 |
নিউইয়র্ক: ইমিগ্রেশন সংস্কার বিল পাশে জনমত গঠনে নতুন কৌশল নিয়েছেন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা। ১১ মিলিয়ন আনডকুমেন্টেড অভিবাসীর ভাগ্য বদলে দিতে এবার তিনি চষে বেড়াবেন পুরো দেশ। নির্বাচনের আগে যেভাবে সারা দেশ ঘুরে ভোট চেয়েছেন এবার যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতির স্বার্থে একইভাবে ঘুরবেন তিনি। তবে এই অভিযানে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতি চাঙ্গা করার যুক্তিটিকেই সামনে রাখবেন প্রেসিডেন্ট ওবামা। হোয়াইট হাউস জানিয়েছে, বুধবার শিকাগোর নক্স কলেজে বক্তব্য রাখার মধ্য দিয়ে এই প্রচার অভিযান শুরু করবেন বারাক ওবামা। বরাবরই বলা হচ্ছে, দেশে অবৈধ অভিবাসীদের বৈধতা দিয়ে কর্মশক্তিতে যোগ করা সম্ভব হলে অর্থনীতি চাঙ্গা হয়ে উঠবে। হোয়াইট হাউস বলেছে, এই বার্তা নিয়েই প্রেসিডেন্ট ওবামা সরাসরি জনগনের সাথে কথা বলবেন আগামী দিনগুলোতে। তবে এর সঙ্গে জনস্বাস্থ্য, গৃহায়ন, উচ্চশিক্ষা, কর্মসংস্থানবৃদ্ধি সহ মধ্যবিত্তের জীবন মান উন্নয়নের বিভিন্ন দিকও গুরুত্ব পাবে ওবামার আলোচনায়। উল্লেখ্য, দ্বিতীয় দফা ক্ষমতা গ্রহণের পর প্রেসিডেন্ট ওবামার সংস্কার উদ্যোগ বাঁধাগ্রস্ত হচ্ছে একের পর এক। সার্বজনীন স্বাস্থ্য সেবা আইন প্রণয়ন করা হলেও এর বাস্তবায়ন শুরু হয়নি। জাতীয় বাজেট বরাদ্ধ নিয়ে রিপাবলিকানদের সাথে টানা লড়াই চলছে। বহু প্রত্যাশীত অভিবাসন সংস্কার আইনও কংগ্রেসে থমকে আছে। সিনেটে আইন প্রস্তাব অনুমোদন পেলেও হাউসে তা পাশ হবে কি না তা ঝুলছে অনিশ্চয়তার দাড়ি পাল্লায়। রিপাবলিকানদের একটি অংশ এই বিলের পক্ষে থাকলেও তাদের নিয়ন্ত্রিত কংগ্রেসে গোটা বিষয়টিতেই ভিন্ন সুর শোনা যাচ্ছে। স্পিকার জন বোয়েনার সংখ্যাগরিষ্ঠের মত না পেলে ফ্লোরেই বিলটি ছাড়বেন না বলে জানিয়ে দিয়েছেন। এভাকেই দরিদ্র জনগোষ্ঠী এবং মধ্যবিত্তদের জন্য প্রেসিডেন্ট ওবামার প্রস্তবগুলো বারবারই আটকে দিচ্ছে কংগ্রেস। এদিকে রাষ্ট্রীয় ভর্তুকি হ্রাসের জন্য কংগ্রেসের পক্ষ থেকে ব্যয় সংকোচনের জন্য চাপ অব্যাহত রয়েছে। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক অগ্রযাত্রার বিষয়টি পুনমুল্যায়ন করেছে জানিয়েছে, ২০১৩ সালে যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় প্রবৃদ্ধি হবে মাত্র এক দশমিক সাত শতাংশ। ২০১৮ সাল যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় প্রবৃদ্ধি দুই দশমিক সাতে পৌঁছতে পারে বলেও আই এম এফ মনে করে। যুক্তরাষ্ট্রের মত শক্তিশালী অর্থনীতির দেশে জাতীয় প্রবৃদ্ধির এ অগ্রযাত্রা পূর্ব ধারনার চেয়ে কম বলে আই এম এফ থেকে বলা হয়েছে। ২০০৮ সালের মন্দা কাটিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতি ঘুরে দাঁড়াচ্ছে বলে দাবি করা হয়। অর্থনৈতিক চাঞ্চল্যের সুচকগুলো এখনও স্পষ্ট নয় মার্কিন সমাজ জীবনে। অর্থনৈতিক অগ্রযাত্রার ধীর গতিতে হতাশ যুক্তরাষ্ট্রের জনগণ। ব্যাপক কর্মহীনতা, উচ্চ শিক্ষার ব্যয় বৃদ্ধি, গৃহায়ন সমস্যা সহ কর বৃদ্ধিতে জনগণের হতাশা আরো তীব্র হয়েছে। বাজেট বরাদ্দের টানাপোড়নের কারণে রাষ্ট্রীয় কল্যাণ খাতে নি¤œ ও মধ্যবিত্তের সুযোগ সুবিধা সংকুচিত হয়েছে। এ অবস্থায় ইমিগ্রেশন সংস্কার বিলসহ যেসব সংস্কার প্রস্তাব প্রেসিডেন্ট ওবামা দিয়েছেন সেগুলো বাস্তবায়নের পথ বের করতে নতুন এই উদ্যোগ ছাড়া গতি নেই বলেই মনে করছে হোয়াইট হাউস।
প্রেসিডেন্ট ওবামার উপদেষ্টা ডেন ফাইফার বলেছেন, প্রেসিডেন্ট মনে করেন দেশের মুল সমস্যার দিকে দৃষ্টি নেই ওয়াশিংটনের। যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবিত্তের জীবন মানের উন্নয়ন নিয়ে কথা বলার পরিবর্তে আইন প্রণেতারা রাজনৈতিক টানাটানি নিয়ে বেশি ব্যস্ত। এ অবস্থায় কংগ্রেসকে পাশ কাটিয়েই অর্থনৈতিক এসব কর্মসুচী বাস্তবায়নে উদ্যোগী হচ্ছেন প্রেসিডেন্ট বরাক ওবামা। যে সব কর্মসুচী বাস্তবায়নের জন্য নতুন করে আইন প্রণয়নের প্রয়োজন নেই সেসবকেই গুরুত্ব দিয়ে প্রেসিডেন্ট ওবামা এবারে মাঠে নামছেন বলে হোয়াইট হাউস থেকে আভাস দেয়া হয়েছে। তবে ইমিগ্রেশন সংস্কার বিল এই অভিযানে বিশেষ গুরুত্ব পাবে বলেই ধারনা দিয়েছে সংশ্লিষ্ট সূত্র।
এদিকে নতুন ইমিগ্রেশন আইনে ১১ মিলিয়ন অবৈধ অভিবাসী নাগরিকত্বের পথে এগুবে ঠিকই কিন্তু তাতে তাদের ভাগ্যের পরিবর্তন কতটুকু হবে সে নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করেছেন গবেষক, শিক্ষক ও শ্রমিক অধিকার কর্মীরা।
ইমিগ্রেশন পদ্ধতিতে পরিবর্তন হলে অবৈধরা একটি ‘ছায়া থেকে বের হয়ে আসবে’ এমনটা বারবারই বলা হচ্ছে। তাতে ধরা নেওয়া যায় বৈধতা পাওয়া মানেই হচ্ছে, তারা তরতর করে উঠে যাবে ভাগ্যের সিঁড়ি বেয়ে।
কিন্তু গোটা দেশজুড়ে এখন এটা স্পষ্ট হয়ে উঠছে যে, পূর্ণাঙ্গ নাগরিকত্ব নিয়েও অনেক মানুষই থেকে যাবে ছায়া অর্থনীতির আঁধারে। তাদের আয় বৃদ্ধি ঘটবে না, কম মজুরিতেই তাদের কাজ করতে হবে। তাদের দারিদ্রের অবসান হবে না কখনোই। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, শ্রম অধিকার গবেষক ও অন্য সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে নিউইয়র্ক টাইমসের সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে এ কথা বলেছে।
এতে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের বড়-ছোট শহরগুলোতে এখন কোটি কোটি মানুষ কাপড় সেলাই করে, লনের ঘাস কেটে, অর্থের বিনিময়ে অন্যের শিশুর যতœ নিয়ে, বাড়ি নির্মাণের কাজ করে, অফিস-ঘরবাড়ি পরিস্কার করে কিংবা হোটেল রেস্টুরেন্টে খাবার সার্ভ করে যারা জীবীকা অর্জন করছে। এই অর্থনীতিটি পুরোটাই নগদ অর্থের। অবৈধ অভিবাসীরা আজ এই কাজের সুযোগগুলো নিয়ে সরকারি নজরদারি এড়িয়ে নগদ অর্থে কাজ করে যাচ্ছে।
অবৈধদের বৈধতা দেওয়ার চেষ্টায় দেশজুড়ে যে আইনজীবীরা কাজ করছেন তাদের অনেকেই এর মধ্য দিয়ে অর্থনৈতিক অগ্রগতির বিষয়টিকে অন্যতম যুক্তি হিসেবে দেখান। গেলো মাসে কংগ্রেসনাল বাজেট অফিসের দেওয়া একটি রিপোর্টকে অনেকটা লুফেও নিয়েছেন এই আইনজীবীরা। রিপোর্টটিতে বলা হয়েছে, সিনেটের দেওয়া ইমিগ্রেশন বিল বলছে এর মাধ্যমে শ্রমশক্তি বাড়বে, যা উৎপাদনশীলতা বাড়াবে। আর তার দীর্ঘ মেয়াদী ফল হিসেবে গড় মজুরি বেড়ে যাবে এবং সার্বিকভাবে এর থাকবে একটি ব্যাপক অর্থনৈতিক প্রভাব। সেই যুক্তিতে গেলো সপ্তাহে ব্যবসায়ী গ্রুপগুলো হাউজ রিপাবলিকানদের ওপর চাপ সৃষ্টি করতেও শুরু করেছে। কিন্তু নাগরিকত্ব পেলেই মানুষ ভালো কাজ পেয়ে যাবে এমনটা ভাবার সুযোগ নেই, বলেছেন গবেষকরা।
ইউনিভার্সিটি অব ক্যালিফোর্নিয়ার লেবার সেন্টারের প্রকল্প পরিচালক ভিক্টর নারোকে উদ্ধৃত করে নিউর্ক টাইমস বলেছে, বৈধতা পেলে মানুষ কাজের মাঝে যখন তখন ধরা পড়ে যাওয়ার ভয় থেকে মুক্তি পাবে। এর বেশি কিছু হবে বলে আমি মনে করি না।
২০০৯ সালে এই লেবার সেন্টারের করা একটি গবেষণায় দেখানো হয়েছে ন্যুনতম মজুরি বঞ্চিতদের মধ্যে এদেশি শ্রমিকের চেয়ে বিদেশি শ্রমিকের সংখ্যা বেশি। আর যারা অবৈধভাবে এই দেশে অবস্থান করছেন, বিশেষ করে যারা নারী শ্রমিক তাদের বঞ্চনার মাত্রা অনেক বেশি। অপেক্ষাকৃত কম মজুরিতে আমেরিকান বংশোদ্ভুত শ্রমিকদের চেয়ে বিদেশি বংশদ্ভুত শ্রমিকের কাজ করার ঘটনাও প্রায় দ্বিগুন। নারোর মতে, সরকার যতদিনে শ্রমিকের অধিকার রক্ষায় সত্যিকারের উদ্যোগ না নেবে, ততদিনে এদের ভাগ্যের কোনো পরিবর্তন হবে না। শ্রমজীবী মানুষগুলো আজ যে তিমিরে অবস্থান করছে সেই তিমিরেই থেকে যাবে। নিয়োগকর্তাদের পক্ষ থেকে স্বেচ্ছায় এমন কিছু উদ্যোগ নেওয়া হবে এমনটাও আমাদের চোখে পড়ছে না, বলেন তিনি।
গোটা আমেরিকা জুড়ে অসংখ্য শ্রমিক ন্যুনতম মজুরির চেয়ে কম মজুরিতে কাজ করছেন। হোক সে বৈধ কিংবা অবৈধ। সপ্তাহ শেষে তাদের হাতে ধরিয়ে দেওয়া হচ্ছে নগদ কিন্তু স্বল্প মজুরি। এই সামান্য মজুরিতে অনেকেই ট্যাক্স ফাঁকি দেওয়ার চেষ্টায় লিপ্ত। অন্য অনেকের কাছে একটাই বার্তা- হয় নগদ অর্থে কাজ করো… নয়তো বেকার থাকো।
শিকাগোর ইলিনোয়িস বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক নিক থিওডোরের মতে, বেশ কিছু শিল্প ও মালিকদের মধ্যে ন্যুনতম মজুরি না দেওয়ার প্রবনতা দেখা যাচ্ছে। এবং শ্রম আইন লঙ্ঘণের সবগুলো দিকই বর্তমান এসব প্রতিষ্ঠানে। তিনি বলেন, এই মালিক শ্রেণি, শ্রমিকের দুর্বলতার সুযোগ নেয়। যখন কাজ থাকে না তখন যেকোনো শর্তেই কাজ পেতে তারা রাজি হয়ে যায় শ্রমিক পক্ষ। এতে মালিকপক্ষ মনে করে, কোন অবস্থাতেই তারা এগুলো রিপোর্ট করে দেবে না অথবা সরকারের সংশ্লিষ্ট বিভাগ কখনোই এর খোঁজ খবর নেবে না।
যুক্তরাষ্ট্রে বছরে দুই ট্রিলিয়ন ডলার আয়ই থেকে যায় আনরিপোর্টেড। উইসকনসিন বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রফেসর এমিরিটাস এডগার এল ফিজ একথা জানিয়ে বলেছেন, ঠিক কতজন শ্রমিক নগদ অর্থে কাজ করছে তা জানার কোনো উপায়ই এখানে নেই। আন্ডারগ্রাউন্ড ও নগদ অর্থ চালাচালি নিয়ে দীর্ঘ এক দশক গবেষণার অভিজ্ঞতা রয়েছে অধ্যাপক ফিজের। নগদ অর্থে মজুরি দিয়ে ব্যবসা করে যাচ্ছে হাজার হাজার ব্যবসায়ী। এটাই যেনো এখনকার নিয়মে পরিণত হয়েছে। তারা এর পরিবর্তন হোক সেটা যেমন চায় না, তেমনি কেউ তাদের তা পরিবর্তনের জন্য বলেও না। নতুন ইমিগ্রেশন বিল নিয়োগকর্তাদের এই নিচু পথ পরিহার করাবে এমন নিশ্চয়তাও নেই, এ কথা বলেছেন সিটি ইউনিভার্সিটি অব নিউ ইয়র্ক গ্রাজুয়েট সেন্টারের সমাজ বিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক শ্রম বিশেষজ্ঞ রুথ মিল্কম্যান।
রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে যারা কাজ খোঁজেন, তাদেরকেই ধরে নেওয়া হয় নগদ অর্থের প্রধানতম শ্রমিক হিসেবে। এই মানুষগুলোই হয়তো তার নিজের দেশে মেকানিক, প্রকৌশলী এমনকি স্থপতি কিংবা চিকিৎসক ছিলেন। এরাই এদেশে এখন আনডকুমেন্টেড অভিবাসী। এরা দিনে একটা কাজ খোঁজেন রাতে হয়তো আরেকটি কাজ করেন। উভয় কাজই তারা করছেন নগদ অর্থে।
লেবার ডিপার্টমেন্টের গত মাসের রিপোর্টে জানানো হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রে ২৭ লাখ অস্থায়ী শ্রমিক রয়েছে, যা অতীতের যে কোনো সময়ের চেয়ে বেশি। প্রতিনিয়ত নতুন নতুন কোম্পানি এভাবে অস্থায়ী শ্রমিক দিয়ে কাজ করিয়ে নেওয়ার দিকে ঝুঁকছে। আর এ সংখ্যা যত বাড়বে ততই দিন মজুরের সংখ্যা বাড়তে থাকবে। হোক সে আমেরিকান বৈধ শ্রমিক কিংবা অবৈধ ইমিগ্র্যান্ট। এক্ষেত্রে মালিকের সুবিধা হচ্ছে, আজ কাজ দিচ্ছে- কাল চাইলেই কাজ বন্ধ রাখছে। অবৈধরা বৈধ হলেও একই অবস্থা চলতে থাকবে। ক্রমেই এর সংখ্যা বাড়বে। আর শ্রমশক্তিতে যখন নতুন নতুন শ্রমিক যোগ হবে তখন বেড়ে যাবে কর্মসংস্থানের প্রতিযোগিতা। ফলে শ্রমিকের কাজের নিশ্চয়তা কমে যাবে। তারা যে অন্ধকারে রয়েছে সেই অন্ধকারেই থেকে যাবে। বৈধ হলেই তাদের দারিদ্র ঘুচে যাবে না।বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম