বর্ণীল আয়োজনে বাকা’র ঐতিহ্যবাহী বাংলা বর্ষবরণ উৎসব
এ্যন্থনী পিউস গমেজ, ভার্জিনিয়া: মেরীল্যান্ডের সিলভার স্প্রীং-এ রস্কো নিক্স এলিমেন্টারী স্কুল মিলনায়তনে গত রবিবার ১৫ই এপ্রিল অনুষ্ঠিত হয়ে গেল “বাঙালি-আমেরিকান খ্রীষ্টান এসোসিয়েশন অব মেরীল্যান্ড, ভার্জিনিয়া এন্ড ওয়াশিংটন ডিসি” বা ‘বাকা’র আয়োজনে বাংলার ঐতিহ্যবাহী বর্ষবরণ অনুষ্ঠান, পহেলা বৈশাখ-১৪২৫। গ্রামবাংলার ঐতিহ্যবাহী উৎসব এখন বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের অংশ হয়ে গ্রামীন জীবনের সীমানা পেড়িয়ে ঠাঁই করে নিয়েছে শহরতলীতে।
সময়ের বিবর্তনে সাংস্কৃতিক জীবনধারার পরিবর্তনের সাথে সাথে পহেলা বৈশাখের আড়ম্বরপূর্ণ আনন্দ আয়োজন বর্ষবরণের পথ ধরে সবাইকে ফিরিয়ে নিয়ে গিয়েছে শেকড়ের কাছে… গ্রামবাংলার ঐতিহ্যের দোরগোড়ায়। আর এরই ধারাবাহিকতায় এখন শহরের মানুষগুলো এই ঐতিহ্যের মধ্যে খুঁজে পেতে চেষ্টা করছে গ্রামীন জীবনের সুন্দর মুহূর্তগুলো, গ্রামের সহজ সরল মূল্যবোধের স্পর্শে সঞ্জিবীত হচ্ছে মানবিক মূল্যবোধ এবং মিলনমেলার অনুভবে একাকার হয়ে মিশে যাচ্ছে গ্রামীন লোকজ শেকড়ের সাথে আত্মার সেতুবন্ধন। আর এই ঐতিহ্যের ঐশ্বর্য স্পর্শ করেছে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা অভিবাসী বাঙালি সমাজকে- তাইতো গ্রামীন সেই বৈশাখী উৎসব এখন মহাসমারোহে বর্ণীল আয়োজনে উদযাপিত হচ্ছে প্রবাসের আঙ্গিনায়ও।
এ শুধু ভাল লাগা নয়, এ শুধু সাংস্কৃতিক নতুন জোয়ারে একাত্মতা নয়- এ যেন উৎসবের মধ্য দিয়ে আমাদেরও দেশের ঐতিহ্যের কোলে ফিরে যাবার প্রয়াস, আনন্দ আয়োজনের মধ্য দিয়ে নস্টালজিক ভাবনায় আপ্লুত হবার বাসনা- আমরা ফিরে যাই আমাদের ফেলে আসা দিনগুলোতে, ফিরে যাই ‘মা-মাটি-মানুষে’র টানে, মাটির কাছে। আরও গভীরভাবে চেতনায় অনুভব করার প্রয়াস পেলে যে বিষয়গুলো আমাদের নাড়া দিয়ে যায়, তা হল আমাদেরই শুধু নয়, আমাদের নতুন প্রজন্মও আন্দোলিত হচ্ছে আমাদের এই ঐতিহ্যের আলোয়। বাঙ্গালির প্রানের মেলা পহেলা বৈশাখ- দেশের মত নাগরদোলা, পুতুল নাচ, ঘুড়ি উৎসব, মোড়গ যুদ্ধ ইত্যাদির আয়োজন এখানে না করতে পারলেও অন্তরের অনুভব এবং উপলব্ধির কোন ঘাটতি নেই।
প্রবাসের অন্যান্য অসংখ্য সংগঠনের মতই মেরীল্যান্ডের অন্যতম সংগঠন “বাকা”র আয়োজনে মহাসমারোহে অনুষ্ঠিত হয়ে গেল বর্ষবরণ অনুষ্ঠান-১৪২৫। প্রথমেই মঙ্গল শোভাযাত্রা করে সবাই মিলনায়তনে প্রবেশ করে। আয়োজনের অন্যতম বিশেষ আকর্ষণ ছিল বাংলার চিরায়ত গ্রামীন খাবারের আয়োজন- যেমন নানা ধরনের পিঠা-পুলির আয়জন (ভাপা পিঠা, পাটি সাপ্টা, চিতই, দুধ-চিতই, ঝাল চিতই ইত্যাদি), ঝালমুড়ি, চটপটি, নানা ধরনের মিষ্টি- রসগোল্লা, গোলাব জামুন, পায়েস, দই ইত্যাদি। এছাড়াও ছিল রসনা তৃপ্ত করার জন্য সুস্বাদু দেশী খাবারের বাহার- আলু ভর্তা, শুটকীর ভর্তা, বেগুন ভর্তাসহ অন্ততঃ ১৫-২০ রকমের ভর্তা, শুটকি মাছ, ভুনা খিচুরী, বিরিয়ানী, তেহারী, ইলিশ ভাজা, পান্তা-ইলিশ, কচু শাক ইত্যাদি।


আয়োজনের অংশ হিসেবে ছিল ছোট ছেলে-মেয়েদের “যেমন খুশী তেমন সাজ” অনুষ্ঠান। বাংলাদেশের জীবন থেকে নেয়া বিভিন্ন চরিত্রের অনুকরণে ওরা সেজেছিল, ভীষণ সুন্দর ছিল ছোট ছেলেমেয়েদের এই সাজ-পোষাক। যেসব ছেলেমেয়েরা বিভিন্ন চরিত্রে সেজে পরিবেশনাটিকে প্রানবন্ত করে তুলেছিল, তারা হলঃ জেসন, টাইলার, জুলিয়া, অবনীল, অবন্তি, অরিয়ানা, এঞ্জেল, মৌমিতা, এ্যভলিন, হৃদীকা এবং আরও অনেকে।
অতঃপর শুরু হয় মূল সাংস্কৃতিক পর্ব। প্রথমেই মৌসুমী রোজারিওর পরিচালনায় সবার প্রানের গানটি গেয়েই শুরু হয় সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান- “এসো হে বৈশাখ এসো এসো”। সাংস্কৃতিক পর্বে ছিল নৃত্য, সঙ্গীত এবং আবৃত্তি। দেশের গান, রবীন্দ্রসঙ্গীত এবং লালনগীতির পরিবেশনায় সন্ধ্যাটি হয়ে উঠেছিল বর্ষবরণের আনন্দে আলোড়িত। অনুষ্ঠানে পরিবেশিত সাংস্কৃতিক পর্বে তবলা সঙ্গত করেনঃ রতন রোজারিও, সুকুমার পিউরিফিকেশন এবং হিউবার্ট গোমেজ।
যারা নৃত্য পরিবেশন করে সবাইকে মুগ্ধ করে দেয়, তারা হলঃ একক নৃত্যে- হৃদী পেরেরা এবং সামান্থা ডি’রোজারিও। দলীয় নৃত্যঃ “বাজে বংশী রাজহংসী” গানটির সাথে নৃত্য পরিবেশন করে সিন্থিয়া এবং তার দল। যারা অংশগ্রহন করে, তারা হলঃ লরেন, রিয়া, মুন, আর্চি, পিওনা, এঞ্জেল, মাত্রি, শ্রেয়া এবং হলি। কোরিওগ্রাফীতে ছিল সিন্থিয়া গোমেজ।যারা একক সঙ্গীতের মূর্ছনায় সবার মন ভরিয়ে দেয়, তারা হলঃ সম্পদ কস্তা, টমাস গোমেজ, সরোজ ডি’কস্তা, ত্রপা পালমা, পলা রোজারিও এবং মুক্তা মেবেল রোজারিও। দ্বৈত সঙ্গীত পরিবেশন করে সবার মন কেড়ে নেয়ঃ সম্পদ কস্তা এবং শার্লিন গোমেজ। দলীয় সঙ্গীত পরিবেশন করেন সন্তোষ ও লিলি রেগো, জেসিকা, এঞ্জেলিকা, এলিসিয়া এবং সিন্থিয়া রেগো।
রবী ঠাকুরের কবিতা- “হঠাৎ দেখা” আবৃত্তি করেন এলভিস গোমেজ। এছাড়া স্বরচিত কবিতার বৃন্ত আবৃত্তি করে যারা সবাইকে মুগ্ধ করেন, তারা হলেনঃ রুবি রোজারিও, মালতি পালমা, পল পরি রোজারিও এবং সুবাস আব্রাহাম কস্তা। বৈশাখী আয়োজনের বিশেষ আকর্ষনীয় পর্ব ছিল – যুগলদের ফ্যাসন শো- “বৈশাখী প্রেম”। প্রথমেই বৈশাখী গানের সাথে দলীয় ফ্যাশন শো প্রদর্শন করেনঃ পান্না গোমেজ, পান্না কার্মেল রোজারিও, হাসি ডি’ কস্তা, লক্ষী গোমেজ এবং লিলি রেগো।
পুরোনো দিনের জনপ্রিয় রোমান্টিক গানের সাথে ( “পড়েনা চোখের পলক”, “ফুলের কানে ভ্রমর এসে চুপি চুপি বলে যায়”, “তুমি চেয়েছিল ওগো জানতে” ইত্যাদি জনপ্রিয় গান) অত্যন্ত আনন্দপূর্ণ এবং চিত্তাকর্ষক ফ্যাশন শো’র পরিবেশনা সবাইকে রোমান্টিকতার আবহে মাতিয়ে দিয়ে অনুষ্ঠানে ভিন্ন মাত্রা যোগ করে দেয়। যুগলদের আনন্দঘন এই ফ্যাশন শো’তে যারা অংশগ্রহন করেন, তারা হলেনঃ রত্না ও পবিত্র ডি’ রোজারিও, বার্থলমিউ সমর ও রীনা কস্তা, খোকন স্ট্যানলী ও রোজমেরী গোমেজ, ডেনিস ও ঝুমকি রোজারিও, ডমিনিক ও লতা রেগো, ভিনসেন্ট ও ট্রিজা কস্তা এবং লাবন্য রড্রিক্স ও এ্যন্ডী।


অবশেষে ছিল তরুনদের নিয়ে সম্প্রতি গড়া তোলা নতুন ব্যান্ড, ‘বিদ্রোহ’-এর পরিবেশনা, যা সবাইকে আনন্দ দান করে। অংশগ্রহনে ছিলেনঃ ড্রামে- ভিনসেন্ট ডি’ কস্তা, গীটারে- রিচার্ড পিয়াল রোজারিও এবং বেইস গীটারে ল্যারী।সমগ্র অনুষ্ঠানটির প্রাঞ্জল উপস্থাপনায় ছিলেন কাকন ও মৌসুমী রোজারিও। শব্দ নিয়ন্ত্রনে ছিলেন জিম রোজারিও এবং সহযোগিতায় এলভিস গোমেজ।
বৈশাখের বর্ণীল আয়োজনে, বাংলার ঐতিহ্যবাহী সংস্কৃতির স্পর্শে এবং স্বদেশী গ্রামবাংলার খাবারের বাহারে রসনা তৃপ্তির মধ্য দিয়ে একটি চমৎকার বর্ষবরণের আয়োজনের সমাপ্তি ঘটে। সবার সাথে প্রানের আনন্দে, মিলনের তৃপ্তিতে, প্রিয় মাতৃভূমি এবং সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যকে ভালবাসার আনন্দে নিজেদের আপ্লুত করে গন্তব্যের দিকে পা বাড়ায় সবাই। নান্দনিক বৈশাখী আয়োজনে একটি সুন্দর সন্ধ্যা- কিন্তু অসংখ্য আনন্দঘন মুহূর্তের বৈশাখী স্মৃতির এ্যলবাম হয়ে রয়ে গেল সবার মনের গহীনে- “পহেলা বৈশাখ-১৪২৫”। ফটো ক্রেডিটঃ খোকন স্ট্যানলী গোমেজ।
- নিউইয়র্কে ন্যাশনাল ইমিগ্র্যান্টস ডে উদ্যাপন; বিভিন্ন ক্ষেত্রে অবদানের স্বীকৃতি, সাত বিশিষ্ট ব্যক্তিকে সম্মাননা প্রদান
- জাতিসংঘে বাংলাদেশের কূটনৈতিক সাফল্য; এলডিসি উত্তরণের প্রস্তুতিকাল বাড়ল আরও ৩ বছর
- নিউ জার্সিতে উৎসবমুখর পরিবেশে দুর্গাপূজা উদযাপিত
- নিউইয়র্কের জেএমসির সম্প্রসারণ প্রকল্প রমজানের আগেই সম্পন্নের প্রত্যাশা, ফান্ডরেইজিংয়ে প্রায় ১০ লাখ ডলার সংগ্রহ, বাকি প্রয়োজন আরও ২০ লাখ
- New York Attorney General James Secures More Than $480,000 and Debt Relief for New York Homeowners
- এই জীবন চিরস্থায়ী নয়, একদিন মরে যাবো
- নিউইয়র্কে বাংলাদেশ সোসাইটির নির্বাচন নিয়ে অনিশ্চয়তা আরও বেড়েছে; ১৭ ডিসেম্বর উভয় পক্ষকে তথ্য-উপাত্ত জমার নির্দেশ
- নিউইয়র্কে নৃত্যশিল্পী ও সাংস্কৃতিক সংগঠক তাহসিন ফেরদৌসের অকালমৃত্যু, বাংলাদেশি কমিউনিটিতে শোকের ছায়া