হিন্দুরা বাংলাদেশকে দিয়েছে অনেক, হারিয়েছে আরও বেশী : বকশিস নয়, হিসাবের পাওনা চাই
শ্যামল চক্রবর্তী : একাত্তরে গেলাম না। কারন দেশটার জন্য যুদ্ধ করেছিল পুরো বাঙ্গালী জাতি। যদিও কোলাটেরল ক্ষতির অধিকাংশই বইতে হয়েছে হিন্দুদের। পুড়েছে ঘর-বাড়ি, মরেছে মানুষ। ভেঙ্গেছে পরিবার, দেশান্তরী লক্ষ লক্ষ। অবশেষ ছিল শুধু দেশটাই। এই দেশটাই তো চেয়েছিলাম আমরা। স্বাধীন দেশ, নিজের দেশ। তবে সব মুসলমানের চাওয়াটা এক ছিল না। এটাই ইতিহাস। যুদ্ধে এত বেশী রক্ত ঝরার জন্য এটাও দায়ী। হিন্দুদের রক্ত। লুঙ্গী খুলে পরখ করা মানুষের রক্ত। তাই হিন্দুদের কাছে জাতি ঋণী, বিশ্বাসঘাতকদের কাছে নয়। কিন্তু যুদ্ধের মহানায়ক বঙ্গবন্ধু যুদ্ধ শেষেই ঘোষণা করলেন সাধারন ক্ষমা, উড়ে গেলেন ওআইসি (ইসলামি রাষ্ট্র জোট) সম্মেলনে। অথচ ওআইসিভুক্ত কোন রাষ্ট্রই তখন পর্যন্ত এমনকি শেখ মুজিব নিহত হবার আগ পর্যন্ত বাংলাদেশকে স্বীকৃতিই দেয়নি। যুদ্ধ করে জিতেছিলাম অসাম্প্রদায়িক একটি রাষ্ট্র। কিন্তু ওআইসি সম্মেলনে শামিল হয়ে বঙ্গবন্ধু জানিয়ে দিলেন আমাদের কষ্টার্জিত নতুন পতাকা রক্তরাঙ্গা স্বাধীনতা নয়। এই পতাকা সবুজে ঢাকা আমাদের শস্য শ্যামলিমা নয়। এই পতাকা স্বপ্ন ভঙ্গের। এই পতাকা বঞ্চনার, হৃদয়ে রক্তক্ষরণের। এই পতাকা ধুসর মরুঝরে লুটোপুঁটি করা নিরেট বালুকনা। এখানে কোন অনুভুতি নেই, কোন স্বপ্ন নেই। স্বাধীনতার এতবছর পর তাই বলছি ঋণের কথা, হিসাবের কথা।
আজ পচাত্তরের কথা বলব। ১৫ই আগস্ট ১৯৭৫ এর কালোরাতে বঙ্গবন্ধুকে হত্যার অব্যবহিত পরেই ভোরবেলা বংশালে মরনচাঁদের মিষ্টিভাণ্ডার লুট করে উন্মত্ত উল্লাস করেছিল সংখ্যাধিক্য জনগোষ্ঠী। উৎসব মুখর দেশ। ছিল না প্রতিবাদের ছিটেফোটা কোথাও। ছাত্রলীগের তৎকালীন সভাপতি, আজকের প্রধানমন্ত্রীর পরমাত্মীয় শেখ শহীদও ছিলেন মহানন্দে। মুখে কলপ এঁটেছিলেন তোফায়েল আহমদ সহ তখনকার জাঁদরেল নেতারা যাদের অনেকেই বর্তমান ও সাবেক সরকারের বেজায় রকম মন্ত্রী। আজকের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সেই ভয়াল দিনে নিজেও কিছু করনেনি। পিতা-মাতা, ভাইবোন ও স্বজন হারানোর শোকে অতীব মুহ্যমান দিন-মাস-বছর পার করেছেন ইউরোপ আর ভারতে। শোক কাটতে লেগে গেছে তার প্রায় একটি যুগ। এখনও শোকের কথা বলেন তিনি। সেটাই স্বাভাবিক। কিন্তু ভাই, বেয়াই সবাইতো দেশে ছিল। উনার আত্মীয় স্বজনরা বরিশাল, খুলনা, ফরিদপুর, ঢাকা সহ দেশের সবখানেই ছিলেন। কেউ এগিয়ে আসেনি। বাংলার আকাশ-বাতাস, গ্রাম-গঞ্জ, শহর-নগর থেকে নিমেষে উবে গিয়েছিল জয়বাংলা স্লোগান। থমকে গিয়েছিল স্বাধীনতার হৃদ-স্পন্দন। এখনও থমকেই আছে। কস্মিঙ্কালেও আর চালু হবে কিনা কে জানে।
শুধু জগন্নাথ হলেই বন্ধ হয়নি স্লোগান। জয় বাংলা স্লোগান। জয় বঙ্গবন্ধু স্লোগান। হিন্দুরা এগিয়ে এসেছিল। হিন্দুরাই এগিয়ে এসেছিল, প্রতিবাদ করেছিল। বঙ্গবন্ধু হত্যার বিচার চেয়েছিল। মিছিল করেছিল। দেশের কোথাও হিন্দুরা স্বাধীনতার সাথে বেঈমানি করেনি। বঙ্গবন্ধু হত্যায় উল্লাস করেনি। এতবছর পর তাই ঋণের কথা, হিসাবের কথা।
বঙ্গবন্ধু তনয়া আজকের প্রধানমন্ত্রী কয়দিন পরপরই হিন্দুদেরকে নাসিরনগর, সাথিয়া, তারাগঞ্জ ঠাকুরপাড়া, গোবিন্দগঞ্জ সাঁওতাল পল্লী, ইত্যাদি ইত্যাদি দিয়ে চলছেন। স্বাধীনতার পর থেকেই নির্যাতিত হয়ে আসছে দেশের হিন্দুরা। এই সরকারের আমলে দেশের ধর্মীয় ও জাতিগত সংখ্যালঘুদের উপর চলমান নির্মম নিপীড়ন যেন আরও বেশী। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী যিনি নিজেকে মাদার অফ হিউম্যানিটি বা মানবতার-মাতা বলে উদ্ভট দাবী করেন তিনি সাঁওতাল মানুষ ও সংস্কৃতি ধ্বংস কিংবা হেফাজত-ওলামাদের আঁতাতে স্বাধীনতার চেতনাকে কলঙ্কিত করার ব্যাপারে এবং হিন্দুদের ঘরবাড়ি জ্বালাও-পোড়াও অথবা ধন-সম্পদ লুটতরাজের ব্যাপারে মুখ খুলছেন না কেন? প্রধানমন্ত্রী শোক করার সুযোগ পেয়েছেন বিয়াল্লিশ বছর। যুদ্ধে স্বজন হারিয়ে হিন্দুরা শোক করতে পেরেছেন কয় বছর? যুদ্ধ জয়ের পর, এখনও হিন্দুরা যুদ্ধ করছে ফিবছর। স্ত্রী-কন্যার সম্ভ্রম বাঁচানোর যুদ্ধ, জন্মভিটা রক্ষা করার যুদ্ধ। ঘর পুড়ছে, স্বজন মরছে। নতুন শোকে বারবার ঢাকা পড়ে যাচ্ছে পুরনো শোকের মাতম।
বর্তমান প্রধানমন্ত্রী অতি-কথন, বর্ণ-চোরা হাসানুল হক ইনুকে মন্ত্রী বানিয়েছেন। অথচ এই ইনুরাই বঙ্গবন্ধু হত্যার আনন্দে উদ্বেলিত ছিলেন ঢাকার রাজপথে। নুরুল ইসলাম নাহিদ, মতিয়া চৌধুরী, নুহউল আলম লেনিনরা লালপট্টি পড়ে অরাজকতার সৃষ্টি করেছিলেন দেশে। ষড়যন্ত্র করেছিলেন দেশের বিরুদ্ধে, দেশকে অপাংতেয় বানিয়েছিলেন বিদেশীদের কাছে। জ্বালিয়ে দিয়েছিলেন ঢাকার ইউসিস (আমেরিকান তথ্য কেন্দ্র)। এরাই তৈরি করেছিলেন বঙ্গবন্ধুকে হত্যার প্রেক্ষাপট। আরও আছে। প্রধানমন্ত্রীর চারপাশে এখন আনাগোনা করছে বেশ কিছু জয়চাঁদ।অনেকগুলো হিন্দুকে প্রশাসনের বিভিন্ন পদে এমনকি গুরুত্বপূর্ণ জায়গাও নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। সেটা শেখ হাসিনার নিরাপদে ক্ষমতায় বহাল থাকার জন্যই। তিনি নিজেও জানেন মোল্লার বাড়িতে বিশুদ্ধ হিন্দু ব্রাম্মন পণ্ডিত রাখা হয় ছেলেমেয়দেরকে জাতে তোলার জন্য়, আর ব্যবসায় হিন্দু মহাকরন রাখা হয় ধন-সম্পদ সুরক্ষিত রাখার জন্য। তাই নিজের ক্ষমতা-ব্যবসা পাকা-পোক্ত করার জন্য চারপাশে এই জয় চাঁদদের না রাখাটাই বিপদ। প্রধানমন্ত্রী জানেন, কার কাছে তিনি নিরাপদ। জানেন কাকে দেওয়া যায় বকশিস আর কাকে গলাধাক্কা। এই জয়চাঁদরা হিন্দুদের উপর নিপীড়ন-সন্ত্রাসের ব্যাপারে একেবারেই নীরব। সুরঞ্জিত বাবু (তাঁর আত্মা স্বর্গলাভ করুক) নীরব ছিলেন, তবে বুঝেছিলেন মরিবার আগে। হটাত সরবও হয়েছিলেন অক্কা পাওয়ার আগে। আর বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহাও তথৈবচ। ক্ষমতা হারিয়ে ও দুর্নীতির অপবাদে এখন ঘুরপাক খাচ্ছেন লাটিমের মত। হিন্দু তাবেদাররা যতই স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলুক, ভাল আছি ভাল থাকব বলে যতই ডুগডুগি বাজাক তারাও জানে লেশটি কার হাতে। দেশের সবচেয়ে বেশী হিন্দুদের বসবাস শেখ হাসিনার জেলায়। অনেকগুলো সংসদীয় এলাকায় হিন্দুরা হলেও নমিনেশন পান উনি বা উনার আত্মীয় স্বজনরা। কোন হিন্দু নয়।
বঙ্গবন্ধু, আওয়ামী লীগ, শেখ হাসিনাকে এখনও হিন্দুরা ভালবাসে। প্রগতির চেতনা এখনও আমরা ধারন করি মননে এবং করে যাব নিঃশেষে। কারন এই দেশটা আমাদের, এই মাটিতে গেঁথে আছে আমাদের শেকড়। তাই হিন্দুদের দেশপ্রেম বা বঙ্গবন্ধু প্রেম নিয়ে প্রশ্ন তোলার অধিকার কারও নেই। কারও কাছ থেকে এজন্য সার্টিফিকেট নেবারও প্রয়োজন নেই। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কাছ তো নয়ই। স্বাধীনতার জন্য অস্ত্র, সৈন্য, প্রশিক্ষন, আশ্রয়, অর্থ এমনকি স্বাধীনতার স্বীকৃতি অন্য কোন দেশ বা জাতি নয়, শুধুমাত্র হিন্দুরাই বহন করেছে বা দিয়েছে। বাঙ্গালী একটি জাতি। খাঁটি বাঙ্গালী হতে হলে আদি-জন্ম এই মাটিতেই হতে হয়। হিন্দুরা এই মাটির মানুষ, প্রকৃত বাঙ্গালী। কাবুলিওয়ালা বা বেদুইন, মুঘল বা বেনিয়ারা কখনই খাটি বাঙ্গালী হতে পারে না। অথচ তারা আজ দণ্ড মুণ্ডের কর্তা। আর হিন্দুরা হারাচ্ছে ভুমি নতুবা হচ্ছে দেশান্তরী। সময় এখন হিসাব মেলাবার, হিসাব বুঝে নেবার। এ দেশ আমাদের, এ মাটি আমাদের। হিন্দুরা এ দেশকে দিয়েছে অনেক। হারিয়েছে আরও বেশী। আসুন এবার ঘুরে দাঁড়ানোর গল্প বলি। রুখে দেবার প্রতিজ্ঞা করি।
লেখকঃ জগন্নাথ হল (ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়) বাংলাদেশ ছাত্রলীগের সাবেক সাধারন সম্পাদক।
- দুই তরুণী রোগীকে যৌন নিপীড়নের অভিযোগ; নিউইয়র্কে বাংলাদেশি-আমেরিকান চিকিৎসক ডা. ফজলুল ইউসুফ গ্রেপ্তার, জামিনে মুক্ত
- বাংলাদেশে বীর মুক্তিযোদ্ধা মানিক পশারীর দাফনে বাধার প্রতিবাদ, ‘শিখা অনির্বাণ’ প্রজ্জ্বলিত রাখার দাবি নিউইয়র্কে
- শান্তি প্রতিষ্ঠায় সিদ্ধান্ত গ্রহণের সব পর্যায়ে নারীর অংশগ্রহণ জরুরি: জাতিসংঘে বাংলাদেশের স্থায়ী প্রতিনিধি আইরিন খান
- নিউইয়র্কে বাংলাদেশ সোসাইটির প্রচার সম্পাদক রিজুর পিতার ইন্তেকাল
- যুক্তরাষ্ট্রের ডিভি লটারি ফের স্থগিত, নিম্ন আদালতের আদেশে আপিল আদালতের বাধা
- যুক্তরাষ্ট্রে ডেলাইট সেভিং টাইমের অবসান, ১ নভেম্বর ঘড়ির কাঁটা এক ঘণ্টা পেছাবে
- নিউইয়র্কে ন্যাশনাল ইমিগ্র্যান্টস ডে উদ্যাপন; বিভিন্ন ক্ষেত্রে অবদানের স্বীকৃতি, সাত বিশিষ্ট ব্যক্তিকে সম্মাননা প্রদান
- জাতিসংঘে বাংলাদেশের কূটনৈতিক সাফল্য; এলডিসি উত্তরণের প্রস্তুতিকাল বাড়ল আরও ৩ বছর