Friday, 26 June 2026 |
শিরোনাম
নিউইয়র্কে বহির্বিশ্বের সবচেয়ে বড় মুসলিম করবস্থান স্কচটাউন বাংলাদেশ সেমিট্রির যাত্রা শুরু নিউইয়র্কে মুন্সিগঞ্জ-বিক্রমপুর অ্যাসোসিয়েশনের বর্ণিল অভিষেক Bangladesh Calls for Stronger Support for LDCs Ahead of Doha Midterm Review নিউইয়র্কে জাতিসংঘে স্বল্পোন্নত দেশগুলোর জন্য আরও আন্তর্জাতিক সহায়তার আহ্বান জানিয়েছে বাংলাদেশ Rohingyas Want to Return Home, Bangladesh Tells UN এক দশক ধরে বিপুল সংখ্যক রোহিঙ্গাকে আশ্রয় দেওয়া দেশের জন্য টেকসই নয়, রোহিঙ্গারাও নিজ দেশে ফিরে যেতে চায় : জাতিসংঘে বাংলাদেশ Bangladesh and UN Women pledge closer cooperation to advance women’s empowerment and the WPS agenda নিউইয়র্কে চিটাগং অ্যাসোসিয়েশন অব নর্থ আমেরিকা (মাকসুদ-মাসুদ) এর সংবাদ সম্মেলনে কুৎসা রটানোর প্রতিবাদ নারীর ক্ষমতায়ন এবং নারী, শান্তি ও নিরাপত্তা এজেন্ডা এগিয়ে নিতে বাংলাদেশ ও ইউএন উইমেনের ঘনিষ্ঠ সহযোগিতার অঙ্গীকার State Minister for Foreign Affairs Urges Stronger Global Action to Protect Civilians, Uphold Humanitarian Law and Support Rohingya Repatriation
সব ক্যাটাগরি

যুক্তরাষ্ট্র বিএনপির কমিটি নিয়ে চাঁদাবাজির অভিযোগ

অনলাইন ডেস্ক পঠিত: 126 বার

প্রকাশিত: December 10, 2016 | 9:04 PM

এনআরবি নিউজ, নিউইয়র্ক  : পরপর দুদফায় দুই আন্তর্জাতিক সম্পাদক নিউইয়র্ক সফর করার পরও যুক্তরাষ্ট্র বিএনপির কমিটি না হওয়ায় গভীর হতাশায় নিপতিত হয়েছেন নেতা-কর্মীরা। শুধু তাই নয়, দলীয় কোন কাজেও তারা উৎসাহ পাচ্ছেন না। ‘বিলুপ্তির পথে ঠেলে দেয়া হয়েছে বিএনপির যুক্তরাষ্ট্র শাখাকে’-এমন অভিযোগও করেছেন বিএনপির সিনিয়র নেতা গিয়াসউদ্দিন। সভাপতি আর সেক্রেটারি বানিয়ে দেয়ার টোপ দিয়ে অন্তত: ১২ জনের পকেট হাতিয়ে নেয়ার অভিযোগও করেছেন এই নেতা। ‘তারেক রহমানের নাম ভাঙ্গিয়ে আন্তর্জাতিক সম্পাদকরা যে ধরনের কান্ড করে গেলেন, তা বিএনপির জন্যে খুবই ক্ষতিকর’-মন্তব্য গিয়াসউদ্দিনের। বিলুপ্ত কমিটির অর্ধ ডজন নেতাকে বিএনপির সাংগঠনিক কাঠামো থেকে সরিয়ে দেয়া সম্ভব হলেই প্রাণচাঞ্চল্যে ফিরবে যুক্তরাষ্ট্র বিএনপি-এমন মন্তব্য তরুণ নেতা-কর্মীদের। আরো বলা হচ্ছে যে, ৬ কংগ্রেসম্যানের স্বাক্ষর জালসহ বহুৃবিধ অপকর্মে লিপ্ত থাকার দায়ে ২৯ বার মার্কিন জেলে যাওয়া ব্যক্তিসহ তারেক রহমানের আত্মীয় পরিচয়ে চাঁদাবাজিতে লিপ্তদের দূরে রাখা সম্ভব না হলে যুক্তরাষ্ট্র বিএনপির সাংগঠনিক কর্মকান্ডে সত্যিকারের গতি আসবে না।
বছর তিনেক আগে যুক্তরাষ্ট্র বিএনপির ৪ নেতাকে লন্ডনে তলব করেছিলেন দলটির সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান তারেক রহমান। তারা ছিলেন সভাপতি আলহাজ্ব আব্দুল লতিফ স¤্রাট, সহ-সভাপতি গিয়াস আহমেদ, সাবেক সেক্রেটারি জিল্লুর রহমান এবং সাবেক আহবায়ক মজিবর রহমান মজুমদার। সে সময় যুক্তরাষ্ট্র বিএনপির কমিটি ভেঙ্গে দেয়া হয়। গিয়াস এবং জিল্লুরের একজনকে সভাপতি এবং আরেকজনকে সেক্রেটারি হবার আহবান জানান তারেক রহমান। কিন্তু উভয়েই সভাপতি হতে চাওয়ায় নয়া কমিটি গঠনের উদ্যোগ ভেস্তে যায়। এর বছর দুয়েক পর অর্থাৎ এ বছরের শুরুতে নিউইয়র্কে আসেন বিএনপির কেন্দ্রীয় কমিটির আন্তর্জাতিক সম্পাদক ও সাবেক শিক্ষা প্রতিমন্ত্রী এহসানুল হক মিলন। লন্ডন থেকে তারেক রহমানের নির্দেশ অনুযায়ী তিনি যুক্তরাষ্ট্র বিএনপির পরিবর্তে বিভিন্ন অঙ্গরাজ্য বিএনপির কমিটি গঠনের উদ্যোগ নেন। এতে ক্ষিপ্ত হন যুক্তরাষ্ট্র বিএনপির নেতা হতে আগ্রহী সকলেই। মিলনকে অবাঞ্ছিত ঘোষণা করা হয় নিউইয়র্কে। এ অবস্থায় মিশিগান, ইলিনয়, ওয়াশিংটন মেট্র, পেনসিলভেনিয়া, জর্জিয়া প্রভৃতি রাজ্যে নিজের পছন্দের লোকের সমন্বয়ে কমিটি গঠন করেন মিলন। এক পর্যায়ে তিনি সে সব রাজ্য কমিটির অনুমোদনও এনে দেন কেন্দ্রীয় কমিটি থেকে। এরপর ক্ষুব্ধ নেতাদের অনেকেই রণে ভঙ্গ দিয়ে মিলনের পক্ষাবলম্বন করেন। সাবেক এই প্রতিমন্ত্রী কিছুটা জোর পেয়ে জুন মাসে নিউইয়র্ক অঙ্গরাজ্যে নয়া কমিটি গঠনে ভিন্ন পন্থা অবলম্বন করেন। মাথাপিছু এক ডলার হারে প্রায় ২৩০০ জনকে বিএনপির সদস্য হিসেবে তালিকাভুক্তির পর গঠন করেন নির্বাচন কমিশন। নিউইয়র্কে বাংলাদেশ সোসাইটির সাবেক সভাপতি ও বিশিষ্ট ব্যবসায়ী এম আজিজের নেতৃত্বে গঠিত নির্বাচন কমিশনের তপসিল অনুযায়ী সরাসরি দুটি প্যানেল থেকে মনোনয়নপত্র জমা হয়। নির্বাচন হবার কথা ১৩ জুলাই। বাছাইয়ের পর শেষ মুহূর্তে পারভেজ সাজ্জাদের নেতৃত্বাধীন প্যানেলের সকলেই মনোনয়নপত্র প্রত্যাহার করেন। এ কারণে মনোনয়নপত্র প্রদানকারি অপর প্যানেল ‘নান্নু এবং বাতিন’র নেতৃত্বাধীন অপর প্যানেলকে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত ঘোষণার প্রাক্কালে ফেসবুকের মাধ্যমে এই নির্বাচন প্রক্রিয়া স্থগিতের নির্দেশ জারি করেন আন্তর্জাতিক সম্পাদক মিলন। সকলেই হতভম্ব হয়ে পড়েন এমন ঘটনায়। তবে মিলনের গঠিত নির্বাচন কমিশন তাতে বিন্দুমাত্র বিচলিত না হয়ে নান্নু-বাতিন প্যানেলকে বিজয়ী ঘোষণা করেন। এরফলে শুরু হয় নতুন বিতর্ক। বিলুপ্ত কমিটির সভাপতি আলহাজ্ব আব্দুল লতিফ স¤্রাট, সহ-সভাপতি গিয়াস আহমেদসহ অনেকে অভিযোগ করেন যে, ‘বিশেষ সুবিধা প্রদানকারিরা নির্বাচনে জয়ী হতে পারবেন না আশংকা থেকেই শেষ মুহূর্তে একটি প্যানেলকে মনোনয়নপত্র প্রত্যাহার করে নেয়ার নির্দেশ দেন সাবেক ঐ প্রতিমন্ত্রী। এরপরই তার নির্দেশে নির্বাচন স্থগিতের গায়েবী ঘটনা ঘটে, যার কোন অবকাশ ছিল না।’
এমন অবস্থায় মোটা অর্থ প্রদানকারিরা সাবেক ঐ প্রতিমন্ত্রীর ওপর চড়াও হতে পারেন আশংকায় রাতারাতি নিউইয়র্ক থেকে লন্ডনে ফিরে যান এহসানুল হক মিলন। নেতা-কর্মীরা অবাক বিস্ময়ে মিলনের কর্মকান্ড অবলোকন করেন। এরপর যোগাযোগ করা হয় লন্ডনে বসবাসরত অপর আন্তর্জাতিক সম্পাদক মাহিদুর রহমানের সাথে। তিনি বহুল আলোচিত এক ব্যক্তিকে নিয়ে অক্টোবরের ১৫ তারিখে নিউইয়র্কে অবতরন করেন। তারেক রহমানের নির্দেশে তিনি এসেছেন বলেও সকলকে জানান। যুক্তরাষ্ট্র বিএনপির নেতা হতে আগ্রহী প্রায় সকলের সাথেই পৃথক ও সম্মিলিতভাবে মতবিনিময় করেন মাহিদুর। এমনকি কয়েক মাস আগে ৬ কংগ্রেসম্যানের স্বাক্ষর জালকারি, তারেক রহমানের আত্মীয় পরিচয় দিয়ে চাঁদাবাজিতে লিপ্ত, কমিটির পদ-পদবি পাইয়ে দেয়ার টোপ দিয়ে অনেকের কাছে অর্থ সংগ্রহকারি ব্যক্তিদের সাথেও দহরম-মহরম করতে দেখা যায় এই আন্তর্জাতিক সম্পাদককে।
‘নেতা যে কমিটি দেবেন তা মেনে নিতে বাধ্য থাকবো’-এমন মুচলেকাও তিনি নেন প্রায় সকলের কাছেই। ১ নভেম্বর তিনি লন্ডনের উদ্দেশ্যে নিউইয়র্ক ত্যাগের আগের রাতে হোটেলে বেশ কজনের সাথে কথা বলেন। এ সময় হোটেলের বিলসহ খাওয়া-দাওয়া বাবদ যাবতীয় খরচ সংগ্রহ করেন এসব নেতার কাছে থেকে। জেএফকে এয়ারপোর্টে সংশ্লিষ্ট সকলকে জানান যে, লন্ডনে ফিরে এখানকার বিস্তারিত তথ্য নেতাকে (তারেক রহমান) জানাবেন। নেতাই করবেন সবকিছু।’ মাহিদুরের কথায় অনেকে স্বস্তি পেলেও দেড় মাস অতিবাহিত হচ্ছে, কিন্তু কমিটির কোন খোঁজ না পেয়ে সকলেই প্রচন্ড হতাশায় নিপতিত হয়েছেন। যুক্তরাষ্ট্র বিএনপির ব্যানারে এখন আর কোন কর্মকান্ডই হচ্ছে না। নিউইয়র্ক স্টেট বিএনপির নামে পাল্টা দুটি কমিটি মাঝেমধ্যে সভা-র‌্যালি করছে। এর একটির নেতৃত্বে রয়েছেন মাওলানা অলিউল্লাহ মোহাম্মদ আতিকুর রহমান এবং অপরটির নেতৃত্ব দিচ্ছেন মাহফুজুল মাওলা নান্নু ও এম এ বাতিন। সর্বশেষ মিয়ানমারে মুসলমান নির্যাতনের প্রতিবাদে র‌্যালি করেছে মাওলানা আতিকের নেতৃত্বাধীন স্টেট বিএনপি। বিজয় দিবস উপলক্ষেও যুক্তরাষ্ট্র বিএনপি কোন কর্মসূচি ঘোষণা করেনি। তবে আলহাজ্ব বাবরউদ্দিনের নেতৃত্বাধীন মুক্তিযোদ্ধা দলের ব্যানারে ব্রুকলীনে জাতীয়তাবাদি আদর্শে বিশ্বাসীরা বিজয় দিবস উদযাপনের প্রস্তুতি নিচ্ছেন বলে জানা গেছে।
এহেন পরিস্থিতির পরিপ্রেক্ষিতে নিউইয়র্ক থেকে লন্ডনে যোগাযোগ করা হয় মাহিদুর রহমানের সাথে। টেলিফোনে তিনি এনআরবি নিউজের এ সংবাদদাতাকে জানান, ‘নেতার কাছে সব রিপোর্ট সাবমিট করেছি। শীঘ্রই একইসাথে ৩টি কমিটি দেয়া হবে। যুক্তরাষ্ট্র বিএনপি, নিউইয়র্ক স্টেট বিএনপি এবং নিউইয়র্ক সিটি বিএনপির কমিটি একইসাথে প্রদানের পরিপ্রেক্ষিতে অনেকেই নেতৃত্ব পাবেন। আর এভাবেই বিএনপির দুর্গ হিসেবে পরিচিত নিউইয়র্কে বিএনপি পরিবার আবারো প্রাণচাঞ্চল্যে ভরে উঠবে।’
আন্তর্জাতিক সম্পাদক মাহিদুরের এ বক্তব্যকে সাধুবাদ জানিয়ে যুক্তরাষ্ট্র বিএনপির সাবেক সিনিয়র সহ-সভাপতি ও মূলধারায় বিএনপির জন্যে লবিংয়ে নিয়োজিত অধ্যাপক দেলোয়ার হোসেন বলেন, ‘এর আগে আন্তর্জাতিক সম্পাদক এহসানুল হক মিলনও বলে গিয়েছিলেন যে, শীঘ্রই নিউইয়র্কের কমিটি আসবে। এখন আর শীঘ্রই শব্দটি ভালো লাগে না। ১/১১ পরবর্তী সময় থেকে এখন পর্যন্ত যারা দলের জন্যে শ্রম, মেধা ও সময় দিচ্ছি, তাদের মূল্যায়ন করা হলেই বিএনপি আবার চাঙ্গা হবে এই মার্কিন মুল্লুকে। কিন্তু আন্তর্জাতিক সম্পাদক মিলন এবং মাহিদুর নিউইয়র্ক সফরকালে এমন কতক লোকের সাথে মিশেছেন, যাদের কোনই গণভিত্তি নেই। সংগঠন পরিচালনার মত আর্থিক সামর্থ্যও তেমন নেই। আঞ্চলিকতার কারণে ঐসব লোকের নেতৃত্বে গঠিত কমিটি কখনোই নিউইয়র্কে দাঁড়াতে পারবে না।’
১/১১ পরবর্তী কেয়ারটেকার সরকারের আমলে তারেক রহমান গ্রেফতার হবার সংবাদ নিউইয়র্কে আসার সাথে সাথে বিএনপির বিলুপ্ত কমিটির অন্যতম যুগ্ম সম্পাদক আকতার হোসেন বাদল সংবাদ সম্মেলন করে মুক্তির দাবিতে গঠন করেন ‘তারেক মুক্তি আন্তর্জাতিক পরিষদ।’ এই সংগঠনের ব্যানারে সোচ্চার ছিলেন তারেক রহমানের চিকিৎসার জন্যে লন্ডনে আসার দিন পর্যন্ত। এরপর সেই সংগঠনের নাম পাল্টিয়ে করা হয়েছে ‘তারেক পরিষদ আন্তর্জাতিক কমিটি’ এর শাখা গঠিত হয়েছে বিভিন্ন দেশে। যুক্তরাষ্ট্র কংগ্রেসের সাথেও এ সংগঠনের ব্যানারে বৈঠকে মিলিত হন বিএনপি ও তারেক রহমানের জন্যে নিবেদিত আকতার হোসেন বাদল। মাহিদুর কর্তৃক যুক্তরাষ্ট্র বিএনপি, স্টেট ও সিটি বিএনপির কমিটি গঠনের সংবাদ প্রসঙ্গে এই বাদল বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্র বিএনপির নয়া কমিটি গঠিত হচ্ছে জেনে স্বস্তি পাচ্ছি। তবে আশা করবো, সময়ের পরীক্ষায় উত্তীর্ণরা যাতে নেতৃত্ব পান। বিশেষ করে, যারা মূলধারায় বিএনপির জন্যে কাজ করছি, তাদের যেন মূল্যায়ন করা হয়। একইসাথে সংগঠনের জন্যে বিস্তর অর্থ ব্যয় এবং সময় দেয়ার মত সামর্থ্য যাদের রয়েছে, তারা নেতৃত্বে আসা জরুরী।’
প্রসঙ্গত: উল্লেখ্য যে, চিকিৎসা এবং অন্য কারণে নিউইয়র্কে বাস করছেন বিএনপির ভাইস প্রেসিডেন্ট ও অবিভক্ত ঢাকা সিটি কর্পোরেশনের মেয়র সাদেক হোসেন খোকা। তাকেও যুক্তরাষ্ট্র বিএনপির কমিটি গঠনে সক্রিয় হতে দেখা যায়নি। তারেক রহমান নির্দেশ না দেয়া পর্যন্ত তিনি বিবাদে লিপ্ত যুক্তরাষ্ট্র বিএনপিকে ঐক্যবদ্ধ করার প্রয়োজনবোধ করছেন না বলে তার ঘনিষ্ঠরা এ সংবাদদাতাকে জানান। বিএনপির আরেক ভাইস প্রেসিডেন্ট ও সাংবাদিক নেতা শওকত মাহমুদও রয়েছেন নিউইয়র্কে। বিএনপির নেতা-কর্মীদের সাথে তারও রয়েছে যোগাযোগ। খোকার সাথে তাকেও দেয়া যেতে পারে কমিটি গঠনের দায়িত্ব।

দুদফায় দুই আন্তর্জাতিক সম্পাদক নিউইয়র্ক সফর করার পরও যুক্তরাষ্ট্র বিএনপির কমিটি না হওয়ায় গভীর হতাশায় নিপতিত হয়েছেন নেতা-কর্মীরা। শুধু তাই নয়, দলীয় কোন কাজেও তারা উৎসাহ পাচ্ছেন না। ‘বিলুপ্তির পথে ঠেলে দেয়া হয়েছে বিএনপির যুক্তরাষ্ট্র শাখাকে’-এমন অভিযোগও করেছেন বিএনপির সিনিয়র নেতা গিয়াসউদ্দিন। সভাপতি আর সেক্রেটারি বানিয়ে দেয়ার টোপ দিয়ে অন্তত: ১২ জনের পকেট হাতিয়ে নেয়ার অভিযোগও করেছেন এই নেতা। ‘তারেক রহমানের নাম ভাঙ্গিয়ে আন্তর্জাতিক সম্পাদকরা যে ধরনের কান্ড করে গেলেন, তা বিএনপির জন্যে খুবই ক্ষতিকর’-মন্তব্য গিয়াসউদ্দিনের। বিলুপ্ত কমিটির অর্ধ ডজন নেতাকে বিএনপির সাংগঠনিক কাঠামো থেকে সরিয়ে দেয়া সম্ভব হলেই প্রাণচাঞ্চল্যে ফিরবে যুক্তরাষ্ট্র বিএনপি-এমন মন্তব্য তরুণ নেতা-কর্মীদের। আরো বলা হচ্ছে যে, ৬ কংগ্রেসম্যানের স্বাক্ষর জালসহ বহুৃবিধ অপকর্মে লিপ্ত থাকার দায়ে ২৯ বার মার্কিন জেলে যাওয়া ব্যক্তিসহ তারেক রহমানের আত্মীয় পরিচয়ে চাঁদাবাজিতে লিপ্তদের দূরে রাখা সম্ভব না হলে যুক্তরাষ্ট্র বিএনপির সাংগঠনিক কর্মকান্ডে সত্যিকারের গতি আসবে না।
বছর তিনেক আগে যুক্তরাষ্ট্র বিএনপির ৪ নেতাকে লন্ডনে তলব করেছিলেন দলটির সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান তারেক রহমান। তারা ছিলেন সভাপতি আলহাজ্ব আব্দুল লতিফ স¤্রাট, সহ-সভাপতি গিয়াস আহমেদ, সাবেক সেক্রেটারি জিল্লুর রহমান এবং সাবেক আহবায়ক মজিবর রহমান মজুমদার। সে সময় যুক্তরাষ্ট্র বিএনপির কমিটি ভেঙ্গে দেয়া হয়। গিয়াস এবং জিল্লুরের একজনকে সভাপতি এবং আরেকজনকে সেক্রেটারি হবার আহবান জানান তারেক রহমান। কিন্তু উভয়েই সভাপতি হতে চাওয়ায় নয়া কমিটি গঠনের উদ্যোগ ভেস্তে যায়। এর বছর দুয়েক পর অর্থাৎ এ বছরের শুরুতে নিউইয়র্কে আসেন বিএনপির কেন্দ্রীয় কমিটির আন্তর্জাতিক সম্পাদক ও সাবেক শিক্ষা প্রতিমন্ত্রী এহসানুল হক মিলন। লন্ডন থেকে তারেক রহমানের নির্দেশ অনুযায়ী তিনি যুক্তরাষ্ট্র বিএনপির পরিবর্তে বিভিন্ন অঙ্গরাজ্য বিএনপির কমিটি গঠনের উদ্যোগ নেন। এতে ক্ষিপ্ত হন যুক্তরাষ্ট্র বিএনপির নেতা হতে আগ্রহী সকলেই। মিলনকে অবাঞ্ছিত ঘোষণা করা হয় নিউইয়র্কে। এ অবস্থায় মিশিগান, ইলিনয়, ওয়াশিংটন মেট্র, পেনসিলভেনিয়া, জর্জিয়া প্রভৃতি রাজ্যে নিজের পছন্দের লোকের সমন্বয়ে কমিটি গঠন করেন মিলন। এক পর্যায়ে তিনি সে সব রাজ্য কমিটির অনুমোদনও এনে দেন কেন্দ্রীয় কমিটি থেকে। এরপর ক্ষুব্ধ নেতাদের অনেকেই রণে ভঙ্গ দিয়ে মিলনের পক্ষাবলম্বন করেন। সাবেক এই প্রতিমন্ত্রী কিছুটা জোর পেয়ে জুন মাসে নিউইয়র্ক অঙ্গরাজ্যে নয়া কমিটি গঠনে ভিন্ন পন্থা অবলম্বন করেন। মাথাপিছু এক ডলার হারে প্রায় ২৩০০ জনকে বিএনপির সদস্য হিসেবে তালিকাভুক্তির পর গঠন করেন নির্বাচন কমিশন। নিউইয়র্কে বাংলাদেশ সোসাইটির সাবেক সভাপতি ও বিশিষ্ট ব্যবসায়ী এম আজিজের নেতৃত্বে গঠিত নির্বাচন কমিশনের তপসিল অনুযায়ী সরাসরি দুটি প্যানেল থেকে মনোনয়নপত্র জমা হয়। নির্বাচন হবার কথা ১৩ জুলাই। বাছাইয়ের পর শেষ মুহূর্তে পারভেজ সাজ্জাদের নেতৃত্বাধীন প্যানেলের সকলেই মনোনয়নপত্র প্রত্যাহার করেন। এ কারণে মনোনয়নপত্র প্রদানকারি অপর প্যানেল ‘নান্নু এবং বাতিন’র নেতৃত্বাধীন অপর প্যানেলকে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত ঘোষণার প্রাক্কালে ফেসবুকের মাধ্যমে এই নির্বাচন প্রক্রিয়া স্থগিতের নির্দেশ জারি করেন আন্তর্জাতিক সম্পাদক মিলন। সকলেই হতভম্ব হয়ে পড়েন এমন ঘটনায়। তবে মিলনের গঠিত নির্বাচন কমিশন তাতে বিন্দুমাত্র বিচলিত না হয়ে নান্নু-বাতিন প্যানেলকে বিজয়ী ঘোষণা করেন। এরফলে শুরু হয় নতুন বিতর্ক। বিলুপ্ত কমিটির সভাপতি আলহাজ্ব আব্দুল লতিফ স¤্রাট, সহ-সভাপতি গিয়াস আহমেদসহ অনেকে অভিযোগ করেন যে, ‘বিশেষ সুবিধা প্রদানকারিরা নির্বাচনে জয়ী হতে পারবেন না আশংকা থেকেই শেষ মুহূর্তে একটি প্যানেলকে মনোনয়নপত্র প্রত্যাহার করে নেয়ার নির্দেশ দেন সাবেক ঐ প্রতিমন্ত্রী। এরপরই তার নির্দেশে নির্বাচন স্থগিতের গায়েবী ঘটনা ঘটে, যার কোন অবকাশ ছিল না।’
এমন অবস্থায় মোটা অর্থ প্রদানকারিরা সাবেক ঐ প্রতিমন্ত্রীর ওপর চড়াও হতে পারেন আশংকায় রাতারাতি নিউইয়র্ক থেকে লন্ডনে ফিরে যান এহসানুল হক মিলন। নেতা-কর্মীরা অবাক বিস্ময়ে মিলনের কর্মকান্ড অবলোকন করেন। এরপর যোগাযোগ করা হয় লন্ডনে বসবাসরত অপর আন্তর্জাতিক সম্পাদক মাহিদুর রহমানের সাথে। তিনি বহুল আলোচিত এক ব্যক্তিকে নিয়ে অক্টোবরের ১৫ তারিখে নিউইয়র্কে অবতরন করেন। তারেক রহমানের নির্দেশে তিনি এসেছেন বলেও সকলকে জানান। যুক্তরাষ্ট্র বিএনপির নেতা হতে আগ্রহী প্রায় সকলের সাথেই পৃথক ও সম্মিলিতভাবে মতবিনিময় করেন মাহিদুর। এমনকি কয়েক মাস আগে ৬ কংগ্রেসম্যানের স্বাক্ষর জালকারি, তারেক রহমানের আত্মীয় পরিচয় দিয়ে চাঁদাবাজিতে লিপ্ত, কমিটির পদ-পদবি পাইয়ে দেয়ার টোপ দিয়ে অনেকের কাছে অর্থ সংগ্রহকারি ব্যক্তিদের সাথেও দহরম-মহরম করতে দেখা যায় এই আন্তর্জাতিক সম্পাদককে।
‘নেতা যে কমিটি দেবেন তা মেনে নিতে বাধ্য থাকবো’-এমন মুচলেকাও তিনি নেন প্রায় সকলের কাছেই। ১ নভেম্বর তিনি লন্ডনের উদ্দেশ্যে নিউইয়র্ক ত্যাগের আগের রাতে হোটেলে বেশ কজনের সাথে কথা বলেন। এ সময় হোটেলের বিলসহ খাওয়া-দাওয়া বাবদ যাবতীয় খরচ সংগ্রহ করেন এসব নেতার কাছে থেকে। জেএফকে এয়ারপোর্টে সংশ্লিষ্ট সকলকে জানান যে, লন্ডনে ফিরে এখানকার বিস্তারিত তথ্য নেতাকে (তারেক রহমান) জানাবেন। নেতাই করবেন সবকিছু।’ মাহিদুরের কথায় অনেকে স্বস্তি পেলেও দেড় মাস অতিবাহিত হচ্ছে, কিন্তু কমিটির কোন খোঁজ না পেয়ে সকলেই প্রচন্ড হতাশায় নিপতিত হয়েছেন। যুক্তরাষ্ট্র বিএনপির ব্যানারে এখন আর কোন কর্মকান্ডই হচ্ছে না। নিউইয়র্ক স্টেট বিএনপির নামে পাল্টা দুটি কমিটি মাঝেমধ্যে সভা-র‌্যালি করছে। এর একটির নেতৃত্বে রয়েছেন মাওলানা অলিউল্লাহ মোহাম্মদ আতিকুর রহমান এবং অপরটির নেতৃত্ব দিচ্ছেন মাহফুজুল মাওলা নান্নু ও এম এ বাতিন। সর্বশেষ মিয়ানমারে মুসলমান নির্যাতনের প্রতিবাদে র‌্যালি করেছে মাওলানা আতিকের নেতৃত্বাধীন স্টেট বিএনপি। বিজয় দিবস উপলক্ষেও যুক্তরাষ্ট্র বিএনপি কোন কর্মসূচি ঘোষণা করেনি। তবে আলহাজ্ব বাবরউদ্দিনের নেতৃত্বাধীন মুক্তিযোদ্ধা দলের ব্যানারে ব্রুকলীনে জাতীয়তাবাদি আদর্শে বিশ্বাসীরা বিজয় দিবস উদযাপনের প্রস্তুতি নিচ্ছেন বলে জানা গেছে।
এহেন পরিস্থিতির পরিপ্রেক্ষিতে নিউইয়র্ক থেকে লন্ডনে যোগাযোগ করা হয় মাহিদুর রহমানের সাথে। টেলিফোনে তিনি এনআরবি নিউজের এ সংবাদদাতাকে জানান, ‘নেতার কাছে সব রিপোর্ট সাবমিট করেছি। শীঘ্রই একইসাথে ৩টি কমিটি দেয়া হবে। যুক্তরাষ্ট্র বিএনপি, নিউইয়র্ক স্টেট বিএনপি এবং নিউইয়র্ক সিটি বিএনপির কমিটি একইসাথে প্রদানের পরিপ্রেক্ষিতে অনেকেই নেতৃত্ব পাবেন। আর এভাবেই বিএনপির দুর্গ হিসেবে পরিচিত নিউইয়র্কে বিএনপি পরিবার আবারো প্রাণচাঞ্চল্যে ভরে উঠবে।’
আন্তর্জাতিক সম্পাদক মাহিদুরের এ বক্তব্যকে সাধুবাদ জানিয়ে যুক্তরাষ্ট্র বিএনপির সাবেক সিনিয়র সহ-সভাপতি ও মূলধারায় বিএনপির জন্যে লবিংয়ে নিয়োজিত অধ্যাপক দেলোয়ার হোসেন বলেন, ‘এর আগে আন্তর্জাতিক সম্পাদক এহসানুল হক মিলনও বলে গিয়েছিলেন যে, শীঘ্রই নিউইয়র্কের কমিটি আসবে। এখন আর শীঘ্রই শব্দটি ভালো লাগে না। ১/১১ পরবর্তী সময় থেকে এখন পর্যন্ত যারা দলের জন্যে শ্রম, মেধা ও সময় দিচ্ছি, তাদের মূল্যায়ন করা হলেই বিএনপি আবার চাঙ্গা হবে এই মার্কিন মুল্লুকে। কিন্তু আন্তর্জাতিক সম্পাদক মিলন এবং মাহিদুর নিউইয়র্ক সফরকালে এমন কতক লোকের সাথে মিশেছেন, যাদের কোনই গণভিত্তি নেই। সংগঠন পরিচালনার মত আর্থিক সামর্থ্যও তেমন নেই। আঞ্চলিকতার কারণে ঐসব লোকের নেতৃত্বে গঠিত কমিটি কখনোই নিউইয়র্কে দাঁড়াতে পারবে না।’
১/১১ পরবর্তী কেয়ারটেকার সরকারের আমলে তারেক রহমান গ্রেফতার হবার সংবাদ নিউইয়র্কে আসার সাথে সাথে বিএনপির বিলুপ্ত কমিটির অন্যতম যুগ্ম সম্পাদক আকতার হোসেন বাদল সংবাদ সম্মেলন করে মুক্তির দাবিতে গঠন করেন ‘তারেক মুক্তি আন্তর্জাতিক পরিষদ।’ এই সংগঠনের ব্যানারে সোচ্চার ছিলেন তারেক রহমানের চিকিৎসার জন্যে লন্ডনে আসার দিন পর্যন্ত। এরপর সেই সংগঠনের নাম পাল্টিয়ে করা হয়েছে ‘তারেক পরিষদ আন্তর্জাতিক কমিটি’ এর শাখা গঠিত হয়েছে বিভিন্ন দেশে। যুক্তরাষ্ট্র কংগ্রেসের সাথেও এ সংগঠনের ব্যানারে বৈঠকে মিলিত হন বিএনপি ও তারেক রহমানের জন্যে নিবেদিত আকতার হোসেন বাদল। মাহিদুর কর্তৃক যুক্তরাষ্ট্র বিএনপি, স্টেট ও সিটি বিএনপির কমিটি গঠনের সংবাদ প্রসঙ্গে এই বাদল বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্র বিএনপির নয়া কমিটি গঠিত হচ্ছে জেনে স্বস্তি পাচ্ছি। তবে আশা করবো, সময়ের পরীক্ষায় উত্তীর্ণরা যাতে নেতৃত্ব পান। বিশেষ করে, যারা মূলধারায় বিএনপির জন্যে কাজ করছি, তাদের যেন মূল্যায়ন করা হয়। একইসাথে সংগঠনের জন্যে বিস্তর অর্থ ব্যয় এবং সময় দেয়ার মত সামর্থ্য যাদের রয়েছে, তারা নেতৃত্বে আসা জরুরী।’
প্রসঙ্গত: উল্লেখ্য যে, চিকিৎসা এবং অন্য কারণে নিউইয়র্কে বাস করছেন বিএনপির ভাইস প্রেসিডেন্ট ও অবিভক্ত ঢাকা সিটি কর্পোরেশনের মেয়র সাদেক হোসেন খোকা। তাকেও যুক্তরাষ্ট্র বিএনপির কমিটি গঠনে সক্রিয় হতে দেখা যায়নি। তারেক রহমান নির্দেশ না দেয়া পর্যন্ত তিনি বিবাদে লিপ্ত যুক্তরাষ্ট্র বিএনপিকে ঐক্যবদ্ধ করার প্রয়োজনবোধ করছেন না বলে তার ঘনিষ্ঠরা এ সংবাদদাতাকে জানান। বিএনপির আরেক ভাইস প্রেসিডেন্ট ও সাংবাদিক নেতা শওকত মাহমুদও রয়েছেন নিউইয়র্কে। বিএনপির নেতা-কর্মীদের সাথে তারও রয়েছে যোগাযোগ। খোকার সাথে তাকেও দেয়া যেতে পারে কমিটি গঠনের দায়িত্ব।

বিজ্ঞাপন / স্পন্সরড কন্টেন্ট
ট্যাগ:
সর্বশেষ সংবাদ
Situs Streaming JAV