Sunday, 1 November 2026 |
শিরোনাম
সমুদ্রের উচ্চতা বৃদ্ধি ও বন্যার ঝুঁকি মোকাবিলায় নিউইয়র্কে ২ বিলিয়ন ডলারের মহাপ্রকল্প দুই তরুণী রোগীকে যৌন নিপীড়নের অভিযোগ; নিউইয়র্কে বাংলাদেশি-আমেরিকান চিকিৎসক ডা. ফজলুল ইউসুফ গ্রেপ্তার, জামিনে মুক্ত বাংলাদেশে বীর মুক্তিযোদ্ধা মানিক পশারীর দাফনে বাধার প্রতিবাদ, ‘শিখা অনির্বাণ’ প্রজ্জ্বলিত রাখার দাবি নিউইয়র্কে শান্তি প্রতিষ্ঠায় সিদ্ধান্ত গ্রহণের সব পর্যায়ে নারীর অংশগ্রহণ জরুরি: জাতিসংঘে বাংলাদেশের স্থায়ী প্রতিনিধি আইরিন খান নিউইয়র্কে বাংলাদেশ সোসাইটির প্রচার সম্পাদক রিজুর পিতার ইন্তেকাল যুক্তরাষ্ট্রের ডিভি লটারি ফের স্থগিত, নিম্ন আদালতের আদেশে আপিল আদালতের বাধা যুক্তরাষ্ট্রে ডেলাইট সেভিং টাইমের অবসান, ১ নভেম্বর ঘড়ির কাঁটা এক ঘণ্টা পেছাবে নিউইয়র্কে ন্যাশনাল ইমিগ্র্যান্টস ডে উদ্‌যাপন; বিভিন্ন ক্ষেত্রে অবদানের স্বীকৃতি, সাত বিশিষ্ট ব্যক্তিকে সম্মাননা প্রদান জাতিসংঘে বাংলাদেশের কূটনৈতিক সাফল্য; এলডিসি উত্তরণের প্রস্তুতিকাল বাড়ল আরও ৩ বছর নিউ জার্সিতে উৎসবমুখর পরিবেশে দুর্গাপূজা উদযাপিত
সব ক্যাটাগরি

নিউইয়র্কে ঊর্ধ্বমান বাড়িভাড়া ও জীবনযাত্রার নানামুখী চাপ এবং সন্তানকে ‘ইন্ডিপেন্ডেন্ট’ করা

অনলাইন ডেস্ক পঠিত: 35 বার

প্রকাশিত: July 27, 2017 | 11:43 PM

মনিজা রহমান : গত ফেব্রুয়ারি থেকে আমার বাসায় একজন আধা শ্বেতাঙ্গ ও আধা কৃষ্ণাঙ্গ তরুণী প্রতি সপ্তাহে আসে। ওর বয়স হবে ২৫ বছর। কথাবার্তায় খুব পটু। দেখতেও মিষ্টি। কিন্তু আচরণে অত্যন্ত গুরুগম্ভীর। ওর কাজ প্যারেন্টদের ট্রেনিং দেয়া । একজন স্পেশাল শিশুর মা হিসেবে আমাকে প্রস্তুত করার জন্য সিটি থেকে ওকে পাঠানো হয়।
প্রতিবার বাসায় ঢুকে ওর সেই একটাই কথা- ‘সৃজনকে ইন্ডিপেন্ডেন্ট করতে হবে। নিজের সব কাজ ও নিজে করবে। নিজের হাতে খাবে। গোসল করবে। কাপড় পাল্টাবে। ‘সৃজনের বয়স মাত্র সাত বছর। কথা বলতে পারে না। আমরা কিছু বললে অর্ধেক বোঝে, অর্ধেক বোঝে না। আমি যে ওকে হাত দিয়ে খাইয়ে দেই এটা প্যারেন্ট ট্রেনারের একদম অপছন্দ। এমনকি চামচ দিয়ে খাওয়ালেও হবে না। সৃজনকে নিজে চামচ দিয়ে নিয়ে খেতে হবে।
সেদিন এই নিয়ে কথা হচ্ছিল। কথার মাঝখানে আমি ফস করে বলে ফেলি, ‘আমার বড় ছেলেকেও তো আমি নিজের হাতে খাওয়াই’।
‘কী মননকে হাত দিয়ে খাইয়ে দাও! ১২ বছর বয়সী একটা ছেলেকে তুমি নিজের হাতে খাওয়ায়!’ আমার প্যারেন্ট ট্রেনারের মাথা ঘুরে চেয়ার থেকে পড়ার দশা। মনে হলো, আমি যেন অষ্টম আশ্চর্য সৃষ্টির মতো একটা ঘটনা ঘটিয়েছি। ওকে বোঝানোর জন্য আমি আমতা আমতা করে বলি, ‘না মানে মনন তো নিজের হাতে খেতেই পারে। তবে নিজের হাতে খেলে অনেক খাবার নষ্ট করে তো! আর শাকসবজি খেতে চায় না।’
প্যারেন্ট ট্রেনারের তবু বিস্ময় কাটে না।
পড়ন্ত দুপুরে বাসার সামনে বসে থাকি ছোট ছেলে সৃজনের স্কুল বাসের জন্য। আসা-যাওয়ার পথে অনেকের সঙ্গে কথা হয়। বিশেষ করে আমি যেখানে থাকি সেই জ্যাকসন হাইটসে বাসা থেকে বের হলেই অনেক বাঙালির সঙ্গে দেখা হয়। আশপাশে অনেক বাঙালি ডাক্তারের চেম্বার, ল’ অফিস থাকার কারণে বহু দেশি লোক ওই রাস্তা দিয়ে চলাচল করে। সৃজনের বাসের জন্য অপেক্ষা করতে করতে তাদের দেখি। আর মনেই হয় না বিদেশে আছি!
যেমন সেদিন ফুটপাত দিয়ে যাচ্ছিলেন আমার পরিচিত বয়স্ক মহিলা। আমাকে দেখে হেসে কুশল জিজ্ঞাসা করলেন। কথায় কথায় বললাম প্যারেন্ট ট্রেনারের কথা। আমার প্রৌঢ়া প্রতিবেশীকে বললাম, সাত বছর বয়সী ছেলেকে কীভাবে নিজের হাতে খাওয়ার জন্য তৈরি করব, সেই দুশ্চিন্তার কথা। সব শুনে উনি বললেন, ‘দূর ওদের কথা শুনলে হবে। বাঙালি মায়েরা সন্তানকে নিজের হাতে খাওয়াবে। আমার বড় ছেলে ডাক্তারি পড়ার সময় পড়ার চাপে ঠিকমতো খাওয়া-দাওয়া করতো না। তখন ওর ২৫-২৬ বছর। এই বয়সেও কতদিন আমি ওকে ভাত মাখিয়ে খাইয়ে দিয়েছি। সন্তানরা ঠিকভাবে না খেলে মায়েদের খাবার কি হজম হয়!
বাসায় ফিরে আমি প্যারেন্ট ট্রেনারের আর প্রৌঢ়া প্রতিবেশীর কথা ভাবি। তবে কি আমরা বাঙালি মায়েরা সন্তানকে ‘ইন্ডিপেন্ডেন্ট’ হতে দেই না! আমরা কী তবে ’ওভার প্রটেকটিভ?’ সন্তানের দেখাশোনা করতে গিয়ে নিজেদের ক্যারিয়ার-জীবনের আনন্দকে বিসর্জন দেই আমরা অনেকে। ওদের সব কাজ করে দেই। খাবারের প্লেট হাতে দাঁড়িয়ে থাকি। সব কাজ নিজে করতে গিয়ে অনেক বেশি ‘স্ট্রেস’ নিয়ে ফেলি।
সিক্স গ্রেড পড়ুয়া ছেলেকে তিন এভিনিউ, পাঁচ ব্লক পার হয়ে স্কুলে দিয়ে আসি। আবার নিয়ে আসি। বিকালে লাইব্রেরি, উইকএন্ডে গানের স্কুল, সামারে সুইমিং ক্লাস, এমনকি শুক্রবার জুমার নামাজেও দিয়ে আসতে হয়। কেন ? ছেলে কি একা যেতে পারে না! স্ট্রিট সাইন চেনে না? চেনে, তবু টেনশন দূর হয় না।
আমার প্যারেন্ট ট্রেনারের সঙ্গে বিষয়গুলো নিয়ে আলোচনা করি। ও আমাকে সাফ বলে, তুমি এসব করে নিজেরই ক্ষতি করছো। ওদের কাজ যদি ওরা না করে, শিখবে কীভাবে? একা একা পথ চলতে না পারলে তো ‘কনফিডেন্স’ গড়ে উঠবে না।
আমার এক বন্ধুর কথা বলি। মা হিসেবে ওকে আমার সব সময় ‘ওভার প্রটেকটিভ’ মনে হয়। একদিন ওর গাড়িতে করে লং আইল্যান্ডে এক বাসায় যাচ্ছিলাম। পথ থেকে ওর মেয়েকে নেবে। পুরো রাস্তা গাড়ি চালাতে চালাতে হেডফোনে মেয়েকে এমনভাবে গাইড করছিল ও আমার রীতিমতো মজা লাগছিল। আমার বন্ধু স্বীকার করে সে ওভার প্রটেকটিভ ঠিকই, তবে এতে করে তার সন্তান ‘ইন্ডিপেন্ডেন্ট’ হচ্ছে না এটা ভাবা ঠিক নয়।
আমার বন্ধুটি বলে, আমার ১৭ বছর বয়সী মেয়ে সামারে একটা কাজ করছে। আমি থাকি লং আইল্যান্ডে। ওর কাজের জায়গা সেই ব্রংকসে। সকালে আমি ওকে ট্রেন স্টেশনে গাড়িতে নামিয়ে দিয়ে আসি। আসার সময় পারি না। কারণ, তখন আমাকে কাজে থাকতে হয়। কিন্তু সারাক্ষণ ওর সঙ্গে আমার মোবাইলে যোগাযোগ থাকে। যখন যে স্টেশনে এসে নেটওয়ার্ক পায়, মেয়ে আমাকে মোবাইলে মেসেজ পাঠায়। দ্যাখ ও কিন্তু ঠিকই ইন্ডিপেন্ডেন্টলি কাজ করছে, আসা-যাওয়া করছে। কিন্তু সারাক্ষণ আমার সঙ্গে যোগাযোগ থাকার কারণে ওর সঙ্গে আমার বন্ডিংটা জোরালো হচ্ছে। কারণ ও আমার একটাই মেয়ে। একমাত্র সন্তান। ওই হচ্ছে আমার সবকিছু। আমার হৃদয়ের সবটুকু ভালোবাসা দিয়ে ওকে বড় করে তুলতে চাই। আর চাই ও যাতে কোনোভাবে নিজেকে ইনসিকিউরড ফিল না করে।
আমি বা আমার মতো প্যারেন্টদের সংখ্যা বাঙালি কমিউনিটিতে বেশি। যারা দিনের বেশিরভাগ সময় পার করি সন্তানদের পেছনে। তবে কাজের প্রয়োজনে এখন অনেককে লম্বা সময় বাইরে থাকতে হয়। তারাও নিজেদের সন্তানকে সেভাবে গড়ে তোলেন। কর্মজীবী মায়েদের ছেলেমেয়েরা স্কুলের পরে অনেকে ‘আফটার স্কুলে’ থাকে। সকাল আটটায় স্কুলে যায়, আবার বাসায় ফিরতে ফিরতে আবার সেই হয়তো রাত আটটা বাজে। কেউ কেউ স্কুল থেকে সরাসরি বাসায় চলে আসে। তাদের কাছে চাবি থাকে। সেই চাবি দিয়ে বাসায় ঢুকে বাবা-মা না আসা পর্যন্ত একা সবকিছু করে। ফ্রিজ থেকে খাবার বের করে মাইক্রোওভেনে গরম করে খায়। নিজের হোমওয়ার্ক নিজেই করে। বিকালে বাসার দরজা লক করে পার্কে খেলতে যায়। এভাবে পরিস্থিতির চাপে ইন্ডিপেন্ডেন্ট হয়ে ওঠে তারা।
নিউইয়র্কে ঊর্ধ্বমান বাড়িভাড়া ও জীবনযাত্রার নানামুখী চাপে অনেক পরিবারে স্বামী-স্ত্রী দুজনের চাকরি করতে হয়। কর্মজীবী মায়েদের সন্তানরা তুলনামূলকভাবে ইন্ডিপেন্ডেন্ট হয় হাউজওয়াইফ মায়েদের তুলনায়। আমার খুব ঘনিষ্ঠ এক কর্মজীবী নারী জানালেন, আগে আমরা কাজ করতাম স্বামী-স্ত্রী দুজন। এখন আমার ছেলেও কাজ করছে। ওকে আমরা কাজের জন্য বলিনি। সে নিজেই কাজ খুঁজে পেয়েছে। ক্লাস সেভেন গ্রেডে যখন পড়ত ও, ব্রংকস থেকে দীর্ঘপথ পাড়ি দিয়ে এস্টোরিয়ায় স্কুলে ক্লাস করতে আসতো। এভাবে ও পথ চিনতে শিখেছে। আর আমার সিক্স গ্রেডে পড়ুয়া মেয়েও তো বাসা থেকে বের হয়ে প্রথমে ট্রেন, তারপর বাস এভাবে চেইঞ্জ করে স্কুলে যায়। প্রথম প্রথম টেনশন হতো। এখন জানি, ও পারবে।
তবে সন্তানরা ইন্ডিপেন্ডেন্ট হতে গিয়ে নানারকম সমস্যাও তৈরি করে। একা একা চলাফেরা করতে গিয়ে নানাজনের সঙ্গে বন্ধুত্ব হয়। অতিরিক্ত স্বাধীনচেতা হয়ে যায়। বাসায় দীর্ঘসময় একা থাকার জন্য নানা বিষয়ে আসক্তি জন্মায়। যে কারণে বাবা-মা কাজে থাকলেও আমার সেই বন্ধুর মতো উচিত সারাক্ষণ সন্তানের সঙ্গে ফোনে, মেসেঞ্জারে, ভাইবারে, হোয়াটসআপে…যেভাবে হোক যুক্ত থাকা। যাতে করে সন্তানরা এক মুহূর্তের জন্য বুঝতে না পারে সে একা আছে। বাবা-মায়ের পাশাপাশি বড় ভাইবোনরা থাকলে তারাও এই কাজটা করতে পারে।

আমার সঙ্গে প্যারেন্ট ট্রেনারের সেশনের প্রায় ছয় মাস চলছে। এই সপ্তাহে গত বুধবার এসেছিল ও। আমাকে জানালো, আর মাত্র দুটা সেশন আছে তোমার সঙ্গে। আর কিন্তু আমাকে পাবে না। কেউ তোমাকে আর কঠিন গলায় শেখাতে আসবে না। ওর কথায় একটু খারাপই লাগল। এত ধৈর্য্য ধরে শেখাচ্ছে ও, কিন্তু আসলেই কী পারছি ওর শেখানো মতে সন্তানদের লালন-পালন করতে?
গভীর আনন্দের ব্যাপার কী জানেন, প্যারেন্ট ট্রেনারের উপস্থিতিতে সেদিন সৃজন নিজের হাতে চামচ দিয়ে ডাল-মাংস দিয়ে মাখানো ভাত খেল। সৃজনের নিজের হাতে খাওয়া দেখে প্যারেন্ট ট্রেনার এত খুশি হলো যে, বলার নয়। আমাকে ডেকে বলল, ওকে একটা রিওয়ার্ড দেয়া দরকার। আমি ব্যাগ থেকে একটা চুইংগাম এনে দিলাম। সৃজনও বুঝতে পারল সে একটা ভালো কাজ করেছে।

আমার আনন্দিত মুখের দিকে তাকিয়ে প্যারেন্ট ট্রেনার জানালো, দেখো একদিন তুমিও পৃথিবীতে থাকবে না। ওর বাবাও থাকবে না। কিন্তু গভীর দুশ্চিন্তায় তোমরা হয়তো শেষ জীবনটা পার করবে এই ভেবে যে, আমাদের মৃত্যুর পরে কে সৃজনকে দেখে রাখবে? ও তো আর দশটা মানুষের মতো নয়। এজন্যই ওকে ইন্ডিপেন্ডেন্ট করে গড়ে তোলা বেশি জরুরি। ও যাতে কারো ওপর নির্ভরশীল না হয়। নিজের সিদ্ধান্ত নিজে নিতে পারে। অন্যের সাহায্য ছাড়া নিজের কাজ নিজে করতে পারে। এই পৃথিবীটা বড় কঠিন। এই কঠিন পৃথিবীতে সৃজনকে একাই লড়াই করে টিকে থাকতে হবে।

বিজ্ঞাপন / স্পন্সরড কন্টেন্ট
ট্যাগ:
সর্বশেষ সংবাদ