প্রতি তিন ঘণ্টায় ভাঙছে একটি সংসার…কেন মন ভাঙে?
২০১০ সালের ১৪ অক্টোবর একজন প্রবাসীর সঙ্গে বিয়ে হয়েছিল শামসুন্নাহারের (ছদ্মনাম)। বিয়ের কিছুদিন পর স্বামী চলে যান মধ্যপ্রাচ্যে তাঁর কর্মস্থলে। বছর ঘুরতে না ঘুরতেই কোলজুড়ে সন্তান আসে শামসুন্নাহারের। কন্যাসন্তান। দীর্ঘ বিরতিতে একেকবার দেশে আসেন স্বামী কফিল (ছদ্মনাম)। কিন্তু এত দিন পর দেশে এলেও স্ত্রী-সন্তানের প্রতি কোনো টান যেন নেই। অন্য এক নারীর সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক গড়ে উঠেছে বলে ধারণা শামসুন্নাহারের। এমনকি তার মানিব্যাগেও এক দিন দেখতে পান সেই নারীর ছবি। এ নিয়ে স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে শুরু হয় কলহ। একপর্যায়ে মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে ফেলেন শামসুন্নাহার। কিন্তু স্বামীর মতিগতির পরিবর্তন নেই। অবশেষে অনন্যোপায় হয়ে ২০১৩ সালের সেপ্টেম্বর মাসে বিবাহ বিচ্ছেদের আবেদন করেন শামসুন্নাহার।
এর ঠিক উল্টো ঘটনাও আছে। সৌদি আরবের রিয়াদে থাকেন মাহমুদুল আলম (ছদ্মনাম)। ২০০৭ সালে দেশে ফিরে বিয়ে করেন শামীমাকে (ছদ্মনাম)। বিয়ের পর কর্মস্থলে ফিরে যান মাহমুদ। মাঝেমধ্যে দেশে আসেন। ২০১১ সালে দেশে ফিরে স্ত্রীর চালচলনে কেমন একটা পরিবর্তন দেখতে পান। লুকিয়ে মুঠোফোনে কার সঙ্গে যেন কথা বলেন শামীমা। এক দিন মুঠোফোনে সেই ব্যক্তির খুদে বার্তা এলে মাহমুদের সন্দেহ দৃঢ়মূল হয়। এ নিয়ে স্বামী-স্ত্রীর কলহের একপর্যায়ে উভয় পক্ষের অভিভাবকদের উপস্থিতিতে সমঝোতা হয়। শামীমা সব দোষ স্বীকার করে ভবিষ্যতে আর এ রকম ঘটবে না বলে কথা দেন।
কিন্তু সমঝোতার মাত্র কয়েক দিন পর ২০১১ সালের ৩১ অক্টোবর নিখোঁজ হয়ে যান শামীমা। বাকলিয়া থানায় সাধারণ ডায়েরি করেন স্বামী। স্থানীয় তিনটি দৈনিক পত্রিকায় ছাপানো হয় নিখোঁজ সংবাদ। কিন্তু খোঁজ মেলে না শামীমার। স্বামী মাহমুদের ধারণা, প্রেমিকের আশ্রয়ে কোথাও লুকিয়ে আছে তাঁর স্ত্রী। অবশেষে ২০১৩ সালের সেপ্টেম্বর মাসে স্ত্রীকে তালাকের নোটিশ দেন মাহমুদ।
এভাবেই স্বামী বা স্ত্রীর অন্য কোনো সম্পর্কে জড়িয়ে পড়া নিয়ে সন্দেহ-অবিশ্বাসের জন্ম। তাতে মন ভাঙে, সংসারও ভেঙে যায়। শুধু পরকীয়া নিয়ে সন্দেহ-অবিশ্বাস নয়। ব্যক্তিত্বর সংঘাত, যৌতুকের দাবি, মাদকাসক্তি নির্যাতন বা প্রতারণা ইত্যাদি নানা কারণে ভাঙছে সংসার।
চট্টগ্রামে গড়ে প্রতি তিন ঘণ্টায় ভাঙছে একটি করে সংসার। চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের সালিশি আদালত থেকে এ তথ্য জানা গেছে।
২০০৯ সালে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের সালিশি আদালতে বিবাহবিচ্ছেদের আবেদন জমা পড়েছিল এক হাজার ৯৫২টি, ২০১০ সালে এর সংখ্যা দুই হাজার ১৬২, ২০১১ সালে দুই হাজার ৬১৫ এবং ২০১২ সালে দুই হাজার ৭৮২, ২০১৩ সালের সেপ্টেম্বর মাসের মধ্যেই এই সংখ্যা এক হাজার ৯৬০। অর্থাৎ প্রতিবছর সংখ্যাটি বেড়েই চলেছে। ২০০৯ সালে
গড়ে প্রতি পাঁচ ঘণ্টায় একটি করে সংসার ভাঙত।
সালিশি আদালত সূত্র জানায়, বিবাহবিচ্ছেদের আবেদন পেলে আদালত এক মাসের নোটিশ দেন বাদী ও বিবাদীকে। তাঁরা হাজির না হলে বা কোনো সমঝোতায় উপনীত না হলে তিন মাসের মধ্যে কার্যকর হয় বিবাহ বিচ্ছেদ।
বিবাহবিচ্ছেদের আবেদনের পর কী পরিমাণ আবেদন প্রত্যাহার হয় বা কয়টি ক্ষেত্রে আপস মীমাংসা হয়?—এ রকম প্রশ্নের জবাবে আদালত সূত্র জানায়, এর সংখ্যা শতকরা পাঁচ ভাগেরও কম।
আদালতে জমা দেওয়া বিবাহবিচ্ছেদের আবেদনের বিষয় পর্যালোচনা করে দেখা যায়, গার্মেন্টসে কর্মরত মেয়েদের বিবাহবিচ্ছেদের আবেদন সবচেয়ে বেশি। বিয়ের পর স্বামীরা তাঁদের বেতনের টাকা হাতিয়ে নেন, মাদকে আসক্ত হয়ে পড়েন, নির্যাতন করেন, অন্য নারীর সঙ্গে অনৈতিক সম্পর্ক রাখেন বা গোপনে অন্যত্র বিয়ে করেন বলেও অভিযোগও করেছেন তাঁরা।
এ ছাড়া প্রবাসে কর্মরত পুরুষেরা বেশির ভাগ ক্ষেত্রে বিবাহবিচ্ছেদের আবেদন করেন তাঁদের অনুপস্থিতিতে স্ত্রীর অনৈতিক সম্পর্ক নিয়ে সন্দেহের বশবর্তী হয়ে। উচ্চবিত্ত ও শিক্ষিত পরিবারে দেখা যাচ্ছে ব্যক্তিত্বের দ্বন্দ্ব, যৌতুক, শ্বশুর-শাশুড়ির সঙ্গে বোঝাপড়ায় সমস্যা ও পরকীয়া প্রেম প্রভৃতি কারণ দেখিয়ে নারী-পুরুষ উভয়ের দিক থেকে বিবাহবিচ্ছেদের আবেদন করা হয়।
নৈতিক স্খলনে বাড়ছে বিবাহবিচ্ছেদ
মোহিত কামাল, মনোরোগ চিকিৎসক
মনোরোগ চিকিৎসক মোহিত কামালের মতে, নৈতিক স্খলনের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে বিবাহবিচ্ছেদের ঘটনা। তাঁর মতে, প্রবাসীদের সঙ্গে স্ত্রীর বিয়ে বাড়ছে মূলত সন্দেহ-অবিশ্বাস থেকে। বিদেশে হাড়ভাঙা খাটুনির পর স্ত্রীর সঙ্গ পান না তাঁরা। এমনকি তাঁদের জীবনে অন্য কোনো বিনোদনও নেই। দেশে স্ত্রী কী করছে এই চিন্তায় অস্থির থাকেন তাঁরা। তার ওপর দেশ থেকে অনেক সময় বাবা-মা বা ভাইয়েরা তাঁর স্ত্রীর আচরণ সম্পর্কে নানা অভিযোগ করেন। এগুলো তাঁর মনকে বিষিয়ে দেয়। স্ত্রীকে ফোন করে তাঁরা তখন কটুকাটব্য করতে থাকেন। এতে সম্পর্ক তিক্ত হয়ে পড়ে। তবে এ কথাও ঠিক, দীর্ঘকাল স্বামীর অনুপস্থিতিতে অনেকে বিবাহ- বহির্ভূত সম্পর্কে জড়িয়ে পড়েন। এটা একটা জৈবিক কারণ। স্বামীর অনুপস্থিতিতে এই জৈবতাড়নাই তাঁকে অবৈধ সম্পর্কে জড়িয়ে পড়তে প্ররোচিত করে। পোশাক-কর্মীদের মতো যাঁরা নিম্নআয়ের মহিলা, অনেক দরিদ্র পুরুষই তাঁদের বিয়ে করেন অর্থনৈতিক সুবিধা লাভের জন্য। অনেক সময় স্ত্রীর টাকায় নেশা করেন অনেকে, কেউ বা গোপনে অন্য নারীতে আসক্ত হয়ে পড়েন। এই মেয়েরা এখন অর্থনৈতিকভাবে কিছুটা হলেও স্বাবলম্বী। তাঁরা এ অন্যায় মুখ বুজে সহ্য করেন না। তাই বিবাহবিচ্ছেদ ঘটানোর মতো সিদ্ধান্ত নেন।
উচ্চবিত্ত পরিবারের ক্ষেত্রে দেখা যায় স্বামী ব্যবসা বা বড় চাকরি করেন। নিয়মিত মদ্য পান করাকে সোশ্যাল স্ট্যাটাসের অন্তর্ভুক্ত মনে করেন। মদ্যপ অবস্থায় স্ত্রীর ওপর শারীরিক-মানসিক নির্যাতন করেন। এ ছাড়া এ শ্রেণীর মেয়েদের মধ্যেও নানা হতাশা থেকে বিয়ে-বহির্ভূত সম্পর্ক স্থাপনের অনেক নজির আছে। সব মিলিয়ে স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্কে চিড় ধরে, যার অনিবার্য ফল বিবাহবিচ্ছেদ।
মাদকাসক্তি ও যৌতুকের মতো সামাজিক ক্ষত সারানো গেলে বিবাহবিচ্ছেদ অনেকাংশে কমবে বলে মনে করেন মোহিত কামাল। তাঁর মতে সমাজে সচেতনতা সৃষ্টি করতে হবে। এ ছাড়া আর কোনো নিদান নেই।প্রথম আলো
- বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার স্বদেশ প্রত্যাবর্তন বাস্তবায়ন উপলক্ষে নিউইয়র্কে সমাবেশ, আগামী ডিসেম্বরে শেখ হাসিনার সঙ্গে দেশে ফেরার প্রত্যয় আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের
- অর্থনৈতিক নীতিনির্ধারণের কেন্দ্রে মানবাধিকারকে রাখতে হবে: জাতিসংঘে বাংলাদেশের স্থায়ী প্রতিনিধি আইরিন খান
- নিউইয়র্কে হিউম্যান সাপোর্টের বিনামূল্যে ফ্লু টিকাদান কর্মসূচি
- New York Attorney General James Announces Election Protection Hotline Ahead of November General Election
- ASAAL’s 19th Annual Convention Draws Nearly 500, Calls for Stronger Civic Engagement and Workers’ Rights
- নিউইয়র্কে ট্রাফিক এজেন্ট ইউনিয়নের সভায় দুই বাংলাদেশি নেতাকে ঘিরে সংঘর্ষ, আসন্ন নির্বাচন ঘিরে নেতৃত্বের বিরোধ প্রকাশ্যে
- দেহের মেহরাবে অনন্তের দীপ
- নিউইয়র্কে বাংলাদেশ সোসাইটির নির্বাচন স্থগিতের প্রতিবাদে ব্রঙ্কসে ‘সেলিম-আলী’ পরিষদের সমাবেশ; মামলার কারণে আর্থিক ক্ষতি ও ভোটাধিকার ব্যাহত হওয়ার অভিযোগ