বিশ্বখ্যাত টুইন টাওয়ার এবং আমাদের এফ রহমান
নাঈমা লাবণী : আমরা যারা আমেরিকায় বসবাস করি তারা অনেকেই মনে করি শ্বেতঙ্গরা অসম্ভব মেধাবী। আমরা যে কোনো জরুরি কাজে বা বিষয়ে যেমন চিকিৎসার ক্ষেত্রে, মামলার ক্ষেত্রে শ্বেতাঙ্গ চিকিৎসক কিংবা আইনজীবীর সেবা পাওয়ার চেষ্টা করি কিংবা আশা রাখি। এমনকি কোনো কলেজে শেতাঙ্গের সংখ্যা বেশি হলে সে কলেজকে মানসম্মত হিসেবে বিবেচনা করা হয় যেমন হান্টার, বিঙহ্যামটন প্রভৃতি। কিন্তু আপনারা কি জানেন যে আমাদের বঙ্গে জন্মেছিলেন এমন বীর মেধাবী সন্তান যার কৃতকর্মে আমরা সকল বাঙালি মাথা উঁচু করে আমাদের পরিচয় দিতে পারি। সত্যি বলতে কি, আমি নিজেই জানতাম না যে এতো বড় মাপের বাঙালি একজন মেধাবী মানুষ হতে পারেন। আমার আম্মুকে অসংখ্য ধন্যবাদ এমন একটি তথ্য আমার দৃষ্টিগোচর করার জন্য। তখন মনে হলো, অনেকেই হয়তো আমার মতো এ ব্যাপারে জানেন না, তাই এ ব্যাপারে লিখতে বসে গেলাম অন্যদের জানাতে।
আমি আজকে যে কিংবদন্তি বাঙালিকে নিয়ে লিখতে যাচ্ছি তার নাম ফজলুর রহমান খান। তিনি ১৯২৯ সালে মাদারীপুর জেলার শিবচর উপজেলার ভা-ারীকান্দি গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতা ছিলেন উচ্চ বিদ্যালয়ের গণিত শিক্ষক, গণিত বিষয়ক গ্রন্থ লেখক এবং পরবর্তীতে জগন্নাথ কলেজের প্রধান অধ্যাপক। ফজলুর রহমান ঢাকার আরমানিটোলা গভর্নমেন্ট হাইস্কুল থেকে মাধ্যমিক শেষ করে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে বেঙ্গল ইঞ্জিনিয়ারিং এন্ড সায়েন্স বিশ্ববিদ্যালয় থেকে উচ্চ মাধ্যমিক পাস করেন। এর পর তিনি বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অফ ইঞ্জিনিয়ারিং এন্ড টেকনোলজি থেকে সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে প্রথম স্থান অধিকার করে স্নাতক পাস করেন। এ কারণে ১৯৫২ সালে তিনি যুগপৎ সরকারি বৃত্তি এবং ফুল ব্রাইট বৃত্তি নিয়ে উচ্চতর শিক্ষার জন্য আমেরিকা গমন করনে। সেখানে তিনি ইউনিভার্সিটি অফ ইলিনয়েস এট উরবানা শ্যাম্পেইন থেকে স্ট্রাকচারাল ইঞ্জিনিয়ারিং এবং থিওরেটিক্যাল এন্ড এপলাইড মেকানিকসে মাস্টার্স ডিগ্রি, এরপর স্ট্রাকচারাল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে পিএইচডি অর্জন করেন। তার গবেষণার বিষয় ছিল ‘এনালিটিক্যাল স্টাডি অফ রিলেশনস এমং ভেরিয়াস ডিজাইন ক্রাইটেরিয়া ফর রেকটেঙ্গুলার প্রেসট্রেসড কনক্রিট বিমস’।
১৯৫৫ সালে তিনি শিকাগোতে স্কিডমোর, অওইংস এন্ড মেরিল প্রতিষ্ঠানে কাজ শুরু করেন। তার কর্মজীবনের প্রারম্ভিক দিকের কাজগুলো মূলত ছিল ইউএস এয়ার আর্মির অধীনে সেতু , হাইওয়ে, রেলপথের নকশা করা। এরই মধ্যে তিনি অল্প সময়ের জন্য ১৯৫৭ সালে পাকিস্তান ফিরে যান এবং সেখানে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং ঊর্ধ্বতন পদে এক্সিকিউটিভ ইঞ্জিনিয়ার অফ দ্য কারাচি ডেভেলপমেন্ট অথরিটি হিসেবে কাজ করেন। যদিও তিনি খুবই উচ্চপদে ছিলেন তারপরেও তিনি তার প্রধান শখ নকশা করা থেকে বঞ্চিত হতে থাকলেন এবং নকশা করার জন্য আকুলভাবে ছটফট করতে লাগলেন। এর পর তিনি পুনরায় তার আমেরিকার পুরনো কর্মস্থলে ফিরে আসেন। ১৯৬০ এবং ১৯৭০-এর দশকে তিনি পৃথিবীর সর্বোচ্চ ভবনগুলোর নকশা করার পাশাপাশি স্ট্রাকচারাল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের কিছু অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ তত্ত্ব কিংবা ক্রিয়াপদ্ধতি আবিষ্কার করেন। তার আবিষ্কৃত গগণচুম্বী অট্টালিকার জন্য তত্ত্ব এবং কাজ আমেরিকারসহ পুরো বিশ্বের দৃষ্টি আকর্ষণ করে। তিনি বিখ্যাত ১০৮ তলা বিশিষ্ট সিয়ার্স টাওয়ার (বর্তমান উইলিস টাওয়ার)-এর নকশা করেন, যা কিনা আমেরিকার সর্বোচ্চ অট্টালিকা এবং ১৯৯৬ সাল পর্যন্ত ছিল পৃথিবীর সর্বোচ্চ অট্টালিকা। এছাড়াও তিনি শিকাগোর ১০০ তলা বিশিষ্ট হ্যানকক ভবনের নকশা করেন।
১৯৫০ সালের ‘বেবি বুম’ এর পর মানুষজন যখন ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যা বৃদ্ধি এবং বসতি স্থাপনের জায়গার অভাব নিয়ে চিন্তিত তখন ফজলুর রহমান এই সমস্যার অভূতপূর্ব সমাধান করেন। তিনি বহুতল ভবন নির্মাণের কথা চিন্তা করেন এবং গগণস্পর্শী অট্টালিকা নির্মাণের জন্য প্রথমবারের মতো তত্ত্ব আবিষ্কার করেন। তাকে টিউবলার সিস্টেমের জনক বলা হয় কারণ তিনি গগণস্পর্শী ভবনের জন্য ‘টিউব স্ট্রাকচারাল সিস্টেম’ বের করেন। ১৯৬০ সাল থেকে এখন পর্যন্ত নির্মিত পৃথিবীর সকল গগণচুম্বী অট্টালিকা তৈরিতে এই পদ্ধতি ব্যবহৃত হয়। এমনকি পৃথিবী বিখ্যাত ‘ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টার কিংবা টুইন টাওয়ার’ ও এই একই পদ্ধতিতে তৈরি করা হয়। অথচ সবচেয়ে মজার ব্যাপার হচ্ছে, যেখানে একজন মুসলমানের তৈরি করা তত্ত্ব এবং নকশার ভিত্তিতে এই ভবনটি তৈরি করা হয় সেখানে এই ভবনটি অন্য মুসলিমদের দ্বারা ধ্বংস হয়েছে।
টিউব স্ট্রাকচারাল সিস্টেমের প্রধান বৈশিষ্ট্য হচ্ছেÑ এটা লেটেরাল লোডস অথবা অনুভূমিক বল যেমন প্রবল বাতাস, ভূমিকম্প ইত্যাদি থেকে উঁচু ভবনকে রক্ষা করে, যা কিনা একটি বহুতল ভবনের জন্য অন্যতম মারাত্মক ঝুঁকি। এই তত্ত্ব অনুসারে ভবন নির্মাণ করলে ভবন গঠনগতভাবে অত্যধিক শক্তিশালী ও মজবুত হলেও ভবন নির্মাণের জন্য প্রয়োজনীয় মালামাল এবং সরঞ্জাম অনেকাংশে কমিয়ে দেয়। এ কারণে অর্থনীতি এবং পরিবেশ কোনোটাই চাপের সম্মুখীন হয় না। এছাড়াও এই পদ্ধতিতে ভবন নির্মাণ করলে ভবনের ভেতরে অনেক জায়গা থাকে এবং ভবনটিকে বিভিন্ন আকৃতি এবং গঠন দেয়া যায়। একমাত্র তার উদ্ভাবিত পদ্ধতির কারণে পৃথিবী আজকে এতো উন্নত, কারণ তার পদ্ধতি অনুসরণ করে এখন পৃথিবীর প্রায় প্রতি দেশে হাজার হাজার গগণস্পর্শী অট্টালিকা তৈরি হচ্ছে, যা জোগান দিচ্ছে আরো বেশি কর্মসংস্থান এবং বাসস্থানের। এ কারণে তাকে একটি যুগান্তকারী উন্নত বিশ্ব এবং অর্থনীতির জনক হিসেবে আখ্যায়িত করা যেতে পারে এবং এবং এটা ওনার জন্য যৌক্তিকভাবে প্রাপ্য।
এছাড়াও স্ট্রাকচারাল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের আরো একটি পথপ্রদর্শক অধ্যায়ের সূচনা করেন তিনি। ১৯৭০-তে ইঞ্জিনিয়াররা প্রথমবারের মতো স্ট্রাকচারাল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের গবেষণা এবং বিশ্লেষণের জন্য কম্পিউটার ব্যবহার শুরু করেন। এ সকল গবেষণা এবং বিশ্লেষণে অবশ্যই ফজলুর রহমান সাহেবের কর্মস্থল এগিয়ে ছিল একমাত্র তার অসাধারণ অবদানের কারণে। একমাত্র তার অনুরোধে তিনি যে প্রতিষ্ঠানে কাজ করতেন সে প্রতিষ্ঠান একটি মেইন ফ্রেইম কম্পিউটার খরিদ করে, যা কিনা সে সময় একটি অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ বিনিয়োগ ছিল। কারণ বর্তমানে যে সকল প্রযুক্তি সব জায়গায় ব্যবহৃত হচ্ছে সেসব প্রযুক্তি তখন কেবল শুরু হয়। তার কর্মস্থল কম্পিউটার কেনার পর সে কম্পিউটার দিয়ে তিনি স্ট্রাকচারাল ইঞ্জিনিয়ারিং ইকুয়েশন এবং আর্কিটেকচারাল ড্রয়িং করতে থাকেন। এ কারণে তাকে কম্পিউটার এইডেড ডিজাইন বা সিএডি-এর অগ্রদূত বলা হয়ে থাকে।
তিনি তার ক্ষুদ্র জীবনে অসামান্য সাফল্য এবং কৃতিত্বের জন্য অসংখ্য সম্মাননা পেয়েছেন। কাউন্সিল অন টল বিল্ডিংস এন্ড উরবান হ্যাবিটেট, গগণস্পর্শী অট্টালিকার ব্যাপারে একটি আন্তর্জাতিক সংগঠন ফজলুর খানের সম্মানার্থে ‘ফজলুর আর খান লাইফ এচিভমেন্ট মেডেল’-এর প্রবর্তন করে। এছাড়াও সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার লক্ষ্যে গড়ে ওঠা ‘ইন্টারন্যাশনাল এসোসিয়েশন ফর লাইফ সাইকেল সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং’ ফজলুর খান সাহেবের ওপর ভিত্তি করে তাদের লাইফ সাইকেল সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং মেডেল-এর নামকরণ করে। পেনসিলভেনিয়ার প্রখ্যাত ‘লেহাই ইউনিভার্সিটি’ খান সাহেবের ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে অসামান্য দক্ষতা এবং সহজাত প্রতিভার প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে ‘খান লেকচার সিরিজ’ এবং ‘ফজলুর আর খান ডিস্টিংগুইশড লেকচার সিরিজ’ নামক কোর্সেস চালু করে। শুধু যে বিদেশেই তাকে সম্মান করা হয়েছে তা নয়, তার সম্মানার্থে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ‘এফ রহমান’ নামে একটি হল নির্মাণ করে।
খান সাহেব যে কেবল আর্কিটেকচার এবং ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে ভালো ছিলেন তাই নয়, তিনি রবীন্দ্রসঙ্গীত গাইতেও বেশ ভালোবাসতেন। কিন্তু দুঃখের ব্যাপার, তিনি তার যে সকল সীমাহীন মহৎ কর্মের জন্য সাফল্যের চূড়ায় অবতীর্ণ করেছিলেন, সেসব করতে তিনি খুবই কম সময় পেয়েছিলেন। ১৯৮২ সালের ২৭ মার্চ মাত্র ৫৩ বছর বয়সে সৌদি আরবের জেদ্দায় তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। মৃত্যুকালীন তিনি তার কর্মস্থানের জেনারেল পার্টনার ছিলেন। এটি সে সময়কার ইঞ্জিনিয়ারদের মধ্যে সর্বোচ্চ পদমর্যাদা ছিল। তার মৃতদেহ আমেরিকাতে ফেরত আনা হয় এবং তাকে শিকাগোতে সমাহিত করা হয়। এফ রহমানের যুগান্তকারী আবিষ্কারের জন্য আজকে পৃথিবী এতো উন্নত, আমাদের উন্নত পৃথিবীতে টুইন টাওয়ারের মতো আকাশছোঁয়া দালানের অস্তিত্ব আছে। তার এই অসামান্য অবদানের জন্য তিনি পৃথিবীর ইতিহাসে অবিস্মরণীয় হয়ে থাকবেন।
- নিউ জার্সিতে উৎসবমুখর পরিবেশে দুর্গাপূজা উদযাপিত
- নিউইয়র্কের জেএমসির সম্প্রসারণ প্রকল্প রমজানের আগেই সম্পন্নের প্রত্যাশা, ফান্ডরেইজিংয়ে প্রায় ১০ লাখ ডলার সংগ্রহ, বাকি প্রয়োজন আরও ২০ লাখ
- New York Attorney General James Secures More Than $480,000 and Debt Relief for New York Homeowners
- এই জীবন চিরস্থায়ী নয়, একদিন মরে যাবো
- নিউইয়র্কে বাংলাদেশ সোসাইটির নির্বাচন নিয়ে অনিশ্চয়তা আরও বেড়েছে; ১৭ ডিসেম্বর উভয় পক্ষকে তথ্য-উপাত্ত জমার নির্দেশ
- নিউইয়র্কে নৃত্যশিল্পী ও সাংস্কৃতিক সংগঠক তাহসিন ফেরদৌসের অকালমৃত্যু, বাংলাদেশি কমিউনিটিতে শোকের ছায়া
- নিউইয়র্কে আবেয়া’র দ্বিবার্ষিক সম্মেলন ও ফ্যামিলি নাইট: প্রযুক্তি সেমিনার, জব ফেয়ার, বিজ্ঞান মেলা ও সাংস্কৃতিক উৎসব
- Global Anticipation Builds as Dr. Mostofa Sarwar’s Sunflower Wounds Debuts with Successful Houston Open House and Worldwide Pre-Order Milestone