Thursday, 19 March 2026 |
শিরোনাম
যুক্তরাষ্ট্রে ঈদুল ফিতর ২০ মার্চ শুক্রবার নারীর ক্ষমতায়ন ও ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে বাংলাদেশ অঙ্গীকারবদ্ধ : ড. খলিলুর রহমান নিইউয়র্কে টাইমস স্কয়ারের মঙ্গল শোভাযাত্রায় যোগ দিচ্ছেন ম্যানহাটান বরো প্রেসিডেন্ট ব্র্যাড হোয়েলম্যান নিউইয়র্কে স্ট্রিট ভেন্ডরদের জন্য নতুন আইন কার্যকর; জেল শাস্তি বাতিল, আরোপ করা হবে জরিমানা New York Attorney General James Leads Bipartisan Coalition Suing Predatory Lender OneMain for Scheme to Trap Consumers in Debt নিউইয়র্ক স্টেট সিনেট হাউসে ‘বাংলাদেশ ডে’ উদযাপন ২৩ মার্চ : আহ্বায়ক কমিটি গঠন বাংলাদেশে আওয়ামীলীগসহ সকল রাজনৈতিক দলের স্বাভাবিক রাজনীতির পরিবেশ সৃষ্টি করার দাবি নিউজার্সি স্টেট আওয়ামী লীগের নিউইয়র্কে ‘অল কাউন্টি হেলথকেয়ার গ্রুপ’র বার্ষিক ইন্টারফেইথ ইফতার পার্টি HUSBAND CHARGED WITH MURDER AND DISMEMBERMENT OF WIFE WHOSE REMAINS WERE FOUND IN SEPARATE LOCATIONS ALONG BROOKVILLE BLVD AND CROSS BAY BLVD নিউইয়র্কে জ্যাকসন হাইটসের গ্রাফিক্স ওয়ার্ল্ডে মাসব্যাপী ইফতার আয়োজন
সব ক্যাটাগরি

‘পরাজিত নই নারী, পরাজিত হয় না কবিরা’-কবি আল মাহমুদ কেমন আছেন ?

অনলাইন ডেস্ক পঠিত: 188 বার

প্রকাশিত: February 8, 2019 | 2:48 PM

মরিয়ম চম্পা : গায়ে খদ্দরের পোশাক। হাতে সুটকেস। অথবা টিনের বাক্স। ভেতরে পুরো বাংলাদেশ। নারী, নদী, পাখি, গাছ। ছয় দশকের বেশি সময় ধরে আল মাহমুদ তার এই ভাঙা সুটকেস থেকে একে একে বের করেছেন জাদুর কাঠি। আমরা ছুটে চলেছি তার পেছনে। কখনো কখনো সমালোচনায় মুখর হয়েছি।

কিন্তু তাকে উপেক্ষা করা যায়নি।

বিচিত্র এক জীবন তার। ব্রাহ্মণবাড়িয়ার মোড়াইলের মোল্লাবাড়িতে জন্ম নেয়া শিশুটি ধীরে ধীরে বেড়ে ওঠতে থাকে। তিতাসপাড়। রাখালের পেছনে ছুটে চলা। তিতফুল, সরষে ফুল, তেলিয়াপাড়ার চা বাগানের কচি পাতার সান্নিধ্য। পুলিশের ভয়ে কলকাতাযাত্রা। এভাবেই জন্মাতে থাকেন সমকালীন বাংলা ভাষার প্রধানতম কবি। খ্যাতির চূড়ায় ওঠেন সোনালী কাবিন লিখে। মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেন সরাসরি। স্বাধীন দেশে সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠার লড়াইয়ে যেতে হয় কারাগারে। পরে অবশ্য মত আর পথে আসে পরিবর্তন।

আল মাহমুদ লিখেছেন, ‘পরাজিত নই নারী, পরাজিত হয় না কবিরা।’ কেমন আছেন অপরাজেয় এই কবি? ৩০শে জানুয়ারি, ২০১৯। বুধবার। অলস দুপুর। মগবাজারের গোমতি আয়েশা ভিলা। এখানেই একটি ফ্ল্যাটে বসবাস করেন কবি আল মাহমুদ। কলিংবেল টিপতেই কবিপুত্র শরীফ আল মাহমুদ দরজা খুলে দেন। ড্রইংরুমে ঢুকতে চোখ আটকে যায় দেয়ালে কবিকে দেয়া একটি বাঁধানো মানপত্রের ফ্রেমে। ড্রইংরুমের খাটের লাগোয়া একটি সেলফে সোনালী কাবিনের কবির সারাজীবনের যতো অর্জন সবই যেন থরে থরে সাজানো। অসংখ্য জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পুরস্কার। 

বাংলা একাডেমি পুরস্কার, একুশে পদক, ফিলিপস সাহিত্য পুরস্কার, শিশু একাডেমি (অগ্রণী ব্যাংক) পুরস্কার ও কলকাতার ভানুসিংহ সম্মাননা। রয়েছে কবি শামসুর রাহমান ও কবির দাম্পত্য সঙ্গী সৈয়দা নাদিরা বেগমের সঙ্গে ছবি। 
অন্দরমহল থেকে কবিপুত্রের স্ত্রী শামীমা আক্তার বকুলের গলার আওয়াজ ভেসে আসলো….‘আব্বা…আব্বা…..ও আব্বা ওঠেন। আপনার সাথে একজন দেখা করতে এসেছে।’ আলো আঁধারের মাঝে কবির ঘুম ঘরে প্রবেশ করতেই দেখা গেল হালকা আকাশি নীল রংয়ের  ফতুয়া ও বিস্কিট রংয়ের লুঙ্গি পড়ে খাটের পাশে বসে আছেন। ছোট বাচ্চাদের মতো পিঠে বালিশের ঠ্যাকা দেয়া। চোখে শোভা পাচ্ছে কালো খয়েরি রংয়ের মোটা ফ্রেমের চশমা।

কবি এখন চোখে তেমন কিছুই দেখতে পান না। এমনকি কানেও খুব একটা শুনতে পান না। মাঝে মাঝে শরীরের রক্তচাপ ওঠানামা করে। নিজ হাতে খাবার খাওয়া, গোসল করা, চলাফেরা কোনো কিছুই করতে পারেন না। স্মৃতিশক্তিও কিছুটা লোপ পেয়েছে। কিছু জানতে চাওয়া হলে অনেক সময় নিয়ে অল্প দু-চারটি কথা বলেন। জানতে চাওয়া হলো ভালো আছেন? বাম চোখ খানিকটা খুলে বললেন, আছি কোনোরকম। শরীরের অবস্থা কেমন? মোটামুটি ভালোই। সারাদিন কিভাবে কাটে? এই পড়াশোনা করে। চোখে দেখতে পান? হুম…এখনো দেখতে পাই। পাশ থেকে ছেলের বউ শুধরে দিয়ে বলেন, আসলে আব্বাতো চোখে দেখতে পান না, তাই হাতে কোনো বই দিলে শুধু পাতা উল্টান আর নেড়ে চেড়ে দেখেন। সকালে নাস্তা করেছেন? এই সামান্য কিছু। আপনিতো একসময় সাংবাদিকতা করেছেন? আমার দেশের জনগণের মাধ্যমেই…..। কী বলতে চাইলেন বুঝা গেল না। আপনার স্ত্রী সৈয়দা নাদিরা বেগমের কথা মনে পরে? পড়ে…..। কবিতার প্রতি আপনার ভালোবাসা এখনো আছে? হ্যাঁ। 

কবির জ্যেষ্ঠপুত্র শরীফ আল মাহমুদ বলেন, পাঁচ ভাই, তিন বোনের মধ্যে আমি বড়। প্রত্যেকের বাসা বলতে গেলে কাছাকাছি। সবাই নিয়মিত বাবার খোঁজ-খবর রাখেন। বাবা গত কয়েক বছর ধরে আমার বাসায় থাকেন। আমার স্ত্রী শামীমা আক্তার বকুল ও বড় ছেলেই তাকে সার্বক্ষণিক দেখাশোনা করেন। আমি বর্তমানে বেকার জীবন যাপন করছি। ৩৬ বছর সাংবাদিকতা করার পর পত্রিকার অর্থনৈতিক অবস্থা খারাপ হওয়ায় আমাকে গোল্ডেন হ্যান্ডশেকে বিদায় জানানো হয়। বর্তমানে আব্বার দিন কাটে শুয়ে, বসে আর ঘুমিয়ে। নিজ থেকে কোনো কথা বলেন না। বর্তমানে বার্ধক্যজনিত রোগে ভুগছেন। তার কোনো সিরিয়াস অসুখ নেই। ডায়াবেটিস বা হার্টে কোনো সমস্যা নেই। এখন বই পড়তে না পারলেও বই হাতে দিলে পড়ার ইচ্ছাটা প্রকাশ পায়। বই নাড়াচাড়া করেন। পৃষ্ঠা উল্টান। আমরা ভাই বোন ও আমাদের ছেলে মেয়েরা সবাই আব্বার বইয়ের পাঠক। তবে, দুঃখের বিষয় আমরা কেউ লেখালেখির সঙ্গে যুক্ত নই। 

সত্যি বলতে আমাদের দেশে সাহিত্য চর্চাটা খুব সুখের নয়। আব্বা অনেক চড়াই উৎড়াই পেরিয়ে এ পর্যায়ে এসেছেন। আমরা খুব দুঃখ কষ্টে বড় হয়েছি। তার উপর সাংবাদিকতা তো আরো ঝুঁকিপূর্ণ। সরকারি কিংবা বিরোধী দল কেউই আব্বার খোঁজ-খবর রাখেন না। এমনকি কেউ একদিন তাকে দেখতে পর্যন্ত আসে নি। মাঝে মধ্যে আব্বার ভক্ত অনুরাগিরা তাকে দেখতে আসেন। কবি আল মাহমুদের গোলাপফুল আঁকা ভাঙা টিনের বাক্স সম্পর্কে তিনি বলেন, আসলে ওই টিনের বাক্সের বাস্তবিক কোনো অস্তিত্ব নেই। এটা আব্বার বন্ধু ও লেখক শহীদ কাদরীর একটি উক্তি ছিল। তিনি ঠাট্টা করে আব্বাকে উদ্দেশ্যে করে বলেছিলেন, ‘আল মাহমুদ টিনের বাক্স নিয়ে ঢাকায় এসেছে, যার মধ্যে পুরো বাংলাদেশ ছিল’।

১৯৩৬ সালের ১১ই জুলাই প্রবল বর্ষণের এক রাতে ব্রাহ্মণবাড়ীয়া জেলার মোড়াইল গ্রামের এক ব্যবসায়ী পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন কবি আল মাহমুদ। তার পিতার নাম আব্দুর রব মীর এবং মাতার নাম রওশন আরা মীর। বেড়ে উঠেছেন ব্রাহ্মণবাড়িয়ায়। কুমিল্লা জেলার দাউদকান্দি থানার সাধনা হাই স্কুল এবং পরে চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ড হাই স্কুলের পড়াশোনা করেন। মূলত এই সময় থেকেই তার লেখালেখি শুরু। মাত্র ১৮ বছর বয়সে ১৯৫৪ সালে সংবাদপত্রে লেখালেখির সূত্র ধরে কবি ঢাকায় আসেন। আজীবন আত্মপ্রত্যয়ী এই কবি ঢাকায় আসার পর কাব্য সাধনা করে একের পর এক সাফল্য লাভ করেন। 

কলকাতার নতুন সাহিত্য, চতুষ্কোণ, ময়ূখ ও কৃত্তিবাস ও বুদ্ধদেব বসু সম্পাদিত বিখ্যাত ‘কবিতা’ পত্রিকায় লেখালেখির সুবাদে ঢাকা-কলকাতার পাঠকদের কাছে তার নাম সুপরিচিত হয়ে ওঠে এবং তাকে নিয়ে আলোচনার সূত্রপাত হয়। সমকালীন বাংলা সাপ্তাহিক পত্র-পত্রিকার মধ্যে কবি আব্দুর রশীদ ওয়াসেকপুরী সম্পাদিত ও নাজমুল হক প্রকাশিত সাপ্তাহিক কাফেলায় লেখালেখি শুরু করেন। পাশাপাশি দৈনিক মিল্লাত পত্রিকায় প্রুফ রিডার হিসেবে সাংবাদিকতা জগতে পদচারণা শুরু করেন। ১৯৫৫ সালে কবি আব্দুর রশীদ ওয়াসেকপুরী কাফেলার চাকরি ছেড়ে দিলে তিনি সেখানে সম্পাদক হিসেবে যোগ দেন।

১৯৬৩ সালে প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থ লোক লোকান্তর সর্বপ্রথম তাকে স্বনামধন্য কবিদের সারিতে জায়গা করে দেয়। এরপর কালের কলস, সোনালী কাবিন, মায়াবী পর্দা দুলে ওঠো ইত্যাদি কাব্যগ্রন্থগুলো তাকে প্রথম সারির কবি হিসেবে সুপ্রতিষ্ঠিত করে। ১৯৭১ সালে তিনি মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেন এবং যুদ্ধের পরে দৈনিক গণকণ্ঠ পত্রিকায় সম্পাদক হিসেবে যোগ দেন। সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের পক্ষে অবস্থান নেয়ায় প্রায় একবছর কারাগারে কাটাতে হয় তাকে। মুক্তির পর নিয়োগ পান শিল্পকলা একাডেমীর গবেষণা ও প্রকাশনা বিভাগের সহপরিচালক পদে। দীর্ঘদিন দায়িত্ব পালনের পর তিনি পরিচালক হন। পরিচালক হিসেবে ১৯৯৩ সালে অবসর গ্রহণ করেন।

আধুনিক বাংলা কবিতার শহরমুখী প্রবণতার মধ্যেই ভাটি বাংলার জনজীবন, গ্রামীণ আবহ, নদীনির্ভর জনপদ, চরাঞ্চলের জীবনপ্রবাহ এবং নরনারীর চিরন্তন প্রেম-বিরহকে তিনি কবিতায় অবলম্বন করেন। সমকালীন বাংলা সাহিত্যাকাশে আল মাহমুদের সমতুল্য মেলা ভার। বিগত কয়েক দশক বাংলা কবিতা তার হাত ধরে আজ চরম উৎকৃষ্ট ও উন্নত শিখরে অবস্থান করছে। কবিতার সঙ্গেই গড়ে তুলেছেন ঘর-সংসার। তিনি বলেছেন, ‘কবিতা আমার জীবন’। পশ্চিমবঙ্গের বিশিষ্ট লেখক, সমালোচক শিবনারায়ণ রায় বলেছিলেন, ‘বাংলা কবিতায় নতুন সম্ভাবনা এনেছেন আল মাহমুদ, পশ্চিম বাংলার কবিরা যা পারেনি তিনি সেই অসাধ্য সাধন করেছেন।’

তার লেখনীর ব্যতিক্রম স্বাদের জন্য তিনি বারবার আলোচিত হয়েছেন। হয়েছেন অসংখ্যবার পুরস্কৃত। মাত্র দু’টি কাব্যগ্রন্থ্যের জন্য ১৯৬৮ খ্রিষ্টাব্দে তিনি বাংলা একাডেমি পুরস্কার লাভ করেন। সাহিত্যিক জীবনে তিনি কবিতা, গল্প, উপন্যাস, প্রবন্ধ, ভ্রমণকাহিনী, আত্মজীবনীসহ নানা বিষয়ে বহু গ্রন্থ রচনা করেছেন। কবিতা, গল্প, উপন্যাসসহ শ’খানেকের মতো গ্রন্থ প্রকাশ হয়েছে তার। উল্লেখযোগ্য গ্রন্থের মধ্যে রয়েছে, কবিতা: লোক লোকান্তর, কালের কলস, সোনালী কাবিন, মায়াবী পর্দা দুলে ওঠো, প্রহরান্তরের পাশ ফেরা, আরব্য রজনীর রাজহাঁস, মিথ্যেবাদী রাখাল, আমি দূরগামী, বখতিয়ারের ঘোড়া, দ্বিতীয় ভাঙন, নদীর ভেতর নদী, উড়াল কাব্য, বিরামপুরের যাত্রী, বারুদগন্ধী মানুষের দেশ, তুমি তৃষ্ণা তুমিই পিপাসার জল, অদৃষ্টবাদীদের রান্নাবান্না, ইত্যাদি। এ ছাড়া ‘যেভাবে বেড়ে উঠি’ তার উল্লেখযোগ্য আত্মজীবনী গ্রন্থ।

সমাজতন্ত্রের সংগ্রামে অবস্থান নেয়ার কারণে কারাভোগ করলেও পরবর্তী আল মাহমুদের বিশ্বাসে পরিবর্তন আসে। ধর্মের প্রতি অনুরাগী হয়ে পড়েন তিনি। এ নিয়ে কেউ কেউ তার সমালোচনাও করেন। নাসির আলী মামুনকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে এর জবাব দেন আল মাহমুদ। বলেন, তারা আমাকে অন্যায়ভাবে মৌলবাদী বলেছে। তারা খুব ভালো করে জানে, কোনো একজন কবি মৌলবাদী হতে পারে না। এটাতো ঠিক নয় যে, আমি ধর্মে বিশ্বাস করেছি বলে আমি মৌলবাদী।

আসলে আল মাহমুদের সমালোচনা করা যায়, কিন্তু তাকে উপেক্ষা করা যায় না। বেলাল চৌধুরী যেমনটা লিখেছেন, শামসুর রাহমান ও আল মাহমুদ দুজনই সমসমায়িককালের কবি। কিন্তু মত ও পথ আলাদা। এই দুই কবির সঙ্গে আমার পরিচয় দীর্ঘকালের। শামসুর রাহমানকে আমি সম্বোধন করি ‘স্যার’। আর অতীতে বন্ধুত্ব থাকা সত্ত্বেও কিছু নীতিগত কারণে আল মাহমুদ থেকে দূরত্ব তৈরি হয়েছে। কিন্তু শামসুর রাহমানের লেখা যেভাবে গুরুত্ব সহকারে আমি পাঠ করি, সেভাবে আল মাহমুদকেও পাঠ করি। মানবজমিন

ট্যাগ:
সর্বশেষ সংবাদ
Advertisements
karnafully1
TEKSERV

Situs Streaming JAV