক্তযোদ্ধাদের খবর দেয়ার জন্য তার উপর প্রচণ্ড অত্যাচার চালানো হয়। কিন্তু তিনি কোনো কিছু ফাঁস করেননি। তাদের অত্যাচারে সৈয়দ আবুল হোসেনের বাম হাত ভেঙে যায়। এ চিহ্ন তাঁর হাতে এখনও স্পষ্ট। এজন্য তিনি সবসময় ফুল-শার্ট পরেন। এ বিবেচনায় তিনি একজন যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধাও বটে।
মো. সাইদুর রহমানের বাড়ি ভবানীপুর। ইজি ওয়াকারের ড্রাইভার। তার তিন মেয়ে স্কুলে পড়েন, ছেলে কলেজে। কীভাবে সম্ভব? তার সহজ উত্তর, কালকিনিতে সৈয়দ আবুল হোসেনের এলাকার লোকের জন্য এটি খুবই সহজ। তিনি শিক্ষার সকল উপায় এবং উপকরণকে আমাদের কাছে সহজলভ্য করে দিয়েছেন। আজম একজন মাছ বিক্রেতা। তিনি বললেন, ‘আমি কোনোদিন তাঁকে দেখি নি তবে যেখানে যাই সেখানে তাঁকে পাই- রাস্তায়, শিক্ষায়, রাজনীতিতে, অফিসে, আদালতে, কথায় এবং সবখানে।’ তার কথা শেষ হবার সাথে সাথে বাঁশগাড়িয়ার জেলে তাপস জলদাস বললেন, ‘তিনি ঈশ্বরের মতো সর্বত্র বিরাজমান। তাঁর ছায়া সবাতে সমভাবে পরিব্যাপ্ত। আমাদের কাছে তিনি দেবতা। ঈশ্বর তার মঙ্গল করুন।’
বাংলাদেশ ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় কমিটির সহসভাপতি রফিক কোতোয়াল বলেন, তিনি অত্যন্ত পাংচুয়াল। প্রতিদিন সকাল নয়টার পূর্বে মন্ত্রণালয়ে আসেন। যেখানে যখন যাবার সময় নির্ধারিত থাকে, ঠিক সে সময় হাজির হন। তিনি ব্যবহারে বিনয়ী, আচরণে অমায়িক। কাজের প্রতি একাগ্রতা, উন্নয়নের কৌশল প্রণয়নে বিচক্ষণতা আমাকে আকৃষ্ট করে। আওয়ামী লীগের প্রতি তাঁর ভালোবাসা এবং উদার সহায়তার যে প্রমাণ আমি পেয়েছি তা স্বচক্ষে না-দেখলে বিশ্বাস করার মতো নয়। তিনি নেত্রী আর দলের প্রতি এত অনুগত যে, নেত্রী বললে হাসতে হাসতে জীবনটা পর্যন্ত দিয়ে দিতে পারেন। রাজনীতিবিদ হিসেবে তাঁর মতো উদার ও সহনশীল নেতা আমাদের এখন বড় প্রয়োজন।
সিডি খান ইউনিয়নের নুরুল ইসলাম ফুটপাথে বসে আতর বিক্রি করছিলেন। তিনি বললেন, ‘আবুল হোসেন ব্যক্তিগতভাবে আমার জন্য কিছুই করেননি। তবে আমার ছেলেমেয়ে, আমার আত্মীয়-স্বজন যারা লেখাপড়া করার কথা কোনো দিন ভাবেনি, তারা এখন পান্তাভাত খেয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ে। আমার ছেলেও তাঁর কলেজ হতে ডিগ্রি পাশ করেছে। আমার ছেলে-মেয়েরা তার গড়া রাস্তায় হাঁটে, তার গড়া স্কুলে পড়ে। এর চেয়ে বেশি কী করবেন তিনি!
মাদারীপুর জেলার প্রাক্তন জেলাপ্রশসক আবদু সাত্তার। আবুল হোসেন সম্পর্কে তার মন্তব্য অত্যন্ত মনোমুগ্ধকর। তিনি বললেন, ‘যে বয়সে বাঙালিরা আকামে অর্থ ব্যয় করে, কুপথে খরচ করে, ফুর্তিতে মেতে থাকে, বিদেশ গিয়ে টাকা উড়ায়, সে বয়সে সৈয়দ আবুল হোসেনের মতো বিপুল অর্থের মালিক শহর-ছেড়ে প্রত্যন্ত গ্রাম এলাকায় ছুটে এসেছেন দুর্গতদের সেবায়; এ আমার কাছে অসাধারণ মনে হয়েছে। তিনি বিয়ের আগে হজ করেছেন। হজ অনেকে করেন। আমি মনে করি তিনি নিজের বিবেককে আরও সচেতন ও সতর্ক রাখার জন্য অল্প বয়সে হজ করেছেন। আমি স্কুল কলেজে ছাত্রদের যে পুরস্কার দিতাম তা ক্রয় করে দিতেন আবুল হোসেন। বক্তৃতায় বলতাম, আমার দেয়া জিনিসগুলো কিনে দিয়েছেন সৈয়দ আবুল হোসেন। আমার আনন্দ আমি একজন ভালো লোকের জিনিস আপনাদের হাতে তুলে দিতে পারছি।’
টুঙ্গীপাড়ার হাজি মো. চান মিয়াকে জিজ্ঞাসা করা হলো, ‘সৈয়দ আবুল হোসেনের একটি ভালো দিক বলবেন? তিনি বললেন: তার ভালো দিক এত বেশি যে, আমি তার ভালো দিকের কথা এত অল্প সময়ে বলতে পারব না। তবে তার কোনো খারাপ দিক নেই, এটি নির্দ্বিধায় বলতে পারি। তার ভালো দিক এত বেশি যে, তা বলতে অনেক সময় লাগবে। অনেক দিন। এর চেয়ে এক কথায় বলি, তিনি সর্বাঙ্গীন সুন্দর মনের একজন আদর্শ মানুষ।’
জরিপের আরও অনেকের কথা লেখা যেত। কিন্তু পরিসর বড় করার সুযোগ নেই। বাকি যাদের কথা পৃথকভাবে লেখা হলো না তাদের বক্তব্য বিশ্লেষণ করে জরিপ দল সৈয়দ আবুল হোসেন সম্পর্কে নিম্ন সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছে: সৈয়দ আবুল হোসেন ঝড়ের আশ্রয়, বিপদের বন্ধু। তিনি ছাতার মতো সবার মাথার উপর স্থির অপলক। তিনি রোদের আশ্রয়। যার ছাতা যত বড় সে ছাতায় তত বেশি লোক আশ্রয় নিতে পারে। বিশাল ছাতা বহন করার যোগ্যতা যার আছে, সেই বিশাল ছাতা বহন করতে পারে। আবুল হোসেনের বিশাল ছাতা বহন করার ক্ষমতা রয়েছে। সৈয়দ আবুল হোসেনের এ ছাতা শুধু বিশাল নয়, মহাবিশাল। তাঁর কাছে সবাই সমান। শিকারমঙ্গলে জামায়াতের লোক বেশি। তারা সবসময় সৈয়দ আবুল হোসেনের বিরোধিতায় অবতীর্ণ হন। নির্বাচনে জেতার পর তিনি প্রথমে শিকারমঙ্গলের উন্নয়নে হাত দিয়েছেন। এত বড় বিশাল মনের অধিকারী ব্যক্তিকে কী বলে সম্বোধন করা যায় তা আমাদের জানা নেই। এক কথায় বলতে পারি তিনি একজন মহামানব।

সৈয়দ আবুল হোসেনের জীবনের 
মহামানবীয় কয়েকটি ঘটনা
উইলিয়াম ওয়ার্ডস ওয়ার্থ-এর একটি বিখ্যাত ও স্বতঃসিদ্ধ উক্তি- The best portion of a good man’s life, His nameless and remembered acts of kindness and of love. সৈয়দ আবুল হোসেনের জীবনে মানুষকে দয়া ও ভালোবাসা দেখানোর এমন অনেক ঘটনা আছে যা কেউ জানেন না, দেখেননি। এরূপ ঘটনা অসংখ্য, অগণিত। সুতরাং ওয়ার্ডস ওয়ার্থের ভাষায় বলা যায়Ñ তার পুরো জীবনের সিংহভাগই শ্রেষ্ঠ। প্রত্যেক মহামানবের জীবনে এমন কিছু ঘটনা ঘটে যা সাধারণ মানুষের জীবনে ঘটার অবকাশ হয় না। এ সকল ঘটনা একদিকে শিক্ষণীয় এবং অন্যদিকে জনকল্যাণমূলক। অধিকন্তু, এ সব দুর্লভ ঘটনা পৃথিবীর মানুষকে চিন্তাচেতনা ও মননশীলতায় সমৃদ্ধ করে মানুষের মানবীয় গুণাবলীর লালনে সহায়তা করে। সৈয়দ আবুল হোসেনের জীবনেও এমন কিছু ঘটনা আছে যা শুধু বিস্ময়কর নয়, তারও অধিক। এ সকল ঘটনার কয়েকটি নিচে উল্লেখ করা হলো :

১.
আবদুর রশিদ কালকিনিতে একটা ছোট্ট টং দোকানের মালিক। তিনি সৈয়দ আবুল হোসেন সাহেবের কাছে একটি চিঠি লিখলেন। চিঠির ভাষা যা মনে আছে বলছি- ‘আপনার কর্মী মজিদ (ছদ্মনাম) আমার দোকান থেকে নগদ টাকা এবং বাকিতে কাপড়-চোপড় কিনিয়া গরিবের মধ্যে বিলি করিয়াছে। বলেছিল টাকা সাহেবের কাছ থেকে আনিয়া পরিশোধ করিবে। অনেকদিন হইয়া গেল আজ পর্যন্ত টাকা পরিশোধ করে নাই। আপনি কালকিনি আসিলে আপনার সামনে দাঁড়াইয়া টাকা চাহিব। না দিলে পেপারে লেখালেখি করিব। মোট পঞ্চাশ হাজার টাকা।’ মজিদ ছিলেন আবুল হোসেন সাহেবের একজন কর্মী। চিঠিটা হাতে নিয়ে সৈয়দ আবুল হোসেন আমাকে বললেন, ‘রশিদ আর মজিদ দু’জনেই সাংঘাতিক দুষ্ট। ষড়যন্ত্র করে কাজটা করেছে, যাতে আমি টাকাটা দেই। দিলে উভয়ে ভাগ করে নেবে। তাদের চালাকি বুঝতে পারলেও আমি টাকা দিয়ে দিয়েছি। তবে তারা বুঝতে পারেনি, তাদের চালাকি আমি ধরে ফেলেছি। আমিও বুঝতে দেইনি। লজ্জা দিলে কী ভালো হতো! নেতা হলে অনেক সময় সমর্থকদের সহানুভূতির দৃষ্টিতে দেখতে হয়। মজিদের দোষ আছে, তবে গুণও তো আছে! কী বলেন মাস্টার সাহেব?’১

২.
জনসভার বক্তব্য নিয়ে আলোচনা হচ্ছিল। সদর উদ্দিন (ছদ্মনাম) সৈয়দ আবুল হোসেনকে বললেন: জনসভায় আপনি এ কথাটা বলেছেন।
সৈয়দ আবুল হোসেন বললেন: আমি বলিনি।
উপস্থিত তিনজন লোক সদর উদ্দিনের পক্ষে সাক্ষ্য দিলেন। প্রত্যেকে উপজেলা পর্যায়ে মোটামুটি গণ্যমান্য ব্যক্তি। আবুল হোসেন কিছুক্ষণ চুপ থেকে তাদের তিনজনের কাছে জানতে চাইলেন: সত্যি কি আমি এমন কথা বলেছি?
তিনজন সমস্বরে বললেন: জি।
সৈয়দ আবুল হোসেন হেসে বললেন, ‘বক্তৃতায় নিজের অজান্তে হয়ত এ কথাটি আমার মুখ দিয়ে বেরিয়ে গেছে। আমার কিন্তু মনে পড়ছে না। আমি একজন, আপনারা তিনজন। একজনের স্মরণশক্তি তিনজনের চেয়ে কম। যদি অমন কথা বলে থাকি তো অজান্তে বলে ফেলেছি। মনে কিছু নেবেন না। আবারও বলছি অমন কথা আমার মুখ দিয়ে বের হবার নয়।’
প্রকৃতপক্ষে সৈয়দ আবুল হোসেন সাহেব অমন কথা বলেননি। ঐ জনসভায় আমি আবদুল আজিজ মাস্টার নিজে উপস্থিত ছিলাম। আমি শুনিনি তারা কীভাবে শুনলেন? পরে সৈয়দ আবুল হোসেন আমার কাছে জানতে চেয়েছিলেন, তিনি অমন মন্তব্য করেছিলেন কিনা। আমি বলেছিলাম, ‘কখনও না।’ সৈয়দ সাহেব বলেছিলেন, ‘আমিও জানতাম তবু তাদের ছোট করতে ইচ্ছা করছিল না। আমি নিজে ছোট হয়ে গেলাম। এটি আমাকে আরও সতর্ক করল। ছোট না-হলে আমি বড় হবার কৌশল রপ্ত করব কীভাবে বলুন তো মাস্টার সাহেব!’২

৩.
খোয়াজপুরে আবুল হোসেন কলেজ প্রতিষ্ঠা হলো। প্রতিষ্ঠাতা সৈয়দ আবুল হোসেন। কলেজের প্রথম ব্যাচের দুই জন ছাত্র সবাইকে অবাক করে দিয়ে জাতীয় মেধা তালিকায় প্রথম ও চতুর্থ স্থান দখল করে নিল। কলেজ এখনও অনুমোদন পায়নি। শিক্ষক-কর্মচারীদের বেতনসহ যাবতীয় খরচ সৈয়দ আবুল হোসেন একাই বহন করে চলেছেন। বিজ্ঞানাগারের যন্ত্রপাতি পর্যাপ্ত নয়। গভর্নিং বডির সদস্যরা অধ্যক্ষ হিসেবে আমাকে বিষয়টি সৈয়দ আবুল হোসেনকে অবগত করানোর পরামর্শ দেন। আমি বলেছিলাম, ‘আর কত চাইব, সব কিছু তো তিনি দিচ্ছেন, লজ্জা করে।’ প্রয়োজন লজ্জা মানে না। একদিন সাকো অফিসে গিয়ে বললাম, ‘কলেজের জন্য সায়েন্সের যন্ত্রপাতি লাগবে।’ একটু থেমে আবার বললাম, ‘অবশ্য পরে হলেও চলবে। তাড়া নেই।’ আমার কথা শেষ হতে না-হতে সৈয়দ আবুল হোসেন বিনয় মিশ্রিত কণ্ঠে বললেন: ‘পরে কেন, এক্ষুনি নয় কেন। আগামীকাল কখনও আসে না স্যার। কত টাকা লাগবে নিয়ে যান। যন্ত্রপাতির জন্য আমার ছেলে-মেয়েরা পড়তে পারবে না, তা হয় না।’৩

৪.
সৈয়দ আবুল হোসেনের একজন ভক্ত, নাম ধরুন আফজাল (ছদ্মনাম)। আর একজন শত্র“। তিনি ইউপি চেয়ারম্যান, নাম ধরুন হিরণ (ছদ্মনাম)। আফজাল জানতে পারল সৈয়দ আবুল হোসেন হিরণকে তার চেয়ে বেশি সাহায্য করেন। ক্ষুব্ধ আফজাল একদিন সৈয়দ আবুল হোসেনকে বললেন, ‘হিরণ সবখানে আপনার বদনাম করে বেড়ায়। সারাক্ষণ আপনার ক্ষতির চিন্তা করে। কীভাবে আপনার বিপদ হয় সে চেষ্টায় ব্যস্ত থাকে। আপনি তাকে একের পর এক সাহায্য করে যাচ্ছেন। শুধু তাকে নয়, যারা আপনার শত্র“, তাদের প্রত্যেককে আপনি একের পর এক সাহায্য করে যাচ্ছেন।
সৈয়দ আবুল হোসেন বললেন, ‘আমি তার উপকার করছি।’ আফজাল বললেন, ‘আমি তো সবসময় আপনার পক্ষে কথা বলি। আপনার ভালো চাই। আপনি আমাকে অত সাহায্য করেন না।’ সৈয়দ আবুল হোসেন বললেন: তুমি আমার উপকার করেছ, আমিও তোমার উপকার করেছি। এটি বিনিময়। হিরণ আমার ক্ষতি করার চেষ্টা করছে, সে আমার শত্র“। তবু আমি তাকে সাহায্য করছি। এটি বিনিময় নয়, উপকার। তোমারটা বাণিজ্য আর তারটা দান। শত্র“র উপকার করে আমি তাকে আমার বন্ধু বানিয়ে নিতে চাই।
কিছুদিন পর আফজাল অবাক হয়ে দেখলেন হিরণ চেয়ারম্যান সৈয়দ আবুল হোসেনের ভক্ত হয়ে গেছে। আরও কিছুদিন অতিবাহিত হবার পর আফজাল হতবাক। কালকিনির যে সকল লোক সৈয়দ আবুল হোসেনকে বন্যায় সাহায্য দিতে বাধা দিয়েছিল এবং কালকিনিতে কলেজ প্রতিষ্ঠায় বিরোধিতা করেছিল তারাও সৈয়দ আবুল হোসেনের পরম ভক্ত হয়ে গেছে।৪

৫.
রাষ্ট্রপতি শাহাবুদ্দিন কালকিনি আসবেন। সৈয়দ আবুল হোসেন স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী। মন্ত্রী মহোদয় কালকিনি সার্কিট হাউজে। একজন লোক অনেকদিন হতে তার সাথে দেখা করতে চাইছিলেন। পারছিলেন না। ঢাকা যাবার সামর্থ্য তার নেই। আজ যেভাবে হোক দেখা করবেই। কিন্তু ভেতরে আসতে পারছিল না। হঠাৎ আবুল হোসেনের চোখ যায় গেইটের দিকে। দেখামাত্র ভিড় ঠেলে ধীরপদে নিচে নেমে সোজা গেইটের কাছে চলে যান। লোকটির হাত ধরে বারান্দায় নিয়ে আসেন। সে ছিল একজন বুড়ো ভিক্ষুক। নাম কানা জলিল। সৈয়দ আবুল হোসেন তাকে বুকে জড়িয়ে ধরলেন। কানা জলিল বলল: আমাকে একশ টাকা দেন। সৈয়দ আবুল হোসেন তাকে একশ টাকা নয়, এক হাজার টাকা দিয়েছিলেন।৫

৬.
জমকালো রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠান। প্রধান অতিথি মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। কঠোর নিরাপত্তা। প্রধানমন্ত্রী আসার সময় হয়ে গেছে। অনুষ্ঠানে সৈয়দ আবুল হোসেনও এসেছেন। প্রবীণ এক লোক সৈয়দ আবুল হোসেনের দিকে এগিয়ে এসে বললেন, ‘আবুল হোসেন, তোমার ব্লেজারটা ভারী সুন্দর। প্রবীণ লোকটির কথা শেষ হতে-না-হতে সৈয়দ আবুল হোসেন নিজের শরীর হতে ব্লেজারটা খুলে প্রবীণ লোকটার গায়ে চড়িয়ে দিলেন। জড়িয়ে ধরে বললেন, ‘আপনাদের জন্যই আমার ব্লেজার এত সুন্দর হয়েছে। আপনারাই আমার ব্লেজারকে সুন্দর করেছেন। আপনাদের স্বীকৃতিই আমার গৌরব। আমি আলো আপনারা সলতে। আপনারা জ্বলেন বলেই আমি আলোকিত। আপনাদের ঋণ শোধ আমার পক্ষে সম্ভব নয়। আপনাদের আলো দিয়ে অন্যকে আলোকিত করতে পারলে ঋণভার হয়ত কিছুটা শোধ হবে।’৬

৭.
২০০১ খ্রিস্টাব্দ। সৈয়দ আবুল হোসেন গাড়িতে। শেরাটনের সামনে সিগন্যাল পেয়ে গাড়ি থেমে যায়। একটা লোক খোঁড়াতে খোঁড়াতে গাড়ির কাছে আসে। তার হাতে কিছু বই, কিছু ম্যাগাজিন। সৈয়দ আবুল হোসেন জানালা নামিয়ে খোঁড়া লোকটার হাতে দশ হাজার টাকা দিলেন। ব্যাপার কী জানতে চাইলে সৈয়দ আবুল হোসেন বলেছিলেন: কিছু দিন আগে এ পথ দিয়ে যাচ্ছিলাম। সিগন্যাল পেয়ে ড্রাইভার গাড়ি থামায়। ঐ লোকটির কাছ হতে একটা ম্যাগাজিন নিই। বাড়ি কোথায় জিজ্ঞাসা করলে জানায় মাদারীপুর। লোকটি খোঁড়া। তবু ভিক্ষা না-করে অনেক কষ্টে হেঁটে হেঁটে বই আর ম্যাগাজিন বিক্রি করছে। আমার ভালো লাগল। বসে বসে এ ব্যবসা করলে কত টাকা লাগবে জানতে চাইলে সে ছয়-সাত হাজার টাকার প্রয়োজন বলে জানায়। আজ দিয়ে দিলাম। বসে বসে ব্যবসা করুক। অত কষ্ট করে হাঁটতে হবে না।৭

৮.
অজয় দাশগুপ্ত। নামকরা সাংবাদিক। কে না চেনে তাকে। তার আরও একটি পরিচয় আছে। তিনি সৈয়দ আবুল হোসেনের সাথে গৈলা স্কুলে একই সাথে পড়েছিলেন। বন্ধু অজয় দাশগুপ্তের ছেলে স্কলারশিপ নিয় আমেরিকা যাবে। আমেরিকা যেতে হলে পর্যাপ্ত ব্যাংক ব্যালেন্স দেখাতে হয়। এত টাকার ব্যাংক ব্যালেন্স দেখানো অজয় দাশগুপ্তের পক্ষে সে মুহূর্তে সম্ভব হচ্ছিল না। এখন উপায়! ঘটনার আগাগোড়া জানতে পেরে সৈয়দ আবুল হোসেন অজয় দাশগুপ্তকে ডেকে নিয়ে বললেন: টাকার জন্য ছেলের স্কলারশিপ বাতিল হতে পারে না। সৈয়দ আবুল হোসেন অজয় দাশগুপ্তের ছেলের নামে পঞ্চাশ লক্ষ টাকার একটা একাউন্ট করে চেক-বহিসহ অন্যান্য কাগজপত্র অজয় দাশগুপ্তের হাতে তুলে দিয়েছিলেন। সৈয়দ আবুল হোসেন এরূপ মহানুভবতার সাথে এগিয়ে না-আসলে ছেলেকে আমেরিকা পাঠাতে পারতেন কিনা সন্দেহ ছিল।৮

৯.
সৈয়দ আবুল হোসেন বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র। তখন ঢাকা হতে কালকিনি যাবার সহজ উপায় ছিল লঞ্চ। ঢাকার লঞ্চ বরিশাল হয়ে মাদারীপুর যেত। একদিন সৈয়দ আবুল হোসেন বাড়ি যাবার জন্য লঞ্চে ওঠেন। অসাবধানতাবশত লঞ্চ ভাড়া দিতে ভুলে যান। বাড়িতে ঢোকার পর লঞ্চ ভাড়া না-দেয়ার কথা মনে পড়ে এবং মনে পড়ার সাথে সাথে কাপড়-চোপড় না-খুলে আবার লঞ্চঘাটে চলে যান। যে লঞ্চে এসেছিলেন সেটি ততক্ষণে চলে গেছে। আর একটি লঞ্চে করে তিনি ঢাকা ফেরেন। ঢাকায় এসে ঐ লঞ্চটি খুঁজে নেন। তারপর প্রাপ্য ভাড়া মিটিয়ে পরের লঞ্চে আবার গ্রামের উদ্দেশ্যে রওয়ানা দেন।৯
১০.
আলহাজ্ব সৈয়দ আবুল হোসেনের ছোট ভাই ডা. সৈয়দ এ হাসানের জবানিতে একটি ঘটনা শোনা যাক- ‘স্বাধীনতা যুদ্ধের অব্যবহিত পরের ঘটনা। যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশ। চারিদিকে অভাব। পাকিস্তানি বাহিনির অত্যাচারে হিন্দুদের অবস্থা শোচনীয়। আমাদের গ্রামের হিন্দুদের অবস্থাও এর বাইরে নয়। এক হতদরিদ্র হিন্দু ভদ্রলোক আমাদের বাড়ির পাশে বর্ষার জলে বড়শি দিয়ে মাছ ধরতেন। সন্ধ্যায় বড়শি দিয়ে যেতেন। সকাল-বেলা এসে মাছ তুলতেন। একদিন সকালে মাছ তুলতে এসে হাজি চাচার ভিটির পেঁপে চুরি করতে যান। আওয়াজ পেয়ে লোকজন বেরিয়ে এসে তাকে বেঁধে রাখে। অনেক লোক জড়ো হয়। খবর পেয়ে আমিও যাই। চোর দেখার আগ্রহই ছিল আলাদা। শুনতাম চোর ধরলে মাথার চুল কেটে দেয়া হয়। আমি আরও কয়েকজন বন্ধু চোরের মাথার চুল কেটে দেই। ঐদিন দাদা (সৈয়দ আবুল হোসেন) ঢাকা হতে বাড়ি এসেছিলেন। আমাকে বাড়ি না-পেয়ে জানতে চান আমি কোথায়। খবর পেয়ে বাড়ি যাই। আমার কাছে ঘটনা শুনে দাদা আঁতকে ওঠেন। তাড়াতাড়ি হাজি চাচার উঠোনে এসে চোরের বাঁধন খুলে দিয়ে আমাদের বাড়ি নিয়ে আসেন। আমাকে দিয়ে চোরের পা ধরিয়ে ক্ষমা চাওয়ান। হাতমুখ ধোয়ার ব্যবস্থা করে চোরকে পেট পুরে খাইয়ে দেন। অতঃপর হাতে টাকা দিয়ে নাপিতের দোকান হতে চুল কাটানোর ব্যবস্থা করেন।১০

১. সূত্র কালকিনি পাইলট উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রাক্তন শিক্ষক আবদুল আজিজ মাস্টার।
২. সূত্র কালকিনি পাইলট উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রাক্তন শিক্ষক আবদুল আজিজ মাস্টার।
৩. সূত্র: মো. তমিজ উদ্দিন. সৈয়দ আবুল হোসেনের শিক্ষক এবং প্রাক্তন অধ্যক্ষ, সৈয়দ 
আবুল হোসেন কলেজ, খোয়াজপুর
৪. সূত্র কালকিনি পাইলট উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রাক্তন শিক্ষক আবদুল আজিজ মাস্টার এবং 
মাঠ জরিপ।
৫. সূত্র : কালকিনি সার্কিট হাউজের কেয়ারটেকার রেজাউল করিম।
৬. এমদাদ হাওলাদার, সহসভাপতি, বাংলাদেশ ছাত্রলীগ কেন্দ্রীয় কমিটি।
৭. ইকবাল হোসেন, ছাত্রনেতা, কালকিনি; তিনি ঐ গাড়িতে সৈয়দ আবুল হোসেনের সাথে 
ছিলেন।
৮. তথ্য সূত্র: অজয় দাশগুপ্ত এবং অজিত; তারিখ ১/৬/২০১০ খ্রিস্টাব্দ।
৯. ড. এ হাসান, সৈয়দ আবুল হোসেনের ছোট ভাই।
১০. ঐ

সৈয়দ আবুল হোসেন : তেজময় সিংহপুরুষ
অহঙ্কার পতনের মূল
খোয়াজপুর সৈয়দ আবুল হোসেন কলেজের অবকাঠামো সম্পন্ন হয়ে গেছে। অনেক ছাত্রছাত্রী ভর্তি হয়েছে। শিক্ষক-শিক্ষিকা নিয়োগও চূড়ান্ত। কলেজ ক্যাম্পাস মুখরিত। তবু সবার মনে একটা দুঃখ খচ্খচ্ করছে। কলেজ অদ্যাবধি এমপিও-ভুক্ত হয়নি। সৈয়দ আবুল হোসেন চেষ্টা করছেন। শিক্ষামন্ত্রী এ কলেজকে এমপিও-ভুক্ত করার প্রচণ্ড বিরোধী। একদিন পত্রিকায় খবর বের হলো- খোয়াজপুর কলেজ সরকার এমপিও-ভুক্ত করবে না। খবর পড়ে ছাত্রছাত্রী আর অভিভাবকদের মাথায় হাত। শিক্ষক-শিক্ষিকাগণ হতাশায় নিমজ্জিত। সৈয়দ আবুল হোসেন ত্রিশ লক্ষাধিক টাকা এ কলেজের পেছনে ব্যয় করেছেন। টাকা ব্যয় না হয় পূরণ করা যাবে। ছাত্রছাত্রীদের জীবনের যে অমূল্য সময় নষ্ট হলো তা তো কোনো কিছু দিয়ে শোধ করা যাবে না। এখন উপায়!
আব্দুল কাদের, আজিজ মাস্টার ও অধ্যক্ষ তমিজ উদ্দিনসহ অনেকে সৈয়দ আবুল হোসেনকে গিয়ে ধরলেন। এখন কী হবে? খোয়াজপুর কলেজকে সরকার অনুমোদন দেবে না। ছাত্রছাত্রী যারা ভর্তি হয়েছে তাদের নাকি ফিরে যেতে হবে। অনেকে হাসাহাসি করছে। ছাত্রছাত্রীদের উত্যক্ত করছে। কী করি? এর চেয়ে তো মরে যাওয়া ভালো। আবুল হোসেন তাদের কথা শুনে কোনোরূপ হতাশ প্রতিক্রিয়া দেখালেন না। হেসে বললেন: আমি কলেজ দিয়েছি, অনুমতি ছাড়া আর সব কিছুতে পরিপূর্ণ। আপনারা ভালোভাবে কলেজ পরিচালনা করুন। বাকিটা আমি দেখছি। আমার নিজের গড়া প্রতিষ্ঠান আমার সন্তানের মতো। আমার সন্তানের অকাল মৃত্যু আমি কিছুতেই মেনে নেব না।
আজিজ মাস্টার বললেন: শিক্ষামন্ত্রী পরিষ্কার বলে দিয়েছেন এ কলেজের অনুমতি তিনি দেবেন না। তিনি শিক্ষামন্ত্রী থাকলে এ অনুমতি হবে না। বিষয়টা জটিল হয়ে গেল না? সৈয়দ আবুল হোসেন আবারও হাসলেন, তার স্বভাবসিদ্ধ অমায়িক হাসি। এ হাসিতে কোনো হতাশা নেই, কোনো ক্ষোভ নেই, কোনো ঘৃণা নেই, আছে শুধু সৃষ্টির উল্লাস, প্রত্যয়ের ঝাণ্ডা। বললেন, ‘কলেজ অনুমতি পাবে। আর শিক্ষামন্ত্রী সাহেব যদি মনে করেন তিনি শিক্ষামন্ত্রী থাকলে আমার কলেজ এমপিও-ভুক্ত হবে না, তাহলে তিনি অন্য মন্ত্রণালয়ে চলে যাবেন।’ আশা-নিরাশার দোলা নিয়ে সবাই ফিরে যান। ঠিক একমাস পর সবাই অবাক বিস্ময়ে দেখলেন, শেখ শহিদ আর শিক্ষামন্ত্রী নেই। গুটি কয়েক শত্র“র মুখে ছাই দিয়ে এবং ছাত্রজনতার মুখে হাসি ফুটিয়ে এ ঘটনার কয়েকদিন পর খোয়াজপুর কলেজ এমপিও-ভুক্ত হয়ে যায়।১

কে বড়?২
আগস্ট, ১৯৮৯। সৈয়দ আবুল হোসেন কলেজ, খোয়াজপুর-এর উদ্বোধন উপলক্ষে একটি ক্রোড়পত্র বের করা হবে। আব্দুল কাদের এবং মমতাজ সাহেব তৎকালীন শিক্ষামন্ত্রী শেখ শহিদের কাছে যান। উদ্দেশ্য ক্রোড়পত্রের জন্য একটি বাণী নেবেন। আব্দুল কাদের সবিনয়ে মাননীয় শিক্ষামন্ত্রীকে তাদের আগমনের উদ্দেশ্য ব্যক্ত করেন। তিনি আব্দুল কাদের সাহেবের পরিচয় জানতে চান। আবদুল কাদের বললেন, ‘আমার বাড়ি আগৈলঝারা। সৈয়দ আবুল হোসেনের মালিকানাধীন সাকো ইন্টারন্যাশনাল লিঃ-এর একজন কর্মকর্তা।’
মাননীয় শিক্ষামন্ত্রী বিরক্তিস্বরে বললেন, ‘আপনার বাড়ি আগৈলঝারা, আপনি কালকিনির কেউ নন। আমার সংসদীয় এলাকায় কলেজ করার জন্য এত মাথাব্যথা কিসের আপনার?’ কাদের সাহেব সবিনয়ে বললেন, ‘শিক্ষার কোনো এলাকা নেই। এটি আলোর মতো। আপনার এলাকায় শিক্ষা প্রতিষ্ঠান হচ্ছে, এ তো আপনারই লাভ। আপনার এলাকা উন্নত হবে। অনুগ্রহপূর্বক একটা বাণী দিলে বাধিত হব স্যার।’ শিক্ষামন্ত্রী বললেন, ‘আমি বাণী দেবো না।’ অনেক অনুনয় করেও শিক্ষামন্ত্রীকে রাজি করানো গেল না। তিনি বাণী দেবেন না। এ তার শেষ কথা।
বিফল হয়ে তারা চলে আসেন। সৈয়দ আবুল হোসেন সব শুনতে পেয়ে বললেন, ‘আপনারা মনে কষ্ট পাবেন না। আমি ভেবেছিলাম স্মরণিকায় মাননীয় শিক্ষমন্ত্রীর বাণীকে মুখ্য রাখব। তা আর হলো না। আপনারা স্মরণিকার বাকি কাজ সম্পন্ন করে ফেলুন। আমি বাণীর কী হবে তা দেখছি। তারপর একটু থেমে বললেন, ‘আচ্ছা শিক্ষামন্ত্রী বড় না রাষ্ট্রপতি বড়? প্রধানমন্ত্রী বড় না শিক্ষামন্ত্রী বড়? আমার শিক্ষামন্ত্রীর বাণী আর চাই না। ক্রোড়পত্রে রাষ্ট্রপতির বাণী যাবে।
কিছুদিন পর সৈয়দ আবুল হোসেন একজন বাহক দিয়ে অধ্যক্ষের কাছে তৎকালীন প্রেসিডেন্ট হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ, উপ-রাষ্ট্রপতি মওদুদ আহমদ, প্রধানমন্ত্রী কাজী জাফর আহমদ এবং উপ-প্রধানমন্ত্রী শাহ মোয়াজ্জেম হোসেন-এর ছবিসহ চারটি বাণী পাঠিয়ে দেন। তাদের বাণী নিয়ে স্মরণিকা বের হয়ে যায়।

যারা করিছে প্রত্যাখ্যান
কালকিনিতে কোনো ভালো কলেজ নেই। নিজের এলাকায় লেখাপড়া করতে পারার মজাই আলাদা। যোগ্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অভাবে সৈয়দ আবুল হোসেনকে গৌরনদী গিয়ে পড়তে হয়েছে। এ দুঃখ তিনি ভুলতে পারেননি। ছাত্রজীবন হতে তাঁর প্রতিজ্ঞা ছিল, সামর্থ্য হলে কালকিনির এ অসহায়ত্ব তিনি দূর করবেন। উদ্দেশ্য সৎ ছিল বলে তা পূরণের যোগ্যতা অর্জন করলেন সৈয়দ আবুল হোসেন।
কালকিনি কলেজের অবস্থা করুণ। নেই ভবন, নেই ভালো শিক্ষক, নেই সুচারু পরিবেশ। তিনি কলেজটিকে জাতীয়মানের একটি শিক্ষালয়ে পরিণত করতে চাইলেন। সনটি ১৯৮৮-এর শেষ প্রান্ত। কলেজ কমিটি এবং এলাকার গণ্যমান্যদের ডেকে কলেজটির আমূল পরিবর্তন ও আধুনিকায়নে প্রয়োজনীয় অর্থ ব্যয় করার প্রস্তাব দিলেন। ভেবেছিলেন এলাকাবাসী খুশি হবেন কিন্তু তাকে হতবাক করে দিয়ে কলেজ পরিচালনা কমিটি ও এলাকার গণ্যমান্য হিসেবে পরিচিত কিছু লোক তাঁর প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেন। এ ঘটনায় সৈয়দ আবুল হোসেনের মনে বিরাট দাগ কাটে তবু তিনি নিজেকে সংবরণ করেন। সংবরণ করলেও মনের ইচ্ছা সংবরণ হয়নি। এ পর্যন্ত তিনি যা চেয়েছেন তা হয়েছে, করেছেন। কারণ তার চাওয়ার মধ্যে, ইচ্ছের মধ্যে কোনো ফাঁক ছিল না, কোনো লোভ ছিল না, কোনো পাপ ছিল না।
সাকো অফিসে এ নিয়ে আলোচনার এক পর্যায়ে সৈয়দ আবুল হোসেন বললেন, ‘আমার মনে কোনো লোভ নেই, আমি এলাকায় শিক্ষা বিস্তার চেয়েছি। কালকিনিবাসী আমার ইচ্ছাকে প্রত্যাখ্যান করেছেন। দেখবেন, অচিরে কালকিনিবাসী, যারা আমাকে প্রত্যাখ্যান করেছে তারাই আমার প্রস্তাব বাস্তবায়নের অনুরোধ নিয়ে আসবেন। আমি কিন্তু সেদিন তাদের ফেরাব না।’
খোয়াজপুর মাদারীপুর-শরিয়তপুর-কালকিনির মিলনস্থল খোয়াজপুর টেকেরহাট একটি অবহেলিত অঞ্চল। শিক্ষা-দীক্ষায় মারাত্মক পিছিয়ে। বিল ছাড়া কিছু নেই। সৈয়দ আবুল হোসেন ওখানে একটি কলেজ প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নিলেন। নিজের টাকায় জমি কিনে সাত/আট হাত গভীর বিল ভরাট করে অল্প সময়ের মধ্যে একটি কলেজ প্রতিষ্ঠা করলেন। এলাকাবাসী কলেজের নাম দিলেন সৈয়দ আবুল হোসেন কলেজ।
১৯৮৯ খ্রিস্টাব্দের সেপ্টেম্বর মাসে মহা আড়ম্বরে কলেজ উদ্বোধন করা হলো। যোগ্য শিক্ষক-শিক্ষিকার নিরলস শ্রমে কলেজটির সুনাম অল্পদিনে চারিদিকে ছড়িয়ে পড়ে। ১৯৯১ খ্রিস্টাব্দের প্রথম ব্যাচের পরীক্ষায় নব প্রতিষ্ঠিত এ কলেজের একজন ছাত্র মেধা তালিকায় প্রথম ও আরেকজন চতুর্থ স্থান লাভ করে। কলেজের সুনাম এত ছড়িয়ে পড়ে যে, কালকিনি কলেজে ঐ বছর ছাত্র ভর্তির সংখ্যা ২৩ এ গিয়ে দাঁড়ায়। এবার টনক নড়ে কালকিনির সে সকল লোকদের। যারা সৈয়দ আবুল হোসেনের প্রস্তাবকে প্রত্যাখ্যান করেছিল তারা বুঝতে পারল অচিরে সৈয়দ আবুল হোসেনের প্রস্তাব গ্রহণ না-করলে কালকিনি কলেজ বন্ধ হয়ে যাবে। নাই অর্থ, নাই ভবন, নাই ভালো শিক্ষক। কীভাবে চলবে কলেজ! ছাত্রছাত্রীরা সব খোয়াজাপুর সৈয়দ আবুল হোসেন কলেজে চলে যাচ্ছে।
একদিন সৈয়দ আবুল হোসেন আমিন কোর্টের সাকো অফিসে কাজ করছিলেন। এ সময় কালকিনির দেড় শতাধিক গণ্যমান্য লোক এসে সৈয়দ আবুল হোসেনকে ঘিরে ধরেন। তারা বললেন, ‘আমাদের ভুল হয়েছে। আপনার প্রস্তাব আমরা সসম্মানে গ্রহণ করলাম। আপনি কালকিনি কলেজকে নিজের মতো করে সাজিয়ে নিন।’
এলাকাবাসীর ওপর অভিমান করে থাকতে পারলেন না মহামহিম সৈয়দ আবুল হোসেন। শুরু হলো আর এক ইতিহাস। সে ইতিহাস গড়ার ইতিহাস; শিক্ষা বিস্তারে নতুন দিগন্ত উন্মোচনের ইতিহাস, কালকিনি বিশ্ববিদ্যালয় কলেজের ইতিহাস। যার অনুপম সুদৃশ্য ভবন পথচারীদের দৃষ্টি থমকে দেয়।৩ সৈয়দ আবুল হোসেন প্রতিষ্ঠিত কলেজগুলো এত ভালো ফল করছিল যে, শেষ পর্যন্ত এমন অবস্থা হয়ে গিয়েছিল, দক্ষিণাঞ্চলের সব শিক্ষা প্রতিষ্ঠান সৈয়দ আবুল হোসেনের নামে নামায়িত করার জন্য জনগণ উদগ্রীব হয়ে উঠেছিল। চারিদিকে সৈয়দ আবুল হোসেন নামের একটা হিড়িক পড়ে গিয়েছিল। লোকজন ভাবত সৈয়দ আবুল হোসেন-এর কলেজে পড়াতে পারলেই তাদের সন্তানের ভালো ফল নিশ্চিত হয়ে যাবে।৪

ইতিহাসের প্রারম্ভ
১৯৮৮ খ্রিস্টাব্দ। মহাপ্লাবনে কালকিনিসহ মাদারীপুরের অধিকাংশ এলাকা সাত/আট হাত পানির নিচে তলিয়ে গেছে। চারিদিকে শুধু পানি আর পানি। কোথাও আশ্রয়ের মতো এক টুকরো মাটি নেই। সব পানির নিচে। দুর্গত মানুষের কান্নায় আকাশ আরও ভারি হয়ে জল ফেলছে। এ অবস্থায় মানব দরদি আবুল হোসেন নিজেকে ঢাকার আয়েশে আটকে রাখতে পারলেন না। মাত্র তিনজন সহচর নিয়ে কালকিনি রওয়ানা দিলেন।
তখন জাতীয় পার্টি ক্ষমতায়। সৈয়দ আবুল হোসেন সাহায্য করতে এসেছেন শুনে ক্ষমতাসীন প্রতিক্রিয়াশীল স্বৈরশাসক-গোষ্ঠীর আঁতে ঘা পড়ে। সৈয়দ আবুল হোসেনকে সাহায্য দিতে দেবে না। কারণ সৈয়দ আবুল হোসেন আলোর ন্যায় সমুজ্জ্বল, ভালোবাসার ন্যায় অনাবিল, যেদিকে তাকান জয় করে নেন। লোকজন ক্রমশ তাঁর ভক্ত হয়ে যাচ্ছে। তাঁকে সাহায্য দিতে দিলে শোষণ, সন্ত্রাস আর ভোট ডাকাতির রাজনীতি চিরতরে বন্ধ হয়ে যাবে। অথচ সৈয়দ আবুল হোসেন কোনো রাজনীতিক উদ্দেশ্য নিয়ে সাহায্য করতে আসেননি। তিনি নিঃস্বার্থভাবে সাহায্য দিতে এসেছেন। তৎকালীন উপজেলা চেয়ারম্যান হাবিবুর রহমানের নেতৃত্বে কিছু লোক সৈয়দ আবুল হোসেনকে বাধা দেন। আবুল হোসেন বললেন: আমি আমার এলাকায় দুর্গত মানুষদের সাহায্য দিতে এসেছি, আপনারা বাধা দেবেন কেন?
যাদের উদ্দেশ্য শুধু বাধা দেয়া তারা যুক্তির ধার ধারে না। বাধা পেয়ে তিনি থানায় আশ্রয় নেন। আস্তে আস্তে এ কথা সর্বত্র জানাজানি হয়ে যায়। সাধারণ লোক তাঁর উদারতার সম্পর্কে অনেক পূর্ব হতে অবগত। তিনি অনেক লোককে নিঃস্বার্থভাবে সাহায্য করেছেন। চারিদিক হতে তাঁর ভক্তরা ছুটে আসতে থাকেন। থানার সামনে অনেক লোক জড়ো হয়ে যায়। সৈয়দ আবুল হোসেনকে তারা এক নজর দেখতে চান। তিনি বেরিয়ে আসেন। লোকজন উল্লাসের সাথে তাঁকে স্বাগত জানায়। সমবেত লোকদের উদ্দেশে তিনি বললেন, ‘আমি আপনাদের সাহায্য করতে এসেছি। এর বেশি কিছু না। কালকিনি আমার জন্মস্থান। আমার এলাকার লোকজন আজ অসহায়। আমি কি দুর্গত লোকদের সাহায্য করতে পারব না? আমি আপনাদেরই লোক, আমি আপনাদের সাথে থাকব। উপস্থিত জনগণ সমস্বরে বললেন, ‘আমরা আপনার পক্ষে আছি। অবস্থা বেগতিক দেখে পালিয়ে যায় প্রতিক্রিয়াশীলরা। সৈয়দ আবুল হোসেনকে দুর্গত লোকজন পরম আদরে বুকে টেনে নেন। শুরু হয় আর এক ইতিহাস। এ ইতিহাস শুধু রাজনীতির নয়, দানের; স্বার্থের নয় ত্যাগের।’৫

নিন্দুকেরে বাসি আমি সবার চেয়ে ভালো৬
কালকিনিতে সৈয়দ আবুল হোসেন একটা সভায় যোগদান করতে এসেছেন। সভার পূর্বে একটি কক্ষে বসে কলেজের উন্নয়ন সম্পর্কে আলোচনা করছেন। সে সময় কয়েকজন লোক সৈয়দ আবুল হোসেনের কাছে এ মর্মে অভিযোগ করলেন যে জনৈক ব্যক্তি তাঁর নিন্দা করছেন। তারা এমনভাবে কথাগুলো বলছিলেন যেন সৈয়দ আবুল হোসেন উত্তেজিত হয়ে ওঠেন। কিন্তু তিনি উত্তেজিত হলেন না, কোনো পরিবর্তনও তার চোখেমুখে দেখা গেল না। স্বভাবসুলভ হাসি দিয়ে বললেন, ‘তোমরা যাও। বিষয়টা আমি দেখব।’ বক্তৃতার সময় তিনি বললেন: আমাকে যারা ভালোবাসেন তার শুনে রাখেন, যারা আমার বিরুদ্ধে কুৎসা রচনা করেন তারা আমার গায়ের ময়লা তাদের নিজের শরীরে মেখে নিয়ে আমাকে পরিষ্কার করে দেন। এতে আপনাদের খুশি হবার কথা, মন খারাপ করার প্রশ্নই আসে না। মনে রাখবেন- নিন্দুকেরে বাসি আমি সবার চেয়ে ভালো; যুগ জনমের বন্ধু আমার আঁধার ঘরের আলো।

মহান যার অনুভব৭
জনৈক ব্যক্তির লাশ পরিবহন ও দাফন-কাফনের জন্য কয়েকজন লোক সৈয়দ আবুল হোসেনের কাছে সাহায্য চাইতে আসেন। মহান দাতা সৈয়দ আবুল হোসেন স্বভাবসুলভ সরলতায় তাদেরকে কাক্সিক্ষত অর্থ প্রদান করে বিদায় করেন। কয়েক বছর পর এক অনুষ্ঠানে সৈয়দ আবুল হোসেন দেখলেন- সেদিন যে লোকটির লাশ পরিবহন ও দাফন-কাফনের জন্য তাঁর কাছ হতে টাকা নেয়া হয়েছিল সে লোকটি দিব্যি হেঁটে বেড়াচ্ছেন। তিনি এ বিষয়ে সাহায্যপ্রার্থীদের কিছু বলেননি। শুধু মুচকি হেসেছিলেন।

১. সূত্র কালকিনি পাইলট উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রাক্তন শিক্ষক আবদুল আজিজ মাস্টার, সৈয়দ 
আবুল হোসেনের বন্ধু ও সাকোর প্রাক্তন কর্মকর্তা আব্দুল কাদের এবং সৈয়দ আবুল 
হোসেন কলেজের অধ্যক্ষ মো. তমিজ উদ্দিনের প্রদত্ত তথ্য।
২. আব্দুল কাদের, খোয়াজপুর কলেজ প্রতিষ্ঠা সৈয়দ আবুল হোসেনের বন্ধু এবং সাকো- 
এর প্রাক্তন কর্মকর্তা।
৩. আবদুল আজিজ মাস্টার, প্রাক্তন শিক্ষক কালকিনি পাইলট উচ্চ বিদ্যালয় এবং প্রাক্তন 
সভাপতি, কালকিনি উপজেলা আওয়ামী লীগ।
৪. ড. একেএম আখতারুল আলম, অ্যাডভোকেট, বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট, প্রাক্তন কর্মকর্তা লিগ্যাল এইড, শরীয়তপুর।
৫. আজিজ মাস্টার, আবুল কালাম আযাদ, আব্দুল কাদের।
৬. ফরহাদ হোসেন, সাবেক অতিরিক্ত সচিব ও জেলাপ্রশাসক মাদারীপুর।
৭. ঐ

আলাপচারিতায় দার্শনিক নান্দনিকতা
এ অধ্যায়ে বর্ণিত ঘটনা ও বক্তব্যগুলো মাননীয় যোগাযোগমন্ত্রীর আলাপচারিতার বিভিন্ন সময়ের কথাবার্তা থেকে সংগৃহীত। এগুলো কোনো বিশেষায়িত বক্তব্য নয়। দৈনন্দিন জীবনের সাধারণ কথাবার্তার টুকিটাকি মাত্র। এসব কথাবার্তায় ছিল না কোনো পূর্বপরিকল্পনা, ছিল না কোনো সমীকরণ। নিতান্তই স্বাভাবিক, নিঃশ্বাসের মতো, প্রশ্বাসের মতো। সাধারণ কথাবার্তায় একজন লোকের প্রকৃত পরিচয় ফুটে ওঠে। মানুষ সভাসমিতিতে নিজেকে লুকিয়ে উঠতে পারেন, কিন্তু স্বাভাবিকতা ভিন্ন। এ সব খোলামেলা কথাবার্তা ও আলাপচারিতায় ব্যক্তি, নেতা, রাজনীতিবিদ ও প্রশাসক হিসেবে সৈয়দ আবুল হোসেনের আদর্শ ফুটে উঠেছে। সংকলনে প্রকাশের উদ্দেশ্যে তথ্যগুলো বিভিন্ন উৎস হতে সংগ্রহ করা হয়েছে।

নেতৃত্ব
কালকিনির লোক। মন্ত্রী মহোদয়ের সমবয়সী। কথাবার্তায় মনে হলো ঘনিষ্ঠ। মাঝে মাঝে তাকে দেখা যায় মন্ত্রণালয়ে। কি একটা তদ্বির নিয়ে এসেছেন। তদ্বিরের বিবরণ শুনে মাননীয় যোগাযোগমন্ত্রী সৈয়দ আবুল হোসেন বললেন, ‘এটি আমার পক্ষে সম্ভব নয়।’ লোকটি বললেন, ‘আপনি মন্ত্রী, আপনার মন্ত্রণালয়ের কাজ। সম্ভব নয় কেন?’ মন্ত্রী বললেন, ‘তুমি একজন শিক্ষিত লোক। কোন কাজটি করা আমার উচিত, কোনটি উচিত নয় সে বিষয়ে তোমার ধারণা থাকা উচিত। প্রত্যেকের সীমাবদ্ধতা আছে। We are all something, but none of us are everything.’ ‘আপনি এত বড় নেতা, এত বড় পদে আছেন, বলে দেন, কাজ হয়ে যাবে।’ মাননীয় মন্ত্রী সৈয়দ আবুল হোসেন বললেন, খবধফবৎংযরঢ় রং ধপঃরড়হ, হড়ঃ ঢ়ড়ংরঃরড়হ. আমার দায়িত্ব কাজ, তদ্বির করা নয়। লোকটি বললেন, তদ্বির না-করলে হয় না। মন্ত্রী মহোদয় বললেন, যেগুলো হবার সেগুলোই আমি তদ্বির করি। যেগুলো হয় না সেগুলোর তদ্বির করি না।
নিন্দুকেরে বাসি আমি সবার চেয়ে ভালো
মন্ত্রী মহোদয়ের কক্ষ। বিভিন্ন পর্যায়ের বেশ কয়েকজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা ও সংসদ সদস্য উপস্থিত আছেন। বিভিন্ন বিষয়ে আলোচনা চলছিল। মন্ত্রী মহোদয় এক সময় বললেন: কেউ একদিনে বড় হয় না, হতে পারে না। আছাড় না খেয়ে কেউ হাঁটতে শেখেনি। বিঘœ ছাড়া কেউ লক্ষ্যস্থলে পৌঁছতে পারেনি। একদিন আমাকে অনেকে উপহাস করেছে, ঢিল ছুড়ে আমার প্রত্যাশাকে থামিয়ে দেয়ার চেষ্টা করেছে। আমি আমার প্রতি নিক্ষিপ্ত ইট দিয়ে সফলতার ভিত্তি বানিয়েছি। ঐ ইটগুলো আমাকে রক্তাক্ত করার জন্য নিক্ষেপ করা হয়েছিল। আমি সযতেœ নিজেকে রক্ষা করেছি। প্রতিটি ইট সংগ্রহ করে আস্তে আস্তে ভিত মজবুত করেছি। যারা আমাকে ঢিল ছুড়েছিল তারা এখন ফুল ছোড়ে। এখন আমি তাদের দিয়ে আমার ভবনের বাকি কাজগুলো করিয়ে নিচ্ছি। পৃথিবী ভয়ঙ্কর জায়গা, আমি জানি। তবে এটি খারাপ লোকদের জন্য নয়; বরং তাদের জন্য, যারা কোনো কিছু না-করে চুপচাপ দাঁড়িয়ে তামাসা দেখে। সহনশীলতা ছাড়া এখানে টিকে থাকার কোনো উপায় নেই। যতবার আমি বাধাগ্রস্ত হয়েছি ততবার আমি দৃঢ়প্রতিজ্ঞ হয়েছি। যে আমার নিন্দা করেছে সে নিন্দার সূত্র ধরে আমি কাক্সিক্ষত পথ খুঁজে পেয়েছি। তাই আমি বিভিন্ন বক্তৃতায় প্রায় বলে থাকি:
‘নিন্দুকেরে বাসি আমি সবার চেয়ে ভালো,
যুগ জনমের বন্ধু আমার আঁধার ঘরের আলো
যিনি আমার প্রশংসা করেন তাকে আমি অগ্রাহ্য করি না, যিনি নিন্দা করেন তাকে ঘৃণা করি না। দু’জন আমার দুটো দিক তুলে ধরেন। দুটোই আমার জন্য প্রয়োজন। প্রশংসা আমাকে উজ্জীবিত করে এবং নিন্দা করে সতর্ক।

আত্ম-পরিবর্তন
রবি বার। নয়টা বাজার পনেরো মিনিট বাকি। ইতোমধ্যে মাননীয় যোগাযোগ মন্ত্রী অফিসে এসে গেছেন। তিনি প্রত্যহ নয়টার আগে অফিসে আসেন। সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীগণ যাতে তাকে অনুসরণ করেন এ জন্য এ ব্যবস্থা। নিয়ম-নীতি ও ব্যক্তি চরিত্র সম্পর্কে আলোচনাপ্রসঙ্গে মন্ত্রী মহোদয় বললেন: পৃথিবীর সবাই পরিবর্তন চায়। কিন্তু অবাক হয়ে দেখি কেউ নিজেকে পরিবর্তন করছে না। তাহলে পৃথিবী কীভাবে পরিবর্তন হবে! নিজেকে পরিবর্তন করলে পৃথিবীর পরিবর্তন স্বয়ংক্রিয়ভাবে হয়ে যাবে। আসলে নিজেকে পরিবর্তন করা খুবই কঠিন। শিক্ষিত হলে মনের পরিবর্তন আসে। আমি মনে করি শিক্ষা ছাড়া অন্য কোনোভাবে আমাদের মনমানসিকতার পরিবর্তন সম্ভব নয়। শিক্ষা এমন একটি শক্তিশালী অস্ত্র যা আমরা অতি সহজে আমাদের মনমানসিকতা ও সমাজকে পরিবর্তন করার জন্য ব্যবহার করতে পারি। শুধু শিক্ষা যথেষ্ট নয়, প্রায়োগিক শিক্ষা প্রয়োজন। শিক্ষা জ্ঞান দেয় বটে; তবে জ্ঞান আমার লক্ষ্য নয়, আমার লক্ষ্য প্রয়োগ। গ্রন্থগত বিদ্যার মতো প্রয়োগহীন জ্ঞানও অর্থহীন।

চাওয়া-পাওয়া
সৈয়দ আবুল হোসেন তখন এলজিআরডি প্রতিমন্ত্রী। মানুষের চাওয়া-পাওয়া, প্রত্যাশা ও লোভ সম্পর্কে আলোচনার এ পর্যায়ে তিনি বললেন, আমি তা-ই করি, যা করতে পারি, তা-ই চাই যা আমার আছে, আমি তা হতে চাই যা আমি ইতোমধ্যে হয়ে আছি। এর বেশি কিছু চেয়ে হতাশ হতে চাই না। হতাশা মানুষের অতীত বর্তমান ও ভবিষ্যৎ সব নষ্ট করে দেয়। আমি হতাশ হই না, কারণ আমি হতাশ হবার মতো কোনো উচ্চাকাক্সক্ষায় নিজেকে জড়াই না। তাই আমি সবসময় প্রফুল্ল থাকি। আমার হাসি আমার প্রফুল্লতার প্রকাশ। আমাকে আমার কর্ম দ্বারা বড় হতে হবে। আপনাকে কেউ বড় হবার জন্য অনুগ্রহ করবে না। আপনার দক্ষতাই আপনাকে সহায়তা দেবে। আমার পিতামহ কত লম্বা ছিল সেটি কোনো বিষয় নয়, আসল বিষয় আমি কতটুকু লম্বা হতে পেরেছি। আপনার বোঝা আপনারকে বহন করতে হবে। আপনার শরীরের কষ্ট আপনার নিজের। কেউ এর ভাগ কখনও নেয়নি, নেবে না এবং নিতে পারে না।১

সমালোচনা
সৈয়দ আবুল হোসেন বাস্তববাদী মানুষ। তিনি বিশ্বাস করেন, মানুষ মাত্রই ভুল করবে। এর ব্যতয় ঘটতে পারে না। ভুল আছে বলে কোনো কিছু পরিপূর্ণ নয়, কোনো কিছু ভুলের ঊর্ধ্বে নয়; তাই কোনো কিছু সমালোচনার ঊর্ধ্বেও নয়। আমি সমালোচনাকে ভয় করি না। আমি যে কাজ করছি সমালোচনা তা প্রকাশ করে। আমি যদি সমালোচনা এড়াতে চাই তাহলে আমার উচিত কিছু না-করে বাড়িতে চুপচাপ বসে থাকা। এটি আমার পক্ষে সম্ভব নয়। লাশের পক্ষে সম্ভব। কীর্তিমানের লাশও সমালোচনায় পড়ে। তাই বলে কী কীর্তিমানেরা চুপ করে ঘরে বসে থাকে! আমি সমালোচনাকে স্বাগত জানাই। Without debate, without criticism, no administration and country can succeed and no republic can survive.২
কাজের কোনো শেষ নেই
প্রত্যেক মানুষ নিজস্ব বলয়ে একজন শিল্পী। শিল্পীর কাজ কখনও শেষ হয় না। একজন শিল্পী যখন তার একটি শিল্পকর্ম শেষ করেছেন বলেন, তখন মূলত তা তিনি এটি সাময়িক বন্ধ রাখেন কিংবা পরিত্যক্ত ঘোষণা করেন মাত্র। যতদিন জীবন ততদিন কাজ। কাজহীন মানুষ লাশের নামান্তর। কাজ করতে গেলে ভুল হয়। ভুল কাজের অংশ। তার ভুল হয় না যে কোনো দিন কোনো কিছু করেনি। তাই আমি ভুলকে সৃষ্টির অনিবার্য অংশ মনে করি। তবে দেখতে হবে ভুল যেন মাত্রাতিরিক্ত না-হয়। এ জন্যই প্রয়োজন জ্ঞান, অধ্যয়ন, বিচক্ষণতা এবং সততা। তাড়াহুড়ো চিন্তার সময়কে সীমিত করে, বাড়িয়ে দেয় ভুলের মাত্রা। ফলে অনেকে মাঝপথে তল্পিতল্পা গুটিয়ে চলে যেতে বাধ্য হয়। আমি ধীরে হাঁটি তবে পিছু হাঁটি না। যদি কখনও পিছোই তাহলে ধরে নিতে হবে আগুয়ান হবার জন্য পরিকল্পনামাফিক পিছু হাঁটি।৩

পরিবর্তন ও প্রগতি
নেতা হতে হলে পরিবর্তনশীল মানসিকতা থাকতে হবে। সংস্কার মানেই পরিবর্তনশীলতা। তবে এটিও মনে রাখতে হবে, সকল আন্দোলন যেমন উন্নয়ন নয়, তেমনি সকল পরিবর্তনও কল্যাণকর নয়। আমার যা পছন্দ হয় নাÑ তা আমি পরিবর্তন করার চেষ্টা করি। যা আমি পরিবর্তন করতে পারি নাÑ তা আমি গ্রহণ করার জন্য নিজের মনকে পরিবর্তন করে ফেলি। তবে যেটি পরিবর্তন করলে আমার ভালো লাগলেও অধিকাংশ লোকের ক্ষতি হয়, সেটি আমি পরিবর্তন না-করে মেনে নেয়ার চেষ্টা করি। আমি জানি যা আসার তা আসবেই। একটি শক্তিশালী সেনা আক্রমণকে রোধ করা যায় কিন্তু একটি ধারণা যার আসার সময় হয়ে গেছে তা কোনোকিছু দিয়ে রোধ করা যায় না। সুতরাং অনড়তা নয় বরং বিচক্ষণ পরিবর্তনশীলতাই প্রগতির লক্ষণ।

সকল শান্তির উৎস
পরিবারের শান্তি সবচেয়ে বড় শান্তি। একজন মানুষ যতই ধনী হোক না কেন, অসুস্থ হলে কোনো শান্তি উপভোগ করতে পারে না, কিছুতে আনন্দ পায় না। তেমনি একজন লোক যতই ধনী, যতই ক্ষমতাশালী হোক না কেন, পারিবারিক শান্তি না-থাকলে তার সবকিছু ব্যর্থ হতে বাধ্য। আমি পারিবারিক জীবনে একজন সুখী মানুষ। আমার সুখের বিনির্মাতা আমি, আমার স্ত্রী, আমার দুই কন্যা। আমি তাদের পর্যাপ্ত সময় দেই, ভালোবাসা দেই। তারাও দেয়। এটি বিনিময় নয়, মর্যাদার অনুভবে ভালোবাসায় সন্তরণ। যেখানে মর্যাদা নেই সেখানে ভালোবাসা নেই। আমি আমার স্ত্রীর প্রতি সর্বদা বিশ্বস্ত এবং মর্যাদাশীল আচরণে অভ্যস্ত। সন্তানদের প্রতি আমি সবসময় সুন্দর ব্যবহার করি। আমি জানি, আমার মৃত্যুর পর তারাই আমার শেষ ঠিকানা স্থির করবে। আমার স্ত্রী পুত্র আমার আনন্দ, বেঁচে থাকার প্রেরণা। এমনকি মৃত্যুর পরও।৪

সূর্য ও জীবন
প্রতি সেকেন্ড আমার কাছে নতুন, প্রতিটি নতুন সূর্য আমাকে একটি নতুন জীবন উপহার দেয়। তাই আমি বর্তমানকে গুরুত্বের সাথে বরণ করি, আনন্দের সাথে উপলব্ধি করি। প্রতিটি মুহূর্তকে অবস্থা বিবেচনায় অভিযোজনীয় কৌশলে উপভোগ্য করে তুলি। শিশুকাল, কৈশোর, যৌবন ও বৃদ্ধকাল- প্রতিটির আনন্দ আছে, সার্থকতা আছে। আমার উপলব্ধিই আমার উপভোগ। মানুষ এককভাবে বাস করতে পারে না। প্রত্যেককে নিয়ে আমি, আমাদের নিয়ে সমাজ, দেশ ও জাতি। আজ যাকে পাব কাল তাকে নাও পেতে পারি। তাই আমার সাথে যারা আছে, যাদের সাথে আমার সাক্ষাৎ হয়েছে, সবাইকে জীবনের অংশ মনে করে যথাযোগ্য গুরুত্ব দেয়ার চেষ্টা করি।

রাগ পাশবিকতার আগুন
আমার মা আমাকে শিখিয়েছেন কীভাবে ধৈর্য ধারণ করতে হয়। রাগ সংবরণ করতে হয়। এক সেকেন্ডের রাগ কারও পুরো জীবনকে বিষিয়ে তুলতে পারে। যে ব্যক্তির ধৈর্য নেই, তার আত্মাও নেই। যার আত্মা নেই, সে মানুষ নয়। রাগ পাশবিকতার নামান্তর। অধৈর্য মানুষকে পশুতে পরিণত করে। মানুষ কেন রাগে? মানুষ যখন ভুল করে এবং সে ভুল স্বীকার করে না, স্বভাবতই তখন সে রেগে যায়। অগভীর মানুষের রাগ বেশি। রাগ অশান্তিকে প্রসারিত করে। রাগের জন্য মানুষের শাস্তি হয় না, তবে রাগ শাস্তি দিয়েই ছাড়ে। তাই আমি নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করার অভ্যাস রপ্ত করে নিয়েছি। আমার পিতামাতা এভাবে আমাকে গড়ে তুলেছেন। ভদ্রতা দিয়ে মানুষ অসাধ্য সাধন করতে পারে। মহাত্মা গান্ধীর ভাষায় বলতে পারি: In gentle way, you can shake the world. রাগ পোশাকের নিচে লুকিয়ে থাকা বিষধর সাপের মতো। এটি পরিহার করতে পারলে নিরাপত্তা ও শান্তিÑ দুটো বহুলাংশে নিশ্চিত হয়ে যায়।
ন্যায় বিচারের গুরুত্ব
এমনভাবে কাজ করবেন যাতে কোনো ব্যক্তি অযথা হয়রানির স্বীকার না-হয়। আমাকে যে বিষয় কষ্ট দেবে, যা করলে আমার ক্ষতি হবে, তা যেন অন্যের বেলাতেও না-হয়। সহকর্মীদের প্রতি সহানুভূতিশীল হবেন। এটিই ন্যায়বিচার। আমরা যদি ন্যায়বিচারের মাধ্যমে অন্যকে রক্ষা না-করি, তাহলে ন্যায়বিচারও আমাদের রক্ষা করবে না। যে ফাঁদে আমি অন্যকে আটকাব, সে ফাঁদে একদিন আমিও আটকে যাব। মনকে বড় করতে হবে। বড় মন ছাড়া ক্ষমতা, অর্থ, বিত্ত সব কুৎসিত ভিক্ষুকের প্রতিচ্ছবি। ন্যায়বিচার যারা লঙ্ঘন করে, তারাও একদিন অন্যায়ের শিকারে পরিণত হয়। তাই আমাদের উচিত ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করা।৫

সংশয়ে সতর্কতা
এক প্রকৌশলী যোগাযোগমন্ত্রী সৈয়দ আবুল হোসেনকে বললেন: আপনি নিশ্চিত থাকেন আমি সফল হব স্যার। জীবনে এ পর্যন্ত কোনো কাজে ব্যর্থ হইনি। মন্ত্রী বললেন: আমি নিজেও একজন ব্যবস্থাপক। আমার প্রতিষ্ঠানে আপনার মতো অনেক প্রকৌশলী কাজ করে। দেখুন, চিন্তাভাবনা করে আমাকে বলুন। পরে যেন লজ্জায় পড়তে না-হয়। জীবনে ব্যর্থ হয়নি তারা, যারা জীবনে কোনো কাজই করেনি। প্রকৌশলী বললেন: আমি পারব স্যার। মন্ত্রী মহোদয় বললেন: আমার মনে হয়, আপনার কোথাও ভুল হচ্ছে। কেন স্যার? প্রকৌশলীর প্রশ্নের জবাবে মাননীয় মন্ত্রী বললেন: কারণ যে নিশ্চিত হয়ে অগ্রসর হয়, তার সমাপ্তি ঘটে সংশয় আর পরাজয়ে; যে সংশয় নিয়ে শুরু করে তার শেষ হয় নিশ্চয়তা আর সাফল্যে। কারণ, সংশয় তাকে সব সময় সতর্ক থাকার কথা স্মরণ করিয়ে দেয়। প্রকৌশলী সাহেব বললেন: আমি স্যার সতর্ক থাকব। আপনাকে যথাসময়ে কাজটি করেই দেবো।” কিন্তু বেচারা কাজটি যথাসময়ে সম্পন্ন করতে পারলেন না। সামান্য কারণে তিনি ব্যর্থ হয়েছেন। মন্ত্রী বললেন : আমি আপনাকে প্রথমেই বলেছিলাম। আপনার নিশ্চয়তা এবং কথা দেখে আমি বুঝতে পেরেছিলাম আপনি পারবেন না। A dog is not considered a good dog because he is a good barker. A man is not considered a good man because he is a good talker.

অসুন্দরে নয়, সুন্দরে
এক অফিসার মন্ত্রী মহোদয়কে বললেন: সাদেক সাহেব (ছদ্মনাম) ভালো অফিসার নন। দুর্নীতিপরায়ণ।
মন্ত্রী মহোদয়: তিনি দুর্নীতিপরায়ণ এরূপ কোনো প্রমাণ আপনার কাছে আছে?
অফিসার: এ সব কেউ প্রমাণ রেখে করে না।
মন্ত্রী মহোদয়: তাহলে এমন কথা বলা উচিত নয়। আমার এ বিষয়ে তিক্ত অভিজ্ঞতা রয়েছে। ওয়ান-ইলেভেনের পর আমাকে দুর্নীতিবাজ আখ্যায়িত করে প্রচণ্ড হয়রানি করা হয়েছিল। মামলা পর্যন্ত করা হয়েছে। আমি কী দুর্নীতিবাজ ছিলাম? আমি কোনোদিন অসৎ পথে আয় করিনি। আমার প্রতিটি পয়সা হালাল। তবু আমাকে দুর্নীতিবাজ আখ্যায়িত করে হয়রানির চেষ্টা করা হয়েছে। শেষ পর্যন্ত আমি প্রমাণ করতে পেরেছি যে, আমি দুর্র্র্নীতিবাজ নই। ততক্ষণে অনেক হয়রানির শিকার হয়ে গেছি। আমাদের উচিত আগে অন্যের ভালোটার দিকে তাকানো। তাহলে পৃথিবী অনেক সুন্দর হয়ে যাবে। কারণ, মানুষ তখন নিজের সুন্দরকে আরও বিকশিত করার প্রতিযোগিতায় নামবে।৬

শত্র“ বিনাশের উপায়
ওয়ান-ইলেভেনের সময় পুরো বাংলাদেশ একটি নরকে পরিণত হয়েছিল। রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস চরম পর্যায়ে পৌঁছে গিয়েছিল। মানবাধিকারের বালাই ছিল না। তবু আমি আশা ছাড়িনি। কারণ, আমি জানি পৃথিবীর সমস্ত অন্ধকারও ছোট্ট একটি মোমবাতির আলোকে ঢেকে রাখার সামর্থ্য রাখে না। এ সময় আমাকে অনেকে বিপদে ফেলার জন্য চেষ্টা করেছে। এমন অনেকে আমার ক্ষতি করার চেষ্টা করেছে যাদের আমি একদিন উপকার করেছিলাম। আমি তাদের ক্ষমা করে দিয়েছি। আমি জানি, The best way to destroy my enemy is to make them my friend. শত্র“কে বন্ধু বানিয়ে নেয়া মানে শত্র“কে শেষ করে দেয়া। ওয়ান ইলেভেনে যারা আমার ক্ষতি করার চেষ্টা করেছে, তাদের সবাইকে আমি জানি। আমি প্রতিশোধ নেব না। প্রতিশোধ এক ধরনের বন্য বিচার, পাশবিকতা। আমি ভালোবাসার মাধ্যমে প্রতিশোধ নেব। এমন প্রতিশোধের পরিণতি খুবই মধুর হয়। শত্র“তা কখনও শেষ হয় না। কারও জীবন শেষ করে দেয়ার জন্য একজন শত্র“ই যথেষ্ট। তবে শত্র“ এমন একটা শক্তি যে, এটাকে শত্র“তা দিয়ে কোনোদিন শেষ করা যায় না। শত্র“ বিনাশের একমাত্র উপায় তাদের বন্ধু বানিয়ে নেয়া।

সহনশীল রাজনীতি, সন্ত্রাস ও শিক্ষাঙ্গন
উন্নয়নের জন্য, শিল্পায়নের জন্য, গণতন্ত্রের সুফল পরিপূর্ণভাবে পরিব্যাপ্ত করার জন্য রাজনীতিক সহনশীলতা অত্যাবশ্যক। রাজনীতি থাকবে রাজনীতির স্থানে। সমাজের বিনির্মাণে রাজনীতির কৌশল প্রতিফলিত হতে হলে তা হবে দলমতের ঊর্ধ্বে। 
যদি “চোখের বদলে চোখ, হাতের বদলে হাত” নীতি বিদ্যমান থাকে তাহলে পৃথিবীর সব মানুষ অন্ধ ও ল্যাংড়া হয়ে যাবে। তাই আমি সহনশীল রাজনীতিতে বিশ্বাসী। সন্ত্রাসী জনপদ হতে সুশীল সন্তান পাওয়া যায় না। তাই আমি শিক্ষাঙ্গনকে সন্ত্রাস ও রাজনীতিমুক্ত রেখে আমার প্রতিষ্ঠানগুলো পরিচালনা করছি। নিয়মের ব্যত্যয় ঘটলে কাউকে ক্ষমা করি না। সহনশীল রাজনীতি, সন্ত্রাসমুক্ত সমাজ ও এ দু’য়ের পরিচর্যায় শিক্ষাঙ্গন পরিচালনা করা গেলে একটি জাতির আর কিছুর প্রয়োজন হবে না।৭

নিরাপত্তা বনাম শান্তি
বুদ্ধিমান লোক সবার আগে নিরাপত্তা নিশ্চিত করার উদ্যোগ নেয়। জ্ঞানী ব্যক্তির উদ্দেশ্য শান্তি নিশ্চিত করা নয়, কষ্টকে এড়িয়ে চলা। কষ্টকে এড়িয়ে চলা সম্ভব হলে শান্তি আপনা-আপনি জেগে ওঠে। ক্ষোভকে প্রশমন করা গেলে বিচক্ষণতা আসে। আর বিচক্ষণতা এমন একটি গুণ যা মানুষকে সচেতন ও সজীব রাখে, বিপদ হতে উদ্ধার করে। তাই সবার উচিত আগে নিরাপত্তার দিকটা ভেবে দেখা। নিরাপত্তার সাথে যোগাযোগের সম্পর্ক অবিচ্ছেদ্য। কারণ, যোগাযোগ পারস্পরিক বিনিময়, সহায়তা ও সম্মিলনের পথকে প্রসারিত করে।৮

যোগাযোগ ও উন্নয়ন
যোগাযোগ ছাড়া কোনো উন্নয়ন সম্ভব নয়। মানুষ যোগাযোগ ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে সভ্যতার দেখা পেয়েছে। যোগাযোগ শুধু প্রতিষ্ঠা করলে হবে না। প্রকৃত যোগাযোগ ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করতে হবে। মানুষ যখন নিজেকে নিরাপদ মনে করবে তখনই প্রকৃত যোগাযোগ প্রতিষ্ঠা পাবে। এ জন্য আমি নিজেকে উৎসর্গ করতে প্রস্তুত। আপনারা আমাকে সহায়তা দেবেন। কারণ, যোগাযোগ কোনো একক বিষয় নয়, অনেকগুলো বিষয়কে সমন্বয় করে যোগাযোগ ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করতে হয়। কোনো সংস্থার পক্ষে এককভাবে প্রকৃত যোগাযোগ ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব নয়। যোগাযোগ প্রত্যেকের জন্য, প্রত্যেকের উন্নয়নের জন্য কোনোরূপ সন্দেহ ব্যতিরেকে সার্বজনীন। তাই সবার উচিত সাবলীল যোগাযোগ প্রতিষ্ঠায় সহায়তা করা।৯

লোভে পাপ, পাপে মৃত্যু
সৈয়দ আবুল হোসেন বিভিন্ন দেশ ভ্রমণ করেছেন। এককভাবে শতাধিক বার চিন ভ্রমণ করেছেন। জাপান, আমেরিকা, রাশিয়া, থাইল্যান্ড, সিঙ্গাপুর, লন্ডন, ইন্দোনেশিয়া, কানাডা, সুইজারল্যান্ড- অনেক অনেক দেশ ভ্রমণ করেছেন। দেশ ভ্রমণের অভিজ্ঞতা সম্পর্কে বলতে গিয়ে বললেন: মানুষের চেয়ে বড় সম্পদ আর নেই। জাপানের প্রাকৃতিক সম্পদ আমাদের চেয়ে অনেক কম। কিন্তু তারা এখন পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ সম্পদশালী দেশ। আমি মনে করি, পৃথিবীতে সম্পদ পর্যাপ্ত নয়। আমি মনে করি, There is enough for everybody`s need, but not enough for everybodys greed. লোভ পাপ আনে, পাপ মৃত্যু ঘটায়। লোভ সংবরণ করা গেলে পাপ কমে যাবে। পাপ কমে গেলে শান্তি প্রসারিত হবে। আপনারা যদি কোনো কিছু প্রকৃতই করতে চান তাহলে অবশ্যই করতে পারবেন। যদি না-চান তাহলে পাবেন একটি অজুহাত।১০

সফলতার অন্ত নেই
প্রবীণ এক রাজনীতিবিদ মাননীয় যোগাযোগ মন্ত্রীকে বললেন: আপনি একজন সফল ব্যক্তি। আর কী চাওয়ার আছে আপনার, আল্লাহ আপনাকে সব দিয়েছেন।
স্মিতহাস্যে মাননীয় মন্ত্রী বললেন: সফলতা গন্তব্যস্থল নয়। ভ্রমণের প্রারম্ভ মাত্র। তাই সফলতা মানুষকে আরও সক্রিয় আরও সাবধান, আরও অধিক পথ পরিক্রমায় দায়বদ্ধ করে তোলে। যারা সফলতার সন্তুষ্টি নিয়ে আত্মতুষ্টিতে আত্মহারা হয়ে থেমে যান, তারা পক্ষান্তরে প্রাপ্ত সফলতাকে গলা টিপে মেরে ফেলেন। সফলতা সন্তানের মতো। একে প্রতিনিয়ত আপন স্নেহে লালন করতে হয়।

শিক্ষক ও শিক্ষা
অধ্যক্ষ তমিজ উদ্দিন সৈয়দ আবুল হোসেনের শিক্ষক, আবার খোয়াজপুর সৈয়দ আবুল হোসেন কলেজের প্রতিষ্ঠাতা অধ্যক্ষ। এক সাক্ষাৎকারে সৈয়দ আবুল হোসেন সম্পর্কে অধ্যক্ষ তমিজ উদ্দিন বললেন, ‘সৈয়দ আবুল হোসেন আমাকে খুব ভালোবাসেন, শ্রদ্ধা করেন, বিশ্বাস করেন। তার মতে আমি নাকি ভালো শিক্ষক। আমি মনে করি, সে ভালো ছাত্র বলেই আমি ভালো শিক্ষক।
আমি তাকে জিজ্ঞেস করেছিলাম, ‘তুমি আমাকে এত শ্রদ্ধা করো কেন?’
সৈয়দ আবুল হোসেন বলেছিলেন, ‘আপনি আমার শিক্ষক।’
আমি বলেছিলাম, ‘তোমার তো আরও অনেক শিক্ষক আছে।’
এর উত্তরে সৈয়দ আবুল হোসেন বলেছিলেন, ‘তিনিই শিক্ষক যিনি কঠিন জিনিস সহজভাবে উপস্থাপন করতে পারেন। তিনিই শিক্ষক যিনি শিক্ষক-ছাত্র দূরত্বকে জ্ঞানের রশ্মি দিয়ে একাকার করে দেন। আপনার সে যোগ্যতা আছে।’১১

অন্যায় যে করে
তদ্বির আর তদ্বির। মাঝে মাঝে তদ্বিরকারীদের জ্বালায় মাননীয় যোগাযোগ মন্ত্রী সৈয়দ আবুল হোসেন প্রাত্যহিক জরুরি কাজেও সময় দিতে পারেন না। তদ্বিরের বিষয়ে তিনি বলেন, এটি আমার স্বাধীন চিন্তায় বিঘœ ঘটায়। আমি ম্যানেজার এবং লিডার। তার চেয়ে বড় কথা আমি পরবর্তী জেনারেশনকে আমার জেনারেশনের চেয়ে আরও প্রগতিশীল, উন্নত এবং আকর্ষণীয় দেখতে চাই। Management is doing things right; leadership is doing the right things. আমি ঠিক কাজটাই করব। কোনো প্রভাবের কাছে মাথা নত করব না। একজন প্রকৃত আওয়ামী লীগার কখনও অন্যায় প্রভাবের কাছে মাথা নত করেন না। বঙ্গবন্ধু করেননি, আমার নেত্রী শেখ হাসিনা করেননি। আমি তাঁদের অনুসারী। আমিও করব না। তবে আমি এ সমাজের একজন মানুষ। সমাজকে উপেক্ষা করে চলতে পারি না। তবু যেটি আমি উচিত নয় বলে মনে করি সেটি না-করার চেষ্টা করি। যেটি অন্যায় বলে মনে হয়, সেটি প্রতিহত করার চেষ্টা করি। আমি যেসব পারি বা পারব তা নয়, কিন্তু তাই বলে আমাকে চুপ মেরে বসে থাকলে চলবে না।
অন্যায় যে করে অন্যায় যে সহে
তব ঘৃণা তারে যেন তৃণসম দহে।

দেশের চেয়ে বড় কিছু নেই
আলোচনা হচ্ছিল বিভিন্ন বিষয়ে। এক সময় আলোচনায় চলে আসে রাজনীতি ও গণতন্ত্র। আলোচনাক্রমে চলে আসে রাজনীতিবিদ ও রাষ্ট্রনায়কের কথা। মাননীয় মন্ত্রী সৈয়দ আবুল হোসেন বললেন, আমি রাজনীতি করি সেজন্য রাজনীতিবিদ। তবে চূড়ান্ত বিশ্লেষণে আমি শুধু রাজনীতিবিদ নই, স্টেটসম্যানও বটে। তাই আমাকে আমার ভোটার, পরবর্তী নির্বাচন ও পরবর্তী প্রজন্ম তিনটার দিকে লক্ষ্য রাখতে হয়। A politician looks forward only to the next election. A statesman looks forward to the next generation. আমার রাজনীতি দেশের জন্য, দেশের মানুষের জন্য, বর্তমানের জন্য এবং ভবিষ্যতের জন্য। আগে দেশ তারপর রাজনীতি। নেত্রী আমাকে এ শিক্ষাই দিয়েছেন। দেশের উন্নতি ঘটলে জনগণের উন্নয়ন আসবে। বঙ্গবন্ধুর জীবন হতে আমি এ শিক্ষা পেয়েছি যে, দেশের চেয়ে বড় কিছু নেই। তাই দেশকে গড়ার লক্ষ্যে আমি শিক্ষাকে গুরুত্ব দিয়েছি।

ক্ষমতা
ক্ষমতার বহু সংজ্ঞা আছে। বিভিন্ন রাষ্ট্রবিজ্ঞানী বিভিন্নভাবে ক্ষমতাকে সংজ্ঞায়িত করেছেন। দাতা, শিক্ষানুরাগী, রাজনীতিবিদ, সংসদ সদস্য, মন্ত্রী এবং সর্বোপরি ব্যবসায়ী ও ব্যাংকার হিসেবে তিনি বহুমাত্রিক ক্ষমতার অধিকারী। এরূপ ব্যক্তিবর্গ সাধারণত ক্ষমতাকে সুসংহতরূপে ব্যবহার করতে পারেন না। সৈয়দ আবুল হোসেন প্রাত্যহিক জীবনে ক্ষমতার প্রয়োগ ও ব্যবহারে যেমন সচেতন তেমনি জনকল্যাণমুখী। তিনি মনে করেন- Power is the ability to do good things for others.

১. এলজিআরডি প্রতিমন্ত্রী থাকাকালীন অফিসারদের সাথে অনানুষ্ঠানিক আলাপে।
২. কালকিনিতে জনগণের বিশাল সংবর্ধনা দেয়ার পর পত্রিকায় সমালোচনা হলে 
তদপরিপ্রেক্ষিতে আলাপ প্রসঙ্গে।
৩. মন্ত্রণালয়ে কয়েকজন অফিসার ও রাজনীতিবিদের সাথে আলাপ প্রসঙ্গে।
৪. কমিউটর ট্রেন উদ্বোধনের লক্ষ্যে নারায়ণগঞ্জ যাবার পথে ট্রেনে কথাপ্রসঙ্গে 
আলাপক্রমে।
৫. মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের উদ্দেশে সৈয়দ আবুল হোসেন।
৬. মন্ত্রণালয়ের অফিসকক্ষে সচিব ও অতিরিক্ত সচিবের সাথে আলাপ প্রসঙ্গে।
৭. মন্ত্রণালয়ে নিজস্ব অফিস কক্ষে, ৯/৬/২০১০ খ্রিস্টাব্দ।
৮. গোপালগঞ্জ যাবার পথে গাড়িতে।
৯. বসিলায় তৃতীয় বুড়িগঙ্গা সেতু উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী আসার পূর্বে কয়েকজন নেতা 
ও প্রকৌশলীগণের সাথে আলাপ।
১০. আবুল হাসান চৌধুরী, সাবেক প্রতিমন্ত্রী, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়।
১১. অধ্যক্ষ তমিজ উদ্দিন, সাক্ষাৎকারে।

দ্বি তী য় অ ধ্যা য়

সময়ের পরশপাথর

সৈয়দ আবুল হোসেনের জন্য শুভেচ্ছা
কবীর চৌধুরী

রাজনীতি ঐক্যবদ্ধ প্রচেষ্টার ক্ষেত্র। এতে লক্ষ্য থাকে, উদ্দেশ্য থাকে, থাকে তা পূরণের কৌশল, পদ্ধতি ও কার্যক্রম। যে বিষয়টি এককভাবে সম্ভব হয় না, যা সফলভাবে বাস্তবায়ন করতে হলে সর্বসাধারণের সমর্থন প্রয়োজন, সেটি মানুষ রাজনীতিক দলের মাধ্যমে ঐক্যবদ্ধ হয়ে পূরণের চেষ্টা করে। এর মাধ্যমে এক দল মানুষ আর্থ-সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় কাঠামোসহ দৈনন্দিন জীবনের সাবলীল পরিসঞ্চালনের জন্য প্রয়োজনীয় উপাদানসমূহের সর্বোচ্চ প্রাপ্তি ও স্বাচ্ছ্যন্দময় সমাবেশ ঘটানোর মাধ্যমে জীবনযাত্রা শান্তিপূর্ণ করে তুলতে চেষ্টা করে।
যত মত তত পথ- এ প্রবাদের মতো রাজনীতিক দলও বহু। মতভিন্নতার কারণ দলভিন্নতা। এতে ক্ষতি নেই, বরং আছে বৈচিত্র্য, যা পৃথিবীকে নানা সম্ভারে সমৃদ্ধ করেছে। বর্তমান বিশ্বে রাষ্ট্র পরিচালনার জনপ্রিয় মাধ্যম হচ্ছে গণতন্ত্র। এটি নিয়ে যতই আলোচনা-সমালোচনা থাকুক না কেন, এখনও এর চেয়ে উত্তম কোনো উপায় মানুষ আবিষ্কার করতে পারেনি। আব্রাহাম লিংকনের ভাষায়- গভর্নমেন্ট অব দি পিপল, বাই দি পিপল অ্যন্ড ফর দি পিপল- শব্দগুলিই গণতন্ত্রের ভিত্তি। তাই এখানে প্রয়োজন পরমত সহিষ্ণুতা প্রকাশের মতো উদার মন।
রাষ্ট্র সবার জন্য, ধর্ম ব্যক্তির। রাষ্ট্রকে ব্যক্তিতে সীমাবদ্ধ করে দিলে সমষ্টির সামষ্টিকতা ব্যক্তির মতো ক্ষুদ্র গণ্ডিতে এসে অর্থহীন হয়ে যায়। রাজনীতির মূল উদ্দেশ্য উন্নয়ন সহায়ক ঐক্য। যেখানে ব্যক্তি সমষ্টিতে এসে বিলীন হয়ে যায়। কিন্তু আত্ম-অহমিকা ও গোঁড়ামি ঐক্যকে নষ্ট করে দেয়। ধর্মীয় গোঁড়ামি, উগ্রজাতীয়তাবাদ ও আত্ম-অহমিকা মানুষকে হিংস্র পশুর চেয়েও নৃশংস করে তোলে। এটা আমরা দেখেছি মহান স্বাধীনতা যুদ্ধের সময়, পঁচাত্তরের কালো রাত্রে, ২১ আগস্টে। ধর্মান্ধতা, গোঁড়ামি ও মৌলবাদীরা পৃথিবীর অন্যতম শত্র“, প্রগতির বাধা। এরা স্বাধীন চিন্তার লোকদের বিকশিত হতে দেয় না।
রাজনীতিতে দলীয়করণের প্রয়োজনীয়তা অস্বীকার করা যায় না, যেমন অস্বীকার করা যায় না জাতীয়তাবাদের তত্ত্বকে। তবে অতিমাত্রার দলীয়করণ উগ্র-জাতীয়তাবাদের মতোই ভয়ঙ্কর। গণতন্ত্রে রাজনীতিক দলের উদ্দেশ্য থাকে রাষ্ট্রীয় কর্মকাণ্ডে অধিক লোকের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা। এটি কার্যকরভাবে নিশ্চিত করতে হলে অতিমাত্রায় দলীয়করণ অবশ্যই পরিত্যাগ করতে হবে। নিজের দলের লোকের সাথে সাথে ভিন্নমতাবলম্বীদেরকেও সুযোগ-সুবিধা প্রদান করতে হবে। তাদের কাছে টেনে আনার প্রয়াস সযতেœ অব্যাহত রাখতে হবে। সবার প্রতি সহনশীল মনোভাব পোষণ না-করলে, ভিন্নমতাবলম্বীদের গুরুত্ব না-দিলে, গণতন্ত্র কেন, সব তন্ত্র নিষ্ফল হতে বাধ্য। রাজনীতির রুক্ষ মাঠে খেলতে গিয়ে অনেক রাজনীতিবিদকে ভণ্ডামির আশ্রয় নিতে দেখি। রূপ বদলায় প্রতিনিয়ত, সংকীর্ণ স্বার্থের জন্য আদর্শকে জলাঞ্জলি দিতে, এমনকি মানবতার কলঙ্ক ঘটাতেও, দ্বিধাবোধ করে না তারা সৈয়দ আবুল হোসেনের মধ্যে এমন ভণ্ডামি নেই। তিনি রাজনীতি আদর্শের জন্য কারও প্রতি তার বিদ্বেষ নেই। দল মত ও জাতিধর্ম নির্বিশেষে সবার প্রতি সম-আচরণ দ্বারা এমন একটি সমাজ প্রতিষ্ঠা করার স্বপ্ন তিনি দেখেন, যেখানে সহনশীল অবস্থানের মাধ্যমে প্রত্যেকে অপরকে শ্রদ্ধা ও ভালোবাসার দৃষ্টিতে মূল্যায়ন করার পরিবেশ খুঁজে পাবে।
গ্রাম দেশের প্রাণ। কিন্তু আমরা অনেকে ভুলে যাই গ্রামের কথা, গ্রামের মানুষের কথা। এটি আমাদের দেশের শহরমুখী প্রবণতার অন্যতম কারণ। ফলে গ্রামগুলি আজ অনেকটা মেধাশূন্য, কর্মশূন্য। ভালো শিক্ষালয় নেই গ্রামাঞ্চলে। নেই আধুনিক সুযোগ-সুবিধা প্রাপ্তির উপযুক্ত ক্ষেত্র। ঢাকা আজ মানুষের চাপে প্রায় বিধ্বস্ত। এ অবস্থার জন্য শুধু জনসংখ্যা বৃদ্ধিকে দায়ী করলে চলবে না। গ্রামের প্রতি বুদ্ধিমান ও সামর্থ্যবান মানুষের অবহেলাও কম দায়ী নয়। মানুষের অত্যাবশ্যকীয় সুবিধাসমূহ দেশের সর্বত্র ছড়িয়ে দিতে পারলে, শহরের উপর মানুষের চাপ কমবে। উন্নয়ন বিকশিত হবে সর্বত্র। কেবল তখনি দেশ প্রকৃত উন্নয়নের স্বাদ পাবে। সৈয়দ আবুল হোসেন নিজ গ্রামে আধুনিক মানসম্পন্ন স্কুল-কলেজ, রাস্তাঘাট, বিদ্যুৎ, হাসপাতাল এবং অন্যান্য সামাজিক প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলে সে পথে অগ্রসর হচ্ছেন। প্রত্যন্ত গ্রামাঞ্চলে তিনি ৬টি কলেজ এবং একটি বিশ্ববিদ্যালয় কলেজ প্রতিষ্ঠা করেছেন। তার এ উদ্যোগ দেশের পশ্চাদপদ এলাকা মাদারীপুর-কালকিনি ও নিকটবর্তী অঞ্চলসমূহের নিম্নবিত্ত পরিবারের সন্তান- সন্ততিদের শিক্ষা লাভের সুযোগ করে দিয়েছে। বিত্তবানরা সৈয়দ আবুল হোসেনের উদাহরণ অনুসরণ করলে দেশের উন্নয়ন ত্বরান্বিত হবে।
সৈয়দ আবুল হোসেন প্রতিষ্ঠিত কলেজসমূহের মধ্যে ডিকে সৈয়দ আতাহার আলী অ্যাকাডেমি অ্যান্ড কলেজ অন্যতম। কলেজ প্রতিষ্ঠার পর শিক্ষক নিয়োগ দেয়া হয়। কলেজে দু’জন মহিলা শিক্ষিকার থাকার মতো কোনো সুবিধাজনক আবাস ছিল না। তারা ভীষণ অসুবিধায় পড়ছিলেন। বিষয়টা জানতে পেরে সৈয়দ আবুল হোসেনের মা সুফিয়া খাতুন শিক্ষিকা দু’জনকে নিজের ঘরে কন্যার মতো স্থান দেন। শিক্ষিকা দু’জন ছিলেন হিন্দু। সুফিয়া খাতুন প্রাচীন কালের মহিলা। লেখাপড়া বেশি করেননি। এ রকম অবস্থায় ডাসারের মতো অজপাড়া গাঁয়ে তিনি তাঁর কক্ষে দু’জন হিন্দু মহিলাকে রাখার যে স্বতঃস্ফূর্ত সাহসিকতা দেখান তা বিস্ময়কর। তারই গর্ভে জন্ম সৈয়দ আবুল হোসেনের। মায়ের মৃত্যুর পর সৈয়দ আবুল হোসেন মায়ের সে ঘরটিকে পরিণত করেছেন শিক্ষিকা হোস্টেলে। সৈয়দ আবুল হোসেন ধর্মনিরপেক্ষ ব্যক্তি। তিনি জানেন, ধর্ম নিয়ে বাড়াবাড়ি ন্যাক্কারজনক। মানুষের বড় পরিচয় মনুষ্যত্বে।
ভদ্র, মুক্তবুদ্ধিসম্পন্ন, সহৃদয় ও সুশীল আচরণ মানুষের মনুষ্যত্ব বিকাশের প্রধান উপায়। মানুষ ও পশুর মধ্যে যতই পার্থক্য থাকুক না কেন, আচরণ দ্বারাই বোঝা যায়, কে মানুষ আর কে পশু। শক্তি পশুকে যেমন হিংস্র করে তোলে, তেমিন অর্থ-বিত্ত ও ক্ষমতাও অনেক মানুষকে হিংস্র করে তুলতে দেখা যায়। ইতিহাসে এর অনেক প্রমাণ আছে। কিন্তু যারা মানুষ, মনুষ্যত্ববোধে যাদের অন্তর উজ্জীবিত, তারা অর্থ ও ক্ষমতা অর্জনের সাথে সাথে বিনয়ী হয়ে ওঠে। শুধু পরিব্যাপ্তি নয়, পরিব্যাপ্তির সাথে সাথে গভীরতা থাকতে হয়। গভীরতাহীন পরিব্যাপ্তি ও পরিব্যাপ্তিহীন গভীরতা দুটোই বিপজ্জনক। সৈয়দ আবুল হোসেন যেমন গভীর তেমনি পরিব্যাপ্ত। তিনি অমায়িক। ক্ষমতা ও বিত্ত তাঁকে বিনয়ী করেছে। এক সময় তাঁর সঙ্গে আমার মোটামুটি ভালো পরিচয় ছিলো। পরে তা শিথিল হয়ে যায়। কিন্তু এখনও আমি তাঁর বিভিন্ন কর্ম ও উদ্যোগের খবর রেখেছি। আমি তার জনকল্যাণমূলক কাজের সফলতা কামনা করি।

কবীর চৌধুরী : জাতীয় অধ্যাপক

ধন্যবাদ সৈয়দ আবুল হোসেন
বেগম সুফিয়া কামাল
বিস্তারিত সিন্ধুর মতো মানব জীবন। কত বর্ণে, ছন্দে-হিল্লোলে, তরঙ্গে তরঙ্গে তার গতি। তেমনি প্রত্যেক মানুষেরই জীবন প্রবাহ বিচিত্ররূপে প্রবাহমান। তারই মধ্যে ব্যতিক্রমও আছে, এক একটি মানুষের জীবন থেকে সহস্রদল পদ্মের মতো বিকশিত বিস্তারিত হয় নানাবর্ণ। নানা রূপ, নানা কথা, হয়ে ওঠে ইতিহাস, হয়ে যায় কিংবদন্তি। সেই মানুষের কয়েক জনের মধ্যে একজন জন্মেছিলেন যার নামই ইতিহাস। সেই নাম বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান।
শেখ মুজিবুর রহমানের পরিচয় দিতে বা তাঁর জীবনী আলোচনা করার জন্যে তার কথা বলা হচ্ছে না, বাংলাদেশকে স্বাধীন করে আততায়ীর হাতে প্রাণ দিয়ে শূন্য হাতে তিনি শেখ হাসিনা ও শেখ রেহানাকে রেখে গিয়েছেন। 
শেখ হাসিনা আজ সর্বজন প্রিয় সংগ্রামী নেত্রী। আমাদের একান্ত আপন। সকলের মিলিত মঙ্গল প্রার্থনা তার জন্য সতত উচ্চারিত হচ্ছে। তার গুণগ্রাহীর অভাব নেই, তেমনি তার দোষ ত্র“টি নিয়ে ব্যঙ্গ বিদ্রƒপ করার লোকেরও অভাব নেই। বিশ্বে যারাই প্রসিদ্ধি লাভ করেছেন, তাদের জীবনের এ ঘটনা অপরিহার্য।
শেখ হাসিনার জীবন ঘটনাবহুল। বড় দুঃখ, বড় সংকটের মধ্য দিয়ে তার পদচারণা। তাকে নিয়ে আজ আলহাজ্ব সৈয়দ আবুল হোসেন যে প্রশস্তি রচনা করেছেন, তাতে করে হাসিনার প্রতি হোসেন সাহেবের অপরিসীম মমতা ও শ্রদ্ধার অনাবিল প্রকাশ পেয়েছে। কিন্তু হাসিনার জীবন বহু কর্তব্য, বহু বক্তব্য, বহু কর্মকাণ্ডে এখন ব্যস্ত; বিকশিত, বিস্তারও হবে। কঠোর, কুটিল, বক্র, সর্পিল পথ ধরে বহন করে হাসিনার বহমান জীবনের প্রতিচ্ছবি আমাদের উপহার দিবেন প্রত্যাশা করি।
এ গ্রন্থে সৈয়দ আবুল হোসেন আমাদের যতটুকু দিয়েছেন, তার জন্য বার বার তাকে ধন্যবাদ জানাতে ইচ্ছা হয়। আল্লাাহ তাকে এ পথযাত্রায় সাহসী পাথেয় দান করুন, এ প্রার্থনা করি।

বিশেষ দ্রষ্টব্য : আলহাজ্ব সৈয়দ আবুল হোসেনের লেখা ‘শেখ হাসিনা সংগ্রামী জননেত্রীর প্রতিকৃতি’ নামক গ্রন্থের ভূমিকায় বাংলাদেশের প্রখ্যাত মহিলা কবি বেগম সুফিয়া কামাল।

শুভেচ্ছা
আনিসুজ্জামান
সৈয়দ আবুল হোসেনের সম্মাননায় একটি সংকলনগ্রন্থ প্রকাশিত হতে যাচ্ছে। সেই উপলক্ষে দু’টি কথা।
তিনি যখন প্রথম দফায় বাংলাদেশ সরকারের মন্ত্রী নিযুক্ত হন, তখন তাঁর সঙ্গে আমার যথাযথ পরিচয় ঘটে। তাঁকে সদালাপী ও সুরসিক মনে হয়।
তারপর কী এক গোলযোগে তিনি পদত্যাগ করলেন। ব্যাপারটা যে গুরুতর নয়, তা বোঝা গেল মন্ত্রীর পদে তিনি দ্বিতীয়বার অধিষ্ঠিত হওয়ায়। এবার তিনি নিলেন যোগাযোগ মন্ত্রণায়ের দায়িত্ব। তারপর একদিন বললেন, তিনি যাত্রাবাড়ি ঘুরে এসেছেন, কোথাও যানজট পাননি। আমরা হতবাক।
এক আমন্ত্রণে তাঁর দেখা পেয়ে কথাটা পাড়লাম। জানতে পারলাম, তিনি খুব সকালে অফিসে রওয়ানা হন, বেশ রাত করে ঘরে ফেরেন। তাই যানজট দেখতে পান না। মনে প্রশ্ন এলো, দিনের মধ্যে কখনো কি তাঁকে বের হতে হয় না? মনে এলেও প্রশ্নটা আর করা হয়নি।
আমার আগের প্রশ্নের উত্তর যে তিনি প্রসন্নভাবে দিলেন, তাতেই বাধিত হলাম। তারপর আবার যখন দেখা হয়েছে, সহাস্যবদনেই তিনি আলাপ করেছেন। বোঝা যায়, তিনি অতি ভদ্র মানুষ।
এখন জানছি, শুধু তাই নয়, তিনি একজন বিদ্যোৎসাহী ব্যক্তিও। তাঁর এলাকায় তিনি অনেক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড়েছেন, জ্ঞানের আলো ছড়াতে সাহায্য করেছেন। শুধু ধন থাকলেই যে মানুষ সৎকাজ করতে পারে, তাই নয়। মনও থাকা চাই। সৈয়দ আবুল হোসেনকে তাই আন্তরিক শুভেচ্ছা জানাই। জনহিতে তিনি নিরলস থাকুন, দীর্ঘজীবী হোন।

আনিসুজ্জামান : এমেরিটাস অধ্যাপক ও গবেষক

নিপাট ভদ্রলোক
সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়
বাংলাদেশের ফরিদপুর জেলার আমগাঁও গ্রামে আমার জন্ম। প্রশাসনিক বিবর্তনে আমগাঁও এখন মাদারীপুর জেলার কালকিনি উপজেলায় ঠাঁই পেয়েছে। এটি সৈয়দ আবুল হোসেন সাহেবের সংসদীয় এলাকা। দেশ বিভাগ না-হলে আজ আপনাদের মতো আমিও বলতে পারতাম- আমার দেশ বাংলাদেশ।
প্রত্যন্ত আমগাঁও ছিল সবুজ শ্যামলে অপরূপ। মনে হয় এখনও তেমন আছে। মনে পড়ে আমগাঁও; ছোট ছোট মেটো পথ, সারি সারি গাছ, নদীর তীর, পাখির নীড়। দেখতে পাই সহজ সরল কৃষাণ-কৃষাণীরা রূপোলি ধানের হাতছানিতে ছুটে যাচ্ছে মাঠে। মনে পড়ে শীতের সকাল, শরতের দুপুর। সোদা গন্ধভরা বাংলাদেশ আমাকে এখনও টানে, জন্মভূমির টান, নাড়ির টান। ভুলতে পারি না ছেলেবেলার সে আমগাঁও, পূর্বপুরুষের ভিটেমাটি। কত সুখ, কত স্মৃতি, কত বন্ধু, কত প্রীতি ছড়িয়ে আছে বাংলাদেশে। সময়ের স্রোতে অনেক কিছু আস্তে আস্তে স্মৃতির অতলে তলিয়ে গেছে। শুধু জেগে আছে কান্নায় মোড়া একঝাঁক দুঃখ।
সৈয়দ আবুল হোসেন বয়সে আমার ছোট। তাঁকে আমি কয়েক বার দেখেছি। উনি খুবই শ্রদ্ধেয় এবং বিরাট মাপের মানুষ। শিক্ষার প্রতি তাঁর গভীর অনুরাগ আমাকে মুগ্ধ করেছে। অর্থ আর ক্ষমতা অনেককে অহমিকার অন্ধকারে নিমজ্জিত করে দেয়। সৈয়দ আবুল হোসেন অর্থ ও ক্ষমতা দুটোর অধিকারী। তবু তিনি বিরাট মনের নিপাট ভদ্রলোক। কোনো অহমিকা নেই। শিশুর মতো সরল। জ্ঞানীর মতো বিনয়ী। যতবার দেখেছি তাই মনে হয়েছে। সদাহাস্য প্রফুল্ল মনের এ মানুষটির মুখ আমার স্মৃতিকে নাড়া দেয়। মনে পড়ে যায় বাংলাদেশের কথা, বাংলাদেশের মুখ।
উনি উচ্চ শিক্ষিত আবার স্বশিক্ষিত। তাই মনটা অনেক বড়। যারা বড় মনের তারা অন্যকেও বড় ভাবতে পারেন। জ্ঞানী ও যোগ্য লোককে সম্মান দিতে জানেন। আমি মাদারীপুর গিয়েছিলাম। তার আতিথেয়তার কথা ভুলব না। বাংলাদেশের মানুষ আমাকে উজাড় করে দিয়েছিলেন সবটুকু ভালোবাসা।
সৈয়দ আবুল হোসেন একজন জনদরদি নেতা। সাধারণ মানুষের প্রতি রয়েছে গভীর ভালোবাসা। শিক্ষা ছাড়া কোনো জাতি উন্নতি লাভ করতে পারে না। তাই শিক্ষা বিস্তারের লক্ষ্যে তিনি গ্রামাঞ্চলে অনেকগুলো শিক্ষা প্রতিষ্ঠান স্থাপন করেছেন। শিক্ষার মাধ্যমে জাতিকে মুক্তির প্রচেষ্টা সৈয়দ আবুল হোসেনকে স্মরণীয় করে রাখবে।
শিক্ষা মানুষকে উদার করে। সৈয়দ আবুল হোসেন একজন শিক্ষিত মানুষ। তাই উদারমনা। তিনি ধর্মপরায়ণও বটে। ধর্মপরায়ণতা অনেককে সংকীর্ণ করে তোলে। তবে উনাকে সংকীর্ণ করতে পারেনি বরং উদার করেছে। প্রকৃত ধার্মিকেরা জ্ঞানীর মতোই উদার। অসাম্প্রদায়িক চেতনা উনাকে আরও বড় করেছে। আমি যখন মাদারীপুর গিয়েছিলাম তখন দেখেছি দলমত ধর্মনির্বিশেষে সবাই সৈয়দ আবুল হোসেনকে কেমন গভীর শ্রদ্ধা করেন।
সৈয়দ আবুল হোসেন সম্মাননা গ্রন্থ ‘সময়ের পরশপাথর’ প্রকাশ একটি প্রশংসনীয় উদ্যোগ। এটি সময়ের একটি দাবি পূরণ করল। যোগ্য ব্যক্তিকে যোগ্য সম্মান প্রদর্শন মহানুভবতার পরিচায়ক। যারা মহানুভবÑ তারাই কেবল এ কাজটি করতে পারেন। গুণীর কদর কম হলে গুণীর সংখ্যাও কমে যায়। সৈয়দ আবুল হোসেনকে সম্মান প্রকাশের এ উদ্যোগে আমি খুশি হয়েছি। তার সম্মাননা গ্রন্থ প্রকাশ উপলক্ষে আমাকে স্মরণ করায় সবাইকে সবিনয় শ্রদ্ধা জানাচ্ছি। আমি এ শুভ উদ্যোগের সাফল্য কামনা করি। দীর্ঘায়ু কামনা করি সৈয়দ আবুল হোসেনের।

সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় : কবি ও উপন্যাসিক

আমার ভালোলাগা একজন
আবদুল মান্নান সৈয়দ
মফিজ চৌধুরী ছিলেন স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম মন্ত্রীসভার অন্যতম সদস্য। ভদ্রলোক ভালো লিখতেন, ভালো বলতেন। কয়েকটি বিদেশি ভাষা জানতেন তাই ভালো অনুবাদকও ছিলেন। তবে অনুবাদ করতেন জাহাঙ্গীর চৌধুরী নামে। বয়সে বড় হলেও ছিলেন অনেকটা বন্ধুর মতো। আড্ডায় মাঝে মাঝে সৈয়দ আবুল হোসেনের কথা বলতেন; বলতেন- মাদারীপুরের ছেলে, ব্যবসায়ী, রাজনীতিবিদ, শিক্ষানুরাগী। মফিজ চৌধুরীর মুখে আমি প্রথম সৈয়দ আবুল হোসেনকে জানার সুযোগ পাই। এরপর পত্র-পত্রিকা বা পর্দায় সৈয়দ আবুল হোসেন প্রসঙ্গ আসলে মনোযোগ না-দিয়ে পারতাম না।
১৯৮৯ সালে মাদারীপুর জেলার খোয়াজপুরে সৈয়দ আবুল হোসেন একটি কলেজ প্রতিষ্ঠা করেন- মফিজ চৌধুরীর কথাটি আমি খুব হালকাভাবে নিই। কলেজ অনেকে প্রতিষ্ঠা করেছেন এবং করে যাচ্ছেন। তাই প্রতিষ্ঠা প্রসঙ্গটি তেমন গুরুত্বের দাবি রাখে না। তবে এ কলেজটি গুরুত্বের দাবি রাখে। এর কারণ প্রতিষ্ঠাগত নয়, প্রতিষ্ঠা-পরবর্তী ফলগত, পরিচর্যা এবং উদ্দেশ্যগত। ১৯৯১ সালে কলেজটির ছাত্রছাত্রীরা প্রথম বারের মতো বোর্ড পরীক্ষায় অংশ নেয়। প্রথম বারেই বাজিমাত। বোর্ডের মেধা তালিকার দু’টি শীর্ষ স্থান দখল করে নেয়- সৈয়দ আবুল হোসেন কলেজ, খোয়াজপুর। সারা বাংলাদেশে সাড়া পড়ে যায়, আসলে সাড়া পড়ারই ঘটনা। এর পরের বছর আরও ভালো রেজাল্ট করে কলেজটির ছাত্র-ছাত্রীরা, পরের বছর আরও, পরের বছর আরও…। সংগত কারণে ১৯৯২ সাল হতে সৈয়দ আবুল হোসেন দেশব্যাপী পরিচিত হয়ে ওঠে তার সৃষ্টির মাধ্যমে। এ জন্য বলা হয়-
স্রষ্টার কৃতিত্ব সৃষ্টি
জাতির ঐতিহ্য কৃষ্টি।
সাকো ইন্টারন্যাশনাল লিঃ সৈয়দ আবুল হোসেনের ব্যবসা প্রতিষ্ঠান। 
বিশ্বস্ততা ও দক্ষতার জন্য বিদেশেও এর সুনাম রয়েছে। শুধু ব্যবসা করার জন্য তিনি সাকো প্রতিষ্ঠা করেছেন, এটি ঠিক নয়। সাকো প্রতিষ্ঠার পেছনে তার উদ্দেশ্য ছিল জনকল্যাণ। তাই সাকো শুধু ব্যবসা প্রতিষ্ঠান নয়। একই কারণে সৈয়দ আবুল হোসেনও অন্য দশজন ব্যবসায়ীর মতো শুধু ব্যবসায়ী নন। অনেকে মুখে বড় বড় বুলি আউড়ে থাকেন, কিন্তু কাজের সময় ডুমুরের ফুল হয়ে যায়। ব্যবসায়ী ও রাজনীতিবিদরা- এ বিষয়ে বড় সেয়ানা। মুখে বলেন একটা, কাজ করেন অন্যটা। সৈয়দ আবুল হোসেন কিন্তু কথা ও কাজে এক। দেশে তার চেয়ে ধনী অনেক ব্যবসায়ী ও শিল্পপতি আছেন। তাদের কয়জন সৈয়দ আবুল হোসেনের মতো শিক্ষালয় প্রতিষ্ঠা করতে পেরেছেন?
ছাত্রজীবন শেষ করে (১৯৭২) টিসিবি-তে কর্মকর্তা হিসেবে যোগ দিয়েছিলেন সৈয়দ আবুল হোসেন। বেশিদিন চাকুরি করেননি। চাকুরি করে ভাত খাওয়া যায়, খাওয়ানো যায় না কাউকে। যারা খেতে ও খাওয়াতে চান তাদের জন্য চাকুরি উপযুক্ত পেশা হতে পারে না। মনে হয় তিনি এটি বুঝেছিলেন। তাই সময় থাকতে চাকুরি ছেড়ে ব্যবসায় নেমেছিলেন। সরকারি চাকুরি করে অঢেল অর্থের মালিক হয়েছেন- এমন অনেক লোক দেখা যায়। অভিজাত এলাকায় আলিশান বাড়ি, বিদেশে পরিবার, বিলাসবহুল গাড়ি…। সরকারি চাকুরি করে এসব করা কারও পক্ষে সম্ভব নয়। কারণ চাকুরেদের বেতন টেনে-টুনে খেয়ে-পরে চলার পক্ষেও যথেষ্ট নয়। তো ওগুলো আসবে কোত্থেকে? সুতরাং তাদের কেউ ঐ ধন বৈধ পথে আয় করেনি। অবশ্য জানতে চাইলে বলেন- শ্বশুর দিয়েছেন, শ্যালিকার স্বামী দিয়েছেন। মিথ্যা কথা। অবৈধ আয় কখনও ভালো কাজে ব্যয় করা যায় না, মিথ্যুক জন সৎ কাজ করতে পারেন না। যাদের ভালো কাজ করার ইচ্ছা থাকে, তারা ঘুষ নিতে পারেন না। যদি কোনো ঘুষখোর কিংবা অবৈধ উপার্জনকারী কল্যাণমূলক কাজ করার ইচ্ছা পোষণ করেন, তার উচিত ঘুষ কিংবা অবৈধ উপার্জন ত্যাগ করা। তাদের জন্য এর চেয়ে ভালো কাজ আর কিছু হতে পারে না।
এবার প্রসঙ্গে ফেরা যাক। অর্থ উপার্জন করে সমাজ সেবায় নিজেকে উৎসর্গ করার জন্য সৈয়দ আবুল হোসেন ব্যবসায় নেমেছেন- এটি তার নিজের উক্তি। অন্যান্য ব্যবসায়ীর মতো তার উক্তি শুধু শব্দমালায় সীমাবদ্ধ থেকে যায়নি। অন্তত পরবর্তী কার্যক্রম তা-ই বলে। সমাজসেবায় উৎসর্গিত হবার জন্য তিনি ব্যবসায় নেমেছেন- এটি তিনি কার্যে পরিণত করে প্রমাণ করেছেন। রাজনীতিবিদ ও ব্যবসায়ীর মতো সৈয়দ আবুল হোসেন কথা ও কাজের মধ্যে ফাঁক রাখতে পারেননি। এ জন্য তার প্রতি আমার আগ্রহ ছিল, প্রচ্ছন্ন একটা শ্রদ্ধাবোধও ছিল।
১৯৯৪ সালের শিক্ষকদের অধিকার আদায়ের আন্দোলনে সৈয়দ আবুল হোসেনের সহমর্মিতা শিক্ষক সমাজে তিনি স্বমহিমায় উজ্জ্বল হয়ে উঠেছিলেন। বিরতিহীনভাবে সাত দিন চলেছিল সমাবেশ। সে আন্দোলনের মঞ্চে উপস্থিত হয়ে তিনি বক্তৃতা দিয়েছিলেন, ক্ষুধার্ত শিক্ষকদের খাবার ও ঔষধ পথ্যের ব্যবস্থা করেছিলেন। অনশনরত শিক্ষকগণের বৃষ্টিতে ভেজার খবর পেয়ে ব্যবস্থা করেছিলেন পলিথিনের। বরিশাল হতে সমাবেশে আসার পথে একজন শিক্ষক অসুস্থ হয়ে মৃত্যুবরণ করেন। সৈয়দ আবুল হোসেন সে শিক্ষকের স্ত্রীকে নগদ পঞ্চাশ হাজার টাকা প্রদান এবং সন্তান-সন্ততিদের ভরণপোষণের ব্যবস্থা করেছিলেন। তার এসব কাজ শিক্ষকগণ অত্যন্ত কৃতজ্ঞতার সাথে গ্রহণ করেছিলেন। যা তাকে শিক্ষক সমাজে মহানুভব হিসেবে প্রতিষ্ঠা করে। শিক্ষক সমাজের প্রতি সৈয়দ আবুল হোসেনের শ্রদ্ধা ও মমত্ববোধের কথা অনেক সহকর্মী আমাকে উচ্ছ্বসিত প্রশংসার সাথে বলেছেন। শিক্ষক হিসেবে এটি আমাকে অভিভূত করেছে। শিক্ষকদের কেউ গুরুত্ব দেয় না- সৈয়দ আবুল হোসেন গুরুত্বহীন শিক্ষকদের গুরুত্ব দিয়েছেন, বিপদে কাছে এসে দাঁড়িয়েছেন। তাই তিনিও গুরুত্বের দাবি রাখেন। এ বিষয়টি শিক্ষক হিসেবে আমাকে তার প্রতি শ্রদ্ধাশীল করে তুলেছে। তাই তাকে আমার ভালো লাগে।
প্রায় সাড়ে তিনশ শিক্ষক-কর্মচারী তার বিভিন্ন কলেজে অধ্যয়ন পেশায় নিয়োজিত। শিক্ষকগণ তার অধীনস্ত। তবে তিনি তাদের অধস্তন মনে করেন না, মনে করেন তার শিক্ষক। তাই সব শিক্ষককে নিজের শিক্ষকের মতো শ্রদ্ধা করেন, গুরুত্ব দেন, তাদের জাতি গঠনের কারিগর আখ্যায়িত করে প্রকাশ্যে স্বীকৃতি দেন। ছাত্রজীবনেও তিনি শিক্ষক-অন্ত-প্রাণ ছিলেন। মন্ত্রী হয়েও পা ছুঁয়ে সম্মান দেখান শিক্ষকদের. বিপদে-আপদে সহায়তা দেন আন্তরিক আগ্রহে। শিক্ষক সমাজ এখন ছাই ফেলার ভাঙা কুলোর মতো, শিক্ষক পেশাকে ভাবেন ঢেঁকি গেলা। ক্ষমতা ও বিত্ত অর্জনের ক্ষেত্র কম থাকায় সাধারণ লোকেরাও শিক্ষকদের গুরুত্ব দেন না। গুরুত্বহীন শিক্ষক সমাজের প্রতি যার সহমর্মিতা রয়েছে, শ্রদ্ধা রয়েছে তিনি ভালো লোক না-হয়ে পারেন না। তাই তাকে আমার ভালো লাগে।
রাজনীতিবিদগণের প্রতি সাধারণ মানুষের আস্থাহীনতার ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট যেমন নিষ্ঠুর তেমন দীর্ঘস্থায়ী। সামন্ত যুগ, রাজা-বাদশা ও জমিদারগণের শোষণ এখনও রূপকথার শিউরে ওঠা প্রচ্ছদ। ব্রিটিশ শাসকদের অত্যাচার ইতিহাসের রক্তাক্ত অধ্যায়। পাকিস্তান আমলে তা রুদ্ররূপ ধারণ করেছিল। সদ্য স্বাধীন কিন্তু বিধ্বস্ত বাংলাদেশের বিনির্মাণে সহায়তার পরিবর্তে দেশদ্রোহী ও ধর্মান্ধদের নৃশংসতার কথা জাতি কখনও কী ভুলতে পারবে? সামরিক আইনের পর সামরিক আইন গণতন্ত্রকে বিপন্ন করেছে বার বার। কয়টা নির্বাচন নিরপেক্ষ হয়েছে বাংলাদেশে? রাজনীতিবিদগণের অহংবোধ, ক্ষমতার আস্ফালন, অপব্যবহার, ধর্মীয় গোঁড়ামি কোনোটি জনগণ ভালো চোখে দেখেননি। রাজনৈতিক হানাহানি এক সময় বর্গী আতঙ্কের চেয়েও প্রকট হয়ে উঠেছিল। এ কারণে অধিকাংশ রাজনীতিবিদ জনগণের আস্থার বাইরে রয়ে গেছে। এ সময় সৈয়দ আবুল হোসেন একজন রাজনীতিবিদ হয়েও শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, সংসদীয় এলাকা এবং কর্মক্ষেত্রে নিরপেক্ষতা, সহনশীল অবস্থান ও উদার মনের পরিচয় দিয়েছেন। প্রতিপক্ষকে বুকে টেনে নিয়েছেন। তা আমাকে অভিভূত না-করে পারেনি। এ জন্য তাকে আমার ভালো লাগে।
ব্যবসা প্রতিষ্ঠান হলেও সাকো আর্থ-সামাজিক উন্নয়ন ও মানবাধিকার প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে কাজ করে যাচ্ছে। এটি প্রমাণ করে যে, সাকো শুধু ব্যবসা প্রতিষ্ঠান নয়, বরং দেশের আর্থসামাজিক ভিত মজবুত করার একটি খুঁটি। যেটি শক্ত হাতে ধরে রেখেছেন সৈয়দ আবুল হোসেন। বাংলাদেশের অধিকাংশ এনজিও সেবার আড়ালে ভোগের ক্যাসিনো, কাবুলিওয়ালাদের মতো সুদের কারবারে নিয়োজিত। চোখে তো তাই দেখি। এক্ষেত্রে এসডিসি একটি সম্পূর্ণ অলাভজনক প্রতিষ্ঠান- আয়ের জন্য নয়, ত্যাগের জন্যই যেটি নিবেদিত। বিভিন্ন সামাজিক সমস্যায় জনমত সংগ্রহ, প্রতিবেদন তৈরি এবং প্রায়োগিক গবেষণা পরিচালনা করে সমস্যার উৎস খুঁজে বের করা এর আরেকটি উদ্দেশ্য। শিক্ষা আলোকিত সমাজ ও উন্নত জাতি গঠনের পূর্বশর্ত। শিক্ষা মানুষের পাশবিক গুণাবলীকে দুরীভূত করে মানুষকে যৌক্তিক করে তোলে। আগামী প্রজন্মকে শিক্ষিত ও দক্ষ জনসম্পদ হিসেবে গড়ে তুলতে হলে নারী শিক্ষার বিকল্প নেই। সৈয়দ আবুল হোসেন বলেন, ‘দেশের অর্ধেক জনসংখ্যা নারী। অর্ধেককে অন্ধকারে রেখে কোনো জাতির প্রকৃত উন্নয়ন সম্ভব নয়। সম্ভব নয় সার্বভৌম আর্থ-সামাজিক ভিত প্রতিষ্ঠা করা। এজন্য প্রয়োজন নারীর ক্ষমতায়ন। কেবল শিক্ষার মাধ্যমে সর্বোত্তম উপায় ও সর্বনিম্ন সময়ে নারীর ক্ষমতায়ন টেকসই করা যায়।’ ‘আমাকে একটি শিক্ষিত মা দাও আমি একটি শিক্ষিত জাতি দেব’- নেপোলিয়নের এ উক্তিটি সৈয়দ আবুল হোসেন খুব গুরুত্বের সাথে মনে রাখেন। একজন শিক্ষিত মায়ের পক্ষে এক জন সন্তানকে যত দক্ষ ও আদর্শ মানুষ হিসেবে গড়ে তোলা সম্ভব, একজন শিক্ষিত পিতার পক্ষে তা সম্ভব নয়। কারণ, শিশুরা মায়ের প্রত্যক্ষ তত্ত্বাবধান ও নিবিড় পরিচর্যা যত বেশি সময় পায় পিতার নিকট হতে তত সময় পায় না। তাই সৈয়দ আবুল হোসেন মনে করেন, শিশুদের উপযুক্ত নাগরিক হিসেবে গড়ে তোলার ক্ষেত্রে মা তথা নারীর বিকল্প আর কিছু হতে পারে না। সৈয়দ আবুল হোসেন আরও মনে করেন, ‘যিনি আত্মসচেতন, পারিপার্শ্বিকতা যথাযথ বিশ্লেষণ করতে পারেন এবং নিজের জীবন সম্পর্কে নিজেই স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত গ্রহণে সক্ষম, তিনিই ক্ষমতাবান। এ সব উপাদান পেতে হলে একজন নারীকে শিক্ষিত হতে হবে। শিক্ষিত হলে আত্মসচেতনতা আসে, পরিপুষ্ট হয় আর্থিক স্বাধীনতা।’ এ লক্ষ্য অর্জনের প্রাথমিক পদক্ষেপ হিসেবে তিনি এসডিসি-এর মাধ্যমে গ্রামীণ নারীদের কর্মমুখী শিক্ষায় প্রশিক্ষিত করে তুলছেন। আমি নিজেই নারীর ক্ষমতায়নের একজন একনিষ্ঠ সমর্থক। সৈয়দ আবুল হোসেন আমার ইচ্ছার প্রতিফলন ঘটাচ্ছেন। তাই রাজনীতি করলেও তাকে ভালো লাগে।
সৈয়দ আবুল হোসেন ডি কে আইডিয়াল সৈয়দ আতাহার আলী একাডেমী এন্ড কলেজ, শেখ হাসিনা উইমেন্স কলেজ এন্ড একাডেমি, ডাসার, কালকিনি; কালকিনি সৈয়দ আবুল হোসেন বিশ্ববিদ্যালয় কলেজ, কালকিনি; সৈয়দ আবুল হোসেন কলেজ খোয়াজপুর, টেকেরহাট এবং খাসেরহাট সৈয়দ আবুল হোসেন কলেজ নামক পাঁচটি কলেজ প্রতিষ্ঠা করেছেন। নারী শিক্ষার প্রসারে শেখ হাসিনা উইমেন্স কলেজ এন্ড একাডেমি (১৯৯৫) বৃহত্তর বরিশাল ও ফরিদপুর অঞ্চলে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে যাচ্ছে। এখানে অধ্যয়নরত প্রায় সাড়ে পাঁচশ ছাত্রীর ভর্তি ফি, পাঠ্যপুস্তক ও বেতন ফ্রি। ভালো ফল অর্জনকারী ছাত্রীদের খাওয়া-দাওয়া পর্যন্ত ফ্রি করে দিয়েছেন প্রতিষ্ঠাতা। প্রত্যেক ছাত্রীর খাট, মেট্রেস, লেপ, তোষক, বালিশ, টেবিল, চেয়ার ইত্যাদি প্রতিষ্ঠান থেকে দেয়া হয়। লোডশেডিঙের সময় জেনারেটরের মাধ্যমে বিদ্যুৎ সরবরাহের ব্যবস্থা করা হয়েছে। এক মিনিটের জন্যও মেয়েদের অন্ধকারে থাকতে হয় না। কন্যা সন্তানের জন্ম গ্রামীণ পরিবারে সাধারণত অবাঞ্চিত। মেয়েদের লেখাপড়ায় অভিভাবকদের নিরুৎসাহ সর্বজনস্বীকৃত। মেয়েদের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পাঠানোর চেয়ে পাত্রলগ্ন করাকে উত্তম মনে করা হয়। অন্যদিকে অনেক মেয়ে অর্থাভাবে আইবুড়ো হয়ে থেকে যায়। দীর্ঘদিন অবিবাহিত থাকায় সামাজিকভাবে লাঞ্ছনার শিকার হয়। এ সকল সমস্যা সমাধানে সৈয়দ আবুল হোসেন বিভিন্ন প্রতিকারমূলক পদক্ষেপ গ্রহণ করেছেন। বাল্যবিবাহ রোধকল্পে এসডিসি নিবিড় গণসচেতনতা সৃষ্টির কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে। গত দুই দশকে সৈয়দ আবুল হোসেন শিক্ষা, স্বাস্থ্য, বাসস্থান, নিয়োগ, প্রশিক্ষণ, দক্ষতাবৃদ্ধি ও আয়বর্ধনমূলক সহায়তার মাধ্যমে ১০ হাজারের অধিক নারীকে স্বনির্ভর হিসেবে গড়ে তুলে ক্ষমতায়নের পথকে প্রশস্ত করেছেন।১ এদের উত্তরণ উৎসাহিত করেছে আরও অনেককে। নাড়া দিয়েছে গোটা সমাজকে। তাই সৈয়দ আবুল হোসেন একজন সমাজ সংস্কারকও বটে। সমাজ সংস্কারকদের অনেকে পছন্দ করেন না কিন্তু আমি জানি সংস্কার ছাড়া কোনো জাতি সমৃদ্ধি লাভ করতে পারে না। সৈয়দ আবুল হোসেন সংস্কারের কাজে নিয়োজিত- এ জন্য তাকে আমার ভালো লাগে।
সৈয়দ আবুল হোসেন শুধু শিক্ষানুরাগী, ব্যবসায়ী এবং রাজনীতিবিদ নন, একজন লেখকও বটে। তার কয়েকটি বই পড়ার সৌভাগ্য আমার হয়েছে। রাজনীতি ও সমাজ সংস্কার বিষয়ক লেখা। প্রতিটি লেখা ক্ষুরধার যুক্তি আর হৃদয়গ্রাহী উদ্ধৃতি পরিচ্ছন্ন প্রজ্ঞার পরিচয় দেয়। এটি তাকে আমার ভালো লাগার অন্য আর একটি কারণ। যার মাঝে আমার ভালো লাগার এতগুলো কারণ রয়েছে তাকে ভালো না-বেসে, শ্রদ্ধা না-করে পারা যায় না।
নারীর ক্ষমতায়নে সৈয়দ আবুল হোসেনের একাগ্রতা প্রশংসনীয়। তিনি দুই কন্যার গর্বিত পিতা। উভয়ে আধুনিক শিক্ষায় শিক্ষিত এবং উদার মনের অধিকারী। আমার মনে হয়, নারীদের প্রতি তার সহমর্মিতা পিতৃস্নেহ উৎসরিত একটি নিখাদ প্রেরণা, অবিরাম প্রবাহ। তার এ প্রেরণায় লক্ষ্যে পৌঁছার তাগিদ আছে কিন্তু অন্ত নেই। তিনি অমায়িক, বিনয়ী ও নিরহঙ্কার চরিত্রের একজন বড় মনের মানুষ- আমার সহকর্মী শিক্ষকগণ এভাবে তাকে মূল্যায়ন করেন। আর কিছু না-হোক, অন্তত কর্ম ও আচরণ তাকে বাঁচিয়ে রাখবে।

আবদুল মান্নান সৈয়দ : শিক্ষাবিদ, কবি ও কথাসাহিত্যিক

১. গবেষণা জরিপ, জনগণের মানুষ।

অপরাধী জানিল না কি বা অপরাধ তারÑ
বিচার হইয়া গেল
অসীম সাহা
গত ৩১ জুলাই (২০১২) ‘দৈনিক কালের কণ্ঠ’ পত্রিকার সম্পাদকীয় পৃষ্ঠায় আবদুল গাফ্ফার চৌধুরীর ‘কালান্তরের কড়চা’য় একটি উপসম্পাদকীয় ছাপা হয়েছে, যার শিরোনাম ‘আক্রান্ত আবুল হোসেনÑটার্গেট শেখ হাসিনা’। লেখাটি পড়ে আমার ভালো লাগল এ জন্যে যে, গত এক বছর যাবৎ প্রাক্তন যোগাযোগ মন্ত্রী সৈয়দ আবুল হোসেনকে টার্গেট করে কতিপয় পত্রিকা এবং বুদ্ধিজীবী ও কলামিস্ট যেভাবে তাকে তুলোধুনো করে ছাড়ছিল, তার কিছুটা মোক্ষম জবাব দিয়ে তিনি অন্তত এইসব জ্ঞানপাপীদের মুখে কিছুটা হলেও কালি লেপন করে দিয়েছেন। গাফ্ফার ভাই এমন একজন কলামিস্ট, যার কলম থেকে সত্য অগ্নিস্ফুলিঙ্গের মতো বেরিয়ে আসে, আর সেজন্যেই সকল পত্রিকায় তাঁর কলামের এত কদর। 
সৈয়দ আবুল হোসেন যখন ভেতর এবং বাইরে থেকে চতুর্মুখী আক্রমণে দিশেহারা, তখনই আমার মনে হয়েছিল, তাকে নিয়ে কিছু একটা লিখি। ভাবতে ভাবতে গাফ্ফার ভাইয়ের লেখাটা আমাকে অনুপ্রাণিত ও প্ররোচিত করলো আবুল হোসেন সম্পর্কে কিছু সত্য কথা তুলে ধরতে। 
শুরুটা হয়েছিল গত ঈদে যোগাযোগ ব্যবস্থার বেহাল অবস্থা নিয়ে। সড়ক পরিবহন ব্যবস্থা তখন এতটাই নাজুক ছিল যে, ঈদে ঘুরমুখো মানুষের দুর্দশার চিত্র তুলে ধরে প্রায় সকল পত্রিকা একযোগে তৎকালীন যোগাযোগ মন্ত্রীর ওপর ঝাঁপিয়ে পড়েছিল। এটা অস্বীকার করার উপায় নেই, তখন টেলিভিশন চ্যানেলে এবং পত্রপত্রিকায় রাস্তাঘাটের করুণ দশা দেখে আমিও বিব্রত বোধ করেছিলাম। আর চতুর্মুখী আক্রমণে বাধ্য হয়ে ঈদে চলাচলের উপযোগী রাস্তা সংস্কারের কাজে আজকের যোগাযোগ মন্ত্রীর মতো সৈয়দ আবুল হোসেনও রাস্তায় নেমে পড়েছিলেন। তাতে রাস্তাঘাটের সার্বিক উন্নতি না হলেও কিছুটা হলেও উন্নতি হয়েছিল। অনেকের মনে প্রশ্ন জাগতে পারে, আবুল হোসেন যোগাযোগ মন্ত্রীর দায়িত্ব পাবার পরপরই কেন রাস্তাঘাট সংস্কারের কাজে নামেননি? এই প্রশ্নের উত্তরে এটা বলা যায়, বিএনপির পাঁচ বছর আর সামরিক বাহিনী সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দু’বছরসহ মোট সাত বছর সারা বাংলাদেশের রাস্তাঘাটের হাল কী ছিল? তখন কি সবগুলো পথঘাট সোনা দিয়ে বাঁধানো ছিল? আমরা কি তখন বাংলাদেশে ছিলাম না? আমরা কী দেখিনি, তখনও রাস্তাঘাটের করুণ এবং দুর্দশাগ্রস্ত অবস্থা? সৈয়দ আবুল হোসেন যোগাযোগ মন্ত্রী হবার পরই তো বাংলাদেশের সকল রাস্তাঘাট চলাচলের অনুপযোগী হয়ে ওঠেনি। এতগুলো রাস্তাঘাট সম্পূর্ণ চলাচলের উপযোগী করে তোলা কি দু’ছরের মধ্যে কারও পক্ষেই সম্ভব? তা হলে এর দায় শুধু তার ওপরই চাপিয়ে দেয়া হলো কেন? আগে যারা এইসব রাস্তাঘাটের উন্নয়নের কাজে তেমন কোনও ভূমিকাই রাখতে পারেনি, তারা কেন এইসব তথাকথিত পত্রিকা, সমালোচক এবং উগ্রপন্থী বুদ্ধিজীবীদের সমালোচনার হাত থেকে বেঁচে গেলেন? তারা আওয়ামী লীগের মন্ত্রী নয় বলে? আসলে গাফ্ফার ভাই যথার্থই বলেছেন, এদের মূল টার্গেট আসলে সৈয়দ আবুল হোসেন নয়, শেখ হাসিনা।
সামান্য ছিদ্র পেলেই তাতে আঙুল দেয়া যাদের স্বভাব, তারা আবুল হোসেন কেন, আওয়ামী লীগের যে কোনও কাজের খুঁৎ ধরতে পারলে একমুহূর্ত দেরি না করে তাতে আঙুল চালিয়ে দিতে বেশ পছন্দ করেন। এরা আবার নিরপেক্ষতার ভান করেন, প্রগতিশীলতার দোহাই পেড়ে আসলে তলে তলে মৌলবাদের ছাতার নিচে বসে প্রত্যক্ষ এবং পরোক্ষভাবে হলেও তাদের গুণগান করতে কসুর করেন না। আসলে আওয়ামী লীগ নামেই এদের মধ্যে অরুচি। তাদের ভাব দেখলে মনে হয়, আওয়ামী লীগের এই সাড়ে তিন বছরের আগে যে সকল সরকার ক্ষমতায় ছিলেন, তারা দেশটাকে একেবারে সোনার দেশে পরিণত করে ফেলেছিলেন। মৌলবাদী-জঙ্গিবাদী দেশ হিসেবে যে দেশটি বিশ্বের মানুষের কাছে ছিল ধিকৃত, সাত সাতবার বিশ্বের এক নম্বর দুর্নীতিবাজ দেশ হিসেবে যারা দেশের কপালে কলঙ্কতিলক লেপন করেছিল, হাজার হাজার কোটি টাকা দেশ থেকে পাচার করেছিল, তাদের চেয়েও কি আওয়ামী লীগ দেশটাকে অনেক বেশি জাহান্নামের আগুনে ঠেলে দিয়েছে? সাম্রাজ্যবাদের টাকায় ললিত-পালিত এসব তথাকথিত বুদ্ধিজীবীদের সেটা মনে হতেই পারে।
তারই আর একটি সর্বশেষ দৃষ্টান্ত পদ্মাসেতু নিয়ে সৈয়দ আবুল হোসেনের বিরুদ্ধে দুর্নীতিসংক্রান্ত বিশ্বব্যাংকের অভিযোগ নিয়ে তার ওপর আদাজল খেয়ে ঝাঁপিয়ে পড়া। বিশ্বব্যাংক অভিযোগ করেছে, তবে আর পায় কে? সাম্রাজ্যবাদের টাকায় লালিত কিছু পোষ্য পত্রিকা এবং তার সম্পাদক ও চ্যালাচামুণ্ডারা পারলে তাকে জবাই করে ছাড়ে। টেলিভিশন চ্যানেল খুললে একটাই আলোচনা, পদ্মাসেতু নিয়ে আবুল হোসেনের দুর্নীতি। এসব চ্যানেলের ‘টক শো’গুলোর সবচাইতে উত্তপ্ত আলোচনার বিষয়ও তাই। আর এতে অংশগ্রহণ করছেন কারা? চিহ্নিত আওয়ামী বিরোধী এবং প্রাক্তন পিকিংপন্থী অর্থাৎ বর্তমানের নব্য রাজাকাররা। আর অদ্ভুত ব্যাপার এটাই যে, এইসব চ্যানেলগুলো যেন দেশে কথা বলার মতো আর কোনও লোকই খুঁজে পায় না। দু’একদিন পরপরই, তারা এমন সব তথাকথিত বুদ্ধিজীবী, সাংবাদিক এবং শিক্ষকদের ডেকে নিয়ে আসে, আওয়ামী লীগকে ধসিয়ে দেয়াতেই যাদের আনন্দ। এটা যে উদ্দেশ্যমূলক, সেটা বুঝতে কারোরই অসুবিধা হবার কথা নয়। আমি প্রায় প্রতি রাতেই এইসব টক শো দেখি। সেখানে অধিকাংশ সময় একজন বা দু’জন বিশ্ববিদ্যালয়ের ড. থাকেন, থাকেন একজন পিকিংপন্থী প্রাক্তন বিপ্লবী ও সাংবাদিক এবং বর্তমানে মৌলবাদ-জঙ্গিবাদের ঘোরতর সমর্থক, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন প্রতিবন্ধী শিক্ষক আর একটি ইংরেজি দৈনিকের দাঁত খিঁচোনো সম্পাদক। প্রতিদিন এরা গরু রচনার মতো আওয়ামী লীগের মুণ্ডুপাত করতে করতে মুখে ফেনা তুলে ফেলেন, প্রাসঙ্গিক-অপ্রাসঙ্গিকভাবে আওয়ামী লীগকে টেনে এনে ধোলাই দিতে না পারলে এদের রাতের ঘুম হারাম হয়ে যেতে পারে, এ কথা ভেবে যতটা সম্ভব আক্রমণাত্মক ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়। 
এদের মনে একটাই প্রতিজ্ঞা থাকে, যে কোনও উপায়ে আওয়ামী লীগকে ধূলিসাৎ করে দিতে হবে। আর আওয়ামী লীগ সভানেত্রী প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে জবাই করার জন্য এরা সব সময় জিভে ধার দিয়েই রাখেন। এর মধ্যে একদিন রাতে কোনও একটি চ্যানেলে পদ্মাসেতুর দুর্নীতির ব্যাপারে আবুল হোসেনকে আক্রমণের এক পর্যায়ে তিনি যে আগেই থেকে চিহ্নিত দুর্নীতিবাজ, তার উল্লেখ করে এতো অল্প সময়ের মধ্যে তিনি কী করে হাজার হাজার কোটি টাকার মালিক হলেন, সে ব্যাপারে ক্রূর একটি প্রশ্ন উত্থাপন করলেন। তর্কের খাতিরে যদি ধরেও নিই আবুল হোসেন দুর্নীতি করে হাজার হাজার কোটি টাকা কামিয়েছেন, সেক্ষেত্রে তিনি একথা ভুলে গেলেন কী করে সৈয়দ আবুল হোসেনের চেয়ে অনেক কম সময়ে তার জানের জান তরুণ এক নেতা দুর্নীতি করে, ভয় দেখিয়ে এবং ব্ল্যাকমেইল করে হাজার হাজার কোটি টাকাই শুধু কামানইনি, তা দেশ থেকে পাচার করে এখন কোর্ট থেকে জামিন নিয়ে বিদেশে আরাম-আয়েসে জীবনযাপন করছেন? তার কথা সেই ড. সাহেবের একবারও মনে হলো না কেন? কারণ দুর্নীতিবাজ হলেও তিনি যে ড. সাহেবের পেয়ারের লোক। বাংলাদেশে এক সময় একটি ছবি হয়েছিল ‘সাধু শয়তান’ নামে। এদের কথাবার্তা শুনলে ভঙ্গমি দেখলে আমার বারবার সেই ছবিটার কথাই শুধু মনে পড়ে।
তাই তারা তাদের পেয়ারের লোকদের সম্পর্কে কিছু বলবেন না। বলবেন শুধু বলীর পাঁঠাদের।! কারণ তাদের আসল উদ্দেশ্য দুর্নীতির বিরুদ্ধে কথা বলা নয়, আওয়ামী লীগকে বেকায়দায় ফেলার জন্য পঙ্গপালের মতো ঝাঁপিয়ে পড়া। এরা সুযোগের অপেক্ষায় থাকে। দুর্নীতিবাজদের সঙ্গে গলাগলি ধরে যখন তারা অন্যের দুর্নীতি খুঁজতে যান, তখন সেসব দেখে আমার খুব কৌতুক বোধ হয়। আবুল হোসেনকে এরা চিহ্নিত দুর্নীতিবাজ বলেন। কেন আবুল হোসেন ছাড়া এদেশে আর চিহ্নিত দুর্নীতিবাজ নেই? রাতের ঘুম হারাম করে যখন এইসব টকাররা বিভিন্ন চ্যানেলে আওয়ামী লীগের গিবত গাওয়ার জন্য যান এবং অনুষ্ঠান শেষে পকেটে দু’তিন হাজার টাকার চেক বা ক্যাশ টাকা নিয়ে বাড়িতে ফেরেন, তার সব টাকাই কি তুলসী পাতায় ধোয়া থাকে? ওর মধ্যে দুর্নীতির ছোঁয়া নেই? সেটা যখন পকেটে পুরে ঘরে ফেরেন, তখন দুর্নীতিবাজদের সঙ্গে আপনারাও যে গাঁটছড়া বাঁধেন, তখন কি আপনাদের কণ্ঠে দুর্নীতির বিরুদ্ধে কথা বলা মানায়?
এই যে এতদিন ধরে বিশ্বব্যাংকের অভিযোগকে একেবারে বেদবাক্যজ্ঞানে অন্তরে ধারণ করে ক্রমাগত সৈয়দ আবুল হোসেন, আওয়ামী লীগ ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে তুলোধুনো করে যাচ্ছেন, আপনারাও জানেন, তার মধ্যে সত্যাসত্য কতটুকু। বিশ্বব্যাংক পদ্মাসেতুতে দুর্নীতির আশংকা করেছেন, কিন্তু এখন পর্যন্ত তারা প্রমাণ দিতে পারেনি, দুর্নীতিটা কোথায় হয়েছে। আমাদের এইসব জ্ঞানপাপীরা শুধু আওয়ামী সরকারের ওপর চাপ দিয়ে যাচ্ছে, বিশ্বব্যাংক দুর্নীতির ব্যাপারে যে অভিযোগ তুলেছে, তা প্রকাশ করতে। আওয়ামী লীগ তো বলেছে এ ব্যাপারে কোনও দুর্নীতি হয়নি। যেখানে পদ্মাসেতুর ব্যাপারে কোন টাকাই ছাড় দেয়াই হয়নি, সেখানে দুর্নীতির প্রশ্নই তো অবান্তর। সৈয়দ আবুল হোসেনও একই কথা বলেছেন। যেহেতু বাংলাদেশ সরকার তা প্রকাশ করবে না, সেক্ষেত্রে বিশ্বব্যাংকই তা প্রকাশ করছে না কেন? তাদের হাতে যদি দুর্নীতির অকাট্য প্রমাণ থাকে তা হলে তা প্রকাশ করতে তাদেরই বা বাধা কোথায়? যদি ধরে নেয়া যায় দুর্নীতির কাজটি মৌখিকভাবে সম্পন্ন হয়েছে অর্থাৎ আবুল হোসেন পদ্মাসেতু প্রকল্প থেকে ঘুষ নেয়ার জন্য কোন বিশেষ প্রতিষ্ঠানের কাছে ঘুষ চেয়েছেন, তা হলে সেটাকে কেউ যুক্তিসঙ্গত বলে মানবেন? উপযুক্ত দালিলিক প্রমাণ ছাড়া শুধু মুখের কথার ওপর ভিত্তি করে যে কাউকে অভিযুক্ত করা যায় না, এটা বিশ্বব্যাংক বোঝে না, তা কোনও পাগলেও বিশ্বাস করবে?
আসলে বিশ্বব্যাংকই যে দুর্নীতিবাজ এটা আগেও প্রমাণিত হয়েছে, এখনও নতুন করে প্রমাণিত হচ্ছে। তাদের নিজেদের ইচ্ছেমতো অযোগ্য প্রতিষ্ঠানকে কাজ পাইয়ে দেয়ার জন্য দুর্নীতির অভিযোগ তুলে বাংলাদেশকে চাপের মধ্যে রেখে আসলে নিজেদের স্বার্থ উদ্ধার করাই যে তাদের লক্ষ্যের মধ্যে ছিল, তা এখন বাংলাদেশের মানুষের কাছে স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। তাছাড়া বিশ্বব্যাংকের বিশেষ বিশেষ কিছু দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তার ব্যক্তিস্বার্থ উদ্ধারের জন্যই যে উন্নয়নশীল দেশগুলোর ওপর তারা এ ধরনের চাপ সৃষ্টি করে থাকে, একজন ব্যক্তি আবুল হোসেনের বিরুদ্ধে অভিযোগ তুলে পদ্মা সেতুতে তাদের অর্থায়ন বাতিল করার মধ্য দিয়ে তাদের হীনতা, দীনতা, ক্ষুদ্রতা এবং সাম্রাজ্যবাদী ভূমিকার নগ্ন বহিঃপ্রকাশই ঘটেছে, আবুল হোসেন সেখানে বলীর পাঁঠা মাত্র। যদি তা না হতো, তা হলে আবুল হোসেন পত্রিকায় বিজ্ঞাপন দিয়ে, বিভিন্ন মিথ্যে সংবাদের প্রতিবাদ জানিয়ে, পদ্মাসেতুর ব্যাপারে তার স্বচ্ছতার নানা প্রমাণ হাজির করে এবং শেষ পর্যন্ত মন্ত্রীর পদ থেকে পদত্যাগ করে বিশ্বব্যাংকের মন সামান্য নরম করতে পারলেও সাম্রাজ্যবাদের দোসরদের মন কিছুতেই গলাতে পারেননি। তাই তাকে নিয়ে এখনও ব্যক্তি-আক্রমণ ঘটেই চলেছে।
আর বিএনপি তো তলোয়ারে ধার দিয়ে বসেই ছিল। বিশ্বব্যাংক যখন পদ্মাসেতুতে দুর্নীতির অভিযোগ তুলেছে, তখন আর যায় কোথায়? সবার আগে লাফিয়ে গিয়ে বিশ্বব্যাংকের অভিযোগের পক্ষে দাঁড়িয়ে আওয়ামী লীগ, শেখ হাসিনা এবং সৈয়দ আবুল হোসেনকে একহাত নিয়েই তবে তাদের শান্তি। আর শেখ হাসিনা লন্ডনে গিয়ে সৈয়দ আবুল হোসেনের পক্ষ নিয়ে যেই তাকে ‘দেশপ্রেমিক’ বলে আখ্যায়িত করলেন, তখন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মির্জা ফখরুল রাজনৈতিক শিষ্টাচার বজায় রেখে তাঁর বক্তব্য উপস্থাপন করলেও তাঁর দলেরই আর এক কেউকেটা ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন সঙ্গে সঙ্গে বলে বসলেন সৈয়দ আবুল হোসেন দেশপ্রেমিক নন, তিনি হলেন ‘বেহায়া’। খবরটি দেখে আমার চক্ষু কপালে উঠে গেল। ড. সাহেব নাকি একসময় বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ছিলেন, তার মুখে এরকম অরুচিকর, অভব্য এবং অশ্লীল শব্দের ব্যবহার দেখে আমার বিস্ময়ের ঘোর কাটলো না। আমি ভাবলাম, তার ঐ অভব্য শব্দের পাল্টা শব্দ ব্যবহার করে সৈয়দ আবুল হোসেন যদি তাকে আক্রমণ করতেন, তাহলে তিনি সেটাকে কীভাবে নিতেন। আসলে এ জাতীয় অভব্য লোকেরা আমাদের রাজনীতির শীর্ষস্থানে অবস্থান করছেন বলেই বাংলাদেশের রাজনীতির আজ এই অবস্থা। আমি সৈয়দ আবুল হোসেনকে ধন্যবাদ দেই এ জন্যে যে, তিনি তথাকথিত ‘দুর্নীতিবাজ’ হওয়া সত্ত্বেও ড. মোশাররফের মতো অসভ্য হতে পারেননি।
আসলে এটা হয়তো অনেকের পক্ষেই বোঝা মুশকিল, সৈয়দ আবুল হোসেন কী করলে এদের অপপ্রচার এবং ব্যক্তিগত কুৎসা রটনা থামবে। আমার ধারণা, এটা সহজে থামবে না। এদের জিভে যতদিন ধার থাকবে, ততদিন তারা সৈয়দ আবুল হোসেন, শেখ হাসিনা ও আওয়ামী লীগকে আক্রমণ করতেই থাকে। আর আক্রমণ করতে করতে যদি জিভের ধার কমে যায়, তা হলে আবার জিভে শান দিয়ে নতুন করে আক্রমণ করতে শুরু করবে। এদের লক্ষ্য, শেখ হাসিনার জীবন। ১৯৭৫ সালে বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যা করার সময় শেখ হাসিনা ও শেখ রেহানা বিদেশে থাকার ফলে বেঁচে যাওয়াতে এদের মধ্যে যে যন্ত্রণার বিষ জমা হয়ে ছিল, এখন তা উগ্ড়ে দেবার জন্য তারা অনেক বেশি সক্রিয় হয়ে উঠেছে। হাসিনা যে বলেছেন, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় তাঁর জীবন সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ, সেটা এদের তৎপরতা দেখলেই বোঝা যায়। এরা এক একটা বিষধর সাপ। এরা হাসিনাকে রক্তাক্ত ছোবল দেয়ার জন্য বারবার চেষ্টা করেছে, ভবিষ্যতেও করবে। তাদের লক্ষ্যই সেটা। গাফ্ফার ভাই যে বলেছেন ‘আক্রান্ত আবুল হোসেনÑটার্গেট শেখ হাসিনা’Ñএর চেয়ে চরম সত্যটি এর আগে এমন করে কেউ বলেননি। এ কথা বলে তিনি শেখ হাসিনাকে সাবধান হতে বলেছেন। সেই সূত্র ধরে আমি সৈয়দ আবুল হোসেনকেও সাবধান হতে বলি। আপনি যতই সৎ হোন, যতই শিক্ষানুরাগী হোন, মানুষের জন্য যতোই আপনার হাত উদার করুন, এরা আপনাকে ছাড়বে না। সে আপনি মন্ত্রীই থাকুন, আর মন্ত্রিত্বের বাইরেও থাকুন। শুধু প্রস্থত থাকুন, নেত্রী শেখ হাসিনাকে যেন ওরা ছোবল না দিতে পারে। ওদের সমালোচনায় ভড়কে যাবেন না। যদি আপনি মনে করেন, আপনি সৎ আছেন, তা হলে বুক চিতিয়ে দাঁড়ান। আওয়ামী লীগের প্রতিটি নিবেদিতপ্রাণ কর্মী এবং দেশের জনসাধারণকে নিয়ে ওদের ষড়যন্ত্রকে রুখে দিন। শহরের অসন্তষ্ট এবং সুবিধাবাদী কিছু বুদ্ধিজীবীর কথায় হতচকিত হয়ে গেলে আখেরে ওদেরই লাভ হবে। সেটা আপনি হতে দেবেন কেন? 
আর বিশ্বব্যাংক? 
সেটা শুধু পাশ্চাত্যের ধনবাদী আগ্রাসী দেশগুলোর পিতৃসম্পত্তি নয়, এখানে আমাদেরও অংশীদারিত্ব আছে। অতএব ওদের রক্তচক্ষু দেখে ভয় পাবার কিছু নেই। যে জাতি ত্রিশ লক্ষ মানুষের রক্ত ও দু’লক্ষ মা-বোনের সম্ভ্রমের বিনিময়ে মাত্র নয় মাসে নিজেদের দেশকে স্বাধীন করেছে, তারা বিশ্বব্যাংকের অন্যায় সিদ্ধান্তের কাছে নতজানু হবে কেন? পদ্মাসেতুর জন্য বরাদ্দ অর্থ বাতিল করে তারা যে ঔদ্ধত্য দেখিয়েছে, তৃতীয় বিশ্বের উন্নয়নশীল দেশের মানুষ একদিন তার দাঁতভাঙা জবাব দেবে। অতএব সৈয়দ আবুল হোসেন, আপনাকে বলি, যদি আপনি সত্যি সত্যি স্বচ্ছতার সঙ্গে কাজ করে থাকেন এবং কোনরকম দুর্নীতির সঙ্গে যুক্ত না থাকেন, তা হলে আপনার ভয় পাওয়ার কিছু নেই। শুধু সময়ের জন্য একটু অপেক্ষা করুন।

অসীম সাহা : কবি ও সাংবাদিক

সৈয়দ আবুল হোসেন, মান্যবরেষু
ইমদাদুল হক মিলন
সৈয়দ আবুল হোসেনের পাঁচটি গ্রন্থ আমার হাতে পড়েছে। সুন্দর প্যাকেট, সুন্দর করে প্রকাশিত হওয়া বই। সবগুলোই রাজনৈতিক বিশ্লেষণধর্মী আলেখ্য। গণতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থার সংকট, গণতন্ত্র, নেতৃত্ব ও উন্নয়ন, আওয়ামী লীগের নীতি ও কৌশল শিল্পায়ন ও অভ্যন্তরীণ সম্পদ সমাবেশ, শেখ হাসিনা সংগ্রামী জননেত্রীর প্রতিকৃতি, স্বাধীনতার জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। সবগুলো বই আমার পড়া হয়নি। তবে ধীরে ধীরে প্রতিটি বই-ই আমি পড়তে চাই। দুটো বই আমি একটু ঘেঁটে ঘেঁটে দেখেছি, দুয়েকটি লেখা পড়েছি, আমার ভালো লেগেছে। সৈয়দ আবুল হোসেনের কোনও লেখা এর আগে আমি পড়িনি। যে লেখকের ভাষা খারাপ তাঁর লেখা আমি পড়তে পারি না। কিন্তু সৈয়দ আবুল হোসেনের ভাষা সুন্দর, তরতর করে পড়ে যাওয়া যায়। বহু তথ্য এবং উদ্ধৃতি তাঁর রচনার মান বাড়িয়ে দিয়েছে। রাজনীতির বাইরে তিনি কিছু লেখেননি। যেহেতু তিনি নিজে একজন রাজনীতিবিদ, সেহেতু রাজনীতি নিয়ে লেখাই তাঁর পক্ষে স্বাভাবিক। রাজনৈতিক বিশ্লেষণধর্মী রচনা বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই অতি খটোমটো হয়ে থাকে, সামন্য পড়েই পাঠক ক্লান্ত হয়ে যান। সৈয়দ আবুল হোসেনের রচনায় এই ত্র“টি নেই। আমি যেটুকু পড়েছি, পড়ে তাঁর পাঁচটি বই পড়ার আগ্রহই আমার মধ্যে তৈরি হয়েছে। একজন পাঠককে এইভাবে আকৃষ্ট করবার ক্ষমতা যার আছে, তিনি যে ধরনের লেখাই লিখুন না কেন, তাঁকে অবশ্যই আমি ভালো লেখক বলবো। রাজনৈতিক বিশ্লেষণধর্মী লেখার ক্ষেত্রে সৈয়দ আবুল হোসেন অবশ্যই একজন অগ্রগণ্য লেখক। এই লেখককে আমি অভিনন্দন জানাই।
বাঙালি জাতির সবচাইতে বড় গৌরব জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। হাজার বছরে এই মাপের নেতা জন্মান না। আমাদের সৌভাগ্য বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এই দেশে জন্মেছিলেন। এই মহান নেতাকে নিয়ে বহু গল্প কবিতা নাটক গান রচিত হয়েছে। বাঙালি জাতির শ্বাস প্রশ্বাসের সঙ্গে মিশে আছেন এই নেতা। আমরা জাতি হিসেবে অকৃতজ্ঞ বলে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে প্রাণ দিতে হয়েছে। বঙ্গবন্ধুর হত্যাকাণ্ড বাঙালি জাতির ললাটে “পিতৃহত্যাকারী” শব্দটি খোদাই করে দিয়েছে। বাঙালি জাতি যতদিন টিকে থাকবে, এই জঘন্য অপরাধ তাদের বয়ে বেড়াতে হবে। চে গুয়েভারাকে নিয়ে সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় একটি কবিতা লিখেছিলেন, “চে, তোমার মৃত্যু আমাকে অপরাধী করে দেয়।” বঙ্গবন্ধুর জন্য চিরকাল বাঙালি জাতি এরকম করে বলবে, “বঙ্গবন্ধু, তোমার মৃত্যু আমাদেরকে অপরাধী করে দেয়।” অনন্তকাল ধরে আত্মগ্লানিতে জ্বলবো আমরা।
এই মহান নেতাকে নিয়ে সৈয়দ আবুল হোসেন লিখেছেন, “স্বাধীনতার জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান”। বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে লেখা এ যাবৎ রচিত গ্রন্থগুলোর মধ্যে সৈয়দ আবুল হোসেনের এই গ্রন্থ এক বিশিষ্ট সংযোজন।
আমি শুনেছি সৈয়দ আবুল হোসেন বহুগুণে গুণান্বিত একজন মানুষ। রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব, রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও কলাম লেখক হিসেবে তিনি শ্রদ্ধেয়। মাদারীপুরের এক বনেদী মুসলমান পরিবারে তাঁর জন্ম। পিতা অতিশয় ধর্মপ্রাণ মানুষ। এলাকার মানুষের শ্রদ্ধারজন। কৃতি ছাত্র ছিলেন সৈয়দ আবুল হোসেন। ১৯৭২ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে তিনি বাণিজ্যে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি লাভ করেন। তারপর মনোনিবেশ করেন ব্যবসায়। ধীরে ধীরে গড়ে তোলেন ‘সাকো ইন্টারন্যাশনাল’ নামে বিশাল এক ব্যবসা প্রতিষ্ঠান। এই সব প্রধান পরিচয়ের পাশাপাশি তার অন্যরকম কিছু পরিচয়ও আছে। একজন লেখক হিসেবে আমার কাছে সেই পরিচয়গুলো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ্। তিনি ধর্মপ্রাণ, তিনি মানুষ ভালোবাসেন। জাতির দুর্যোগে তো বটেই অন্যান্য নানা প্রকার দুর্যোগের সময় বিপন্ন মানুষের পাশে তিনি তার সবটুকু সামর্থ্য নিয়ে দাঁড়ান। মানুষের কথা ভাবেন এবং তাদের পাশে দাঁড়ান, সেই মানুষকেই আমি মহান মানুষ মনে করি। সততা, নির্লোভ, অকারণ উচ্চাকাক্সক্ষা ইত্যাদি সৈয়দ আবুল হোসেনকে কখনও ম্লান করতে পারেনি। এটাই তার জীবনের মূল সার্থকতা। বাংলাদেশের জন্য যে রকম মানুষের খুব প্রয়োজন, সৈয়দ আবুল হোসেন তেমন একজন মানুষ। মৃত্যুর আগ মুহূর্ত পর্যন্ত তিনি তার সততা, মানুষের প্রতি মমত্ববোধ এবং দেশ ও জাতির কল্যাণের কাজে নিয়োজিত থাকবেন, এই আমার প্রার্থনা।

ইমদাদুল হক মিলন : কথাসাহিত্যিক

পদ্মা সেতু প্রকল্প এবং আমাদের করণীয়
আইনুন নিশাত
পদ্মা সেতু প্রকল্প নিয়ে অনেক জল ঘোলা হওয়ার পর আমার কথা একটাই। সরকার যেভাবে নিজস্ব উৎস থেকে প্রকল্প বাস্তবায়নের কথা বলছে, সেটা সম্ভব হলে এই দেশের নাগরিক হিসেবে আমি গর্বই বোধ করব। এ ধরনের প্রকল্প বাস্তবায়নে নেতৃত্ব দিতে পারেনÑ এমন বিশেষজ্ঞের অভাব নেই এ দেশে। কিন্তু আমাদের ঘাটতি রয়েছে অর্থে ও প্রযুক্তিতে। প্রযুক্তির বিষয়টি ঠিকাদারের মাথাব্যথা। সরকারের উচিত হবে সম্পূর্ণ অর্থ জোগাড়ের দিকে মনোযোগ দেওয়া; অর্থের সংস্থান হলেই কেবল নির্মাণ কাজের ব্যাপারে অগ্রসর হওয়া।
পদ্মা সেতু নিয়ে সমকালের পাতায় কয়েকদিন আগে অধ্যাপক ড. জামিলুর রেজা চৌধুরীর একটি মূল্যবান নিবন্ধ ছাপা হয়েছে। জামিল স্যার আমার ক্লাসরুম শিক্ষক শুধু নন; তার সঙ্গে পরে বহু প্রকল্পে কাজ করেছি এবং করছি। জটিল কারিগরি জিনিস সহজভাবে ব্যাখ্যা করতে তার জুড়ি পাওয়া দায়। তদুপরি স্যারের মনে রাখার ক্ষমতা এবং বিভিন্ন ঘটনার পরম্পরা বজায় রেখে বর্ণনা করার দক্ষতা অপরিসীম। বলাবাহুল্য, স্যারের ওই লেখাতেও তার ছাপ স্পষ্ট ছিল।
পদ্মা সেতু প্রকল্প সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন কাজের ঠিকাদার ও পরামর্শক নির্বাচন প্রক্রিয়া কীভাবে এগোচ্ছিল, অধ্যাপক চৌধুরী তার লেখায় তা গুছিয়ে বলেছেন। ওই নিবন্ধের আলোকে একটি বিষয় স্পষ্ট যে এসএনসি লাভালিনকে সুপারভিশন কনসালটেন্ট হিসেবে নিযুক্তিতে বিশ্বব্যাংকের কোনো আপত্তি ছিল না। বরং উল্টোটাই ঘটেছিল বলা চলে। বাংলাদেশি মূল্যায়নকারীদের মূল্যায়ন বিশ্বব্যাংক লিখিতভাবে অনুমোদন করেছে এবং সেই প্রক্রিয়ায় বিশ্বব্যাংকের একজন সাবেক কর্মকর্তাও যুক্ত ছিলেন।
আমি আজকে কলম ধরেছি এসব বিষয়ে আরও কিছু কথা বলার জন্য। বলে রাখা ভালো, বঙ্গবন্ধু যমুনা সেতুর ক্ষেত্রে বিভিন্ন পরামর্শক ও ঠিকাদার নির্বাচনের সময় অধ্যাপক জামিলুর রেজা চৌধুরীর সঙ্গে আমিও জড়িত ছিলাম। একইভাবে পদ্মা সেতু প্রকল্পেরও আমরা কাজ করেছি। যমুনা সেতু প্রকল্পের অভিজ্ঞতার আলোকে পদ্মা সেতু প্রকল্পের পরামর্শক বা ঠিকাদার নির্বাচন প্রক্রিয়ায় কোথায় কোথায় বিশেষ নজর দিতে হবে, সে সম্পর্কে আমাদের পূর্বধারণা ও অভিজ্ঞতা কাজে এসেছে।
অনেকেই হয়ত জানেন, পরামর্শক ও ঠিকাদার নির্বাচনের জন্য বিশ্বব্যাংক, এডিবি (এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক) বা আইডিবি (ইসলামিক ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক)Ñ সবারই রয়েছে পৃথক পৃথক নীতিমালা। অর্থাৎ কোনো প্রকল্পে যারা অর্থায়ন করবেন তারাই নির্ধারণ করে দেন যে কোন কোন দেশের পরামর্শক বা ঠিকাদাররা দরপত্র জমা দিতে পারবেন। এরপর আসে দরপত্রে কী কী বিষয়ে নজর দেওয়া হবে এবং কী পদ্ধতিতে মূল্যায়ন করা হবে, তার নিয়মাবলি। পদ্মা সেতু প্রকল্পের ক্ষেত্রে সেই নিয়মাবলি প্রণয়নের দায়িত্বে ছিল ডিজাইন কনসালটেন্ট বা নকশা প্রণয়নের দায়িত্বে থাকা পরামর্শক প্রতিষ্ঠান। তাদের প্রণীত নিয়ম ও শর্তাবলি প্রথমে বাংলাদেশ সরকারের কর্মকর্তারা অনুমোদন করেন এবং এরপর তা দাতা সংস্থার বিশেষজ্ঞের দ্বারা পর্যালোচিত এবং অনুমোদিত হয়। অর্থাৎ বিশ্বব্যাংক, এডিবি ও জাইকার (জাপান ইন্টারন্যাশনাল কোঅপারেশন এজেন্সি) অনুমোদন পাওয়ার পরই দরপত্র আহ্বানের প্রক্রিয়া শুরু হয়।
দরপত্রের প্রথম পদক্ষেপ হচ্ছে প্রাক-যোগ্যতার ভিত্তিতে কারা দরপত্র দিতে পারবেন, তা নির্ধারণ করা। পদ্মা সেতুর মতো বৃহৎ ও জটিল প্রকল্পে কেবল তাদেরই দরপত্র দেওয়ার সুযোগ দেওয়া হয়, যাদের এ ধরনের কাজের অভিজ্ঞতা রয়েছে। অর্থাৎ আগ্রহী ঠিকাদার অথবা পরামর্শক প্রতিষ্ঠান তাদের কাজের অভিজ্ঞতা, আর্থিক সচ্ছলতা, দক্ষ কর্মকর্তার তালিকা ইত্যাদি জমা দেন। সেসবের ভিত্তিতে মূল্যায়ন করা হয়।
পদ্মা সেতু প্রকল্পের ক্ষেত্রে বড় তিনটি চুক্তি বা কন্ট্রাক্ট করা প্রয়োজন ছিল। প্রথম চুক্তি হচ্ছে মূল সেতুটি নির্মাণ বিষয়ে। এ কাজে ঠিকাদারদের প্রাক-যোগ্যতা নিরূপণের পর নির্বাচিতদের তালিকা বিশ্বব্যাংকের দফতরে রয়েছে। তারা অনুমতি দিলে তবেই মূল দরপত্র আহ্বান করা হতো। তার মানে, মূল দরপত্র এখনও আহ্বান করা হয়নি। কাজেই ঠিকাদার নির্বাচনের বিষয়টি অনেক পরের বিষয়।
দ্বিতীয় চুক্তি বা কন্ট্রাক্ট হচ্ছে নদীশাসন সংক্রান্ত। মূল সেতুর মতো এ কাজটিও অত্যন্ত জটিল এবং এতে দক্ষ ঠিকাদার প্রয়োজন। এ কাজটিরও কেবল প্রাক-দক্ষতা যাচাই কাজ শেষ হয়েছে। বিশ্বব্যাংকের দফতরে এই কাজের জন্যও প্রাক-দক্ষতা যাচাইয়ের পর মূল্যায়িত ঠিকাদারদের তালিকা জমা দেওয়া আছে। অর্থাৎ এ কাজেও এখন পর্যন্ত দরপত্র আহ্বান করা হয়নি।
তৃতীয় কন্ট্রাক্টটি হচ্ছে অ্যাপ্রোচ রোড। অর্থাৎ সেতু সংযোগকারী রাস্তার নির্মাণ বিষয়ে। ওই কাজটির অর্থায়ন করবে আইডিবি। কাজেই তাদের নিয়ম মেনে প্রাক-যোগ্যতার কাজ সম্পন্ন করা হয়েছে। দরপত্র আহ্বান করা হয়েছে। ঠিকাদার নির্মাণের কাজও সম্পন্ন হয়েছে। আইডিবির অনুমোদনের জন্য কাগজপত্র পাঠানো হয়েছে। এ দরপত্র মূল্যায়নে বিশেষ জটিলতার সম্মুখীন হতে হয়েছিল। এখনও চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়নি।
এবার আসি কনস্ট্রাকশন সুপারভিশন কনসালটেন্টের বিষয়ে। এ কনসালটেন্টের কাজ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। পদ্মা সেতুটি নির্মিত হবে আন্তর্জাতিক নিয়মাবলি মেনে। সংক্ষেপে বলা হয়েছে (ঋওউওঈ) ‘ফিডিক’ মেনে। এর পুরো নাম হচ্ছে ইন্টারন্যাশনাল ফেডারেশন অব কনসালটিং ইঞ্জিনিয়ার্স। মূল নামটি ফরাসি। এরা বিশ্বজুড়ে যে কোনো নির্মাণ কাজে শর্তাবলি ও কন্ট্রাক্ট বাস্তবায়নের পদ্ধতি ঠিক করে দেয়। এদের নিয়মের বাইরে কোনো আন্তর্জাতিক কন্ট্রাক্ট পরিচালিত হতে পারে না।
ফিডিকের নিয়ম অনুযায়ী কনস্ট্রাকশন সুপারভিশন কনসালটেন্টের (সিএসসি) তত্ত্বাবধানে কন্ট্রাক্ট সম্পর্কিত সব সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। এ কারণে সিএসসি নির্বাচন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ কাজ শুরু হলে এদের সিদ্ধান্ত অর্থায়নকারী সংস্থাগুলো প্রায়ই মেনে নেয় এবং প্রকল্পের মূল মালিক, অর্থাৎ সরকারও মানতে বাধ্য হয়। ঠিকাদারের দাবি যদি সিএসসি অনুমোদন করে, কিন্তু সরকার পক্ষ যদি সেই দাবিকে অযৌক্তিক মনে করে তাহলে সিএসসির সিদ্ধান্তই বলবৎ হবে। পরে সরকার এ বিষয়ে মামলা করতে পারে।
পদ্মা সেতু প্রকল্পের সিএসসি হিসেবে নিযুক্তির জন্য পাঁচটি কোম্পানি তাদের প্রস্তাব জমা দিয়েছিল। ইতিপূর্বে নির্ধারিত নিয়মাবলি মেনে দরপত্রগুলো মূল্যায়িত হয়। এ মূল্যায়ন বিশ্বব্যাংক মেনে নিয়েছিল। পরে নির্বাচিত কনসালন্টিং ফার্মের কোনো কাজে বিশ্বব্যাংক ক্ষুব্ধ হয়েছে এবং তাদের কালো তালিকাভুক্ত করেছে। মোদ্দাকথা, আমি বলতে চাচ্ছি, নির্বাচন পদ্ধতি বা নির্বাচনের ফলাফল নিয়ে বিশ্বব্যাংকের কোনো আপত্তি ছিল না। যে কারণে এখন জটিলতা দেখা দিয়েছে, তা হলো পরবর্তী সময়ে ঘটে যাওয়া কিছু ঘটনা।
এবার আরেকটি বিষয়ের অবতারণা করতে চাই সেটি হচ্ছে, যে কোনো প্রকল্পে স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা, অংশীদারিত্ব বজায় রাখার প্রচণ্ড তাগিদ আছে বিশ্বজুড়ে। কোনো একটি দেশের কাছ থেকে পাওয়া অর্থ বা কোনো আন্তর্জাতিক অর্থলগ্নিকারক প্রতিষ্ঠানের অর্থ সবার মধ্যে সব পদক্ষেপে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা অর্জনের কথা বলা হচ্ছে। একই সঙ্গে যোগ হচ্ছে যে কোনো কর্মকাণ্ডে প্রাইভেট-পাবলিক পার্টনারশিপ এবং সব স্টেকহোল্ডার বা অংশীদারের অংশগ্রহণ নিশ্চিতকরণ।
বিশ্বের বিভিন্ন অঙ্গনে কথায় কথায় সুশাসন, গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া ও আইনের শাসনের কথা এখন উচ্চারিত হয়। সেই আলোকে, সবাই এখন মানে, যে কোনো দাতা দেশ বা দাতা সংস্থা তাদের সব স্টেকহোল্ডারের কাছে এসব বিষয়ে জবাবদিহি করতে বাধ্য। বিশ্বব্যাংক এবং এডিবিতে সিভিল সোসাইটি প্রতিনিধিরা নিয়মিতভাবে প্রাতিষ্ঠানিক কর্মকাণ্ড পর্যালোচনা ও মূল্যায়ন করে। কাজেই কোনো কারণে কেউ যদি সন্দেহ পোষণ করে যে, এ প্রকল্পে দুর্নীতি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে, তাহলে বিশ্বব্যাংক বিশেষ নজরদারি করতে বাধ্য। বিশ্বব্যাংকের অফিসে পদ্মা সেতুসহ ৫-৬টি বড় প্রকল্পের জন্য একজন ভাইস প্রেসিডেন্ট রয়েছেন। তার কাজই হচ্ছে এ প্রকল্পগুলো বিশেষভাবে পর্যবেক্ষণ করা, যাতে করে কোনো ধরনের অভিযোগ না আসে। আমি যতদূর জানি, পদ্মা সেতুর জমি অধিগ্রহণ এবং ক্ষতিগ্রস্তদের পুনর্বাসনের বিষয়টি তারা খুব গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করেছে এবং সরকারের কাজে সন্তোষ প্রকাশ করেছে। আমার জানা মতে, বাংলাদেশ সরকারের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাও তার কাউন্টারপার্ট হিসেবে নিয়োজিত ছিলেন। এটা মনে করার কোনো কারণ নেই যে, পদ্মা সেতুর ক্ষেত্রে বিশ্বব্যাংকের বিশেষ তদারকির কথা বাংলাদেশের সংশ্লিষ্ট সব কর্মকর্তার জানা ছিল না। তারপরও দুর্ঘটনা ঘটে গেল।
খবরের কাগজে পড়ছি, সরকার বিকল্প উৎস থেকে অর্থ পাওয়ার চেষ্টা করছে। সরকারের এমন প্রচেষ্টা অস্বাভাবিক নয়। কারণ দেশের লোকজন সেতুটি দ্রুত নির্মিত হওয়া দেখতে চায়। গত নির্বাচনের অঙ্গীকার এবং সামনের নির্বাচনে সাফল্য তুলে ধরার কথাও ভাবতে হচ্ছে সরকারকে। তার ফলেই বিভিন্ন উৎস থেকে অর্থ জোগাড় করার কথা বলা হচ্ছে।
সত্যি বলতে কি, বিভিন্ন মহলের এ তৎপরতা দেখে আমার ভালো লাগছে। তবে মনে রাখতে হবে, টাকায় কুলাবে না। লাগবে বৈদেশিক মুদ্রা ডলার, ইউরো, ইয়েন, পাউন্ড ইত্যাদি। পুরো অর্থের বন্দোবস্ত করে তবেই মাঠে নামতে হবে। দেশে যেভাবে নির্মাণ কাজ হয়, আমরা দেখি, অর্থের অভাবে ঠিকাদারদের অনেক সময় বসে থাকতে হয়। এটি কোনোভাবেই আন্তর্জাতিক ঠিকাদারদের সঙ্গে চলবে না। ফিডিক আইন অনুযায়ী ঠিকাদার তার রানিং বিল জমা দিলে নির্ধারিত সময়ের মধ্যেই তা পরিশোধ করতে হবে। কোনো কারণে ঠিকাদারকে কাজ বন্ধ করতে বলা যাবে না। কারণ ঠিকাদার তার যন্ত্রপাতি, লোক-লস্কর মোবিলাইজ করেছেন। সরকারের কারণে কাজের গতি শ্লথ হলে বিপুল পরিমাণ অর্থদণ্ড দিতে হবে।
পদ্মা সেতু প্রকল্প নিয়ে অনেক জল ঘোলা হওয়ার পর আমার কথা একটাই। সরকার যেভাবে নিজস্ব উৎস থেকে প্রকল্প বাস্তবায়নের কথা বলছে, সেটা সম্ভব হলে এই দেশের নাগরিক হিসেবে আমি গর্বই বোধ করব। এ ধরনের প্রকল্প বাস্তবায়নে নেতৃত্ব দিতে পারেনÑ এমন বিশেষজ্ঞের অভাব নেই এ দেশে। কিন্তু আমাদের ঘাটতি রয়েছে অর্থে ও প্রযুক্তিতে। প্রযুক্তির বিষয়টি ঠিকাদারের মাথাব্যথা। সরকারের উচিত হবে সম্পূর্ণ অর্থ জোগাড়ের দিকে মনোযোগ দেওয়া; অর্থের সংস্থান হলেই কেবল নির্মাণ কাজের ব্যাপারে অগ্রসর হওয়া।

ড. আইনুন নিশাত : সাবেক অধ্যাপক বুয়েট। পরিবেশ বিশেষজ্ঞ ও পানি বিজ্ঞানী, উপাচার্য, ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়।

সৈয়দ আবুল হোসেন গভীর ষড়যন্ত্রের শিকার
নির্মল চক্রবর্তী
পদ্মা সেতু প্রকল্পে বিশ্ব ব্যাংকের আনীত তথাকথিত দুর্নীতি নিয়ে পত্রপত্রিকায় অনেক লেখালেখি হয়েছে। সব লেখা মূলত সৈয়দ আবুল হোসেনকে ঘিরে। বছরাধিক কাল যেন পত্রিকায় প্রকাশের জন্য বাংলাদেশে আর কোন বিষয় ছিল না। অধিকাংশ প্রতিবেদনে পদ্মা সেতু প্রকল্পে দুর্নীতি হয়েছে মর্মে বিশ্বব্যাংকের অযৌক্তিক দাবিকে প্রমাণের চেষ্টা করে সৈয়দ আবুল হোসেনের বিরুদ্ধে বিষোদগার করা হয়েছে। এ সকল প্রতিবেদনে আবেগ ছিল যুক্তি ছিল না, রসালো বিবরণ ছিল কিন্তু বিশেষায়িত তথ্য ছিল না। যে সকল লেখায় তাঁর বিরুদ্ধে বিষোদগার করা হয়েছে, বিশ্বব্যাংকের কথিত দুর্নীতির শঙ্কাকে সত্য বলে প্রতিষ্ঠিত করার চেষ্টা করা হয়েছে সে সকল প্রতিবেদনের লেখকগণ পদ্মা সেতু প্রকল্পের মত জটিল ও উচ্চ কারিগরি অবকাঠামোর পর্যায়ক্রমিক বিষয়টি বিবেচনায় আনেননি। হয়ত অমন ঋদ্ধতাও তাদের ছিল না। তাঁরা শুধু দুর্নীতির অভিযোগটি সত্য প্রমাণের ব্যর্থ প্রয়াসের মাধ্যমে সাধারণ জনগণকে সৈয়দ আবুল হোসেনের বিরুদ্ধে, পক্ষান্তরে সরকারের বিরুদ্ধে ক্ষুব্ধ করে তোলার চেষ্টা করেছেন। রাজনীতিক বক্তৃতার মত প্রতিপক্ষকে মনগড়া কাহিনী দিয়ে ঘায়েল করার চেষ্টা করেছেন। ঋণচুক্তি বাতিল হওয়ায় দেশের ক্ষতির সব দোষ তার উপর চাপিয়ে দিয়েছেন। অথচ সৈয়দ আবুল হোসেন দুর্নীতি করেছেন কিনা কিংবা তার পক্ষে কথিত দুর্নীতি করা আদৌ সম্ভব ছিল কিনা তা অধিকাংশ প্রতিবেদক এড়িয়ে গিয়েছেন। কোন্ পরিস্থিতিতে কখন বিশ্বব্যাংক দুর্নীতির শঙ্কা প্রকাশ করেছে, যে সময়ে দুর্নীতর শঙ্কা প্রকাশ করা হয়েছে সেটি আদৌ যৌক্তিক ছিল কিনা তাও বিবেচনা করা হয়নি। বিষয়ের গভীরে না গিয়ে ‘কাক কান নিয়ে গিয়েছে’ গল্পের মত সবাই কাক এর পেছনে ছুটেছে। গালের পাশে কানটি আছে কিনা কেউ হাত দিয়ে দেখেননি, দেখার চেষ্টা করেননি। সব লেখা তার বিপক্ষে গিয়েছে তা নয়। পদ্মা সেতুর মত বৃহৎ ও জটিল বিষয়ে জ্ঞানসমৃদ্ধ আন্তর্জাতিক মানের বিশেষজ্ঞগণের লেখায় স্পষ্টভাবে ফুটে উঠেছে, পদ্মা সেতুর কথিত দুর্নীতি যেমন হাস্যকর তেমনি অযৌক্তিক। বিশেষজ্ঞ লেখকগণ পদ্মা সেতু প্রকল্পের সবকটি পর্যায় বিশ্লেষণ করে দেখিয়েছেন, দুর্নীতি হবার কোন অবকাশ এখানে ছিল না। এরূপ বিশ্লেষণমূলক লেখা যারা লিখেছেন তাদের মধ্যে ড. জামিলুর রেজা চৌধুরী, ড. আইনুন নিশাত, মেজর জেনারেল এ কে মোহাম্মাদ আলী শিকদার, পিএসসি (অব.), রাহাত খান, হায়দার আকবর খান রনো, বোরহানউদ্দিন খান জাহাঙ্গীর, মিলু শামস এবং আবদুল গাফফার চৌধুরী সহ আরও অনেকের নাম উল্লেখ করা যায়। 
সাংবাদিক হিসেবে সৈয়দ আবুল হোসেনকে কাছে থেকে দেখার সুযোগ আমার হয়েছে। পেশাগত কারণে তাঁকে নিয়ে বি¯তৃত ঘটনাবলী গভীর মনযোগের সাথে অবলোকন করেছি। সৈয়দ আবুল হোসেনের আকর্ষণীয় ব্যক্তি চরিত্র ও আদর্শের সাথে পত্রপত্রিকায় প্রকাশিত লেখালেখির কোন মিল খুজে পাই না। শুধু আমি নই; যারা সৈয়দ আবুল হোসেনকে জানেন সবার একই কথা। তাহলে এ সব কেন? তা ভালোভাবে জানার জন্য প্রকাশিত ঘটনার সাথে রটনা, বাস্তবতার সাথে কল্পনা এবং কার্যকরণের সাথে সৈয়দ আবুল হোসেনের বিরুদ্ধে প্রকাশিত সংবাদ ও প্রতিবেদনগুলোর তুলনামূলক বিশ্লেষণ করি। একজন সাংবাদিক হিসেবে কাছ থেকে, দূর থেকে সৈয়দ আবুল হোসেন এবং আনুপূর্বিক ঘটনাবলী পর্যবেক্ষণ করে আমি নিশ্চিত যে, সৈয়দ আবুল হোসেনের বিরুদ্ধে পদ্মাসেতু প্রকল্প ও অন্যান্য বিষয়ে প্রকাশিত অভিযোগ সারবত্তাহীন এবং গভীর ষড়যন্ত্রের নিকৃষ্ট উদাহরণ। 
পরামর্শক ও ঠিকাদার নির্বাচনের জন্য বিশ্বব্যাংক, এডিবি, আইডিবি প্রত্যেকের পৃথক নীতিমালা রয়েছে। যে সংস্থা অর্থায়ন করে সে সংস্থা পরামর্শক বা ঠিকাদারগণের দরপত্র সংক্রান্ত যোগ্যতা নির্ধারণ করে থাকে। পদ্মা সেতু প্রকল্পের ক্ষেত্রেও এ সকল নিয়মাবলী অনুসৃত হয়েছে। আন্তর্জাতিক দরপত্রের বিশেষ কতগুলো পর্যায় রয়েছে। প্রথম পর্যায় হচ্ছে প্রাক-যোগ্যতা। এ পর্যায়ে প্রাক-যোগ্যতার ভিত্তিতে কোন প্রতিষ্ঠান দরপত্র প্রদান করার যোগ্যতা সম্পন্ন এবং দরপত্র প্রদান করতে হলে কী কী যোগ্যতা আবশ্যক তা নির্ধারণ করা হয়। পদ্মা সেতুর ন্যায় উচ্চ-কারিগরী ও জটিল অবকাঠামোগত প্রকল্পে শুধু সে সকল প্রতিষ্ঠানকে দরপত্র জমা দেয়ার সুযোগ দেয়া হয়, যাদের বর্ণিত কার্য সম্পাদনের পর্যাপ্ত অভিজ্ঞতা রয়েছে। আগ্রহী প্রতিষ্ঠানকে দরপত্রের সাথে তাদের অভিজ্ঞতা, আর্থিক যোগ্যতা, দক্ষতা, কর্মকর্তাগণের তালিকাও জমা দিতে হয়। প্রতিটি বিষয় দাতা সংস্থার প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ তদারকি এবং নির্দেশনায় উপস্থাপিত দলিলাদির ভিত্তিতে মূল্যায়ন করা হয়।
পদ্মা সেতু প্রকল্পের বিভিন্ন পর্যায়ে তিনটি অত্যাবশ্যক বৃহৎ ও জটিল চুক্তির প্রয়োজন ছিল। তম্মধ্যে প্রথম ও প্রধান চুক্তিটি ছিল মূল সেতু নির্মাণ কার্যক্রম। এ কাজে প্রাক-যোগ্যতা নির্ধারণের পর যোগ্য নির্বাচিত ঠিকাদারগণের তালিকা বিশ্বব্যাংকের দপ্তরে জমা দেয়া হয়েছিল। বিশ্বব্যাংক অনুমতি প্রদান করলে মূল দরপত্র আহ্বান করা হতো। কিন্তু বিশ্বব্যাংক অনুমোদন না দেয়ায় মূল দরপত্র আহ্বান করা যায়নি। ঠিকাদার নির্বাচনের বিষয়টি ছিল আরও অনেক ধাপ পরের বিষয়। দ্বিতীয় চুক্তিটি ছিল নদীশাসন। এখানেও দক্ষ ঠিকাদার নিয়োগের ক্ষেত্রে প্রাক-যোগ্যতা নির্ধারণ প্রয়োজন ছিল। এটার কেবল প্রাক-যোগ্যতা যাচাই সম্পন্ন হয়েছে। এ কাজের প্রাক-দাতা যাচাইয়ের পর ঠিকাদারগণের তালিকা বিশ্বব্যাংকে জমা দেওয়া হয়েছে। তা বিশ্বব্যাংকের সদর দপ্তরে রক্ষিত আছে। বিশ্বব্যাংকের অনুমোদন না পাওয়ায় সেটিরও দরপত্র আহ্বান করা সম্ভব হয়নি। এ দুটি গুরুত্বপূর্ণ কাজ বাংলাদেশ সরকার অতি অল্প সময়ের মধ্যে সম্পন্ন করে অনুমোদনের জন্য পাঠালেও বিশ্বব্যাংক অনুমোদন না করে দীর্ঘদিন ফেলে রাখে। এ দীর্ঘসূত্রিতায় কী বিশ্বব্যাংকের সদিচ্ছার বহিঃপ্রকাশ ঘটেছে! তৃতীয় হচ্ছে সংযোগ সড়ক নির্মাণ। এ কাজের অর্থযোগান ও দায়িত্বে ছিল আইডিবি। আইডিবির বিধিবিধান অনুসারোক-যোগ্যতার কাজ সম্পন্ন করে দরপত্র আহ্বান করা হয়। ঠিকাদার নির্বাচনের কাজ সম্পন্ন করার পর আইডিবির অনুমোদনের জন্য পাঠানো হয়েছিল। এটিরও চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত পাওয়া যায়নি। 
২০০৭ সালে পদ্মা সেতুর নকশা প্রণয়নের জন্য এডিবি বাংলাদেশকে কারিগরি সহায়তা দেয়ার উদ্যোগ নেয়। সরকার আন্তর্জাতিক বিজ্ঞাপনের মাধ্যমে পরামর্শকদের কাছ থেকে প্রস্তাব আহবান করে। ছয়টি পরামর্শক প্রতিষ্ঠান প্রস্তাব দাখিল করে। ফিলিপাইনের রাজধানী ম্যানিলায় অবস্থিত সদর দফতরে এডিবি নিজেদের বিশেষজ্ঞ দিয়ে প্রস্তাবগ্রলো মূল্যায়ন করে। একই সাথে বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক গঠিত একটি বিশেষজ্ঞ কমিটি এডিবির নিদের্শনা মোতাবেক প্রস্তাবগুলোর মূল্যায়ন চালিয়ে যায়। বাংলাদেশের মূল্যায়নে এডিবির মূল্যায়ন সমীক্ষায় কিছু ভুল ধরা পড়ে। এডিবি ভুলগুলো সংশোধনপূর্বক তাদের মূল্যায়ন প্রতিবেদন চূড়ান্ত করে। তদভিত্তিতে নিউজিল্যান্ডের প্রতিষ্ঠান মনসেল, কানাডিয়ান প্রতিষ্ঠান নর্থ-ওয়েস্ট হাইড্রোলিক ও অস্ট্রেলিয়ান প্রতিষ্ঠান স্মারক পদ্মা সেতুর পরামর্শক নির্বাচিত হয়। সৈয়দ আবুল হোসেন যোগাযোগ মন্ত্রী হবার অব্যবািহত পর এডিবির মূল্যায়ন প্রতিবেদন অনুমোদন করে চুক্তি স্বাক্ষরের উদ্যোগ গ্রহণ করেন। বঙ্গবন্ধু সেতু নির্মাণের প্রস্তুতি কাজে ১০ বছর লেগেছে কিন্তু সৈয়দ আবুল হোসেনের বিচক্ষণ ব্যবস্থাপনার কারণে পদ্মা সেতুর প্রস্তুতি ২ বছরে শেষ করতে সক্ষম হয়েছেন। এটি একটি বিরল ঘটনা। 
পদ্মা সেতু নির্মাণ একটি জটিল, বৃহৎ ও উচ্চ কারিগরি প্রকল্প। ডিজাইন চূড়ান্ত করার পূর্বে প্রচুর তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহসহ অসংখ্য পরস্পর অবিচ্ছেদ্য জটিল উপাদানের সমন্বয়ে নির্ভুল ডিজাইন প্রণয়ন ছিল অত্যাবশ্যক। এ সকল প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে ২০১০ খ্রিস্টাব্দের মাঝামাঝি সেতুর ডিজাইন প্রণয়ন শুরু করা হয়। সময় সাশ্রয়ের লক্ষ্যে একই সাথে প্রকল্পের অত্যাবশ্যক প্যাকেজগুলোর পরামর্শকদের প্রাক-যোগ্যতা নির্ধারণের প্রক্রিয়াও শুরু করা হয়েছিল। বিশ্বব্যাংক, এডিবি ও জাইকা প্যাকেজসমূহের প্রাক-যোগ্যতার শর্তাবলী নির্ধারণের প্রতিটি পর্যায়ে উপস্থিত ছিলেন। সবার সাথে আলোচনাপূর্বক ঐকমত্যের ভিত্তিতে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়। প্রকল্পের স্বচ্ছতা ও নির্ভুলতার স্বার্থে ২০০৯ সালের মধ্যভাগে প্রকল্পের কারিগরি বিষয়ে প্রয়োজনীয় পরামর্শ ও নির্দেশনা প্রদানের জন্য দশ সদস্য বিশিষ্ট একটি আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞ প্যানেল গঠন করা হয়। প্যানেলে অন্তর্ভুক্ত বিশেষজ্ঞগণের মধ্যে তিনজন জাপানি, একজন নরওয়েজিয়ান বিশেষজ্ঞ ছিলেন। এদিকে ডিজাইন পরামর্শক সংস্থাসমূহ প্রতিবেদন জমা দেয়। প্রতিবেদনগুলো পর্যালোচনা করে আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞ প্যানেল কিছু সুপারিশ প্রদান করে। সুপারিশের ভিত্তিতে ২০১১ সালের মাঝামাঝি সময়ে পদ্মা সেতুর ডিজাইন মোটামুটি চুড়ান্ত করা হয়। উল্লেখ্য, প্রাক-যোগ্যতা নির্ধারণের জন্য সরকার আরও একটি বিশেষজ্ঞ কমিটি গঠন করেছিল। বিশেষজ্ঞ কমিটির সুপারিশ বিশ্বব্যাংক, এডিবি ও জাইকা সর্বসম্মতক্রমে অনুমোদন করে।
বিশ্বব্যাংক প্রথমে বলেছিল, সৈয়দ আবুল হোসেনকে যোগাযোগ মন্ত্রণালয় থেকে সরিয়ে দিলে সেতুর কাজ চালিয়ে নেওয়া হবে। কিন্তু তাঁকে সরানো হলেও বিশ্বব্যাংক স্থগিত কার্যক্রম শুরু করেনি। মন্ত্রণালয় পরিবর্তনের পর তারা জানায়, কানাডায় এসএনসি লাভালিনের বিরুদ্ধে তদন্ত সমাপ্ত না হওয়া পর্যন্ত সেতুর কাজ শুরু হবে না। পদ্মা সেতু প্রকল্পে কর্মরত বিশ্বব্যাংক কর্মকর্তাদের অভিমত ‘এ পর্যন্ত যে কাজ হয়েছে তার স্বচ্ছতা সম্পর্কে অভিযোগ নেই।’ এডিবি ও জাইকাসহ অন্য সহযোগী সংস্থা উদ্ভূত পরিস্থিতিতে দুঃখ প্রকাশ করে। ২৯ জুন বিশ্বব্যাংক পদ্মা সেতুর ঋণ চুক্তি বাতিল করে প্রেসনোট জারি করে। এর ভাষা ও অভিযোগ ছিল বাংলাদেশের জন্য যেমন বিব্রতকর তেমনি অপমানজনক। কোনরূপ তথ্য প্রমাণ ছাড়া বিশ্বব্যাংক ঋণচুক্তি বাতিলের যে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে তা বিরল। সৈয়দ আবুল হোসেন ২০০৯ খ্রিস্টাব্দের ৬ জানুয়ারি যোগাযোগ মন্ত্রীর দায়িত্ব পান। দায়িত্ব গ্রহণের অল্প কিছুদিন পর থেকে পদ্মা সেতু নির্মাণ নিয়ে বিশ্ব ব্যাংকের সাথে আলোচনা শুরু করেন। বিশ্ব ব্যাংক বিভিন্ন অজুহাতে বিলম্ব করছিল। সৈয়দ আবুল হোসেন মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রতিশ্র“ত সময়ের মধ্যে পদ্মা সেতু নির্মাণে বদ্ধপরিকর ছিলেন। তিনি বিশ্বব্যাংককে দ্রুত অর্থ ছাড়ের জন্য তাগিদ দিয়ে যাচ্ছিলেন। মূলত: এটাই হয়েছে তার কাল এবং যাবতীয় সমালোচনার উৎস। 
সৈয়দ আবুল হোসেন ৫ ডিসেম্বর ২০১১ পর্যন্ত যোগাযোগ মন্ত্রী ছিলেন। এ-সময় পদ্মা সেতু নির্মাণ প্রকল্পের ভুমি অধিগ্রহণ, সাইট প্রিপারেশন, স্টক ইয়ার্ড নির্মাণ, তিগ্রস্তদের পূর্ণবাসনসহ প্রস্তুতিমূলক সকল কাজ শেষ করা হয়েছে। মূল সেতু, নদী শাসন এবং সংযোগ সড়কের কাজের জন্য প্রাক-যোগ্য দরদাতাদের নির্বাচন শেষ করা হয়েছে। প্রকল্পের নির্মাণ তদারকি পরামর্শক (ঈড়হংঃৎঁপঃরড়হ ঝঁঢ়বৎারংরড়হ ঈড়হংঁষঃধহঃ) নিয়োগের লক্ষ্যে কারিগরি মূল্যায়নসহ যাবতীয় কাজ সম্পন্ন করা হয়েছে। প্রতিটি ক্ষেত্রে সরকারের নিয়ম-কানুন, ক্রয়নীতি, বিশ্ব ব্যাংক ও দাতা সংস্থাদের গাইডলাইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে। ভূমি অধিগ্রহণ ব্যতীত প্রতিটি ক্ষেত্রে বিশ্ব ব্যাংকের সম্মতির পর পরবর্তী কার্যক্রম গৃহীত হয়েছে। এ সকল কাজ চলাকালীন দাতা সংস্থার কর্মকর্তারা প্রকল্প এলাকা পরিদর্শন করে সন্তোষ প্রকাশ করেছেন। দুর্নীতির কোন নিশানা তারা পাননি। হঠাৎ করে দুর্নীতির তথ্য পেয়ে গেলেন, তাও আবার নির্মাণ তদারকি পরামর্শক নিয়োগে, যা কখনও বিশ্বাসযোগ্য নয়।
নির্মাণ তদারকি পরামর্শক নিয়োগের জন্য বিশ্বব্যাংক নির্ধারিত নিয়মাবলী অনুসরণ করে প্রথমে আবেদনকারী পরামর্শকদের সংক্ষিপ্ত তালিকা করা হয়। এরপর তা অনুমোদনের জন্য বিশ্ব ব্যাংকের কাছে পাঠানো হয়। বিশ্ব ব্যাংক অনুমোদন করলে সংক্ষিপ্ত তালিকায় অন্তর্ভুক্ত প্রতিষ্ঠানের নিকট থেকে দরপত্র আহবান করা হয়। দরপত্রগুলো ড. জামিলুর রেজা চৌধুরীর নেতৃত্বে আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন একদল বিশেষজ্ঞের সমন্বয়ে মূল্যায়ন করা হয়েছে। কমিটিতে ড. আইনুন নিশাতও ছিলেন। বিশ্ব ব্যাংকের মনোনীত সিনিয়র কনসালটেন্ট ড. দাউদও কমিটির সদস্য ছিলেন। জামিলুর রেজা চৌধুরী ও আইনুন নিশাত আন্তর্জাতিক খ্যাতি সম্পন্ন বিশেষজ্ঞ। বিশ্বব্যাংকের প্রত্যক্ষ তদরকিও ছিল। সৈয়দ আবুল হোসেন বিশেষজ্ঞ মূল্যায়ন কমিটির কোন সদস্য ছিলেন না। সুতরাং তারপক্ষে কোন পর্যায়ে কোনভাবে পদ্মা সেতু প্রকল্পকে প্রভাবিত করার সুযোগ ছিল না। তাহলে কেন এসএনসি লাভালিন তাঁকে প্রভাবিত করতে আসবেন? তারা এমন কারও কাছে যেতেন, যার প্রভাবিত করার সুযোগ ছিল। 
এসএনসি লাভালিনকে নির্মাণ তদারকি পরামর্শক হিসেবে নির্বাচনের জন্য নাকি দুর্নীতির আশ্রয় নেয়া হয়েছে। অথচ যাদের বিরুদ্ধে অভিযোগের তীর তারা কোন অবস্থাতে পদ্মা সেতুর নির্মাণ তদারকি পরামর্শক নিয়োগ কমিটিকে প্রভাবিত করার যোগ্যতা রাখেন না। পদ্মা সেতু প্রকল্প সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন কাজের ঠিকাদার ও পরামর্শক নির্বাচন প্রক্রিয়া যেভাবে এগিয়ে নেয়া হয়েছে তা পর্যালোচনা করলে বিষয়টি স্পষ্ট হয়ে উঠে। এসএনসি লাভালিনকে নির্মাণ তদারকি পরামর্শক নির্বাচন ও নিয়োগে বিশ্বব্যাংকের কোনো আপত্তি ছিল না। আপত্তি থাকলে লাভালিন বিশ্বব্যাংক কর্তৃক অনুমোদিত সংক্ষিপ্ত তালিকায় স্থান পেত না। কমিটির মূল্যায়ন বিশ্বব্যাংক লিখিতভাবে অনুমোদন করেছে। যে প্রক্রিয়ার মাধ্যমে এ মূল্যায়ন সম্পন্ন হয়েছে তাতে বিশ্বব্যাংকের প্রতিনিধিও ছিলেন। সুতরাং এ বিষয়ে কোন সন্দেহ নেই যে, বিশ্বব্যাংক নিজেও এসএনসি লাভালিনের পক্ষে ছিল। তাহলে পরে কেন এমন পরিস্থিতি সৃষ্টি হল? এর সাথে দেশীয় ও আন্তর্জাতিক রাজনীতি, উন্নয়নশীল দেশের প্রতি পুজিবাদী বিশ্ব নিয়ন্ত্রিত আর্থিক সংস্থার ভূমিকা, প্রসাদ ষড়যন্ত্র প্রভৃতি ছাড়াও আরও অনেক বিষয় জড়িত। নইলে যে কারণ দেখিয়ে বিশ্বব্যাংক ঋণচুক্তি বাতিল করেছে তার নজির বিশ্বে আর নেই। সুতরাং পদ্মা সেতু প্রকল্পে বিশ্বব্যাংকের দুর্নীতির আশঙ্কা যেমন বৈপরিত্যমূলক তেমন সাংঘর্ষিক। এটি ছিল ঋণচুক্তি বাতিলের নিছক একটি অজুহাত মাত্র। 
এস.এন.সি-লাভালিন এর প্রতিনিধির সাথে বৈঠকের সূত্র ধরে বিশ্ব ব্যাংকের বিশেষজ্ঞ প্যানেল পরামর্শক নিয়োগে দুর্নীতির ষড়যন্ত্র এবং তার সাথে সৈয়দ আবুল হোসেনের সম্পৃক্ততা উত্থাপন করেছেন। এটি যেমন অযৌক্তিক তেমনি হাস্যকর। মূল্যায়ন কমিটির সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করার কোন এখতিয়ার সৈয়দ আবুল হোসেনের ছিল না। মূল্যায়নের প্রতিটি স্তরে বিশ্ব ব্যাংকের সম্মতির পর পরবর্তী কার্যক্রম গ্রহণ করা হয়েছে। পরামর্শক নির্বাচনে প্রচলিত বিধিবিধান ও বিশ্ব ব্যাংকের নির্দেশনা অনুযায়ী ‘নিরপেক্ষবিশেষ মূল্যায়ন কমিটি’ দরপত্র মূল্যায়নপূর্বক কার্যাদেশ প্রদানের সুপারিশ করেছে। মূল্যায়ন কমিটির কার্যক্রমের প্রতিটি স্তরে বিশ্ব ব্যাংক প্রত্যক্ষভাবে স¤পৃক্ত ছিল। ফলে পরামর্শক নিয়োগে কোন অনিয়ম, ষড়যন্ত্র ও দুর্নীতির সুযোগ সৈয়দ আবুল হোসেনের ছিল না। মন্ত্রীরা জনপ্রতিনিধি হিসেবে আইনের মধ্যে থেকে জনস্বার্থে নানাবিধ কাজ করে থাকেন। দেশের জনসাধারণ, ব্যবসায়ী, সাংবাদিক, বিদেশি ডেলিগেট ও কুটনীতিকসহ বিভিন্ন পর্যায়ের লোকজন মন্ত্রীর সাথে দেখা করেন। পদ্মা সেতুর পরামর্শক নিয়োগের ক্ষেত্রে সৈয়দ আবুল হেসেন মন্ত্রী ও জনপ্রতিনিধি হিসেবে বিভিন্ন জনের সাথে বিভিন্ন সময়ে সরল বিশ্বাসে প্রকাশ্যে কথা বলেছেন। এটি ছিল তাঁর দায়িত্বের অবিচ্ছেদ্য অংশ। অধিকন্তু তিনি ছিলেন আওয়ামী লীগের আন্তর্জাতিক বিষয়ক সম্পাদক। বৈদেশিক বিনিয়োগ ও আন্তর্জাতিক সম্পর্ক রক্ষায় এ ধরণের আলোচনা শিষ্টাচার হিসেবে গণ্য। ফলে এ রকম শিষ্টাচার পালনের নিমিত্ত কর্মকর্তাদের নিয়ে প্রকাশ্য আলোচনার জন্য সৈয়দ আবুল হোসেনকে দায়ি করা কোন অবস্থাতে যুক্তিযুক্ত নয়। 
সাবেক প্রতিমন্ত্রী জনাব আবুল হাসান চৌধুরীর অনুরোধে এবং তাঁর উপস্থিতিতে সরকারি অফিসে এস.এন.সি-লাভালিনের প্রতিনিধির সাথে সৈয়দ আবুল হোসেনের সৌজন্য সাক্ষাৎ হয়েছে। এস.এন.সি-লাভালিনের প্রতিনিধি ছাড়াও বাংলাদেশে নিযুক্ত কানাডার প্রাক্তন হাইকমিশনারও দুইবার এস.এন.সি-লাভালিনের বিষয়ে মন্ত্রীর সাথে দেখা করেছেন। প্রাক্তন ব্রিটিশ হাই কমিশনার এবং জাপানের রাষ্ট্রদূতও সংশ্লিষ্ট দেশের প্রতিষ্ঠানের ব্যাপারে সৌজন্য সাক্ষাৎ করেছেন। সৌজন্য সাক্ষাতে পদ্মা সেতু প্রকল্পের ব্যাপারে মন্ত্রী হিসেবে তিনি সকলকেই টেন্ডারের শর্ত, যোগ্যতা, মূল্যায়ন কমিটির সুপারিশ এবং বিশ্ব ব্যাংকের গাইড লাইন অনুযায়ী যথারীতি পরামর্শক প্রতিষ্ঠান নিয়োগ করা হবে মর্মে আশ্বস্ত করেছেন। 
বিশ্ব ব্যাংক বিশেষজ্ঞ প্যানেল বলেছে, দরদাতা নির্বাচন ও কার্যাদেশ প্রদানে মন্ত্রী চুড়ান্ত কর্তৃপক্ষ। প্যানেলের এ মন্তব্য সম্পূর্ণ ভুল। পদ্মা সেতুর পরামর্শক নিয়োগে মন্ত্রী চূড়ান্ত কর্তৃপক্ষ নয়। ক্রয়নীতি অনুযায়ী যে কোন প্রকল্পের উপদেষ্টা নিয়োগের ক্ষেত্রে চুক্তি মূল্য সর্বোচ্চ ১০ কোটি টাকা এবং উন্নয়ন প্রকল্পের ঠিকাদার নিয়োগের ক্ষেত্রে চুক্তি মূল্য সর্বোচ্চ ৫০ কোটি টাকা হলে, তা সংশ্লিষ্ট মন্ত্রী অনুমোদন দিতে পারেন। চুক্তি মূল্য এর অধিক হলে তা চূড়ান্ত অনুমোদনের জন্য সরকারি ক্রয়-সংক্রান্ত্র মন্ত্রিসভা কমিটিতে উপস্থাপন করতে হয়। পদ্মা সেতুর পরামর্শক নিয়োগের আনুমানিক চুক্তি মূল্য ৩০০ কোটি টাকার অধিক। তাই এ চুক্তি অনুমোদনে সৈয়দ আবুল হোসেন চূড়ান্ত অনুমোদনদাতা ছিলেন না। সরকারি ক্রয়-সংক্রান্ত মন্ত্রিপরিষদই ছিল চুড়ান্ত অনুমোদনকারী। কাজে “মন্ত্রী চুড়ান্ত অনুমোদনকারী”- উল্লেখ করে কথিত দুর্নীতির ষড়যন্ত্রের সাথে সৈয়দ আবুল হোসেনের জড়িত থাকার ইঙ্গিত যথার্থ নয়। তাদের এ মন্তব্যের মধ্যে কাউকে দোষী করার ষড়যন্ত্রের প্রমাণ পাওয়া যায়।
পদ্মা সেতু প্রকল্পের ‘পরামর্শক নিয়োগ বিশেষজ্ঞ মূল্যায়ন কমিটি’র মূল্যায়ন ও সুপারিশ বিশ্ব ব্যাংকের অনুমোদনের পর যোগাযোগ মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে ক্রয়-সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটিতে উপস্থাপন করার কথা। মন্ত্রিসভা কমিটি উপস্থাপিত সুপারিশ পর্যবেক্ষণপূর্বক চুড়ান্ত সিদ্ধান্ত প্রদানের অধিকারী। বিধি অনুযায়ী মন্ত্রী মূল্যায়ন কমিটির সুপারিশ পরিবর্তন, পরিবর্ধন, সংশোধন বা পুনঃর্মূল্যায়ন করতে পারেন না। আন্তঃমন্ত্রণালয় সভা করেও দরপত্র পূনঃর্মূল্যায়ন করার এখতিয়ার মন্ত্রীর নেই। অতএব, বিশ্ব ব্যাংক প্যানেলের ধারণা অনুযায়ী মন্ত্রী হিসেবে কোন প্রতিষ্ঠানের সাথে দর-কষাকষি করে কাজ দেয়ার সিদ্ধান্ত গ্রহণের কোন সুযোগ ও এখতিয়ার সৈয়দ আবুল হোসেনের ছিল না। পরামর্শক নিয়োগের বিষয়টি ক্রয়-সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটিতে উপস্থাপনের জন্য কোন প্রস্তাব মন্ত্রী থাকাকালীন তাঁর নিকট উপস্থাপন করা হয়নি। দরপত্র মূল্যায়ন কমিটির সুপারিশের সাথে মন্ত্রী একমত হতে না পারলে মন্ত্রীকে মূল্যায়ন প্রতিবেদন অপরিবর্তিত রেখে নিজস্ব মত কিংবা পর্যবেক্ষণ সরকারি ক্রয়-সংক্রান্ত মন্ত্রিপরিষদ কমিটিতে প্রেরণ করতে হয়। এ অবস্থায় পিপিআর সম্পর্কে সামান্য জ্ঞাত কোন ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান কী কারণে মন্ত্রীকে উৎকোচ দিতে আসবেন তা কোনভাবে বোধগম্য নয়।
এস.এন.সি-লাভালিনের স্থানীয় প্রতিনিধি-প্রেরিত ই-মেইল নিয়েও সৈয়দ আবুল হোসেনের সংশ্লিষ্টতা খোঁজা হচেছ। ই-মেইল নাম্বার জানা থাকলে যে কেউ যে কারও কাছে ই-মেইল পাঠাতে পারেন। তাই কথিত ই-মেইল এর সাথে আবুল হোসেনের সংশ্লিষ্টতা প্রমাণের চেষ্টা নিতান্তই হাস্যকর। ই-মেইল দাতা ও গ্রহীতাকে জিজ্ঞাসা করা হলে এর সত্যতা বেরিয়ে আসবে। যারা অভিযোগ প্রমাণের জন্য উঠে পড়ে লেগেছেন তারাও তো এমনটি কারতে পারে! এ বিষয়ে এত সমালোচনা সৈয়দ আবুল হোসেনের বিরুদ্ধে পরিকল্পিত ষড়যন্ত্রের অপপ্রয়াস বই কিছু নয়। ‘উর্ধ্বতন ব্যক্তি’ হিসেবে সৈয়দ আবুল হোসেনকে ইংগিত করেও যদি ই-মেইল প্রদান করা হয়ে থাকে, তাহলেও প্রমাণের পূর্বে সৈয়দ আবুল হোসেনেকে দায়ি করার কোন সুযোগ নেই। কারণ যে কেউ এরূপ ই-মেইল প্রদান করতে পারেন। এ ধরণের ই-মেইল আদান প্রদানে অন্য কোন উদ্দেশ্যে রয়েছে কিনা- তা খুঁজে বের না করে শুধু সৈয়দ আবুল হোসেনকে সংশ্লিষ্ট করা গভীর ষড়যন্ত্রেরই চিহ্ন।
বিশ্ব ব্যাংকের বিশেষজ্ঞ প্যানেল প্রেরিত চিঠিতে ‘সচিবের মধ্যস্থতা’ বলতে কি বুঝাতে চেয়েছেন- তা রীতিমত অস্পষ্ট। সাবেক প্রতিমন্ত্রীর অনুরোধে এবং তিনিসহ মন্ত্রণালয়ের অন্যান্য কর্মকর্তাদের উপস্থিতিতে সৈয়দ আবুল হোসেন সরকারি অফিসে এস.এন.সি-লাভালিনের প্রতিনিধির সাথে সৌজন্য সাক্ষাৎ করেছেন। মন্ত্রী ইচ্ছা করলে যে কোন বৈঠকে মন্ত্রণালয়ের সচিব ও প্রকল্প সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাগণের উপস্থিত থাকা নিতান্তই স্বাভাবিক। বরং তারা না থাকলে বিষয়টি দোষের হতো। এক্ষেত্রে ‘সচিবের মধ্যস্থতা’ – কথাটি হাস্যকর। কোন অসৎ উদ্দেশ্য নিয়ে বৈঠকটি হয়নি। অসৎ উদ্দেশ্য থাকলে মন্ত্রী গোপনে বেঠকটি করতেন।
রমেশ শাহের ডাইরিতে সৈয়দ আবুল হোসেনের নাম অর্ন্তভূক্ত থাকার বিষয়টিকে পদ্মা সেতু প্রকল্পে দুর্নীতির প্রমাণ ধরে নিয়ে আলোচনা করা যেমন হাস্যকর তেমনি বালসুলভ। কেউ নিজ ডায়রিতে যে কোন কিছু লিখতে পারেন। এ জন্য বিনা প্রমাণে কাউকে দুর্নীতির দায়ে অভিযুক্ত করে হেনস্তা করা নৈতিকতা কিংবা মানবতা উভয়ের পরিপন্থি। রমেশ শাহের ডাইরিতে বর্ণিত- ‘পিসিসি’ তিনি কি উদ্দেশ্যে লিখেছেন তা তিনি নিজেই জানেন। রমেশ শাহকে জিজ্ঞাসা ব্যতীত সৈয়দ আবুল হোসেনকে অর্থ প্রদানের বিষয়টি সত্য ধরে আগাম দোষী সাব্যস্ত করা অন্যায়। কানাডায় পরিচালিত প্রাকমামলার কার্যধারা পর্যবেক্ষণ করে দুদক চেয়ারম্যান রমেশ শাহের ডায়েরিকে ‘বাজারের ফর্দ’ হিসেবে অভিহিত করেছেন। ‘বাজারের ফর্দে’ যে পণ্যগুলো কেনা হবে তার সঙ্গে সঙ্গে উর্ধতন কর্তৃপক্ষ অনুমোদিত আনুমানিক মূল্যও লিপিবদ্ধ থাকে। সাধারণত ক্রেতারা যান বাজারে পণ্যসমূহ কেনার উদ্দেশে; পণ্যেরা ক্রেতাদের কাছে আসে না নিজেদের বিক্রি করার মানসে। সুতরাং ক্রেতা বাড়িতে বসে যে ফর্দ তৈরি করে সে ফর্দ অনুযায়ী ক্রেতার কাছ হতে পণ্য ক্রয় না করা পর্যন্ত বিক্রেতা বা পণ্যের সাথে ক্রেতার সম্পর্ক সৃষ্টির প্রশ্নই আসে না। রমেশ শাহের যে ডায়েরিতে ঘুষ লেনদেনের লক্ষ্যে কর্মকর্তাদের নাম লেখা রয়েছে বলা হচ্ছে সেটিও সত্যিকার অর্থে একটি বাজারের ফর্দ। কানাডিয়ান আদালতে এসএনসি-লাভালিনের যে দুই প্রাক্তন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে প্রাকবিচার পরিচালিত হয়েছে তম্মধ্যে একজন বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত মোহাম্মদ ইসমাইল। যার অর্থ প্রদানের কোন মতাই ছিল না এবং অন্যজন ভারতীয় বংশোদ্ভূত রমেশ শাহ। তারও উর্ধতন কর্তৃপক্ষের অনুমোদন ছাড়া যে ধরণের আর্থিক লেনদেনের কথা উঠেছে সেটার প্রতিশ্র“ত দেয়ার প্রশ্ন আসে না। সুতরাং যে ডায়েরি নিয়ে সৈয়দ আবুল হোসেন বা বাংলাদেশি অন্যান্য কয়েকজনকে দুর্নীতির সাথে জড়িত থাকার কথা বলা হচ্ছে সেটি পুরোটাই কাল্পনিক, অযৌক্তিক এবং অন্যায্য। 
সমালোচকগণ এস.এন.সি-লাভালিন ২য় থেকে ১ম স্থানে উঠে আসার ব্যাপারেও অনিয়মের শঙ্কা প্রকাশ করেছেন। এ বিষয়ে কোন অনিয়ম হয়েছে কিনা- তা সৈয়দ আবুল হোসেনের জানার কথা নয়। কাজটি বিশ্ব ব্যাংকের প্রতিনিধি সমন্বয়ে গঠিত বিশেষজ্ঞ মূল্যায়ন কমিটির সর্বসম্মত সিদ্ধান্তের পরিপ্রেক্ষিতে করা হয়েছে। এসএনসি লাভালিন কেন এবং কীভাবে প্রথম স্থানে উঠে এলো সেটি মূল্যায়ন কমিটির প্রতিবেদনে উল্লেখ আছে। বিশেষজ্ঞ মূল্যায়ন কমিটির সুপারিশ হুবহু চূড়ান্ত অনুমোদনের জন্য সেতু বিভাগ থেকে বিশ্ব ব্যাংকে পাঠানো হয়েছে। মূল্যায়ন কমিটির সুপারিশে সৈয়দ আবুল হোসেন কোন পরিবর্তন, পরিবর্ধন, পরিমার্জন বা সংশোধন করেননি।এক্ষেত্রে সৈয়দ আবুল হোসেনের সংশ্লিষ্টতা খোঁজা শুধু অযৌক্তিক নয়; অজ্ঞতাও বটে। মূল্যায়ন কমিটির সদস্যদের জিজ্ঞাসাবাদ করলে সহজে জানা যাবে যে, মন্ত্রী থাকাকালীন সৈয়দ আবুল হোসেন মূল্যায়ন কমিটির কোন সদস্যেকে কোন বিষয়ে প্রভাব কাটানোর চেষ্টা করেছিলেন কিনা। এর জন্য দুদক কিংবা কানাডার প্রাক আদালতের প্রয়োজন নেই। 
এবার কমিটি গঠন-পুনর্গঠন নিয়ে আলোচনা করা যাক। অসৎ উদ্দেশ্যে নাকি বার বার কমিটি ভাঙ্গাগড়া হয়েছে। প্রকৃতপক্ষে কমিটি ভাঙ্গা-গড়া হয়নি। উপযুক্ততা ও গ্রহণযোগ্যতা বৃদ্ধির স¦ার্থে কমিটি গঠন কিংবা পুনর্গঠন করা হয়েছে। পদ্মা সেতু নির্মাণে অধিকতর স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে তা করা হয়েছে। মূল্যায়ন কমিটি গঠন বা পুনর্গঠনের ব্যাপারে বিশ্ব ব্যাংকের মতামত ও সম্মতিকে সবসময় গুরুত্ব দেয়া হয়েছে। কমিটি গঠন বা পুনর্গঠনের তুলনামূলক পর্যালোচনায় দেখা যায়, সর্বশেষ কমিটিই- পদ্মা সেতু প্রকল্পের জন্য সর্বোত্তম বিশেষজ্ঞ কমিটি। ড. জামিলুর রেজা চৌধুরীর নেতৃত্বে কারিগরি জ্ঞানসম্পন্ন বিশেষজ্ঞ সদস্যদের সমন্বয়ে ঐ গঠন করা হয়েছে। কমিটির অন্য সদস্যরা হলেন- ব্রাক বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি ড. আইনুন নিশাত, বুয়েটের সাবেক ভিসি ড. মো: সফিউল্লাহ, বিশ্ব ব্যাংক মনোনীত পরামর্শক ড. দাউদ আহমেদ ও পদ্মা সেতু প্রকল্পের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী কাজী ফেরদৌস। এক্ষেত্রে সদস্য-সচিব ছাড়া কমিটির অন্য সদস্যরা সেতু বিভাগ বহিঃর্ভূত। 
পদ্মা সেতু প্রকল্পে দুর্নীতির ষড়যন্ত্র নিয়ে কানাডার আদালতে মামলা চলছে। রমেশ শাহের ডায়েরিতে নাকি ঘুষ প্রদানের তালিকা লেখা আছে। যদিও মামলাটি করেছে কানাডিয়ান ফেডারেল সরকারের গুরুত্বপূর্ণ ও স্বাধীন সংস্থা আরসিএমপি। এসএনসি-লাভালিনের দুই প্রাক্তন কর্মকর্তাকে আসামি করা হলেও কোম্পানিকে আসামি করা হয়নি। প্রকৃতপক্ষে আসামির কাঠগড়ায় দাঁড় করানো হয়েছে বাংলাদেশকে। আরসিএমপি বিশ্বব্যাংকের অনুরোধে তদন্ত শুরু করছে। এটি সর্বজনস্বীকৃত যে, বিশ্বব্যাংক কোন দুর্নীতিমুক্ত প্রতিষ্ঠান নয় এবং এক ঝাঁক দেবদূতও এটা পরিচালনা করছেন না। ২০১৩ খ্রিস্টাব্দের এপ্রিলের শেষ ও মে মাসের প্রথম সপ্তাহে প্রাকবিচার পর্যন্ত বিশ্বব্যাংকের কাছেও ঐ ডায়েরির কোন কপিও ছিল না। সে অবস্থায় বিশ্ব ব্যাংক কোন দলিলের ভিত্তিতে দুদকের কাছে ডায়েরিতে যাদের নাম রয়েছে তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠনের দাবি জানিয়েছিল? পদ্মা সেতু প্রকল্পে যে পরিমাণ ঘুষ লেনদেনের ষড়যন্ত্রের কথা উঠেছে সেটি মোট প্রকল্প ব্যয়ের মাত্র এক হাজার ভাগের এক ভাগ। পৃথিবীর অনেক দেশে বিশ্ব ব্যাংকের অনেক প্রকল্পে এর চেয়ে অনেক বেশি ঘুষ লেনদেন হয়েছে। কিন্তু প্রকল্প বাতিল করা হয়নি। যারা দুর্নীতির ষড়যন্ত্রের সাথে জড়িত ছিল তাদের বিরুদ্ধে তদন্ত শুরু করে বিশ্ব ব্যাংক প্রকল্প কাজ চালিয়ে যেত পারত। প্রকৃতপক্ষে দুর্নীতির ষড়যন্ত্র একটি অজুহাত মাত্র। আসল লক্ষ্য বাংলাদেশ এবং শেখ হাসিনার সরকার। যার প্রথম শিকার সৈয়দ আবুল হেসেন। 
তদসত্ত্বেও বাংলাদেশের রাজনীতিক এবং মিডিয়া অঙ্গনে পদ্মাসেতুর দুর্নীতি নিয়ে মহা তোলাপাড় শুরু করে দেয়। এর কারণ হলো ঘটনার বাদি বিশ্বের সর্বশক্তিমান আর্থিক সংস্থা বিশ্ব ব্যাংক এবং আসামি বাংলাদেশের ১৬ কোটি মানুষ। বাংলাদেশের অর্থনীতি এমন স্বনির্ভর নয় যে, ঐ পরাক্রমশালী সংস্থাকে বিদায় জানাতে পারে। ফলে সংস্থাটির দেয়া বিষময় আর্থনীতিক প্রেসক্রিপশন বাংলাদেশকে বিনাপ্রতিবাদে গলাধঃকরণ করতে হয়। পদ্মা সেতু প্রকল্প সফলভাবে সম্পন্ন হলে বাংলাদেশের আর্থ-সামাজিক অবস্থার ব্যাপক উন্নয়ন ঘটতো। অথচ বিশ্বব্যাংক ও বাংলাদেশের কিছু সংবাদপত্রের জন্য তা হয়নি। গণতান্ত্রিক সমাজে সংবাদপত্রের স্বাধীনতা এবং সত্য প্রকাশের দায়বদ্ধতা সমান্তরালভাবে চলার কথা। কিন্তু বাংলাদেশে সংবাদপত্রের স্বাধীনতাকে স্বাধীনতা না বলে স্বেচ্ছাচারিতা বলাই সমধিক যুক্তিযুক্ত। নইলে কীভাবে বিশ্বব্যাংকের ধারণাভিত্তিক দুর্বল ও তুচ্ছ অভিযোগকে এমন ফুলিয়ে ফাপিয়ে তুলে!! দৈনিক প্রথম আলো লিখেছে, “রমেশের হাতে লেখা ডায়েরির এই বিশেষ পৃষ্ঠায় এসএনসি-লাভালিনের আন্তর্জাতিক প্রকল্প বিভাগের সাবেক ভাইস প্রেসিডেন্ট কেভিন ওয়ালেসের স্বাক্ষর রয়েছে”। এটি কত হাস্যকর সহজে অনুমেয়। সামান্য অক্ষরজ্ঞান সম্পন্ন লোকও বলবে কারও ব্যক্তিগত ডায়েরিতে তার উর্ধতন কর্মকর্তার স্বাক্ষর থাকার কথা নয়। অনেক সংবাদপত্র ও ইলেকট্রনিক মিডিয়া এবং সুশীল সমাজের অনেকে তদন্ত কাজে ধীর গতির জন্য দুদকের সমালোচনায় কেঁদে কেটে একাকার হয়ে গিয়েছিলেন। অথচ দুদক সূত্রে জানা যায় কানাডার আরসিএমপিকে বারবার অনুরোধ করা সত্ত্বেও রমেশ শাহের ডায়েরির কপি দুদককে দেয়া হয়নি। যে দলিলটি দুর্নীতি প”মাণের একমাত্র লিখিত সাক্ষ্য সেটা ছাড়া তদন্ত কাজে অগ্রগতি কোনভাবে সম্ভব নয়। 
বিশ্বব্যাংক প্যানেল প্রধান মেরিনো ওকাম্পো’র দুদক চেয়ারম্যানকে লেখা চিঠিতেও সৈয়দ আবুল হোসেনকে অন্যায় ও অযৌক্তিকভাবে সম্পৃক্ত করার চেষ্টা করা হয়েছে। সাক্ষ্য-প্রমাণ ও যুক্তি ছাড়া শুধু দাতা সংস্থার নির্দেশে দুর্নীতির আশংকার সাথে সম্পৃক্ত করতে হবে- এমন দাবি ন্যায় বিচারের পরিপন্থী। অধিকন্তু, বিশ্ব ব্যাংক বিশেষজ্ঞ প্যানেল যখন দুদকে বৈঠক করেন, তখন বিশ্ব ব্যাংকের বাংলাদেশের প্রতিনিধি মিসেস গোল্ড স্টেইন উপস্থিত ছিলেন। যা নিরপেক্ষ তদন্তের স্বার্থে অগ্রহণযোগ্য। কারণ, বিশ্ব ব্যাংক নিজেই অভিযোগকারী। পদ্মা সেতুর ঋণচুক্তিতে বিশ্ব ব্যাংককে দায়মুক্তি দেয়া হয়েছে। তাই বিশ্ব ব্যাংকের কোন অন্যায়ের বিরুদ্ধে মামলা করা যাবে না। দায়মুক্তির সুযোগ নিয়ে যথেচ্ছ আচরণ সবচেয়ে জঘন্য।
ঋণ সাহায্য সবসময়ই রাজনীতিক সিদ্ধান্তের ব্যাপার। বিশ্বব্যাংকের ঋণচুক্তিটিও রাজনৈতিক কারণের বাইরে নয়। সংগত কারণে বাতিলও রাজনীতিক। আমেরিকার সঙ্গে বেশ কয়েকটি কারণে বাংলাদেশের সম্পর্ক ঠিক সাবলীল যাচ্ছিল না। এক ধরনের টানাপোড়েন সৃষ্টি হয়েছিল। বিশেষ করে গ্রামীণ ব্যাংক নিয়ে আমেরিকার খোলামেলা পক্ষপাতিত্ব কারও অজানা নয়। একটি স্বাধীন দেশের অভ্যন্তরীণ ব্যাপারে নাক গলানোর স্পর্ধা গরিবের বউ সবার ভাবী প্রবাদটি স্মরণ করিয়ে দেয়। নেপথ্যে তেল গ্যাস-কয়লা বিষয়টিও থাকতে পারে। গ্যাস রফতানির জন্য আমেরিকার চাপের কথা সবার জানা। বিশ্বব্যাংকের যে কোন বড় সিদ্ধান্ত আমেরিকার আঙ্গুল নাড়ার দিকে চেয়ে থাকে। সুতরাং ঋণ বাতিল সিদ্ধান্তের পেছনে রাজনীতিক শক্তি, শক্তিধর লবিস্ট বহুজাতিক কোম্পানি ও হোয়াইট হাউসসহ অপরাপর শক্তির যোগসাজশ ছিল এটি নিঃসন্দেহে বলা যায়।
নব্বুই এর দশকে রাজনীতিতে সক্রিয় হবার পর থেকে সৈয়দ আবুল হোসেনের বিরুদ্ধে পত্রিকায় অসত্য খবর ও প্রতিবেদন প্রচার হতে শুরু করে। বিএনপি আমলে এসব অভিযোগ তদন্ত করা হলেও কোন সত্যতা খুজে পাওয়া যায়নি। আওয়ামী লীগ সরকারের আমলেও বিভিন্ন সময়ে তার বিরুদ্ধে অসত্য খবর প্রকাশিত হয়েছে। ২০০১ খ্রিস্টাব্দে বিএনপি সরকার ক্ষমতায় এলে এসব খবর নিয়ে একটি শ্বেতপত্র প্রকাশ করা হয়। এ নিয়ে বিএনপি সরকার ৫ বছর তদন্ত করে। তবে তার বিরুদ্ধে উত্থাপিত সব অভিযোগ মিথ্যা প্রমাণিত হয়। ভয়ংকর ১/১১ এর সময় তার জন্ম থেকে শুরু করে তার বিরুদ্ধে প্রকাশিত খবর, বেনামি চিঠি ও বিএনপির শ্বেতপত্রের ওপরও তদন্ত হয়। এ শ্বেতপত্রে তার স্বাক্ষর জাল করেও পত্রিকায় ছাপানো একটি চিঠিও ছিল। সার্বিক তদন্তে তিনি নির্দোষ প্রমাণিত হন। 
বিশ্বব্যাংক একটি অখ্যাত চায়না প্রতিষ্ঠানকে কাজ পাইয়ে দেয়ার জন্য বার বার তদ্বির করেছে। কমিটি তা অগ্রাহ্য করেছে। বিশ্বব্যাংকের মত প্রভাবশালী প্রতিষ্ঠানকে যেখানে পাত্তা দেয়নি সেখানে আমি সৈয়দ আবুল হোসেনের প্রভাব বিস্তার করার দাবি উদ্ভট।। বিশ্বব্যাংকের মত একটি প্রতিষ্ঠান এমন বোকামিপূর্ণ অভিযোগ কীভাবে আনয়ন করল তা ভাবতে আশ্চর্য লাগে। আসলে মিথ্যা কখনও গোপন রাখা যায় না। বিশ্বব্যাংকের ঋণ দেয়ার ইচ্ছা থাকলে একজন দুইজনের দুর্নীতির জন্য ষোল কোটি মানুষকে বঞ্চিত করত না। যে প্রতিষ্ঠানটি দুই/তিনজন লোকের তথাকথিত দুর্নীতির ধুয়ো তুলে ঋণচুক্তি বাতিল করতে পারে সে প্রতিষ্ঠান যে কোন অবস্থাতে বিবেচক নয় তা বলার অপেক্ষা রাখে না। এমন কাজ করে বিশ্বব্যাংক কী বিবেচনপ্রসূত কাজ করেছে?
এর পরও যদি সৈয়দ আবুল হোসেনকে প্রভাব বিস্তার করার কৃতিত্ব দেয়া হয় তাহলে বলতে হয়, বিশ্বব্যাংকই সৈয়দ আবুল হোসেনের কাছে নতি স্বীকার করেছে। তাহলে বিশ্বব্যাংকের পক্ষে কীভাবে তার বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ আনা সম্ভব! যাদের মধ্যে একটু বিবেচনা বোধা আছে তারও এ অভিযোগ কখনও বিশ্বাসযোগ্য মনে করবেন না। এমন অবিশ্বাস্য অভিযোগের উপর ভিত্তি করে পদ্মা সেতুর ঋণ চুক্তি বাতিল ষোল কোটি মানুষের প্রত্যাশাকে হত্যা করা। এর চেয়ে বেশি অবিবেচনার কাজ, জুলুমের কাজ, দুর্নীতির কাজ আর হতে পারে না।

লৈখক পরিচিতি: কলামিস্ট, সাংবাদিক; দৈনিক উত্তরবঙ্গ সংবাদ, শিলিগুড়ি, ভারত।

সুশোভিত সুমন
আতাউর রহমান খান কায়সার
যোগাযোগ একটি বিশাল পরিধির মন্ত্রণালয়। এটি কেউ অস্বীকার করবেন না যে, যোগাযোগ অবকাঠামো বিনির্মাণ যে কোনো দেশের জন্য প্রাকৃতিক, আর্থিক ও কৌশলগত কারণে বেশ জটিল। বিশেষ করে, বাংলাদেশের মতো নদীমাতৃক একটি গরিব দেশের জন্য এটি মহাজটিল। অনেকগুলো মন্ত্রণালয়কে নিয়ে যোগাযোগ মন্ত্রণালয়কে কাজ করতে হয়। অর্থের জন্য অন্য দেশের সাহায্যের উপর নির্ভর করতে হয়, স্বভাবতই কার্যকর সমন্বয় সাধনের উপর যোগাযোগ মন্ত্রণালয়ের সফলতা বহুলাংশে নির্ভর করে। আমি মনে করি, সৈয়দ আবুল হোসেন অনেক সীমাবদ্ধতার মাঝেও এ কাজগুলো সুচারুভাবে সম্পন্ন করে যাচ্ছেন।
তিনি কোনোরূপ প্রটোকল বা ইগোর তোয়াক্কা না-করে বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী ও কর্মকর্তা এমনকি অফিস সহকারীর সাথে সরাসরি আলাপ করে উদ্ভুত সমস্যা সমাধান করার উদ্যোগ গ্রহণ করেন। নিজের ব্যক্তিগত অফিস সাকো-তেও এমন আচরণ লক্ষণীয়। এলাকার উন্নয়নের প্রশ্নে, প্রকল্প বাস্তবায়নের প্রশ্নে, প্রয়োজন হলে, বিরোধী-দলীয় লোকদের সাথে কথা বলতেও তিনি সংকোচ বোধ করেন না। প্রকল্পের সাথে বৈদেশিক যোগসূত্র থাকলে তিনি তা দক্ষতার সাথে সম্পন্ন করতে পারেন। সংশ্লিষ্ট দেশের দূতাবাসের সহায়তায় আন্তঃদেশীয় বৈঠকের মাধ্যমে কাক্সিক্ষত প্রকল্প যথাসময়ে যথাযথভাবে বাস্তবায়নের সম্ভাব্য সকল প্রক্রিয়া সম্পন্ন করেন। বিদেশি সহায়তা সংগ্রহে তিনি অত্যন্ত কুশলী এবং যতœবান। এটি সবার জানা।
রাজনীতি গণিত নয়। এখানে ভুলত্র“টি থাকবেই। রাজনৈতিক প্রশাসনে একশ ভাগ মার্ক পাওয়ার দাবি করা এবং সে রকম কারও কাছ হতে প্রত্যাশা করা দুটোই হাস্যকর ও বোকামি। আমাদের দেখতে হবে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি কতটুকু আন্তরিকতার সাথে কাজ করছেন, তার উদ্দেশ্য এবং কার্যপদ্ধতি। আন্তরিকতা বিবেচনায় সৈয়দ আবুল হোসেনের প্রচেষ্টায় কেউ প্রশ্ন তুলতে পারবেন বলে মনে হয় না। পদ্মা সেতুর কাজ যথাসময়ে সম্পন্ন করার জন্য তার নিরলস প্রচেষ্টা সত্যি প্রশংসনীয়। এর সফলতা নির্ভর করবে সহায়ক শক্তিগুলো তাকে কতটুকু সহায়তা করে তার উপর। আশা করি, তিনি এ কাজে সফল হবেন।
মন্ত্রণালয়ের কাজে কোনো বিষয়ে জটিলতা দেখা দিলে আলোচনার মাধ্যমে তা নিরসনে তিনি নিজেই এগিয়ে আসেন। যথার্থ সমালোচনাকে তিনি উপদেশ গণ্যে সাদরে গ্রহণ করেন। যা তাঁর পরবর্তী পদক্ষেপকে সহজ করে দেয়। তবে সমালোচনা যদি শুধু সমালোচনার জন্য হয়, তাহলে তা অবশ্যই নিরুৎসাহের এবং মনোকষ্টের। এ নিয়ে তিনি কষ্ট পেলেও আবার সাহসী হয়ে ওঠেন।
রাষ্ট্রীয় এমনকি ব্যক্তিগত কাজেও যে কোনো সময় তাঁকে পাওয়া যায়। সমস্যার সমাধান করতে পারুন বা না-পারুন, চেষ্টা করেন এবং ভদ্রোচিত ব্যবহারে সবাইকে মুগ্ধ করেন। চট্টগ্রামের প্রতি তার দরদ রয়েছে। বাণিজ্য নগর এবং বারো আউলিয়ার পুণ্য-ভূমি, সর্বোপরি ঐতিহাসিক গুরুত্বপূর্ণ স্থান হিসেবে তিনি চট্টগ্রামের প্রতি, চট্টগ্রামের উন্নয়নের প্রতি তাকে আমি সবসময় আন্তরিক দেখতে পেয়েছি। চট্টগ্রামের উন্নয়নমূলক কাজে যখনই সহায়তা চেয়েছি, পেয়েছি।
বিভিন্ন সভায় সৈয়দ আবুল হোসেন নিজের দলের লোকের ন্যায় বিরোধী দলের লোকদের প্রস্তাবও গুরুত্বের সাথে শোনেন এবং বিবেচনার আশ্বাস দেন। আওয়ামী লীগ মনে করে আওয়ামী লীগের সব কাজ ভালো, আবার বিএনপি মনে করে বিএনপির সব কাজ ভালো। কিন্তু সৈয়দ আবুল হোসেন মনে করেন, দেশ ও জাতির কল্যাণ এবং সাধারণ মানুষের মঙ্গলের জন্য নিবেদিত সকল কাজই ভালো- তা যে দলই করুক না কেন। যারা কিংবা যে কাজ দেশ ও জাতির ক্ষতি করে, মানুষে মানুষে হানাহানি সৃষ্টি করে, সন্ত্রাস বাড়ায়- তা দল নির্বিশেষে কোনোরূপ প্রশ্ন ব্যতীত খারাপ কাজ। সংগতকারণে পরিত্যাজ্য।
আমি যতটুক জানি, যোগাযোগ মন্ত্রণালয়ের সাথে সংশ্লিষ্ট সবার সাথে তার ব্যক্তিগত সম্পর্ক বন্ধুসুলভ। সবার সাথে ভালো সম্পর্ক থাকার কারণে প্রশাসনিক ও কার্যগত সম্পর্কও চমৎকার। মন্ত্রী হিসেবে তাকে চারিপাশের মানুষ যতটুক সম্মান করেন তিনি তার চেয়ে বেশি সম্মান করেন তাদেরকে- যারা তার কাছে আসেন। এটি অবশ্য শুধু হোমরাচোমরাদের বেলায় করেন তা নয়, সবার প্রতি তিনি সৌজন্যমূলক আচরণ করেন। তিনি অত্যন্ত প্রাণবন্ত, হাসিখুশি এবং ব্যক্তিত্বময়। গত জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নির্বাচন পরিচালনা ও সমন্বয় সংক্রান্ত দায়িত্ব পালনকালে তিনি প্রতিদ্বন্দ্বীদের সাথে ন্যায্য আচরণ করেছেন। বাইরের জগতের মতো তিনি সংসদেও সহনশীল, আন্তরিক ও রুচিশীল। প্রতিপক্ষ আহত হতে পারে কিংবা মনোকষ্ট পেতে পারে- এমন কথা বলতে শুনিনি। মিডিয়াতেও তার কথাবার্তা ও বাচনভঙ্গি আকর্ষণীয় এবং ব্যক্তিত্বময়। তাই দলমত নির্বিশেষে সবাই সৈয়দ আবুল হোসেনকে ভালো জানেন এবং ভালোবাসেন।
একটি মন্ত্রণালয় চালানো সহজ কথা নয়। একজন মন্ত্রীকে অনেক দূরদর্শী হতে হয়। তাঁর থাকতে হয়ে ধৈর্য, কমিটমেন্ট, নিষ্ঠা, দেশপ্রেম, সততা, স্বচ্ছতা এবং নেতৃত্ব প্রদানের দূরদর্শিতা। মাননীয় যোগাযোগ মন্ত্রী সৈয়দ আবুল হোসেনের প্রতিটি কাজে এ সকল গুণাবলীর সমাবেশ দেখা যায়। সর্বোপরি, একজন মন্ত্রীর সার্থকতা নির্ভর করে প্রশাসনিক দক্ষতার উপর। অনেকে মন্ত্রী আমলাদের প্রস্তাবে শুধু ডিটু মেরে যান, বোঝেন না; কিংবা বুঝলেও গভীরে যাবার চেষ্টা করেন না। সৈয়দ আবুল হোসেন তার কাজের ব্যাপারে যেমন অভিজ্ঞ, তেমন সচেতন। যোগাযোগ মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সকল নীতিমালা, বিধি, সাকুর্লার, সরকারি আদেশ ও পিপিআর সম্পর্কে তার অগাধ পাণ্ডিত্য রয়েছে। তার সাথে কাজ করেছেন এমন কয়েকজন কর্মকর্তার কাছে আমি এমনই শুনেছি। কাজে কাজেই তিনি প্রতি নথির আগাগোড়া সহজে বুঝে নিতে পারেন দেখার সাথে সাথে।
তার আত্মসংযম ক্ষমতা প্রবল। ফলে যে কোনো পরিস্থিতি তিনি খুব সহজে কোনোরূপ মনোমালিন্য ব্যতিরেকে সমাধান করতে পারেন। অনেকে দায়-দায়িত্ব অন্যের উপর ছেড়ে দিয়ে বসে থাকেন এবং ব্যর্থতার দায়ভার অধস্তনদের কাঁধে চাপিয়ে দিয়ে সাফাই নেবার চেষ্টা করেন। সৈয়দ আবুল হোসেনকে আমি এমন দায় এড়ানো মনোভাব নিয়ে কাজ করতে কখনও দেখিনি। মন্ত্রণালয়ের সবার একই মত- তার মতো মানুষ বেশি একটা দেখা যায় না, তার মতো মন্ত্রীও খুব কম। তিনি মন্ত্রণালয়ের কাজকে ব্যক্তিগত কাজের মতো গুরুত্ব দিয়ে রাষ্ট্রীয় কোষাগারের অর্থকে স্বচ্ছতার সাথে অথচ সর্বনিম্ন খরচে শুধু জনকল্যাণে ব্যয় করার চেষ্টা করেন। সৈয়দ আবুল হোসেন কর্মকর্তা-কর্মচারীদের দায়িত্ব দিয়ে নিশ্চুপ বসে থাকেন না। নিবিড় তদারক করেন। কাজ আদায় এবং যথাসময়ে কাজটির সফল সম্পাদনের জন্য সবার সাথে নিজেও সামিল হয়ে যান কাজে এবং ব্যর্থতার দায়ভার অন্যের উপর চাপিয়ে না-দিয়ে নিজে বহন করতে বিন্দুমাত্র দ্বিধা করেন না। এটি একজন নেতার অন্যতম বৈশিষ্ট্য বলে আমি মনে করি।
সামাজিক, রাজনৈতিক, প্রশাসনিক ও রাষ্ট্রীয় মর্যাদা ইত্যাদি পদালঙ্করিক হলেও মূলত এর প্রকাশ ঘটে মনে। কেউ মর্যাদা ও ক্ষমতায় যত বড় হোন না কেন, মানসিক দিক দিয়ে বড় না-হলে সে বড়ত্ব দামি অথচ বাসী খাবারের ন্যায় দুর্গন্ধ ছড়ায়, তাই পরিত্যাগ করা ছাড়া উপায় থাকে না। সৈয়দ আবুল হোসেন যত বড় তার চেয়ে বড় তার মন; তার চেয়ে উদার তার ব্যবহার। ফলে তার বড়ত্বে অহঙ্কার এসে বসতে পারে না। তিনি যত বড় হচ্ছেন তার মনে তত বেশি বিনয় শোভা পাচ্ছে। মুখে সবসময় হাসি লেগে থাকে। শিশুর মতো নিষ্পাপ হাসির মাঝে সরলতার আলোর স্ফুরণ যে কাউকে বিগলিত করে দিতে পারে। তিনি চারিত্রিক অলঙ্করণে সুশোভিত মনের একজন সুন্দর মানুষ।
সৈয়দ আবুল হোসেনের যে গুণটি সবচেয়ে বেশি আমাকে আকর্ষণ করে সেটি হচ্ছে উদারতা। দল-নির্বিশেষে সবাইকে তিনি প্রশাসন ও আইনের দৃষ্টিতে অভিন্ন মনে করেন। বিশেষ করে, উন্নয়নের ক্ষেত্রে তিনি সম্পদের বণ্টনকে সমভাবে বণ্টনের চেষ্টা করেন। হয়ত তার ইচ্ছামতো সব কিছু সম্ভব হয় না। কিন্তু তিনি চেষ্টা করেন- এ ব্যাপারে কারও কোনো সন্দেহ নেই। কালকিনি এলাকার উন্নয়নে সৈয়দ আবুল হোসেন দলীয় চেতনাকে কখনও গুরুত্ব সহকারে দেখেননি। তার মানে এ নয় যে, তিনি তার সমর্থকদের অবহেলা করেন। তিনি নির্বাচিত হবার পর শত্র“-মিত্র নির্বিশেষে সবাইকে কাছে টানার চেষ্টা করেন। এ যে চেষ্টা তা-ই বা কয়জন দেখাতে পারেন? মন্ত্রী হবার পর কালকিনিবাসী কর্তৃক প্রদত্ত বিশাল সংবর্ধনা সভায় তিনি যে বক্তৃতা দিয়েছেনÑ তার একটি কপি আমি পড়েছি। এ বক্তৃতায় তিনি ওয়ান-ইলেভেনের সময় যারা তার প্রতি চরম ঘৃণ্য ব্যবহার করেছেন তাদেরকেও ক্ষমা করে দিয়ে জাতীয় উন্নয়নে একাত্ম হবার উদাত্ত আহবান করেছেন।
দলের প্রতি পূর্ণ অনুগত থেকেও সবার প্রতি ভালো আচরণ করা যায়- সৈয়দ আবুল হোসেন এর জ্বলন্ত উদাহরণ। শুধু জিহ্বাটা নিয়ন্ত্রণ করতে পারলে- শত্র“র মনের গভীরেও রেখাপাত করা যায়; এটির উদাহরণও আমরা সৈয়দ আবুল হোসেনের কাছ হতে নিতে পারি। অমায়িক ব্যবহার দিয়েও বঞ্চিত ভাবেন এমন কাউকে সন্তুষ্ট করা যায়-এটিও আমরা তার আচরণে দেখতে পাই।
বাংলাদেশে দলমতের ঊর্ধ্বে উঠে কাজ করার মতো সংস্কৃতি কিংবা পরিবেশ এখনও সৃষ্টি হয়নি। এটি আওয়ামী লীগ-বিএনপি বা অন্য যে কোনো দলের বেলায় প্রযোজ্য। যে ক্ষমতায় যায়, সে নিজেকে বড় ভেবে বসে, যে বিরোধী দলে থাকে সে নিজেকে বঞ্চিত ভেবে বসে। পরস্পর কাদা ছোড়াছুড়ি, একে অন্যকে দোষারোপ ইত্যাদি নিত্যনৈমিত্তিক ব্যাপার হয়ে দাঁড়ায়। এগুলো ঠিক নয়, তবু আমরা কেউ এগুলো ছাড়তে পারিনা। ভিন্ন মতাবলম্বীর দোষের সাথে সাথে গুণ প্রকাশের সংস্কৃতি চালু হলে গণতন্ত্রের ভিত আরও মজবুত হবে। সৈয়দ আবুল হোসেন এ দুটির সমন্বয় ঘটানোর চেষ্টা করেন। এটি শুধু দূরদর্শিতা নয়, মহত্তের পরিচায়কও বটে।
ব্যক্তি বিবেচনায় মাননীয় যোগাযোগ মন্ত্রী সৈয়দ আবুল হোসেন একজন চমৎকার মানুষ। সততা, বিশেষ করে, অর্থিক সততা একজন মন্ত্রীর সুনাম ও সফলতার জন্য অপরিহার্য। আর শুধু সৎ হলে হয় না, সততার সাথে থাকতে হয় নিষ্ঠা, স্বচ্ছতা ও দ্রুততা। সৈয়দ আবুল হোসেন সততার সাথে নিষ্ঠার সমন্বয় ঘটিয়ে যোগাযোগ মন্ত্রণালয়কে একটি কার্যকর মন্ত্রণালয় হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার জন্য দিনরাত নিরলস পরিশ্রম করে যাচ্ছেন। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী যোগ্য লোককে যোগ্যস্থানে অধিষ্ঠিত করে যোগ্যতার যে মূল্যায়ন করেছেনÑ এটি আমাদের সবার জন্য শিক্ষণীয় হয়ে থাকবে। আমি তার সাফল্য কামনা করি।

আতাউর রহমান খান কায়সার : বিশিষ্ট রাজনীতিবিদ, প্রেসিডিয়াম সদস্য, বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ।

পদ্মা সেতু প্রকল্পের প্রাসঙ্গিক বাস্তবতা
মো. মোশাররফ হোসেন ভুঁইয়া
ইদানিং দেশের প্রায় সব পত্রপত্রিকা এবং ইলেকট্রনিক মিডিয়ায় পদ্মা-সেতু প্রকল্পের বিষয়ে বিস্তর লেখা-লেখি ও আলাপ-আলোচনা হচ্ছে। দেশের রাজনীতিবিদ, বুদ্ধিজীবী, সিভিল সোসাইটি থেকে শুরু করে সাধারণ মানুষও বিষয়টিতে কৌতুহলী হয়ে পড়েছেন। বিশ্বব্যাংক গত ২৯ জুন তারিখে প্রকল্পের ঋণচুক্তি বাতিল করায় বিষয়টিতে নতুন মাত্রা যুক্ত হয়েছে এবং এটি ‘টক অব দি কান্ট্রি’-তে পরিণত হয়েছে। এ অবস্থায় অনেক ক্ষেত্রেই পত্রিকা ও ইলেকট্রনিক মিডিয়ায় আলোচকবৃন্দ প্রাসঙ্গিক বাস্তবতা যথার্থভাবে না জেনেই ধারণাপ্রসূত তথ্য-উপাত্তের ভিত্তিতে অসত্য, অর্ধসত্য এবং ক্ষেত্রবিশেষে কাল্পনিক তথ্যাদি উপস্থাপন করছেন। যোগাযোগ মন্ত্রণালয়ের সেতু বিভাগের সচিব পদে দু’বছর কাজের সুবাদে আমি সরকারি দায়িত্বপালনের কারণেই প্রত্যক্ষভাবে পদ্মা-সেতু প্রকল্পের বিষয়ে অবহিত হওয়ার সুযোগ পেয়েছি। সময়ের প্রয়োজনে এবং দেশের স্বার্থে সে অভিজ্ঞতালব্ধ প্রাসঙ্গিক ঘটনাবলী জনসাধারণকে অবহিত করার লক্ষ্যে বিবেকের তাড়নায় এ লেখার প্রয়াস। বিনয়ের সাথে জানাতে চাই-দীর্ঘ ৩২ বছর ন্যূনতম কোন অভিযোগ ব্যতীত পরিপূর্ণ আন্তরিকতা, সততা ও নিষ্ঠার সাথে সরকারি চাকরির শেষ পর্যায়ে অসত্য, অর্ধসত্য এমনকি কাল্পনিক তথ্যের ভিত্তিতে আমাকে জড়িয়ে বিভিন্ন পত্র-পত্রিকায় প্রকাশিত নানাবিধ সংবাদ/নিবন্ধ এবং বিভিন্ন টেলিভিশনের ‘টক শো’-তে কতিপয় আলোচকবৃন্দের মন্তব্যে আমি মর্মাহত হয়েছি সত্য; তবে আত্মপক্ষ সমর্থন করা বা অন্য কাউকে দোষারোপ করা এ লেখার উদ্দেশ্য নয়।

পদ্মা-সেতু প্রকল্পের কাজের শুরু
আমরা সকলেই জানি বর্তমান সরকার ২০০৯ সালের জানুয়ারিতে দায়িত্ব গ্রহণের পর পরই পদ্মা সেতু নির্মাণকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার প্রদান করে। তারই ধারাবাহিকতায় ১৯ জানুয়ারি, ২০০৯ তারিখে সরকারি ক্রয় সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির সভায় পদ্মা সেতুর ডিজাইন পরামর্শক হিসেবে Maunsell AECOM Ltd.-কে নিয়োগের প্রস্তাব অনুমোদিত হয়। ডিজাইন পরামর্শক প্রতিষ্ঠানের কাজের সর্বোচ্চ মেয়াদ ছিল ২ বছর; তবে প্রতিষ্ঠানটি ১৭ মাসের একটি accelerated কর্মসূচি প্রণয়ন করে কাজ শুরু করে। বাস্তবে উক্ত সময়সীমা উত্তীর্ণ হওয়ার পরও প্রতিষ্ঠানটি বিভিন্ন কৌশলে তাদের পরামর্শক সেবার মেয়াদ বৃদ্ধিতে সচেষ্ট হলেও তাদেরকে দ্রুততম সময়ের মধ্যে কার্যক্রম সম্পদান এবং ফবষরাবৎধনষবং হস্তান্তরের ব্যবস্থা করা হয়। পদ্মা-সেতু প্রকল্পে একাধিক উন্নয়ন সহযোগী থাকায় প্রকল্পের স্বার্থে তাদের মধ্যকার সমঝোতা ও সমন্বয়ের বিষয়টি যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ ছিল। কাজের শুরুতেই বিশ্বব্যাংক ও জাইকা’র মধ্যে মূলসেতু নির্মাণের ব্যাপারে একটি বড় কারিগরি বিষয়ে মতদ্বৈততার সৃষ্টি হয় এবং প্রায় অচল অবস্থা সৃষ্টি হলে সচিব হিসেবে আমার যোগদানের পর সেতু বিভাগের পক্ষ হতে উদ্যোগ গ্রহণ করে বিষয়টির সম্মানজনক সমাধান করা সম্ভবপর হয়। অবশ্য টেগর ডকুমেন্ট এর ক্লিয়ারেন্স প্রদানের পূর্বেই বিশ্বব্যাংক প্রকল্পের কার্যক্রম স্থগিত করে।
এছাড়া, ০১ জুলাই, ২০১১ তারিখে বিশ্বব্যাংক সেতু কর্তৃপক্ষের প্রস্তাবিত প্রিকোয়ালিফিকেশন প্রস্তাব অনুমোদন করে। তবে সেতু কর্তৃপক্ষের প্রস্তাবিত (ডিজাইন পরামর্শক ও মূল্যায়ন কমিটির সুপারিশে) টেন্ডার ডকুমেন্ট (বিড ডকুমেন্ট) অনুমোদন নিয়ে জটিলতার সৃষ্টি হয়। বিশ্বব্যাংক উক্ত ডকুমেন্টে শুধুমাত্র তাদের ‘নিজস্ব এন্টিকরাপশন’ গাইডলাইন এর নির্দেশাবলী অন্তর্ভূক্ত করে। এতে অন্য দুটি উন্নয়ন সহযোগি যেমন এডিবি ও জাইকা আপত্তি প্রদান করে এবং তাদের গাইডলাইনের নির্দেশাবলীও অন্তর্ভূক্ত করার দাবী জানায়। সেতু বিভাগ হতে ৩টি উন্নয়ন সহযোগি সংস্থার সাথে দীর্ঘ নেগোসিয়েশনের মাধ্যমে বিষয়টি সমঝোতা করা সম্ভবপর হয়। অবশ্য টেগর ডকুমেন্ট এর কিয়ারেন্স প্রদানের পূর্বেই বিশ্বব্যাংক প্রকল্পের কার্যক্রম স্থগিত করে।

প্রকল্পে সম্পাদিত কার্যাদি 
পদ্মা-সেতু প্রকল্পের কাজে সময়ক্ষেপণ পরিহার করে একইসাথে বিভিন্ন কাজ এগিয়ে নেয়ার পদক্ষেপ গৃহীত হয়েছিল। একদিকে ডিজাইন প্রণয়ন, অন্যদিকে আনুষঙ্গিক কাজের প্রস্ততি যেমনÑ জমি অধিগ্রহণ ও এর মূল্য প্রদান, ৪টি পুনর্বাসন সাইট উন্নয়ন, পরিকল্পনা মাফিক রাস্তাঘাট ও ইউটিলিটি সার্ভিস স্থাপনসহ অন্যান্য নাগরিক সুবিধার ব্যবস্থাকরণ, পরিবেশ সংরক্ষণ ইত্যাদি কার্যক্রম স্বচ্ছতা ও দ্রুততার সাথে সম্পাদনের ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়। জমি অধিগ্রহণের দায়িত্ব ন্যস্ত ছিল শরিয়তপুর, মাদারিপুর ও মুন্সিগঞ্জ জেলা প্রশাসনের উপর। দু’একটি ক্ষেত্রে জমি অধিগ্রহণের অর্থ প্রদান বিষয়ে অভিযোগ/আপত্তি উত্থাপিত হলে তাৎক্ষণিক জেলা প্রশাসকদের সাথে যোগাযোগ করে এর প্রতিকারের ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়। অধিগ্রহণকৃত জমির সঠিক মূল্য পুণঃ নির্ধারণের ও প্রদানের ক্ষেত্রে সেতু বিভাগের পদক্ষেপ ও ভূমিকা মাওয়া ও জাজিরা সাইটের ক্ষতিগ্রস্থ মানুষ ও জনপ্রতিনিধিগণের নিকট বিপুলভাবে প্রশংসিত হয়। এ সব কাজে নূ্যূনতম কোন দুর্নীতি, অনিয়ম বা অভিযোগ ব্যতীত সরকারি বাজেটের প্রায় ১২০০ কোটি টাকারও বেশী ব্যয়িত হয়। বিশ্বব্যাংকসহ প্রকল্পের সকল উন্নয়ন সহযোগীর প্রতিনিধিবর্গ উক্ত কার্যাদি পরিদর্শন করে সন্তোষ প্রকাশ করেন।

বিশেষজ্ঞ কমিটি ও ডিজাইন পরিবর্তন
বিশ্বব্যাংক, এশিয় উন্নয়ন ব্যাংক, ইসলামী উন্নয়ন ব্যাংক ও জাইকা প্রত্যেকেই পদ্মা সেতুর কাজের জন্য একজন করে প্রতিনিধি মনোনীত করেন। সার্বিক কাজ সমন্বয়ের জন্য উন্নয়ন সহযোগী সংস্থার মধ্যে বিশ্বব্যাংককে সমন্বয়কের দায়িত্ব দেয়া হয়। তদপ্রেক্ষিতে বিশ্বব্যাংক তাদের একজন অভিজ্ঞ কর্মকর্তা জনাব মাসুদ আহমাদকে ‘টাস্ক টীম লিডার’ হিসেবে মনোনীত করে। উক্ত মনোনীত ব্যক্তিগণ সার্বক্ষণিক পদ্মা সেতু প্রকল্পের পরিচালকসহ অন্যান্য ইঞ্জিনিয়ারগণের এবং ডিজাইন পরামর্শকের সাথে যোগাযোগ ও সভার মাধ্যমে বিভিন্ন বিষয় নিষ্পত্তি করেন। প্রকল্পের কারিগরি বিষয়াদি পর্যলোচনা ও বাংলাদেশ সেতু কর্তৃপক্ষকে সহায়তার জন্য একটি আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞ টীম (চধহহবষ ড়ৎ ঊীঢ়বৎঃং) গঠন করা হয়। প্রফেসর ড. জামিলুর রেজা চৌধুরীর নেতৃত্বে গঠিত উক্ত বিশেষজ্ঞ টীমে বুয়েটের আরও চারজন অধ্যাপক নিয়োজিত রয়েছেন; তারা হলেন প্রফেসর ড. আইনুন নিশাত, ড. মু. সফিউল্লাহ, ড. ফিরোজ এবং ড. আলমগীর মুজিবুল হক। এ’ছাড়া জাপান, নেদারল্যান্ড ও নরওয়ের ৫ জন পানি বিশেষজ্ঞ এই প্যানেলের অন্তর্ভুক্ত ছিলেন। এদের অধিকাংশই বঙ্গবন্ধু যমুনা সেতু নির্মাণকালীন সময়ে প্যানেল সদস্য হিসেবে কাজ করেছেন। ডিজাইন প্রণয়ন, সেতুর প্রতিটি প্যাকেজের ব্যয় নির্ধারণ, টেন্ডার প্রাক-যোগ্যতার ডকুমেন্ট তৈরী, মূল টেন্ডার ডকুমেন্ট তৈরী ইত্যাদি প্রতিটি ক্ষেত্রে ডিজাইন পরামর্শক প্রতিষ্ঠানের প্রণীত ডিজাইন/দলিলে উন্নয়ন সহযোগীদের কিয়ারেন্স গ্রহণ করা হয় যার নেতৃত্ব দেন বিশ্বব্যাংকের নিয়োজিত টাস্ক টীম লিডার। সেতু বিভাগের পক্ষ হতে দ্রুত সিদ্ধান্ত প্রদান, নথি অনুমোদন, বিভিন্ন বিষয়ে সমন্বয় ইত্যাকার বিষয় উন্নয়ন সহযোগী, প্যানেল অব এ্যাক্সপার্টস, ডিজাইন পরামর্শক এবং সর্বোপরি সরকারের নিকট ব্যাপক প্রশংসিত হয়। মূল সেতুর ঠিকাদার প্রাকযোগ্যতার জন্য টেন্ডার আহবান করা হলে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের ১১টি খ্যাতনামা প্রতিষ্ঠান প্রস্তাব দাখিল করে। এরমধ্যে মূল্যায়ন কমিটি ৫টি প্রতিষ্ঠানকে প্রাক্্যোগ্য হিসেবে নির্বাচন করে। টেন্ডার আহবানের পর ডিজাইন আংশিক পরিবর্তনের অজুহাতে বিশ্বব্যাংক পুণঃ টেন্ডার আহবানের প্রস্তাব দেয়। পূর্বের ডিজাইনে দরপত্রে অংশগ্রহণে আগ্রহী প্রতিষ্ঠানসমূহের নদীতে ইড়ৎবফ এবং/অথবা জধপশরহম চরষরহম-এর অভিজ্ঞতা থাকতে হবে মর্মে উল্লেখ ছিল। পরবর্তীতে চূড়ান্ত ডিজাইনে শুধুমাত্র Racking Piling-এর প্রভিশন রাখা হয়। বিশ্বব্যাংকের সাথে বিবাদ এবং লেখালেখিতে সময়ক্ষেপন হতে পারে বিবেচনায় পুনঃটেন্ডার বিজ্ঞপ্তির প্রস্তাবে সম্মত হয়ে এপ্রিল’২০১০ এ পুনরায় টেন্ডার আহবানের প্রেক্ষিতে ১০টি প্রতিষ্ঠান দরপত্রে অংশ নেয় এবং পূর্বের প্রাক-যোগ্য বিবেচিত ৫টি প্রতিষ্ঠানই মূল্যায়ন কমিটি কর্তৃক প্রাকযোগ্য বিবেচিত হয়।

প্রকল্পের কাজের মোটাদাগের প্যাকেজ, মূল্যায়ন কমিটি ও মূল্যায়ন
পদ্মা-সেতু সংশ্লিষ্ট কাজ (packages) গুলো হল-মূল সেতু, নদীশাসন, সংযোগ সড়কসহ যাবতীয় পূর্ত কাজ এবং Construction Supervision Consultant I Management Support Consultant নিয়োগ। 
আমার সেতু বিভাগের সচিব হিসেবে যোগদানের পূর্বেই দরপত্র মূল্যায়ন কমিটি গঠন করা থাকলেও স্বচ্ছ ও বস্থনিষ্ঠ মূল্যায়নের উদ্দেশে মাননীয় মন্ত্রী এবং উন্নয়ন সহযোগী সমন্বয়ক বিশ্ব ব্যাংকের সাথে আলোচনাক্রমে উক্ত কমিটি পরিবর্তন করে পদ্মা-সেতু সংশ্লিষ্ট কাজ যথা মূল সেতু, নদীশাসন, সংযোগ সড়কসহ যাবতীয় পূর্ত কাজের দরপত্র মূল্যায়নের জন্য আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত বিশেষজ্ঞ এবং প্রশ্নাতীত সুনামের অধিকারী প্রফেসর ড. জামিলুর রেজা চৌধুরী, ড. আইনুন নিশাত ও ড. আবু সিদ্দিকসহ ৭ জন কর্মকর্তাকে নিয়ে একটি দরপত্র মূল্যায়ন কমিটি গঠন করা হয়। এছাড়া Construction Supervision Consultant I Management Support Consultant দরপত্র মূল্যায়নের জন্য সচিবের নেতৃত্বে অপর একটি মূল্যায়ন কমিটি গঠন করা হয়। এ কমিটির অন্যান্য সদস্যগণ ছিলেন সড়ক ও জনপথ বিভাগের সাবেক অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী জনাব তরুণ তপন দেওয়ান, পানি উন্নয়ন বোর্ডের অতিরিক্ত মহাপরিচালক প্রকৌশলী মকবুল হোসেন, বুয়েটের অধ্যাপক, ড. ইসতিয়াক আহমেদ ও পদ্মা সেতুর প্রকল্প পরিচালক জনাব রফিকুল ইসলাম, ড. দাউদ আহমেদ এবং সেতু কর্তৃপক্ষের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী কাজী মোঃ ফেরদৌস। 
মূল সেতু, নদীশাসন, সংযোগ সড়কসহ যাবতীয় নির্মাণ প্যাকেজের মূল্যায়ন প্রক্রিয়ায় সহায়তা করেন ডিজাইন পরামর্শক প্রতিষ্ঠান অঊঈঙগ। প্রথমে উক্ত প্রতিষ্ঠানে নিয়োজিত কারিগরি বিশেষজ্ঞগণ দর প্রস্তাবগুলো পুঙ্খনাপুঙ্খ পরীক্ষা করেন। অতঃপর অঊঈঙগ-এর নিউজিল্যান্ড ও অস্ট্রেলিয়াস্থ Principal Office -এর উচ্চ পদস্থ বিশেষজ্ঞগণের সম্মতি গ্রহণের পর প্রকল্প মূল্যায়ন কমিটির নিকট উপস্থাপন করা হয়। মূল্যায়ন কমিটি অত্যন্ত স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষভাবে কাজ করেছে; তাঁদের কাজে কোনভাবেই কোন প্রভাব বিস্তার বা সেরূপ প্রচেষ্টা হয়নি; এমনকি মূল্যায়ন কমিটির কোন সিদ্ধান্ত বা মতামত সচিব কিংবা মন্ত্রী কর্তৃক কখনো অগ্রাহ্য করা হয়নি। দ্বিতীয় বার টেন্ডার আহবানের পর মূল সেতুর প্রাক্ যোগ্যতা মূল্যায়ন প্রতিবেদন, ডিজাইন পরামর্শক এবং মূল্যায়ন কমিটি কর্তৃক চূড়ান্ত করার পর ০৮ জানুয়ারি, ২০১১ তারিখে বিশ্বব্যাংকে প্রেরণ করা হয়। প্রথম টেন্ডারের পর যে ৫টি প্রতিষ্ঠান প্রাক্্ যোগ্য বিবেচিত হয়েছিল দ্বিতীয় টেন্ডারের মূল্যায়নেও সে ৫টি প্রতিষ্ঠানই কমিটি কর্তৃক প্রাক্্ যোগ্য হিসেবে নির্বাচন করা হয়েছিল। বিশ্বব্যাংক উক্ত মূল্যায়ন প্রতিবেদন পরীক্ষান্তে টাস্ক টীম লিডারের ২৯ মার্চ ও ০৬ এপ্রিল তারিখের ই-মেইলের মাধ্যমে চায়না রেলওয়ে কনস্ট্রাকশন করপোরেশন (ঈজঈঈ)-কে প্রাক্্ যোগ্য হিসেবে বিবেচনার অনুরোধ করে। মূল্যায়ন কমিটি তথা সেতু বিভাগ ০৭ এপ্রিল এক পত্রে (CRCC)-কে যোগ্য হিসেবে বিবেচনায় অসম্মতি জানায়। পুনরায় বিশ্বব্যাংক ১৩ এপ্রিল তারিখের ই-মেইলে CRCC-এর কাছ থেকে কিছু অতিরিক্ত তথ্য সংগ্রহ করে প্রস্তাব পুনর্মূল্যায়নের অনুরোধ জানায়। তদপ্রেক্ষিতে সেতু কর্তৃপক্ষ ঈজঈঈ এর কাছে তাদের পূর্ব কাজের অভিজ্ঞতার স্বপক্ষে ড্রয়িং, ফটোগ্রাফ, নির্মাণ সামগ্রী এবং বৃহৎ ডায়মিটারের রেকিং পাইল-এ ব্যবহৃত হ্যামারের বর্ণনা দেয়ার জন্য চিঠি লেখেন। তারা যেসব তথ্য প্রেরণ করে তাতে ডিজাইন পরামর্শক ও মূল্যায়ন কমিটি বড় রকমের অসঙ্গতি দেখতে পায়। ঈজঈঈ অন্য প্রতিষ্ঠানের নির্মাণ করা ব্রিজের ছবি পরিবর্তন করে ঈজঈঈ-এর নামে জমা দেয়। তাছাড়া পাইলিং ইকুইপমেন্টস্্ ও অন্যান্য কারিগরি বিষয়ে যেসব তথ্যাদি হাজির করে তাতে পদ্মা সেতুর মত বড় ব্রিজের পাইলিং করার মত যোগ্যতা প্রমাণ করে না। ০৭ মে, ২০১১ তারিখে ডিজাইন পরামর্শক প্রতিষ্ঠান তার প্রতিবেদনে উরেøখ করে যে, ঈজঈঈ মিথ্যা তথ্য ও অন্য প্রতিষ্ঠানের নির্মিত ব্রীজের ছবি প্রদান করেছে। এতদপ্রেক্ষিতে ঢাকাস্থ চীন দূতাবাসের ইকোনোমিক কাউন্সিলরকে ০৮ মে তারিখে বিবিএ অফিসে আমন্ত্রণ করে এনে ঈজঈঈ’র চিঠি দেখানো হলে তিনি জানান যে, চিঠিতে উল্লেখিত চীনা কর্মকর্তার নামের স্বাক্ষর চীনা ভাষার নকল স্বাক্ষর। ০৯ মে, ২০১২ তারিখে ঈজঈঈ সেতু কর্তৃপক্ষকে পত্র দিয়ে মূল সেতুর প্রাক যোগ্যতার আবেদন প্রত্যাহার করে নেয় এবং তাদের স্থানীয় Venture International Limited এর এজেন্সিশীপ বাতিল করে। এতে প্রতিয়মান হয় যে, ঈজঈঈ-এর পক্ষে স্থানীয় এজেন্ট Venture International Limited CRCC এর একটি শাখা অফিসের মাধ্যমে বিভিন্ন জাল তথ্য পরিবেশন করেছে। ১৮ই মে, ২০১১ তারিখে পুনরায় ৫টি প্রতিষ্ঠানের প্রিকোয়ালিফিকেশনের সুপারিশ বিশ্বব্যাংকে প্রেরণ করা হয়। ঈজঈঈ প্রাক্্ যোগ্যতার প্রতিযোগীতা হতে নাম প্রত্যাহার করায় বিশ্বব্যাংক আর তাদের পক্ষে চাপ প্রয়োগ করেনি। 
নদীশাসন কাজের প্রি-কোয়ালিফিকেশন টেন্ডার ২৪ জুলাই, ২০১০ তারিখে আহবান করা হয়। টেন্ডার কমিটি ৬টি প্রতিষ্ঠানকে প্রি-কোয়ালিফিকেশনের মূল্যায়ন প্রস্তাব ২৪ ডিসেম্বর, ২০১০ তারিখে বিশ্বব্যাংকে প্রেরণ করে। বিশ্বব্যাংক আরও ২টি চীনা প্রতিষ্ঠানকে প্রাক-যোগ্য বিবেচনা করা যায় কিনা তা পরীক্ষা করতে বলে। ডিজাইন পরামর্শক ও মূল্যায়ন কমিটি বিশ্বব্যাংকের এ প্রস্তাবেও সম্মত হয়নি। অক্টোবর পর্যন্ত নদীশাসন কাজের প্রি-কোয়ালিফিকেশন চূড়ান্ত করা যায়নি। উল্লিখিত ২টি প্যাকেজে বিশ্বব্যাংকের সুপারিশ গ্রহণ না করার কারণে বিশ্বব্যাংকের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাগণ মৌখিকভাবে যোগাযোগ মন্ত্রীকে দোষারোপ করেন, যদিও এব্যাপারে যোগাযোগ মন্ত্রীর কোন কিছু করার ছিলনা। ঈজঈঈ’র স্থানীয় এজেন্ট ঠবহঃঁৎব ওহঃবৎহধঃরড়হধষ খরসরঃবফ যোগাযোগ মন্ত্রী কর্তৃক মূল্যায়ন কমিটিকে প্রভাবিত করা হয়েছে মর্মে বিশ্বব্যাংকের নিকট অভিযোগ করে মর্মে অনেকে ধারণা করেন। 
কনষ্ট্রাকশন সুপারভিশন কনসালটেন্সির (ঈঝঈ) প্রস্তাব মূল্যায়ন বিষয়ে আলোকপাত করতে চাই। এ প্যাকেজের জন্য প্রকল্পে প্রায় ৩৪৫ কোটি টাকা (৫০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার) ধরা আছে। বিশ্বব্যাংকের গাইড লাইন অনুসরণ করে পরামর্শক প্রতিষ্ঠান নিয়োগের জন্য ০৮.১২.২০০৯ তারিখে ঊীঢ়ৎবংংরড়হ ড়ভ ওহঃবৎবংঃ (ঊঙও) আহবান করা হলে প্রস্তাব দাখিলের শেষ দিন (১৪.০১.২০১০) পর্যন্ত ১৩ টি প্রতিষ্ঠান প্রস্তাব দাখিল করে। আমি সেতু বিভাগে যোগদান করার পূর্বে গঠিত প্রস্তাব মূল্যায়ন কমিটি ০৫টি প্রতিষ্ঠানকে ‘শর্ট লিস্টিং’ করে। এ ০৫টি প্রতিষ্ঠান হ’ল :
1. High Point Rendel Ltd. U. K. 2. Oriental Consultants Company Ltd, Japan. 3. Halcrow Group Ltd. UK 4. SNC- Lavalin International INC. UK, Canada. 5. AECOM Newzealand Ltd. প্রতিটি কোম্পানীর সাথে ৩/৪ টি করে দেশী-বিদেশী কোম্পানী জয়েন্ট ভেঞ্চার কোম্পানী হিসেবে সংযুক্ত রয়েছে। নির্ধারিত সময়সীমা অর্থাৎ ৩০.০৬.২০১০ তারিখ পর্যন্ত শর্ট লিস্টেড ০৫টি প্রতিষ্ঠানই ‘দুই ইন্্ভেলপ’ পদ্ধতিতে কারিগরি ও আর্থিক প্রস্তাব দাখিল করে। জুলাই মাসেই আমার নেতৃত্বে গঠিত কমিটি মূল্যায়নের কাজ শুরু করে। প্রসঙ্গক্রমে বলা ভাল যে, কমিটিতে আমি একমাত্র নন্্টেকনিক্যাল ব্যক্তি। অন্যান্য সকলেই ইঞ্জিনিয়ার এবং অনুরূপ প্রস্তাব মূল্যায়নে অভিজ্ঞতা রয়েছে মর্মে দাবী করেন। ২/১টি সভা অনুষ্ঠানের পরই আমি মূল্যায়নের বিভিন্ন খুঁটিনাটি বুঝতে পারি। তবে প্রায় ৪ মাস অতিক্রান্ত হলেও মূল্যায়ন প্রক্রিয়ায় তেমন অগ্রগতি হয়নি। এর কারণ সকলেই দায়িত্বপূর্ণ কাজে নিয়োজিত। মূল্যায়ন করার জন্য যথেষ্ট সময় দেয়া তাঁদের পক্ষে সম্ভব হচ্ছিল না। বেশ কয়েকজন সদস্য বিভিন্ন অজুহাতে সময়ক্ষেপন করতে থাকেন। কয়েকজন সদস্যের মতামত ও কথাবার্তায় বুঝা যায় তারা একটি বিশেষ কোম্পানীকে সবচেয়ে যোগ্যতা সম্পন্ন বিবেচনা করছেন। বুয়েটের অধ্যাপকসহ অন্য কয়েকজন সদস্য ভিন্ন মত পোষণ করেন, তবে তারা কেউই চূড়ান্ত মূল্যায়ন করে নম্বর প্রদান করেননি। আমি সময় বেঁধে দিলাম যে, আগামী ১৫ দিনের মধ্যে ২টি সভা করে সম্পূর্ণ মূল্যায়ন চূড়ান্ত করে বিশ্বব্যাংকে প্রেরণ করতে হবে। ইত্যবসরে দেখা যায় কয়েকজন সদস্য তাদের মূল্যায়ন ই-মেইলে আদান-প্রদান করছে। আমার ই-মেইলেও ২/১টি মূল্যায়ন পাওয়া যায়। উক্ত মূল্যায়ন খুবই পক্ষপাতদুষ্ট ছিল। আমি দেখলাম, অন্য সদস্যগণ সুষ্ঠুভাবে মূল্যায়ন করলেও চূড়ান্ত মূল্যায়ণে স্বচ্ছতা আসবে না। সেকারণে মাননীয় মন্ত্রীর সাথে পরামর্শ করে আমি সচিবের নেতৃত্বাধীন কমিটি ভেঙ্গে দিয়ে নি¤œরূপ একটি উচ্চ ক্ষমতা সম্পন্ন নিরপেক্ষ কমিটি গঠন করি :
১। অধ্যাপক ড. জামিলুর রেজা চৌধুরী, সাবেক অধ্যাপক, বুয়েট -আহবায়ক
২। অধ্যাপক ড. আইনুন নিশাত, ভিসি ব্রাক বিশ্ববিদ্যালয় – সদস্য
৩। ড. মোঃ সফিউল্লাহ, সাবেক ভিসি, বুয়েট – সদস্য
৪। ড. দাউদ আহমেদ, বিশ্বব্যাংক কর্তৃক মনোনিত পরামর্শক ও বিশ্বব্যাংকের সাবেক কর্মকর্তা – সদস্য 
৫। কাজী ফেরদৌস, তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী, পদ্মা সেতু প্রকল্প – সদস্য সচিব

উক্ত কমিটি পূর্বের প্রেক্ষাপট বুঝতে পারে এবং নতুনভাবে মূল্যায়নের কাজ শুরু করে। এখানে উল্লেখযোগ্য যে, এ মূল্যায়নে ডিজাইন কন্্সালটেন্ট কর্তৃক কমিটিকে সহায়তার সুযোগ নেই, কারণ অঊঈঙগ নিজেই ঈঝঈ এর একজন প্রতিদ্বন্দ্বি। মূল্যায়ন কমিটি বেশ কয়েকটি সভায় মিলিত হয়ে তাঁদের কারিগরি মূল্যায়ন প্রতিবেদন ডিসেম্বর, ২০১০ মাসে বিশ্বব্যাংকে প্রেরণ করে। বিশ্বব্যাংক ১০.০৩.২০১১ তারিখে উক্ত কারিগরি মূল্যায়নের উপর সম্মতি প্রদান করে। কারিগরি মূল্যায়নে HPR, Uk প্রথম স্থান, SNC-Lavalin, Canada দ্বিতীয় স্থান, AECOM, Newzealand তৃতীয় স্থান, Halcrow, UK চতুর্থ স্থান এবং Oriental, Japan পঞ্চম স্থান অধিকার করে। উক্ত কারিগরি মূল্যায়ন অনুমোদনের সময় বিশ্বব্যাংক বিবিএকে এমর্মে অনুরোধ করে যে, আর্থিক মূল্যায়নের স্কোর যোগ করে চূড়ান্ত মূল্যায়নের সময় মূল্যায়ন কমিটি যাতে সর্বোচ্চ নম্বরধারী প্রতিষ্ঠানের প্রস্তাবিত পরামর্শক সদস্যদের (Manpower) জীবনব”ত্তান্ত ভালভাবে পরীক্ষা কওে বিশ্বব্যাংক জানায়। বিশ্বব্যাংকের সম্মতি প্রাপ্তির পর মূল্যায়ন কমিটি আর্থিক প্রস্তাব উন্মুক্ত করে। বিশ্বব্যাংকের গাইড লাইন অনুযায়ী কারিগরি মূল্যায়নের উপর ৯০% এবং আর্থিক প্রস্তাবের উপর ১০% ‘ওয়েটেজ’ রাখা হয়। কারিগরি ও আর্থিক মূল্যায়ন ফলাফল সংশ্লিষ্ট সকল প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিদের সামনে ঘোষণা করা হয়। বিশ্বব্যাংকের পরামর্শ অনুযায়ী জীবনবৃত্তান্ত যাচাইকালে বেশ কিছু ব্যক্তির জীবনবৃত্তান্তে কিছু অসংগতি পাওয়া যায়। ঐধষপৎড়ি আনুষ্ঠানিক চিঠি দিয়ে তাদের প্রস্তাবের অসংগতি স্বীকার করে। উল্লিখিত অসংগতি দূর করতে কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের কারিগরি প্রস্তাব (SNC-Lavalin Ges Halcrow) আংশিক পুনঃমূল্যায়ন প্রয়োজন হয়। উক্ত মূল্যায়নে কারিগরি ও আর্থিক প্রস্তাবের গাণিতিক ভুল ও জীবন-বৃত্তান্তে উল্লেখিত যোগ্যতা ও অভিজ্ঞতা পরীক্ষা করা হয়। কারিগরি ও আর্থিক প্রস্তাব যুক্ত করে সার্বিক মূল্যায়নে এসএনসি-লাভালিন প্রথম হয়। এর কারণ কারিগরি মূল্যায়নে প্রথম স্থান অধিকারী ঐচজ-এর আর্থিক দর এসএনসি-লাভালিনের প্রায় দ্বিগুণ। মূল্যায়ন কমিটির চূড়ান্ত মূল্যায়ন আগস্ট, ২০১১ মাসে বিশ্বব্যাংকে প্রেরণ করা হয়েছে।
প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, ড. জামিলুর রেজা চৌধুরী কর্তৃক উক্ত মূল্যায়নের বিষয়ে লিখিত একটি নিবন্ধ গত ০২ জুলাই, ২০১২ তারিখ দৈনিক সমকাল পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে। উক্ত নিবন্ধে তিনিও এ বিষয়ে বিশদভাবে বর্ণনা করেছেন।

যোগাযোগ মন্ত্রী সৈয়দ আবুল হোসেন প্রসঙ্গ
তৎকালীন মাননীয় যোগাযোগ মন্ত্রী সৈয়দ আবুল হোসেনের কার্যক্রম বিষয়ে আমি কিছু উল্লেখ করতে চাই। সেতু বিভাগে যোগদান করার পর থেকেই আমি তাঁকে একজন ভদ্র, সদালাপী, অমায়িক ব্যবহারের অধিকারী ব্যক্তি হিসেবে পেয়েছি। তিনি একদিন আমাকে বলেন, “আমরা যখন নির্বাচিত হয়ে আওয়ামী লীগ সরকারের মন্ত্রী হিসেবে শপথ নেই, সেদিন শপথ অনুষ্ঠান শেষে গাড়িতে উঠার সময় মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আমাকে বলেন, ‘আবুল, পদ্মা ব্রিজ করার দায়িত্ব তোমাকে নিতে হবে। তখনই আমি বুঝতে পারি আমাকে যোগাযোগ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব দেয়া হবে। এরপর থেকে আমি নিরলসভাবে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা বাস্তবায়নে সচেষ্ট হই”। বাস্তবেও তার কার্যকলাপে আমি তাঁর সদিচ্ছা ও নিরলস কর্মতৎপরতা লক্ষ্য করেছি। যখনই তাঁকে বলতাম, ‘স্যার, কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ নথি আছে, আপনার অনুমোদনের প্রয়োজন; তখনই তিনি সেতু বিভাগে চলে আসতেন এবং নথি সই করে দিতেন। এমনকি বাসায় চলে গেলেও অসময়ে ফোন করলে বলতেন, “আমি কি আসবো?” পদ্মা সেতুর প্রতিটি স্টেজেই কাজের অগ্রগতি মনিটর করতেন, প্রয়োজনে মাঠ পর্যায়ে প্রকল্প এলাকা পরিদর্শন করতেন। বিভিন্ন সময়ে উন্নয়ন সহযোগী সংস্থার সিনিয়র কর্মকর্তা, রাষ্ট্রদূত, সাংবাদিক প্রমুখকে নিয়ে চলমান কাজ পরিদর্শন করেছেন। মাঝে মাঝে আমাকে নিয়ে প্রকল্পের বিভিন্ন প্যাকেজের অগ্রগতি সম্পর্কে ডিজাইন পরামর্শক ও মূল্যায়ন কমিটির সাথেও আলোচনা করতেন। কমিটি বিভিন্ন বিষয়ে তাঁকে খুটিনাটি ব্যাখ্যা করত। মন্ত্রী মহোদয় মূল্যায়ন কমিটির সদস্যগণ বিশেষ করে প্রফেসর জামিলুর রেজা চৌধুরীকে খুবই শ্রদ্ধা করতেন। মূল্যায়নের বিষয়গুলো এমন টেকনিক্যাল ধরণের যে, মাননীয় মন্ত্রী কিংবা অন্য কারো মূল্যায়ন প্রক্রিয়া প্রভাবিত করার কোন সুযোগ ছিল না। আমাদের কাজের সাথে সংশ্লিষ্ট বিশ্বব্যাংকের কর্মকর্তাগণ মাননীয় যোগাযোগ মন্ত্রীর কর্মতৎপরতার প্রশংসা করেন, তবে কেউ কেউ ধারণা করেন, তিনি প্রকল্প পরিচালকের মাধ্যমে বিভিন্ন সিদ্ধান্ত প্রভাবিত করতে চেষ্টা করেন। এবিষয়টি তাঁরা আমাকেও বলেন। তাঁরা জানতেন যে, সৈয়দ আবুল হোসেন ‘সাকো ইন্টারন্যাশনাল’ নামক একটি ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের সত্ত্বাধিকারী। তাদের ধারণা, পদ্মা সেতুর কাজ পেতে আগ্রহী কোম্পানীগুলির সাথে মন্ত্রীর ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের যোগাযোগ থাকতে পারে। বাংলাদেশের প্রিন্ট মিডিয়া বা বিভিন্ন সংবাদপত্রে মাননীয় মন্ত্রীর বিরুদ্ধে প্রচুর লেখালেখি হতে থাকে। বিশ্বব্যাংকের হেড্্ কোয়ার্টারের কর্মকর্তাগণও বিষয়টি অবহিত হন। সংবাদপত্রে এসব অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে লিখিত প্রতিবাদে মাননীয় মন্ত্রী জানান যে, সরকারের মন্ত্রী হওয়ার পর তিনি তাঁর প্রতিষ্ঠানের চেয়ারম্যানের পদ থেকে পদত্যাগ করেছেন, যদিও তাঁর পরিবারের অন্যান্য সদস্যগণ সে প্রতিষ্ঠানের পরিচালক হিসেবে বহাল রয়েছেন। যোগাযোগ মন্ত্রী হিসেবে নিয়োজিত হওয়ার পর থেকে মন্ত্রীর এ প্রতিষ্ঠানটি যোগাযোগ মন্ত্রণালয়ের কোন প্রকল্প কিংবা কোন পূর্ত কাজ বা পরামর্শক কাজে অংশ গ্রহণ করেনি। এদিকে প্রকল্প পরিচালক জনাব রফিকুল ইসলামের পূর্বতন চাকরিস্থল সড়ক ও জনপথ বিভাগে কথিত দুর্নীতির বিষয়েও সংবাদপত্রে ব্যাপক লেখালেখি শুরু হয়। পদ্মা প্রকল্পের পরিচালক নিযুক্ত হওয়ার পূর্বে তিনি সড়ক ও জনপথ বিভাগের অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী ছিলেন। ২০০৭-২০০৮ সালে কেয়ারটেকার সরকারের সময় সামরিক বাহিনী অন্যান্য প্রকৌশলী কর্মকর্তার সাথে তাঁকে দুর্নীতির দায়ে গ্রেফতার করে। তিনি বেশ কিছুদিন জেলে ছিলেন। সংবাদপত্রে আরও খবর পরিবেশিত হয় যে, তিনি তৎকালে গঠিত “ট্রুথ কমিশন” সমীপে হাজির হয়ে দোষ স্বীকার করে ক্ষমা পেয়েছেন। এরূপ খবর সংবাদপত্রে প্রকাশিত হওয়ার পর জনাব রফিকুল ইসলাম প্রতিবাদ পাঠিয়ে জানান যে, তিনি ’ট্রুথ কমিশনে’ যাননি। সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তরের কতিপয় কর্মকর্তার সাথে সেনাবাহিনীর হাতে গ্রেফতার হয়েছিলেন, তবে পরবর্তীতে সসম্মানে ছাড়া পান। বিশ্বব্যাংকের ঢাকায় নিয়োজিত কর্মকর্তাগণ এবং প্রকল্পের টাস্ক টীম লিডার আমাকে জানান যে, এরূপ একজন আতœস্বীকৃত ও চিহ্নিত দুর্নীতি পরায়ন কর্মকর্তাকে চুক্তিভিত্তিক প্রকল্প পরিচালক হিসেবে নিয়োজিত করা ঠিক হয়নি। মাননীয় মন্ত্রীর সাথে এ বিষয়ে আলাপ করা হলে তিনি জানান যে, ‘লোকটি কাজ বুঝে এবং ব্রিজ নির্মাণে তাঁর পূর্ব অভিজ্ঞতা রয়েছে। তাঁর চেয়ে ভাল লোক আমি সড়ক বিভাগে কোথায় পাব? অধিকাংশ প্রকৌশলীর বিরুদ্ধেই দুর্নীতির অভিযোগ রয়েছে।’

বিশ্বব্যাংকের সাথে সম্পর্ক, কথিত অভিযোগ ইত্যাদি
কিছু কিছু ক্ষেত্রে বিশ্বব্যাংকের সাথে মতদ্বৈততা হলেও আমার সাথে বিশ্বব্যাংকের বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তাদের সম্পর্ক ছিল খুবই নিবিড়। এই সুসম্পর্কের কারণে সেতু বিভাগের সচিব হিসেবে আমার ২০১০ এর এপ্রিল থেকে ২০১১ এর জুলাই পর্যন্ত কয়েকটি ভ্রমণে বিশ্বব্যাংকের ওয়াশিংটন সদর দপ্তরে নিয়োজিত কর্মকর্তাদের নিকট থেকে প্রকল্পের বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ কাজ আদায় করা সম্ভব হয়। ২০১০ সনের এপ্রিল মাসে মাননীয় অর্থ মন্ত্রীসহ বাংলাদেশ প্রতিনিধি দল বিশ্বব্যাংকের প্রেসিডেন্ট রবার্ট জয়েলিক এর সাথে দেখা করে বিশ্বব্যাংকের ঋণ প্রাপ্তির বিষয়টি চূড়ান্ত করেন। 
মূল সেতুর ব্যয় ধরা হয়েছিল ১০০০ মিলিয়ন ডলার, নদী শাসন প্যাকেজের সম্ভাব্য ব্যয় ৭৫০ মিলিয়ন ডলার এবং সুপারভিশন কনসালটেন্সি ব্যয় ধরা হয়েছিল মাত্র ৫০ মিলিয়ন ডলার। কিন্তু শেষোক্ত প্যাকেজের কাজ পাওয়ার জন্যই প্রতিযোগীতা বেশী লক্ষ্য করা গিয়েছে। শুরুতেই ১টি কোম্পানীকে ‘ফেবার’ করার চেষ্টা আঁচ করতে পেরে মূল্যায়ন কমিটি ভেঙ্গে দিয়ে নিরপেক্ষ বিশেষজ্ঞ পর্যায়ের ব্যক্তিবর্গকে নিয়ে পরবর্তী কমিটি গঠন করা হয়। এ কমিটির মূল্যায়ন চলাকালীন সময়ে একটি মহল ই-মেইলের মাধ্যমে বিশ্বব্যাংকের ইন্টিগ্রিটি ডিপার্টমেন্টের সাথে যোগাযোগ করতে থাকে। ইন্টিগ্রিটি বিভাগের কর্মকর্তাদের দেয়া ই-মেইলের কপি প্রকল্প সংশ্লিষ্ট জাপানী একজন কর্মকর্তার কাছেও পাঠানো হয়। শুরু থেকে না হলেও কয়েক মাস পর থেকে উক্ত ই-মেইলের কপি বিশ্বব্যাংকের মাধ্যমে আমার ই-মেইলে ফরওয়ার্ড করা হয়। দেখা যায় যে ২টি প্রতিষ্ঠান (এসএনসি-লাভালিন ও এইচপিআর) কারিগরি মূল্যায়নে বেশী নম্বর পেতে পারে বলে ঐ মহলটি আশংকা করে সেই প্রতিষ্ঠান ২টির বিরুদ্ধে বিষোদগার করতে থাকে। কোন কোন মেইলে তারা ঐধষপৎড়-িএর ও দোষত্র“টি তুলে ধরে। মূল্যায়ন কমিটির বিভিন্ন সদস্য, মন্ত্রী, সচিব এমনকি বিশ্বব্যাংকের মনোনীত পরামর্শক ও টাস্ক টীম লিডারকে জড়িয়ে বানোয়াট তথ্য প্রদান করে। উক্ত ই-মেইলে আদান-প্রদানের সাথে পদ্মা প্রকল্পের কোন কর্মকর্তা জড়িত থাকতে পারে মর্মে সহজেই অনুমান করা যায়। ইন্টিগ্রিটির কয়েকজন কর্মকর্তা ই-মেইল আদান-প্রদানে ও তথ্য সংগ্রহে বেশ উৎসাহী হয়ে উঠে। ২০১১ সনে পদ্মা সেতুর গুরুত্বপূর্ণ কাজে আমি ২ বার বিশ্বব্যাংক সদর দপ্তরে গমন করি। প্রথমবার (মার্চ-এপ্রিল, ২০১১ মাসে) টাস্ক টীম লিডারকে জানাই যে, ইন্টিগ্রিটির জুনিয়র ২ জন কর্মকর্তা যেভাবে ই-মেইলের মাধ্যমে একটি ভুল বিষয়ের উপর যোগাযোগ করে তথ্য সংগ্রহ করছে তা নিরসনের জন্য আমি তাদের সাথে কথা বলতে চাই। টাস্ক টীম লিডার ইন্টিগ্রিটি বিভাগের সাথে যোগাযোগ করলে তারা বলে যে, এপর্যায়ে তারা আমার সাথে কোন কথা বলবেনা। দ্বিতীয়বার (জুন-জুলাই, ২০১১ মাসে) ভ্রমণে মাননীয় অর্থনৈতিক বিষয়ক উপদেষ্টা ড. মসিউর রহমান নেতৃত্ব দেন। উল্লেখ্য ড. মসিউর রহমান ইতোমধ্যে পদ্মা প্রকল্পের ইন্টিগ্রিটি এড্্ভাইজার নিযুক্ত হয়েছেন। অনিয়মের কোন অভিযোগ পাওয়া গেলে প্রতিকারের জন্য তাঁকে জানানোর কথা। এ সফরে তিনি ইন্টিগ্রিটি ভাইস প্রেসিডেন্টের সাথে বৈঠক করেন; কিন্তু কথিত অভিযোগ সমূহের বিষয়ে বৈঠকে কোন আলোচনা হয়নি। বিশ্বব্যাংকের দক্ষিণ এশিয়া বিষয়ক ভাইস প্রেসিডেন্ট, মিস ইসাবেল গুরায়রা এর সাথে আমাদের সাক্ষাতের সময় আমি এ বিষয়টি পুনরায় উত্থাপন করি। তিনি জানান, ইন্টিগ্রিটির ভাইস প্রেসিডেন্ট সরাসরি প্রেসিডেন্টের কাছে রিপোর্ট করেন। যে পদ্ধতিতে তারা কোন বিষয়ের তদন্ত করে তাতে আমাদের কোন কিছু বলার সুযোগ নেই। তবে তাদের তদন্ত চলাকালীন সময়ে পদ্মা সেতুর কাজ থেমে থাকবে না। কাজ এবং তদন্ত – এ দু’টি ইস্যু সম্পূর্ণ পৃথক। শুধু ওয়াশিংটনে নয়, আমি ঢাকাস্থ কান্ট্রি ডাইরেক্টরকেও বিষয়টি অবহিত করি। পরবর্তীতে খবর পেলাম ইন্টিগ্রিটির কর্মকর্তাগণ ঢাকায় এসে অভিযোগকারীদের সাথে দেখা করেছে। বিশ্বব্যাংকের স্থানীয় কর্মকর্তাগণকে আমি বললাম, ‘ইন্টিগ্রিটি যদি তদন্ত করে তবে বাংলাদেশ সেতু কর্তৃপক্ষ ও মূল্যায়ন কমিটির সদস্য সকলেরই মতামত নিতে হবে’। তারা জানালেন, “ইন্টিগ্রিটি বিভাগের কাজের ব্যাপারে আমাদের বলার কিছু নেই”। জুলাই-আগস্ট, ২০১১ মাসের দিকে আমাকে জানানো হ’ল বিশ্বব্যাংক ইন্টিগ্রিটি সুপারভিশন কনসালটেন্সি ছাড়াও মূল সেতুর টেন্ডারের অনিয়মে মন্ত্রীর সংশ্লিষ্টতার বিষয়েও তদন্ত করছে। একপর্যায়ে তারা মাননীয় মন্ত্রীর ব্যবসা প্রতিষ্ঠান সাকো ইন্টারন্যাশনালেও গমন করেন। তাদের অভিযোগ ‘এ প্রতিষ্ঠানটি প্রাক্্ যোগ্যতা বহির্ভূত ঈযরহধ জধরষধিু ১৫ ইঁৎবধঁ নামক প্রতিষ্ঠানকে চিঠি দিয়ে তাদের প্রাক্্ যোগ্য করে দেয়ার প্রস্তাব দেয়’। পরবর্তীতে শুধু ১৫ ইঁৎবধঁ নয়, প্রাক্্ যোগ্য ০৫টি প্রতিষ্ঠানের সাথেও নাকি মন্ত্রীর প্রতিষ্ঠানের লোক গিয়ে দেখা করে। এক পর্যায়ে কান্ট্রি ডাইরেক্টর আমাকে বলেন, ‘বিশ্বব্যাংকের উচ্চ পর্যায়ে যোগাযোগ মন্ত্রীর বিরুদ্ধে বিভিন্ন অভিযোগ গিয়েছে। তাঁকে যোগাযোগ মন্ত্রণালয়ে রেখে এ প্রকল্পের কাজ এগিয়ে নেয়া সম্ভব নয়। আমি বিষয়টি মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর সাথে দেখা করে তাঁকে অবহিত করতে চাই’। আমি কান্ট্রি ডাইরেক্টরকে জানাই যে, আমরা যে পদ্ধতিতে পদ্মা সেতুর কাজ করে যাচ্ছি সে পদ্ধতিতে মাননীয় মন্ত্রীর হস্তক্ষেপ করার কোন সুযোগ নেই। তিনি বর্তমান সরকারের একজন প্রভাবশালী ও বিশ্বস্ত ব্যক্তি। বিশ্বব্যাংক কর্তৃক তাঁকে সরানোর প্রস্তাব মাননীয় প্রধানমন্ত্রী ভালভাবে নিবেননা। কান্ট্রি ডাইরেক্টর আমাকে বলেন, মন্ত্রিসভায় রদবদল করে তাঁকে অন্য মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব দিলেও হবে। আমি মাননীয় মন্ত্রীর বিষয়ে বিশ্বব্যাংকের ভুল ধারণা নিরসনের চেষ্টা করেও ব্যর্থ হই। সেপ্টেম্বর, ২০১১ মাসে বিশ্বব্যাংকের ভাইস প্রেসিডেন্ট ও ইন্টিগ্রিটির একজন পরিচালকসহ বিশ্বব্যাংকের প্রতিনিধি দল বাংলাদেশে এসে সরকারের সাথে দেখা করে আনুষ্ঠানিকভাবে কথিত দুর্নীতির চেষ্টার বিষয়টি অবহিত করেন। মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর সাথে সাক্ষাতের সময় মাননীয় অর্থ মন্ত্রী এবং মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর ২ জন উপদেষ্টাও উপস্থিত ছিলেন। এ ব্যাপারে বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ হতে দুর্নীতির স্বপক্ষে প্রমাণ উপস্থানের জন্য বলা হয়। ভাইস প্রেসিডেন্ট বলেন যে, জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের আসন্ন সভায় প্রধানমন্ত্রী নিউইয়র্ক গেলে সেখানে প্রমাণ উপস্থাপন করা হবে। তারা প্রধানমন্ত্রীর নিকট নিউইয়র্কে কোন তথ্য প্রমাণ দেয়নি। তবে মাননীয় অর্থ মন্ত্রী একই সময়ে ওয়াশিংটন গেলে তাঁর নিকট একটি চিঠি দেওয়া হয়। উক্ত চিঠিতে মাননীয় যোগাযোগ মন্ত্রীর বিরুদ্ধে অভিযোগ করা হয়েছে বটে, কিন্তু কোন সুনির্দিষ্ট তথ্য প্রমাণ দেয়া হয়নি। বিশ্বব্যাংক বিষয়টি দুদক এর মাধ্যমে তদন্ত করার অনুরোধ করে। ইতোমধ্যে বাংলাদেশে প্রিন্ট মিডিয়ায় মন্ত্রীর বিরুদ্ধে তুমুল লেখা-লেখি শুরু হয়। বিশ্বব্যাংক ঋণ চুক্তি ও পদ্মা সেতু প্রকল্পে তাদের কার্যক্রম স্থগিতের ঘোষণা দেয়। সেতু বিভাগ তখন মূল সেতুর প্রি-কোয়ালিফিকেশনের পর টেন্ডার আহবানের জন্য প্রস্থত। আর সুপারভিশন কনসালটেন্সির চূড়ান্ত মূল্যায়ন বিশ্বব্যাংকের বিবেচনাধীন। এ পর্যায়ে বিদেশী সংবাদ মাধ্যমে খবর প্রচারিত হয় যে, পদ্মা সেতুর দুর্নীতির সংশ্লিষ্টতায় রয়াল কানাডিয়ান মাউন্টেড পুলিশ এসএনসি-লাভালিনের অফিসে হানা দিয়ে তাদের কাগজপত্র জব্দ করে। যোগাযোগ মন্ত্রী সৈয়দ আবুল হোসেনের বিরুদ্ধে মিডিয়ার অপপ্রচারে নতুন মাত্র যোগ হয় যখন উইকিলিকস্্ এর ফাঁস করা ১টি চিঠিতে সাবেক মার্কিন রাষ্ট্রদূত মরিয়াটি তাঁকে ‘লেস দ্যান অনেস্ট’ আখ্যায়িত করেন। মাননীয় যোগাযোগ মন্ত্রী সাংবাদিক সম্মেলন করে নিজের সততা ও স্বচ্ছতার কথা বলেন, কিন্তু মিডিয়াতে তা গ্রহণযোগ্য হয়না। সে সময়ে মাননীয় মন্ত্রীর অনুমতি নিয়ে আমি পিআইডিতে একটি সাংবাদিক সম্মেলন করি। আমি পরিস্কারভাবে উক্ত সাংবাদিক সম্মেলনে আমাদের বিভিন্ন কার্যক্রম তুলে ধরি এবং জানাই, যেভাবে আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞ দল ও নিরপেক্ষ মূল্যায়ন কমিটির মাধ্যমে সেতুর কাজ চলে আসছে তাতে মাননীয় মন্ত্রী কেন, তাঁর উর্দ্ধের কোন কর্তৃপক্ষেরও এখানে হস্তক্ষেপের কোন সুযোগ নেই। তাছাড়া যেখানে ঋণের কোন টাকাই ছাড় হয়নি সেখানে দুর্নীতির কোন প্রশ্নই আসেনা। আমার সাংবাদিক সম্মেলনের বক্তব্য পরদিন মিডিয়ায় ব্যাপক প্রচার পায়। একই সময়ে আমি কয়েকটি টিভি চ্যানেলেও পদ্মা পকল্পের কাজে আমাদের স্বচ্ছতা এবং কতিপয় স্বার্থান্বেষি ব্যক্তির বেনামি অভিযোগের বিষয়টি তুলে ধরি এবং বিশ্বব্যাংকের দুর্নীতির অভিযোগের কোন ভিত্তি নেই মর্মে জোর দিয়ে উল্লেখ করি। সে সময়ে দেশে কোন কোন মহল আমাকে বলেন, ‘বিশ্বব্যাংক তো আপনার (সচিবের) বিরুদ্ধে কোন অভিযোগ করছেনা। আপনি মন্ত্রীর পক্ষে সাফাই গাচ্ছেন কেন?’ আমি বললাম, প্রকল্পের কাজ যে স্বচ্ছতার সাথে সম্পাদিত হচ্ছে কোন অনিয়ম হয়নি আমি তা-ই জনসমক্ষে তুলে ধরছি। আমাদের স্বচ্ছতা প্রশ্নবিদ্ধ হলে মন্ত্রী কেন, আমরা সকলেই দায়ী হবো। তাছাড়া মাননীয় মন্ত্রীর সাথে কাজ করে আমি দেখছি এপর্যন্ত তিনি আমাদের কোন কাজে হস্তক্ষেপ করেননি, কোন অনৈতিক বিষয়ে সুবিধা দাবী করেননি। ভবিষ্যতে কিভাবে এ থেকে ফায়দা নিবেন তা আমার জানা নেই। তবে তাঁর ব্যক্তিগত চালচলন ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের অবস্থা থেকে বুঝা যায় এ সরকারের মন্ত্রী হওয়ার পূর্ব থেকেই তিনি বেশ সম্পদশালী। কাজেই মন্ত্রীত্ব করে সম্পদ কামানোর জন্য তাঁর হাপিত্তেস আমার চোখে পড়েনি। তিনি প্রচলিত ধ্যানধারনার রাজনীতি করেননা। সে জন্য তাঁর দলের অনেক প্রভাবশালী ব্যক্তিও তাঁর বিরুদ্ধে বিভিন্ন ফোরামে এমনকি সংসদেও বক্তব্য প্রদান করেছেন। যোগাযোগ মন্ত্রীর বিরুদ্ধে মিডিয়ার অপপ্রচার তুঙ্গে উঠে যখন দীর্ঘ দেড়মাস বৃষ্টিতে পানি জমে সারা দেশের রাস্তা-ঘাট তথা সড়ক যোগযোগ ভেঙ্গে পড়ে, যানবাহন ধর্মঘট হয় এবং দেশে বেশকিছু সড়ক দুর্ঘটনা ঘটে। একটি দুর্ঘটনায় আরিচা থেকে আসার পথে সাংবাদিক ও মিডিয়া ব্যক্তিত্ব মিশুক মুনীর এবং চলচ্চিত্র পরিচালক তারেক মাসুদ নিহত হন। উক্ত দুর্ঘটনা যদিও খারাপ রাস্তার কারণে হয়নি, তথাপি দেশের বুদ্ধিজীবি মহল মন্ত্রীর পদত্যাগের দাবীতে সোচ্চার হন এবং ঈদের দিনেও শহীদ মিনারে সমবেত হয়ে তাদের দাবীর স্বপক্ষে বিক্ষোভ করেন। এখানে বলে রাখা প্রয়োজন যে, মাননীয় যোগাযোগ মন্ত্রীর বিরুদ্ধে দেশে বিদেশে যতই অভিযোগ থাকুক, দুর্নীতি কিংবা অদক্ষতার সুনির্দিষ্ট প্রমাণ ছাড়া সরকার কোন ব্যবস্থা নিতে চাইলেন না। ইতোমধ্যে পদ্মা সেতুর প্রকল্প পরিচালকের বিরুদ্ধে অফিসের স্বার্থ বিরোধী কাজের কিছু নমুনা পাওয়ায় মাননীয় মন্ত্রীর সাথে আলোচনা করে তাঁর চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ বাতিলের প্রস্তাব করি। অবশেষে অক্টোবর, ২০১১ মাসের প্রথমদিকে তাঁকে প্রকল্প পরিচালকের পদ থেকে সরানো হয়। একই মাসের মাঝামাঝি সময়ে আমাকে সেতু বিভাগের সচিব পদ থেকে বদলী করে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের অধীন বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষের নির্বাহী চেয়ারম্যান হিসেবে নিয়োগ দেয়া হয়। বিশ্বব্যাংকের ঢাকাস্থ এবং ওয়াশিংটনের কর্মকর্তাগণ এ বদলীর প্রেক্ষিতে বিস্মিত হন এবং মাননীয় অর্থমন্ত্রীসহ সরকারের উচ্চ মহলে সেতু বিভাগ থেকে আমাকে বদলী না করার জন্য অনুরোধ করেন। অক্টোবরে বদলী করা হলেও মাননীয় অর্থমন্ত্রী ও যোগাযোগ মন্ত্রীর অনুরোধে আমি নভেম্বরের মাঝামাঝি পর্যন্ত সেতু বিভাগে দায়িত্ব পালন করি।

দূর্নীতির অনুসন্ধান ও পরবর্তী পরিস্থিতি
বিশ্বব্যাংকের পূর্বের প্রস্তাব ছিল জনাব আবুল হোসেনকে যোগাযোগ মন্ত্রণালয় থেকে সরালেই সেতুর কাজ চালিয়ে নেয়া যাবে। কিন্তু পরবর্তীতে মন্ত্রীর পোর্টফলিও বদল করে তাকে যোগাযোগ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দেয়ার পরও তারা স্থগিত কার্যক্রম পুনরায় শুরু করেনি। সরকারের উপরের মহল থেকে বিশ্বব্যাংকের সাথে যোগাযোগ করা হলে তারা জানান বিষয়টি ব্যাংকের প্রেসিডেন্ট রবার্ট জয়েলিকের হাতে। শোনা যায়, নীচের দিকে কিছু চেষ্টা হলেও জয়েলিকের অনিহার কারণে কাজ শুরু করা যায়নি। বিশ্বব্যাংক বাংলাদেশ সরকারকে জানিয়ে দেয় যে, কানাডিয়ান পুলিশ কর্তৃক এসএনসি-লাভালিনের বিরুদ্ধে চলমান তদন্ত সমাপ্ত না হওয়া পর্যন্ত সেতুর কাজ শুরু করা হবেনা। অক্টোবর, ২০১১ মাসে আমি সেতু বিভাগের সচিব থাকা কালীন বিশ্বব্যাংকসহ অন্যন্য উন্নয়ন সহযোগীদের সাথে পদ্মার কার্যক্রম চালিয়ে নেয়ার বিষয়ে কথা বলি। বিশ্বব্যাংকের যেসকল কর্মকর্তা আমাদের সাথে নিবিড়ভাবে কাজ করেছেন তাদের অভিমত এই যে, এপর্যন্ত প্রকল্পের যে কাজ হয়েছে তার স্বচ্ছতা সম্পর্কে আমাদের কোন অভিযোগ নেই। তবে আমরা উর্দ্ধতন কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্তের বাইরে যেতে পারিনা। এডিবি ও জাইকাসহ অন্যান্য সহযোগী সংস্থার কর্মকর্তাগণ উদ্ভুত পরিস্থিতিতে দুঃখ প্রকাশ করেন। প্রকল্পের কার্যক্রমের মাঝ পথে অর্থ্যাৎ মূল সেতুর টেন্ডার আহবানের চূড়ান্ত মূহুর্তে বিশ্বব্যাংক কর্তৃক কাজ বন্ধ করে দেয়া যৌক্তিক হয়নি মর্মে মত প্রকাশ করেন। তবে তারা এ-ও বলেন, বিশ্বব্যাংক যেহেতু প্রকল্পের সমন্বয়কের দায়িত্ব পালন করছে সেহেতু তাদের সিদ্ধান্ত আমাদেরও মেনে নিতে হয়। এদিকে সরকারের উপরের মহল বুঝতে পারে যে, পদ্মা সেতুর কাজে এ যাবৎ কোন দুর্নীতি হয়নি, তথাপি পদ্মা সেতুর কাজ চালিয়ে নেয়ার জন্য বিশ্বব্যাংকের চাহিদা মাফিক মন্ত্রীকে বদল করা হল। তারপরও কাজ বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত সঠিক নয়। এ পর্যায়ে সরকারের পক্ষ থেকে বিশ্বব্যাংকের কার্যক্রম নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করা হয়, যা বিশ্বব্যাংক-কে বিচলিত করে। সরকারের পক্ষ থেকে কয়েকটি চিঠির মাধ্যমে অনুরোধ এবং একজন মাননীয় উপদেষ্টার বিশ্বব্যাংক-এ গমন করে নেগোসিয়েট করা সত্ত্বেও কোন কাজ হয়নি। ইতিমধ্যে বিশ্বব্যাংকের উত্থাপিত দুর্নীতির বিষয়টি দুর্নীতি দমন কমিশন তদন্ত করে। তদন্তে মূল সেতুর বিষয়ে মাননীয় যোগাযোগ মন্ত্রীর কথিত দুর্নীতির সাথে সংশ্লিষ্টতার কোন প্রমাণ পাওয়া যায়নি। দুর্নীতি দমন কমিশন বিশ্বব্যাংকেও তাদের রিপোর্ট প্রেরণ করে। তবে সুপারভিশন কনসালটেন্সি বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের তথ্য না দেয়ার কারণে এবং বিশ্বব্যাংকে চিঠি লিখে সুনির্দিষ্ট তথ্য না পাওয়ার কারণে এর তদন্ত শেষ করা সম্ভব হয়নি। বিশ্বব্যাংক জানায় যে, নিয়ম অনুযায়ী অভিযোগকারী ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের পরিচয় ও তথ্য দিতে বিশ্বব্যাংক অপারগ। এ বছরের এপ্রিল মাসে বিশ্বব্যাংক বাংলাদেশ সরকারের নিকট একটি চিঠি লিখে এবং কনসালটেন্সি প্রদানের ক্ষেত্রে কথিত দুর্নীতির সাথে জড়িত কতিপয় সরকারি-বেসরকারি ব্যক্তির নাম উল্লেখ করে। এবারের চিঠিতে অভিযোগের তীর আমার প্রতিও বর্ষিত হয়। চিঠির কপি দুর্নীতি দমন কমিশনেও দেওয়া হয়। উক্ত চিঠিতেও দুর্নীতির কোন সুনির্দিষ্ট প্রমাণ উপস্থাপন করা হয়নি। শুধুমাত্র এসএনসি-লাভালিনের কেস-এ কানাডিয়ান পুলিশের কাছে তথ্য আছে মর্মে এবং আরও কিছু সূত্র থেকে পাওয়া তথ্য আছে মর্মে উল্লেখ করা হয়, যদিও সেসকল সূত্রের নাম প্রকাশ করা হয়নি। পত্রের সাথে বিশ্বব্যাংক বাংলাদেশ সরকারের কিছু করণীয় নির্ধারণ করে দেয়। বিশ্বব্যাংকের সবগুলো দফা সরকারের পক্ষে মেনে নেয়া সম্ভব নয় বিধায় সরকার যতটুকু মানা সম্ভব ততটুকু মেনে নিয়ে বিশ্বব্যাংকের সাথে নেগোসিয়েশন অব্যাহত রাখে। এ পর্যায়ে গত ২৯ জুন, ২০১২ বিশ্বব্যাংকের প্রেসিডেন্ট রবার্ট জয়েলিক-এর কার্যকালের শেষ দিকে বিশ্বব্যাংক পদ্মা সেতুর ঋণ চুক্তি বাতিল করে একটি প্রেস নোট জারি করে। উক্ত প্রেস নোটটির ভাষা এবং অভিযোগ বাংলাদেশের জন্য খুবই বিব্রতকর ও অপমানজনক। বিশ্বব্যাংকের বক্তব্যে আমার দৃষ্টিতে বেশকিছু অতিরঞ্জন ও অসত্য তথ্য দেয়া হয়েছে। বিগত সেপ্টেম্বর, ২০১১ মাসে দু’টি ইন্্ভেষ্টিগেশনের সুনির্দিষ্ট প্রমাণাদি মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর কাছে দেয়া হয়েছে মর্মে প্রেসনোটে যা উল্লেখ করা হয়েছে তা একেবারেই সত্য নয় যা আমি আগেই উল্লেখ করেছি। এপ্রিল, ২০১২ মাসে ‘ঈড়ৎৎঁঢ়ঃরড়হ ঈড়হংঢ়বৎরপু’-এর সুনির্র্দিষ্ট তথ্য দিতে না পারলেও কতিপয় ব্যবস্থা নিতে বলে যা একটি সার্বভৌম দেশের নিরপেক্ষ ইনষ্টিটিউশনের পক্ষে পালন করা সম্ভব নয়। তারা কথিত ষড়যন্ত্রের সাথে জড়িত মন্ত্রী ও সরকারি কর্মকর্তাদের ছুটি দেয়ার কথা বলে এবং দুদকের তদন্তে বিশ্বব্যাংকের পূর্ণ খবরদারী করার ক্ষমতা চায় যা দুদক আইনের সাথে সঙ্গতিপূর্ণ নয়। সরকার মনে করে যে, সরকারি কর্মকর্তাগণ সুনির্দিষ্ট আইন, বিধি ও নিয়মের অধীনে প্রজাতন্ত্রের কাজে নিয়োজিত। তদন্ত ও সুনির্দিষ্ট প্রমাণাদি ছাড়া কাউকে বিশ্বব্যাংকের কথায় ছুটি দেয়া বা বিদায় করা অযৌক্তিক, যেখানে পুরু অভিযোগটিই প্রশ্নবিদ্ধ। তাছাড়া মন্ত্রীদের বাধ্যতামূলক ছুটি দেয়ার কোন বিধান নেই। সেক্ষেত্রে মন্ত্রীকে অপসারণ বা পদত্যাগে বাধ্য করতে হবে। সরকারের উচ্চ মহলের সাথে নেগোসিয়েশন চলাকালে হঠাৎ করে ঋণ চুক্তি বাতিল করার বিষয়টি স্বেচ্ছাচারিতার শামিল। 
বিশ্বব্যাংকের অভিযোগের প্রেক্ষিতে কানাডিয়ান পুলিশ যখন এসএনসি-লাভালিনের অফিস রেইড্্ করে তখন উক্ত প্রতিষ্ঠানের কর্তৃপক্ষ তাদের প্রতিষ্ঠানের বিগত কয়েক বছরের কার্যক্রম অভ্যন্তরিন নিরীক্ষার ব্যবস্থা করে। উক্ত নিরীক্ষায় এ প্রতিষ্ঠান কর্তৃক বিগত কয়েক বছরে লিবিয়াসহ কতিপয় আফ্রিকার দেশে কিছু টহফড়পঁসবহঃবফ ঊীঢ়বহফবঃঁৎব অর্থ্যাৎ আর্থিক লেন-দেন খুঁজে পায়। অবশ্য বাংলাদেশে কোন অর্থ লেনদেনের প্রমাণ পাওয়া যায়নি। উক্ত অসঙ্গতির প্রেক্ষাপটে সিইওকে পদত্যাগ করতে হয়েছে বলে জানা গিয়েছে। উক্ত সিইও বাংলাদেশে পদ্মা সেতুতে এসএনসি-লাভালিন কর্তৃক প্রস্তাব প্রনয়ণ, জমা দেয়া কিংবা এত্্দবিষয়ে বাংলাদেশে এসে কোন কার্যক্রমে অংশগ্রহণ করেননি। আমি আগেও উল্লেখ করেছি কনসালটেন্সির বাজেট ছিল মাত্র ৫০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার, সেখানে এসএনসির প্রস্তাব ছিল ৩৭ মিলিয়ন মার্কিন ডলার। তাদের জয়েন্ট ভেঞ্চারে ছিল আরও ২টি বিদেশী প্রতিষ্ঠান এবং ২ টি বাংলাদেশী প্রতিষ্ঠান। প্রায় ৬ হাজার দক্ষ ও বিশেষজ্ঞ জনবলের ৫ বছর ব্যাপি ব্রিজ নির্মাণ কার্যক্রমের তদারকির কাজ। এ প্রেক্ষাপটে তাদের দ্বারা মোটা অংকের ঘুষ দেওয়ার প্রস্তাব আমার কাছে একান্তই অমূলক মনে হয়েছে। কারণ প্রতিষ্ঠানটি এ প্রকল্প থেকে মুনাফা করতে না পারলে নিজের পকেট থেকে বাংলাদেশে টাকা দেওয়ার কথা নয়। মূলতঃ মোঃ ইসমাইল নামক একজন বাংলাদেশী কানাডিয় ইঞ্জিনিয়ার এসএনসি-লাভালিনের পক্ষে অন্যান্য জয়েন্ট ভেঞ্চার প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিদের নিয়ে এ প্রকল্পে প্রস্তাব দাখিল করেন মর্মে জানতে পেরেছি। অন্যান্য প্রতিষ্ঠানগুলোও একই পদ্ধতিতে বাংলাদেশে এসে তাদের প্রতিনিধির মাধ্যমে প্রস্তাব দাখিল করে। এসকল প্রস্তাব দাখিলের পর দরদাতা সকল প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিবৃন্দ বিভিন্ন সময়ে সেতু বিভাগের পদ্মা প্রকল্পের সাথে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সাথে দেখা করে তাদের প্রস্তাবের শ্রেষ্ঠত্ব, প্রতিষ্ঠানের দক্ষতা ও অভিজ্ঞতা তুলে ধরেন। বৃটেন, কানাডা ও জাপানের মান্যবর রাষ্ট্রদূতগণও মাননীয় যোগাযোগ মন্ত্রীর সাথে অনুরূপ উদ্দেশ্যে দেখা করেন। এসব সাক্ষাতের সময় আমরা তাদেরকে বলেছি যে, একটি নিরপেক্ষ মূল্যায়ন কমিটি রয়েছে যার মাধ্যমে সঠিকভাবে মূল্যায়ন করা হবে। কেউ ক্ষতিগ্রস্থ হবে না। ‘এসএনসি-লাভালিনের কর্মকর্তাগণ সচিব-মন্ত্রীর সাথে কতিপয় ব্যক্তিকে সাথে নিয়ে দেখা করেন’ খবরের কাগজে এ ধরনের সংবাদ চাঞ্চল্যকর সংবাদ নয় বলে আমি মনে করি; কারণ, অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের সিইও/পরিচালকগণও তাদের বাংলাদেশী এসোসিয়েটদের নিয়ে আমাদের সাথে সাক্ষাৎ করেন। উল্লেখ্য, দরপ্রস্তাবের কারিগরি মূল্যায়ন বিশ্বব্যাংক কতৃক অনুমোদিত এবং এ বিষয়ে কারো কোন অভিযোগ নেই। যদি মূল্যায়ন সঠিক থাকে, সেক্ষেত্রে কোন বিশেষ প্রতিষ্ঠানকে কাজ পাইয়ে দেয়ার সুযোগ সৃষ্টির অভিযোগই অবান্তর। 
রমেশ সাহা নামক এসএনসির কর্মকর্তা তাদের প্রস্তাবের সাথে প্রথম থেকে যুক্ত ছিলেন না। বিশ্বস্তসূত্রে জানা যায়, ইতিপূর্বে তিনি বাংলাদেশে ২/১ টি প্রকল্পে এসএনসির প্রতিনিধি হিসেবে কাজ করেছেন। তার ‘আউট-পুট’ ও আচরণ সুবিধের নয় বিধায় তাকে বাংলাদেশী কর্তৃপক্ষ গ্রহণ করতে চায় না। সেজন্যই উক্ত কোম্পানি প্রথমে তাকে এ প্রকল্পের প্রস্তাব প্রণয়ন ও দাখিলের সাথে যুক্ত করেনি মর্মে প্রতীয়মান হয়। জনাব ইসমাইলের সাথে তার সদ্ভাব ছিল না। জানা যায় কারিগরি মূল্যায়নে এসএনসি প্রথম হতে না পারায় রমেশ সাহা কৌশলে এর ব্যর্থতার দায় চাপিয়ে ইসমাইলকে কারিগরী মূল্যায়ন প্রতিবেদন প্রকাশ হওয়ার পরপরই (এপ্রিল, ২০১১ এর প্রথম দিকে) চাকরি থেকে সরিয়ে দেয় এবং তার পরিবর্তে নিজে বাংলাদেশে এসএনসি’র প্রতিনিধি হিসেবে আবির্ভূত হয়। উক্ত দায়িত্ব পাওয়ার পর তিনি তার উর্দ্ধতন কর্মকর্তা মি. কেভিন ওয়ালেস এর সাথে একবার বাংলাদেশে আসেন। তার আচরণ এবং কাজের সুনাম না থাকায় এসএনসি-লাভালিন কাজ পেলে তার নিয়োগ গ্রহণযোগ্য হবে না মর্মে মি. ওয়ালেসকে জানিয়ে দেওয়া হয়েছিল। মি. ওয়ালেসও এতে সম্মত হন। এসএনসি-লাভালিনের অনুরূপভাবে সম্মিলিত মূল্যায়নে দ্বিতীয় স্থান অধিকারী ঐধষপৎড়ি এর সিইও বাংলাদেশে এসে আমার সাথে দেখা করলে তাকেও জানানো হয় যে, কাজ পেলে এ প্রকল্পে যোগ্য লোকবল নিয়োজিত করতে হবে। মিঃ রমেশের ডাইরিতে বা নোটবুকে কি লেখা ছিল বা কাদের নাম পাওয়া গিয়াছে তা মোটেই গুরুত্বপূর্ণ নয় বলে আমি মনে করি। সে কাকে কী ‘প্রস্তাব’ দিয়েছিল বা তাকে কে কী ‘প্রস্তাব’ দিয়েছিল তা তদন্তের পর বুঝা যাবে। উক্ত ভারতীয় বংশোদ্ভুত মি. রমেশ যদি প্রকল্প সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিবর্গকে ‘কমিশন’ দেয়ার কথা বলে নিজেই ঐ কোম্পানির অর্থ আত্মসাতের পরিকল্পনা করে থাকে এবং সে কারণেই অসৎ উদ্দেশ্যে নিজের অপরাধ আড়াল করার জন্য বাংলাদেশী কারো নামে কিছু বলে, সঠিক প্রমাণাদি ছাড়া তা স্বতঃসিদ্ধ সত্য হিসেবে বিবেচনা করা আদৌ সুবিবেচকের কাজ নয়। দচ্চতার সাথে আমি বলতে পারি তার নোটবুকে আমার নাম থাকা অবান্তর, কারণ কোন বিষয় নেগোশিয়েট (?) করার জন্য আমার কোন ‘প্রতিনিধি’ নেই। মি. রমেশ সাহা সম্পর্কে আরো জানা গিয়েছে যে, তিনি ঢাকা চট্টগ্রাম হাইওয়ে প্রকল্পের সম্ভাব্যতা জরিপ কাজে এসএনসি’র স্থানীয় এসোসিয়েট ইপিসিকে তাদের প্রাপ্য টাকা সম্পূর্ণ পরিশোধ করেননি। উক্ত অর্থ রমেশ এসএনসি’র নিকট থেকে গ্রহণ করে নিজে আত্মসাৎ করেছে কীনা তা জানা দরকার।

পরিলেখ
এখানে আরেকটি বিষয় উল্লেখযোগ্য; ই-মেইলে অভিযোগকারীগণ বিশ্বব্যাংকের টাস্কটিম লিডার এবং বিশ্বব্যাংকের মনোনীত মূল্যায়ন কমিটির বিশেষজ্ঞ সদস্যের বিরুদ্ধেও বলেছে আমাদের সাথে নাকি তাদের যোগসাজশ রয়েছে। কিন্তু এসএনসি-লাভালিনকে ‘কাজ পাইয়ে দেয়ার’ জন্য আমরা যদি দায়ী হই তবে যোগসাজসের জন্য তাদেরও দায় থাকা উচিৎ। উল্লিখিত ‘অপরাধের জন্য’ এমনকি মূল সেতু প্যাকেজে একটি অযোগ্য চীনা কোম্পানিকে ‘কোয়ালিফাই’ করার জন্য যারা চাপ প্রয়োগ করেছিল বিশ্বব্যাংক কি তাদের বিরুদ্ধে কোন ব্যবস্থা নিয়েছে? 
একটি সরকারি কাজে যদি পক্ষপাতিত্ব বা দুর্নীতি সন্দেহ করা হয় তবে প্রথমে সরকারের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নিকট প্রতিকার চাওয়া কিংবা অভিযোগ করা বাঞ্ছনীয়। কিন্তু যারা গোপনে ই-মেইলের মাধ্যমে বিশ্ব ব্যাংকের ইন্টিগ্রিটি কর্মকর্তাদের নিকট দিনের পর দিন অভিযোগ করেছে তাদের উদ্দেশ্য ছিল পদ্মা সেতুর কাজ বন্ধ করে দেওয়া। প্রকল্পের টাস্ক টিম লিডার তার জুন ’১১ মাসের একটি ই-মেইলে এরূপ আশঙ্কাই করেছিলেন। ই-মেইলগুলো পর্যালোচনা করলেই বুঝা যাবে কীভাবে একটি স্বার্থান্বেষী মহল ইন্টিগ্রিটি অফিসারদেরকে প্ররোচিত করেছে। একইভাবে ইন্টিগ্রিটি বিভাগের কয়েকজন জুনিয়র কর্মকর্তা শুধুমাত্র অভিযোগকারীদের কথা শুনে, প্রতিষ্ঠানের যোগ্যতার মূল্যায়ন বিচার না করে এবং আমাদের কাগজপত্র দেখে সত্যাসত্য যাচাই না করে সরাসরি কানাডিয়ান পুলিশের নিকট অভিযোগ করে, যা বিশ্ব ব্যাংকের ইতিহাসে বিরল ঘটনা। সুষ্ঠু তদন্তের স্বার্থে অভিযোগকারীগণের ব্যবহৃত ঢ়ধফসধথনৎরফমব@ুসধরষ.পড়স ও ঢ়ধফসধথনৎরফমব@ুধযড়ড়.পড়স এর অনুসন্ধানও অভিযোগকারীদের সঠিক পরিচয় উদ্ঘাটনপূর্বক বিচারের আওতায় আনা প্রয়োজন। তাদের কারণে আজ বিশ্বব্যাংক কথিত দুর্নীতির অভিযোগ এনে বাংলাদেশের মুখে কালিমা লেপনের সুযোগ পেল। আর এদেশের এক শ্রেণীর মানুষও সত্যানুসন্ধান না করে তথ্য প্রমাণ বিহীন বিশ্বব্যাংকের দেয়া অভিযোগ সঠিক বলে প্রচার শুরু করে যা তথ্য সন্ত্রাসের সামীল। কিছু মিডিয়া ও জ্ঞানপাপী আলোচক আরও একধাপ এগিয়ে “ঘুষ দেয়া-নেয়ার কাল্পনিক গল্পও তৈরি করে ফেলে, যেখানে বিশ্বব্যাংক বা কানাডীয় কর্তৃপক্ষও লেনদেনের অভিযোগ করেনি। 
সরকারি কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠলেই যারা বিনা তদন্তে তাদেরকে বাড়িতে পাঠিয়ে দেয়ার কথা বলেন তাদের উদ্দেশ্যে বলব, ‘নিজের অবস্থান থেকে বিচার করবেন। আপনি যদি আমার জায়গায় থাকতেন তাহলে কি এরূপ অন্যায় আবদার মেনে নিতেন?’ আমি একজন অতি সাধারণ মানুষ এবং সৎ জীবন যাপন করি ও দেশ প্রেম বজায় রেখে নিরপেক্ষভাবে সরকারি কাজ করি। বত্রিশ বছরের চাকরি জীবনে যে সকল সচিব, মন্ত্রী, উপদেষ্টা ও সহকর্মীদের সাথে কাজ করেছি তারা সকলেই আমার সততা ও কর্তব্যনিষ্ঠার সাক্ষী। চাকরির শেষ পর্যায়ে এসে ইন্্শাআল্লাহ্্ পদস্খলনের আর সম্ভাবনা নেই।

লেখক পরিচিতি : মোঃ মোশাররফ হোসেন ভূঁইয়া এনডিসি, সচিব, গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার।

সৈয়দ আবুল হোসেন : আপনাকে
মো. মোজাম্মেল হক খান
আমার সীমাবদ্ধতাকে মার্জনা করবেন। তখনও আমি আপনাকে ভালোভাবে চিনে উঠিনি। অথচ সারা কালকিনি উপজেলা আপনার গুণগানে মুখরিত। মাদারীপুর জেলাতেও তার দোলা লাগছে। ক্রমান্বয়ে তা দেশব্যাপী বিস্তার লাভ করছে। আপনার এ সুখ্যাতির হাজারো কারণ থাকলেও তার অন্যতম মূল কারণ শিক্ষার উন্নয়ন ও বিস্তারের ক্ষেত্রে আপনার অনতিক্রম্য, অসামান্য অবদান বলেই আমার মনে হয়।

প্রিয় শিক্ষানুরাগী,
দেশের সার্বিক উন্নয়নের ক্ষেত্রে শিক্ষার অপরিসীম গুরুত্বের বিষয়টি বিশ্বব্যাপী সমাদৃত। এ চিরন্তন সত্য উপলব্ধিটুকু অনেকের চেতনায় থাকলেও ব্যক্তিগতভাবে তা বাস্তবায়নের কার্যকর উদ্যোগের সম্মিলনটি তাদের অনেকের মধ্যেই থাকে প্রায় অনুপস্থিত। ফলে এ সকল উন্নয়ন ভাবনা বাস্তবায়নের মুখ দেখে না। এ ক্ষেত্রে আপনি অসাধারণ ও অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। কালকিনি উপজেলার অসংখ্য মসজিদ, স্কুল, মাদ্রাসা, কলেজ (বিশ্ববিদ্যালয় কলেজসহ) স্থাপনে আপনার ব্যক্তিগত উদ্যোগ, সমর্থন, মূলত আর্থিক অনুদানের ক্ষেত্রে আপনার মুক্তহস্ত এলাকার মানুষকে দারুণভাবে প্রভাবিত করেছে। ফলে শিক্ষানুরাগের যে অনুপম দৃষ্টান্ত আপনি স্থাপন করেছেন, তা শুধু মাদরীপুরবাসীদের জন্যই নয়, সারাদেশবাসীর জন্যও এটি একটি বিরল অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত। এ ক্ষেত্রে আপনার কাছাকাছি কোনো দ্বিতীয় ব্যক্তির উদাহরণ আপাতত আমার জানা নেই। এ মুহূর্তে ছোট একটি ঘটনা মনে পড়ছে। তা হলো প্রায় দু’দশক আগে একবার কোনো শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে কিছু আর্থিক সাহায্যের জন্য আপনার নিকট একটি আবেদন পত্র প্রেরণ করা হয়। তাৎক্ষণিকভাবে আপনি প্রার্থিত অর্থের কয়েকগুণ টাকা (টাকার অংক মনে করতে পারছি না বলে দুঃখিত) বেশি প্রদান করেও দারুণভাবে অতৃপ্তিতে ভোগেন। তখন আপনার আর্থিক সমস্যার কথা জানিয়ে প্রদত্ত অর্থ আপনার বিবেচনায় যথেষ্ট নয় বলে আক্ষেপ ও দুঃখ প্রকাশ করেছিলেন। এটি কারও আমি কোনো একটি লেখায় পড়েছিলাম। আমার স্মৃতি আমাকে আজকে এতটা বেকায়দায় ফেলবে অনুমান করতে পারলে পঠিত লেখাটি সযতেœ হেফাজত করতে পারতাম।

সদাচরণের মূর্ত প্রতীক,
সদাচরণের ক্ষেত্রে আপনি এক অনন্য মহান ব্যক্তিত্ব। জন্মগতভাবে আপনার ঐতিহ্যবাহী পারিবারিক শিক্ষা এবং পরবর্তীকালে সামাজিকীকরণের অন্যান্য মাধ্যমে অর্জিত বিভিন্ন গুণের সমাহার আপনার চারিত্রিক মাধুর্যকে আরও বিকশিত করেছে। পদমর্যাদায় আপনার কাছেও নেই, এমন মানুষকে যে ভাষায় এবং আচরণে আপনি মোহাবিষ্ট করছেন তার দৃষ্টান্তও বিরল। আপনার অকল্পনীয়, অসাধারণ, মুগ্ধকর ব্যবহারের কৌশল ও সৌন্দর্য অবলোকন করার সুযোগ যারা পেয়েছেন তাদের অভিভূত হওয়া ছাড়া উপায় নেই। রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ কিংবা আপনার সাফল্যে ঈর্ষান্বিত কোনো ব্যক্তিকে (যাদেরকে আপনি চেনেন) অথবা গর্হিত অপরাধ করে ফেলেছেন এমন কাউকেও আপনি কটু কথা বলতে শেখেননি। কি করে কথার যাদুতে আপনি বিরুদ্ধাচারীকেও বশীভূত করেন তা দেখে তাজ্জব বনে যেতে হয়। আমার সৌভাগ্য, চাকুরির সুবাদে আমাকে প্রতিদিনই এগুলোর সাক্ষী হতে হচ্ছে। আপনার সাহায্য প্রার্থনার জন্য এসেছেন এমন দর্শনার্থীকেও সিঁড়ির/লিফটের গোড়া পর্যন্ত গিয়ে অভ্যর্থনা ও বিদায় জানানোর যে কাজটি আপনার নিত্যকার ঘটনাÑ তা আমার ২৮ বছরের চাকুরি জীবনে আর দ্বিতীয়টি চোখে পড়েনি।
সৌজন্য প্রদর্শন, শ্রদ্ধাবোধ, প্রটোকল এগুলো ঊধর্ক্ষগামী। যাদের থেকে এগুলো উৎসারিত, সেবা বা ত্যাগের আনন্দ ছাড়া বাকি সুফলগুলো বড়রাই ভোগ করেন। এখানেও আপনি ব্যতিক্রম। বয়স, পদমর্যাদা নির্বিশেষে, আপনি শুধু দাতা, ভোক্তা নন। ছোটদের প্রতিও স্বভাবসুলভ হাসি, আন্তরিকতা এবং যথোপযুক্ত শব্দসম্ভার প্রয়োগ করে আপনি পারস্পরিক মিথস্ক্রিয়াকে প্রাণবন্ত ও দীপ্তিমান করে তোলেন। ফলে সহযোগীদের কর্মস্পৃহা, পারস্পরিক সমঝোতা ও কর্মসহায়ক পরিবেশ সৃষ্টিতে তা খুবই ফলদায়ক হয়। যার সুফল মন্ত্রণালয় ও আমরা প্রতিনিয়ত ভোগ করছি।
প্রিয় বীর মুক্তিযোদ্ধা,
আপনি একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা। যে কারণে মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় উদ্বুদ্ধ যে কাউকেই আপনি আন্তরিক দৃষ্টিতে দেখেন। তাঁদের সুযোগ সুবিধা ও মর্যাদার আসনে প্রতিষ্ঠিত করতে আপনার আকুলতা আমাকে মুগ্ধ করেছে। মুক্তিযুদ্ধের সময় রাজাকার বাহিনীর হাতে আপনার জীবন প্রায় বিপন্ন হয়ে পড়েছিল। তাদের নির্মম আঘাত আপনাকে ক্ষতবিক্ষত করেছে। আপনার সৌম্যকান্তি, মার্জিত আচরণ, সদা প্রফল্ল হাস্যময় মুখশ্রী সে ক্ষতকে আড়াল করে রাখলেও আপনার হাতের কনুইয়ে যে ক্ষত রাজাকাররা সৃষ্টি করে গেছে, তা আজীবন আপনাকে বহন করতে হবে। জানি এ জন্য আপনার প্রকাশ্য কোনো দুঃখবোধ নেই। তথাপি অতীত স্মৃতি রোমন্থনে গিয়ে যখন আপনি মুক্তিযুদ্ধের দিনগুলোতে ফিরে যান তখন নিশ্চয়ই ক্ষণিকের জন্য হলেও আপনি বিষণœতার শিকার হন।

প্রিয় কর্মবীর,
কাজের ক্ষেত্রে উদয়-অস্ত পরিশ্রমের যে সর্বোচ্চ মানদণ্ড নির্ধারিত হয়ে আছে, তাও আপনি অতিক্রম করেছেন। এ কর্মগুণ, কর্মদক্ষতা, কর্মস্পৃহা, কর্মপ্রেরণাই আপনাকে এতটা পথ এগুতে সাহায্য করেছে। সকাল থেকে যে কর্মযজ্ঞে আপনি নিমজ্জিত হন, ঘুমোতে যাওয়া পর্যন্ত তা অব্যাহত থাকে। মন্ত্রণালয়, রেলভবন, সেতুভবন, সংসদভবন এগুলো আপনার নিজস্ব কর্মপরিধি সহায়ক সংস্থা ও মন্ত্রণালয়। বোধ করি আপনিই একমাত্র মাননীয় মন্ত্রী যিনি সরকারি কাজের প্রয়োজনে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী থেকে শুরু করে যে কোনো স্তরের কর্মকর্তাদের শরণাপন্ন হন। কঠিন ও সময়সাপেক্ষ কাজও আপনার কার্যকর হস্তক্ষেপে হয়ে যায় সহজ ও অনায়াসসাধ্য। দিবারাত্রি কর্মমুখরতা আপনাকে উজ্জীবিত রাখে। সর্বক্ষণ আপনি থাকেন প্রাণবন্ত। আর তাই ক্লান্তিও আপনার কাছে পরাভূত হয়।

প্রিয় সুজন,
আপনাকে নিয়ে অসংখ্য মধুর স্মৃতি আমার মানসপটে। প্রতিটিই মুগ্ধকর, প্রতিটিই শিক্ষণীয় এবং উদ্দীপ্ত আবেদনে ভরপুর। সেবার বিদেশ যাচ্ছি। আমরা একই ফ্লাইটের যাত্রী। লক্ষ করলাম সকল যাত্রীরা একে একে দাঁড়িয়ে কার সাথে যেন কুশল বিনিময় করছেন। আমার আগ্রহ বেড়ে যায়। দেখলাম যিনি কুশল বিনিময় করছেন তিনি সৈয়দ আবুল হোসেন। তিনি সে আবুল হোসেন যিনি বিদেশ যাত্রাকালেও সাধারণ যাত্রীদের সাথে কুশল বিনিময় করতে ভোলেন না। তিনি সেই আবুল হোসেন আকাশপথেও যার আজন্ম লালিত বিনয় আর অমায়িকতার প্রকাশ থেমে থাকে না। প্রকৃত বিনয় ও নির্মল অমায়িকতা স্থান-কাল-পাত্র মেনে চলে না। এটি সর্বগামী এবং সার্বজনীন।
রাজনীতি, আমলা এবং সুশীল সমাজ-এর একটি সভা কিংবা ছোট্ট সমাবেশ হচ্ছে। সেখানে অনেকেই কুশলাদি বিনিময় কিংবা সভার প্রাসঙ্গিক আলাপচারিতায় ব্যস্ত। তন্মধ্যে একজনের উপস্থিতি অধিকতর উজ্জ্বল, আন্তরিকতাপূর্ণ এবং প্রশান্তিময়। সেই মহান ব্যক্তিটিও আপনি। এ কথা শুধু আমার নয়। আপনাকে, আমাকে উভয়কে চেনেন এমন বহুজনের। মাননীয় মন্ত্রী আপনাকে নিয়ে বিদগ্ধজনের এরূপ মূল্যায়ন কিংবা মন্তব্য আমার জন্য বরাবরই উপভোগ্য হয়। পোশাক-আশাকসহ অন্য যে কোনো পছন্দের বিষয়ে আপনার রুচির প্রশংসা নাÑহয় আমি নাই বা করলাম। এ ক্ষেত্রেও আপনি অতুলনীয়, মার্জিত এবং মানানসই।

মাননীয় মন্ত্রী,
আপনি দীর্ঘজীবন লাভ করুন। যতদিন বেঁচে থাকুন সুস্থ, সাবলীল ও কর্মক্ষম থাকুন। এ প্রার্থনা যতটা না আপনার জন্য, তার চেয়ে বেশি জরুরি দেশের সে সব মানুষের জন্য; যাদের কল্যাণে আপনার সমস্ত মেধা, কর্ম, শ্রম ও ত্যাগ নিবেদিত। তাদের স্বার্থেই আপনার মতো সেবাপরায়ণ দানবীর, শিক্ষানুরাগী, কর্মী পুরুষের জীবনকাল দীর্ঘায়িত হওয়া প্রয়োজন।
আপনাকে আমার অবিনাশী বিনম্্র শ্রদ্ধা, অকুণ্ঠ গভীর ভালোবাসা ও লাল গোলাপ শুভেচ্ছা। আপনি আমাদের প্রিয় মানুষ, একান্ত সুজন, সর্বসময়ের পরীক্ষিত বন্ধু। আপনার জয় হোক।

মো. মোজাম্মেল হক খান : সচিব, সড়ক ও রেলপথ বিভাগ, যোগাযোগ মন্ত্রণালয়

বলতে চাই তারই কথা
ড. এম এ মাননান
সেই মানুষটিকে নিয়ে কিছু কথা বলতে চাই, যার সম্বন্ধে অনেক কিছুই বলা হয়নি, যাকে নিয়ে কথা হয় বন্ধুমহলেÑ উচ্ছ্বসিত আড্ডায় যার নাম আসে সর্বাগ্রে চা-এর টেবিলে কিংবা কফি হাউজে। তাকে নিয়েই কিছু বলতে চাই, যাকে দেখেছি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে ’৭৩-৭৪-এ, টিসিবি’র আঙিনায় ৭৫-৭৭-এ, সাকো’র কর্ণধার হিসেবে ৭৮ থেকে, রাজনীতির মঞ্চে ৯১ থেকে, মন্ত্রীপরিষদে ৯৬ থেকে, পূর্ণাঙ্গ নেতৃত্বে ২০০৮ থেকে। তাকে নিয়েই বলতে চাই, যিনি একাধারে একজন একনিষ্ঠ কর্মী; যিনি শুধু ব্যবস্থাপনার ছাত্রই ছিলেন না বরং একজন সফল ব্যবস্থাপক এবং উদ্যোক্তা; যিনি শুধু প্রাতিষ্ঠানিক পরিমণ্ডলে একজন উজ্জ্বল সাংগঠনিক নেতাই নন, পাশাপাশি একজন রাজনৈতিক নেতাও বটে; যিনি দেশের গণ্ডি ছাড়িয়ে আন্তর্জাতিক পরিসরে নামকরা লবিস্ট এবং নেগোশিয়েটর – যিনি আন্তঃরাষ্ট্রীয় বন্ধুত্ব স্থাপনে অগ্রনায়ক, যার স্বাক্ষর এশিয়ান অঞ্চলের আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক সহযোগিতা ফোরাম ‘বোয়াও’।
যাকে নিয়ে আরও বলতে চাই, সে-ব্যক্তিটি প্রচারবিমুখ একজন নীরব বন্ধু, ব্যক্তিগত আড্ডায় ঝলমলে হাসিমাখা উচ্ছল এক দীপ্তি, নিজ এলাকায় গরিব-দুঃখীর কাছে বিনম্র মায়াভরা ভালোবাসার প্রতীক, আপামর জনগণের সুখে-দুঃখে বিপদে-আপদে একজন দানশীল সহযোগী, প্রসন্ন চিত্তের ও নিরহংকারী বিত্তের সমাহারে একজন বিনয়ী সুহৃদ। তারই কথা বলতে চাই যিনি অক্লান্ত পরিশ্রম, সততা, দক্ষতা, কর্মনিষ্ঠা ও বিশ্বস্ততার মাধ্যমে গড়ে তুলেছেন একাধিক ব্যবসা প্রতিষ্ঠান, শত-সহস্র লোকের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করেছেন, সফল উদ্যোক্তা হিসেবে সুধীজনের প্রশংসা কুড়িয়েছেন, তুখোড় ব্যবস্থাপনাবিদ হিসেবে দেশে-বিদেশে সুখ্যাতি পেয়েছেন এবং পরিশ্রমলব্ধ সম্পদ এলাকার শিক্ষার উন্নয়ন ও জনগণের কল্যাণে অকাতরে ব্যয় করেছেন।
আমি বলতে চাই, তারই কথা, যিনি সময়ের নিয়ামক, কর্মের নির্ঘণ্টে নিষ্ঠার বর্তিকা; প্রতিটি নিশ্বাস, প্রতিটি সেকেন্ড যার হিসেবের খাতায় পরম যতেœ সজ্জিত, চরম আদরে শানিত। যিনি প্রতিটি মুহূর্ত কাজে লাগান নিজের মাধ্যমে দেশের জন্য, জাতির জন্য, রাজনীতি এবং গণতন্ত্রের জন্য। আমি বলতে চাই তারই কথা যিনি কর্মের নিবিড় আলয়ে সময়সজ্জিত জীবন-হিসেবের অমূল্য খাতায় নিষ্ঠা নামক অধ্যায়ের অধ্যবসায় নামক পাতায় জ্বলজ্বল সার্থকে ফুটে ওঠা স্বপ্রতিষ্ঠিত এক অনুপম উদাহরণ। আমি তারই কথা বলছি সাফল্য যাকে আরও বহুদূর এগিয়ে যাবার প্রত্যয়ে উদ্দীপ্ত করে, যিনি বড় হবার সাথে সাথে কৃতজ্ঞতার অসীম বৈভবে বৈচিত্র্যময় হতে হতে আকাশের চেয়েও বিশাল হয়ে উঠেছেন।
আমি স্বতঃস্ফূর্ত উচ্ছ্বাসে তারই কথা বলছি, যিনি বিনয়ের মোহনায় প্রশান্তির ঢেউ, মার্জিত রুচির উৎপ্রাসে উৎপ্রাসে ব্যক্তিত্বের রঙন আর প্রকৃতি উদার হৃদয়ের নিপুণ বিন্যাসে অনন্ত সহানুভূতির নন্দিত নায়ক। যিনি নিজের জন্য যেমন ভাবেন তেমনি ভাবেন সবার জন্য, দেশের জন্য, পরিবারের জন্য, আত্মীয়র জন্য; যার ভালোবাসায় রয়েছে সার্বজনীন আহক্ষানের নিত্য সংস্কার এবং প্রগতির আলয়ে সমৃদ্ধির বারতা। যিনি কর্মকে বরণ করেন উৎসব মুখরতায়, জীবনকে বরণ করেন কল্যাণের নবলতায়। আমি তারই কথা বলছি যিনি এমনভাবে কাজ করেন যেন অনন্তকাল বাঁচবেন আর এমন ব্যবহার করেন যেন এক মুহূর্তও সময় নেই আর।
আমি সেই মানুষটির কথা বলতে চাই যে মানুষটি অনেক উঁচুতে উঠেও গ্রামের মাটিময় পরিবেশের কথা এক মুহূর্তের জন্যও ভুলতে পারেননি, ভুলতে পারেন নি মাটির মানুষগুলোর কথা, আগামী প্রজন্মের কথা, দেশ ও জাতির ভবিষ্যতের কথাÑ তাই তাদের ভবিষ্যৎ বিনির্মাণে গড়ে তুলেছেন কর্মমুখী ও কারিগরি ব্যবস্থাসহ একের পর এক অনেকগুলো কার্যকর শিক্ষা প্রতিষ্ঠান।
আমি তারই কথা বলতে চাই যে, লোকটির সাথে কেউ একবার কথা বললে, যে লোকটির কাছে কেউ একবার গেলে, যে লোকটিকে কেউ একবার কাছে পেলে বিগলিত হয়ে যেতে হয় শ্রদ্ধায়, মোহিত হয়ে যেতে হয় কৃতজ্ঞতায়, অবনত হয়ে যেতে হয় কৃতজ্ঞতায়। আমি তারই কথা বলতে চাই- যে লোকটি মানুষের মর্যাদা প্রতিষ্ঠার দীপ্ত প্রত্যয়ে অবিনাশী প্রতীক, সৃষ্টির সেবায় সতত বৈপ্লবিক আর উদারতার মোহনায় বৃষ্টি বৃষ্টি সুর।
আমি বলতে চাই তারই কথা, যার মধ্যে বংশপরম্পরায় রয়েছে নির্মল ধর্মীয় মূল্যবোধ, ইসলামিক চিন্তাধারায় বিধৌত ধর্ম-নিরপেক্ষ মনোবৃত্তি, মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় সুরভিত মন, মানব-কল্যাণে নিবেদিত প্রাণ, সহানুভূতির নিদাঘ পরশ এবং পরিবার-বান্ধব সংসারি দিল। তিনি সে-ই, যিনি পারিবারিক জগতে নিষ্ঠাবান দায়িত্বশীল কর্তা, বিশ্বস্ত পতি, স্নেহশীল পিতা, সংসারি গুরুজন।
দ্বিধাহীন কণ্ঠে তারই কথা বলতে চাই, যিনি একজন মননশীল মানুষ, সৃজনশীল চিন্তাবিদ-চিন্তনে-লিখনে যার রয়েছে অগাধ ব্যুৎপত্তি। লেখায় যার সাবলীলতা ঈর্ষণীয়, বিষয় নির্বাচনে অনুপম বোদ্ধা। যার লেখায় পাওয়া যায় কান্নার সুর- যখন তিনি কালির আঁচড়ে বলেন স্বাধীনতার জনক জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুর লড়াকু জীবন আর দেশদ্রোহী ঘাতকদের হাতে নির্মমভাবে শহিদ হওয়ার কাহিনি। যার লেখনীর গুণে জীবন্ত হয়ে উঠেছে বাংলাদেশের স্বপ্নদ্রষ্টা ও স্্রষ্টা কোটি কোটি বাঙালির প্রাণ-পুরুষ সিংহ-হৃদয় ‘বাংলার মুজিব’-এর সংগ্রামী জীবন, তাঁর জীবনের বঞ্চনার কাহিনি, নৃশংসভাবে তাঁকেসহ তাঁর পরিবারের শাহাদাত-বরণের কথা। আমি তারই কথা উচ্চকণ্ঠে বলতে চাই, যার লেখায় দীপ্ত হয়ে উঠেছে বাংলার জনগণের চরম বিপদে সদা-সর্বদা সংগ্রামী মন নিয়ে আপোষহীন এগিয়ে থাকা বঙ্গবন্ধু-তনয়া সংগ্রামী জননেত্রী শেখ হাসিনার প্রতিকৃতি যিনি প্রবল বিরূপতার মধ্যে থেকেও সততার চরম পরাকাষ্ঠা দেখিয়ে জাতিকে নেতৃত্ব দিয়েছেন ও দিচ্ছেন। আমি তারই কথা বিনা দ্বিধায় বলতে চাই যার শানিত লেখায় বাঙময় হয়ে উঠেছে বঙ্গজননী বেগম ফজিলাতুন্নেছার সংগ্রামময় পারিবারিক জীবন এবং শত কষ্টের মধ্যেও বঙ্গবন্ধুর জেল-জীবনের সময়ে মাসুম সন্তানদের গড়ে তোলার ইতিকথা। শ্রেষ্ঠত্ব তার এখানেই, তার লেখার মধ্যে।
আমি বলতে চাই সে মানুষটির কথা, যে মানুষটির কাছে অহঙ্কারের সবগুলো উপাদান কানায় কানায় তবু সাদাসিধে, যিনি নিরহঙ্কারের ডালা হাতে বরণের প্রতীক্ষায় থাকেন উঁচু-নিচু, জাতি-ধর্ম বর্ণ নির্বিশেষে সবার সমক্ষে শ্রদ্ধায় শ্রদ্ধায়, প্রমুগ্ধ তপস্যায়। যিনি বড় হতে হতে এত বড় হয়ে গেছেন যে যার স্বকীয়তা সবার মাঝে একাকার হয়ে গেছে ত্যাগের অনুভবে, মহিয়ান হতে হতে মিশে গেছেন প্রকৃতির লাস্যে নান্দনিক স্বপ্নের বিভাময় হাস্যে।
একদিন হয়ত তিনি হারিয়ে যাবেন রাজনীতি থেকে, হারিয়ে যাবেন জীবন থেকে, হারিয়ে যাবেন সবার থেকে কিন্তু তিনি বেঁচে থাকবেন তার প্রকাশিত নয়টি গ্রন্থের মধ্যে, এমন সব গ্রন্থ যার মধ্যে তিনি দেশকে তুলে এনেছেন, মূর্ত করেছেন স্বাধীনতা সংগ্রামকে, উজ্জীবিত করেছেন গণতন্ত্রকে; স্বাধীনতার স্রষ্টাকে প্রাপ্য মর্যাদা-সহকারে দেদীপ্যমান আলোতে এনেছেন এবং দেশ-মাতৃকার প্রকৃত ইতিহাস তুলে ধরে নিজকেও সম্মানিত করেছেন। তিনি বেঁচে থাকবেন তার গড়া সে সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের মাঝে যেগুলো হতে প্রতি বছর হাজার হাজার গরিব ও অসহায় ছাত্রছাত্রী প্রায় বিনা খরচে সর্বোচ্চ ডিগ্রি নিয়ে দেশ ও জাতির বিভিন্ন কাজে নিয়োজিত হবার সুযোগ। তিনি বেঁচে থাকবেন সে সকল অসহায় নরনারীর মাঝে, যারা তার বদান্যতায় মরতে মরতে বেঁচে থাকার উপায় পেয়ে হাস্যে-লাস্যে আবার শুরু করেন নতুন জীবন। তিনি বেঁচে থাকবেন সে সকল মানুষের মাঝে, যারা তার চারিত্রিক মাধুর্য্যে অনুপ্রাণিত হয়ে তারই মতো দেশ ও জাতির কল্যাণে নিবেদিত হবার প্রয়াস পান।
আমি যার কথা বলতে চেয়েও বলা শেষ করতে পারিনি তিনি হলেন এক কালের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যবস্থাপনার কৃতি ছাত্র আমার সহপাঠী কালকিনির সৈয়দ বংশের কৃতিসন্তান, এনায়েতপুরের খ্যাতিমান পির বংশের জামাতা গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের যোগাযোগমন্ত্রী সৈয়দ আবুল হোসেন – আমাদের সুপ্রিয় আবুল।

ড. এম এ মাননান : অধ্যাপক, ব্যবস্থাপনা বিভাগ. ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
কিছু স্মৃতি কিছু কথা
শফিক আলম মেহেদী
আমি তখন পর্যটন কর্পোরেশনের চেয়ারম্যান। কোনো এক বর্ষণমুখর সন্ধ্যায় ক’বন্ধু কক্সবাজারের হোটেল শৈবালে জমপেশ আড্ডায় মত্ত ছিলাম। মাননীয় যোগাযোগ মন্ত্রী সৈয়দ আবুল হোসেনের টেলিফোন পেয়ে প্রথম জানতে পারি, ওই মন্ত্রণালয়ে অতিরিক্ত সচিব হিসেবে বদলির কথা। মাত্র সাত-আট মাসের কর্মস্থল আমার ছিল যোগাযোগ মন্ত্রণালয়ে। যদিও এর আগে ঐ মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম-সচিব হিসেবে কাজের অভিজ্ঞতা ছিল। তবে এবারকার অভিজ্ঞতা ভিন্নতর। কর্মস্থল সবসময় প্রীতিকর হয় না। স্মৃতিও সতত সুখের নয়। তাপরও নির্দ্বিধায় বলতে পারি, যোগাযোগ মন্ত্রণালয়ে কাজ এবং কাজের পরিবেশ দুটোই ছিল উপভোগ্য ও আনন্দময়।
একটি মন্ত্রণালয়ের প্রধান চরিত্র হলেন মাননীয় মন্ত্রী। তাঁকে কেন্দ্র করেই মন্ত্রণালয়ের সবকিছু আবর্তিত হয়। যেখানে মাননীয় মন্ত্রী মন্ত্রণালয়ের সবাইকে আপন করে নেন, সেখানে স্বাভাবিকভাবেই বিরাজ করে এক কর্মমুখর ও প্রাণচঞ্চল পরিবেশ। মাননীয় যোগাযোগ মন্ত্রী সৈয়দ আবুল হোসেনের চারিত্রিক বিশালতা ও হৃদ্যিক কমনীয়তার কারণে আমরা সবসময় কর্মমুখর ও প্রাণচঞ্চল পরিবেশে কাজ করতে পেরেছি।
মার্চ থেকে অক্টোবর ২০০৯ আমার কর্মজীবনের একটি স্মরণীয় অধ্যায়। স্মৃতির অ্যালাবামে যেন অনেক উজ্জ্বল সঞ্চয় জমা হয়ে আছে। যোগাযোগ মন্ত্রণালয়ে যোগদানের প্রথম দিনেই জেনে নিই মাননীয় মন্ত্রীর দিনপঞ্জির নির্ঘণ্ট। সকাল সাড়ে আটটার মধ্যেই তিনি পৌঁছে যান কর্মস্থলে। আমারও পুরোনো অভ্যেস অফিস শুরুর আগে অফিসে যাওয়া। মনে মনে স্থির করি, মাননীয় মন্ত্রীর মতোই অফিসে চলে আসব সাড়ে আটটার মধ্যে। তিনি থাকেন অফিস থেকে অনেক দূরে গুলশানে, আর আমি থাকি কাছের ইস্কাটন গার্ডেনে। সত্য স্বীকারে দ্বিধা নেই, মাননীয় মন্ত্রীর কাছে অফিসে পৌঁছার ব্যাপারে প্রায়শই হার মানতাম। মাননীয় মন্ত্রী প্রতিদিন অফিসে এসেই দিনের গুরুত্বপূর্ণ কাজের বিষয়ে সার্বিক প্রস্তুতি নিতেন। সকাল ন’টার পূর্বে তাঁর কক্ষে সাধারণত কোনো কর্মকর্তার ডাক পড়ত না। হঠাৎ একদিন তাঁর নজরে আসে অফিস সময়ের পূর্বেই আমার অফিসে পৌঁছার বিষয়টি। ডেকে জানিয়ে দেন, অফিস সময়ের আগে আমার আসার প্রয়োজন নেই অর্থাৎ আমি যেন সকাল ন’টায় অফিসে আসি। অবাক হই তাঁর এ মহানুভবতায়।
অফিস শুরু হলে মাননীয় মন্ত্রী জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাদের নিয়ে প্রাত্যহিক অভ্যেসমতো চা খেতেন। দিনের গুরুত্বপূর্ণ বিষয়াদি সম্পর্কে আলোচনা সেরে নিতেন। সে সাথে পূর্বের দিনের কোনো কাজ অনিষ্পন্ন থাকলে সে বিষয়েও করণীয় সম্পর্কে দিকনির্দেশনা দিতেন। কোনো কাজের বিষয়ে কর্মকর্তাদের ওপর নিজস্ব অভিমত চাপিয়ে দিতে কখনও দেখিনি তাঁকে। কোনো জটিল বিষয় হলে সংশ্লিষ্টদের নিয়ে আলাপ আলোচনা করে তিনি সর্বসম্মত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে পছন্দ করতেন। মন্ত্রণালয়ের সব কাজে ছিল স্বচ্ছতা। কোনো কাজে অস্পষ্টতা রাখতেন না। আবার তাঁর মতের বিপরীতে কোনো কিছু বললেও, তা যথামর্যাদায় বিবেচনা করতেন এবং যেটি অধিক উত্তম হতোÑ সেটিই গ্রহণ করতেন। কোনো অহঙ্কার তাঁর মধ্যে কাজ করত না। শুধু একটিই উদ্দেশ্য দেখতাম, সেটি হল মন্ত্রণালয়ের কাজ দ্রুত এবং সফলতার সাথে সম্পন্ন করে জনকল্যাণ নিশ্চিত করা।
ঐ মন্ত্রণালয়ের সচিব অবসরে যাওয়ায় আমি তখন সচিবের অতিরিক্ত দায়িত্বে ছিলাম। সে সময় একদিন প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে একটি সভায় যোগ দিতে যাই। সভা চলাকালে হঠাৎ শুনি মাননীয় মন্ত্রী সভাস্থলের বাইরে আমার জন্য অপেক্ষা করছেন। তড়িঘড়ি করে গিয়ে দেখি তিনি একটি জরুরি নথি আমার স্বাক্ষরের জন্য নিজে নিয়ে এসেছেন। আমি সত্যিই অবাক হই সরকারি কাজের ব্যাপারে তাঁর এ ধরনের ব্যতিক্রমী দৃষ্টিভঙ্গি দেখে। তিনি সব গুরুত্বপূর্ণ কাজের জন্য কর্মকর্তাদের সময় বেঁধে দিতেন। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কাজটি সম্পন্ন না হলে তার খুব অস্বস্তি হতো।
আর একদিনের ঘটনা : মন্ত্রণালয়ের একজন কর্মকর্তা গুরুতর অসুস্থ হয়ে হাসপাতাল ভর্তি হয়েছেন। এ খবর পাওয়ামাত্রই তাকে দেখেছি হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের সাথে কথা বলতে। তিনি বলেছিলেন, ‘যত টাকা প্রয়োজন হয়, আমি দেবো। কিন্তু আমার অফিসারের সুচিকিৎসা যেন ব্যাহত না-হয়।’ পরে জেনেছি উক্ত কর্মকর্তার আত্মীয়স্বজনকে কিছু জানতে না-দিয়েই তিনি সমুদয় চিকিৎসা ব্যয় পরিশোধ করেছেন। এ ধরনের অনেক ঘটনা আছে, যা শুনলে আমাদের কাছে অবিশ্বাস্য মনে হবে। তিনি যতবার বিদেশ যান ততবারই সহকর্মীদের কথা মনে করে কিছ-না-কিছু উপহার নিয়ে আসেন। এমনকি আমি ঐ মন্ত্রণালয় থেকে বিদায় নেয়ার পরও তিনি আমার দু’মেয়ের কথা ভোলেননি।
মাননীয় মন্ত্রী সৈয়দ আবুল হোসেন নিঃসন্দেহে একজন কর্মবীর, সে সাথে হৃদয়বান মানুষও। আমাদের এ ক্ষয়িষ্ণু সমাজে তিনি ভালো মানুষ ও নিরলস কর্মীর এক অপূর্ব যুগলবন্দি। কর্মসূত্রে এখন আমার অবস্থান অন্যত্র। তবু দূর থেকে তাঁকে জানাই আমার বিনম্র শ্রদ্ধা ও উষ্ণ অভিনন্দন।

শফিক আলম মেহেদী : সচিব, বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়, কবি ও গবেষক।
একজন স্বয়ংসিদ্ধ মানুষ সম্পর্কে
আবদুল গাফফার চৌধুরী
সৈয়দ আবুল হোসেন বাংলাদেশের একজন কৃতি সন্তান। পেশায় ব্যবসায়ী হলেও রাজনীতিতেও তিনি দক্ষতার পরিচয় দিয়েছেন। ব্যবসায়ে যেমন শীর্ষ স্থানে পৌঁছেছেন, তেমনি রাজনীতি করেও তিনি এখন একজন প্রভাবশালী মন্ত্রী। রাজনীতিতে তিনি সুযোগ-সুবিধার অন্বেষণ করেননি। বরং আদর্শভিত্তিক রাজনীতি করেছেন। বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে যে দলটি নেতৃত্ব দিয়েছে, সেই আওয়ামী লীগ ভিত্তিক রাজনীতি করেছেন, সেই আওয়ামী রাজনীতিই তিনি আঁকড়ে ধরে আছেন এবং বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের গণতান্ত্রিক ও ধর্ম নিরপেক্ষ বাংলাদেশ গঠনের কাজে নিজেকে জড়িত রেখেছেন। কোন কোন ব্যবসায়ী যেমন ব্যবসার স্বার্থে ঘন ঘন দল ও মত পরিবর্তন করেন, আবুল হোসেন তা করেননি। এখানেই তার বৈশিষ্ট্য।
সৈয়দ আবুল হোসেনের জন্ম মাদারীপুরের কালকিনি গ্রামে। তিনি সম্ভ্রান্ত পরিবারে জন্ম নিলেও সোনার চামচ মুখে জন্মাননি। নিজের চেষ্টায় তিনি উচ্চ শিক্ষা লাভ করেছেন এবং ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলেছেন। দেশের শিল্প উন্নয়নে তার যেমন অবদান আছে, তেমনি শিক্ষা বিস্তারে এবং সমাজ ও সংস্কৃতির উন্নয়নেও তার ভূমিকা উল্লেখযোগ্য।
তিনি বহু শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলেছেন এবং জনহিতকর নানা প্রতিষ্ঠান স্থাপনেও অগ্রণী ভূমিকা নিয়েছেন।
জননেত্রী শেখ হাসিনার মন্ত্রীসভায় যোগাযোগ মন্ত্রী হিসেবে তিনি বেশ সুনাম অর্জন করেছেন। দেশের যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন ছাড়াও আবুল হোসেন বহির্বিশ্বের বিভিন্ন দেশের সঙ্গে বাংলাদেশের জোরালো অর্থনৈতিক সম্পর্ক স্থাপনের কাজেও চমৎকার ভূমিকা রেখেছেন। একই সঙ্গে ব্যবসায়, শিক্ষা এবং রাজনীতির অঙ্গনে আবুল হোসেন নিজেকে সুপ্রতিষ্ঠা দানে সক্ষম হয়েছেন। 
সুনাম-দুর্নাম মানুষ মাত্রেরই থাকে। আবুল হোসেনের সুনামের পাল্লাটাই ভারি। এই সুনাম রক্ষায় তার আন্তরিক প্রচেষ্টা রয়েছে। ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান এবং রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা তাকে দেশের নানা ধরণের উন্নয়ন তৎপরতায় সাহায্য যোগাচ্ছে। এই মানুষটি ভবিষ্যতে নিজেকে আরও সমৃদ্ধ করে দেশ ও দশের ভাগ্য উন্নয়নে আরও সাফল্য দেখাতে পারবেন বলে আমার বিশ্বাস। 
আমি তার দীর্ঘ জীবন ও এবং সকল তৎপরতার সাফল্য কামনা করি।

আবদুল গাফফার চৌধুরী : আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রচ্ছারি খ্যাত প্রাবন্ধিক, কলামিস্ট ও গবেষক।

সৈয়দ আবুল হোসেনের রাজনীতিক দর্শন
ড. আবদুল করিম
আমার ছাত্র মোহাম্মদ আমীন। এখন সরকারি উচ্চ পদস্থ কর্মকর্তা। কিন্তু কর্মকর্তা হিসেবে নয়, লেখক এবং ইতিহাসবেত্তা হিসেবে তার সাথে আমার হৃদ্যতা। সে অনেকগুলো ইতিহাস গ্রন্থ রচনা করেছে। তার লেখার হাতিয়ার ইতিহাস, অভয়নগরের ইতিহাস এবং চকরিয়ার ইতিহাস আঞ্চলিক ইতিহাসের অনবদ্য সংযোজন বলে আমি মনে করি। এক সন্ধ্যায় সে আমাকে সৈয়দ আবুল হোসেনের উপর একটি লেখা দেয়ার অনুরোধ করে। ‘আমি ইতিহাসের ছাত্র। রাষ্ট্র নিয়ে, রাষ্ট্রনায়ক নিয়ে আমার কাজ। আমি ব্যক্তি নিয়ে লিখিনা। আমার উত্তরে হতাশ না-হয়ে আমীন বলল, ‘ইতিহাস ব্যক্তির কার্যকলাপের বর্ণনা। সৈয়দ আবুল হোসেন ঐতিহাসিক ব্যক্তিত্ব। আপনার রাজা, সম্রাট, আকবর, জাহাঙ্গীর কারও চেয়ে তিনি কম নন। আপনার রাজা-সম্রাটগণ খৈ এর তেল দিয়ে খৈ ভাজেন। সৈয়দ আবুল হোসেন নিজের কষ্টার্জিত অর্থ উদার হস্তে দান করেন’। সৈয়দ আবুল হোসেন সম্পর্কে আমি পত্র-পত্রিকায় পড়েছি। কোনোদিন তাকে অধ্যয়ন করিনি। তিনি একজন লেখকও বটে। তার অনেকগুলো কলাম আমি পড়েছি, বইও পড়েছি। বললাম: ঠিক আছে। তার এক সেট বই দিয়ে যাও, বই পড়লে লেখকের দৃষ্টিভঙ্গি জানা যায়। পরদিন আমীন আমাকে সৈয়দ আবুল হোসেনের কয়েকটি বই, তিন পাতার একটি জীবনবৃত্তান্ত ও কর্ম-পরিচিতি দিয়ে এক সপ্তাহের মধ্যে লিখে ফেলার জন্য এমনভাবে অনুরোধ করল, মনে হলো তাৎক্ষণিক লিখে দেই। কিন্তু শরীর এত দুর্বল যে, মন তাকে কোনোভাবে বশ করতে পারল না। তারপরও লিখতে হবে, কারও কারও অনুরোধ না-রেখে উপায় থাকে না। আমীনকে বিদায় দিয়ে লিখতে বসলাম।
রাজনীতি সৈয়দ আবুল হোসেনের অস্থিমজ্জায় তবে তা দেশ ও জাতির জন্য, ব্যক্তির জন্য নয়। যদিও রাজনীতি তাঁর জীবনের কোনো পরিকল্পনা নয়, আকস্মিক ঘটনা মাত্র। তিনি নিজের জন্য রাজনীতিতে আসেননি, জনগণের দাবিকে সম্মান করে তাদের কল্যাণে রাজনীতিতে এসেছেন। তিনি মনে করেন, “সমাজ, সভ্যতা ও প্রগতির নিয়ামক হচ্ছে রাজনীতি। মহত্তর ও উন্নততর জীবনের সন্ধানেই মানুষ রাজনীতি করে থাকে। রাজনীতির পেছনে থাকে সুনির্দিষ্ট আদর্শ। যদি তা না-হতো তাহলে মানুষ রাজনীতি করতে গিয়ে জেল-জুলুম সহ্য করত না, বুলেট বেয়নটের সামনে বুক চিতিয়ে দাঁড়াতে পারত না।”১ তবে রাজনীতি হতে হবে সুশৃঙ্খল, নীতিবদ্ধ। যা সভ্যতার ক্রমবিকাশের সাথে পরিবর্তনশীল হবে, হবে কল্যাণমুখী। এ বিষয়ে সৈয়দ আবুল হোসেনের দৃষ্টিভঙ্গি পরিষ্কার, “সব কিছুরই একটা নিয়মশৃঙ্খলা বা ব্যাকরণ থাকে। তেমনি রাজনীতিরও নিজস্ব ব্যাকরণ ও নিয়মশৃঙ্খলা রয়েছে। এটা ভঙ্গ করলে রাজনীতি হয় না, দলনীতি হয়। গণতন্ত্র হয় না, হয় দল ও ব্যক্তিতন্ত্র।২ সৈয়দ আবুল হোসেন এ উক্তিগুলো শুধু বইয়ের পাতায় সীমাবদ্ধ রাখেননি। প্রয়োগ করে চলছেন তার জীবনে, রাজনীতির মঞ্চে এবং সমাজ জীবনের অন্দরে অন্দরে। তাই তিনি রাজনীতি করতে গিয়ে মেনে চলেন রাজনীতির নিয়ম, রাজনীতির ব্যাকরণ। যা গণতন্ত্রকে পরিশীলিত করার লক্ষ্যে উজ্জীবিত করছে অনেককে।
সৈয়দ আবুল হোসেন সহনশীল রাজনীতির একনিষ্ঠ সমর্থক। রাজনীতিকে তিনি উন্নয়নের হাতিয়ার ও মানবাধিকার প্রতিষ্ঠার মূল মাধ্যম মনে করেন। রাজনীতি ক্ষমতা দেয়, এ ক্ষমতা ভিন্ন মতাবলম্বীদের প্রতিহত করার জন্য নয় বরং উন্নয়নের জন্য, মানুষের মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করার জন্য। যে রাজনীতি ভিন্ন মতাবলম্বীদের প্রতিহত করে, অন্যের বাকস্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ ও ক্ষমতাকে কুক্ষিগত করার লক্ষ্যে পরিচালিত হয়, সেটি রাজনীতি নয়, পশ্বনীতির নামান্তর। যাকে সাধারণভাবে স্বৈরাচার বলা হয়। তাঁর মতে, ‘গণতন্ত্র মানে জনগণের অংশীদারিত্বমূলক শাসন ব্যবস্থা।’৩ গণতন্ত্র রাজনীতির মাধ্যমে প্রাতিষ্ঠানিক অবয়ব পায়। যেখানে রাজনীতি অন্যকে দলিত করে সেখানে জনগণের অংশীদারিত্ব ব্যাহত হয়। সৈয়দ আবুল হোসেন বাংলাদেশের গণতন্ত্র নিয়ে নতুনভাবে চিন্তাভাবনা করার কথা বলেন। বিঘœ দেখে দুঃখ পান কিন্তু হতাশ হন না। তার আক্ষেপ-‘… গণতন্ত্রের জন্য মানুষ দীর্ঘদিন ধরে সংগ্রাম করে আসছে। বহু ত্যাগ-তিতিক্ষা স্বীকার করে চলেছে। কিন্তু কাক্সিক্ষত সে গণতন্ত্র আজও অ-ধরা রয়ে গেছে। জনগণের বিজয় বারবার ছিনতাই হয়ে যায়। যেমন হয়েছে পঁচাত্তরে।’৪ জন-বিজয় ছিনতাই হয়ে গেলেও সৈয়দ আবুল হোসেন তা পুনরুদ্ধারে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ এবং আশান্বিত। বাধা আসবে, বিঘœ থাকবে। এরই মধ্যে এগিয়ে যেতে হবে সামনে।
তাই আক্ষেপ করলেও তিনি হতাশ নন, প্রতিকূলতা দেখে মুষড়ে পড়েন না। তিনি জানেন, শান্ত সমুদ্র কোনো দক্ষ নাবিকের জন্য নয়। তাই তিনি উচ্ছ্বসিত প্রত্যাশায় উদ্বেল হয়ে বলতে পারেনÑ ‘আমি আশাবাদী। আমার দৃঢ় বিশ্বাস, বাংলাদেশের জনগণের সংগ্রাম বৃথা যাবে না।’৫ তাকে দেখলাম তিনি প্রচণ্ড আশাবাদী এবং আত্মপ্রত্যয়ী। অন্যে যেখানে দুর্যোগ দেখেন সেখানে তিনি দেখেন সুযোগ। অন্যে যেখানে শোনেন কান্না, সেখানে তিনি দেখেন, কলকল ঝর্না। এ আশাবাদী মনোভাব তার উত্তরণের জ্বালানি- এ ব্যাপারে আমার সন্দেহ নেই।
রাজনীতিকে ভালোবাসলেও রাজনীতির কুফল, বিশেষ করে, বাংলাদেশে এর অপব্যবহারে সৈয়দ আবুল হোসেন শঙ্কিত। ছাত্র রাজনীতি তিনি সমর্থন করেন, তবে তা কোনো রাজনীতিক দলের লেজুড়বৃত্তি করতে নয়। রাজনীতি যদি ছাত্র সমাজের ন্যায্য দাবি-দাওয়া আদায় ও ভবিষ্যৎ-নেতা হিসেবে নিজেদের গঠনের জন্য হয়, তাহলে কেবল তাই সমর্থনযোগ্য। এ প্রসঙ্গে তাঁর বক্তব্য যেমন গঠনমূলক তেমনি কার্যকর, ‘দেশের প্রায় শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর ভবন ও দেয়াল যেন প্রতিদ্বন্দ্বী রাজনৈতিক দল ও তাদের সমর্থক ছাত্র সংগঠনসমূহের রাজনৈতিক বিপণনের বিজ্ঞাপন বা বিলবোর্ডে রূপান্তরিত হয়েছে।৬ এর পরিবর্তন আবশ্যক। প্রত্যেক দলের এ দিকে খেয়াল দেয়ার সময় পার হয়ে যাচ্ছে। তাই সৈয়দ আবুল হোসেন তার গড়া শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোকে রাজনীতি মুক্ত রেখেছেন। কলেজ অঙ্গন ও দেয়ালে রাজনীতিক শ্লোাগানের বদলে শোভা পাচ্ছে ­মনীষীদের অসংখ্য বাণী। আমি মনে করি, এটি একটি নতুন ধারণা, মানসিকতা পরিবর্তনের নতুন দর্শন। সৈয়দ আবুল হোসেনের এ দর্শনকে সারা বাংলাদেশে ছড়িয়ে দেয়ার কার্যক্রম গ্রহণ করলে শিক্ষাব্যবস্থা ও শিক্ষাঙ্গনের পরিবেশে আমূল পরিবর্তন আসতে পারে। এ ব্যাপারে সৈয়দ আবুল হোসেনকে সরকার কাজে লাগাতে পারেন।
রাজনীতি করতে হলে দল প্রয়োজন। সৈয়দ আবুল হোসেন মনে করেন, আওয়ামী লীগ একটি গণমুখী দল। এর ব্যাখ্যাও তাঁর লেখায় পাওয়া যায়। তিনি মনে করেন, আওয়ামী লীগ সাম্প্রদায়িকতা মুক্ত। এ দল জাতির স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের স্রষ্টা এবং রক্ষক। আওয়ামী লীগ জনগণের দল এবং জনগণই এর মালিক। তাঁর ভাষায়, ‘আওয়ামী লীগের জন্ম কোনো সামরিক ছাউনিতে নয়, আওয়ামী লীগের স্পন্দন জনগণের মনের গভীরে গ্রোথিত।৭ জনগণের সাথে আওয়ামী লীগ সবসময় একাত্মকরণ-এর স্পন্দন জনগণের হৃদস্পন্দনের সাথে অবিচ্ছেদ্য। জনগণের অবহেলা মানে আওয়ামী লীগের স্পন্দন থেমে যাওয়া। আওয়ামী লীগ স্বাধীনতা দিয়েছে, মুক্তি দিয়েছে, দুর্বলকে আশ্রয় দিয়েছে। সংখ্যালঘুরা আওয়ামী লীগে তাদের নিরাপত্তা ও নিশ্চিত আশ্রয় খুঁজে পায়। তাই বাংলাদেশে এত দল থাকা সত্ত্বেও সৈয়দ আবুল হোসেন আওয়ামী লীগের প্রতি অনুরক্ত। এটি নিঃসন্দেহে তাঁর প্রগতিশীল মনোভাবের পরিচায়ক। প্রগতিশলীলতা কোনো আকস্মিক উপলব্ধি নয়, গভীর আত্মদর্শন ও নিবিড় অধ্যয়নের বিষয়। উদার মনোভাবের সাথে সার্বজনীন গ্রহণযোগ্যতার বীজ অঙ্কুরিত হলে এ বোধ স্ফুরিত হয়।
নেতা হিসেবে সৈয়দ আবুল হোসেন দূরদর্শী। কথায় ও চালচলনে তিনি ধীরস্থির ও প্রজ্ঞাময়। বলার আগে ভাবেন এবং ভাবেন বলে অশালীন কোনো বাক্য বের হয় না তার মুখ দিয়ে। রাজনীতির চালক নেতা, তবে নেতা যদি নেতৃত্বের গুণাবলীতে বিভূষিত না-হন, তাহলে সে রাজনীতি দেশের কল্যাণ নয় বরং অকল্যাণই বয়ে আনে। নেতাকে কথা ও কাজে যেমন শালীন তেমন আন্তরিক হতে হয়। নইলে রাজনীতি মিথ্যানীতির জঞ্জালে পরিণত হয়। আমাদের দেশের নেতৃবৃন্দ অনেক সময় অশালীন ও রূঢ় মন্তব্য করে বসেন। এ দিকটার দিকে আঙুল দেখিয়ে সৈয়দ আবুল হোসেন বলেছেন, “একজন নেতা বা নেত্রীকে কথায় ও কাজে কেবল পারফেক্ট হলেই চলবে না, তাকে অনুকরণীয় গুণাবলীর অধিকারীও হতে হবে। তার কাছ থেকে মানুষ প্রেরণা পাবে। তিনি হবেন আদর্শ স্থানীয়। মানুষ তাকে অনুসরণ করবে। তাকে দেখে শিখবে, উজ্জীবিত হবে। সে জন্যে একজন নেতা বা নেত্রীকে মেপে মেপে কথা বলতে হয়। তিনি যা বলছেন তার তাৎপর্য, মর্ম এবং জনগণের কি সম্ভাব্য প্রতিক্রিয়া হতে পারে সে সম্পর্কে তার সঠিক ধারণা থাকতে হবে। কারণ রাজনৈতিক অবস্থানের কারণে তার প্রতিটি কথারই গুরুত্ব রয়েছে। তাই দৃষ্টি নন্দনের চেয়ে তাকে হতে হবে বেশি মাত্রায় উক্তি নন্দন। তাকে সবসময় স্মরণ রাখতে হবে তার অসংলগ্ন বা বল্গাহীন উক্তি তার ভাবমূর্তি ক্ষুণœ করতে পারে।৮ হোসেন সাহেবের এ কথাটি আমার কাছে অত্যন্ত কার্যকর মনে হয়েছে। আমাদের নেতা-নেত্রীদের কথায় লাগাম টানার অপরিহার্যতা কী চমৎকার ভাষায় সৈয়দ আবুল হোসেন তুলে ধরেছেন!
নেতার আদিরূপ প্রজা। সাধারণ জনগণই ব্যক্তিকে সাধারণ পর্যায় হতে নেতায় রূপান্তর করে। অনেক নেতা ক্ষমতা পেয়ে নিজেকে সর্বাধিনায়ক ভেবে বসেন। মনে করেন তিনিই সব। যারা তাকে নেতা করেছেন, ক্ষমতায় এনেছেন তাদেরকে তুচ্ছ মনে করেন এবং নেতা হয়ে তাদের কথা ভুলে যান। সৈয়দ আবুল হেসেন এ নীতির বিরোধী তাই তিনি সবাইকে নিয়ে রাষ্ট্র পরিচালনায় আগ্রহী। রাষ্ট্র সবার জন্য, সবাইকে সংশ্লিষ্ট করতে না-পারলে রাষ্ট্র পরিচালনায় কাক্সিক্ষত সাফল্য আসে না। তাঁর ভাষায়, ‘আমিই রাষ্ট্র, আমি যা ভালো মনে করব তাই হবে। আমরাই সব আর কেউ কিছু নয়, এসব মধ্যযুগীয় সামন্ততান্ত্রিক চিন্তাধারা এখন সম্পূর্ণ অচল। গণতন্ত্রে জনগণই হচ্ছে সবকিছুরই নিয়ামক ও নির্ধারক।৯ আবুল হোসেন সাহেবের এ বিশ্বাস যথাযথভাবে কার্যকর করা আবশ্যক। তাহলে রাষ্ট্র পরিচালনায় অধিকাংশ নাগরিকের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা যাবে। কেবল তখনই জাতির সার্বিক উন্নয়ন প্রতিষ্ঠা পাবে। মনে রাখতে হবে, উন্নয়ন বলতে কোনো ব্যক্তি বা অঞ্চল বিশেষের উন্নয়ন বোঝায় না। এটি আলোর মতো সার্বজনীন কেতনে আপতিত না-হলে উন্নয়ন হয়ে উঠতে পারে প্রলয়ের চেয়ে ভয়ঙ্কর।
ক্ষমতা কুক্ষিগত করে রাখার চেষ্টা গণতন্ত্র ও উন্নয়নের প্রতিকূল ধারণা। সৈয়দ আবুল হোসেন যাদের সমর্থনে নেতা হয়েছেন তাদের সুঃখ দুঃখের সাথে নিজেকে একাকার করে দেয়ার চেষ্টায় অবিরাম নিবিষ্ট থাকেন। এ বোধ যাদের থাকে, তারা সহনশীল, বিনয়ী ও নিরহঙ্কারী না-হয়ে পারেন না। নেতা মানে জনগণের নির্বাচিত প্রতিনিধি। যিনি জনগণের কাজ করবেন, জনগণের কাজে দায়বদ্ধ থাকবেন। নেতা হয়ে যিনি যাদের জন্য নেতা তাদের ভুলে যান, নিজেকে নিয়ে মগ্ন হয়ে পড়েন তারা নেতা নয়, ব্যথা।
ক্ষমতা একটা অদ্ভুত ধারণা। ক্ষমতা কুক্ষিগতকারী নেতৃত্ব ক্ষমতা সুসংহত করা নিয়ে এতই ব্যস্ত থাকেন যে, নিজের বিপদ কোনো দিক দিয়ে চলে আসে সে বিষয়ে মোটেও সজাগ থাকার সুযোগ পায় না। তাই এত সতর্ক থাকার পরও শেষ পর্যন্ত নিজেদের রক্ষা করতে পারে না। জনবিচ্ছিন্ন নেতৃত্ব ক্ষমতার মোহে এত অন্ধ থাকে যে, কারও পরামর্শ গ্রাহ্য করে না। সৈয়দ আবুল হোসেন বিষয়টি খুব নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করেছেন। তিনি বলেন, ‘ক্ষমতাসীনরা কখনও কোনো সৎ পরামর্শ গ্রহণ করে না। সংকট সমাধানে নয়, সংকট সৃষ্টিতেই তারা বেশি পারদর্শী ও উৎসাহী।’ তিনি আরও মনে করেন, ‘যা অনিবার্য তার জন্য দুঃখ বা অনুশোচনা হয় না, কিন্তু যা পরিহার করা যেতে পারত, তা ঘটে গেলে বা ঘটতে দিলে অবশ্যই মনস্তাপ হবে, ক্ষোভ হবে, কষ্ট হবে।’১০
ইতিহাসে অনেক শিক্ষা থাকে কিন্তু কেউ গ্রহণ করে না। ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি হয়। ক্ষমতা আঁকড়ে থাকার জন্যে প্রাণপণ চেষ্টা সত্ত্বেও সকল স্বৈরাচারকেই একদিন না একদিন বিদায় নিতে হয়। এটাই ইতিহাসের শিক্ষা। কিন্তু এ শিক্ষাটা কেউ নেয় না, নিতে চায় না। সে কারণেই বোধ হয় বার বার স্বৈরাচারের আবির্ভাব ঘটে।১১ এ রকম অদূরদর্শী নেতাগণের প্রতি তাঁর উপদেশ, ‘জনগণকে ভালোবাসুন, নিরাপত্তা আপনা আপনি নিশ্চিত হয়ে যাবে।’ তাই তিনি জনগণে বিলীন হয়ে নিজেকে সাধারণ্যের পর্যায়ে নিয়ে যেতে চান। এখানেই তার আনন্দ। এটাই তার প্রাপ্তি। সংগতকারণে জনগণও তাঁকে উজাড় করা ভালোবাসায় বার বার অভিষিক্ত করেন।
অনেকের কাছে নেতৃত্ব ক্ষমতা জৌলুসের বিষয়, গর্বের বিষয়। সৈয়দ আবুল হোসেন নেতৃত্ব ও দায়িত্বকে জৌলুসময় মনে করেন না। তার মতে, ‘একটি কার্য আর একটি বোঝা। এ বোঝা মূলত বাস্তবায়নের, দায়িত্বের এবং প্রতিজ্ঞার। …যে মস্তকে শোভিত হয় মুকুট, সে মস্তক কখনও নিশ্চিত থাকে না। হাজারও চিন্তাভাবনা, শত সমস্যার কণ্টকে সে মুকুট থাকে শোভিত। রাতের ঘুম, দিনের আরাম তখন বিলকুল হারাম হয়ে যায়। বাংলাদেশের মতো হতদরিদ্র দেশ হলে তো কথাই নেই। তাই দায়িত্ব পাবার আগে প্রত্যেকের উচিত দায়িত্ব বহনের সামর্থ্য অর্জন।’
‘সুষ্ঠুভাবে রাষ্ট্র পরিচালনার জন্য সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন প্রজ্ঞা।’১২ উপযুক্ত শিক্ষা আর ত্যাগী মনোভাব ছাড়া তা অর্জন করার কোনো উপায় নেই। তাই সৈয়দ আবুল হোসেন প্রজ্ঞাময় প্রজন্ম সৃষ্টির মানসে কার্যকর শিক্ষার বিস্তার ও প্রসারে সমর্পিত। এর মাধ্যমে মননশীল জনগোষ্ঠী সৃষ্টি করে তিনি বাংলাদেশের রাজনীতির সহিংস ক্ষেত্রকে সহনশীলতার উর্বর ক্ষেত্রে পরিব্যাপ্ত করার ইচ্ছায় ব্যাকুল। স্বল্প সময়ের মধ্যে তিনি যে সংখ্যক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলেছেন, যেভাবে শিক্ষার প্রসারে কাজ করে যাচ্ছেন, সে রকম ব্যক্তি যদি অন্তত প্রতি জেলায় একজন করে হলেও থাকত, তো বাংলাদেশ এতদিনে যে কোনো উন্নত দেশের সাথে পাল্লা দেয়ার সক্ষমতা অর্জন করতে সক্ষম হতো।
সৈয়দ আবুল হোসেন মনে করেন, বাংলাদেশের সমস্যা গুড গভর্নেন্স, সুষ্ঠু ও সৎ শাসন ব্যবস্থা না-থাকা। তিনি সুশাসন বলতে সৎ ও প্রত্যয়দীপ্ত নেতৃত্ব; সুষ্ঠু নির্বাচন বা অংশীদারিত্বমূলক গণতন্ত্র এবং উপযোগী নীতিমালা গ্রহণপূর্বক এ সবের কার্যকর বাস্তবায়নকে বুঝে থাকেন। এ তিনটি বিষয়কে সমন্বিত করার জন্য তিনি নিরলস কাজ করে যাচ্ছেন। এ কাজ করতে গিয়ে সৈয়দ আবুল হোসেন কঠোর বাস্তবতার মুখোমুখি হয়েছেন। রাজনীতিক সদিচ্ছার অভাবের কারণে বার বার সুশাসন প্রতিষ্ঠা ব্যাহত হয়েছে। ঘুষ, দুর্নীতি, সন্ত্রাস, মৌলবাদ, কুসংস্কার, মুক্তিযুদ্ধের চেতনাবিরোধী কার্যকলাপ, দলীয়করণ, যুক্তিহীন সমালোচনা ইত্যাদি কারণে সুশাসন বিকাশ হতে পারছে না। তার অভিজ্ঞতার প্রকাশ সত্যিকার অর্থে অকাট্য- ‘একটি সৎ ও সত্যিকারের জনপ্রতিনিধিত্বশীল সরকারই কেবল এ সব সম্ভাবনাকে বাস্তবে রূপ দিতে সক্ষম। আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা সুশাসনের অন্যতম পূর্বশর্ত।’ তিনি বিশ্বাস করেন, সুশাসন প্রতিষ্ঠা করতে সুশিক্ষিত ও প্রজ্ঞাময় মানুষ এবং দক্ষ জনশক্তি প্রয়োজন। এ জন্য তার দৃষ্টি সর্বাগ্রে শিক্ষার উপর। এ বিষয়ে তার বক্তব্য প্রত্যেকের অনুধাবন করা উচিত-
‘শিক্ষকতা একটি মামুলী পেশা নয়। শিক্ষকতা একটি ব্যতিক্রমধর্মী সম্মানিত পেশা। শিক্ষকতাকে অভিহিত করা হয় পৃথিবীর শ্রেষ্ঠতম ব্রত ও মহানতম আদর্শ পেশা হিসেবে। বিশ্বনবী হযরত মোহাম্মদ (দঃ) বলতেন, তাঁর সবচেয়ে বড় পরিচয়Ñ তিনি মানব জাতির শিক্ষক। গ্রিক দার্শনিক ও রাষ্ট্রচিন্তাবিদ প্লেটো শিক্ষাকে তুলনা করেছিলেন অন্ধকার গুহার মধ্যে অজ্ঞতার শিকলবদ্ধ মানুষের কাছে আলোক রশ্মির আকস্মিক বিকিরণের সাথে। সে অর্থে শিক্ষা হচ্ছেÑ তিমির অভিসারী ও আলো বিতরণকারী। শিক্ষকদের বলা হয়, মানুষ গড়ার রূপকার। মহাবীর আলেকজান্ডার বলেছিলেন, আমার জীবনের জন্যে, আমার জন্মের জন্যে আমি আমার পিতামাতার কাছে ঋণী। কিন্তু আমার বিদ্যা, বুদ্ধি, জ্ঞান ও মনুষ্যত্বের জন্যে; কৃতিত্ব, বীরত্ব ও গৌরবের জন্যÑ ঋণী হচ্ছি আমার শ্রদ্ধেয় শিক্ষক এরিস্টটলের কাছে। রবীন্দ্রনাথ বিশ্বকবি হয়ে সন্তুষ্ট থাকেননি। বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করে তিনি নিজেকে একজন নিবেদিত প্রাণ আদর্শ শিক্ষকে রূপান্তরিত করার প্রয়াস পেয়েছিলেন। আধুনিক চীনের প্রতিষ্ঠাতা মাওসেতুং প্রায় সময় বলতেন, তিনি একজন শিক্ষক মাত্র। বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ ও দার্শনিক হোয়াইটহেড বলেছিলেন, ঘড় ঝুংঃবস ড়ভ ঊফঁপধঃরড়হ রং ইবঃঃবৎ ঃযধহ ধ ঞবধপযবৎ. অর্থাৎ কোনো শিক্ষা ব্যবস্থাই শিক্ষকের চেয়ে উন্নত নয়। শিক্ষকই শিক্ষা ব্যবস্থার প্রাণ। শিক্ষা প্রক্রিয়ার অন্তস্থলে শিক্ষকদের অবস্থান। দার্শনিক বার্টান্ড রাসেলের কথায়- শিক্ষক সমাজ হচ্ছে প্রকৃতই সমাজ ও সভ্যতার বিবেক। এজন্য শিক্ষকদের বলা হয় সোস্যাল ইঞ্জিনিয়ার (ঝড়পরধষ ঊহমরহববৎ) বা সমাজ নির্মাণের স্থপতি।১৩
সৈয়দ আবুল হোসেন তাঁর ধারণা ও বিশ্বাসকে শুধু তথ্যে সীমাবদ্ধ রাখেন না। যা বিশ্বাস করেন তা মনেপ্রাণে কার্যকর করার চেষ্টা করেন। তিনি শিক্ষক সমাজকে সবচেয়ে বেশি শ্রদ্ধা করেন। জীবনের বিভিন্ন ক্ষেত্রে এটি তাঁর ব্যবহার ও কার্য দ্বারা বার বার মূর্ত হয়ে উঠেছে। তিনি শুধু তাত্ত্বিক নন, একই সাথে প্রায়োগিকও বটে। পর্যবেক্ষণের পর সিদ্ধান্তে আসেন, সিদ্ধান্তের পর বাস্তবায়নে। হুজুগের মাথায় কোনো কিছু করা হতে প্রবল মানসিক চাপ সত্ত্বেও বিরত থাকার চেষ্টা করেন। তাঁর জ্ঞান ও দক্ষতাকে তিনি লুকিয়ে রাখেন না। সমাজের জন্য তা ব্যবহার করেন। এ রকম মানুষই সমাজের উপকার করতে পারেন। যে জ্ঞান নিজের মনে সীমাবদ্ধ থাকে সে জ্ঞান থাকা না-থাকা একই।
রাজনীতি, অর্থনীতি, শিক্ষা, সমাজব্যবস্থা সব কিছুর লক্ষ্য উন্নয়ন। তবে উন্নয়ন একটি বহুমাত্রিক ধারণা। সৈয়দ আবুল হোসেনের ভাষায়, ‘গণতন্ত্র, নেতৃত্ব ও উন্নয়ন সমার্থক এবং পরস্পর গভীরভাবে সম্পৃক্ত। একটির উপর নির্ভর করে এদের সাফল্য।’১৪ তিনি মুক্ত অর্থনীতির সমর্থক। অর্থনীতিকে বন্দি করে রেখে খাঁচার পাখির মতো অথর্ব করে দেয়ার পক্ষপাতি নন তিনি। শিল্পায়নকে তিনি উন্নয়নের অগ্রাধিকার প্রাপ্ত খাত হিসেবে দেখতে চান। তিনি মনে করেন, ‘শিল্পায়ন ছাড়া জনগণের জীবনধারণের মান উন্নয়ন করা যায় না। শিল্পায়ন ছাড়া বেকার সমস্যার কার্যকর ও ফলপ্রসূ সমাধান সম্ভব নয়। এক কথায়, শিল্পায়নই হচ্ছে সমৃদ্ধি ও অগ্রগতির সোপান। কৃষির মাধ্যমে কাক্সিক্ষত উন্নয়ন সম্ভব নয়। কারণ, ভূমির একটি সর্বোচ্চ ধারণ ক্ষমতা রয়েছে। এ কারণেই আমাদের আর্থ-সামাজিক প্রেক্ষাপটে শিল্পায়নের কোনো বিকল্প নেই।’১৫ তাই বলে তিনি কৃষিকে অবহেলা করার কথা বলেন না। বলেন, কৃষিকেও আধুনিক প্রযুক্তির সামিল করতে। তাহলে কৃষিও শিল্প হিসেবে প্রতিষ্ঠা পাবে।
ছাত্র রাজনীতি নিয়ে তিনি শুরু হতে শঙ্কিত ছিলেন। তাই নিজের চেষ্টায় গড়ে তুলেছেন একের পর এক অনেকগুলো শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। যা ছাত্র রাজনীতি নামক লেজুড়বৃত্তি হতে সম্পূর্ণ মুক্ত। তিনি মনে করেন, ছাত্ররাই জাতির ভবিষ্যৎ। আগামী দিনের নেতৃত্ব আসবে তাদের কাছ থেকেই। ছাত্রদের ক্ষুদ্র ও সংকীর্ণ রাজনৈতিক কোন্দল, হানাহানি ও সংঘাতের দিকে ঠেলে দিলে শিক্ষাব্যবস্থা যেমন হবে বিপর্যস্ত, তেমনি বিকশিত হতে পারবে না জাতির আগামী দিনের সম্ভাবনাময় তরুণ মেধা ও প্রতিভা।১৬ তাই তিনি তাঁর প্রতিটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানকে সম্পূর্ণভাবে লেজুড়বৃত্তিময় রাজনীতি হতে মুক্ত রেখেছেন এবং এ ব্যাপারে অনড়।
সৈয়দ আবুল হোসেন একজন গণতন্ত্রমনা নেতা। গণতন্ত্রের অনেকগুলো সংজ্ঞার ক্ষেত্রে তিনি আব্রাহাম লিংকনের সংজ্ঞাকে শ্রেষ্ঠ মনে করেন। তাঁর গণতন্ত্রে জনগণই সব। রাষ্ট্র পরিচালনায় যাতে সর্বাধিক লোকের অংশীদারিত্ব নিশ্চিত হয় সেভাবে তিনি রাজনীতিক কলাকৌশল নির্ধারণে আগ্রহী। তিনি মনে করেন, ‘সুষ্ঠু, শান্তিপূর্ণ, নিরপেক্ষ ও অবাধ নির্বাচনই হচ্ছে গণতন্ত্রের প্রধান স্তম্ভ। জনগণের সম্মতি ও স্বার্থ অনুযায়ী শাসন করা সরকারের একটি মহৎ ও গৌরবজনক লক্ষ্য। জনপ্রিয় নির্বাচন অনুষ্ঠান করা ব্যতিরেকে এই লক্ষ্য অর্জিত হতে পারে না।’১৭ তিনি আরও মনে করেন, ‘গণতন্ত্রে ন্যায়সঙ্গত প্রতিবাদ জ্ঞাপনের অধিকার আইনসম্মতভাবে স্বীকৃত।’১৮ তার মতে, শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান ও সহনশীলতাই গণতন্ত্রের মূল কেন্দ্র। এ প্রসঙ্গে তার অভিমত খুবই অর্থবহ- ‘শিক্ষা তখনই প্রকৃত অর্থে আমাদের ঋদ্ধ করতে সক্ষম হয় যখন আমরা পরস্পর পরস্পরের প্রতি বিনয়ী ও শ্রদ্ধাশীল হই। গণতন্ত্র হচ্ছে বৈচিত্র্যময় অনেকগুলো পথ-মতের সমাহার। গণতন্ত্র তখনই কার্যকর হয়, যখন প্রত্যেক মানুষ আপন দর্শনে স্থিত থেকে স্বাধীনভাবে উচ্চকিত হওয়ার পরিবেশ পায়। সহাবস্থান, সহনশীলতা ও শিক্ষার মাধ্যমে এটি নিশ্চিত করা যায়। তাই ছাত্রদের উচিত আগে জ্ঞান অর্জন করা। জ্ঞান তখনই অর্জিত হবে বলে ধরে নেয়া যাবে, যখন ব্যক্তি নিজের সুখের জন্য অন্যের সুখ হরণকে অত্যন্ত গর্হিত মনে করবে। পক্ষান্তরে সবার সুখ নিশ্চিত করার জন্য আত্মত্যাগে উদ্বুদ্ধ হবে।’১৯
রাষ্ট্র পরিচালনা ও রাজনীতিক উদ্দেশ্য হাওয়ায় বাস্তবায়ন করা যায় না। এর জন্য প্রয়োজন লাগসই নীতি, টেকসই প্রযুক্তি, দক্ষ জনবল, অদম্য স্পৃহা এবং সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য। নীতিমালা প্রণয়ন ও প্রযুক্তি প্রয়োগের জন্য প্রয়োজন দক্ষ জনশক্তি। সৈয়দ আবুল হোসেন মনে করেন, নিবেদিত প্রাণ সৎ, দক্ষ ও কঠোর পরিশ্রমী আমলাতন্ত্র ছাড়া সরকারের নীতির পরিপূর্ণ বাস্তবায়ন সম্ভব নয়।২০ তিনি এগুলোর সমন্বয় সাধনের মাধ্যমে রাষ্ট্রের লক্ষ্যকে সাফল্যমণ্ডিত করার জন্য রাজনীতি করেন। সংকীর্ণ স্বার্থসিদ্ধির জন্য নন। ধর্ম বিষয়ে তার উদারতা আমাকে মুগ্ধ করেছে। সাম্প্রদায়িকতা মুক্ত মানসিকতা সৈয়দ আবুল হোসেনের রাজনীতিক দর্শনের বিমল অলঙ্কার, বস্তুত সাম্প্রদায়িকতাহীন বলে তিনি এত উদার, সহনশীল এবং মহানুভব হতে পেরেছেন।
সৈয়দ আবুল হোসেনের কর্মকাণ্ড ও কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ করে আমার মনে হয়েছে, তিনি এমন একজন রাজনীতিবিদ, যিনি জনগণের কল্যাণে সম্পূর্ণভাবে নিবেদিত একজন সাধারণ মানুষ। জনগণ এমন একজন সহজ মানের অসাধারণ রাজনীতিবিদকে তাদের নেতা হিসেবে চান। এমন নেতাই দেশের ভাগ্য বদলে দিতে পারেÑ স্বপ্নীল আগামীর ভাবনায়। অনেক রাজনীতিবিদ মনে করেন ক্ষমতায় যেতে হলে সন্ত্রাসীদের সহায়তা প্রয়োজন। সৈয়দ আবুল হোসেন এটি মোটেও বিশ্বাস করেন না। তিনি মনে করেন, সন্ত্রাসীরা পক্ষান্তরে দলকে জনবিমুখ করে তোলে। জনগণের কাছে যেতে হলে জনগণের শত্র“ সন্ত্রাস আর সন্ত্রাসীকে কঠোর হস্তে দমন করতে হবে।
জনৈক জ্ঞানী ব্যক্তি বলেছেন, কারও চারিত্রিক পূততা পরীক্ষা করতে হলে তাকে অর্থ বা ক্ষমতা দাও, তারপর দেখো তিনি কেমন। আমীন আমাকে গ্রন্থের সাথে আলহাজ্ব সৈয়দ আবুল হোসেনের একটি বায়োডাটা দিয়েছিল। তা পড়ে মুগ্ধ না-হয়ে পারলাম না। তাঁর জন্ম ১৯৫১ খ্রিস্টাব্দের ১ আগস্ট। আশির দশকের শেষভাগ হতে তার জনসেবার অভিযাত্রার সূচনা। কতইবা বয়স, মাত্র পঁয়ত্রিশ। এ বয়সে কত বিত্তবান লোককে দেখেছি হোটেলে, ক্লাবে, দেশে-বিদেশে ফুর্তি আনন্দে মজা লুটতে; অসামাজিক কাজ করতে। সে ক্ষেত্রে সৈয়দ আবুল হোসেন স্কুল করেছেন, কলেজ করেছেন, বৃত্তি দিয়েছেন, গরিবদের দু’হাতে তুলে দিয়েছেন নিজের কষ্টার্জিত অর্থ। এটি আমাকে অভিভূত করেছে। তাঁর মতো মানুষ বাংলাদেশে বড় প্রয়োজন।

ড. আবদুল করিম : প্রাক্তন উপাচার্য, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়, লেখক, গবেষক; উপমহাদেশের শ্রেষ্ঠ ইতিহাসবেত্তা।

১. গণতন্ত্র নেতৃত্ব ও উন্নয়ন, সৈয়দ আবুল হোসেন, পৃষ্ঠা ২৯
২. গণতন্ত্র নেতৃত্ব ও উন্নয়ন, পৃষ্ঠা- ৪৩
৩. গণতন্ত্র, নেতৃত্ব ও উন্নয়ন, সৈয়দ আবুল হোসেন, প্রকাশকাল ফেব্রচ্ছারি, ১৯৯৬।
৪. গণতন্ত্র, নেতৃত্ব ও উন্নয়ন, সৈয়দ আবুল হোসেন, প্রকাশকাল ফেব্রচ্ছারি, ১৯৯৬।
৫. ঐ
৬. ঐ পৃষ্ঠা- ৩০।
৭. ঐ
৮. ঐ পৃষ্ঠা- ৪১।
৯. গণতন্ত্র নেতৃত্ব উন্নয়ন গ্রন্থের প্রবন্ধ, লেখক সৈয়দ আবুল হোসেন, পৃষ্ঠা ৪৩
১০. গণতন্ত্র নেতৃত্ব উন্নয়ন গ্রন্থের প্রবন্ধ, লেখক সৈয়দ আবুল হোসেন, ৪৫
১১. গণতন্ত্র নেতৃত্ব ও উন্নয়ন, পৃষ্ঠা ৬৪
১২. গণতন্ত্র নেতৃত্ব ও উন্নয়ন, সৈয়দ আবুল হোসেন, পৃষ্ঠা ৬৯।
১৩. শিক্ষক ও শিক্ষা ব্যবস্থা, গণতন্ত্র নেতৃত্ব উন্নয়ন গ্রন্থের প্রবন্ধ, লেখক সৈয়দ আবুল হোসেন, পৃষ্ঠা ২২।
১৪. গণতন্ত্র নেতৃত্ব ও উন্নয়ন, সৈয়দ আবুল হোসেন।
১৫. শিল্পায়ন ও অর্থনীতির বিকাশ, সৈয়দ আবুল হোসেন, গণতন্ত্র, নেতৃত্ব ও উন্নয়ন, পৃষ্ঠা ৩৮)
১৬. গণতন্ত্র নেতৃত্ব ও উন্নয়ন, পৃষ্ঠা ৩৪
১৭. গণতন্ত্র নেতৃত্ব ও উন্নয়ন, পৃষ্ঠা ৬৬
১৮. গণতন্ত্র নেতৃত্ব ও উন্নয়ন, পৃষ্ঠা ৩২
১৯. সূত্র অধ্যাপক মনোরঞ্জন দাস।
২০. গণতন্ত্র নেতৃত্ব ও উন্নয়ন, সৈয়দ আবুল হোসেন, পৃষ্ঠা ৭৬।

সততাই সর্বোৎকৃষ্ট পন্থা
এম মতিউর রহমান
১৯৭৬ সালে আমি বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সচিব হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের কয়েকদিন পর একজন ব্যবসায়ী আমার দপ্তরে আসেন। সুন্দর, সুঠাম ও আভিজাত্যময় চেহারা। নিপুণভঙ্গিতে আঁচড়ানো চুলে মাথা ভর্তি। ফর্সা মুখে সারল্যের হাসি। রুচিশীল টাই-স্যুট পোশাকে তাঁকে অপূর্ব লাগছিল। মানুষ হিসেবে আমিও কম সুন্দর নই। তবে যুবককে দেখে আমার সুন্দরটা নি®প্রভ মনে হলো। বিনয়ের সাথে সালাম দিয়ে বললেন: ‘আমার নাম সৈয়দ আবুল হোসেন। নতুন ব্যবসায় নেমেছি। ফরিদপুর জেলার মাদারীপুর মহকুমায় বাড়ি। আপনার সাথে পরিচিত হতে আসলাম।’ চেয়ারে বসতে বসতে আরও বলেছিলেন, ‘বাড়ি মাদারীপুর হলেও লেখাপড়া করেছি বরিশাল। গৌরনদী কলেজের ছাত্র ছিলাম।’
আমার বাড়ি বরিশাল (বর্তমান পিরোজপুর)। প্রশাসনিক বিভাজনের অবস্থানগত নৈকট্য মানুষের পরস্পর সম্পর্ক সৃষ্টির একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রভাবক, এটা অস্বীকার করার উপায় নেই। আমার নিজ জেলার পাশের জেলা ফরিদপুরের ছেলে সৈয়দ আবুল হোসেনের উপস্থাপনাগত সৌন্দর্যের সাথে ঠিকানাগত নৈকট্য আমাকে তাঁর প্রতি আকৃষ্ট করে। অনেকে এটাকে আঞ্চলিকতা বলবেন। আমি বলব আঞ্চলিকতা নয়, দেশপ্রেম। চ্যারিটি বিগেইনস এট হোম। চা পানের ফাঁকে ফাঁকে অনেক ব্যক্তিগত তথ্য আদান-প্রদান হয়ে গেল। তাঁর ব্যক্তিত্ব, দৃষ্টিভঙ্গি, মনোভাব, দেশপ্রেম, জীবনের লক্ষ্য এবং ব্যবসায় হিসেবে লক্ষ্যস্থলে পৌঁছার দৃঢ়তার সাথে সৎ থাকার অঙ্গীকার আমাকে মোহিত করে। শুধু অবয়বগতভাবে নয়, হৃদয়গতভাবেও তিনি মনকাড়া গুণাবলীর অধিকারী মনে করার যথেষ্ট কারণ আমার কাছে পরিষ্কার হয়ে ওঠে।
গত বছর (১৯৭৫) সৈয়দ আবুল হোসেন ‘সাকো ইন্টারন্যাশনাল’ নামক একটি ব্যবসা প্রতিষ্ঠান খুলেছেন। নতুন উদ্যোক্তা, অল্প বয়স। বলেছিলাম, ‘বাণিজ্য সচিব হিসেবে আপনাকে সহযোগিতা করা আমার কর্তব্য এবং নৈতিক দায়িত্ব।’ তিনি বলেছিলেন, ‘আপনার কথা শুনে আমি খুশি হলাম। তবে অনৈতিক কিছু আমি চাইব না এবং করব না; এ কথা নির্দ্বিধায় বলতে পারি।’ এ রকম প্রত্যয়দীপ্ত কথা প্রথমে অনেকের কাছে অহঙ্কার বা আস্ফালন মনে হতে পারে। প্রকৃতপক্ষে এখানে তাঁর অহঙ্কারের কিছু ছিল না। এর মাধ্যমে কেবল তাঁর সততার পরিচয়টা ফুটে উঠেছিল। স্বাধীনতাত্তোর বাংলাদেশে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমানের ঔদার্যের সুযোগে মুনাফালোভী কিছু অসাধু ব্যবসায়ী কালোবাজারি ও মজুদদারি করে দেশের যে ক্ষতি করেছিল তা ইতিহাসের পাতায় এখনও কলঙ্ক হয়ে আছে। বঙ্গবন্ধু এসব অসাধু, মুনাফাখোর ব্যবসায়ী ও কালোবাজারিদের অপকর্মে এতই ক্ষিপ্ত ছিলেন যে, বিভিন্ন বক্তৃতায় বারবার তাদের সতর্ক করে দিতেন। এ অবস্থায় বঙ্গবন্ধু-পরবর্তী বাংলাদেশকে আধুনিক বিশ্বের উন্নয়ন স্রোতে সম্পৃক্ত হতে হলে সততার সাথে কোনো আপোষ করলে চলবে না- এটি সৈয়দ আবুল হোসেন সচেতনভাবে উপলব্ধি করতে পেরেছিলেন।
সাত বছর আমি বাণিজ্য সচিব ছিলাম। এ দীর্ঘ সাত বছর সৈয়দ আবুল হোসেনকে একজন ব্যবসায়ী ও ব্যক্তি হিসেবে নিবিড়ভাবে খুব কাছ হতে প্রত্যক্ষ করার সুযোগ পেয়েছি। শিল্প মন্ত্রণালয়ের সচিব হবার পরও তাঁর সাথে আমার পরিচয়ের ছেদ নামেনি। দীর্ঘ এক যুগের বেশি সময় অনেক বার তিনি আমার কাছে এসেছেন, একা এসেছেন, অনেককে নিয়ে এসেছেন। মাঝে মাঝে ব্যবসায়ী সমাজের প্রতিনিধি হিসেবে মন্ত্রণালয়ের সভায়ও যোগ দিয়েছেন। সবখানে তাঁকে আমি তীক্ষè বুদ্ধিসম্পন্ন একজন আদর্শ ব্যবসায়ী হিসেবে প্রত্যক্ষ করেছি।
ঢাকা ইউনিভার্সিটির শিক্ষকতার চাকুরি ছেড়ে ১৯৪৯ খ্রিস্টাব্দে আমি সরকারি চাকুরিতে যোগ দেই। দীর্ঘ চাকুরি জীবনে ভালোমন্দ অনেক অভিজ্ঞতা আমার হয়েছে। শুধু সিভিল সার্ভেন্ট ছিলাম না, সংসদ সদস্য হয়েছি, মন্ত্রী হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছি। একটি বিষয়ে আমার অভিজ্ঞতা অত্যন্ত তিক্ত সেটি হচ্ছে, নীতি-নৈতিকতা অবহেলা করে যেনতেন প্রকারে অর্থ উপার্জন করা এবং তাড়াতাড়ি ধনী হবার মানসিকতা। ব্যবসা যে শুধু অর্থ উপার্জন নয়, সাথে সাথে সমাজসেবা- এ ধারণা খুব কম ব্যবসায়ীই পোষণ করতেন। এ ক্ষেত্রে আমি সৈয়দ আবুল হোসেনকে সম্পূর্ণ ব্যতিক্রম দেখতে পেয়েছি। লাভের জন্য ব্যবসা, এটি শতভাগ সত্য। তার মানে নৈতিকতা বিসর্জন দিয়ে অসৎ উপায়ে ব্যবসা পরিচালনা, প্রকৃত অর্থে ব্যবসা হতে পারে না। সৈয়দ আবুল হোসেনের দর্শন ছিল সমাজসেবার জন্য উপার্জন, কল্যাণের জন্য উপার্জন। মঙ্গলজনক কাজের উদ্দেশ্যে ধাবিত আয় কখনও অসৎ উপায়ে অর্জিত হতে পারে না। আর যারা অসৎ উপায়ে অর্জন করেন, তারা কখনও অবৈধ পন্থায় অর্জিত অর্থ কল্যাণমূলক কাজে ব্যয় করতে পারেন না। নেকড়ের কাছ হতে কখনও কোকিলের গান পাওয়া যায় না।
অধিকাংশ ব্যবসায়ী অনৈতিক উপায়ে লাভবান হতে চাইতেন। সৈয়দ আবুল হোসেন অনৈতিক সুবিধা গ্রহণকে প্রচণ্ড ঘৃণা করতেন। তিনি শুধু আইনগতভাবে প্রাপ্য তার ন্যায্য অধিকারটুকু চাইতেন। তার চাওয়াটা ‘সুবিধা’ ছিল না, ছিল ‘অধিকার’Ñ দেশের নাগরিক হিসেবে যা রাষ্ট্র তাকে সাংবিধানিকভাবে প্রদান করেছে। এর বাইরে তিনি চাইতেন না। সৈয়দ আবুল হোসেনকে ভালো লাগার অন্য যত কারণই থাকুক না কেন, এ গুণটির জন্য জন্য আমি এ ব্যবসায়ী যুবকটিকে অন্যান্য ব্যবসায়ীদের চেয়ে আলাদা চোখে দেখতাম। শুধু আমি নই, সবাই তাকে পছন্দ করতেন। তাঁর মধ্যে অন্যের পছন্দকে প্রভাবিত করার অদ্ভুত ক্ষমতা রয়েছে।
প্রথম যখন আবুল হোসেনের সাথে আমার পরিচয় হলো, তখন তিনি এত বড় ব্যবসায়ী ছিলেন না। ব্যবসা শুরু করেছিলেন মাত্র। পুঁজিও ছিল যৎসামান্য। অধিকন্তু তিনি ছিলেন অত্যন্ত সৎ ও নীতিবান। তাহলে কীভাবে তিনি এত বড় ব্যবসা প্রতিষ্ঠান গড়ে তুললেন? উত্তর- অনেস্টি ইজ দ্যা বেস্ট পলিসি। আসলে সততার মতো বড় মূলধন আর নেই। তাঁর আর্থিক পুঁজি কম ছিল এটা ঠিক- তবে তাঁর এমন কিছু পুঁজি ছিল যা পৃথিবীর সকল অর্থ একত্রিত করলেও হার মানবে। এ পুঁজি হচ্ছে পরিশ্রম, সততা, সময়নিষ্ঠা আর ভদ্রতা। তিনি কীভাবে এত বড় ব্যবসায়ী হতে পেরেছেন, মর্যাদায় পৌঁছোতে সক্ষম হয়েছেনÑ তা নিচের আলোচনায় স্পষ্ট হয়ে উঠবে।
মার্জিত আচরণ, সুললিত ভদ্রতা, আকর্ষণীয় ব্যক্তিত্ব, নজরকাড়া আভিজাত্য, মোহনীয় রুচি সৈয়দ আবুল হোসেনকে অনেক বড় মাপের মানুষে পরিণত করেছে। যদিও এগুলো জন্মগতভাবে অর্জন করা কঠিন অবশ্য। পরে জানতে পেরেছি, এসব গুণাবলী অর্জনে সৈয়দ আবুল হোসেনের ব্যক্তিগত সাধনা ছিল, তদসাথে তার বংশমর্যাদা সহায়ক ভূমিকা পালন করেছে। পেশাগতভাবে সৈয়দ আবুল হোসেন ছিলেন অত্যন্ত সৎ ও স্বচ্ছ; ব্যবহারে ছিলেন ব্যক্তিত্বময়, বিনয়ে পরিপূর্ণ মার্জিত। তিনি মিথ্যা বলতে পারেন- এমন কেউ ভাবতে পারত না। তাই সৈয়দ আবুল হোসেন যা বলতেন তা সবাই কোনোরূপ দ্বিধা ছাড়া সত্য মর্মে মেনে নিত। শুধু বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে নয়, পুরো সচিবালয়ে এবং যাদের সাথে তিনি ব্যবসা করতেন, যারা তাঁর কাছে আসতেন-যেতেন, কথা বলতেন, কথা শুনতেন সবার কাছে তিনি ছিলেন একজন আদর্শ মানুষের পূর্ণ প্রতিচ্ছবির আদর্শিক নান্দনিকতায় গড়ে ওঠা একজন। সংগতকারণে তিনি পুরো সচিবালয়ে ছোটবড় সবার পরিচিত সর্বমহলের প্রিয়পাত্র হয়ে ওঠেন। আমি মনে করি, সৈয়দ আবুল হোসেনের বড় হবার পেছনে এটি অন্যতম কারণগুলোর অন্যতম।
সৈয়দ আবুল হোসেনের বড় পুঁজি সততা। সততার সাথে তিনি ব্যবসা পরিচালনা করতেন। ব্যবসায় কার্যক্রম পরিচালনায় সুবিধাভোগীদের সাথে সম্পাদিত চুক্তি তিনি অক্ষরে অক্ষরে পালন করতেন। যাকে যেটুকু দেবার অঙ্গীকার করতেন, তার কম দিতেন না, বরং বেশিই দিতেন। ফলে অল্প সময়ে তাঁর ও তাঁর ব্যবসায় প্রতিষ্ঠানের সুনাম দ্র্রুত বেড়ে যায়। এটিও মূলত সততার পুরস্কার। ওয়ান-এলেভেনে তাঁকে হয়রানি করার চেষ্টা করা হচ্ছে শুনে বড় কষ্ট পেয়েছিলাম। কারণ, এমন একজন সৎ ব্যক্তিকে হয়রানি করা মানে সততাকেই হয়রানি করা।
ভোগের জন্য আয় এটা কেউ অস্বীকার করে না এবং পেশা এক ধরনের ভোগ। তবে ভোগের মধ্যে ব্যক্তিতে ব্যক্তিতে তফাৎ লক্ষ্য করা যায়। পশুরাও ভোগ করে, মানুষও ভোগ করে, আবার হিটলারও ভোগ করেছেন, মাদার তেরেসাও ভোগ করেছেন কিন্তু এ ভোগের পার্থক্য প্রবল, কারও ভোগ অন্যের কষ্টের কারণ হয়ে দাঁড়ায়, আবার কারও ভোগ সমাজে বিস্তার করে শান্তি, বইয়ে দেয় আনন্দ। যাদের ভোগ অন্যকে কষ্ট দেয়, রীতিনীতি, আইন-কানুন বা নৈতিকতার সাথে সাংঘর্ষিক, তাদের ভোগ পাশবিকতাময়। ভোগের জন্য পশু হয়ে যেতে হবে এমন আচরণ কোনো মানুষের পক্ষে সম্ভব নয়। মূলত এটিই পশু আর মানুষের মধ্যে পার্থক্য। মানবীয় ভোগ মানবীয় সৌন্দর্যে বিভূষিত থাকতে হবে। নৈতিকতা বিবর্জিত কোনো মানুষের মাঝে মানবীয় ভোগ থাকতে পারে না। সৈয়দ আবুল হোসেন মানবীয় ভোগে বিদূষিত একটি অত্যত্তুম চরিত্র। তিনি আয় করেছেন একা, তবে তা শুধু একার উপভোগের জন্য নয়। তাঁর ভোগ প্রতিষ্ঠা করেছে স্কুল, কলেজ, মাদ্রাসা, মসজিদ, মন্দির, রাস্তা ইত্যাদি।
শুধু স্কুল কলেজ নয়, শিক্ষার যে কোনো ক্ষেত্রে তিনি উদার। তাঁর অর্থায়নে অনেক লেখক তাঁদের অপ্রকাশিত গ্রন্থ প্রকাশ করতে সক্ষম হয়েছেন। এ সংবাদটি অনেকে জানেন না। আমার মনে হয়, সৈয়দ আবুল হোসেন সাহেব নিজেও জানেন না তিনি কয়জন লেখককে গ্রন্থ প্রকাশে কতভাবে সহায়তা করেছেন। আমি অনেকের নাম জানি। তবে দাতার মহত্ততার প্রতি সম্মান রেখে তা প্রকাশ নাই-বা করলাম। তিনি দান করতেন গোপনে, গ্রহীতাকে তা গোপন রাখার অনুরোধ করতেন। এ যে দান গোপন রাখার মতো মহৎ মন, কয়জনের আছে আমার জানা নেই।
অনেকে কম পরিশ্রম করে বেশি উপার্জনকে পেশাগত উন্নয়ন ও আর্থিক সফলতার সবচেয়ে উত্তম কৌশল বলে মনে করেন। সৈয়দ আবুল হোসেন মনে করেন, এটি সবচেয়ে নিকৃষ্ট এবং বিপজ্জনক পন্থা। যে গাছ দ্রুত বাড়ে সে গাছ সামান্য বাতাসে ভেঙে পড়ে। সময়ের আগে পাকা ফল লাল হতে পারে, পরিপক্ব হয় না, পাকার মতো মনে হলেও মুখে দিলে বিস্বাদের কষ্টে ছুড়ে দেয়া ছাড়া গত্যন্তর থাকে না। কম পরিশ্রম করে বেশি উপার্জনকারী ব্যক্তি অকালপক্ব ফলের ন্যায় বিরক্তিকর। কম শ্রমে বেশি উপার্জন করার ফন্দি মূলত অসৎ উপায় অবলম্বন করার নামান্তর। এ জন্য অনেকে অনৈতিক পথ অবলম্বন করতে উৎসাহী হয়ে ওঠে। সৈয়দ আবুল হোসেন কম পরিশ্রম করে বেশি উপার্জন করার কৌশল অবলম্বন করার কথা ভাবতেও পারতেন না। তিনি যতটুক পরিশ্রম করতেন ততটুক চাইতেন। তার চাওয়া শ্রম আর চেষ্টার সাথে সংগতিপূর্ণ থাকত বিধায় তিনি যতটুক চাইতেন ততটুক পেতেন। চাওয়া পাওয়ার সমান্তরাল বোধ তাকে আত্মবিশ্বাসী করে তুলেছিল সে যুবা বয়সে। তাই দিন দিন তিনি হয়ে উঠেছেন শ্রম-বিশ্বাসী একজন আত্মপ্রত্যয়ী মানুষ। শ্রমের যথাযথ মূল্য দিতে গিয়ে তিনি সময়নিষ্ঠ হয়ে ওঠেন।
আমি যখন যোগাযোগ মন্ত্রী, তখনও সৈয়দ আবুল হোসেনের সাথে মাঝে মধ্যে কথা হতো, দেখা হতো। জননেত্রী শেখ হাসিনার প্রথম শাসনামলে সৈয়দ আবুল হোসেন এলজিআরডি প্রতিমন্ত্রী হয়েছিলেন। একদিন তাঁর অফিসে এলাকার একটি কাজের জন্য তদ্বির করতে যাই। আমাকে দেখে তিনি এমন বিনীত ব্যবহার করলেন, যেন আমি বাণিজ্য সচিব এবং তিনি একজন ব্যবসায়ী। তাঁর বিনয়ী আচরণ আমাকে আবার মুগ্ধ করল। বিশ বছর আগে তাঁকে যে মূল্যায়ন আমি করেছিলামÑ তা অক্ষরে অক্ষরে মিলে গেছে দেখে গর্বে বুকটা ফুলে উঠেছিল। প্রতিমন্ত্রী সৈয়দ আবুল হোসেন আমার নিজ এলাকা পিরোজপুর জেলার কাউখালীর উন্নয়নে আমাকে যেভাবে সাহায্য সহযোগিতা করেছিলেন, তা তাঁর বিনয় আর কৃতজ্ঞতার প্রতিচ্ছবি।
এখনকার আবুল হোসেন আগের সে অখ্যাত ব্যবসায়ী আবুল হোসেন নন। তিনি এখন রাজনীতিবিদ, সংসদ সদস্য, দানবীর, সংগঠক, শিক্ষাবিদ ও লেখক। দেশব্যাপী রয়েছে তার প্রচুর খ্যাতি। সাধারণত মানুষ বিখ্যাত হবার পর অহঙ্কারী হয়ে ওঠেন, বিনয়ের পরিবর্তে হামবড়া প্রকট হয়ে ওঠে। আমি অবাক হয়ে লক্ষ্য করেছি সৈয়দ আবুল হোসেন যত বড় হচ্ছেন, যত বিখ্যাত হচ্ছেন, ততই তাঁর বিনয় প্রসারিত হচ্ছে। কোনো মানুষ বড় হবার সাথে সাথে যদি তার বিনয়-ভাব প্রসারিত হয়, ধরে নিতে হবে তিনি বড়ত্বের যোগ্য। ধারণক্ষমতার চেয়ে বেশি গ্যাস ভরলে বেলুন ফেটে যায়। ঐ ফেটে যাওয়াটা অহঙ্কারের প্রতিক্রিয়া। যা আমাদের অনেক পদাধিকারীর মাঝে লক্ষ করা যায়। বর্তমানে সৈয়দ আবুল হোসেন যোগাযোগ মন্ত্রী। মাঝে মাঝে এলাকার বিভিন্ন কাজ নিয়ে তার অফিসে যাই। যোগাযোগ মন্ত্রীকে সবসময় ব্যস্ত থাকতে হয়। তবু যখনই তাঁর কাছে গিয়েছি, অনেক ব্যস্ততার মাঝেও সম্মানের সাথে কাছে ডেকে নিয়েছেন, যথা মর্যাদায় স্বাগত জানিয়ে এবং সময় দিয়ে মহানুভবতার পরিচয় দিয়েছেন।
বাণিজ্য সচিব ও শিল্প সচিব হিসেবে আমি একটা কথা নির্দ্বিধায় বলতে পারি, সৈয়দ আবুল হোসেন কখনও সরকার বা অন্য কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান হতে অনৈতিক কোনো সুবিধা আদায় করেননি কিংবা অনুরূপ আদায়ের চেষ্টাও করেননি। তিনি কাউকে ঠকাননি, কেউ তাঁকে ঠকালে বিস্ময়ের সাথে ভেবেছেন- মানুষ কীভাবে প্রতারক হতে পারে! এবং এ ভেবে লজ্জা পেয়েছেন। আমার চাকুরি জীবনে আমি যত ব্যবসায়ী দেখেছি, যত মানুষ দেখেছি তন্মধ্যে সৈয়দ আবুল হোসেন সততা, মানবতা, ভদ্রতা আর নিষ্ঠা বিবেচনায় শ্রেষ্ঠ একজন।

এম মতিউর রহমান : প্রাক্তন রাষ্ট্রদূত জাপান এবং কোরিয়া; প্রাক্তন সচিব বাণিজ্য ও শিল্প মন্ত্রণালয়; প্রাক্তন সংসদ সদস্য এবং প্রাক্তন মন্ত্রী যোগাযোগ মন্ত্রণালয়, গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার

বন্ধু আমার উদার নিদাঘ আকাশ
আবুল হাসান চৌধুরী
সৃষ্টির সেরা জীব মানুষ। সৃষ্টিকর্তা মানুষকে সেরা করে সৃষ্টি করেছেন। তিনি তার সেরা সৃষ্টিকে সেরা জীবন উপভোগের জন্য অগণিত প্রাচুর্য দিয়েছেন, অনির্বাণ সৌন্দর্যে বিভূষিত করে দিয়েছেন চারিপাশ, পৃথিবীকে বৈচিত্র্যময় অবকাশের কুহুরে কুহুরে করে দিয়েছেন মুখরিত। কত নদী, কত সরোবর, আকাশ, বাতাস, তারা, পাহাড়, ফুল, ফল, মা-বাবা, বন্ধু, দেশ, জাতি, প্রতিবেশি- আরও কত কী দিয়েছেন তিনি আমাদের। সৃষ্টিকর্তা মানুষকে যত কিছু দিয়েছেন তন্মধ্যে বন্ধু নামক শব্দটিকে আমার কাছে সবচেয়ে আকর্ষণীয়, সবচেয়ে হৃদয়গ্রাহী এবং সবচেয়ে প্রশান্তির মনে হয়। এ জন্যই বন্ধুর কথা উঠলে আমার মনে পড়ে যায় জন অস্টিনের স্বতঃসিদ্ধ উক্তি- ঋৎরবহফংযরঢ় রং ঃযব ভরহবংঃ নধষস ভড়ৎ ঃযব ঢ়ধহমং ড়ভ ফবংঢ়রংবফ ষড়াব.
মানুষের জীবনে বন্ধুর চেয়ে বড় আর কিছু নেই। ফ্রান্সিস বেকন বন্ধুকে মানব-মানবীর বহুমাত্রিক সম্পর্কের মধ্যে সর্ব বিবেচনায় উৎকৃষ্ট হিসেবে বর্ণনা করেছেন। বেকন তার বিখ্যাত ফ্রেন্ডশিপ ‘বন্ধু’ নামক সম্পর্কটির শ্রেষ্ঠত্ব নিরূপণ করতে গিয়ে বলেছেন- ণড়ঁ সধু ঃধশব ংধৎুধ ঃড় ড়ঢ়বহ ঃযব ষরাবৎ, ংঃববষ ঃড় ড়ঢ়বহ ঃযব ংঢ়ষববহ, ভষড়বিৎ ড়ভ ংঁষঢ়যঁৎ ভড়ৎ ঃযব ষঁহমং, পধংঃড়ৎবধস ভড়ৎ ঃযব নৎধরহং; নঁঃ হড় ৎবপবরঢ়ঃ ড়ঢ়বহঃয ঃযব যবধৎঃ, নঁঃ ধ ঃৎঁব ভৎরবহফ; ঃড় যিড়স ুড়ঁ সধু রসঢ়ধৎঃ মৎরবভং, লড়ুং, ভবধৎং, যড়ঢ়বং, ংঁংঢ়রপরড়ঁং, পড়ঁহংবষং ধহফ যিধঃংড়বাবৎ ষরবঃয ঁঢ়ড়হ ঃযব যবধৎঃ ঃড় ড়ঢ়ঢ়ৎবংং রঃ, রহ ধ শরহফ ড়ভ পরারষ ংযৎরভঃ ড়ভ পড়হভবংংড়হ. সত্যি, পৃথিবীর সব কিছুর তুলনা আছে, সব কিছুর বিকল্প আছে কিন্তু বন্ধু ও বন্ধুত্বের কোনো তুলনা নেই। যদি তা প্রকৃত বন্ধুত্বের বিনি সুতোয় প্রস্ফুটিত করা যায়। এজন্যই ইংরেজি ঋজওঊঘউ শব্দটিকে ব্যাখ্যা করা হয়েছে এভাবে- ঋ- ভব,ি জ- ৎবষধঃরড়হ ও- রহ, ঊ- ঊধৎঃয, ঘ- হবাবৎ, উ-ফরব. এটি আসলেই দুর্লভ, সহজে পাওয়া যায় না। আর পাওয়া গেলে ভোলা যায় না।
আমার পিতা আবু সাঈদ চৌধুরী বাংলাদেশের প্রেসিডেন্ট ছিলেন। প্রেসিডেন্ট হবার আগে তিনি দেশবিদেশে বহু গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেছেন। পিতার চাকুরি সুবাধে শুধু দেশে নয়, বিদেশেও আমার অনেক সময় কেটেছে। সাধারণত মানুষ বড় পদ পেলে আত্মগর্বে এমন অন্ধ হয়ে যায় যে, নিজেকে ছাড়া আর কাউকে দেখতে পায় না। আমার পিতা এ বিষয়টাকে খুব ঘৃণার চোখে দেখতেন। তিনি বলতেন, ‘যারা আপাত দৃষ্টে আমার অধস্তন তাদের জন্যই আমার সম্মান। তাই যিনি যত ছোট তাকে তত বেশি গুরুত্ব দেয়া উচিত। কারণ, তারাই আমার সম্মানের ভিত্তি। ভবন যত বড় হোক না কেন, মাটির নিচে পুঁতে রাখা ভিতের উপর তার ঋজুতা।’ এ জন্য বাবা আমাদের এমনভাবে গড়ে তুলেছেন যাতে কোনো মানুষকে অমর্যাদা করার কোনো ইচ্ছা আমাদের মনে জাগ্রত না হয়। পরিবার, পেশা, রাজনীতি এবং উত্তরাধিকারসূত্রে অর্জিত শিক্ষার কারণে আমার পরিচিতের সংখ্যা নেহাত কম নয়। সাধারণত পরিচিত মহলের মধ্যে যারা অধিকতর ঘনিষ্ঠ তাদেরকে আমরা বন্ধু বলে থাকি। তবে প্রকৃত অর্থে তারা সবাই বন্ধু নয়। সকল ঘনিষ্ঠ জন বন্ধু নয়, তবে সব বন্ধুই ঘনিষ্ঠ। মানুষ বহু কষ্টে মানুষ, পরিচিত বহু পরীক্ষায় বন্ধু।
আমার বন্ধুদের মধ্যে সবচেয়ে প্রিয় সৈয়দ আবুল হোসেন। অবশ্য এ কথাটি আমি কখনও তাঁর সামনে প্রকাশ করিনি, অন্য কারও কাছেও এ পর্যন্ত প্রকাশ করিনি। শুধু নিজে নিজে অনুভব করে থাকি। কেন তিনি আমার প্রিয় বন্ধু? সহজ উত্তর: তিনি- ঝযধৎবং ড়ভ সু পধৎবং. অনেকে প্রশ্ন করতে পারেন, তার সাথে দীর্ঘ পরিচয় নেই, ঘনিষ্ঠতাও তেমন দেখি না, তবু কীভাবে আমার প্রিয় বন্ধু হন সৈয়দ আবুল হোসেন? তাদের জ্ঞাতার্থে জানাচ্ছি: উবঢ়ঃয ড়ভ ভৎরবহফংযরঢ় ফড়বং হড়ঃ ফবঢ়বহফ ড়হ ষবহমঃয ড়ভ ধপয়ঁধরহঃধহপব -এটি সম্পূর্ণ মনোগত এবং আচরণগত ব্যাপার। দুটো ইট হাজার বছর পাশাপাশি থাকলেও জোড়া লাগে না। দুটি মানুষ লক্ষ বছর কাছাকাছি থাকলেও বন্ধুত্ব জেগে ওঠে না; যদি-না তাদের মনোগত অনুভব পরস্পরকে ছুঁয়ে যায় ভালোবাসার তারল্যে।
১৯৮০ খ্রিস্টাব্দের প্রথমার্ধে সৈয়দ আবুল হোসেনের সাথে আমার প্রত্যক্ষ পরিচয় ঘটে। আমি তখন স্টান্ডার্ড চাটার্ড ব্যাংকের কর্পোরেট ম্যানেজার আর সৈয়দ আবুল হোসেন সাকো ইন্টারন্যাশনাল নামক একটি প্রতিষ্ঠানের প্রধান নির্বাহী। ব্যাংকের সাথে ব্যবসার সম্পর্ক যেমন তেমনি ব্যাংকারের সাথে ব্যবসায়ীর সম্পর্ক। সুতরাং উভয়ের পরিচয়টা ঘনিষ্ঠ হয়ে ওঠার সুযোগ কর্মগত কারণেও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছিল যা আমাদের দু’জনের বেলায়ও ঘটেছে। পূর্বে বলেছি ১৯৮০ খ্রিস্টাব্দে তাঁর সাথে আমার প্রত্যক্ষ পরিচয় ঘটে। তবে এর বহু পূর্বে আমি বিভিন্নভাবে বিভিন্ন ক্ষেত্রে তাঁর নাম শুনেছি। শুনতে শুনতে পরস্পর প্রত্যক্ষ পরিচয়ের অনেক আগেই সৈয়দ আবুল হোসেন নামটি আমার একটি প্রিয় নাম হয়ে ওঠে। প্রশ্ন আসতে পারে, নাম শুনে প্রিয় হবার পেছনে এমন কী কারণ ছিল? কারণ অবশ্যই ছিল। বন্ধুদের সাথে আলোচনা করতে গেলে সৈয়দ আবুল হোসেনের কথা উঠত, কথা উঠত তাঁর কাজের, নিষ্ঠার। রাজনীতি, ব্যবসা, অর্থনীতি, আদর্শ- যেটা নিয়ে আলোচনা হোক না, সৈয়দ আবুল হোসেনকে কোনোভাবে এড়ানো যেত না, কেউ তাকে বাদ দিতে পারত না। তিনি বাদ দিতে পারার মতো ছিলেন না।
১৯৭৩ খ্রিস্টাব্দ হতে দীর্ঘ অনেক বছর আমি লন্ডনে ছিলাম। ১৯৮০ খ্রিস্টাব্দে লন্ডনে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ, ইউরোপ শাখার সেক্রেটারি নির্বাচিত হই। জননেত্রী শেখ হাসিনার উপস্থিতি ও সভাপতিত্বে এ গুরু দায়িত্ব পেয়েছিলাম। সেক্রেটারি থাকাকালীন সৈয়দ আবুল হোসেনের নাম আরও বেশি বেশি শুনতে পাই। খবর নিয়ে জানতে পারি, তিনি আওয়ামী লীগ করেন না। তবু দলের সবার মুখে তাঁর নাম এ বিষয়টি আমাকে তাঁর প্রতি আগ্রহী করে তোলে। তাঁকে ভালোভাবে জানার ও দেখার আগ্রহে উদগ্রীব হয়ে উঠি। পরবর্তীকালে যেটি জানতে পারলাম তা আমাকে বিস্ময় ও আনন্দে হতবাক করে দেয়। পঁচাত্তরের পট পরিবর্তনের পর আওয়ামী লীগের দুঃসময়ে সৈয়দ আবুল হোসেন নামের যুবকটি উদার হস্তে এগিয়ে এসেছেন। আওয়ামী লীগের জন্য যখন যেখানে যা প্রয়োজন স্বতঃস্ফূর্ত আন্তরিকতায় দিয়েছেন। দল না-করেও দলের প্রতি এমন দরদি উদারতা ছিল আমার কাছে অকল্পনীয়, অবিশ্বাস্য। ১৯৯১ খ্রিস্টাব্দের পূর্বে তিনি রাজনীতির সাথে যুক্ত ছিলেন না। তবু দলের জন্য অসীম ত্যাগ সংগতকারণে তাঁকে আলোচনার মূল বিন্দুতে নিয়ে আসে।
সৈয়দ আবুল হোসেন মুক্তিযোদ্ধা। বঙ্গবন্ধুর ডাকে জীবন বাজি রেখে যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছেন। প্রত্যক্ষ রাজনীতি না-করা সত্ত্বেও কেবল বঙ্গবন্ধুর অনুসারী হিসেবে দৃঢ় প্রত্যয়, গভীর শ্রদ্ধা ও নিঃস্বার্থ ভালোবাসার তুলনাহীন ঔদার্যে আওয়ামী লীগকে সাহায্য করে গেছেন। বঙ্গবন্ধুর প্রতি তাঁর শ্রদ্ধা এবং আওয়ামী লীগের প্রতি ভালোবাসা আমাকে সৈয়দ আবুল হোসেনের প্রতি অনুরক্ত করে তোলে। উভয়ের আদর্শিক সমতা, পরস্পরকে কাছে আসার; পরবর্তীকালে ঘনিষ্ঠ হবার সকল শর্ত পূরণ করে। ঘনিষ্ঠ হবার পর দেখতে পাই- ঐব রং ধ ঢ়ধৎঃ ড়ভ সরহব, ফলে নিজের অজান্তে আমার মন তাকে বন্ধু হিসেবে বরণ করে নেয়। তিনি একজন সুখী মানুষ; ডযড়বাবৎ রং যধঢ়ঢ়ু রিষষ সধশব ড়ঃযবৎং যধঢ়ঢ়ু, এ লোভটা ছাড়তে না-পেরে আমি স্বতঃস্ফূর্তভাবে তাঁর বন্ধু হয়ে যাই। তার কাছে গেলে মনটা আপনা-আপনি বড় হয়ে ওঠে প্রশান্তির ঢেউয়ে।
আমার অনেক পরে সৈয়দ আবুল হোসেন রাজনীতিতে সক্রিয় হয়েছেন। তবু আমার বহু পূর্ব হতে তিনি আওয়ামী অঙ্গনের একনিষ্ঠ শুভাকাক্সক্ষী ও নিঃস্বার্থ দাতা হিসেবে খ্যাত হয়ে উঠেছিলেন। কোনোরূপ ক্ষমতা বা পদের লোভ না-করে জাতির জনকের প্রতি পিতৃশ্রদ্ধায় আবদ্ধ হয়ে আওয়ামী লীগকে দুঃসময়ে যেরূপ উদারতায় সাহায্য-সহযোগিতা করেছেন, তা কৃতজ্ঞতার সাথে সবার মণিকোঠায় স্মরণীয় হয়ে থাকবে। এখানে আর একটা বিষয় বিশেষভাবে উল্লেখের দাবি রাখে, সেটি হচ্ছে- তিনি যখন আওয়ামী লীগকে উদারভাবে সাহায্য করে যাচ্ছিলেন তখন আওয়ামী লীগের ক্ষমতায় আসার কোনো সম্ভাবনা ছিল না। এরূপ কেউ ভাবতেও পারতেন না। সৈয়দ আবুল হোসেনের মতো বিশাল মনের লোকদের ভালোবাসায় আওয়ামী লীগ আস্তে আস্তে দুঃসময় কাটিয়ে এ অবস্থানে আসতে সক্ষম হয়েছে। এ জন্য জননেত্রী শেখ হাসিনাসহ দলের প্রবীণ নেতাগণ সৈয়দ আবুল হোসেনকে অত্যন্ত স্নেহের চোখে দেখতেন।
‘৯০-এর গণ-অভ্যুত্থানের পূর্বে আমি স্ট্যান্ডার্ড চাটার্ড ব্যাংকের চাকুরি ছেড়ে দিয়ে পুরোপুরি রাজনীতিতে সক্রিয় হই। বাংলাদেশের রাজনীতিতে নতুন হলেও ইউরোপের রাজনীতি এবং আমার পিতার পরিচিতি আমাকে কিছুটা হলেও অনুকূল পরিবেশ দিয়েছিল। সৈয়দ আবুল হোসেনের এমন কোনো গার্ডিয়ান ছিলেন না যিনি তাকে রাজনীতিক অঙ্গনে তুলে ধরতে পারেন। তবে তিনিও গার্ডিয়ান-মুখাপেক্ষি ছিলেন না। নিজেই নিজেকে প্রতিষ্ঠার জন্য যথেষ্ট ছিলেন। তাঁর আত্মশক্তি এত প্রবল ছিল যে সবাই তাঁর সহায়ক গার্ডিয়ান হয়ে যেতে বাধ্য হতেন। তিনি সবাইকে গুরুত্ব দিতেন এবং এমন ব্যবহার করতেন, যা হতে আমরা শেখতাম- ডব সঁংঃ ষবধৎহ ড়ঁৎ ষরসরঃং. ডব ধৎব ধষষ ংড়সবঃযরহম, নঁঃ হড়হব ড়ভ ঁং ধৎব বাবৎুঃযরহম.
প্রত্যন্ত ডাসার গ্রামের মধ্যবিত্ত পরিবার হতে এসে কোনোরূপ আত্মীয়-স্বজনের প্রণোদনা ব্যতীত সৈয়দ আবুল হোসেন নিজেকে ধ্র“ব তারার মতো উজ্জ্বল মহিমায় প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হয়েছেন। এটি চাট্টিখানি কথা নয়। আমার পিতা প্রেসিডেন্ট ছিলেন, তাঁর পিতা ছিলেন গ্রামের একজন সাধারণ মানুষ। তখনকার আওয়ামী লীগে নতুনের এত জয়গান ছিল না এবং প্রবীণেরাই ছিল মুখ্য নিয়ামক। নেত্রী প্রবীণদেরই বেশি গুরুত্ব দিতেন। তবু কেন জানি ১৯৯১ খ্রিস্টাব্দের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ সভানেত্রী মহীয়সী শেখ হাসিনা আমাকে মনোনয়ন দেন। একই সাথে সৈয়দ আবুল হোসেনও মনোনয়ন পান। শুনেছি সৈয়দ আবুল হোসেন মনোনয়ন নিতে চাননি। এলাকার লোকজন তাঁকে এক প্রকার বাধ্য করে রাজি করিয়েছেন। নির্বাচনে রাজি করানোর জন্য এলাকাবাসীকে অনশন পর্যন্ত করতে হয়েছে। জননেত্রী শেখ হাসিনা অনুরোধ না-করলে তিনি নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতেন কিনা সন্দেহ। মনোনয়ন পাবার পর আমাদের দু’জনের ঘনিষ্ঠতা আরও গভীর হয়। ১৯৯৬ খ্রিস্টাব্দের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ সংখ্