ওবামা, আরও চার বছর

হাসান ফেরদৌস : ২১ জানুয়ারি ছিল মার্টিন লুথার কিং ডে। আমেরিকার কালো মানুষের অধিকার দাবি করে নিহত হয়েছিলেন তিনি। তাঁর জন্মদিন উপলক্ষে সরকারি ছুটির দিন। এ দিনেই দ্বিতীয়বারের মতো প্রেসিডেন্ট হিসেবে শপথ নিলেন বারাক ওবামা, আমেরিকার প্রথম কৃষ্ণাঙ্গ প্রেসিডেন্ট। বেঁচে থাকলে এ বছর জানুয়ারিতে মার্টিন লুথার কিংয়ের বয়স দাঁড়াত ৮৪ বছর। ১৯৬৮ সালে মাত্র ৩৯ বছর বয়সে বর্ণবাদী ঘাতকের হাতে নিহত হওয়ার সময় এই কৃষ্ণাঙ্গ ধর্মযাজক শ্বেত আমেরিকার চোখে ছিলেন ভীষণ নিন্দিত। তাঁর অপরাধ, আমেরিকার নিগ্রোদের জন্য তিনি সমানাধিকার দাবি করেছিলেন। এমন একজন ‘বিপজ্জনক’ মানুষের জন্মদিন বিশেষ দিন হিসেবে উদ্যাপিত হবে, তার তো প্রশ্নই ওঠে না। মার্কিন কংগ্রেসে বারবার উত্থাপিত হওয়া সত্ত্বেও সে প্রস্তাব নাকচ হয়েছে। শুধু রিপাবলিকান নয়, উদারনৈতিক বলে বিবেচিত অনেক ডেমোক্র্যাটও সে প্রস্তাবের বিরোধিতা করেছেন। নিউইয়র্কের খ্যাতনামা সিনেটর প্যাট্রিক ময়নিহান, যিনি একসময় ভারতে মার্কিন রাষ্ট্রদূতের দায়িত্ব পালন করেন, ‘কিং ডে’র প্রস্তাবের নথি সিনেট কক্ষ থেকে কেবল দলামোচা করে ছুড়ে ফেলেন, তা-ই নয়, তাঁর ক্রোধের মাত্রা বোঝাতে সে কাগজের ওপর জুতা দিয়ে মাড়িয়ে দেন। দক্ষিণের অতি রক্ষণশীল সিনেটর জেসি হেলমস সে সময় মার্টিন লুথার কিংকে ‘কমিউনিস্ট’ হিসেবে অভিযুক্ত করেছিলেন। কয়েক শ পাতার এক নথি প্রস্তুত করে তিনি প্রমাণের চেষ্টা করেছিলেন, ভিয়েতনাম যুদ্ধের বিরোধিতাকারী কিং আসলে একজন বিদেশি চর। অব্যাহত দাবির মুখে সে বিরোধিতা ক্রমেই প্রশমিত হয়েছে। অবশেষে ১৯৮৩ সালে যখন জানুয়ারির তৃতীয় সোমবারকে ‘কিং ডে’ হিসেবে ঘোষণার প্রস্তাব মার্কিন কংগ্রেসের উভয় কক্ষে অনুমোদন লাভ করে, তাতে বাগড়া বসান প্রেসিডেন্ট রিগ্যান। তাঁর যুক্তি ছিল, আরও একটি দিনে সরকারি ছুটি ঘোষিত হলে তার ব্যয়ভার বহন অসম্ভব হবে। তাঁর ভেটোর হুমকি উপেক্ষা করে কংগ্রেসে বিপুল সংখ্যাধিক্যে সে প্রস্তাব গৃহীত হলে রিগ্যান অতি বিরক্তির সঙ্গে তাতে স্বাক্ষর দেন। সে ছিল ৩০ বছর আগের ঘটনা। এখন, তিন দশক পরে, সেই ‘কিং দিবসে’ই আমেরিকার প্রেসিডেন্ট হিসেবে শপথ নিলেন বারাক ওবামা। কালো মানুষ, আফ্রিকা থেকে আসা এক কেনীয় পিতার সন্তান। ‘হোসেন’ তাঁর মধ্য নাম, পিতার পারিবারিক সূত্রে পাওয়া, যদিও ধর্মাচারে তিনি খ্রিষ্টান। চার বছর আগে প্রথম যখন বিপুল ভোটাধিক্যে তিনি নির্বাচিত হন, পৃথিবীর মানুষ তাঁকে এক নতুন উত্তর-বর্ণবাদী আমেরিকার প্রতিনিধি হিসেবে স্বাগত জানিয়েছিল। ওবামা ঘোষণা করেছিলেন, যে পরিবর্তনের জন্য আমরা এত দিন অপেক্ষায় ছিলাম, ‘আমরাই’ হলাম সেই পরিবর্তন। তিনি প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন অধিক সমতাপূর্ণ, অধিক মানবিক ও কম আগ্রাসী এক আমেরিকা নির্মাণে তিনি নেতৃত্ব দেবেন। সে প্রতিশ্রুতি পুরোপুরি রাখা ওবামার পক্ষে সম্ভব হয়নি, তবে পরিবর্তনের একটি ধারার তিনি সূচনা করেছেন। বিরোধী রিপাবলিকান ও আমেরিকার ধনকুবেররা আদাজল খেয়ে যেভাবে তাঁর বিরোধিতা করে, তা থেকে বোঝা যায়, নিশ্চয় ভালো কিছু করার উদ্যোগ নিয়েছিলেন তিনি। নতুন স্বাস্থ্য বিমা আইন সেসব কাজের একটি। ওবামার চার বছরের আরেকটি বড় কাজ ওয়াল স্ট্রিটের লাগামহীন কর্মকাণ্ড আইনি নিয়ন্ত্রণের আওতায় আনা। ইরাকে মার্কিন উপস্থিতির ইতি ও আফগানিস্তান থেকে মার্কিন সেনা প্রত্যাহার-প্রক্রিয়ার শুরু, এই দুটোকেও ওবামার সাফল্যের কলামে রাখা যায়। রিপাবলিকান বিরোধিতার কারণে প্রথম চার বছরে ওবামা যা করতে পারেননি (আমেরিকাকে আরও ভারসাম্যপূর্ণ ও সম-অধিকারসম্পন্ন করা), তা অর্জনের প্রতিশ্রুতি দিয়ে তিনি দ্বিতীয় মেয়াদ শুরু করলেন। শপথ গ্রহণের পর প্রায় ১০ লাখ মানুষকে সাক্ষী রেখে যে ভাষণটি তিনি দেন, তা অধিকাংশ মানুষকেই বিস্মিত করেছে। যে ওবামাকে আমরা তাঁর দুটি আত্মজৈবনিক গ্রন্থে দেখেছি, অথবা প্রথম দফার নির্বাচনের সময় তাঁর যে রাজনৈতিক মনোজগৎ আমাদের নজরে এসেছে, তা থেকে এমন ধারণার সৃষ্টি হয়েছিল, এই লোক মন-মেজাজে উদারনৈতিক, প্রগতিশীল। অথচ রিপাবলিকান বিরোধিতার মুখে তাঁর প্রেসিডেন্সির প্রথম চার বছর যে ওবামাকে পাই, তিনি আপসকামী, এমনকি তাঁকে আমরা ‘গোপন’ দক্ষিণপন্থী ভাবা শুরু করেছিলাম। কিন্তু এখন যখন তাঁকে আর কোনো নির্বাচনী প্রতিদ্বন্দ্বিতার মুখোমুখি হতে হবে না, ওবামা নিজের খোলস ছেড়ে বেরিয়ে এসেছেন। ২১ তারিখে যে ওবামাকে আমরা দেখলাম, যাঁর কথা শুনলাম, তিনি আদ্যোপান্ত একজন উদারনৈতিক মানুষ। ‘লিবারেল’ শব্দটি এত দিন এ দেশে একটা গালি বলেই বিবেচিত হতো। ওবামা কোনো রাখঢাক ছাড়াই সে গালিকে আভরণ হিসেবে গ্রহণ করলেন। গত বছরের নির্বাচনী প্রচারণার সময়েই ওবামা আমেরিকার কম অধিকারভোগী মানুষের পক্ষে নিজেকে দাঁড় করিয়েছিলেন। তাঁর বিপরীতে রিপাবলিকান প্রার্থী মিট রমনি ছিলেন আমেরিকার ধনিক শ্রেণীর প্রতিনিধি। রমনির যুক্তি ছিল, দেশের ৪৭ শতাংশ মানুষ সরকারি সাহায্য নিয়ে বেঁচে আছে, ওবামা তাদের বেকার ভাতা-দরিদ্র ভাতা-স্বাস্থ্য ভাতা দিয়ে পুষছেন। অতএব এই ৪৭ শতাংশের কোনো সমর্থন তিনি পাবেন না, তাদের নিয়ে কোনো মাথাব্যথাও তাঁর নেই। মুখ ফসকে রমনির বলা সে-কথা তাঁর গলার ফাঁস হয়ে উঠল। ওবামা সাগ্রহে সেই ৪৭ শতাংশের পক্ষে নিজেকে দাঁড় করালেন। সেই ৪৭ শতাংশ, আর তার সঙ্গে আরও ৬-৭ শতাংশ নিয়ে মোট ৫৩ শতাংশ মানুষের ভোট পেয়ে পুনর্নির্বাচিত হলেন ওবামা। শপথ গ্রহণের সময় আমেরিকার এই কম অধিকারহীন মানুষদের কথা মনে রেখেছিলেন ওবামা। জানালেন, যারা সরকারি সাহায্য নিয়ে বেঁচে থাকার সংগ্রাম করছে, তাদেরও ‘আমেরিকান স্বপ্ন’ দেখার অধিকার আছে। কৃষ্ণাঙ্গ, বৃদ্ধ, অভাবী, নারী ও সমকামী, প্রান্তবর্তী প্রতিটি মানুষ সমানাধিকার ও সমান সুযোগ ভোগের অধিকারী। সম্প্রদায় হিসেবে, রাষ্ট্র ও সরকার হিসেবে তাদের দিকে হাত বাড়ানো নৈতিক ও আইনগত দায়িত্ব। ‘সম্মিলিতভাবে আমরা এই উপলব্ধিতে পৌঁছেছি যে আধুনিক অর্থনীতির জন্য চাই রেললাইন ও দূরপাল্লার সড়ক, যাতে যাতায়াত সহজ হয়, ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রসার ঘটে। সম্মিলিতভাবে আমরা এই উপলব্ধিতেও পৌঁছেছি যে মুক্তবাজার ব্যবস্থা কেবল তখনই কার্যকর হয়, যখন খোলাবাজার প্রতিযোগিতায় সহায়ক আইনকানুন থাকে এবং সেসব মেনে চলা হয়। একটি মহান জাতি হিসেবে সম্মিলিতভাবে আমরা এ বিষয়েও প্রতিজ্ঞাবদ্ধ যে দুর্বলদের রক্ষা করা এবং তাদের কঠিন সংকট ও দুর্ভোগ থেকে আগলে রাখা আমাদের দায়িত্ব।… আমরা তখনই নিজেদের আদর্শের প্রতি নিষ্ঠাবান বলে প্রমাণিত হব, যখন অসীম দারিদ্র্যে জন্মগ্রহণকারী একটি শিশুকন্যাও জানবে, অন্য সবার মতো সফল হওয়ার সব সুযোগ তারও রয়েছে।’ ওবামার ভাষণে এমন একটি আশ্চর্য বাক্যবন্ধ রয়েছে: ‘বৃদ্ধ ও দরিদ্রদের জন্য স্বাস্থ্যসেবার যে প্রতিশ্রুতি আমরা দিয়েছি, তা আমাদের উদ্যমকে ক্ষুণ্ন করে না, বরং তা আমাদের অধিক বলশালী করে। এর ফলে আমরা “ভিক্ষুকের” জাতিতে পরিণত হই না, বরং তা আমাদের বিপদের ঝুঁকি নিতে প্রেরণা জোগায়।’ কোনো ভুল নেই, ওবামা এখানে এক ‘অ্যাক্টিভিস্ট’ সরকারের কথা বলছেন। আমেরিকায় রাষ্ট্র তথা সরকার বরাবর ধনীদের ওপর ছাতা ধরে থেকেছে। সে ছাতা তিনি সরিয়ে নিচ্ছেন না, শুধু সে ছাতার নিচে অভাবী ও দুর্বলদের জায়গা দেওয়ার প্রস্তাব রাখছেন। রিপাবলিকান প্রতিপক্ষ বরাবর দাবি করে এসেছে, এ দেশের ধনিক শ্রেণী যত ফুলে-ফেঁপে আঙুল ফুলে কলাগাছ হবে, আমেরিকার ততই মঙ্গল। কারণ, ধনীরাই অর্থনীতির আসল ইঞ্জিন। তারাই কারখানা বানায়, ব্যবসায় বিনিয়োগ করে। আর সে কারখানায় বা ব্যবসায় কাজের সুযোগ জোটে দেশের গরিব মানুষের। ওবামা সে যুক্তি খণ্ডন করছেন না, শুধু তার সঙ্গে এ কথা যোগ করছেন যে কাজটা একা ব্যবসায়ীদের পক্ষে সম্ভব নয়। ব্যবসার জন্য দরকার রাস্তা ও রেললাইন। দরকার দক্ষ শ্রমিক, যা তৈরি হয় স্কুল-কলেজে। কোনো কারখানার মালিক দূরপাল্লার রাস্তা বানায় না, লাভের বখরা না পেলে স্কুল-কলেজেও দুই পয়সা ঢালে না। এ কাজটা করে দেশের সরকার। তিনি প্রস্তাব রেখেছেন, এ কাজটা এমনভাবে করতে হবে, যাতে সবাই—এমনকি অবৈধ অভিবাসীও লাভবান হয়। সরকারের দায়িত্ব খেলার মাঠটাকে সবার জন্য সমতল করে তোলা, যাতে সবাই তাতে খেলার সুযোগ পায়, একসময় মধ্যবিত্ত হিসেবে প্রতিষ্ঠা পায়। ৩২ বছর আগে, ১৯৮১ সালের ২০ জানুয়ারি ঠিক একই মঞ্চ থেকে প্রেসিডেন্ট হিসেবে শপথ নিয়েছিলেন রোনাল্ড রিগ্যান। সে সময় তিনি বলেছিলেন, সরকার আমেরিকার সমস্যার সমাধানের পথ নয়, সরকার আমেরিকার সব সমস্যার কারণ। সে ভাষণ থেকে শুরু হয়েছিল এক নয়া রক্ষণশীল রাজনৈতিক আন্দোলন, যার সাফল্যের কারণে পিছু হঠতে বাধ্য হয়েছিল প্রগতিশীল রাজনীতি, ‘উদারনৈতিক’ শব্দটি ছুড়ে ফেলা হয়েছিল রাজনীতির আস্তাকুঁড়ে। ওবামা সেই ছুড়ে ফেলা শব্দটিকে সযত্নে তুলে নিলেন। মুখে বললেন না বটে, কিন্তু ওয়াশিংটনে যে ১০ লাখ লোক সেদিন জড়ো হয়েছিল এবং যে লাখ লাখ মানুষ তাঁর সে ভাষণ টিভি ও ইন্টারনেটে শোনার সুযোগ পেয়েছিল, তাদের কারও বুঝতে বাকি ছিল না—ওবামা নির্দ্বিধায় জানিয়েছেন, তিনি একজন লিবারেল। যুক্তরাষ্ট্র আদর্শগতভাবে বিভক্ত। শুধু রিপাবলিকান পার্টি নয়, ওবামার নিজের দলের একাংশ এখনো তাঁর প্রস্তাবিত উদারনৈতিক এজেন্ডায় আস্থাবান নয়। নিজের এজেন্ডা পূরণে ওবামার হাতে আছে মাত্র চার বছর। অতএব, সামনে এগোতে হলে তাঁকে লড়তে হবে। দেশের অধিকাংশ মানুষ তাঁর পক্ষে, এবারের নির্বাচনে তিনি সে কথার প্রমাণ পেয়েছেন। এখন দেখার বিষয় হলো, নিজের কথার প্রতি তিনি নিজে বিশ্বস্ত থাকেন কি না; যে নতুন উদারনৈতিক আমেরিকার রূপরেখা তিনি নিজে তুলে ধরেছেন, তার বাস্তবায়নে নেতৃত্ব দিতে তিনি নিজে প্রস্তুত কি না।
নিউইয়র্ক হাসান ফেরদৌস: প্রাবন্ধিক ও কলাম লেখক।
- ওয়ার্ল্ড হিউম্যান রাইটস ডেভেলপমেন্ট ইউএসএর সাধারণ সম্পাদক ড. সাদিয়া আফরিন এরা
- চরমোনাই পীরের যুক্তরাষ্ট্র সফর উপলক্ষে নিউইয়র্কে দোয়া মাহফিল, কুরআন-সুন্নাহর আলোকে বয়ান
- New York Attorney General James Secures Reimbursements for T-Mobile Customers Whose Rates Were Unjustly Raised
- নিউইয়র্কে বাংলাদেশ সোসাইটির নির্বাচনে কুনু-ফিরোজ পরিষদের সাত দফা ইশতেহার ঘোষণা; কমিউনিটি সেন্টার প্রতিষ্ঠা, সাশ্রয়ী ফিউনারেল সেবা, বিমানের সরাসরি ফ্লাইট ও আর্থিক স্বচ্ছতায় অঙ্গীকার
- ফিলিস্তিনিদের আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকারের প্রতি বাংলাদেশের পূর্ণ সমর্থন: জাতিসংঘে রাষ্ট্রদূত আইরিন খান
- নিউইয়র্কে বাংলাদেশ সোসাইটির নির্বাচনে প্রথমবারের মতো বিতর্ক, গুরুত্ব পেল স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি
- New York Attorney General James Warns New Yorkers About AI-Generated Election Misinformation Ahead of November Elections
- Bangladesh calls for global treaty to protect victims of crimes against humanity