কলাম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে সেমিনারে মানবতা বিরোধী অপরাধের বিচারে জাতিসংঘকে জড়িত করার দাবী আইন বিশেষজ্ঞদের
আনোয়ার হোসাইন মঞ্জু, নিউইয়র্ক: বাংলাদেশে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল (আইসিটি) মানবতা বিরোধী অপরাধ সংঘটনের অভিযোগে আটক ব্যক্তিদের বিচার করার ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক মান বজায় রাখছে না বলে অভিযোগ করে আইন বিশেষজ্ঞরা অভিযুক্তদের বিচার প্রক্রিয়ায় জাতিসংঘ ও আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের (আইসিসি) সংশ্লিষ্টতা দাবী করেছেন। এজন্য তারা আন্তর্জাতিক চাপ সৃষ্টির আহবান জানান। তারা বলেন, ট্রাইব্যুনাল যেভাবে বিচার পরিচালনা করছে তা কোনভাইে আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন হচ্ছে না এবং এভাবে চলতে থাকেলে ট্রাইব্যুনালের কাছে নিরপেক্ষ বিচার আশা করা যায় না। তারা বলেন, আইসিসি’র স্বাক্ষরকারী দেশ হিসেবে এ ধরনের বিচারের ক্ষেত্রে আইসিসি’র বিধিবিধান অনুসরণের যে বাধ্যবাধকতা বাংলাদেশের রয়েছে, তার প্রতি ভ্রুক্ষেপ করছে না সরকার। উপরন্তু সরকারের মন্ত্রীরা বিচারের রায় কি হবে এবং কবে রায়ে সাজাপ্রাপ্তদের মৃত্যুদন্ড কার্যকর করা হবে সেই দিনক্ষণও নির্ধারণ করে বক্তব্য দিয়ে যাচ্ছেন। ফলে বিচার প্রক্রিয়া প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়েছে। গতকাল ২৩ অক্টোবর মঙ্গলবার নিউইয়র্কের কলাম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে অনুষ্ঠিত এক সেমিনারে আন্তর্জাতিক আইন বিশেষজ্ঞরা এসব কথা বলেন। কলাম্বিয়া ল’ স্কুলের হিউম্যান রাইটস ইন্সটিটিউটের উদ্যোগে আয়োজিত সেমিনারে নির্ধারিত বক্তা হিসেবে ছিলেন যুদ্ধাপরাধ বিষয়ক যুক্তরাষ্ট্রের অ্যামবেসেডর-এট-লার্জ ষ্টিফেন জে র্যাপ, বৃটিশ আইনজীবী ব্যারিষ্টার টবি ক্যাডম্যান, নিউইয়র্ক ভিত্তিক মানবাধিকার সংগঠন হিউম্যান রাইটস ওয়াচ এর ইন্টারন্যাশনাল জাস্টিস প্রোগ্রামের পরিচালক প্যাম সিং। সেমিনার উপস্থাপনা করেন কলাম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের প্রফেসর ল্যারি ডি জনসন। সেমিনারের মূল প্রতিপাদ্য ছিল “প্রটেকটিং দি রাইটস অফ দি একিউজড ইন ডমেষ্টিক ট্রায়ালস ফর এট্টোসিটি ক্রাইমস”। অ্যামবেসেডর ষ্টিফেন র্যাপ তার বক্তব্যে মানবতা বিরোধী অপরাধের বিচার প্রক্রিয়া শুরু হওয়ার পর বাংলাদেশ সরকারের আমন্ত্রণে তিন দফা বাংলাদেশ সফর এবং সংশ্লিষ্ট সকলের সাথে সাক্ষাতের পর বিচারকে সুষ্ঠু ও আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন করতে সরকারের কি করণীয় সে সম্পর্কে তার সুপারিশের উল্লেখ করে অনেকগুলো সুপারিশ বাস্তবায়ন না করায় বিচারের আন্তর্জাতিক মান ও নিরপেক্ষতা নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, কোন দেশে মানবতা বিরোধী অপরাধ সংঘটিত হলে, যারা ক্ষতির শিকার তাদের পরিবারের সদস্যদের আকাংখা থাকে যে তারা ন্যায়বিচার লাভ করবেন। কিন্তু এ ধরনের বিচার করতে হলে সকল পক্ষের অধিকারের প্রতি দৃষ্টি রাখতে হবে যাতে ন্যায়বিচার থেকে কেউ বঞ্চিত না হয়। পাশাপাশি বিচারের পরিণতি সম্পর্কেও সংশ্লিষ্ট সকলকে খেয়াল রাখা জরুরী। কারণ সুবিচার নিশ্চিত করা সম্ভব না হলে অনেক সময় হিতে বিপরীত হওয়ার আশংকা থাকে। তিনি বলেন, বাংলাদেশ স্বাধীনতা লাভ করার দুই বছর পর ১৯৭৩ সালে আন্তর্জাতিক অপরাধ আইন পাস করা হয়। এর ফলে এ আইন দিয়ে আইন প্রণীত হওয়ার পূর্ববর্তী অপরাধের বিচার করার ক্ষেত্রে জটিলতা ছিল। বাংলাদেশ আইসিসি’র সদস্য এবং রোম ষ্ট্যাটিউটের স্বাক্ষরকারী দেশ। আমি আমার সুপারিশে রোম ষ্ট্যাটিউট অনুসরণ করতে বলেছি, কিন্তু তারা সে সুপারিশ বাস্তবায়ন করেনি। কিন্তু বিচারকে আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন করতে হলে তাদেরকে এগুলো করতে হবে। এছাড়া অন্যান্য দেশ যেভাবে মানবতা বিরোধী অপরাধের বিচার করেছে, যেমন সাবেক যুগোস্লাভিয়া, লাইবেরিয়া, সিয়েরালিওন, কেনিয়া, কম্বোডিয়ার বিচার প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে পারে বাংলাদেশ। ১৯৭৩ সালের আইনে অভিযুক্তদের বিনা বিচারে অনির্দিষ্টকালের জন্য আটক রাখা ও জামিন না দেয়ার যে বিধান রয়েছে তা সুষ্ঠু বিচার প্রক্রিয়ার সাথে সাংঘর্ষিক। কারণ এর দ্বারা অভিযুক্তদের অধিকার থেকে বঞ্চিত করা হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্তদের নিরাপত্তা দেয়ার সুযোগ রাখা হয়েছে। কিন্তু অভিযুক্তদেরও নিরাপত্তা লাভের অধিকার আছে, যা নিশ্চিত করা জরুরী। এক প্রশ্নের উত্তরে র্যাপ বলেন, সকল সাক্ষ্য প্রমাণের ভিত্তিতে দোষী সাব্যস্ত হওয়ার আগে অভিযুক্ত সকলকে নির্দোষ বিবেচনা করাই আইনের দাবী। টবি ক্যাডম্যান বলেন, ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ চলাকালে অসংখ্য লোক নিহত ও নির্যাতিত হয়েছে, তাতে কোন সন্দেহ নেই। কিন্তু যাদের বিরুদ্ধে মানবতা বিরোধী অপরাধের অভিযোগ আনা হচ্ছে এসবের কোনটাই তাদের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয়। তারা কোন অপরাধ করে থাকলে দেশের প্রচলিত ফৌজদারি আইনে তার বিচার হতে পারে। স্বাধীনতার বিরোধিতা করা অপরাধ বলে গন্য হতে পাওে না। কিন্তু বাংলাদেশে এখন রীতি হয়ে দাঁড়িয়েছে যে, আইসিটিতে যাদের বিচার চলছে তাদের পক্ষাবলম্বনকারীদের স্বাধীনতা বিরোধী বলে চিহ্নিত করা হচ্ছে। এটি কোন শুভ লক্ষণ নয়। সরকার একটি রাজনৈতিক দলকে টার্গেট করে বলছে যে, তারা অপরাধ মার্জনা করার সংস্কৃতি থেকে দেশকে মুক্ত করতে এ বিচার করছে। তাই যদি হয় তাহলে ১৯৭১ সালে পাকিস্তানী ও ভারতীয় সৈন্যরা এবং মুক্তিযোদ্ধারাও একই ধরনের অপরাধে জড়িত ছিল, যাদেরকে ১৯৭৪ সালে প্রেসিডেন্টের আদেশ বলে তাদের কৃত অপরাধ থেকে দায়মুক্তি দেয়া হয়েছিল তাদেরকেও বিচারের আওতায় আনতে হবে। তিনি বলেন, বিচারকে কেন্দ্র করে একটি বিপজ্জনক আবেগের সৃষ্টি করা হয়েছে। ষ্টিফেন র্যাপ বিচারকে আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত করতে যে সুপারিশ করেছিলেন সেগুলো আংশিক গ্রহণ করা হলেও বাস্তবে সেসবের কোন প্রয়োগ নেই। মন্ত্রীরা প্রকাশ্যে বলছেন যে এ বছরের মধ্যে ৩ জনের বিচার শেষ করে ১৬ ডিসেম্বর মৃত্যুদন্ড কার্যকর করা হবে এবং অবশিষ্টদের মৃত্যুদন্ড দেয়া হবে ২০১৩ সালের মার্চে। কারণ এ দু’টি মাসের সাথে বাংলাদেশের রাজনৈতিক আবেগ জড়িত। রায় পূর্ব নির্ধারিত হলে অভিযুক্তদের পক্ষে কি করে ন্যায়বিচার পাওয়া সম্ভব? সরকার অতি দ্রুত বিচার সম্পন্ন করার জন্য উঠে পড়ে লেগেছে। যুদ্ধাপরাধ বিষয়ক আইন বিশেষজ্ঞ ক্যাডম্যান আরো বলেন, এধরণের একটি বিচারের মাধ্যমে বাংলাদেশ এক বিপজ্জনক দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে যাচ্ছে, যা আশেপাশের দেশগুলো তাদের দেশে প্রয়োগের হন্য অনুসরণ করতে পারে। এ ব্যাপারে আইসিটির করণীয় কিছুই নেই। কারণ মূল সমস্যা নিস্পত্তির জন্য আইসিটি প্রতিষ্ঠা করা হয়নি। সম্প্রতি উগান্ডার একটি প্রতিনিধিদল ট্রাইব্যুনাল ও বিচার প্রক্রিয়া পরিদর্শন করে তাদের দেশেও অনুরূপ বিচার চালু করার ইচ্ছা ব্যক্ত করেছে। কেউ ভাবতে চাইছে না যে এ প্রতিশোধ গ্রহণের জন্য একটি পক্ষকে বেছে নিয়ে বিচারের মুখোমুখি করার পরিণতি দীর্ঘস্থায়ী অশান্তির বীজ বপন করবে। সেজন্য আমরা বিচার প্রক্রিয়ার সাথে জাতিসংঘের জড়িত হওয়া এবং এ ব্যাপারে যেহেতু আইসিসি’র দায়িত্ব রয়েছে সেজন্য তাদেরও জড়িত হওয়া জরুরী বলে মনে করছি। তাছাড়া বিচারকার্য পর্যবেক্ষণ ও মনিটর করার জন্য বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থাকে বিচার কাজ প্রত্যক্ষ করার সুযোগ দেয়া উচিত ন্যূরেমবার্গ ট্রায়ালের অনুসরণে বাংলাদেশে মানবতা বিরোধী অপরাধের বিচার করা হচ্ছে মর্মে বাংলাদেশ সরকারের দাবী সম্পর্কে তিনি বলেন, ন্যূরেমবার্গ ট্রায়াল কোন অবস্থাতেই নিরপেক্ষ ট্রায়াল ছিল না। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরপরই সে বিচার অনুষ্ঠিত হয়েছিল এবং যুদ্ধের প্রভাব ও অনুভূতি বিচারকে প্রভাবিত করেছিল। বাংলাদেশের দৃশ্যপট সম্পূর্ণ ভিন্ন এবং দৃষ্টিতে সমস্যাপূর্ণ। ১৯৭৩ সালের আন্তর্জাতিক অপরাধ আইনটি করা হয়েছিল পাকিস্তানী সৈন্যদের বিচার করতে এবং কোন বেসামরিক আদালত প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্যে নয়। কিন্তু সেটি বহু পরে সংশোধন করা হয় একটি বেসামরিক ট্রাইব্যুনাল প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে যেটি বেসামরিক ব্যক্তি, মিলিটারি ও সহায়তাকারী বাহিনীর সদস্যদের বিচার করবে। কিন্তু আইনের মধ্যেই সমস্যা রয়ে গেছে। আন্তর্জাতিক আইনের একটি নীতি হচ্ছে যে, অপরাধ সংঘটনের সময় কার্যকর ছিল না এমন কোন আইন দিয়ে কোন ব্যক্তিকে অভিযুক্ত করা, বিচার করা বা শাস্তি দেয়া যাবে না। অপরাধ সংঘটিত হয়েছিল ১৯৭১ সালে ১৯৭৩ সালে নয়। সেই আইনকে চল্লিশ বছর পর সংশোধন করে ভিন্ন অপরাধের জন দেশের লোকদের বিচার করতে প্রয়োগ করতে গেলে কি পদক্ষেপ নিতে হবে তা ষ্টিফেন র্যাপ ছাড়াও বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা এবং আমরা যারা অভিযুক্তদের আইনজীবীদের পরামর্শ দিচ্ছি তাদের পক্ষ থেকে বার বার বলা হয়েছে। কিন্তু সরকার কোন ভ্রুক্ষেপ না করে তাদের রাজনৈতিক উদ্দেশ্য সাধনের জন্য কাজ করে যাচ্ছে। হিউম্যান রাইটস ওয়াচের প্যাম সিং বলেন, আমরা শুরু থেকেই বলে আসছি যে বাংলাদেশে মানবতা বিরোধী অপরাধের বিচার রাজনৈতিক প্রভাবদুষ্ট এবং এ কারণেই আমরা সন্দেহ পোষণ করছি যে, এমন বিচার ঝুঁকিপূর্ণ এবং আইনের শাসনের সাথে এর কোন সম্পর্ক নেই। আমরা বার বার আমাদের উদ্বেগ প্রকাশ করেছি। ট্রাইব্যুনালের প্রধান ১৯৯৪ সালে যখন একজন আইনজীবী ছিলেন তখন একজন অভিযুক্তের বিরুদ্ধে অনুষ্ঠিত বিচার নাটকে (গণ আদালত) জড়িত ছিলেন। অতএব তার ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন উঠায় বিষয়টি ট্রাইবুনালে চ্যালেঞ্জ করা হলেও বা বাতিল করা হয়। তিনি বলেন, অভিযুক্তদের আইনজীবীদের পুলিশ হয়রাণী করছে, হুমকি দিচ্ছে। এভাবে চলতে থাকলে বিচার প্রক্রিয়া কিভাবে সুষ্ঠু হবে এবং বিচার কিভাবে নিরপেক্ষ হবে সে ব্যাপারে আমরা সন্দিহান।
- নিউইয়র্কে ঢাকা জেলা অ্যাসোসিয়েশনের ইফতার ও দোয়া মাহফিল অনুষ্ঠিত
- বাংলাদেশ সোসাইটি অব ব্রঙ্কস নিউইয়র্ক ইনকের কোরআন তেলাওয়াত প্রতিযোগিতা ও ইফতার মাহফিল
- New York Attorney General James Releases Statement on Live Nation Trial
- নিউইয়র্কে গোল্ডেন এইজ হোম কেয়ারের ইফতার মাহফিল
- নিউইয়র্ক বাংলাদেশি আমেরিকান লায়ন্স ক্লাবের ইফতার ও দোয়া মাহফিল অনুষ্ঠিত
- নিউইয়র্কসহ যুক্তরাষ্ট্রের উত্তর-পূর্বাঞ্চলে ৭ মার্চ ঘড়ির কাঁটা এক ঘন্টা এগিয়ে যাবে
- নিউইয়র্কে জ্যামাইকা বাংলাদেশ ফ্রেন্ডস সোসাইটির বার্ষিক ইফতার ও দোয়া মাহফিল
- Radwan Chowdhury Announces Candidacy for Montgomery County Council At-Large, Launches “Five-Pillar Blueprint” for Accountable Governance.








