নিউইয়র্কে সিনেমা হলে ঈদ আনন্দ এবং যৌথ প্রযোজনা বিতর্ক…
হাসানুজ্জামান সাকী : ছোটবেলায় ঈদ আনন্দের অন্যতম অনুসঙ্গ ছিল হলে গিয়ে সিনেমা দেখা। আমরা যখন কৈশোর পেরিয়ে তারুণ্যে পৌঁছালাম তখনই বাংলা সিনেমার অন্ধকার যুগের শুরু। তাই সেই সময় থেকে ঈদে সিনেমা দেখার চল প্রায় উঠেই গেল। আশার কথা, বাংলা সিনেমা আবারো তার হারানো ঐতিহ্য ফিরে পেতে মরিয়া।
এবার ঈদের দিনে নিউইয়র্কে সিনেমা দেখলাম হলে গিয়ে সালমান খানের ‘টিউবলাইট’। বহুদিন পর ছোটবেলার সেই আনন্দ ফিরে পেলাম মনে হলো। যদিও বাংলা ছবি হলে সেই আনন্দ আরো বাড়তো কিন্তু সেই সুযোগ তো নিউইয়র্কে নেই। এখানকার সিনেমা হলগুলোতে বাংলাদেশের ছবি দূরে থাক কলকাতারও কোনো ছবি চলে না।
‘টিউবলাইট’ ছবিটি ভারত-চীন সীমান্তের উত্তেজনা নিয়ে। ছবিটি দেখতে দেখতে হলে বসেই বাংলা ছবি নিয়ে ভাবছিলাম। দীর্ঘ ঘনঘোর অমানিশা পেরিয়ে বাংলা ছবি যখন আবারো দর্শকদের হলে টানতে শুরু করেছে তখনই নতুন এক বিতর্কে সিনেমা অঙ্গন কলুষিত হয়ে উঠছে। এই বিতর্ক চলচ্চিত্র জগতের বাইরের কেউ ওঠায়নি। বিতর্ক ওঠেনি দর্শক শ্রেণী থেকে, বোদ্ধা শ্রেণী থেকে। বিতর্ক তুলেছেন খোদ চলচ্চিত্র শিল্পীরাই।
কী সেই বিতর্ক? কয়েক বছর ধরে ঢাকা ও কলকাতার যৌথ প্রযোজনায় বেশ কিছু ছবি নির্মিত হয়েছে। যৌথ প্রযোজনার এ প্রয়াস নতুন নয়। যৌথ প্রযোজনার সাম্প্রতিক ছবিগুলো দর্শকদের কাছে প্রশংসা পেয়েছে। এদেশের শিল্পীরা ওপারে গিয়ে অভিনয় করছেন। ওপার থেকে শিল্পীরা আসছেন এপারে কাজ করতে। কিন্তু এখন বাংলাদেশের চলচ্চিত্র শিল্পীদের বড় একটি অংশ চাইছেন না যৌথ প্রযোজনায় কোন ছবি হোক। তারা অভিযোগ তুলেছেন, এতে করে দেশীয় চলচ্চিত্রের সর্বনাশ হচ্ছে। আর এই নিয়েই বিতর্ক।
যারা যৌথ প্রযোজনার ছবি নিয়ে বিতর্ক শুরু করেছেন, মাঠে নেমেছেন, তাদের একটি পক্ষের বক্তব্যের বিরোধিতা করে বলতে চাইÑএতদিন তো আপনারা বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের ‘এক নম্বর’কে ‘নপুংসক’ বানিয়ে রেখেছিলেন, ওপারের ছোঁয়ায় তিনি যখন একটু একটু করে ‘পূরুষ’ হতে শুরু করলেন, নায়ক হয়ে উঠতে লাগলেন, তখনই আপনারা তার বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে গেলেন! আপনারা তো ‘নপুংসক’কে পূরুষ বানানো দূরে থাক, একটা সুদর্শন পূরুষকে ‘নপুংসক’ বানিয়ে ফেলছিলেন! নিজেদের গল্প, ডায়ালগ, শিল্পীকে দিয়ে অভিনয় করিয়ে নেয়ার ক্ষমতা সম্পর্কে ধারণা আছে কোনো? নিজেদের মেকিং কেমন তা দেখার জন্য হলিউড-বলিউডের ছবি দেখতে হবে না। প্রতিবেশিদের ছবিগুলো দেখুন। যদিও ওপারের ছবিতে পনের বছর আগেও এমনটা ছিল না। তারা নিজেদের উত্তরণ ঘটিয়েছে। আমরা কেবলই পেছনে পড়ে রইলাম।
একটা ছবির কথা বলিÑ ‘পূর্ণদৈর্ঘ্য প্রেম কাহিনী’। এই নামে দুটো ছবি তৈরি হয়েছে। দুটো ছবিই হিট। কিন্তু ছবি দুটো কেমন? এ ছবি দেখে রাগে-ক্ষোভে-দু:খে মাথার চুল ছিঁড়তে ইচ্ছা করে। আর যারা ছবিটি নির্মাণে জড়িত তাদের অন্য কিছুও ছিঁড়ে ফেলতে চাইবেন আপনি! বিশেষ করে ‘পূর্ণদৈর্ঘ্য প্রেম কাহিনী-২’ এর কথা না বললেই নয়। এতে অভিনয় করেছেন শাকিব খান ও জয়া আহসান। কি যে নিচু মানের অভিনয় তাদের! শাকিবের কথা বাদ দিলাম, কিন্তু এই জয়া আহসান! দূর্দান্ত অভিনয়ের জন্য জয়া আহসান এখন ওপারের ছবির নিয়মিত শিল্পী। বছরের বেশির ভাগ সময় সেখানেই থাকেন।
‘পূর্ণদৈর্ঘ্য প্রেম কাহিনী-২’ ছবির গল্পটা গাঁজাখুরিতে ভরপুর! ছবিতে বাংলাদেশের জাতীয় ক্রিকেট দলের অধিনায়ক হয়েছেন শাকিব খান আর সহ অধিনায়ক ইমন। এই দুজন সারাক্ষণ এক নারীকে নিয়ে মেতে থাকেন। একজন আরেকজনকে কিভাবে ল্যাং মেরে ফেলে দেবেন সেই ভাবনায় মশগুল থাকেন। লুচ্চামি করেন, মদ খেয়ে মাতলামি করেন। আর তাদের ক্রিকেট খেলার সেকি ধরন! ব্যাটিং আর বোলিং দেখলে হাসিও আসে না, কান্নাও পায় না। বিরক্তিতে সারা শরীর জ্বলতে থাকে। যেমন অদ্ভূত তার কাহিনী-সংলাপ, তেমনি অদ্ভূত শিল্পীদের অভিনয় এবং ছবিটির নির্মাণৈশলী! ছবিটির গল্প লিখেছেন রুম্মান রশীদ নামে একজন বিনোদন সাংবাদিক। ছবির পরিচালক সাফি উদ্দিন সাফি। ছবির পরিচালক সম্পর্কে খুব একটা ধারণা নেই। দু’একবার দেখা হয়েছে। হাতিরঝিলে এই ছবির একটি গান যখন দৃশ্যায়ন করবেন, তখন আমার এক বন্ধুকে দিয়ে সেই ব্যবস্থা করিয়ে দিয়েছিলাম। কিন্তু আমি কথা বলতে চাই রুম্মান রশীদ খানকে নিয়ে। একই পেশার কারণে তাকে নিয়ে বলার অধিকার বেশি।
রুম্মান দেখতে সুদর্শন ও স্মার্ট। একটি রুচিশীল কাগজে কাজ করেছেন দীর্ঘদিন। কিন্তু সেই তিনিই যে এমন উদ্ভট একটা কাহিনী লিখবেন ভাবতে পারিনি। ‘প্রথমে দর্শনদারী তারপর গুণবিচারী’ এই প্রবাদ বাক্যটিই উল্টে গেছে। সুদর্শন, স্মার্ট এক বিনোদন সাংবাদিকের লেখনিতে কুৎসিত এক কর্ম সম্পাদিত হয়েছে। ‘পূর্ণদৈর্ঘ্য প্রেম কাহিনী-২’ ছবিটি দেখলে এর পেছনের কলাকুশলীদের আর নেপথ্যের সবার সুন্দর সুন্দর মুখগুলোতে দলা পাকানো বিরক্তি ছুঁড়ে দিতে মন চায়। এমন একটি ছবি হিট হয় কিভাবে তা ভেবে পাই না। আমাদের দর্শকদের রুচিও কি তলানিতে ঠেকলো তবে?
নিউইয়র্কের প্রেক্ষাগ্রহে ‘টিউবলাইট’ ছবিটা দেখছিলাম আর ভাবছিলাম, বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তেও তো অনেক তিক্ততা আছে। সমস্যা আছে দেশের অভ্যন্তরে পার্বত্য চট্টগ্রাম ইস্যুতে। কিন্তু এসব বিষয় নিয়ে দেশে ছবি হয় না কেন? দুটি মানব-মানবীর নিছক প্রেম ভালবাসার গল্প আর কতদিন? বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের টানাপোড়েন নিয়ে একটা ছবি হয়েছে সম্প্রতিÑ‘শঙ্খচিল’। সেটিও নির্মাণ করলেন কি না একজন ভারতীয় নির্মাতা! আমরা কেন নতুন কিছু ভাবতে পারি না, নতুন কিছু তৈরি করতে পারি না?
এক সময় আমাদের নাটকের সুনাম ছিল ওপারে। এখন ওপারের নাটক ছাড়া এপারের দর্শকেরা আর কিছুই দেখেন না। কেন? এটা একদিনে হয়নি, এমনি এমনি হয়নি। ‘সাংস্কৃতিক আগ্রাসন’ বলে গলা ফাটিয়ে কোনো লাভ নেই। নিজেদের দূর্বলতাগুলো ঢেকে রাখলে কোনোদিনই উন্নতি হবে না আমাদের।
যৌথ প্রযোজনার বিতর্ক প্রসঙ্গে ফিরে আসি। ফিল্ম পলিটিক্স সব দেশেই আছে। তবে শাকিব যে ভাষায় সিনিয়রদের সম্পর্কে কথা বলেছেন আর সিনিয়র নায়করা যেভাবে একজন জুনিয়রের বিরুদ্ধে কথা বললেন তা পলিটিক্স নয়। ক্ষোভের বহি:প্রকাশ নয়। আমার কাছে মনে হয়েছে, এটি নোংরামি। নায়ক আলমগীর কথা বলছেন আর পিছনে দাঁড়িয়ে জুনিয়র নায়ক শাকিব খানের বিরুদ্ধে হাত উঁচিয়ে শ্লোগান দিচ্ছেন সিনিয়র নায়ক রিয়াজ। একবার ভাবুন দৃশ্যটা। নিজেকে কতটা নীচে নামিয়ে নিয়ে আসলে এমন ভুমিকা নিতে পারেন রিয়াজ!
প্রিয়াংকা, দীপিকারা হলিউডে অভিনয় করছেন। বেশির ভাগ সময় থাকছেন নিউইয়র্কে, লস এঞ্জেলেসে। আমাদের দেশের নায়ক-নায়িকারা যাচ্ছেন টালিউডে-বলিউডে। আমাদেরও তো গর্ব করা উচিত।
খাবার যদি নিম্ন মানের হয় তাহলে দেশীয় হলেও কেউ তা খাবেন না। এমন কোনো দেশপ্রেমিক নেই যে দেশীয় বলে নি¤œ মানের কোনো জিনিস গ্রহণ করবে। এই গ্লোবালাইজেশনের যুগে তা আরো সম্ভব নয়।
সারা বিশ্বের সাথে তাল মিলিয়ে আমাদের এগিয়ে যেতে হবে। নিজেদের সমৃদ্ধ করতে হবে। নিজেদের মেধাবী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে হবে। একজন দেশপ্রমিকের এই হোক ব্রত।
লেখক: সাংবাদিক, নিউইয়র্ক।
- SUSPENDED ATTORNEY CHARGED WITH GRAND LARCENY FOR STEALING MORE THAN $1 MILLION FROM BORROWERS, DIME COMMUNITY BANK
- Six Bangladeshi Peacekeepers Posthumously Awarded UN Dag Hammarskjöld Medal
- নিউইয়র্কে জাতিসংঘের ড্যাগ হ্যামারশোল্ড পদকে ভূষিত ছয় বাংলাদেশি শান্তিরক্ষী
- যুক্তরাষ্ট্রের জর্জিয়া স্টেট সিনেট নির্বাচনে বাংলাদেশি-আমেরিকান শেখ রহমানের টানা পাঁচবার জয়
- A Star Dimmed: Mourning the Loss of Tofail Ahmed, Architect of Our History
- নিউইয়র্ক ষ্টেট অ্যাসেম্বলী ডিষ্ট্রিক্ট-৩০’র প্রাইমারী নির্বাচনে শামসুল হকের সমর্থনে জ্যামাইকায় ফান্ড রেইজিং
- Bangladesh Secures Historic Victory in UNGA Presidency
- New York Attorney General James Secures Refunds for All New Yorkers Cheated by Nissan Dealerships’ Lease Overcharge Schemes