যুক্তরাষ্ট্রে এসাইলাম প্রক্রিয়া কঠিন হচ্ছে
সৈয়দ আফতাব আহমেদ : প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন নিরবে এসাইলাম প্রক্রিয়া কঠিন করছে। ইউএসসিআইএস এর অধীনে ‘রিফিউজি, এসাইলাম এন্ড ইন্টারন্যাশনাল অপারেশন্স ডিরেক্টরেট (আরএআইও) বিভিন্ন সময়ে এসাইলাম অফিসারদের বেসিক ট্রেনিং কোর্সে বিভিন্ন লেসন প্ল্যান প্রকাশ করে থাকেন। এবারের একটি আপডেট করা লেসন প্ল্যানের মধ্যে এসাইলাম সংক্রান্ত একটি পরিবর্তন আনা হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পরবর্তী এসালাইম প্রার্থীদের আবেদনে এই পরিবর্তনের কারণে এসাইলাম কঠিনতর হবে এবং পুরো প্রক্রিয়াটিতে ব্যাপক মাত্রায় প্রভাব পড়বে। এ বছরের ফেব্রুয়ারির ১৩ তারিখে ইউএসসিআইএস এর এসাইলাম ডিভিশনের চিফ জন ল্যাফারটি এই নতুন লেসন প্ল্যান জারি করেন। এটি ফেব্রুয়ারির ২৭ তারিখ থেকে কার্যকর হয়েছে। এই নতুন লেসন প্ল্যানের ব্যাপারে ইউএসসিআইএস কোন মন্তব্য করতে রাজী হয়নি।
প্রেসিডেন্ট হওয়ার আগে ডোনাল্ড ট্রাম্প বিদ্যমান ইমিগ্রেশন আইন কঠোরভাবে প্রয়োগের যে নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি করেছিলেন সেটিকেই বাস্তবায়নের আরেক ধাপ হিসেবে এসাইলামের আবেদনকে আরো কঠিন করে তোলার এই পদক্ষেপÑ এমনটাই মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। ইমিগ্রেশন বিষয়ক পরামর্শদাতার বলছেন, যারা সত্যিকার অর্থেই সহিংস পরিস্থিতির শিকার হয়েছেন এই পরিবর্তন তাদের যুক্তরাষ্ট্রে এসাইলামের মাধ্যমে যথাযথ নিরাপত্তা পাওয়া থেকে এমনকি তাদের আবেদন সঠিকভাবে বিবেচিত হওয়ার আগেই আটকে যেতে পারে। এসাইলাম অফিসার এবং ইমিগ্রেশন ল’ইয়ারদের কাছে সরবরাহ করা এই রহস্যময় লেসন প্ল্যান ট্রাম্পের এক্সিকিউটিভ অর্ডার এবং এর ইমপ্লিমেন্টেশন গাইন্ডেন্সের হৈচৈয়ের আড়ালে চাপা পড়ে গেছে। কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ এই পরিবর্তনটি ব্যাপকভাবে প্রচারিত না হলেও ইমিগ্রেশন কৌশলিরা বলছেন, এসাইলামের আবেদন কিভাবে পর্যালোচনা করা হবে সে ব্যাপারে এবং পরবর্তীতে যুক্তরাষ্ট্রে এসাইলাম আবেদন করতে ইচ্ছুকদের ক্রমবর্ধমান সংখ্যা রোধ করতে এই প্ল্যান ভুমিকা রাখবে। এতে নতুন আইন প্রবর্তনেরও প্রয়োজন নেই। ইউএসসিআইএস এর সাবেক পরিচালক লিয়ন রড্রিগুয়েজ বলছেন, ‘এটা একটা স্পষ্ট বার্তা যে আমরা আরো কঠোর হতে চাই। আমি মনে করি, এসাইলাম অফিসাররা এর অন্তর্নিহিত উদ্দেশ্য ভালো করেই বুঝতে পারবেন।’
সহিংসতার শিকার হয়েছেন এমন অভিবাসী নারী এবং শিশুদের অধিকার নিয়ে কাজ করে এরকম একটি সংস্থা তাহিরী জাস্টিস সেন্টার। এই সংস্থাটি আমেরিকান ইমিগ্রেশন লইয়ারস এসোসিয়েশনের ন্যাশনাল এসাইলাম কমিটির সদস্য। তাহিরী জাস্টিস সেন্টারের পলিসি এন্ড প্রোগ্রামস-এর চিফ আরচি পিয়াতি মনে করেন, এই পরিবর্তনের কারণে সহিংসতার শিকার হলে যারা ইমিগ্রেশন এন্ড ন্যাশনালিটি অ্যাক্ট এর ধারা ১০১ (এ) (৪২) এর আওতায় রিফিউজির সংজ্ঞাভুক্ত হবেন তারাও তাদের আইনজীবী, কাউন্সেলর অথবা জাজের মুখোমুখি হওয়ার আগেই অনায্যভাবে এসাইলামের আবেদন গ্র্যান্ট হওয়া থেকে বঞ্চিত হবেন। প্রচলিত আইনে যখন কেউ যুক্তরাষ্ট্রে ভিসা ছাড়া প্রবেশের সময় অথবা ভিসা নিয়ে প্রবেশের পর দাবি করেন যে সে পারসিকিউশন অথবা টর্চার এর শিকার হয়েছেন এবং বাঁচার জন্য ইউএসএতে এসেছেন তখন ওই ব্যক্তি এসাইলামের আবেদন করতে পারেন। কোন ব্যক্তি এসাইলাম পাওয়ার যোগ্য কিনা সে ব্যাপারে যদিও শেষ পর্যন্ত একজন ইমিগ্রেশন জাজ সিদ্ধান্ত নেন কিন্তু প্রথম ধাপে একজন এসাইলাম অফিসার আবেদনকারীর ইন্টারভিউ করেন এবং নির্ধারণ করেন আবেদনকারীর কোন ‘নির্যাতন অথবা নিপীড়নের বিশ্বাসযোগ্য ভীতি’ (ক্রেডিবল ফিয়ার অফ পারসিকিউশন অব টর্চার) রয়েছে কিনা। এই পরিবর্তনের আগের ভার্সনের লেসন প্ল্যানে ছিলÑ যদি একজন এসাইলাম অফিসারের কোন আবেদনকারীর বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে যুক্তিসঙ্গত সন্দেহ (রিজনেবল ডাউট) থাকে তাহলে তিনি ওই আবেদন পুর্ন শুনানীর জন্য ইমিগ্রেশন জাজ এর কোর্টে রেফার করবেন। নতুন লেসন প্ল্যানে এই বিধান তুলে দেয়া হয়েছে।
ক্রেডিবিলিটি যাচাইয়ের প্রক্রিয়ায় এতদিন আবেদনকারীর হাবভাব, অকপটতা এবং সংবেদনশীলতা (ডেমিনর, ক্যানডর এন্ড রেস্পন্সিভনেস) অনেক গুরুত্ব পেত। এসাইলাম অফিসাররা এটা স্বীকার করতেন যে আবেদনকারীর ডেমিনর, ক্যানডর এন্ড রেস্পন্সিভনেস তার সাংস্কৃতিক আবহ, বিদেশে অবস্থান করা, দেশে ফেলে আসা দুঃস্বপ্ন, দীর্ঘ ভ্রমণ কিংবা ভাষাগত দুর্বলতা দ্বারা প্রভাবিত হতে পারে। কিন্তু নতুন লেসন প্ল্যানে এই বিষয়গুলোকে ‘তাৎপর্যপূর্ণ প্রভাব’ (সিগনিফিক্যান্ট ফ্যাক্টর) হিসেবে চিহ্নিত করা হয়নি। যে কারণে এসাইলাম অফিসাররা আবেদনকারীর ক্রেডিবিলিটির ব্যাপারে সন্দেহ পোষণ করার আইনগত ভিত্তি পেয়ে যাচ্ছেন। এ কারণে আইনজীবীর সহায়তায় ইমিগ্রেশন জাজ এর মুখোমুখি হওয়ার আগেই ‘ক্রেডিবল ফিয়ার’ নেই মর্মে যে রায় এসাইলাম অফিসার কর্তৃক পেয়ে যাচ্ছেন তাকে ওয়াশিংটন ইউনিভার্সিটির আইনের অধ্যাপক স্টিফেন লেগমস্কি ‘কম নিয়ন্ত্রণমূলক বিশ্বাসযোগ্য ভয় সীমারেখা’ (লেস রেস্ট্রিক্টিভ ক্রেডিবল ফিয়ার থ্রেশোল্ড) নীতির সমর্থকরা প্রকৃতই মৃত্যুভয় ও সহিংসতার শিকার হওয়াদের প্রতি অবিচার হিসেবে চিহ্নিত করছেন।
অন্যদিকে, কনজারভেটিভ ইমিগ্রেশন পিলিসি সেন্টার এর পরিচালক জেসিকা ভন এই পরিবর্তনকে সাধুবাদ জানিয়েছেন। তার দৃষ্টিতে এটি অবৈধ ও অযোগ্য এসাইলাম আবেদনকারীদের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের এসাইলামের গোটা ব্যবস্থাটির অখন্ডতা পুনরুদ্ধার করবে। তিনি বলেন, ‘এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ কেননা সাম্প্রতিক সময়ের পুরো সিস্টেম এসাইলাম আবেদনকারীর জন্য সহায়ক ছিল এবং এসালাইমের আবেদন রিজেক্ট করা এসাইলাম অফিসারের জন্য অনেক কঠিন হয়ে পড়েছিল। গত পাঁচ ছয় বছরে তাই এসাইলামের আবেদন এমন উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছিল যে, দেখে মনে হচ্ছিল লোকেরা খুবই সহনশীল একটা ব্যবস্থার ফায়দা লুটছে।’
এছাড়া এ বছরের ২০ ফেব্রুয়ারি ডিপার্টমেন্ট অব হোমল্যান্ড সিকিউরিটির বর্তমান সেক্রেটারি জন কেলি ‘ইমপ্লিমেন্টিং দ্য প্রেসিডেন্টস বর্ডার সিকিউরিটি এন্ড ইমিগ্রেশন এনফোর্সমেন্ট ইম্প্রুভমেন্ট পলিসি’ এবং ‘এনফোর্সমেন্ট অব দ্য ইমিগ্রেশন ল টু সার্ভ দ্য ন্যাশনাল ইন্টারেস্ট’ নামে দুটি মেমোরেন্ডাম ইউএসসিআইএস, সিবিপি ও আইসিই এর অফিসারদের উদ্দেশ্যে জারি করেছেন সেখানেও অধিকতর কঠোর এসাইলাম প্রক্রিয়ার কথা জোর দিয়ে বলা হয়।
লেখক: ব্যারিস্টার-এট-ল, নিউইয়র্ক।
- দুই তরুণী রোগীকে যৌন নিপীড়নের অভিযোগ; নিউইয়র্কে বাংলাদেশি-আমেরিকান চিকিৎসক ডা. ফজলুল ইউসুফ গ্রেপ্তার, জামিনে মুক্ত
- বাংলাদেশে বীর মুক্তিযোদ্ধা মানিক পশারীর দাফনে বাধার প্রতিবাদ, ‘শিখা অনির্বাণ’ প্রজ্জ্বলিত রাখার দাবি নিউইয়র্কে
- শান্তি প্রতিষ্ঠায় সিদ্ধান্ত গ্রহণের সব পর্যায়ে নারীর অংশগ্রহণ জরুরি: জাতিসংঘে বাংলাদেশের স্থায়ী প্রতিনিধি আইরিন খান
- নিউইয়র্কে বাংলাদেশ সোসাইটির প্রচার সম্পাদক রিজুর পিতার ইন্তেকাল
- যুক্তরাষ্ট্রের ডিভি লটারি ফের স্থগিত, নিম্ন আদালতের আদেশে আপিল আদালতের বাধা
- যুক্তরাষ্ট্রে ডেলাইট সেভিং টাইমের অবসান, ১ নভেম্বর ঘড়ির কাঁটা এক ঘণ্টা পেছাবে
- নিউইয়র্কে ন্যাশনাল ইমিগ্র্যান্টস ডে উদ্যাপন; বিভিন্ন ক্ষেত্রে অবদানের স্বীকৃতি, সাত বিশিষ্ট ব্যক্তিকে সম্মাননা প্রদান
- জাতিসংঘে বাংলাদেশের কূটনৈতিক সাফল্য; এলডিসি উত্তরণের প্রস্তুতিকাল বাড়ল আরও ৩ বছর