Monday, 26 October 2026 |
শিরোনাম
নিউইয়র্কে আদালতের নিষেধাজ্ঞায় স্থগিত বাংলাদেশ সোসাইটির নির্বাচন; ওসমান চৌধুরীর সদস্যপদ প্রত্যাখ্যান নিয়ে মামলা, ৫ নভেম্বর পরবর্তী শুনানি; সংবাদ সম্মেলনে আইনি পরিস্থিতি তুলে ধরল নির্বাচন কমিশন হানি ট্র্যাপে হত্যার অভিযোগ, সাগরের মামলা পিবিআইতে দেওয়ার দাবি পরিবারের; প্রধান আসামির জামিনে উদ্বেগ, দ্রুত গ্রেপ্তার ও সুষ্ঠু তদন্তের আহ্বান ওয়ার্ল্ড হিউম্যান রাইটস ডেভেলপমেন্ট ইউএসএর সাধারণ সম্পাদক ড. সাদিয়া আফরিন এরা চরমোনাই পীরের যুক্তরাষ্ট্র সফর উপলক্ষে নিউইয়র্কে দোয়া মাহফিল, কুরআন-সুন্নাহর আলোকে বয়ান New York Attorney General James Secures Reimbursements for T-Mobile Customers Whose Rates Were Unjustly Raised নিউইয়র্কে বাংলাদেশ সোসাইটির নির্বাচনে কুনু-ফিরোজ পরিষদের সাত দফা ইশতেহার ঘোষণা; কমিউনিটি সেন্টার প্রতিষ্ঠা, সাশ্রয়ী ফিউনারেল সেবা, বিমানের সরাসরি ফ্লাইট ও আর্থিক স্বচ্ছতায় অঙ্গীকার ফিলিস্তিনিদের আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকারের প্রতি বাংলাদেশের পূর্ণ সমর্থন: জাতিসংঘে রাষ্ট্রদূত আইরিন খান নিউইয়র্কে বাংলাদেশ সোসাইটির নির্বাচনে প্রথমবারের মতো বিতর্ক, গুরুত্ব পেল স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি New York Attorney General James Warns New Yorkers About AI-Generated Election Misinformation Ahead of November Elections Bangladesh calls for global treaty to protect victims of crimes against humanity
সব ক্যাটাগরি

বাবার শ্রেষ্ঠত্বই আমাদের অদৃশ্য শক্তি: নিউইয়র্ক প্রবাসী ফাহিম রেজা নূর

অনলাইন ডেস্ক পঠিত: 52 বার

প্রকাশিত: July 24, 2013 | 10:24 PM

মাহমুদ মেনন, হেড অব নিউজ বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম
বাবার শ্রেষ্ঠত্বই আমাদের অদৃশ্য শক্তি: ফাহিম রেজা নূর

নিউইয়র্ক থেকে: আমার বাবা একজন সাহসী সাংবাদিক ছিলেন। মুক্তিযুদ্ধের সেই ঝঞ্ঝাক্ষুব্ধ দিনগুলোতে তার কৌশলী সাংবাদিকতা, দৈনিক ইত্তেফাকে প্রকাশিত তার প্রতিটি লেখা একটি স্বাধীন দেশ হিসেবে বাংলাদেশের জন্মলাভের পেছনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। তার সাংবাদিকতাই মুখোশ খুলে রেখেছিলো রাজাকার, আলবদরদের। আর আজ যে বিচার চলছে- যাতে জাতি কলঙ্কমুক্ত হচ্ছে সেই বিচারেও গুরুত্বপূর্ণ দলিল হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে আমার বাবার লেখালেখি। এর চেয়ে আনন্দের- গৌরবের আর কি থাকতে পারে।
বাংলানিউজকে কথাগুলো বলছিলেন ফাহিম রেজা নূর। মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় অন্যতম শহীদ বুদ্ধিজীবী তৎকালীন দৈনিক ইত্তেফাকের নির্বাহী সম্পাদক সিরাজ উদ্দিন হোসেনের ছেলে। বর্তমানে নিউইয়র্ক প্রবাসী ফাহিম রেজা নূর নিজেও একজন সাংবাদিক। এখান থেকে প্রকাশিত জাগরণ পত্রিকার নির্বাহী সম্পাদক হিসেবে কাজ করছেন। তিনি একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটি নিউইয়র্ক শাখার আহ্বায়ক।
সম্প্রতি মুক্তিযুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদের বিরুদ্ধে ফাঁসির আদেশ হওয়ায় ফাহিম রেজা নূর ও তার পরিবার খুশি বলে জানান তিনি। ফাহিম বলেন, এই মুজাহিদ উনিশশ’ একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছিলেন। তিনিই ছিলেন আল-বদর বাহিনীর প্রধান। ১৯৭৩ সালে স্বাধীনতার পরপরই বুদ্ধিজীবী হত্যার যে বিচার হয় তাতে যেই দুই যুবক আদালতের কাছে তাদের জবানবন্দিতে সিরাজ উদ্দিন হোসেনসহ অন্য বুদ্ধিজীবীদের ধরে নেওয়ার কথা স্বীকার করেছিলেন তারাই বলেছেন আল-বদর বাহিনীর প্রধানের নির্দেশেই তারা বাড়িতে বাড়িতে গিয়ে বুদ্ধিজীবীদের ধরে এনেছিলেন। বুদ্ধিজীবীসহ মুক্তিযোদ্ধাদের হত্যার দায় মুজাহিদের ওপরই বর্তায়। আর সে কারণে আমরা খুশি, বলেন ফাহিম রেজা নূর। তবে বাবার হত্যার এই বিচার আমার মা দেখে যেতে পারেননি। মাত্র ছয় মাস আগে বুকভরা কষ্ট নিয়ে তিনি পৃথিবী থেকে বিদায় নিয়েছেন এটাই আমাদের অন্যতম আক্ষেপ।
একটি সাদা কুকুর ও হানাদার বাহিনী সেই রাতের বর্ণনায় ফাহিম রেজা নূর জানান, হানাদারদের সঙ্গে নিয়ে দেশীয় রাজাকার-আলবদররা সেরাতে তাদের বাসায় গিয়েছিলেন রাত তিনটার পরে। কিন্তু তার কিছুক্ষণ আগেও দরজায় শব্দ শুনে দরজা খুলে দেখেছিলেন একটি সাদা কুকুর। ফাহিম বলেন, দ্বিতীয় দফায় দরজায় শব্দ শুনে আমরা ভেবেছিলাম এবারও হয়তো কুকুরটিই হবে। কিন্তু শব্দের ধরণ শুনে দরজা খুলে দেখলাম এবার আর সাদা কুকুরটি নয় একদল মানুষরূপী কুকুর।
তিনি বলেন, ওরা আমার বাবাকে তার পাঞ্জাবীটিও পরতে দেয়নি।

তখন অষ্টম শ্রেণির ছাত্র ফাহিম রেজা নূর বলেন, ভুতুড়ে সেই রাতে বাবাকে ধরে নিয়ে যাওয়ার প্রতিটি ক্ষণ এখনো আমার চোখের সামনে ভাসে। আমার বাবার মতো একজন মর্যাদাসম্পন্ন মানুষকে ওরা চোখ বেঁধে টেনে হিঁচড়ে নিয়ে গেলো। গাড়ির চলে যাওয়ার শব্দে আমাদের চিৎকার আর মায়ের বুকফাঁটা আর্তনাদ সেদিন ঢাকাকে প্রকম্পিত করেছে।
আমরা আর সকালে উঠিনি পরের দিন সকালে উঠে কি করলেন? এমন প্রশ্নে ফাহিম রেজা নূর বলেন, পরের দিন সকালে আর আমরা কেউ ঘুম থেকে উঠিনি। কারণ সে রাতেই আমরা কেউ ঘুমাইনি। রাতেই খবর দেওয়া হলো পত্রিকা অফিসে। চারিদিকে খরব ছড়িয়ে পড়লো সিরাজ উদ্দিন হোসেনকে ধরে নিয়ে গেছে হানাদাররা। সংবাদপত্র অফিস থেকে সব ধরনের চেষ্টা করা হলো, রাও ফরমান আলীকে পর্যন্ত জানানো হলো কিন্তু অনেকেই শান্তনার কথা বললেও আমার বাবা আর ফেরেননি। এরপর দেশ স্বাধীন হলো। রাতের পর রাত আমাদের কেটেছে এই বুঝি বাবা আসবেন সেই ভাবনায়। কিন্তু আর ফেরেননি। মিরপুরে বুদ্ধিজীবীদের অনেকের মরদেহ যেখানে ওরা ফেলে রেখেছিলো, রায়ের বাজার বধ্যভূমিতে গিয়ে পরে খুঁজেছি। আমার বাবার লাশ কোথাও পাইনি।
বাবা ছিলেন কৌশলী সাংবাদিক একজন যোগ্য ও দেশপ্রেমিক সাংবাদিকের সন্তান হিসেবে গর্বিত ফাহিম রেজা নূর বলেন, ১৯৭০-৭১ সালে আমার বাবার লেখাগুলো ও ইত্তেফাকের তৎকালীণ রিপোর্টগুলো পড়লেই বোঝা যাবে একজন সাংবাদিক হিসেবে আমার বাবা কতটা উঁচুমানের ও কতটা নির্ভিক ছিলেন। ফাহিম বলেন, দেশের যুদ্ধের কথা লেখা যেতো না কিন্তু তখন তুরষ্ক, ইয়েমেনসহ বিশ্বের যেখানে যেখানেই সামরিক বাহিনীর তৎপরতা ছিলো তাদের অত্যাচারের কথা এমনভাকে ইত্তেফাকে তুলে ধরা হতো যেনো পাঠক পড়ে সামারিক বাহিনীর ওপর তাদের ঘৃণাবোধ জাগ্রত করতে পারে। যার পরোক্ষ প্রভাব এসে পড়তো বাংলাদেশের ওপর। ফাহিম বলেন, সেমময় অনেক রিপোর্ট বাবা এমনভাবে লিখতেন যে তার লেখা পড়ে সংগ্রামও এমন কিছু লিখতে বাধ্য হয় যা হানাদার বাহিনী ও তাদের দোসরদের কর্মকাণ্ডকে তুলে ধরে। বাবার ওই কৌশলে পড়েই সংগ্রাম অনেক ঘটনা প্রকাশ করতে বাধ্য হয়। এবং এখন সেই সংগ্রামের প্রতিবেদনই উপস্থাপিত হচ্ছে রাজকার-আলবদরদের বিচারের প্রক্রিয়ায়। এ প্রসঙ্গে তিনি সিরাজ উদ্দিন হোসেনের ‘ঠগ বাছতে গা উজার’ শীর্ষক একটি কলামের কথা উল্লেখ করে বলেন ওই কলামের পর সংগ্রাম লিখেছিলো.. ‘অতএব আর ঠগ বাছিও না…’ শীর্ষক কলাম।
বাবার শ্রেষ্ঠত্বই আমাদের শক্তি ফাহিম রেজা নূর বলেন, আমার বাবা একজন ভালো মানুষ ছিলেন। তার শ্রেষ্ঠত্বই আমাদের টিকে থাকার শক্তি হিসেবে কাজ করছে। আমরা আট ভাই। এখন সবাই নিজ নিজ ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠিত। কেউ কখনো কোনো ধরনের অন্যায় কাজের সঙ্গে জড়াইনি। কেউ কখনো অন্যকে আঘাত দেইনি। এর পেছনে আমার বাবার ‘ভালো মানুষ’ এই পরিচিতি একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। কি একটা অজানা শক্তি সবসময়ই আমাদের ফিসফিস করে বলে দেয়, কোনো খারাপ কাজের সঙ্গে জড়িত হয়ো না.. দেশের ক্ষতি হয় এমন কোনো কাজ করো না।
বাবা অত্যন্ত মানবদরদী একজন মানুষ ছিলেন। তাকে তুলে নিয়ে যাওয়ার পর আমরা সেটা বুঝতে পেরেছি। আমরা দেখেছি গলির পাশের ভিক্ষুক, পথের রিক্সাওয়ালা, মুদি দোকানদার, পত্রিকার হকার এরাই যেনো আমাদের চেয়ে বেশি কষ্ট পাচ্ছে। তাদের কান্না আমাদের কান্নাকে ছাপিয়ে যেতো। পরে জেনেছি এই গরীব-দুঃখীদের বাবা নানাভাবে অর্থ সহায়তা দিতেন।
মা অবর্তীর্ণ হলেন বাবার ভূমিকায় ফাহিম রেজা নূর বলেন, বাবাকে হারানোর পর আমরা নতুন বাবা হিসেবে পেলাম আমাদের মাকে। বাবাকে যেরাতে ধরে নিয়ে যায় তখন ঘরে মাত্র ছয় আনা ছিলো। আমরা আটটি ভাই। পরের দিন থেকেই শুরু হয় আমাদের দারিদ্র দশা। আমরা ঠিকমতো খেতে পেতাম না। মা সেলাই-ফোঁড়াই জাতীয় বিভিন্ন কাজ করতেন। আমাদের পরিবারে তখন সপ্তাহেও একদিন মাংস জুটতো না। আমার বড়ভাই শামীম রেজা নূর… তিনি নিজেও একজন মুক্তিযোদ্ধা… নিজের জীবনের সব উচ্চাশা এক পাশে রেখে তাকে তখনই ঢুকে পড়তে হয় কাজে। বায়তুল মোকাররমে একটি দোকানে কাজ করতেন। ছোট তিনটি ভাই মাংস ভাত খেতে চায়। তখন বাংলামটর থেকে প্রতিদিন পায়ে হেঁটে কাজে গিয়ে পয়সা জমিয়ে একদিন তিন পোয়া মাংস কিনেছিলেন। আমার মা বেশি করে ঝোল-আলু দিয়ে ততধিক মমতা মিসিয়ে সেই মাংস রান্না করে আমাদের খেতে দিয়েছিলেন। তবে মা কখনোই হাল ছাড়েননি। সন্তানদের শিক্ষিত করে তুলতে তিনি চেষ্টা চালিয়ে গেছেন। আজ হয়তো তার সন্তানেরা কেউই কোনো খারাপ অবস্থানে নেই। কিন্তু শুরুর সেই দিনগুলো আজও আমরা ভুলতে পারি না। মায়ের কথা বলতে গিয়ে বাকরুদ্ধ হয়ে আসে ফাহিম রেজা নূরের। বলেন মাত্র ১১ বছর বয়সে বউ হয়ে বাবার ঘরে এসেছিলেন। জীবনের ২১ বছর সধবা ও ৪২ বছর বৈধব্যে কেটেছে তার। কিন্তু মুরগীর ছানার মতো সন্তানদের নিজের ডানার নিচে ওম দিয়ে বড় করে তোলেন।
বাবার আদর্শ মায়ের মধ্যেও ছিলো প্রগাঢ়, বলেন ফাহিম রেজা নূর। যুদ্ধাপরাধের বিচারে আমার বড় ভাই, আমিসহ অন্যরা যখন সাক্ষ্য দিতে যাই তখন বার বার মা একটি কথাই বলতেন, দেখো বাবা প্রতিহিংসার বশবর্তী হয়ে কোনো মিথ্যা কথা বলো না। তোমরা শুধু যা দেখেছো যা জেনোছো তাই বলবে। আর তাতে সত্যের জয় হবেই। আজ মুজাহিদের ফাঁসি হয়েছে কিন্তু মা দেখে যেতে পারলেন না, আক্ষেপ করে বলেন ফাহিম রেজা নূর।
উল্লেখ্য ২০১২ সালের ২০ ডিসেম্বর মৃত্যুবরণ করেন সিরাজ উদ্দিন হোসেনের স্ত্রী নূরজাহান।
যুদ্ধাপরাধীদের বিচারে রায় হচ্ছে, কিন্তু এখানেই শেষ কথা নয়, এইসব রায় কার্যকর হলে তবেই আমরা সত্যিকারের খুশি হবো। শান্তি পাবে সিরাজউদ্দিন হোসেনসহ ত্রিশ লাখ শহীদের আত্মা। থামবে নূরজাহান সিরাজসহ অসংখ্য প্রিয়জনহারা নারীর বুকফাটা আর্তনাদ। সেই দিনটিরই অপেক্ষায় আমরা সবাই, বলেন ফাহিম রেজা নূর।বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম

বিজ্ঞাপন / স্পন্সরড কন্টেন্ট
ট্যাগ:
সর্বশেষ সংবাদ