বিএনপি-জামায়াত জোট আমলে বাংলাদেশ সন্ত্রাসীদের স্বর্গরাজ্য ছিল : বিশ্বব্যাংকের সংস্কার দাবি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার

অনলাইন ডেস্ক : প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা জাতিসংঘ, বিশ্বব্যাংক, আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল ও অন্য দাতা সংস্থাগুলোর সংস্কারের দাবি পুনর্ব্যক্ত করেছেন। নিউইয়র্কে জাতিসংঘের ৬৭তম সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে গতকাল বৃহস্পতিবার দেওয়া ভাষণে প্রধানমন্ত্রী এই সংস্কারের কথা বলেন। সাধারণ পরিষদে দেওয়া ভাষণে শেখ হাসিনা বলেন, ২০০১ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশ সন্ত্রাসীদের স্বর্গরাজ্যে পরিণত হয়েছিল। তখন বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের প্রত্যক্ষ মদদে আন্তর্জাতিকভাবে নিষিদ্ধ জেএমবি, হরকাতুল জিহাদ, হিযবুত তাহরীর, লস্কর-ই-তৈয়বাসহ বিভিন্ন সন্ত্রাসী গোষ্ঠী প্রায় প্রতিদিনই বোমা ও গ্রেনেড হামলা চালাত। এসব হামলার প্রধান লক্ষ্য ছিল দেশ থেকে অসাম্প্রদায়িক ও প্রগতিশীল রাজনৈতিক দল ও তাদের নেতা-কর্মীদের নিশ্চিহ্ন করা। প্রধানমন্ত্রী আরও বলেন, ‘আমিও ২০০৪ সালের ২১ আগস্ট সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর এক ভয়াবহ গ্রেনেড আক্রমণের শিকার হই। তখন আমি ব্রিটিশ হাইকমিশনারের ওপর গ্রেনেড হামলার প্রতিবাদে আয়োজিত জনসভায় ভাষণ দিচ্ছিলাম। এতে ২৪ জন নেতা-কর্মী প্রাণ হারিয়েছেন। প্রায় ৫০০ জন আহত হয়েছেন। আমি অলৌকিভাবে বেঁচে যাই।’ তিনি বলেন, ‘এসব ন্যক্কারজনক সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড থেকে দেশকে রক্ষার লক্ষ্যে আমরা সন্ত্রাস ও সকল প্রকার চরমপন্থার বিরুদ্ধে “জিরো টলারেন্স” নীতি গ্রহণ করেছি।’ নিউইয়র্কে জাতিসংঘের ৬৭তম সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে দেওয়া প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার হুবহু ভাষণটি পাঠকদের জন্য তুলে দেওয়া হলো:
সম্মানিত সভাপতি, আসসালামু আলাইকুম। শুভ অপরাহ্ন। ১. জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৬৭তম অধিবেশনের সভাপতি নির্বাচিত হওয়ায় আমি আপনাকে আন্তরিক অভিনন্দন জানাচ্ছি। ইউএনজিএর ৬৬তম অধিবেশনের সভাপতি হিসেবে বলিষ্ঠ নেতৃত্বের জন্য জনাব নাসির আবদুল আজিজ আল-নাসেরকে ধন্যবাদ জানাচ্ছি। জাতিসংঘ বিগত বছরে বিভিন্ন ক্ষেত্রে সফল উদ্যোগ গ্রহণ করায় আমি মহাসচিব বান কি মুনকেও ধন্যবাদ জানাচ্ছি।
সম্মানিত সভাপতি, ২. বর্তমান বিশ্ব গণজাগরণ, আন্তঃদেশীয় সংঘর্ষ, জলবায়ু পরিবর্তনজনিত দুর্যোগ, বৈশ্বিক আর্থিক সংকট, খাদ্য ও জ্বালানি নিরাপত্তাহীনতা, মানবাধিকার লঙ্ঘন, সন্ত্রাসবাদ প্রভৃতি প্রত্যক্ষ করছে। এসব সমস্যার শান্তিপূর্ণ সমাধানে জাতিসংঘের সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। তাই আমি এবারের আলোচনার মূল প্রতিপাদ্য “শান্তিপূর্ণ উপায়ে আন্তর্জাতিক বিরোধ বা পরিস্থিতি নিষ্পত্তিকরণ”-এর প্রশংসা করছি।
৩. এখানে আমি আমার বাবা, সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে স্মরণ করছি, যিনি আজ থেকে ৩৮ বছর আগে এ মঞ্চে দাঁড়িয়েই “সকলের প্রতি বন্ধুত্ব, কারো প্রতি বৈরিতা নয়”, “সকল বিরোধের শান্তিপূর্ণ সমাধান”, “আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে বলপ্রয়োগের অবসান” এবং “বিশ্ব শান্তি ও নিরাপত্তা রক্ষায় অবদান”-এর ঘোষণা দিয়েছিলেন। তাঁর এই নীতি দেশে-বিদেশে মূলতঃ ন্যায়বিচার ও শান্তির ওপর প্রতিষ্ঠিত ছিল, যা আমাকে ১৯৯৭ সালে, প্রধানমন্ত্রী হিসেবে আমার প্রথম মেয়াদে, পার্বত্য চট্টগ্রাম শান্তি চুক্তি সম্পাদনে অনুপ্রাণিত করেছে। ফলে ২০ বছরের দ্বন্দ্ব-সংঘাতে ২০ হাজার প্রাণবধের অবসান হয়েছে। বঙ্গবন্ধুর এ নীতিই আমাকে ২০০৯ সালের ফেব্রুয়ারীতে বর্ডার গার্ড বিদ্রোহ সংকটের শান্তিপূর্ণ সমাধান করতে প্রেরণা যুগিয়েছে।
৪. আমরা বৈদেশিক সম্পর্ক উন্নয়নকে গুরুত্ব দেই। তাই ১৯৯৬ সালে ভারতের সাথে গঙ্গা পানি বণ্টন চুক্তি সম্পাদনের মাধ্যমে ২৫ বছরের পুরোনো সমস্যার সমাধান করেছি। ১৯৭৪ সালে সম্পাদিত স্থল সীমানা চুক্তির আওতায় ২০১১ সালে প্রটোকল স্বাক্ষরের মাধ্যমে ৬৪ বছর ধরে অনিষ্পন্ন ইস্যুর নিষ্পত্তি করেছি। একটি যৌথ নদীর ওপর ভারতের প্রস্তাবিত ড্যাম নির্মাণের বিষয়ে পারস্পরিক উদ্বেগ বিবেচনায় নেয়া হয়েছে। আমাদের অপর প্রতিবেশী মিয়ানমারের সাথে “ইটলস”-এর মাধ্যমে ৪১ বছরের পুরোনো সমুদ্রসীমা বিরোধের শান্তিপূর্ণ মীমাংসা করেছি।
৫. শান্তির প্রতি আমাদের জাতীয় ও আন্তর্জাতিক অঙ্গীকারের আরেকটি প্রমাণ হচ্ছে, জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে আমরা অন্যতম সর্বাধিক শান্তিরক্ষী প্রেরণকারী দেশ। বাংলাদেশ জাতিসংঘ শান্তি স্থাপন কমিশনেরও প্রতিষ্ঠাতা সদস্য। কমিশনের বর্তমান চেয়ারম্যান হিসেবে আমরা গত ২৫ সেপ্টেম্বর “শান্তিস্থাপন: টেকসই শান্তি ও নিরাপত্তার চাবিকাঠি” শীর্ষক একটি সভা করেছি। আপনাদের অনেকেই এতে অংশগ্রহণ করেছেন। মানবাধিকার কাউন্সিল ও “ইকোসোক” এর সদস্য হিসেবে আমরা ন্যায়বিচার, শান্তি, গণতন্ত্র, লিঙ্গসমতা, ধর্মনিরপেক্ষতা, আইনের শাসন, সংখ্যালঘু ও অসহায় মানুষের অধিকারকে প্রাধান্য দেই। ইউএনডিপি, ইউএনএফপিএ, ইউএনওপিএস, ইউনেস্কো, এফএও, আইএমও ও ইউপিইউ’র সদস্য হিসেবে বিশ্ব রীতি-নীতি ও মান নিরূপণকে সমর্থন করি।
৬. চার দশকের জনকল্যাণমূলক রাজনীতির মাধ্যমে আমি জেনেছি যে ন্যায়বিচার বিরাজ করলেই শান্তি স্থাপিত হয়। এটা দেশের অভ্যন্তরে এবং এক রাষ্ট্রের সাথে অপর রাষ্ট্রের সম্পর্কের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। একমাত্র ন্যায়বিচারই শান্তি নিশ্চিত করে, যা উন্নয়নের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। গণতন্ত্রের মাধ্যমে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা সম্ভব যা জনগণকে ক্ষমতাশালী করে। গণতন্ত্রের পর্যায়ক্রমিক অনুপস্থিতির অর্থ হচ্ছে সামাজিক অবিচার, দারিদ্র্য, বৈষম্য, বঞ্চনা এবং অসহায়ত্ব। এটি চরমপন্থা ও সন্ত্রাসবাদের জন্ম দেয়। আমরা তাই সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনী, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, সকলকে নিয়ে এগিয়ে যাওয়া, টেকসই প্রবৃদ্ধি, মানবসম্পদ উন্নয়ন ও সন্ত্রাস দমন করছি। ফলে ক্ষুধা, দারিদ্র্য, বৈষম্য ও বঞ্চনা দূরীভূত হচ্ছে। জনগণের ক্ষমতায়ন হচ্ছে। গণতন্ত্র ও ন্যায়বিচার সুদৃঢ় হচ্ছে।
৭. এ অনন্য সাফল্য আমাকে ইউএনজিএ’র ৬৬তম অধিবেশনে “জনগণের ক্ষমতায়ন ও উন্নয়ন” মডেল উপস্থাপন করতে উত্সাহিত করেছে। ৬টি পরস্পর ক্রিয়াশীল বিষয় এই মডেলে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। বিষয়গুলো হচ্ছে, (১) ক্ষুধা ও দারিদ্র্য নির্মূল, (২) বৈষম্য হ্রাস, (৩) বঞ্চনা লাঘব, (৪) কর্মযজ্ঞে সকলকে সম্পৃক্তকরণ, (৫) মানবসম্পদ উন্নয়ন ত্বরান্বিতকরণ এবং (৬) সন্ত্রাস নির্মূল। আমাদের এ প্রস্তাব গত বছর ইউএনজিএ’র ৬৬/২২৪ নম্বর সিদ্ধান্ত হিসেবে সর্বসম্মতিক্রমে গৃহীত হয়েছে। মডেলটি নিয়ে আলোচনার লক্ষ্যে আমরা এ বছরের ৫ ও ৬ আগস্ট ঢাকায় একটি আন্তর্জাতিক সম্মেলন করেছি। সম্মেলনে অংশগ্রহণকারী ৬২টি দেশ ইউএনজিএ’র ৬৭তম অধিবেশনে মডেলটি বিবেচনার জন্য সমর্থন দিয়েছে। এই সকল দেশকে আমি আন্তরিক ধন্যবাদ জানাচ্ছি। মডেলটির ব্যাপক প্রচারণার জন্য আমি আপনাদের সমর্থন কামনা করি।
৮. জনগণের ক্ষমতায়নে আমাদের নানামুখী উদ্যোগের অংশ হিসেবে ২০০৮ সালের সাধারণ নির্বাচন পরবর্তী জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনেই সবগুলো সংসদীয় স্থায়ী কমিটি গঠন করা হয়। বর্তমানে কমিটির সংখ্যা ৫০টি। যার অনেকগুলোতে বিরোধী দলের এমপিদের সভাপতি নির্বাচিত করা হয়। আমরা জাতীয় সংসদে “প্রধানমন্ত্রীর প্রশ্নোত্তর” পর্ব চালু করেছি। নির্বাচন কমিশন, দুর্নীতি দমন কমিশন ও মানবাধিকার কমিশন শক্তিশালী করেছি। তথ্য কমিশন গঠন করেছি। স্বাধীন ও কার্যকর বিচারব্যবস্থা এবং আইনের শাসন নিশ্চিত করেছি। জনগণের ক্ষমতায়নের লক্ষ্যে মানবাধিকার, জবাবদিহিতা, ধর্মনিরপেক্ষতা ও সংখ্যালঘুদের অধিকার প্রতিষ্ঠা এবং আঞ্চলিক মাল্টি-মোডাল সংযোগ নিয়ে অগ্রসর হয়েছি। আমরা মাদরাসা শিক্ষাকে আধুনিকীকরণ করেছি। নির্বাচন কমিশন এবং গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলো শক্তিশালী হওয়ায় এ পর্যন্ত অনুষ্ঠিত ৫ হাজার ১৮২টি নির্বাচনই সম্পূর্ণ অবাধ ও বিশ্বাসযোগ্য হয়েছে। মিডিয়া এখন সম্পূর্ণ স্বাধীন। দেশে বর্তমানে ২৪টি টিভি চ্যানেল, ৭টি বার্তা সংস্থা, ১১টি এফএম ও ১৪টি কম্যুনিটি রেডিও স্টেশন চালু আছে। ৩২০টি দৈনিক ও ১৫১টি সাপ্তাহিক পত্রিকা প্রকাশিত হচ্ছে।
৯. শান্তি ও উন্নয়নের লক্ষ্যে জনগণের ক্ষমতায়ন অপরিহার্য্য। ন্যায়বিচার হচ্ছে এর ভিত্তি। তাই সর্বক্ষেত্রে নারীর সমান ভূমিকা থাকা উচিত। নারীর ক্ষমতায়নকে বেগবান করার লক্ষ্যে নতুন শিক্ষানীতির আওতায় মেয়ে শিক্ষার্থীদের উচ্চ মাধ্যমিক পর্যায় পর্যন্ত শিক্ষাকে অবৈতনিক করা হয়েছে। আমাদের জাতীয় জীবনেও নারীর সক্রিয় অংশগ্রহণকে উত্সাহিত করা হচ্ছে। তৃণমূল পর্যায় থেকে জাতীয় পর্যায় পর্যন্ত নারী নেতৃত্ব গড়ে তোলা হয়েছে। ২০০৮ সালের সাধারণ নির্বাচনের পর রাজনীতিতে নারীর অংশগ্রহণ বেড়েছে। স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোর সংরক্ষিত আসনে ১২ হাজার ৮৩৮ জন নারী নির্বাচিত হয়েছেন। জাতীয় সংসদে ৬৯ জন সদস্য নারী। যা মোট সংসদ সদস্যের প্রায় ২০ শতাংশ। আমি নিজে প্রধানমন্ত্রী ও সংসদ নেতা, বিরোধী দলীয় নেতা, সংসদ উপনেতা, পাঁচজন মন্ত্রী ও একজন হুইপ নারী। সরকারী চাকুরীর ৩০ শতাংশ পদ নারীর জন্য সংরক্ষিত। বেশকিছু নারী কর্মকর্তা বিচার বিভাগ, প্রশাসন, কূটনীতিক পর্যায়ে উচ্চ পদে নিয়োজিত আছেন। সামরিক বাহিনী, আইন প্রয়োগকারী সংস্থা এবং জাতিসংঘ শান্তিরক্ষী হিসেবেও নারীরা সাফল্যের সঙ্গে দায়িত্ব পালন করছেন।
১০. বর্তমান সরকারের মেয়াদে জনগণের ক্ষমতায়নে গৃহীত পদক্ষেপের ফলে দারিদ্র্য ১০ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে। জিডিপি প্রবৃদ্ধি হার ৬ দশমিক ৫ শতাংশ অর্জিত হয়েছে। মাথাপিছু আয় ৩৪ দশমিক ৬ শতাংশ বেড়েছে। সার্বিক মূল্যস্ফীতি দুই অঙ্ক থেকে কমে ৪ দশমিক ৯৭ শতাংশে পৌঁছেছে। খাদ্যপণ্যের মূল্যস্ফীতি ২ দশমিক ২৫ শতাংশে নেমে এসেছে। যা ২০০৮-এ ছিল প্রায় ১৩ শতাংশ। সরকারী খাতে ৫ লাখ এবং বেসরকারী খাতে ৭৫ লাখ কর্মসংস্থান হয়েছে। রপ্তানি প্রবৃৃদ্ধি হার ১৯ শতাংশ। ২০০৮-০৯ অর্থবছরে রফতানি আয় ১ হাজার ৫৫৬ কোটি ডলার থেকে ২০১১-১২ অর্থবছরে ২ হাজার ৪৩০ কোটি ডলারে উন্নীত হয়েছে। ১৮ লাখ ৭০ হাজার মানুষের বৈদেশিক কর্মসংস্থান হয়েছে। প্রতি বছর ১০ শতাংশ হারে রেমিটেন্স বেড়েছে। গত অর্থবছরে প্রায় ১২শ’ কোটি ডলার রেমিটেন্স এসেছে। সামষ্টিক অর্থনীতি স্থিতিশীল রয়েছে। গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর দোরগোড়ায় ই-সেবা পৌঁছে দেয়ার লক্ষ্যে তথ্যপ্রযুক্তি সুবিধা তৃণমূল পর্যায় পর্যন্ত সমপ্রসারণ করা হয়েছে। প্রায় শতভাগ শিশুর স্কুলে ভর্তি নিশ্চিত করা হয়েছে। প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষায় লিঙ্গসমতা অর্জিত হয়েছে। গ্রামীণ জনগোষ্ঠী বিশেষ করে নারী ও শিশুর পুষ্টি ও স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিতের লক্ষ্যে পল্লী এলাকায় ১২ হাজার কম্যুনিটি ক্লিনিক চালু করা হয়েছে। জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি মোকাবেলা ও অভিযোজনের লক্ষ্যে “ক্লাইমেট চেঞ্জ ট্রাস্ট ফান্ড” গঠন করা হয়েছে। আমাদের এসব উদ্যোগের ফলে ২০১৫ সালের আগেই লিঙ্গসমতা ও নারীর ক্ষমতায়ন বিষয়ক এমডিজি-৩, শিশু ও মাতৃমৃত্যু হ্রাস সংক্রান্ত এমডিজি-৪ ও এমডিজি-৫ অর্জন সম্ভব হয়েছে।
১১. এ সাফল্যের জন্য আমরা এমডিজি পদক, সাউথ-সাউথ পদক ও এফএও এওয়ার্ড পেয়েছি। যা আমাদের অর্জনে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি এনে দিয়েছে। পাশাপাশি জাতিসংঘের মহাসচিব বান কি-মুন পুষ্টি আন্দোলনকে এগিয়ে নেয়ার লক্ষ্যে আমাকে লিড গ্রুপের একজন সদস্য এবং “এডুকেশন ফার্স্ট ইনিসিয়েটিভ” এর চ্যাম্পিয়ান হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করেছেন। এমডিজি-পরবর্তী ডিভালাপমেন্ট এজেন্ডার ওপর তাঁর “হাই লেভেল প্যানেল” গঠনকে আমরা স্বাগত জানাই। এসব এজেন্ডা এসডিজি’র সাথে সঙ্গতিপূর্ণ হবে বলে আশা করি। যার মাধ্যমে ক্ষুধা, দারিদ্র্য, পুষ্টি, বিশ্ব খাদ্য ও জ্বালানি নিরাপত্তা, জলবায়ু পরিবর্তন এবং বিশ্বব্যাপী টেকসই উন্নয়নে আন্তর্জাতিক অংশীদারিত্ব অগ্রাধিকার পাবে।
১২. আমি আশা করি, “হাই লেভেল প্যানেল” অটিস্টিক ও সুবিধাবঞ্চিত শিশু যারা বিশ্বের মোট জনসংখ্যার এক শতাংশ, তাদের বেদনাদায়ক দুর্দশা লাঘবে একটি অবস্থানপত্র প্রণয়ন করবেন। আমরা দেশে ৫৫টি বিশেষ সহায়ক স্কুল ও একটি নিউরোডেভেলপমেন্ট সেন্টার চালু করেছি। আমরা ২০১১ সালের জুলাইয়ে ডব্লিউএইচও ও অটিজম স্পিকস এর সহযোগিতায় গ্লোবাল পাবলিক হেলথ ইনিসিয়েটিভ চালু করেছি। ইউএনজিএ’র চলতি অধিবেশনে আমরা “অটিজম স্পেক্ট্রাম ডিসঅর্ডার” বিষয়ক একটি প্রস্তাব উত্থাপন করব। আমি আশা করি, এ প্রস্তাব গ্রহণে আপনাদের সমর্থন পাব।
১৩. জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে আমাদের উন্নয়ন উদ্যোগগুলো বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। এর ফলে দারিদ্র্য, সম্পদহানি ও মানব স্থানচ্যুতি হচ্ছে। যা সন্ত্রাসবাদকে উস্কে দিচ্ছে। সমুদ্রস্তরের উচ্চতা বৃদ্ধির ফলে স্থানচ্যুত অভিবাসীরা গণআন্দোলন সৃষ্টি করতে পারে। এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় একটি নতুন আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা উচিত—যা জলবায়ু অভিবাসীদের সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও অর্থনৈতিক পুনর্বাসন নিশ্চিত করবে। এ বিষয়টি আমি ইউএনজিএ’র ৬৪তম অধিবেশনে উত্থাপন করেছিলাম। গত বছর ঢাকায় অনুষ্ঠিত জলবায়ু পরিবর্তন ও সমুদ্রস্তরের উচ্চতা বৃদ্ধির কারণে মারাত্মক ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর জোট “ক্লাইমেট ভালনারেবল ফোরাম”-এর বৈঠকেও এ ব্যাপারে গুরুত্ব আরোপ করা হয়। বাংলাদেশ গতকাল নিউইয়র্কে ক্লাইমেট ভালনারেবিলিটি মনিটরের দ্বিতীয় বৈঠক করেছে। সাধারণ ও বিশেষ দায়িত্ব পালনের ওপর গুরুত্ব আরোপ করে গ্রীনহাউজ গ্যাস নির্গমন নিয়ন্ত্রণে একটি আন্তর্জাতিক চুক্তি সম্পাদনের আহ্বান পুনর্ব্যক্ত করছি। পাশাপাশি জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি মোকাবিলা ও অভিযোজন, প্রযুক্তি হস্তান্তর ইত্যাদি কর্মকাণ্ডের জন্য “গ্রীন ক্লাইমেট ফান্ড” এর দ্রুত বাস্তবায়নের আহ্বান জানাই।
১৪. বিশ্ব খাদ্য ও জ্বালানি নিরাপত্তা জলবায়ু পরিবর্তনের সাথে নিবিড়ভাবে সম্পর্কিত। জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে খাদ্য ও জ্বালানির মূল্য বৃদ্ধি ব্যাপক অশান্তির সৃষ্টি করতে পারে। যা স্বল্পোন্নত দেশগুলোর ওপর মারাত্মক নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। তাই দেশগুলোর আর্থ-সামাজিক নিরাপত্তায় আরো বেশি আন্তর্জাতিক সহায়তা প্রয়োজন। এ ক্ষেত্রে উন্নত ও উন্নয়নশীল বিশ্বের বাজারে এলডিসি পণ্যের শুল্কমুক্ত প্রবেশাধিকার এবং ওডিএ প্রতিশ্রুতি পূরণ অত্যাবশ্যক। ব্রেটন উডস্ ইনস্টিটিউশনস ও আন্তর্জাতিক আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোতে সমঅধিকার প্রতিষ্ঠা এবং সব দেশে শ্রমিকের অবাধ চলাচল নিশ্চিতের বিষয়গুলোও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। শ্রমিক প্রেরণকারী ও গ্রহণকারী দেশগুলোর সুবিধা নিশ্চিতে “জিএটিএস” এর মুড-ফোর আশু বাস্তবায়ন প্রয়োজন। নিরাপদ অভিবাসন এবং নারীসহ অভিবাসী কর্মজীবীদের অধিকার সংরক্ষণে অভিবাসী প্রেরণকারী ও গ্রহণকারী দেশগুলোর যৌথ দায়িত্ব ডব্লিউটিও নীতির অংশ করা উচিত।
সম্মানিত সভাপতি, ১৫. ফিলিস্তিন জনগণের ওপর ইসরাইলের নগ্ন অবিচার, হত্যা, নির্যাতন ও অবমাননা মানব ইতিহাসে এক লজ্জাজনক অধ্যায়। এসব অবিচার ফিলিস্তিন ও অন্যান্য স্থানে গভীর হতাশার সৃষ্টি করে। যা সন্ত্রাসবাদকে উস্কে দেয়। ন্যায়বিচার ও গণতান্ত্রিক অধিকার প্রতিষ্ঠা করার মাধ্যমে ফিলিস্তিন সমস্যা ও একই ধরনের জ্বলন্ত ইস্যুগুলোর আশু সমাধান অত্যন্ত জরুরী।
১৬. বাংলাদেশও ২০০১ থেকে ২০০৬ পর্যন্ত সন্ত্রাসীদের স্বর্গরাজ্যে পরিণত হয়েছিল। তখন বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের প্রত্যক্ষ মদদে আন্তর্জাতিকভাবে নিষিদ্ধ জেএমবি, হরকাতুল জিহাদ, হিজবুত তাহরির, লস্কর-ই-তৈয়বাসহ বিভিন্ন সন্ত্রাসী গোষ্ঠী প্রায় প্রতিদিনই বোমা ও গ্রেনেড হামলা চালাতো। এসব হামলার প্রধান লক্ষ্য ছিল, দেশ থেকে অসাম্প্রদায়িক ও প্রগতিশীল রাজনৈতিক দল ও তাদের নেতাকর্মীদের নিশ্চিহ্ন করা। এসব সন্ত্রাসী হামলার মধ্যে আছে, ২০০২ সালের ৫ ডিসেম্বর ময়মনসিংহের চারটি সিনেমা হলে বোমা হামলায় ১৯ জন নিহত। ২০০৪ সালের ২১ মে ব্রিটিশ হাইকমিশনারের ওপর গ্রেনেড হামলা। ২০০৫ সালের ১৭ আগস্ট আধা ঘণ্টায় দেশের ৬৪টি জেলার মধ্যে ৬৩টি জেলার পাঁচশ’ স্থানে বোমা বিস্ফোরণ। গ্রেনেড ও আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহার করে আমাদের প্রাক্তন অর্থমন্ত্রী ও এসকাপের প্রাক্তন নির্বাহী পরিচালক এসএএমএস কিবরিয়া এমপি, শ্রমিক নেতা আহসানউল্লাহ মাস্টার এমপি, মমতাজউদ্দিন এমপি এবং কোর্ট চত্ত্বরে দুইজন জনপ্রিয় বিচারক হত্যা।
১৭. আমিও ২০০৪ সালের ২১ আগস্ট সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর এক ভয়াবহ গ্রেনেড আক্রমণের শিকার হই। তখন আমি ব্রিটিশ হাইকমিশনারের ওপর গ্রেনেড হামলার প্রতিবাদে আয়োজিত জনসভায় ভাষণ দিচ্ছিলাম। এতে ২৪ জন নেতা-কর্মী প্রাণ হারিয়েছেন। প্রায় ৫০০ জন আহত হয়েছেন। আমি অলৌকিভাবে বেঁচে যাই। বাঙালি জাতি ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট একটি ভিন্নধর্মী সন্ত্রাসী হামলার শিকার হয়। সেদিন কিছু বিপথগামী সেনাসদস্য আমার বাবা, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এবং আমাদের পরিবারের ১৮ জন সদস্যকে নৃশংসভাবে হত্যা করে। রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা দখল করাই ছিল হত্যাকারীদের উদ্দেশ্য। বাংলাদেশের ইতিহাসের সবচেয়ে কলঙ্কময় এ দিনে আমার ছোট বোন শেখ রেহানা ও আমি বিদেশে ছিলাম। ফলে প্রাণে বেঁচে যাই। এসব ন্যাক্কারজনক সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড থেকে দেশকে রক্ষার লক্ষ্যে আমরা সন্ত্রাস ও সকল প্রকার চরমপন্থার বিরুদ্ধে “জিরো টলারেন্স” নীতি গ্রহণ করেছি।
সম্মানিত সভাপতি, ১৮. আমি জাতিসংঘের অধিকাংশ সদস্য রাষ্ট্রের সাথে একাত্মতা প্রকাশ করে জাতিসংঘ, ব্রেটন উডস ইনস্টিটিউশনস ও অন্যান্য বহুজাতিক আর্থিক প্রতিষ্ঠান সংস্কারের বিষয়ে পুনরায় গুরুত্ব আরোপ করছি। এসব প্রতিষ্ঠানের কাঠামো ও সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়া ৬০ বছরের পুরোনো ক্ষমতার সমীকরণের প্রতিফলন। যেখানে অধিকাংশ দেশের স্বার্থ উপেক্ষিত থাকে এবং কয়েকটি বিশেষ সুবিধাপ্রাপ্ত দেশের স্বার্থ রক্ষা হয়। নতুন সহস্রাব্দে বেশকিছু স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্র এবং বিশ্বায়ন একটি পরিবর্তিত বিশ্ব ব্যবস্থা গড়ার সুযোগ এনে দিয়েছে। আজ আমরা ন্যায়বিচার, সমতা, গণতন্ত্র, স্বাধীনতা, মানবাধিকার, পরিবেশ ও জলবায়ু পরিবর্তনের নেতিবাচক প্রভাবের কথা দৃঢ়তার সঙ্গে বলতে পারছি। এ সবই আমাদের অগ্রাধিকার। অতীতের অপ্রীতিকর অভিজ্ঞতা ভুলে সবার এখন সেই লক্ষ্যে কাজ করা উচিত। নতুন বিশ্ব ব্যবস্থা অবশ্যই ন্যায়বিচার, পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ এবং সার্বভৌম সমতার ভিত্তিতে হতে হবে। যার মাধ্যমে শান্তিময় বিশ্ব গড়ে উঠবে। ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য সেটিই হবে আমাদের শ্রেষ্ঠ উপহার।
সম্মানিত সভাপতি, আপনাকে আবারো ধন্যবাদ জানাচ্ছি। সবাইকে ধন্যবাদ।
খোদা হাফেজ। জয় বাংলা, জয় বঙ্গবন্ধু। বাংলাদেশ চিরজীবী হোক। জাতিসংঘ দীর্ঘজীবী হোক।
- নিউইয়র্কে আমেরিকান ট্রাভেল এজেন্ট এসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ’র ইফতার ও দোয়া মাহফিল
- নিউইয়র্কে অ্যাসাল ওজোন পার্ক চ্যাপ্টারের ইফতার ও অভিষেক
- নিউইয়র্কে বাংলাদেশ ল সোসাইটি ইউএসএ’র ইফতার মাহফিল: খারাপ কাজ থেকে দূরে থাকার আহ্বান
- BOROUGH PRESIDENT GIBSON HOSTS FOURTH ANNUAL BRONX IFTAR DINNER DIALOGUE UNDER THE THEME “UNITY IN DIVERSITY”
- নিউইয়র্কে মানসিক সংকটে থাকা যুবককে গুলি: পুলিশ প্রশিক্ষণ এবং মানসিক সংকটসংক্রান্ত ৯১১ কল
- নিউইয়র্কে গ্রী ম্যাকানিকেল ইয়াঙ্কার্স এর ইফতার ও দোয়া মাহফিল
- নিউইয়র্কে যুক্তরাষ্ট্র বঙ্গমাতা পরিষদ’র ইফতার ও দোয়া মাহফিল
- নিউইয়র্কে ঢাকা জেলা অ্যাসোসিয়েশনের ইফতার ও দোয়া মাহফিল অনুষ্ঠিত








