রীনা রায়হানের `নিসর্গে ভালোবাসার খেলা’ সম্পর্কে
জমিল সৈয়দ, কলকাতা থেকে : গত ২৭শে অক্টোবর ব্রুকলিনের চার্চ ম্যাকডোনাল্ডের ‘নীরব সংকেত’ মিলনায়তনে রীনা রায়হানের প্রথম গল্পগ্রন্থ ‘নিসর্গে ভালোবাসার খেলা’র মোড়ক উন্মোচন করা হয় । খবরটা জেনেছিলাম ইন্টারনেট বাহিত সংবাদ সূত্রে। কিন্তু তখনও জানি না সেই বইটি একদিন ঠিক আমার হাতে চলে আসবে, কলকাতায় !
রীনা রায়হানের ‘নিসর্গে ভালবাসার খেলা’ বইটি হাতে নিয়ে ভাবছিলাম, কখন যে আমাদের চিরপরিচিত এই রীনা আমার চোখের আড়ালে এরকম জবরদস্ত লেখক হয়ে উঠলেন, টেরও পেতে দেননি ! লম্বা চল্লিশ বছরেরও বেশী সময় ধরে চিনি রীনাকে, মধ্যিখানে কিছুদিন ভুলেও গেছিলাম, কিন্তু আমার স্মৃতি ফিরে আসার পরে তাঁকে আবিষ্কার করলাম লেখকের চেহারায়। একজন পুরোদস্তুর গল্পকার হিসেবে তাঁর এই আত্মপ্রকাশ আমাকে বিস্ময়াহত করেছে, উল্লসিত করেছে ততোধিক। কতো দীর্ঘ দীর্ঘ সময় ধরে রীনা অর্জন করেছেন জীবনের অভিজ্ঞতা; কুড়িয়ে নিয়েছেন দেশ ও বিদেশের বেঁচে থাকার স্বর্ণখণ্ডগুলি, আর নির্মিত হয়েছে তাঁর গল্পসম্ভার।
দেশ ও বিদেশ, এই শব্দবন্ধ এখানে অপ্রাসঙ্গিক, কারণ রীনার বড় হয়ে ওঠা বাংলাদেশে, বাস করেন আমেরিকায়। তাঁর দেশ কোথায়, বিদেশই বা কোথায় ! মনে হয় নাকি এই বিস্তৃত ভূমণ্ডল কেবলই ছোট হয়ে আসছে রীনার মতো লেখকদের পায়ের তলায় ! দেশ ও বিদেশের সীমারেখা ঘুচিয়ে দিয়ে যা শেষপর্যন্ত জেগে থাকে তার নাম মানুষ ।
এই বইটির বড় সম্পদ সেই লেখাগুলি, যেখানে সজল স্মৃতিকথার আদলে এসে যায় নিজের বাবা-মা, ভাই-বোনেদের কথা। এগুলো কি গল্প, না স্মৃতি, নাকি যে কোনও সমগ্র মনুষ্যজীবনের কথকতা । বইটি উৎসর্গ করা হয়েছে মা-কে। উৎসর্গপত্রটি জুড়ে মায়ের অ-বিস্মরণীয় স্মৃতিতর্পণ, এটি তো যে কোনও মায়ের প্রতিই তাঁর যে কোনও সন্তানের প্রণত হাহাকার। মনে হয়েছে, এই লেখাটি কি আমিই লিখেছি, এই মা কি আমারই মা, এ তো আমারই আবহমান বাংলার মা ! ১২-ই জুন “একটি মা-হীন পৃথিবীতে” ছুঁড়ে দিয়ে মা চলে যান পৃথিবী ছেড়ে – এখানে তারিখটা কেবল বদলে নিলেই আমার-আপনার-সবার ক্ষেত্রেই সমান প্রযোজ্য হয়ে উঠবে – মাথার উপরে যেখানে মায়ের সঘন বটবৃক্ষের ছায়া অপসারিত হয়ে গিয়ে একরাশ শূন্যতাকে প্রকট করছে। বিশুদ্ধ গদ্যে লেখা একটি অপরূপ ও বেদনাময় এপিটাফে রূপান্তরিত উৎসর্গপত্র অনেকদিন চোখে পড়েনি আমার।
একদিকে বাংলাদেশের অভ্যুত্থান, স্বাধীনতার সংগ্রাম আর সেই সঙ্গে ঘরে ঘরে নিখোঁজ হয়ে যাওয়া কিংবা মৃতদেহ হয়ে ফিরে আসা মানুষেরা – অনেকখানি জুড়ে আছে এই গ্রন্থের পাতায়। ‘পতাকার নিচে মাসুদের লাশ’ – বাংলাদেশের সবুজ পতাকার নিচে শুয়ে থাকা মাসুদ এরকমই একটি সূর্যের নাম।
বইটিতে কোনও প্রত্যক্ষ মুক্তিসংগ্রামের কাহিনী নেই, কিন্তু মুক্তিসংগ্রামের প্রেক্ষিতে ক্ষতবিক্ষত জনজীবনের মর্মস্পর্শী গাথা ভরে উঠেছে প্রতিটি পরতে। বাংলাদেশে ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের ক্রান্তিকালের মধ্য দিয়ে যে বালক-বালিকারা বড় হয়ে উঠেছেন, তাঁরা একধাক্কায় প্রাপ্তমনস্ক হয়ে উঠেছিলেন, জেনেছিলেন স্বাধীনতার মূল্য কীভাবে দিতে হয় জীবনের বিনিময়ে। রীনা রায়হানের পিতা ছিলেন স্বাধীনতার মুক্তিযোদ্ধা, ফিরে আসেন নি আর তাঁর পরিবারে। তাঁর জগুভাই, সেই স্বাধীনতা সংগ্রামের দিনগুলির প্রোজ্জ্বল উদাহরণ হয়ে দাঁড়িয়ে আছেন লেখিকার সামনে। আমাদের বাংলা সাহিত্য সমৃদ্ধ হয়েছে এইসব স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিবৃত্তে। রীনার লেখাতেও ছড়িয়ে আছে সেইসব দিনগুলির রোদ ও ছায়া, যখন পিতা আর ঘরে ফিরে আসেন না। যখন জগুভাইয়ের কাছে গল্প শুনতে চায় ছোট ভাইবোনেরা, সেই অবধারিত গল্প তো স্বাধীনতা সংগ্রামের !
‘কাঙ্ক্ষিত স্বাধীনতা এবং পিতার অন্তর্ধান’ বা ‘অশোধিত ঋণ’ এই দুটি গল্প আমি বিশেষভাবে উল্লেখ করতে চাই, যেখানে সেই রক্তে রাঙা দিনগুলির স্মৃতি খুব টাটকা হয়ে লেগে আছে আমাদের সত্তায়। আর কোনও দিনও ফিরবেন না পরদেশি হায়েনার হাতে আক্রান্ত পিতা । স্বাধীনতার আনন্দকে আর চোখ মেলে দেখবে না মাসুদের মৃতদেহ। কত প্রাণের বিনিময়ে অর্জিত একটি স্বাধীনতার গল্প এই গল্পগ্রন্থটিকে কালের প্রস্তর স্বাক্ষর হিসেবেই প্রতিভাত হবে।
‘একুশের প্রত্যয়’ গল্পে ছয়শো মানুষের দল এগিয়ে চলে শহীদ মিনারের দিকে, খালি পায়ে হাঁটতে হাঁটতে, তাদের হাতের ব্যানারে ঝলসে উঠছে সেই অমৃতবাণী, ‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি।’ সেখানেই, সেই পরমতম দিনে, ভালোবাসার পথে প্রস্তরখণ্ড সরিয়ে সজলধারা জেগে উঠল অনিম ও বন্যার জীবনে। ওই পথ যেন বেঁধে দিল বন্ধনহীন গ্রন্থি। জীবনযাপন ও বেঁচে থাকার সঙ্গে আমর্ম জড়িয়ে গেছে একুশে ফেব্রুয়ারি, একাত্তরের মুক্তি সংগ্রাম। নতুন একভালোবাসার জন্ম হয় সেই শহীদ মিনার অভিমুখী মিছিলের মধ্য থেকে।
আমার মনে হয়েছে, যেখানে লেখকের ব্যক্তিগত স্মৃতির অনুষঙ্গ ফিরেফিরে আসছে, সেখানে ভূমির অন্তর্লীন টান গল্পকে ভারি মেদুর ও বেদনাবহ করে তুলেছে। ‘যুদ্ধ গল্প বাবা মা’ একটি স্বল্পায়তন ছোটগল্প। বাবা চিরতরে হারিয়ে গেছেন, মৃতদেহও খুঁজে পাওয়া যায়নি। ফলে, ছেলেমেয়েদেরকে প্রতিষ্ঠা করার লক্ষে অবিচল একজন মা, তাঁর একক জীবনের সংগ্রামও তো মুক্তিযুদ্ধের সঙ্গেই সম্পৃক্ত হয়ে আছে। আমি অনুভব করি, বাংলাদেশে এরকম অনেক মা-ই আছেন ও ছিলেন, যাঁদের বেঁচে থাকার লড়াইও কোনও অংশে কম নয়। দেশের সুসন্তানদের নির্মিতির জন্য তাঁদের অবদান কি কোনও ইতিহাসে লেখা থাকবে ? জানি না। কিন্তু রীনা রায়হানের ছোটগল্পে একটি ইঙ্গিত পাওয়া গেল, যাতে ভবিষ্যতের গবেষকেরা গোপন সূত্র অবশ্যই পেয়ে যাবেন।
আমি কখনও বাংলাদেশে যাইনি, তাই ঢাকা শহরের একটি গন্ধ পেতে উৎসুক ছিলাম, যে শহরে লেখকের বেড়ে ওঠার দিনরাত্রিগুলি বাহিত হয়েছে। আর আশ্চর্যভাবে আবিষ্কার করলাম –“ভেঁপু বাজান নিরাপদ দূরত্ব বজায় রাখুন সমগ্র বাংলাদেশ ৫ টন” গল্পটি। আমি চমকিত হয়েছি, তাঁর স্মৃতির অবগহনে এমন একটি প্রবহমান ঢাকা শহর আজও তাঁকে বিদ্ধ করে রেখেছে। পুরোনো ঢাকার আগা ছাদেক রোড, তার একটি ভাড়া বাড়ি, সেখানে বাস করত তুলি ও তার ভাই-বোনেরা, উল্টোদিকে মসজিদের গম্বুজের নিচে ওহাবচাচার দোকান ও তার ছেলে মুহিম-মুনিম ! আর সেজোভাইয়ের জানলার পাশ দিয়ে চলে যাচ্ছে একটি মালভর্তি ট্রাক, যার গায়ে লেখা – ভেঁপু বাজান – নিরাপদ দূরত্ব বজায় রাখুন – সমগ্র বাংলাদেশ – ৫ টন । পুরোনো ঢাকার রাস্তা-মানুষজন- আর কৈশোরের গভীর গোপন মন-কেমন-করা নিয়ে একটি আলেখ্য গড়ে উঠেছে, এত সাবলীলভাবে, স্বচ্ছন্দ গতিতে, “মুহিম কি ভেলে গেছে তুলিকে ?” এই প্রশ্ন আমারও বুকের ভেতরে “চিনচিন করে উঠল” !
লেখক যেহেতু নিউইয়র্কের বাসিন্দা, তাই অবধারিত ভাবে এসেছে ১১ সেপ্টেম্বরের সেই বিধ্বস্ত টুইন টাওয়ারে স্বজন হারানোর বেদনার কাহিনী। ‘শরাহত এলির চলে যাওয়া’ গল্পে স্বামী পরিত্যক্তা এলি তার পুত্র জনিকে বড় করে তুলেছিল, যাকে ঘিরে আবর্তিত হচ্ছিল তার জীবন ও স্বপ্ন । ওয়ার্লড ট্রেড সেন্টারের ৮৬ তলার অফিসে গিয়ে জনি নিরুদ্দেশ হয়ে গেল চিরকালের জন্য ! কী করবে এবার এলি ? যার আর স্বপ্ন নেই, ইচ্ছে নেই, শুধু আছে এক নিদারুণ শূন্যতা। “ওর আশায় আশায় লালিত ঝাঁকে ঝাঁকে ইচ্ছের পাখিগুলিকে কে বা কারা মুহূর্তের ব্রাশ ফায়ারে মাটিতে লুটিয়ে দিলো ? … এলি উঠে দাঁড়ালো সোজা হয়ে। মন স্থির করল এক্ষুণি এই শহর ছেড়ে চলে যাবে। কোথায় যাবে জানে না। কত দূর তাও না।”
এটি একটি নাগরিক দিকশূন্যতার গল্প, যখন সন্ত্রাস মানুষকে এতটাই দগ্ধ করে, অসহায় করে। অনির্দেশ্য জীবনের পথে হাঁটতে থাকে স্বপ্ন্যচ্যুত মানুষ। এই গল্প শুধু নিউইয়র্কের গল্প নয়। আবহমান পৃথিবীর গল্প। সন্ত্রাস ও উৎপীড়ন মানুষকে কীভাবে বাস্তুচ্যুত করে, তা সারা পৃথিবীতেই দেখছি, মায়ানমারে বা ইজরায়েলে।
এই বইটিতে ভালোবাসার আখ্যানও আছে, কিন্তু তা অনেকক্ষেত্রেই বিয়োগান্তক উপসংহারের দিকে লেখকের আকর্ষণকে প্রকট করেছে। নামগল্পটি ‘নিসর্গে ভালোবাসার খেলা’ বা ‘জরি অরণ্যের ভালোবাসা’, কিংবা ‘সোনালী মোড়কে পাঁচ বছর’ “ভালবাসার ঐশ্বরিয়া রাই’ – এই চারটি গল্পই যেন একসূত্রে বাঁধা। সেই সূত্রটির নাম, ভালোবাসার মধ্য থেকে উঠে আসা অনির্দেশ্য যন্ত্রণা। পাত্র-পাত্রী যেন ভাগ্যের হাতে ক্রীড়নক, তাদের ভালোবাসার মানুষ কেবলই দূরে সরে যায়। ভালোবাসা শুধু রেখে যায় একরাশ কান্না ও বিচ্ছেদের সুনিপুণ মালা।
এই বইয়ের একটি গল্পের কথা না বললে চলবে না, একেবারে ভিন্ন স্বাদের গল্প, অন্যরকম গল্প। গল্পটির নাম , ‘পিনু বিড়ালের গল্প’। একটি বইয়ে নানাধরনের গল্প থাকতে পারে, তাতে রচনার বৈচিত্র আমাদের পঠনের অভ্যাসকে সুস্বাদু করে। গল্পটি একটি সার্থক ছোটগল্পের উদাহরণ, যার উপসংহারের চমক গল্পটিকে স্বভূমিতে প্রোথিত করেছে। একটি ছোট্ট বিড়ালছানা পিনু আর একটি ছোট্ট মেয়ে সিমি, এই দু’জনকে নিয়েই সাধারণ একটি গল্প একেবারে অসাধারণ হয়ে উঠেছে প্রাণীর প্রতি ভালোবাসার অনুভূতিময় দ্যোতনায়। গাছ-পাখি-পশুদের প্রতি ভালোবাসা আদিকাল থেকেই মানুষের মধ্যে বংশপরম্পরা সঞ্চারিত, কিন্তু আধুনিকতা সেই ভালোবাসাকে অনেকাংশে ব্যাহত করে। কিন্তু কোমল মনের সিমি যে গভীরতায় ভালোবেসেছিল বিড়ালছানাটিকে, তার প্রতি লেখকের পক্ষপাত আছে বলেই একটি সাধারণ কাহিনী এমন অসাধারণ গল্পে রূপান্তরিত হতে পেরেছে।
গ্রন্থটিতে ২১টি গল্প আছে। এই আলোচনা পড়ার আগে মন দিয়ে পড়ে নিলেই বইটির প্রতি সুবিচার করা হয়। বইটির প্রকাশককে ধন্যবাদ দিতে চাই এমন সুমুদ্রিত ও সুরুচিসম্পন্ন একটি গ্রন্থের জন্য। রোকেয়া বেগম বীনার কাচচিত্র অবলম্বনে অনন্য বাসারের প্রচ্ছদ বইয়ের মর্যাদার প্রতি সযত্ন দৃষ্টি রেখেছে। আমি মনে করি, রীনা রায়হান এবার নিয়মিত লিখতে থাকবেন, তাঁর আরও গ্রন্থ অদূর ভবিষ্যতে আমাদের কাছে আসবে। প্রথম বইয়ের আনন্দ স্থিত হলে, তিনি আরও মনোযোগ দিয়ে মানুষের বিস্তৃত জীবনের দিকে লক্ষ্য দিতে থাকবেন এবং তাঁর সেইসব রচনার প্রতি আমাদের ঔৎসুক্য জায়মান রেখে দিচ্ছি।
- নিউ জার্সিতে উৎসবমুখর পরিবেশে দুর্গাপূজা উদযাপিত
- নিউইয়র্কের জেএমসির সম্প্রসারণ প্রকল্প রমজানের আগেই সম্পন্নের প্রত্যাশা, ফান্ডরেইজিংয়ে প্রায় ১০ লাখ ডলার সংগ্রহ, বাকি প্রয়োজন আরও ২০ লাখ
- New York Attorney General James Secures More Than $480,000 and Debt Relief for New York Homeowners
- এই জীবন চিরস্থায়ী নয়, একদিন মরে যাবো
- নিউইয়র্কে বাংলাদেশ সোসাইটির নির্বাচন নিয়ে অনিশ্চয়তা আরও বেড়েছে; ১৭ ডিসেম্বর উভয় পক্ষকে তথ্য-উপাত্ত জমার নির্দেশ
- নিউইয়র্কে নৃত্যশিল্পী ও সাংস্কৃতিক সংগঠক তাহসিন ফেরদৌসের অকালমৃত্যু, বাংলাদেশি কমিউনিটিতে শোকের ছায়া
- নিউইয়র্কে আবেয়া’র দ্বিবার্ষিক সম্মেলন ও ফ্যামিলি নাইট: প্রযুক্তি সেমিনার, জব ফেয়ার, বিজ্ঞান মেলা ও সাংস্কৃতিক উৎসব
- Global Anticipation Builds as Dr. Mostofa Sarwar’s Sunflower Wounds Debuts with Successful Houston Open House and Worldwide Pre-Order Milestone