Thursday, 29 October 2026 |
শিরোনাম
New York Attorney General James Secures More Than $480,000 and Debt Relief for New York Homeowners এই জীবন চিরস্থায়ী নয়, একদিন মরে যাবো নিউইয়র্কে বাংলাদেশ সোসাইটির নির্বাচন নিয়ে অনিশ্চয়তা আরও বেড়েছে; ১৭ ডিসেম্বর উভয় পক্ষকে তথ্য-উপাত্ত জমার নির্দেশ নিউইয়র্কে নৃত্যশিল্পী ও সাংস্কৃতিক সংগঠক তাহসিন ফেরদৌসের অকালমৃত্যু, বাংলাদেশি কমিউনিটিতে শোকের ছায়া নিউইয়র্কে আবেয়া’র দ্বিবার্ষিক সম্মেলন ও ফ্যামিলি নাইট: প্রযুক্তি সেমিনার, জব ফেয়ার, বিজ্ঞান মেলা ও সাংস্কৃতিক উৎসব Global Anticipation Builds as Dr. Mostofa Sarwar’s Sunflower Wounds Debuts with Successful Houston Open House and Worldwide Pre-Order Milestone যুক্তরাষ্ট্রে ৭৫ দেশের অভিবাসী ভিসায় অনিশ্চয়তা, আদালতের নির্দেশের পরও কাটেনি জট Human Rights Must Be at the Heart of Economic Governance and Policies: Ambassador Irene Khan বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার স্বদেশ প্রত্যাবর্তন বাস্তবায়ন উপলক্ষে নিউইয়র্কে সমাবেশ, আগামী ডিসেম্বরে শেখ হাসিনার সঙ্গে দেশে ফেরার প্রত্যয় আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের অর্থনৈতিক নীতিনির্ধারণের কেন্দ্রে মানবাধিকারকে রাখতে হবে: জাতিসংঘে বাংলাদেশের স্থায়ী প্রতিনিধি আইরিন খান
সব ক্যাটাগরি

নিউইয়র্কে কোরবানি ঈদের আনন্দ

অনলাইন ডেস্ক পঠিত: 50 বার

প্রকাশিত: October 4, 2014 | 10:49 AM

পাড়াগাঁয়ের সাধারণ মানুষ তিনি। পেশা গৃহস্থি। জমি-জমা, গরু-ছাগলের পাল দেখাশোনা করাই ছিল তাঁর কাজ। ষাটোর্ধ্ব মানুষটি সাদা পায়জামা-পাঞ্জাবি আর কাঁধে গামছা ফেলে টইটই করে ঘুরে বেড়াতেন গ্রামময়। গ্রামের জলাজংলায় সারা জীবন কাটিয়ে দেওয়া সেই মানুষটির সঙ্গে সেদিন দেখা হলো নিউইয়র্কের জ্যাকসন হাইটসের থার্টি সেভেন অ্যাভিনিউতে। কাঁধে গামছাটা নাই, তবে পরনে আছে সাদা পাজামা-পাঞ্জাবি, মাথায় সাদা টুপি। বাংলাদেশের গ্রামের সহজ সরল মানুষ। ঝকঝকে, তকতকে নিউইয়র্ক শহরের সঙ্গে ঠিক মানায় না!
—কী খবর, মন খারাপ কেন ?
—আর বলবেন না, এভাবে কি কোরবানি ঈদ করে মানুষ ? গ্রোসারি শপে গেলাম অর্ডার দিতে। নিজের নাম আর বাপের নাম লিখে দিয়ে আসলাম।
—তাতে সমস্যা কী ?
— কোথায় তারা কোরবানি দেবে জানি না। নিজেরা উপস্থিত থাকতে না পারলে কি আনন্দ হয় বলেন! গ্রোসারি মালিক বলল, মাংস দেবে সন্ধ্যা বেলা। আবার না-ও দিতে পারে। পরের দিনও হতে পারে।
বয়স্ক এই মানুষটির নাম মতিউর রহমান হাওলাদার। শরীয়তপুর জেলার নড়িয়া উপজেলার ফতেজঙ্গপুর গ্রামে বাড়ি তাঁর। সস্ত্রীক ছয় মাস ধরে আছেন মেয়ের বাসায়। মেয়ে আর মেয়েজামাই সকাল হলেই ম্যানহাটানে কাজে চলে যান। তাঁদের দুই মেয়েকে স্কুল থেকে আনা-নেওয়া, দেখাশোনার দায়িত্ব এখন নানা-নানির। মেয়ের আবার সন্তান হবে। নতুন অতিথি পৃথিবীতে না আসা পর্যন্ত আমেরিকা ছাড়তে পারছেন না তাঁরা। কিন্তু গাঁও গেরামের মানুষদের কীভাবে ভালো লাগবে এখানে থাকতে ! বিশেষ করে ঈদ বা কোনো পার্বণ এলে, তাদের মন শুধু কেমন কেমন করতে থাকে দেশের জন্য।
মারুফ হাসান নামে এক তরুণ স্টুডেন্ট ভিসা নিয়ে নিউইয়র্কে এসেছেন দুই বছর আগে। এখানে পড়াশোনার পাশাপাশি হলুদ ক্যাব চালান। রোজগারপাতি মন্দ না। একা থাকার কারণে খাওয়া-দাওয়া যা একটু সমস্যা হয়। তাই ঈদ এলে সে মহাখুশি হয়। দাওয়াত থাকে প্রচুর। এই বাসায়, ওই বাসায় খেয়ে দিন পার হয়ে যায়। কিন্তু একটা ব্যাপারে সে প্রথমবার খুব অবাক হয়েছিল। কোথাও গরু বা খাসি কোরবানি দেওয়ার আওয়াজ নেই, রাস্তায় এক ফোটা রক্ত নাই, ছুরি হাতে কাউকে দেখা যাচ্ছে না, কিন্তু এত মাংস কোথা থেকে এল?
তানশি আর মাহির ওর মায়ের সঙ্গে দিনাজপুরের পাবর্তীপুর থেকে নিউইয়র্কে এসেছে মাত্র তিন মাস হলো। ওর বাবা তোসাররফ আলী নিজেকে গুছিয়ে নিতে না পারার জন্য এত দিন আনেননি ওদের। সেদিন স্ত্রী পুতুলের সঙ্গে কোরবানি ঈদের পরিকল্পনা করার সময় ছেলেমেয়েরা তো অবাক বিস্ময়ে ছুটে এল। ‘কী বলো বাবা, কোরবানি ঈদ নাকি সামনে? কই আমরা তো টেরই পাচ্ছি না !’ ছোট্ট এই দুই ভাইবোনের কাছে ঈদ মানে শহরের নানাবাড়ি থেকে গ্রামে দাদাবাড়িতে যাওয়া। চাচাতো-ফুফাতো ভাইবোনদের সঙ্গে একত্র হওয়া। সারা দিন ছোটাছুটি আর মজা।
ওপরের চিত্রগুলি নিউইয়র্ক শহরের। সবাই জানেন যে, বছর ঘুরে মুসলিম সম্প্রদায়ের দ্বিতীয় বৃহত্তম ধর্মীয় উত্সব পবিত্র ঈদুল আজহা সমাগত। এই ঈদে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো কোরবানি দেওয়া। একসময় নিউইয়র্কে কোরবানি দেওয়া এত জনপ্রিয় ছিল না। কিন্তু ক্রমে এই শহরে বাঙালির সংখ্যা বাড়ার পাশাপাশি তাদের নানা ধরনের উত্সব-পার্বণ উদযাপনের জোয়ারও তৈরি হয়েছে। আগে অনেকে বাংলাদেশে কোরবানি দিতেন। এখনও দেন। তার পরও পরিবার-পরিজন নিয়ে নিউইয়র্কে থাকাতে এখানেই কোরবানি দিয়ে থাকেন বেশির ভাগই। আমেরিকায় জন্ম নেওয়া পরের প্রজন্মকে বাপ-দাদার ধর্মীয় ঐতিহ্যের সঙ্গে পরিচয় করে দেওয়ার জন্যও অনেকে এখানে কোরবানি দিয়ে থাকেন।
দেশে কোরবানি দেওয়া আর নিউইয়র্ক শহরে কোরবানি দেওয়ার মধ্যে পার্থক্য অনেক। বাংলাদেশে যারা কোরবানি দেন, তাঁরা হাট থেকে গরু কিনে আনেন। তারপর সেই গরু জবাই করেন রাস্তা, বাড়ির উঠানে কিংবা মাঠে। তারপর সেই গরুর মাংস সমান তিন ভাগে ভাগ করা হয়। একভাগ নিজেদের জন্য, একভাগ আত্মীয়স্বজন আর আরেক ভাগ গরিবদের জন্য রাখা হয়। আর এখানে কোরবানি দেওয়ার সবচেয়ে সহজ উপায় হলো বাংলাদেশি মালিকানাধীন মুদি দোকান বা গ্রোসারিতে গিয়ে নিজের নাম দিয়ে আসা।
তবে অতি উত্সাহী কেউ কেউ আছেন যাঁরা কয়েকজন মিলে খামারে গিয়ে গরু বাছাই করে কোরবানি দেন। তারপর সেই মাংস সমান তিন ভাগ করে এক ভাগ নিজেরা রাখেন, বাকি দুই ভাগ আত্মীয়স্বজন ও বন্ধুবান্ধবদের বাড়ি বাড়ি গিয়ে দিয়ে আসেন। এখানে ফকির-মিসকিনদের দেওয়ার সুযোগ নেই। তাই মাংস বিতরণে সমস্যার মধ্যেই পড়তে হয় অনেককে। সবার বাসায়ই মাংস, তাই কারও আগ্রহ থাকে না অন্যের মাংস নেওয়ার। এখানে কোরবানি দেওয়া গরুর এক ভাগে থেকে প্রায় ৭০ থেকে ৮০ পাউন্ড মাংস পাওয়া যায়। এক ভাগের নিচে দেওয়া যায় না বলে পরিমাণও কমানো যায় না।
গরু এক ভাগ দিতে এখানে খরচ পড়ে ৩০০ থেকে সাড়ে ৩০০ ডলার। গরিবদের মাংস বিতরণ করা যায় না বলে অনেকে সেই অঙ্কের টাকা দেশে পাঠিয়ে দেন। এতে করে খরচ আরও বেড়ে যায়। নিউইয়র্কের কুইন্সের জ্যামাইকা, নিউজার্সি, পেনসেলভানিয়া, লংআইল্যান্ডে অবস্থিত গরুর খামার থেকে মাংস সংগ্রহ করে গ্রোসারি বা মুদি দোকানগুলি। প্রত্যেক খামারে মৌলভি রাখা হয়, যাঁরা আল্লাহর নাম নিয়ে কোরবানি দিয়ে থাকেন। এখানে বেশির ভাগ গরুর খামারের মালিক আরব বংশোদ্ভূত। স্প্যানিশরাও আছেন অনেক। কেউ কেউ ছাগল, দুম্বা, ভেড়াও কোরবানি দেন।
ঈদের দিন সকালে খাবারদাবার নিয়ে পুরো পরিবার খামারে চলে যাবার রেওয়াজও আছে। সারা দিন সেখানে থেকে ড্রেসড-প্যাকেট করা মাংস নিয়ে বাসায় ফেরেন তাঁরা। সেই মাংস বিতরণে শুরু হয় আরেক সংগ্রাম। ছুটির দিন না হলে কাউকে বাসায় পাওয়া কঠিন। আবার এখানে প্রত্যেক বাড়িতে ফ্রিজ মালিকরাই বসিয়ে দিয়ে যান। সবারই একটাই ফ্রিজ। সেখানে কতখানি আর জায়গা মেলে ! তবু আনন্দ থেমে থাকে না। রোজার ঈদের মতো কোরবানি ঈদের আগের রাত মানে চাঁদ রাতে বাংলাদেশি অধ্যুষিত এলাকায় মানুষের ঢল নামে। সবাই চাল-ডাল-মসলাপাতি কেনেন। ফুটপাতগুলোতে পোশাক, জুতা, জুয়েলারিসহ নানা পণ্যের পসরা সাজিয়ে বসেন নানা দেশের ব্যবসায়ীরা। চেয়ার-টেবিল ফেলে মেহেদির আল্পনা আঁঁকে কিশোরী-তরুণী থেকে শুরু করে সব বয়সের নারীরা।
তবে এবারের কোরবানি ঈদের আনন্দে বাদ সেধেছে খামার মালিকদরে অতিরিক্ত মুনাফার খায়েশ। বাংলাদেশি অধ্যুষিত এলাকায় প্রতিষ্ঠিত গ্রোসারি মালিকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, এবারের ঈদে গরু ও খাসির সংকট রয়েছে। যে কারণে গত বছরের তুলনায় এবার কোরবানির ব্যয় বাড়বে। তাঁরা জানান, নিউইয়র্ক রাজ্য বা তার আশপাশে গরু ও খাসির যাঁরা পাইকারি বিক্রেতা, তাঁরা ইতিমধ্যেই বুঝে গেছেন মুসলমানদের ধর্মীয় উত্সব ঈদুল আজহা আসছে। এ সময় মুসলিম সম্প্রদায়ের লোকজন কোরবানি দিয়ে থাকেন। তাঁরা ভালোভাবেই জানেন, দাম বেশি হলেও তারা কোরবানি দেবেন। যে কারণে এই কৃত্রিম সংকট তৈরি হয়েছে। গত বছর গরুপ্রতি পাউন্ড ছিল ২.৯৯ ডলার থেকে ৩.২৯ ডলার। এবার কোরবানি আসার আগেই দুই সপ্তাহ ধরে প্রতি পাউন্ড মাংস বিক্রি হচ্ছে ৩.৪৯ ডলারে। তারা জানিয়েছেন, গরুর সংকটের কারণে এই দাম চার ডলার ছাড়িয়ে যেতে পারে। কোনো কোনো গ্রোসারি মালিক যদি সরবরাহ না করতে না পারেন, সেই শঙ্কা থেকে অর্ডার নেয়া বন্ধ রেখেছেন।
‘ওদেরও তো মুনাফার টার্গেট থাকে। সারা বছর খামার মালিকরা অপেক্ষা করে থাকে এই সময়ের জন্য। এ কারণে দাম কিছুটা বাড়তে পারে। তবে এবারের বৃদ্ধিটা একটু বেশি অস্বাভাবিক।’ বললেন, জ্যাকসন হাইটসের সবচেয়ে পুরনো গ্রোসারি ‘মেঘনা’র স্বত্বাধিকারী আনোয়ার হোসেন। এ প্রসঙ্গে কথা বলতে গিয়ে আরও জানালেন, ‘পেনসেলভানিয়া বা নিউজার্সির খামার থেকে আমার দোকানের গরু আসে। আমেরিকায় গরু উত্পাদন তো শুধু কোরবানি ঈদ-নির্ভর নয়। এখানে লাইফস্টক ব্যবসা খুব জমজমাট। সারা দুনিয়ায় রপ্তানি করে তারা। তাই এখানে গরু-ছাগলের সংকট আছে, এটা আমি বিশ্বাস করতে পারি না। তবে একদিনের জন্য এত বেশি সরবরাহ করতে গিয়ে সমস্যা হতেই পারে।’ তাজ গ্রোসারির মালিক মজিবর রহমান বাবু একটা গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দিলেন। গরুর খাবারের দাম বেড়ে যাওয়ার কারণে মাংসের দাম বেড়েছে বলে জানান তিনি, ‘গরুর খাবারের দাম বৃদ্ধি পেয়েছে। তারপর আগের তুলনায় নিউইয়র্কে এখন বাঙালি বেশি। গত বছর যে পরিমাণ অর্ডার পেয়েছি, এবারের অর্ডার তার চেয়ে অনেক বেশি।’
জ্যাকসন হাইটস, ব্রংকস, জ্যামাইকাসহ বাংলাদেশি অধ্যুষিত এলাকায় প্রতিষ্ঠিত গ্রোসারি মান্নান সুপার মার্কেটের স্বত্বাধিকারী সৈয়দ রহমান মান্নান কথা বলেন গরু ও খাসির সংকট নিয়ে, ‘যারা এখানে হোল সেলার রয়েছেন, তাঁরা ভালোভাবে জেনে গেছেন মুসলিম সম্প্রদায়কে দাম বাড়লেও কোরবানি দিতে হবে। যে কারণে তাঁরা হয়তো কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করেছেন বেশি মুনাফার আশায়। আমরা যারা সত্যিকারের হালাল মাংস বিক্রি করছি তাদেরকে বেশি দামেই বিক্রি করতে হবে। আর যাঁরা হালাল বলে চালিয়ে যাচ্ছেন, তাঁরা কিছুটা কম মূল্যে বিক্রি করতে পারবেন।’ জ্যাকসন হাইটসের তিতাস গ্রোসারির আবুল ফজল দিদারুল ইসলাম, হাটবাজারের মনসুর চৌধুরী, জ্যামাইকার কারওয়ান বাজার সুপার মার্কেটের ইলিয়াস খান, ব্রুকলিনের বাংলানগর সুপার মার্কেটের আনোয়ার হোসেন সবাই জানালেন, ‘অন্যান্য বছরের তুলনায় এবার অর্ডার বেশি পাচ্ছি। সময় গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে অর্ডার বাড়ছে।’

তবে সব মালিকের মধ্যেই আশঙ্কা বিরাজ করছে যে, নির্ধারিত দিনে ক্রেতাদের চাহিদা তাঁরা পূরণ করতে পারবেন কি না ! জ্যাকসন হাইটসের খামার বাড়ির স্বত্বাধিকারী কামরুজ্জামান জানান, ‘এবার আমরা ভয়ে অর্ডারের জন্য সাইন বোর্ড পর্যন্ত লাগাইনি। এবার গরু ও খাসির সংকট থাকার কারণে বেশি পরিমাণে অর্ডার নিতে চাইছি না। যদি অর্ডার নিয়ে দিতে না পারি তবে বাজারে আমাদের সুনাম নষ্ট হবে।’
মনিজা রহমান
নিউইয়র্ক, যুক্তরাষ্ট্র

বিজ্ঞাপন / স্পন্সরড কন্টেন্ট
ট্যাগ:
সর্বশেষ সংবাদ