প্রবাসে মুক্তিযুদ্ধের নীরব সংগঠক ইসাদ আলী
সাখাওয়াত হোসেন সেলিম : স্বাধীনতা এক অমূল্য ঐশ্বর্য, অনন্য সম্মান। স্বাধীনতা বাঙালির চিরকালের অবিনাশী গান। স্বাধীনতা বাঙালির হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ অর্জন। বিশ্বের ইতিহাসে একটি স্বাধীন দেশের জন্য দীর্ঘ নয় মাস রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ করেছে বাঙালি বীর মুক্তিযোদ্ধারা। তা স্বর্ণাক্ষরে ইতিহাসের পাতায় স্মরণীয় হয়ে থাকবে। মুক্তিযোদ্ধাদের আত্মত্যাগের বিনিময়ে দেশ ও জাতি স্বাধীনতা ভোগ করছে। বাংলাদেশের পতাকা যতদিন উড়বে ততদিন মুক্তিযোদ্ধাদের নিকট ঋণী হয়ে থাকতে হবে। সে ঋণ অপরিশোধযোগ্য। মুক্তিযোদ্ধারা সরকারের সর্বকালের সকল ধরনের সম্মান পেয়ে থাকবেন, এমনকি তাদের প্রজন্মরাও তা পাওয়ার অধিকার রাখে। বহির্বিশ্বে তাই হয়ে থাকে।
মহান মুক্তিযুদ্ধে যারা বীরত্ব দেখিয়েছেন, জীবন উত্সর্গ করেছেন, ঐতিহাসিক অবদান রেখেছেন, তাদের অনেককে সরকার জাতির পক্ষ থেকে আলাদাভাবে সর্বোচ্চ মর্যাদা দিয়েছে। সে সময় মুক্তিযোদ্ধাদের মধ্যে অনেককে নানা উপাধিতে শ্রেষ্ঠত্বের ঘোষণা দেয়া হয়। এসব উপাধি মুক্তিযোদ্ধার অমর প্রতীক। বিনম্র শ্রদ্ধা ও ভালবাসায় জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তানদের স্মরণ করা হয় প্রতি বছর।
আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধে যে বিদেশি বন্ধুরা সহযোগিতা করেছেন তাদেরকে সরকার সম্মাননা প্রদান করেছেন। কিন্তু দেশের বাইরেও এমন অনেকে ছিলেন যারা প্রবাসে থেকেও নানা প্রতিকুলতায় স্বদেশের স্বাধীনতার জন্য মূল্যবান শ্রম ও অর্থ ব্যয় করেছেন। তাদের কেউ মূল্যায়ন করেনি। এমনকি জাতি তাদের নামও মনে রাখেনি।
এমনি একজন প্রবাসী হচ্ছেন ইসাদ আলী। যিনি যুক্তরাষ্ট্রে থেকেও দেশ মাতৃকার মুক্তি সংগ্রামে অনন্য ভ’মিকা রেখেছেন। মুক্তিযুদ্ধের নীরব সংগঠক ইসাদ আলীর জীবদ্দশায় মেলেনি তার স্বীকৃতি। মুক্তিযুদ্ধের এই নীরব সংগঠকের জন্ম ১৯১৯ সালের ১৫ জানুয়ারী বৃহত্তর সিলেটের ছাতকের কাইতকোনা গ্রামে। জাহাজের চাকুরির সুবাদে ১৯৪৭ সালে ইসাদ আলী জাহাজে চড়ে চলে আসেন আমেরিকায়। শীতের এক সন্ধ্যায় তার জাহাজ ভীড়ে বাল্টিমোর বন্দরে। নোঙ্গরের শিকল বেয়ে মাথায় কিচেনের একটা ডেকচি দিয়ে নেমে পড়েন বরফ শীতল জলে। সাঁতরে অর্ধমৃত অবস্থায় তীরে উঠে সন্নিকটে এক বাসায় গিয়ে আশ্রয় নেন। মধ্য বয়সী এক মহিলা তার দুরবস্থা থেকে গরম কাপড় আর খাবার দিয়ে তাকে সুস্থ করে তুলেন। রাতটা সে বাড়ীতে কোনরকমে কাটিয়ে ওই মহিলার সহায়তায় তার দেয়া টিকিটে তিনি চলে আসেন ম্যানহাটান ডাউনটাউনের এলেন স্ট্রীটে। শুরু হয় তার সংগ্রামী জীবন। গড়েন জীবন সংগ্রামের এক ইতিহাস।
কঠিন জীবন সংগ্রামে তার জীবনে শূন্য থেকে আসে পূর্ণতা। সেময় ৩০ ওয়েষ্ট সেন্ট্রাল পার্কে সাউথে পেন হাউসে কাজ নেন। দিনরাত পরিশ্রম করে ইসাদ আলী কিছূ মূলধন সংগ্রহ করেন। সঞ্চিত অর্থে ১৯৫৮ সালের মে মাসে নিজ মালিকানায় চালু করেন বোম্বে ইন্ডিয়া নামে একটি রেস্টুরেন্ট। নিউইয়র্কে রেষ্টুরেন্ট ব্যবসায় ইসাদ আলী ছিলেন বাংলাদেশীদের মধ্যে দ্বিতীয় এবং উপমহাদেশের মধ্যে তৃতীয় ব্যক্তি। এ রেস্টুরেন্ট ব্যবসায় ইসাদ আলীর ভাগ্যের চাকা ঘুরে যায়। ব্যবসার সাফল্যের ধারাবাহিকতায় ১৯৭৩ সালে ২৩৪ ওয়েষ্ট ৫৬ স্ট্রীটে প্রতিষ্ঠা করেন বোম্বে ইন্ডিয়া -২ নামে আরেকটি রেষ্টুরেন্ট।
১৯৭১ সালে যখন দেশে মুক্তিযুদ্ধ শুরু হয় তখন দেশ মাতৃকাকে মুক্ত করার সংগ্রামে প্রবাসীরাও নানাভাবে ভ’মিকা রাখেন। নিউইয়র্কে হবিগঞ্জ প্রবাসী কাজী শামসুদ্দিন আহমদের নেতৃত্বে এগিয়ে আসেন ইসাদ আলী সহ আরো অনেকে। ম্যানহাটানের ১০৩ ব্রডওয়েতে ছিল কাজী শামসুদ্দিন আহমদের বিখ্যাত বিট অব বেঙ্গল রেষ্টুরেন্ট। সে রেষ্টুরেন্টেই মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে বসতো নিয়মিত মিটিং। ইসাদ আলী সহ অনেকেই যোগ দিতেন সে মিটিংয়ে। সেখান থেকেই প্রণীত হতো আন্দোলন সংগ্রামের নানা কর্মসুচি। কর্মসূচি মোতাবেক জাতিসংঘ, হোওয়াইট হাউসের সামনে ডেমোনেষ্ট্রেশন হতো। ডেমোনেষ্ট্রেশন সহ সকল কর্মসূচিতে যোগ দিতেন ইসাদ আলী। ইসাদ আলী শুধু এসব অনুষ্ঠানে যোগই দিতেন না, অনুষ্ঠান খরচের বড় আর্থিক যোগানদাতাও ছিলেন তিনি। বিভিন্ন কর্মসূচি বাস্তবায়নের জন্য চাঁদা তোলা হতো। একবার ইসাদ আলী একাই চাঁদা দেন ১ হাজার ডলার। সেসময় মানুষ পুরো সপ্তাহে কাজ করে মজুরি পেতো মাত্র ৫০ ডলার।
ইসাদ আলীর ভাতিজা সুনামগঞ্জ জেলা সমিতির সভাপতি আপ্তাব আলী জানান, ইসাদ আলী যে ১ হাজার ডলার চাঁদা দিয়েছিলেন তা সংগঠক কাজী শামসুদ্দিন আহমেদ কথা প্রসঙ্গে তার কাছে উল্লেখ করেছিলেন। নিউইয়র্কের বানজারা রেষ্টুরেন্টের আবু সুফিয়ানও ইসাদ আলীর আর্থিক সহায়তার বিষয়টি উল্লেখ করেন।
আপ্তাব আলী জানান, মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে ওয়াশিংটনে হোয়াইট হাউজের সামনে এক ডেমোশনষ্ট্রেশনের আয়োজন করা হয়। নিউইয়র্ক থেকে ২ বাস ভর্তি বাঙ্গালী সেখানে যোগ দেন। ডেমোনেষ্ট্রেশনে অংশগ্রহণকারী বাংলাদেশীদের খাবার সরবরাহ করেন ইসাদ আলী তার রেষ্টুরেন্ট থেকে। এভাবে ইসাদ আলী মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন অনেক আন্দোলন সংগ্রামে অসামান্য ভ’মিকা রাখেন।
বাংলাদেশের মুক্তি সংগ্রামে প্রবাস থেকে মুক্তিযুদ্ধের সহযোগি ইসাদ আলী ১৯৮২ সালের ৪ জানুয়ারী ইন্তেকাল করেন নিউইয়র্কে। শেষ ইচ্ছা অনুযায়ী তার লাশ দাফন করা হয় দেশের বাড়ী সুনামগঞ্জে। কোন প্রতিদানের আশা না করেই ইসাদ আলী মহান মুক্তিযুদ্ধের সমর্থনে মিটিং-মিছিলে অংশ নিয়েছিলেন, দু’হাতে বিলিয়েছেন কষ্টার্জিত অর্থ। কিন্তু তার এ অবদানের স্বীকৃতি মেলেনি আজো। উল্টো দেশ স্বাধীন হওয়ার পর দেশে গিয়ে ঢাকা বিমান বন্দরে নাজেহালের শিকার হন তিনি। এ করুণ ঘটনা তিনি দুঃখ করে নিউইয়র্কে ফিরে এসে বলেছিলেন তার স্বজনদের কাছে।
ইসাদ আলীর ভাতিজা সুনামগঞ্জ জেলা সমিতির সভাপতি আপ্তাব আলী জানান, দেশ স্বাধীন হবার পরও তার চাচা ইসাদ আলী দেশের জন্য সহায়তায় হাত প্রসারিত করেন। দেশ ও প্রবাসে মানুষের কল্যাণে সমানভাবে ভ’মিকা রাখেন তিনি। যুক্তরাষ্ট্রে নতুন কেউ এলে তার থাকা-খাওয়া, চাকুরীর ব্যবস্থা করতেন, লিগ্যাল হবার জন্য করতেন সহযোগিতা। ইসাদ আলী ছিলেন সংস্কৃতিমনা। অন্তরে লালন করতেন দেশজ সংস্কৃতি। তার রেষ্টুরেন্টে প্রতি শুক্রবার রাতে আসর বসতো দেশীয় গানের। বেহালা এবং দোতরা বাজিয়ে গান গাইতেন বিয়ানী বাজারের কুতুব আলী। নিউজার্সী থেকে আসতেন হিরু চৌধুরী, লাল মিয়া, আরব আলী, সিরাজ মিয়া সহ অনেকেই। সারারাত চলতো গানের আসর। ঢোল বাজাতেন নিউজার্সী থেকে আগত লটাই মিয়া, হারমোনিয়াম বাজাতেন আঃ মোসাবির জিতু।
৭১ এর উত্তাল দিনে যারা প্রবাসে থেকেও মুক্তযুদ্ধের পক্ষে বিক্ষোভ সমাবেশ করেছেন, আন্দোলন সংগ্রামে অংশ নিয়েছেন। কষ্টার্জিত অর্থ ও সময় ব্যয় করেছেন ইসাদ আলীর মত তাদের অনেকেই আজ বেঁচে নেই। আবার সেসব দিনের জ্বলজ্বলে স্মৃতি বুকে নিয়ে কেউ কেউ বেঁচেও আছেন। ছড়িয়ে আছেন নিউইয়র্কসহ বিভিন্ন স্থানে। মুক্তিযুদ্ধের সত্যিকার ইতিহাস রচনায় তাদের খুঁজে বের করা উচিত বলে অনেকে মনে করেন।
সংশ্লিষ্টরা বলেন, আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধে সহযোগিতাদানকারী বিদেশি বন্ধুদের সরকার সম্মাননা প্রদান করেছেন। এটা অবশ্যই একটি মহৎ উদ্যোগ। পাশাপাশি বিদেশি বন্ধুদের ন্যায় প্রবাসে থেকেও মহান মুক্তিযুদ্ধে যারা যথাসাধ্য ভ’মিকা রেখেছিলেন তাদেরও মূল্যায়ন করা উচিত বলে বলে তারা মনে করেন।
- Global Anticipation Builds as Dr. Mostofa Sarwar’s Sunflower Wounds Debuts with Successful Houston Open House and Worldwide Pre-Order Milestone
- যুক্তরাষ্ট্রে ৭৫ দেশের অভিবাসী ভিসায় অনিশ্চয়তা, আদালতের নির্দেশের পরও কাটেনি জট
- Human Rights Must Be at the Heart of Economic Governance and Policies: Ambassador Irene Khan
- বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার স্বদেশ প্রত্যাবর্তন বাস্তবায়ন উপলক্ষে নিউইয়র্কে সমাবেশ, আগামী ডিসেম্বরে শেখ হাসিনার সঙ্গে দেশে ফেরার প্রত্যয় আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের
- অর্থনৈতিক নীতিনির্ধারণের কেন্দ্রে মানবাধিকারকে রাখতে হবে: জাতিসংঘে বাংলাদেশের স্থায়ী প্রতিনিধি আইরিন খান
- নিউইয়র্কে হিউম্যান সাপোর্টের বিনামূল্যে ফ্লু টিকাদান কর্মসূচি
- New York Attorney General James Announces Election Protection Hotline Ahead of November General Election
- ASAAL’s 19th Annual Convention Draws Nearly 500, Calls for Stronger Civic Engagement and Workers’ Rights