Friday, 26 June 2026 |
শিরোনাম
নিউইয়র্কে বহির্বিশ্বের সবচেয়ে বড় মুসলিম করবস্থান স্কচটাউন বাংলাদেশ সেমিট্রির যাত্রা শুরু নিউইয়র্কে মুন্সিগঞ্জ-বিক্রমপুর অ্যাসোসিয়েশনের বর্ণিল অভিষেক Bangladesh Calls for Stronger Support for LDCs Ahead of Doha Midterm Review নিউইয়র্কে জাতিসংঘে স্বল্পোন্নত দেশগুলোর জন্য আরও আন্তর্জাতিক সহায়তার আহ্বান জানিয়েছে বাংলাদেশ Rohingyas Want to Return Home, Bangladesh Tells UN এক দশক ধরে বিপুল সংখ্যক রোহিঙ্গাকে আশ্রয় দেওয়া দেশের জন্য টেকসই নয়, রোহিঙ্গারাও নিজ দেশে ফিরে যেতে চায় : জাতিসংঘে বাংলাদেশ Bangladesh and UN Women pledge closer cooperation to advance women’s empowerment and the WPS agenda নিউইয়র্কে চিটাগং অ্যাসোসিয়েশন অব নর্থ আমেরিকা (মাকসুদ-মাসুদ) এর সংবাদ সম্মেলনে কুৎসা রটানোর প্রতিবাদ নারীর ক্ষমতায়ন এবং নারী, শান্তি ও নিরাপত্তা এজেন্ডা এগিয়ে নিতে বাংলাদেশ ও ইউএন উইমেনের ঘনিষ্ঠ সহযোগিতার অঙ্গীকার State Minister for Foreign Affairs Urges Stronger Global Action to Protect Civilians, Uphold Humanitarian Law and Support Rohingya Repatriation
সব ক্যাটাগরি

বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ ও হেনরি কিসিঞ্জার

অনলাইন ডেস্ক পঠিত: 134 বার

প্রকাশিত: December 15, 2016 | 4:18 PM

এবনে গোলাম সামাদ : একটা দেশের পররাষ্ট্রনীতি তার জাতীয় রাজনীতিরই অংশ, যা তার সাধারণ বিশ্বাস ও স্বার্থ চেতনানির্ভর। মার্কিন পররাষ্ট্রনীতিতে হেনরি কিসিঞ্জারের নাম একাধিক কারণে উল্লেখ হয়ে আছে। আমাদের অনেকের কাছেও হেনরি কিসিঞ্জার একটি পরিচিত নাম। কেননা ১৯৭১ সালে ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধের সময় মার্কিন প্রেসিডেন্ট রিচার্ড নিক্সন হেনরি কিসিঞ্জারের সাথে আলোচনা করে বঙ্গোপসাগরে পাঠিয়েছিলেন সপ্তম নৌবহর। জাতির নীতি হয়ে আছে, The Kissinger Tilt নামে (সময়, ১৭ জানুয়ারি, ১৯৭২ দ্রষ্টব্য)। সপ্তম নৌবহর বদলে দিয়েছিল ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধের ভারসাম্য। ১৯৭৪ সালের ৩০ অক্টোবর হেনরি কিসিঞ্জার ১৯ ঘণ্টার জন্য ঢাকা সফরে আসেন এবং শেখ মুজিবের সঙ্গে নানা ব্যাপারে কথা বলেন। যা প্রভাবিত করে বাংলাদেশের রাজনীতিকে। এই বিষয়ে আলোচনায় আমরা পরে আসবো।
হেনরি কিসিঞ্জার ১৯২৩ সালে জন্মান জার্মানির ব্যাভিলিয়া প্রদেশের ফুর্ত নামক শহরে এক জার্মান ইহুদি পরিবারে। তার বাবা ছিলেন একজন স্কুলশিক্ষক, মা ছিলেন গৃহবধূ। ১৯৩০-এর দশকে জার্মানিতে শুরু হয় ইহুদিপীড়ন। হেনরি কিসিঞ্জার তার মা-বাবার সাথে প্রথমে আসেন লন্ডনে, ১৯৩৮ সালে, পরে তিনি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে যান তার মা-বাবার সঙ্গে। নিউ ইয়র্ক শহরে সেখানে তিনি বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে লেখাপড়া শেখেন। পরে যান হারভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে। সেখানে তিনি অর্জন করেন রাজনীতিতে এমএ ও পিএইচডি। একসঙ্গে তিনি পররাষ্ট্রনীতি ও সমরবিদ্যার অনুশীলন করেন পৃথকভাবে। তিনি নিজেকে সংশ্লিষ্ট করেন রিপাবলিকান দলের সঙ্গে। ১৯৬৮ সালে রিচার্ড নিক্সন যখন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট হন, তখন তিনি হেনরি কিসিঞ্জারকে গ্রহণ করেন তার পররাষ্ট্রসচিব ও সামরিক উপদেষ্টা হিসেবে। কিসিঞ্জার তার কূটনৈতিক দক্ষতার ফলে ১৯৭৩ সালে ভিয়েতনামে শান্তি প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হন। এ জন্য তাকে ১৯৭৩ সালে শান্তির জন্য নোবেল পুরস্কার প্রদান করা হয়।
রিচার্ড নিক্সন ১৯৭৪ সালের আগস্ট মাসে ওয়াটার গেট কেলেঙ্কারির জন্য প্রেসিডেন্ট পদ থেকে ইস্তফা দিতে বাধ্য হন। তার স্থলাভিসিক্ত হন ভাইস প্রেসিডেন্ট জিরাল্ড ফোর্ড। ফোর্ড কিসিঞ্জারকে আগের পদে বহাল রাখেন। ফোর্ড ১৯৭৭ সাল পর্যন্ত মার্কিন প্রেসিডেন্ট ছিলেন। অর্থাৎ ১৯৬৮ সাল থেকে ১৯৭৭ সাল পর্যন্ত কিসিঞ্জার ছিলেন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রসচিব এবং সামরিক উপদেষ্টা। আসলে এই সময়টাতে তিনি গোটা মার্কিন প্রশাসনকেই কার্যত পরিচালিত করেন।
কিসিঞ্জার এখন ক্ষমতায় নেই কিন্তু তার মতামতকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে এখন যথেষ্ট গুরুত্ব দেয়া হয়। সম্প্রতি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের The Atlantic পত্রিকায় তিনি একটি সাক্ষাৎকার প্রদান করেছেন (১০ নভেম্বর ২০১৬)। সাক্ষাৎকারটি গ্রহণ করেছেন ওই পত্রিকার প্রধান সম্পাদক জেফরি গোল্ডবার্গ। এই সাক্ষাৎকারের এক জায়গায় কিসিঞ্জার বলেছেন :
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রের মূল ভিত্তি হলো মানবাধিকার। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র চেয়েছে দেশে দেশে মানবাধিকারের প্রতিষ্ঠা কিন্তু সেই একই সঙ্গে তাকে আবার ভাবতে হয়েছে তার নিজের নিরাপত্তার কথাও। অনেক ক্ষেত্রে তার নিরাপত্তা প্রসঙ্গ পেয়েছে প্রাধান্য। আর এর ফলে সম্ভব হয়নি মানবাধিকারের দাবিকে মানা। মার্কিন পররাষ্ট্রনীতিতে তাই সৃষ্টি হতে পেরেছে অনেক ক্ষেত্রে অসঙ্গতির। এটা ঘটতে পেরেছিল বিশেষভাবে বাংলাদেশের যুদ্ধের সময় ১৯৭১ সালে। ১৯৬৯ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র তার নিরাপত্তার প্রয়োজনে চাচ্ছিল চীনের সঙ্গে সোভিয়েতবিরোধী একটি জোট বাঁধতে। এই প্রক্রিয়ায় পাকিস্তান রাষ্ট্র হিসেবে পালন করছিল বিশেষ ভূমিকা। ১৯৭১ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষে তাই সম্ভব ছিল না বাংলাদেশে এর জন্য পাকিস্তানের ওপর বিশেষ চাপ সৃষ্টি। তবুও প্রেসিডেন্ট নিক্সন পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট আগা মোহাম্মদ ইয়াহিয়া খানকে অনুরোধ করেছিলেন বাংলাদেশকে স্বায়ত্তশাসন প্রদান করতে, ইয়াহিয়া তা প্রদান করতে রাজি হন ১৯৭২ সালের মধ্যে।

পাক-মার্কিন প্রতিরক্ষা চুক্তি
ডেইট উট দি আইজেনহাওয়ার ১৯৬১ সালের ২০ জানুয়ারি মার্কিন প্রেসিডেন্ট হন। এ সময় তার ভাইস প্রেসিডেন্ট হন রিচার্ড নিক্সন। এ সময় পররাষ্ট্রসচিব পদে নিযুক্তি পান জন ফসটার ডালেস। জন ফসটার ডালেস মনে করেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী জওয়াহেরলাল নেহরু বামপন্থী মনোভাবাপন্ন। তাই তার কাছ থেকে সোভিয়েতবিরোধী কোনো সাহায্য-সহযোগিতা লাভ সম্ভব নয়। জন্মলগ্ন থেকেই জওয়াহেরলাল চাচ্ছিলেন রাষ্ট্র হিসেবে পাকিস্তানকে বিলুপ্ত করতে। এ ছাড়া ভারতের সঙ্গে পাকিস্তানের বিরাট বিরোধ দেখা দেয় কাশ্মির নিয়ে। অন্য দিকে জওয়াহেরলাল আফগানিস্তানকে উসকানি দিতে থাকেন ডুরাল্ড লাইনকে পাকিস্তান ও আফগানিস্তানের মধ্যে সীমান্ত হিসেবে না মানতে। আফগানিস্তান পাকিস্তানের জন্য হয়ে উঠতে থাকে হুমকি। পাকিস্তান তাই আত্মরক্ষার জন্য মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সামরিক প্রতিরক্ষা চুক্তি করতে বাধ্য হয়। ১৯৫৪ সালের ১৯ মে স্বাক্ষরিত হয় পাক মার্কিন প্রতিরক্ষা চুক্তি। যাতে পাকিস্তান পেশওয়ারের কাছে মার্কিন সামরিক ঘাঁটি নির্মাণ করতে সম্মত হয়। আর তার বিনিময়ে রাজি হয় পাকিস্তানের তখনকার ২৪ হাজার সৈন্যের ব্যয়ভার বহন করতে। ১৯৫৬ সালের ১২ সেপ্টেম্বর হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় সরকারের প্রধানমন্ত্রী হন। তিনি ১৯৫৭ সালের ২৭ জুলাই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে সফর করতে যান। এ সময় তিনি ও আইজেনহাওয়ার যুক্ত ইশতেহহারে বলেন :
স্বাধীন বিশ্বের জন্য আন্তর্জাতিক কমিউনিজম এক বিরাট হুমকি হিসেবে বিরাজ করছে। সোহরাওয়ার্দী মার্কিন পক্ষ গ্রহণ করায় আওয়ামী লীগের মধ্যে গুরুতর মতবিরোধ দেখা দেয়। মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী আওয়ামী লীগ থেকে তার সমর্থকদের নিয়ে বেরিয়ে যেয়ে ন্যাশনাল আওয়ামী লীগ পার্টি (ন্যাপ) গঠন করেন। শেখ মুজিব যান না ভাসানীর পক্ষে। তিনি থাকেন তার নেতা সোহরাওয়ার্দীর পক্ষে। ১৯৫৭ সালের ১১ অক্টোবর সোহরাওয়ার্দীর প্রধানমন্ত্রিত্ব শেষ হয়। বলতে হয়, তার রাজনৈতিক জীবনী শেষ হয়। ১৯৬৩ সালের ৫ ডিসেম্বর বৈরুতে সোহরাওয়ার্দী সাহেব ইন্তেকাল করেন। শেখ মুজিবের ওপরে আসে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বের ভার। এই সময় তিনি গ্রহণ করেন পশ্চিম পাকিস্তানের ধনকুবের ইউসুফ হারুনের আলফা ইন্স্যুরেন্সের চাকরি। ইউসুফ হারুনকে মনে করা হতো ঈওঅ-এর সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করে চলা ব্যক্তি। এ সময় বাংলাদেশে বামপন্থী মহল থেকে প্রচার করা হতে থাকে যে, শেখ মুজিব নাকি হলেন সিআইএ-এর এজেন্ট। আর গোটা আওয়ামী লীগ দলটাই নাকি চলেছে সিআইএ-এর আর্থিক অনুদানে। কিন্তু এসব প্রচার-প্রচারণা সত্ত্বেও আওয়ামী লীগ ১৯৭০ সালের নির্বাচনে বিপুল ভোটে জয়ী হয়। কিন্তু জুলফিকার আলী ভুট্টোর চক্রান্তে পান না রাষ্ট্রিক ক্ষমতা।
১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ শুরু হয় পাকসেনাদের জনমত দমনের রক্তক্ষয়ী অভিযান। আওয়ামী লীগ নেতা ও নির্বাচিত গঘঅ ও গখঅ সবাই চলে যান কলকাতায়। সেখানে গঠিত হয় প্রবাসী বাংলাদেশ সরকারÑ যার প্রধানমন্ত্রী হন তাজউদ্দীন আহমদ, পররাষ্ট্রমন্ত্রী হন খোন্দকার মোশতাক আহমদ, অর্থমন্ত্রী ক্যাপ্টেন মনসুর আলী এবং স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী হন এ এইচ এম কামারুজ্জামান। মুক্তিফৌজ (পরে মুক্তিবাহিনী) সর্বাধিনায়ক হন আতাউল গণি উসমানী (মন্ত্রী সমপর্যায়ে)। শেখ মুজিব অবশ্য গিয়েছিলেন না ভারতে। তাকে পাকবাহিনী গ্রেফতার করে প্রথম নিয়ে যায় এবোটাবাদে এবং পরে রাওয়ালপিন্ডিতে। তিনি সেখানে থাকেন কারাবন্দী হয়ে। ড. কামাল হোসেন স্বেচ্ছায় চলে যান করাচিতে। তিনি বিয়ে করেছেন সিন্ধি (ব্রোহি) কন্যাকে। করাচিতে থাকেন শ্বশুরবাড়িতে।

বাংলাদেশ যুদ্ধে কিসিঞ্জারের ভূমিকা
১৯৭১ সালের এপ্রিল মাসের প্রথম সপ্তাহে আমি রাজশাহী ছেড়ে পদ্মা নদী পেরিয়ে চলে যাই কলকাতায়। সেখানে অবস্থান করি ১৯৭২ সালের প্রথম সপ্তাহ পর্যন্ত। আমি আমার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা থেকে এখানে কিছু কথা বলার স্বাধীনতা নিচ্ছি।
১৯৭১ সালের ১১ জুলাই কলকাতা থেকে প্রকাশিত ইংরেজি দৈনিক পত্রিকা ঞযব ঝঃধঃবংসধহ পত্রিকায় একটি খবর পড়েছিলাম, যাতে বলা হয়েছিল ১০ জুলাই রাওয়ালপিন্ডি থেকে ১০০ কিলোমিটার উত্তরে নাথিয়াগালি নামক জায়গায় হেনরি কিসিঞ্জার ও ড. কামাল হোসেনের মধ্যে দীর্ঘ আলোচনা হয়েছে পূর্ব পাকিস্তানে উদ্ভূত সমস্যার সমাধান নিয়ে। ১৯৭১ সালের ১১ জুলাই কলকাতা থেকে প্রকাশিত বিখ্যাত বাংলা দৈনিক যুগান্তর প্রত্রিকায় খবর পড়েছিলাম, যে জুলফিকার আলী ভুট্টো তেহরানে এক সংবাদপত্রের প্রতিনিধিকে বলেছেন, তিনি মনে করেন পূর্ব পাকিস্তানের সৃষ্ট সমস্যার একটা রাজনৈতিক সমাধান হওয়া প্রয়োজন। আর এ জন্য হওয়া দরকার, আওয়ামী লীগ নেতাদের সঙ্গে আলোচনা। এর দুই দিন পর কলকাতায় গুজব শুনেছিলাম রাওয়ালপিন্ডি থেকে নাকি ড. কামাল হোসেন কলকাতার মার্কিন কনসালের মাধ্যমে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী খোন্দকার মোশতাক আহমদের কাছে একটি বার্তা পাঠিয়েছেন। যাতে তাকে বলা হয়েছে আওয়ামী লীগের যেসব এমএনএ আছেন তাদের সবাইকে নিয়ে ঢাকায় যেতে এবং প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়ার সঙ্গে আলোচনায় বসতে। কিন্তু ভারত সরকার এটা হতে দিতে চায়নি। খোন্দকার মোশতাক আহমদকে নাকি গৃহবন্দী করা হয়েছে। এমএনএ ও এমএলএদের সীমান্তে আটকিয়ে আবার কলকাতায় ফেরত পাঠানো হয়েছে। এই কথা কতটা সত্য আমি বলতে পারি না। তবে গুজবটা ছিল যথেষ্ট ব্যাপক। আরো উড়ো ভাষা শোনা গিয়েছিল যে, হেনরি কিসিঞ্জার এ জন্য ভয়ঙ্কর ক্ষুব্ধ হয়েছেন এবং তিনি নাকি ইন্দিরা গান্ধীকে বলেছেন ডাইনী নারী।
১৯৭১ সালে ৩ ডিসেম্বর বাধে ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধ। এর আগে থেকেই অবশ্য ভারত পূর্ব পাকিস্তানে পাঠাচ্ছিল তার কমান্ডো বাহিনী মুক্তিফৌজ নামে। তবে এখানে বলা দরকার, ভারত যদিও মুক্তিবাহিনী গড়েছিল কিন্তু মুক্তিবাহিনীর হাতে সরাসরি অস্ত্র দিত না। ভারতের অস্ত্র যেয়ে পড়তে পারে চীনপন্থী কমিউনিস্টদের হাতে। এ সময় ইন্দিরা গান্ধীকে বিশেষভাবে পেয়ে বসেছিল বাংলাদেশে চীনপন্থী কমিউনিস্টদের উত্থানের ভয়। ভারত চাচ্ছিল কমান্ডোদের মাধ্যমে বাংলাদেশের দীর্ঘ অঞ্চলকে দখল করে নিতে। অর্থাৎ পরিস্থিতি হয়ে উঠেছিল খুবই জটিল। ৩ ডিসেম্বরের আগেই ভারত পূর্ব সীমান্তে শুরু করেছিল যুদ্ধ। ৩ ডিসেম্বর যুদ্ধ শুরু হয় ভারতের পশ্চিম সীমান্তেও। ৩ ডিসেম্বর পাক বিমানবাহিনী বোমাবর্ষণ করে অমৃতস্বর, অবন্তিপুর, আমবালা, আগরা, জোথপুর, পাঠানকোট, শ্রীনগর এবং উত্তরলাই বিমানবন্দরে। একই সঙ্গে পাকিস্তান স্থলবাহিনী আক্রমণ করে সুলেমানকি, খেমকারান, ছম্ব ও পুঞ্জ। ৫ ডিসেম্বর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র জাতিসঙ্ঘের নিরাপত্তা পরিষদে যুদ্ধ বন্ধের জন্য একটি প্রস্তাব তোলে। সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেটো প্রয়োগ করে প্রস্তাবটিকে নাকচ করে দেয়। ৭ ডিসেম্বর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র জাতিসঙ্ঘের সাধারণ পরিষদে যুদ্ধ বন্ধের একটি প্রস্তাব উঠায়, যা বিপুল ভোটে গৃহীত হয়। কিন্তু ভারত এই প্রস্তাব মানতে সম্মত হয় না। ১৩ ডিসেম্বর প্রেসিডেন্ট রিচার্ড নিক্সন হেনরি কিসিঞ্জারের সঙ্গে পরামর্শ করে বঙ্গোপসাগরে ৭৪ নম্বর সপ্তম নৌবহরের টাস্কফোর্স পাঠানোর সিদ্ধান্ত নেন, যাতে থাকে একাধিক ডেসট্রয়ার। টাস্কফোর্সের নেতৃত্বে থাকে পারমাণবিক শক্তিচালিত বিমান ও মেরিনবাহী পৃথিবীর সবচেয়ে বড় রণতরী Enterprise। ১৪ ডিসেম্বরের মধ্যে সপ্তম নৌবহর এসে পড়ে বাংলাদেশের সাগর সৈকতে। ওই একই দিনে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র জাতিসঙ্ঘের নিরাপত্তা পরিষদে যুদ্ধ বন্ধের আবার একটি প্রস্তাব উঠায়। কিন্তু সোভিয়েত ইউনিয়ন আবার এটিকে ভেটো প্রদান করে নাকচ করে। কিন্তু হঠাৎ করেই পাকবাহিনী ভারতের কাছে শর্তহীনভাবে আত্মসমর্পণ করতে রাজি হয়। ১৬ ডিসেম্বর পাকিস্তানের লেফটেন্যান্ট জেনারেল আমির আবদুল্লাহ খান নিয়াজী শর্তহীনভাবে ভারতের পূর্বাঞ্চলীয় কমান্ডোর প্রধান লেফটেন্যান্ট জেনারেল জগজিৎসিং অরোরার কাছে আত্মসমর্পণ করেন। ১৭ ডিসেম্বর ভারতের পশ্চিম রণাঙ্গনে যুদ্ধ শেষ হয়। কেননা পাকিস্তান ভারতের যুদ্ধবিরতি প্রস্তাব মেনে নেয়।
এই যুদ্ধের ক্ষেত্রে কতগুলো বিষয় লক্ষ করার মতো। যদিও বলা হয় পাকিস্তানের পূর্ব কমান্ড ভারতের কাছে বিনা শর্তে আত্মসমর্পণ করেছিল, সেটা সত্য কি না। কেননা মুক্তিবাহিনীর কমান্ডার আতাউল গণি ওসমানীকে আত্মসমর্পণে আসতে দেয়া হয়নি। কেন আসতে দেয়া হয়নি সেটা নিয়ে তোলা যায় প্রশ্ন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় ১৯৪৫ সালে জাপান পরাজিত হয়েছিল মিত্রবাহিনীর কাছে। জাপানকে পৃথকভাবে আত্মসমর্পণ করতে হয়েছিল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, গ্রেট ব্রিটেন, সোভিয়েত ইউনিয়ন, ফ্রান্স, চীন, অস্ট্রেলিয়া, কানাডা, হল্যান্ড ও নিউজিল্যান্ডের সেনাপতি অথবা সেনাপ্রতিনিধিদের প্রতিনিধিত্বকারীদের কাছে। যদিও মিত্রবাহিনীর সর্বোচ্চ অধিনায়ক ছিলেন মার্কিন জেনারেল ম্যাক আর্থার। আর তিনি পরিচালনা করেছিলেন এই আত্মসমর্পণ অনুষ্ঠান। কিন্তু পাকবাহিনী বাংলাদেশের মুক্তিবাহিনীর মহানায়কের কাছে আত্মসমর্পণ করছিল না। আত্মসমর্পণ করেছিল শুধু ভারতীয় কমান্ডের কাছে। ভারতের হিসাব মতে পাকিস্তানের ২৩ হাজার সৈন্য আত্মসমর্পণ করেছিল। এই সৈন্যদের কাউকেই বন্দী করে রাখা হয়নি বাংলাদেশে। সবাইকে নিয়ে যাওয়া হয় ভারতে। ১৯৭২ সালে ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে স্বাক্ষরিত হয় শিমলা চুক্তি। এই চুক্তির শর্ত অনুসারে সব পাকযুদ্ধবন্দীকে ছেড়ে দেয়া হয়। শিমলা সম্মেলনে বাংলাদেশের কোনো প্রতিনিধিকে ডাকা হয়নি। শিমলা সম্মেলনে ভারত-পাকিস্তান যুক্ত ইস্তেহারে ১৯৭১-এর যুদ্ধকে বলা হয় ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধ। বলা হয় না বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ। বাংলাদেশ সরকার এর কোনো প্রতিবাদ করেনি।

বাংলাদেশে কিসিঞ্জার
হেনরি কিসিঞ্জার ১৯৭৪ সালের ৩০ অক্টোবর বাংলাদেশে ১৯ ঘণ্টার জন্য সফরে আসেন এবং গোপনে বহু বিষয় নিয়ে কথা বলেন। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র পররাষ্ট্র দফতর থেকে ৩৩ বছর পর অনেক গোপন দলিল ইতিহাস চর্চার সুবিধার জন্য প্রকাশ করা হয়। কিসিঞ্জার ও শেখ মুজিবের কথোপকথনের গোপন দলিল প্রকাশ করা হয় ২০০৭ সালের ১১ অক্টোবর। এই দলিলের এক জায়গায় শেখ মুজিব বলেছেন, তিনি জুলফিকার আলী ভুট্টোর সাথে কোনো বিবাদে যেতে চাননি। আর এখনো চাচ্ছেন না। জুলফিকার আলী ভুট্টো যাতে জটিলতার মধ্যে না পড়েন সে জন্য তিনি জেদ করেননি যুদ্ধাপরাধী পাকসেনাদের বিচার করার জন্য। তিনি তেমন জেদ করলে পাকবাহিনীতে বিদ্রোহ দেখা দিত। আর ভুট্টো হারাতেন ক্ষমতা। যেটা তিনি চাননি। এ সময় বাংলাদেশে চলেছিল দুর্ভিক্ষের অবস্থা। শেখ মুজিব চান মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কাছে খাদ্য সাহায্য। কিসিঞ্জার বলেন, এ ব্যাপারে তিনি প্রেসিডেন্ট ফোর্ডকে খাদ্য প্রদানে অনুরোধ জানাবেন। এই আলোচনা হয়েছিল খুব হার্দিক পরিবেশে। শেখ মুজিব কিসিঞ্জারের মাধ্যমে প্রেসিডেন্ট ফোর্ডকে আমন্ত্রণ জানান বাংলাদেশ সফরে।
বাংলাদেশের বুদ্ধিজীবীদের কাছে কিসিঞ্জার হয়ে আছেন খুব ঘৃণ্য ব্যক্তি। কেননা মনে করা হয় ১৯৭১ সালে বাংলাদেশে যে বিরাট রক্তপাত ঘটেছে তার জন্য মূলত কিসিঞ্জারই দায়ী। কিন্তু ঘটনা তা নয়। কেননা মার্কিন নৌবহর এসেছিল পাকিস্তানের প্রতিরক্ষার জন্য। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র পাকিস্তানের প্রতিরক্ষার জন্য চুক্তিবদ্ধ হয়েছিল সেই ১৯৫৪ সালে। যখন কিসিঞ্জারের পক্ষে মার্কিন পররাষ্ট্রসচিব হওয়া সম্ভব ছিল না। পররাষ্ট্রসচিব ছিলেন জন ফসটার ডালেস। কিসিঞ্জার বহন করেছিলেন ডালেসের করে যাওয়া প্রতিরক্ষা নীতির ছককে অনুসরণ। সাবেক পাকিস্তান ছিল একটি আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্র। সে ছিল জাতিসঙ্ঘের সদস্য। ভারত চাচ্ছিল রাষ্ট্রটিকে আসলে বিলুপ্ত করতে। আর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র তার এই ইচ্ছাকে প্রতিরোধ করেছিল। এটা ছিল আন্তর্জাতিক আইনের দৃষ্টিতে আইনসম্মত। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে পাকিস্তান ছিল প্রতিরক্ষা চুক্তিতে আবদ্ধ। যত দূর জানি বাংলাদেশ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রর সঙ্গে করেছে স্ট্যাটাস অব ফোর্স এগ্রিমেন্ট। যেকোনো সংখ্যক মার্কিন সৈন্য ইচ্ছে করলে এখনো আসতে পারে বাংলাদেশে পাসপোর্ট ভিসা ছাড়াই। অন্য কোনো রাষ্ট্রের সাথে আমাদের এ রকম চুক্তি নেই।
হেনরি কিসিঞ্জারের বয়স চলেছে ৯৫ বছর। তিনি যুক্ত রিপাবলিকান পার্টির সাথে। কিন্তু এবারের নির্বাচনে তিনি ডোনাল্ড ট্রা¤পকে ভোট দেননি। কেবল তাই নয়, তিনি সবাইকে ভোট দিতে বলেছিলেন হিলারি ক্লিনটনকে। কিন্তু ডোনাল্ড ট্রা¤প জিতলেন। তাই বলতে হয়, হেনরি কিসিঞ্জার এখন মার্কিন রাজনীতিতে আর আগের মতো প্রভাবশালী ব্যক্তি নন। তিনি এখন অতীতের ফসিল নেতা মাত্র।

বিজ্ঞাপন / স্পন্সরড কন্টেন্ট
ট্যাগ:
সর্বশেষ সংবাদ
Situs Streaming JAV