আমেরিকার দুই শত বছরের অধিক সময়ের মধ্যে কোন নারী প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হওয়া তো দূরের কথা প্রেসিডেন্ট পদপ্রার্থীও হননি
এম এ ইউসুফ খান : আমেরিকা বিশ্বের সবচেয়ে কার্যকর গণতান্ত্রিক দেশ হিসেবে পরিচিত। বিস্ময়কর হলেও একথা সত্য যে, এই একবিংশ শতাব্দিতেও আমেরিকার জনগণ নারী নেতৃত্বের সাথে পরিচিত নয়। নারী স্বাধীনতার কথা বলা হলেও আমেরিকার দুই শত বছরের অধিক সময়ের মধ্যে কোন নারী প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হওয়া তো দূরের কথা প্রেসিডেন্ট পদপ্রার্থীও হননি। সেই অর্থে হিলারি ক্লিনটনই একমাত্র নারী যিনি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট পদে মনোনয়ন লাভে কঠিন প্রতিদ্বন্দ্বিতায় অবতীর্ণ হয়েছিলেন। ২০০৮ সালে মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ডেমোক্র্যাট পার্টি থেকে দলীয় মনোনয়ন যুদ্ধে বেশ কয়েকজন প্রতিদ্বন্দ্বী থাকলেও কৃষ্ণাঙ্গ বারাক ওবামার সঙ্গেই হিলারী ক্লিনটনকে লড়তে হয়েছিল। ঠিক তার আগে যেহেতু রিপাবলিকান দল থেকে জর্জ ডব্লিউ বুশ আট বছর ক্ষমতায় ছিলেন এবং মেয়াদের শেষ পর্যায়ে বুশ অভ্যন্তরীণ ও বহির্বিশ্বে দারুণভাবে সমালোচিত ও বিতর্কিত হয়ে জনপ্রিয়তা হারিয়েছিলেন তাই সবার মধ্যে একটি ধারণার সৃষ্টি হয়েছিল যে, ২০০৮ সালে পরবর্তী নির্বাচনে রিপাবলিকান দল আর ক্ষমতায় আসতে পারবে না, ডেমোক্র্যাট পার্টি থেকেই প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হবেন। সেক্ষেত্রে হিলারি ক্লিনটনই হয়তো আমেরিকার প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হবেন, যদি অপ্রত্যাশিতভাবে কোনকিছু না ঘটে।
মনোনয়ন প্রত্যাশীদের মধ্যে তীব্র প্রতিযোগিতা শুরু হয়ে যায়। ডেমোক্র্যাট পার্টি থেকে যুক্তরাষ্ট্রে প্রথম নারী প্রেসিডেন্ট হবার স্বপ্ন দেখেন হিলারী ক্লিনটন। হিলারী প্রথমে বিখ্যাত হয়েছিলেন আমেরিকার সাবেক প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটনের স্ত্রী হিসেবে। পরে নিজেই খ্যাতিমান হন। পরপর দু’বার তিনি নিউইয়র্কের সিনেটর নির্বাচিত হন। রাজনৈতিক কর্মী হিসেবেও ভিয়েতনাম যুদ্ধের বিরুদ্ধে প্রচারণা চালিয়ে তিনি ব্যাপক পরিচিতি লাভ করেন। আইনজীবী হিসেবেও তিনি সফল ছিলেন। প্রেসিডেন্ট পদে মনোনয়ন দৌড়ে অংশ গ্রহণ করার সময় তার রাজনৈতিক অভিজ্ঞতাকেও খাটো করে দেখার সুযোগ ছিল না। হিলারি এতটাই আত্মপ্রত্যয়ী হয়ে উঠেন যে, তিনি মনে করেন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রথম নারী প্রেসিডেন্ট হিসেবে তিনিই হোয়াইট হাউসে প্রবেশ করবেন এবং আমেরিকাকে তিনি শান্তি, সমৃদ্ধি ও অগ্রগতির পথে নিয়ে যাবেন। কিন্তু বিধি বাম ! আমেরিকার ইতিহাসে প্রথম নারী প্রেসিডেন্ট হওয়ার যে স্বপ্ন তিনি দেখেছিলেন তা স্বপ্নই থেকে গেল। মনোনয়ন দৌড়ে অংশগ্রহণ করে টানা দুই বছর অক্লান্ত পরিশ্রমের পর শেষ পর্যন্ত তাকে হার মানতে হয়। ১ কোটি ৮০ লাখ ভোটারের অকুণ্ঠ সমর্থন পেয়েও কোন কাজ হয় না। দলের শীর্ষ নেতা ও আইন প্রণেতাদের অসহযোগিতায় মনোনয়ন প্রক্রিয়া থেকে ছিটকে যান তিনি। মার্কিন পুরুষেরা একজন নারীকে তাদের নেতা হিসেবে মন থেকে গ্রহণ করতে পারেনি বলেই ২০০৮ সালে প্রেসিডেন্ট পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার লক্ষ্যে হিলারিকে শেষ পর্যন্ত মনোনয়ন না দিয়ে কৃষ্ণাঙ্গ বারাক ওবামাকে মনোনয়ন দেন।
২০০৭ সালের প্রথম দিকে যখন হিলারি নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতার ঘোষণা দেন তখন থেকেই তাকে নিয়ে বিশ্ব মিডিয়াতে শুরু হয় তোলপাড়। নির্বাচনী প্রচারণায় প্রথম দিকে হিলারি জনপ্রিয়তার দৌড়ে অনেকটা এগিয়ে ছিলেন। নারী, বৃদ্ধ ও শ্বেতাঙ্গ শ্রমিক শ্রেণীর কাছে প্রিয়পাত্র হয়ে দাঁড়ান তিনি। তাদের জনপ্রিয়তার উপর ভর করেই নিউইয়র্ক, পেনসিলভানিয়া, ফ্লোরিডা, মিশিগানের মত বড় অঙ্গরাজ্যসহ মোট ২৪টি রাজ্যে বিজয়ী হন তিনি। বিভিন্ন অঙ্গরাজ্যে তিনি তার বক্তৃতা-বিবৃতিতে বলেন-মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট পদে মনোনয়ন লাভে নারী প্রতিযোগী হিসেবে আমি গর্বিত। সবচেয়ে ভালো প্রেসিডেন্ট হওয়ার ভাবনা থেকেই আমি প্রতিযোগিতায় নেমেছি। আমি একজন মা হিসেবে প্রতিযোগিতায় নেমেছি যিনি তার কন্যার ভবিষ্যত্ রেখে যেতে চান। আমেরিকায় আর যেন নারী-পুরুষের বৈষম্য না থাকে। অর্থাত্ নারীরা যাতে সমান মজুরি ও সমান শ্রদ্ধা পায়। ভবিষ্যতে যাতে যুক্তরাষ্ট্রে অন্য নারীরাও প্রেসিডেন্ট পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার সুযোগ লাভ করেন। হিলারি এক সভায় বারাক ওবামাকে তার রানিংমেট হওয়ার প্রস্তাব দেন। কিন্তু ভাগ্যের নির্মম পরিহাস পরবর্তীতে তিনিই ওবামার পররাষ্ট্রমন্ত্রী হন। দলের মনোনয়ন না পাওয়ায় হিলারির লাখ লাখ সমর্থক দারুণভাবে মনোক্ষুণ্ন হন। অনেকেতো বলেই ফেলেন ডেমোক্র্যাট হওয়া সত্ত্বেও কৃষ্ণাঙ্গ বারাক ওবামার বদলে তারা রিপাবলিকান প্রার্থীকে ভোট দেবেন। এ ধরনের সমর্থকদের দলে ধরে রাখার জন্যই ডেমোক্র্যাট পার্টির নীতি-নির্ধারকরা হিলারির ব্যাপারে চিন্তা-ভাবনা শুরু করেন। যার ফলশ্রুতিতেই তিনি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী নিয়োজিত হন।
তবে বিশ্লেষকরা মনে করেন পুরুষ শাসিত মার্কিন সমাজ দেশের শীর্ষপদে একজন নারীর আসীন মেনে নিতে না পারলেও মনোনয়ন দৌড়ে অংশ নিয়ে হিলারি মাইল ফলক সৃষ্টি করেন। মনোনয়ন লড়াই থেকে নিজেকে প্রত্যাহার করে ওবামাকে পুর্ণ সমর্থন দেয়ার ঘোষণা দিলেও তিনি প্রেসিডেন্ট পদে প্রথম নারী মনোনয়ন প্রত্যাশী হয়ে যুক্তরাষ্ট্রে ইতিহাস সৃষ্টি করেন। ভবিষ্যতে আমেরিকার সমস্ত নারীদের জন্য হয়ে থাকবেন অনুপ্রেরণা। দেশজুড়ে সাধারণ মানুষের মাঝে তিনি যে উদ্দীপনার সৃষ্টি করতে সক্ষম হয়েছিলেন মার্কিন ইতিহাসে কোন নারী তা পারেনি। এজন্য ওবামা পর্যন্ত তার ভুয়সী প্রশংসা করেন। হিলারিকে তিনি আমেরিকার গর্বিত সন্তান ও অসাধারণ নেতা হিসেবে বর্ণনা করেন। ওবামা আরো বলেন ক্যারিয়ারে হিলারি ক্লিনটন যতটা দক্ষতা দেখাতে সক্ষম হয়েছেন আমেরিকার রাজনৈতিক দিগন্তে আর কোন নারী তা পারেনি। দেশে ও দেশের বাইরে হিলারির যতটা পরিচিতি আছে আর কোন নারী সিনেটর কিংবা ফার্স্ট লেডির তা নেই। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নারী বিদ্বেষী সমাজে পুরুষ প্রতিদ্বন্দ্বিতার সাথে প্রেসিডেন্ট পদে মনোনয়ন দৌড়ে অংশ নিয়ে হেরে গেলেও হিলারি ক্লিনটন সাধারণ মানুষের কাছে বিজয়ী হিসেবেই গণ্য হবেন।
পুরুষ শাসিত মার্কিন সমাজে নারীর ক্ষমতায়নে এত বাধা-বিপত্তি সত্ত্বেও হিলারি ক্লিনটন আমেরিকার মত শক্তিধর রাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হয়েছেন এটাও কিন্তু নেহায়েত কম প্রাপ্তি নয়। হিলারির রাজনৈতিক প্রজ্ঞা, মেধা-মননশীলতা ও দূরদর্শিতার জন্যই তাকে এই পুরস্কারে পুরস্কৃত করা হয়েছে। তিনি এখন মার্কিন পররাষ্ট্র নীতি সম্পর্কিত কূটনৈতিক ও রাজনৈতিক ইস্যুগুলো নিয়ে বিশ্বের এক দেশ থেকে আরেক দেশ সফর করছেন।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা এবং তার মন্ত্রিসভার সদস্য পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিলারি ক্লিনটন এখনো ওই দেশের অন্যতম পছন্দের ব্যক্তিদের তালিকার শীর্ষে রয়েছেন। দেশটিতে সমপ্রতি পরিচালনা করা একটি জরিপে পছন্দনীয় পুরুষ এবং নারীদের তালিকায় এই দু’জন শীর্ষস্থানে অবস্থান করছেন। এ দু’জন শুধু যুক্তরাষ্ট্রে নয়, গোটা বিশ্বজুড়েই জনপ্রিয়। তাই শীর্ষস্থানে থাকার বিষয় নিয়ে কোন সন্দেহ নেই। তারা আরও জানিয়েছেন, হিলারি বিগত ১০ বছরের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে বেশি জনপ্রিয় নারী হিসেবে বিবেচিত হয়েছেন। পছন্দের তালিকায় থাকা যুক্তরাষ্ট্রের শীর্ষ অন্য পাঁচ নারী হলেন, ওপরাহ উইনফ্রে, মিশেল ওবামা, সারাহ পলিন ও কনডোলিসা রাইস। আর পুরুষদের তালিকায় রয়েছেন-বিল ক্লিনটন, বিলি গ্রাহাম এবং ওয়ারেন বাফেট। অন্যতম পছন্দের ব্যক্তিদের তালিকায় শুধু হিলারি ক্লিনটনই নন সাবেক প্রেডিডেন্ট বিল ক্লিনটনও রয়েছেন।
বিল ক্লিনটন ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিলারি ক্লিনটন দম্পতির একমাত্র কন্যা চেলসি ক্লিনটনও কিন্তু পিছিয়ে নেই। তিনিও ধীরে ধীরে সামনের দিকে এগিয়ে যাচ্ছেন। চেলসি সমপ্রতি সাংবাদিকতা পেশায় ঢুকেছেন। তিনি “এনসিসি নিউজ” টেলিভিশনে বিশেষ প্রতিবেদক হিসেবে চুক্তিবদ্ধ হয়েছেন। সবসময় যিনি গণমাধ্যমের আড়ালে থাকতে পছন্দ করতেন তিনি এবার নিজেই গণমাধ্যমের সঙ্গে যুক্ত হলেন। সেবামূলক কাজেই তার বেশি আগ্রহ। ওই একই টেলিভিশনে প্রতিনিধি হিসেবে কর্মরত আছেন আর এক সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট জর্জ ডব্লিউ বুশের মেয়ে জেনা বুশ হ্যাগার। এছাড়া রিপাবলিকান পার্টির ম্যাক কেইনের মেয়ে মেগান ম্যাক কেইনও “এনসিসি নিউজ” টেলিভিশনে কাজ করছেন।
আমেরিকা গোটা বিশ্বের কাছে প্রকৃত গণতান্ত্রিক রাষ্ট্ররূপে স্বীকৃত। তারাই বিশ্বের একমাত্র গর্বিত মুরুব্বি এবং উপদেশদাতা। নারীদের চাকরি-বাকরি ও অন্যান্য সুযোগ-সুবিধার ক্ষেত্রে তারা অত্যন্ত উদার। নারীদের স্বাধীনতায় তারা কখনো হস্তক্ষেপ করে না। কিন্তু নারীদের একটি ব্যাপারে তারা ভিন্নমত পোষণ করেন তা হলো রাষ্ট্র পরিচালনায় নারীদের দক্ষতা ও যোগ্যতা নিয়ে। রাষ্ট্র পরিচালনার ব্যাপারে আমেরিকার নীতি নির্ধারকরা বল সব সময়ই নিজেদের কোর্টেই রাখেন। নারীদের কোর্টে বল পাঠান না। তারা মনে করেন গুরুত্বপূর্ণ পদগুলোতে নারীরা যোগ্যতার স্বাক্ষর রাখতে সক্ষম হবে না। আমেরিকা অনেক সমতার দেশ হলেও এক্ষেত্রে অসমতার দেশ। তারা অন্য দেশকে শুধু উপদেশই দেয় না প্রয়োজনে চোখ রাঙায়। কিন্তু নিজেরা বাস্তবায়ন বা প্রতিপালন করে না। নিজেদের দেশে এটি একটি অলিখিত নারী-পুরুষ বৈষম্য। এ অসমতা যুগ যুগ ধরে চলে আসছে। কিন্তু নীতি নির্ধারকরা নির্বিকার। আলোচনা-সমালোচনা কোনটাই তারা পরোয়া করে না। আমেরিকার মতো গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে এ ক্ষেত্রটি শতভাগ পুরুষ শাসিত। তারা গণতন্ত্রের মহান বাণীকে দেশে দেশে পৌঁছিয়ে দিতে তত্পর। কিন্তু তাদের সেই মহান গণতন্ত্রের দেশে আজ পর্যন্ত কোন নারী প্রেসিডেন্ট জায়গা করে নিতে পারেনি।ইত্তেফাক
লেখক: আন্তর্জাতিক বিশ্লেষক
- নিউইয়র্কে আমেরিকান ট্রাভেল এজেন্ট এসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ’র ইফতার ও দোয়া মাহফিল
- নিউইয়র্কে অ্যাসাল ওজোন পার্ক চ্যাপ্টারের ইফতার ও অভিষেক
- নিউইয়র্কে বাংলাদেশ ল সোসাইটি ইউএসএ’র ইফতার মাহফিল: খারাপ কাজ থেকে দূরে থাকার আহ্বান
- BOROUGH PRESIDENT GIBSON HOSTS FOURTH ANNUAL BRONX IFTAR DINNER DIALOGUE UNDER THE THEME “UNITY IN DIVERSITY”
- নিউইয়র্কে মানসিক সংকটে থাকা যুবককে গুলি: পুলিশ প্রশিক্ষণ এবং মানসিক সংকটসংক্রান্ত ৯১১ কল
- নিউইয়র্কে গ্রী ম্যাকানিকেল ইয়াঙ্কার্স এর ইফতার ও দোয়া মাহফিল
- নিউইয়র্কে যুক্তরাষ্ট্র বঙ্গমাতা পরিষদ’র ইফতার ও দোয়া মাহফিল
- নিউইয়র্কে ঢাকা জেলা অ্যাসোসিয়েশনের ইফতার ও দোয়া মাহফিল অনুষ্ঠিত








