সজলের এভারেস্ট জয়ের গল্প অজানাই থেকে গেল
কাজল ঘোষ: যখন খবরটা জানতে পারি তখন বিশ্বাস হচ্ছিল না। ফেসবুকের পাতা থেকে ততক্ষণে সজলের হাস্যোজ্জ্বল ছবিটি সরিয়ে দেয়া হয়েছে। ব্ল্যাকআউট করে কালো ছায়া জানান দিচ্ছে বন্ধু সজল আর নেই। হিমালয়ের চূড়া জয় করেও সেই সাহসজাগানিয়া গল্প সে বলে যেতে পারলো না। যাওয়ার আগের এসএমএস-এ দোয়া চেয়েছিল পরিচিতজনদের কাছ থেকেই। আদর-সোহাগে জড়িয়ে ছিল সহধর্মিণী তাহমিনা শৈলী আর দেড় বছরের পুত্র সুম্মিরকে। ৮ই এপ্রিল এসএমএস-এ সজল লিখেছিল, Everest is calling. I am joining an Expedition to Mt. Everest this week. This is my second attempt on Everest. I am going with celebrity climber Sudarshan Gautam who doesn’t have two hands. Sudarshan says “Disability is not an Inability”. Your good wish will inspire me. সবার কাছ থেকে প্রেরণা আর উৎসাহ নিয়ে বিদায় নিয়েছিল। যেন দ্বিতীয়বারের অভিযানে বিজয়ী হয়ে বীরের বেশে ফিরতে পারে। ২০১১ সালের এপ্রিল-মে’তে চীনের তিব্বতের উত্তর প্রান্ত থেকে এভারেস্ট অভিযানে অংশ নিয়েছিল সজল। বেজ ক্যাম্প ১-এ প্রায় ২৩ হাজার ফুট পর্যন্ত উঠেও ফিরতে হয়েছিল তাকে। ফুসফুসে তরল জমে যাওয়ায় অসুস্থ হয়ে পড়ায় সেবার হিমালয়ের চূড়া স্পর্শ করার সৌভাগ্য হয়নি। এর আগে ২০০৬ সালে মূসা ইব্রাহিমের সঙ্গে ফ্রে পর্বত (সিকিম, ভারত), সিঙ্গুচুলি পর্বত (নেপাল) ও মেরা পর্বত (নেপাল) জয় করে সজলের এভারেস্ট বিজয়ের স্বপ্ন পোক্ত হয়েছিল। অভিজ্ঞতায় একেবারে নতুন নয় সজলের। সঙ্গের বেশ ক’জন ইতিমধ্যেই ফিরে এসেছে হিমালয়ের চূড়া স্পর্শ করে। মুসা-মুহিত-নাজনীন-নিশাত। সেই উজ্জ্বল মুখের তালিকায় সজলও থাকবে এমনটাই দৃঢ়চিত্ত ছিল সে। এবার আর ব্যর্থ হয়নি। কথা রেখেছে। এভারেস্ট ছুঁয়েছে। কিন্তু সেই অভিযানের আদ্যোপান্ত আমাদের অজানাই থেকে গেল। এক অদম্য নেশায় সজল ছুটছে সেই দুই দশক আগ থেকেই। বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের ছাদ বারান্দায় প্রথম দেখা ১৯৯৩ সালে। শেষ দেখা ফেব্রুয়ারি ২০১৩-তে স্কয়ার হসপিটালে। যখনই দেখেছি অভিযানের ব্যাগ ঘাড়ে। হঠাৎ আড্ডার ভিড়ে লম্বা সময় সজলের দেখা নেই। উধাও। কখনও পনের দিন আবার এক মাসের লম্বা সময় দেখা মিলতো না। এক বিকালে আবারও চায়ের কাপে চুমুক দিয়ে ছোট ছোট পাহাড় অভিযানের গল্প শোনা। আমরা তখন দশ-পনের জনের একটি দল দিনের পর দিন নানা স্বপ্নের বীজ বুনি। সজল শুধুই এভারেস্টে যাবে এ স্বপ্ন নিয়েই থাকে। পরে অনেক নতুন নতুন অভিযানে সজল ব্যস্ত হয়। হঠাৎ দেখায় সে জানালো সে ছবি নির্মাণ করছে। নানা প্রতিকূলতা শেষে সরকারি অনুদান পেলে কাজ শুরু করে। একসময় আমন্ত্রণপত্র পাঠ ঘরোয়া প্রিমিয়ার শো’র। পেশাগত কারণে যাওয়া হয়ে ওঠেনি। তবু শুভ কামনা ছিল। খ্যাতনামা লেখক জাফর ইকবালের ‘কাজলের দিনরাত্রি’ উপন্যাস অবলম্বনে চিত্রনাট্য লিখেছিল। ছবিটির নামও তাই দিয়েছিল। ছবিটির নির্মাণ কাজের ফাঁকেই জানালো সে এভারেস্ট অভিযানের দুঃসাহসিক ১৪টি অভিযান নিয়ে এড ভিশ্চার্যের লেখা বইয়ের অনুবাদ করছে। পাণ্ডুলিপিটি আমার কাছে পাঠাবে। যতদূর মনে পড়ে, এভারেস্টের প্রথম অভিযানের গল্পটিও মানবজমিন ঈদসংখ্যা ২০১০-এ ছাপা হয়েছে। বিশ্বসাহিত্যকেন্দ্রের নানা অনুষ্ঠানের ছলছুতোয় দেখা হতো সজলের সঙ্গে। কখনও কখনও সায়ীদ স্যারকে কোন কোন অনুষ্ঠানের যুক্ত করা নিয়ে কথা হতো। সজল-শৈলীর বিয়েতেও যাওয়ার সুযোগ হয়েছিল। সব ছাপিয়ে তার মধ্যে মগ্নতা ছিল হিমালয়ের। সব স্বপ্ন ছাপিয়ে সে বড় হতে চেয়েছিল অদম্য হিমালয়ের চূড়া বিজয়ী হিসেবেই। ৫ম এভারেস্ট জয়ীর ফেরা হলো না দুই দশকের স্বপ্ন- বিশ্বের সর্বোচ্চ পর্বতশৃঙ্গ এভারেস্ট জয়। স্বপ্ন পূরণ হলো। ৫ম বাংলাদেশী হিসেবে এভারেস্টজয়ীর খাতায় নাম লেখালেন তিনি। নেমেও আসছিলেন নিচে- কিন্তু সে সময়ই শিকার হলেন নির্মম এক পরিস্থিতির। পায়ের চলচ্ছক্তি দুর্বল হয়ে যাওয়ায় প্রাণ হারাতে হলো অসীম সাহসী ৩৫ বছরের সজল খালেদকে। শিশুতোষ চলচ্চিত্র ‘কাজলের দিনরাত্রি’র পরিচালক ছিলেন তিনি। তার সঙ্গে সুং হো-সিউ (৩৪) নামের দক্ষিণ কোরিয়ার আরেক অভিযাত্রীও প্রাণ হারিয়েছেন। দু’জনে মারা যান ৮ হাজার মিটার উঁচুতে এভারেস্টের ‘ডেথ জোন’-এ। এভারেস্ট জয় করতে গিয়ে এই প্রথম কোন বাংলাদেশী মৃত্যুবরণ করলেন। গতকাল পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে বহিঃপ্রচার বিভাগের মহাপরিচালক শামিম আহসান গণমাধ্যমের কাছে খালেদের মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করেন। এর আগে নেপালের বাংলাদেশ মিশন দেশে খালেদের স্ত্রী তাহমিনা খান শৈলীর সঙ্গে যোগাযোগ করে মৃত্যুর খবর জানানো হয়। নেপালে বাংলাদেশ দূতাবাসের প্রথম সচিব খান মোহাম্মদ মঈনুল হোসেন জানান, সোমবার স্থানীয় সময় বেলা ১১টায় খালেদ এভারেস্ট জয় করেন। তাদের সঙ্গে ৮২ বছর বয়সী এক বৃদ্ধও আছেন। তিনি এভারেস্ট জয় করেছেন। দলের সদস্যরা নিচে নেমে এলে বিস্তারিত জানা যাবে। নেপালের পর্যটন মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তা থিল লাল গৌতমের বরাত দিয়ে সে দেশের কান্তিপুর অনলাইন জানায়, এভারেস্ট জয়ের কয়েক ঘণ্টা পর সোমবার বিকালে ৮,৬০০ মিটার উচ্চতায় নিজের তাঁবুতে মারা যান খালেদ। সুং হো-সিউও এদিন নামতে গিয়ে প্রাণ হারান। গৌতম জানান, সুং হো-সিউ বাড়তি অক্সিজেন না নিয়ে নামার চেষ্টা করে ব্যর্থ হন। তবে খালেদের মৃত্যুর কারণ সম্পর্কে স্পষ্ট কিছু বলতে পারেনি নেপালি গণমাধ্যম। প্রতিকূল আবহাওয়ার কারণে তার মৃত্যু হয়ে থাকতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। বিভিন্ন দেশের মোট আটজন এই অভিযানে এক সঙ্গে অংশ নেন। তিনি গত ১১ই এপ্রিল নেপালের উদ্দেশ্যে যাত্রা করেন। গত ২৫শে এপ্রিল কাঠমাণ্ডু থেকে এভারেস্টের উদ্দেশে রওনা দেন তিনি। খালেদ ও শৈলীর একমাত্র ছেলে সুস্মিতের বয়স আড়াই বছর। রাজধানীর খিলগাঁও এলাকায় তাদের বাসা। সজলদের গ্রামের বাড়ি মুন্সীগঞ্জের শ্রীনগর উপজেলার আটপাড়া ইউনিয়নের সিংপাড়া হাসারগাঁও। মূলত সজল খালেদ নামেই বেশি পরিচিত। ভাল নাম মোহাম্মদ খালেদ হোসাইন। পিতার নাম আবদুল আজিজ ও মা প্রয়াত সখিনা বেগম। চার ভাই ও দুই বোনের মধ্যে সজল সবার ছোট। পরিবার জানায়, এই অভিযান ছিল তার পঞ্চদশ অভিযান আর এভারেস্ট জয়ের দ্বিতীয় প্রচেষ্টা। এর আগে এভারেস্টের ২৪ হাজার ফুট পর্যন্ত উঠলেও বৈরী আবহাওয়ার কারণে চূড়ায় পৌঁছানো হয়নি তার। বাংলা মাউন্টেইনিয়ারিং অ্যান্ড ট্রেকিং ক্লাবের সদস্য সজল খালেদের এ অভিযানে গণমাধ্যম সহযোগী ও পৃষ্ঠপোষক হিসাবে ছিল বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেল দেশ টিভি। বাংলা মাউন্টেইনিয়ারিং অ্যান্ড ট্রেকিং ক্লাবের সদস্য রিয়াজ আহমেদ বলেন, আমরা খালেদের শেরপার সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করছি। কিন্তু তাকেও পাওয়া যাচ্ছে না। ওই ক্লাবেরই দুই সদস্য এমএ মুহিত ও নিশাত মজুমদার এর আগে এভারেস্ট জয় করেন। এদের মধ্যে নিশাত হিমালয় চূড়ায় প্রথম বাংলাদেশী নারী। আর মুহিত দুই বার এভারেস্ট জয় করেন। এদিকে অন্য পর্বতারোহীদের সুবিধার্থে পর্বতে ওঠা শেষ না হওয়া পর্যন্ত মরদেহ উদ্ধারের কাজ শুরু করা হবে না। নেপালের পর্যটন মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তা জ্ঞানেন্দ্র শ্রেষ্ঠ বলেন, পর্বতারোহণের এই মওসুম না গেলে তাদের মৃতদেহ উদ্ধার করা সম্ভব হবে না। কারণ এতে অন্য আরোহীদের সমস্যা হতে পারে। এ মওসুমে আরও পাঁচ অভিযাত্রী এভারেস্ট জয় করতে গিয়ে প্রাণ হারান। এর আগে গত ছয় দশকে প্রায় ৩০০ অভিযাত্রী এভারেস্ট জয় করতে গিয়ে মারা গেছেন, যাদের কারও কারও দেহাবশেষ হিমালয়েই রয়ে গেছে। নেপাল থেকে এভারেস্টে ওঠার জন্য মে মাসকেই সবচেয়ে ভাল সময় হিসেবে ধরা হয়। এ বছর তেনজিং নরগে ও এডমন্ড হিলারির এভারেস্ট জয়ের ৬০তম বার্ষিকীতে প্রায় ৩০০ অভিযাত্রী এভারেস্ট চূড়ায় উঠেছেন।মানবজমিন
সর্বশেষ সংবাদ
- নিউইয়র্ক স্টেট সিনেট হাউসে ‘বাংলাদেশ ডে’ উদযাপন ২৩ মার্চ : আহ্বায়ক কমিটি গঠন
- বাংলাদেশে আওয়ামীলীগসহ সকল রাজনৈতিক দলের স্বাভাবিক রাজনীতির পরিবেশ সৃষ্টি করার দাবি নিউজার্সি স্টেট আওয়ামী লীগের
- নিউইয়র্কে ‘অল কাউন্টি হেলথকেয়ার গ্রুপ’র বার্ষিক ইন্টারফেইথ ইফতার পার্টি
- HUSBAND CHARGED WITH MURDER AND DISMEMBERMENT OF WIFE WHOSE REMAINS WERE FOUND IN SEPARATE LOCATIONS ALONG BROOKVILLE BLVD AND CROSS BAY BLVD
- নিউইয়র্কে জ্যাকসন হাইটসের গ্রাফিক্স ওয়ার্ল্ডে মাসব্যাপী ইফতার আয়োজন
- নিউইর্য়কে এনওয়াইপিডি মুসলিম অফিসার সোসাইটির বার্ষিক ইফতার ডিনার ও অ্যাওয়ার্ড অনুষ্ঠিত
- নিউইয়র্কে জালালাবাদ অ্যাসোসিয়েশনের কোরআন তেলাওয়াত প্রতিযোগিতার ও ইফতার মাহফিল অনুষ্ঠিত
- যুক্তরাষ্ট্র জাতীয় পার্টির ইফতার ও দোয়া মাহফিল








