‘টাইমস স্কোয়ারকে মনে হচ্ছিল পল্টন ময়দান’
মনিজা রহমান : কোথায় যেন পড়েছিলাম, কালো মানুষদের সবচেয়ে সুন্দর লাগে যখন তারা প্রতিবাদী হয়। যখন তারা
রুখে দাঁড়ায়। যখন তারা ঐক্যবদ্ধ হয়। সৃষ্টিকর্তা যেন ওদের প্রতিবাদ করার জন্যই পৃথিবীতে পাঠিয়েছিল।
১৫ই জানুয়ারি সোমবার বিকালে ম্যানহাটনের ফরটি টু স্ট্রিট টাইম স্কোয়ারে দাঁড়িয়ে ভাবছিলাম সেই কথা। যত দূর চোখ যায় শুধু মানুষ। প্রায় সবাই কালো মানুষ। বেশির ভাগ হাইতিয়ান। আফ্রিকান অন্যান্য দেশেরও আছে। সবার হাতে নিজ দেশের পতাকা। সবার হাত উত্তোলিত। শিরদাঁড়া খাড়া করে তাকিয়ে আছে মঞ্চের দিকে। যেখানে একের পর এক জ্বালাময়ী বক্তৃতা চলছে। উপস্থিত জনতার সরব উপস্থিতি আন্দোলিত করছিল বক্তাকেও।
১৫ই জানুয়ারি ছিল আমেরিকার অবিসংবাদিত কালো মানুষের নেতা মার্টিন লুথার কিং জুনিয়রের জন্মদিন। পুরো আমেরিকায় তিনিই একমাত্র মানুষ, যার জন্মদিনে স্কুল-কলেজ-অফিস আদালত সব বন্ধ থাকে। যে কারণে টাইম স্কোয়ারের সমাবেশ যেন পেলো ভিন্নমাত্রা। শ’ শ’ বছর ধরে চলে আসা বর্ণবৈষম্যের বিরুদ্ধে কালো মানুষদের যে আন্দোলন, সেটা যেন আজও থামেনি। থামবে কিভাবে! আমেরিকার প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প, যিনি নিজেই যে একজন প্রচণ্ড বর্ণবাদী- সেটাই প্রমাণিত হলো আরেকবার।
দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে ভাবছিলাম, কালো মানুষেরা কি চিরকাল অপমানিতই হবে? অশালীন উক্তির শিকার হবে? এই তো ক’দিন আগেই হোয়াইট হাউসে রিপাবলিকান ও ডেমোক্রেট দলীয় সিনেটরদের সঙ্গে এক বৈঠকে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ‘মলদ্বার’-এর সঙ্গে তুলনা করেছেন হাইতি, এল সালভাদর ও আফ্রিকান দেশগুলোকে। তিনি যে শব্দটি ব্যবহার করেন, সেটা ছিল ‘শিটহোল’। যার সঠিক অনুবাদ করতে গিয়ে পৃথিবীব্যাপী সাংবাদিকরা বিপদে পড়েছেন। তবে আক্ষরিক অর্থে এর মানে হলো- মলদ্বার বা টয়লেট। শুধু নোংরা ভাষায় আক্রমণ নয়, ভবিষ্যতে এসব দেশ থেকে ইমিগ্র্যান্টদের আনার ব্যাপারেও আপত্তি জানিয়েছেন তিনি।
ওইদিন বিকালে কুইন্স থেকে সেভেন ট্রেনে করে ম্যানহাটন ফর্টি টু স্ট্রিটে এলাম, তখন বুঝতে পারছিলাম না কোন দিকে যাবো। দ্রুত মোবাইল ফোন বের করে ঠিকানায় গুগল ম্যাপে দিয়ে হাঁটা শুরু করলাম। তাপমাত্রা তখন মাইনাস তিন ডিগ্রি। প্রায় দশ মিনিট হাঁটার পরে গ্লাভসে ধরা মোবাইল ফোন হঠাৎ বন্ধ হয়ে গেল। তবে মাইক্রোফোনে আসা বক্তৃতার আওয়াজ শুনে বুঝলাম, আমার গন্তব্য আশপাশে কোথাও। জায়গাটা অবশেষে খুঁজে পেলেও মন খারাপ হয়ে গেল অন্য কারণে। এমন ঐতিহাসিক এক সভার ছবি মোবাইলে তুলতে পারছি না। কারণ চার্জ নেই মোবাইল ফোনে। রাগে-দুঃখে মাথার চুল ছিঁড়তে ইচ্ছা করছিল।
সভাস্থলের পাশে ফুটপাথ ঘেঁষে একটা দোকান দেখলাম। বিক্রেতার চেহারা দেখে মনে হলো বাঙালি। জিজ্ঞাসা করতে মাথা নাড়লো। বললাম, ‘আপনার কাছে কি আইফোনের চার্জার আছে?’ উনি উনার মোবাইল দেখিয়ে বললেন, ‘সরি, আমার স্যামসাং ফোন’। আমি বিমর্ষ মন নিয়ে চলে এলাম সেখান থেকে। ঠেলেঠুলে ফুটপাথের কিনার ঘেঁষে ব্যারিকেডের পাশে এসে একটা জায়গা পেলাম। আশপাশের সবাই আমার চেয়ে লম্বা। পেছনে দাঁড়িয়ে মঞ্চের মানুষদের দেখা সম্ভব নয়।
ঢাকায় থাকাকালে ক্রীড়া সাংবাদিক হওয়ার কারণে পল্টন আর গুলিস্তান এলাকায় রোজই যেতাম। প্রায় প্রতিদিন সেখানে সভা, সমাবেশ, মিছিল লেগে থাকতো। আমরা মাঠে খেলা দেখতাম আর দূর থেকে ভেসে আসতো সেই বক্তৃতার শব্দ। মানুষের গনগনে আবেগের উত্তাপ যেন অনুভব করলাম অনেকদিন পরে। টাইমস স্কোয়ারকে মনে হচ্ছিল পল্টন ময়দান। সেই ঢাকার মতো ব্যারিকেড দিয়ে পথ আটকে রেখেছে নিউ ইয়র্কের বিখ্যাত পুলিশ ডিপার্টমেন্ট এনওয়াইপিডি। তবে সৌভাগ্য যে, সভা শান্তিপূর্ণ ছিল। কাউকে গ্রেপ্তার করার দরকার হয়নি।
আমার পাশে দাঁড়ানো একজন বয়স্ক ধরনের লোককে দেখলাম মঞ্চের ছবি তুলছেন। আমি তাকে বললাম, ‘আমি কুইন্স থেকে এসেছি। আমার মোবাইল ফোনের চার্জ শেষ হয়ে গেছে। তুমি কি আমার কয়েকটা ছবি তুলে দেবে?’ লোকটা সানন্দে রাজি হয়ে গেল। ওর পতাকা আমার হাতে দিয়ে বলল পোজ দিতে। আমার অনেকগুলো ছবি তুলল ও। লোকটার নাম জিম ফার্দিনান্দ। ছবি তোলার সময় দেখলাম, জিমের পাশে দাঁড়ানো এক ভদ্রমহিলা সরু চোখে দেখছে আমাকে। ধারণা করলাম, উনি জিমের স্ত্রী বা বান্ধবী হবে। ভদ্রমহিলার সঙ্গে কুশলবিনিময়ের পরে জানালাম, ‘আমি জানি আমেরিকার স্বাধীনতাযুদ্ধে হাইতিয়ানরা বিশাল ভূমিকা রেখেছিল। এমনকি সিভিল ওয়ারের সময়ও।’ ‘জিনা’ নামের সেই ভদ্রমহিলা আমার কথায় সায় দিয়ে বললেন, ‘কিন্তু ট্রাম্পতো সেসব ভুলে গেছে। সে তো চায়ই না হাইতিয়ান-আফ্রিকানরা এই দেশে ইমিগ্র্যান্ট হয়ে থাকুক।’
অনেকে হয়তো জানেন না, হাইতি ল্যাটিন আমেরিকার প্রথম দেশ যারা স্বাধীন হয়েছিল। ১৮০৪ সালে ফরাসি ঔপনিবেশকারীদের বিরুদ্ধে তাদের এই স্বাধীনতা ছিল কালো ক্রীতদাসদের ত্যাগ ও বীরত্বের ফসল। আমেরিকা জর্জ ওয়াশিংটনের নেতৃত্বে ১৭৭৬ সালে যখন স্বাধীনতা অর্জন করেছিল, তখন তাদের হয়ে লড়াই করেছিল হাইতিয়ানরাও। ১৮৬১ থেকে ১৮৬৫ পর্যন্ত আমেরিকান সিভিল ওয়ারের সময় সাউথে যখন শ্বেতাঙ্গদের প্রচণ্ড আগ্রাসন, তখন বহু কালো মানুষ পালিয়ে হাইতি চলে গিয়েছিল। হাইতি নামটাই আমেরিকার বহু কালো মানুষের আশা আর প্রেরণার প্রতীক। যদিও রাজনৈতিক নেতৃত্বের কোন্দলের কারণে স্বাধীনতার এত বছর পরেও দেশটি এই অঞ্চলের সবচেয়ে দরিদ্র দেশ হিসেবে পরিচিত।
২০১০ সালে হাইতিতে এক ভয়াবহ ভূমিকম্পের কথা কারো ভুলে যাওয়ার কথা নয়। প্রায় আড়াই থেকে তিন লাখ মানুষ মারা গিয়েছিল তখন। সেই সময় মানবিক দিক বিবেচনা করে আমেরিকান সরকার প্রায় পঞ্চাশ হাজার হাইতিয়ানকে নিজের দেশে আশ্রয় দিয়েছিল। একই ঘটনা ঘটেছিল ২০০১ সালে সালভাদরের ভূমিকম্পের পরে। এখন ট্রাম্প প্রশাসন সিদ্ধান্ত নিয়েছে টেম্পোরারি প্রটেকশন স্ট্যাটাস সংক্ষেপে টিপিএস-এ আসা এসব উদ্বাস্তুকে ডিপোর্টেশন করে দেশে পাঠিয়ে দেয়ার। ২০১০ সালের ভূমিকম্পের পরে দ্বীপরাষ্ট্র হাইতিতে বেশ কয়েকবার ঘূর্ণিঝড় হয়েছে। সবমিলে দেশটির অর্থনৈতিক অবস্থা এখনও নাজুক। যে কারণে আশ্রয় নেয়া হাইতিয়ানদের অনেকে আর নিজের দেশে ফিরে যেতে চায় না। তাদেরকে এখন বর্তমান প্রেসিডেন্ট তুলনা করেছেন মলদ্বারের সঙ্গে।
আমেরিকার সচেতন জনগণ ট্রাম্পের এই মন্তব্যের তীব্র বিরোধিতা করেছে। ফ্লোরিডার মিয়ামিতে ও নিউ ইয়র্ক সিটির হারলেমে ইতিমধ্যে বিশাল প্রতিবাদ সভা হয়েছে। কিছুদিন আগে আমার এক হাইতিয়ান বন্ধু বিয়াত্রিচ লুবিন স্যাম্পিন এর ফেসবুকে এক ভিডিওতে দেখলাম, বিভিন্ন সামাজিক-মানবাধিকার সংগঠনের সদস্যরা ট্রাম্প টাওয়ারের সামনে দাঁড়িয়ে একসঙ্গে নিজেদের পশ্চাৎদেশ প্রদর্শন করছে। জনপ্রিয় উপস্থাপক এন্ডারসন কুপার একটা ভিডিও পোস্ট করেছেন সিএনএন’র ওয়েবসাইটে, সেখানে তিনি লিখেছেন- ‘ফাইটিং ব্যাক টিয়ার্স, ডিফেন্ড হাইতি এগেইনস্ট ট্রাম্প ‘শিটহোল’ রিমার্ক।’
ফুটপাথের পাশে দাঁড়িয়ে জিম ফার্দিনান্ড আর জিনার কাছ থেকে শুনছিলাম আর ভাবছিলাম, মানুষ কত দ্রুত ইতিহাস বিস্মৃত হয়। চোখের কোনা দিয়ে দেখলাম, এনবিসি টিভি’র এক পুরুষ রিপোর্টার, তাঁর নারী ক্যামেরা পার্সনকে নিয়ে এগিয়ে আসছে আমাদের সাক্ষাৎকার নিতে। এনবিসি আমার খুব প্রিয় টিভি চ্যানেল। ওরা এসে কারো সঙ্গে কথা বলতে চাইলে জিনা এগিয়ে গেল।
হঠাৎ মঞ্চে শোরগোল উঠল। ভালো করে তাকিয়ে দেখি নিউ ইয়র্কের সমস্ত অভিবাসী মানুষের আশা-ভরসার প্রতীক প্রিয় মেয়র বিল ডি ব্ল্যাজিও ডায়াসে দাঁড়িয়ে আছেন। উনি এসে প্রত্যয়ের সঙ্গে উচ্চারণ করলেন, ‘আই এম হাইতিয়ান’ ‘আই এম আফ্রিকান’। দু’টি বাক্যে যেন সাগরের গর্জন তুলল জনসভায়। শান্তি, ভালোবাসার পক্ষে আর বর্ণবৈষম্যের বিরুদ্ধে কথা বললেন তিনি।
হৃদয়ে সেই গর্জনের কম্পন নিয়ে ট্রেনে করে বাড়ি ফিরলাম। বাসায় ফিরে মোবাইল ফোন সেটে চার্জ দিয়েই ফেসবুক মেসেঞ্জারে হাইতিয়ান বন্ধু বিয়াত্রিচকে জানালাম, আজকের বিকালের কথা। আমি সেখানে গিয়েছি শুনে ও খুব খুশি হলো। জানতে চাইলাম, ওরা এখন কি চায়? বিয়াত্রিচ প্রত্যুত্তরে জানালো, ‘ট্রাম্প শুধু নিজের গায়ের রঙ আর অর্থের ওপর আস্থা রাখে, হাইতিয়ান মানুষ আর তাদের ইতিহাস সম্পর্কে ওর কোনো ধারণাই নেই, থাকলেও তাঁর কোন শ্রদ্ধা নেই। হাইতিয়ানরা অসম্ভব পরিশ্রমী। আর হাইতি হল আফ্রিকান কালো মানুষদের স্বাধীনতার প্রতীক। ট্রাম্পকে এসব জানতে হবে। হাইতি ও আফ্রিকানদের নিয়ে সে যে মন্তব্য করেছে, প্রকাশ্যে সেই জন্য দুঃখ প্রকাশ করতে হবে।’
বিয়াত্রিচের ইচ্ছা কি পূর্ণ হবে?
- শান্তি প্রতিষ্ঠায় সিদ্ধান্ত গ্রহণের সব পর্যায়ে নারীর অংশগ্রহণ জরুরি: জাতিসংঘে বাংলাদেশের স্থায়ী প্রতিনিধি আইরিন খান
- নিউইয়র্কে বাংলাদেশ সোসাইটির প্রচার সম্পাদক রিজুর পিতার ইন্তেকাল
- যুক্তরাষ্ট্রের ডিভি লটারি ফের স্থগিত, নিম্ন আদালতের আদেশে আপিল আদালতের বাধা
- যুক্তরাষ্ট্রে ডেলাইট সেভিং টাইমের অবসান, ১ নভেম্বর ঘড়ির কাঁটা এক ঘণ্টা পেছাবে
- নিউইয়র্কে ন্যাশনাল ইমিগ্র্যান্টস ডে উদ্যাপন; বিভিন্ন ক্ষেত্রে অবদানের স্বীকৃতি, সাত বিশিষ্ট ব্যক্তিকে সম্মাননা প্রদান
- জাতিসংঘে বাংলাদেশের কূটনৈতিক সাফল্য; এলডিসি উত্তরণের প্রস্তুতিকাল বাড়ল আরও ৩ বছর
- নিউ জার্সিতে উৎসবমুখর পরিবেশে দুর্গাপূজা উদযাপিত
- নিউইয়র্কের জেএমসির সম্প্রসারণ প্রকল্প রমজানের আগেই সম্পন্নের প্রত্যাশা, ফান্ডরেইজিংয়ে প্রায় ১০ লাখ ডলার সংগ্রহ, বাকি প্রয়োজন আরও ২০ লাখ