একটি সমীক্ষা: পুরুষ কেন সহিংস হয়?
মানসুরা হোসাইন : হয়তো ছোটবেলায় চোখের সামনে দেখেছে মা-বাবার বিরোধ কিংবা বাবার দ্বিতীয় বিয়ে। সহিংসতা আর নির্যাতনের চিত্র দেখা শৈশবজুড়েই। নিজেও হয়তো হয়েছে নির্যাতনের শিকার। ধীরে ধীরে বড় হওয়া…। অতঃপর নিজের আচরণেই সেই প্রকাশ।শৈশবের সহিংস অভিজ্ঞতা পুরুষকে নারীর প্রতি সহিংস আচরণ করতে উদ্বুদ্ধ করে।
নারীপক্ষের ‘বাংলাদেশে নারীর প্রতি সহিংসতা: পুরুষ অপরাধীর জীবন অভিজ্ঞতা’ শীর্ষক এক সমীক্ষায় এ চিত্র পাওয়া গেছে। সমীক্ষায় কিছু গতানুগতিক ধারণাও উঠে এসেছে। যেমন, পুরুষ নারীর চেয়ে শ্রেষ্ঠ। এই শ্রেষ্ঠত্ব প্রতিষ্ঠা করার জন্য নারীকে শারীরিক নির্যাতন করা। এ ছাড়া নারীরা তাঁর স্বামীর দাসী। তাঁরা শ্বশুরবাড়ি আসেন সবাইকে সেবা করার জন্য। সুতরাং তাঁর প্রতি যেকোনো ব্যবহার তাঁকে সহ্য করতে হবে।
নারীসংগঠন ‘নারীপক্ষ’ ১৯৯৭ সালে বাংলাদেশে নারীর প্রতি সহিংসতা-বিষয়ক একটি গবেষণা করে। পরে আরও গবেষণার প্রয়োজন দেখা দিলে নারীর প্রতি সহিংসতা রোধে রাষ্ট্রীয় কর্মকাণ্ডের পরিবীক্ষণ প্রকল্পের অধীনে সহিংস আচরণকারী পুরুষের অভিজ্ঞতা, সহিংস আচরণের কারণ এবং কীভাবে সহিংস আচরণের ইচ্ছা সৃষ্টি হয়েছে তা অনুসন্ধান করার জন্য বর্তমান গবেষণাটি করা হয়। এ গবেষণায় সহিংস আচরণকারী পুরুষদের মনের ভাব অনুসন্ধান করেছেন মনোবিজ্ঞানীরা। নারীপক্ষের নারীর প্রতি সহিংসতা রোধে রাষ্ট্রীয় কর্মকাণ্ড পরিবীক্ষণ প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালক ও এই সমীক্ষার সমন্বয়কারী রীতা দাশ রায় প্রথম আলোকে বলেন, এ সমীক্ষায় নারী নির্যাতন নিয়ে সমাজের যে বদ্ধমূল কিছু ধারণা আছে, সেগুলোই নির্যাতনকারীদের মুখ থেকে জানা গেছে। সমীক্ষায় একেবারেই নতুন কিছু বেরিয়ে এসেছে, তা নয়। তবে সমীক্ষার পর মনে হয়েছে, শিশুদের প্রাক-প্রারম্ভিক শিক্ষাসহ নৈতিক শিক্ষার ওপর বেশি গুরুত্ব দিতে হবে। এ ছাড়া এ ধরনের বাস্তবতায় পরবর্তী সময়ে নারী নির্যাতন প্রতিরোধে কী ধরনের কর্মসূচি নিতে হবে, তা এ সমীক্ষা থেকে বের করা সহজ হবে।
সমীক্ষায় নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন ২০০০-এ (২০০৩-সংশোধন) যারা সহিংস আচরণের জন্য সাজাপ্রাপ্ত, ওই ধরনের ১৮ জন এবং নির্যাতন করার পর কোনো সংগঠনের কাছে সেবা পাওয়ার জন্য এসেছেন, এ ধরনের স্বঘোষিত ১৩ জন পুরুষের সাক্ষাৎকার নেওয়া হয়।
সমীক্ষা অনুযায়ী, ৩১ জনের মধ্যে নয়জনই বলেছেন, বউ বা অন্যরা রাগ দেখালে তখন তাঁরা তাঁদের পেটাতেন। নারীরা প্রেম, যৌন চাহিদার মতো কোনো চাহিদা মেটাতে না পারলে তাঁদের নির্যাতন করতেন, এমনকি ‘এ কারণে’ তাঁদের ওপর এসিড নিক্ষেপ করা যায়, এ ধরনের মনোভাব ছিল পাঁচজনের। সাতজনেরই শৈশবে নির্যাতন ভোগ করার ইতিহাস ছিল। পাঁচজনের মত ছিল, নিজের ইচ্ছা পূরণের জন্য প্রয়োজন হলে পরিবারের সদস্যদের পেটানো যায়। বউ পেটানো একজন নির্যাতকের বক্তব্য ছিল, ‘সে আমার সম্পত্তি। তাই আমি যা খুশি তা-ই করতে পারি। আমি জানি, এত কিছু করার পরও সে আমাকে ছেড়ে অন্য কোথাও যাবে না।’ আরেক জনের বক্তব্য ছিল, ‘অবাধ্য স্ত্রীকে পেটানো জায়েজ।’ অনেকে শুধু নারীদের ওপর নেতিবাচক মনোভাবের কারণে নির্যাতন করেছেন বলে জানান। ৩১ জনের মধ্যে চারজন চরম দারিদ্র্যের কারণে নির্যাতন করতেন বলে জানান। একই কারণে যৌতুকের জন্যও নির্যাতনের ঘটনা ঘটেছে। মাদকাসক্ত হয়ে পড়ার কারণেও অনেকে নির্যাতন করতেন বলে জানান সমীক্ষায়।
গতানুগতিক ধারণা পুনঃপ্রতিষ্ঠিত: নারীকে দোষী সাব্যস্ত করে এবং তাঁদের সংশোধন করার জন্য সহিংসতাকারী সহিংস আচরণ করেন।
এ ছাড়া এ সমীক্ষায় অংশ নেওয়া পুরুষদের বক্তব্য অনুযায়ী, নির্যাতক নয়, ঘটনার জন্য নারী, সমাজ, বাবা বা মা দায়ী ছিলেন। পরিবার ও প্রতিবেশীদের থেকে তাঁদের মধ্যে এই বিশ্বাস জন্মেছে, তিনি যদি তাঁর স্ত্রীকে না পেটান, তবে তিনি পুরুষ মানুষ নন। পুরুষের অধিকার, সুবিধাভোগ, গতানুগতিক বিশ্বাস চ্যালেঞ্জ করলে নারীকে নির্যাতন করা যায়। এ ছাড়া অসহনীয় অনুভূতি থেকে পুরুষ নিজেকে বাঁচানোর জন্য বাড়িতে নারীর ওপর অত্যাচার করেন, তিনি মনে করেন, তিনি একেবারে অক্ষম বা অসমর্থ নন। সংসারে যেহেতু পুরুষ সবার মুখে খাবার জোগান, সেহেতু তাঁর যেকোনো ধরনের আচরণ করার অধিকার আছে। মেয়েদের এ জন্য ধৈর্য থাকা দরকার এবং অত্যাচার সহ্য করা উচিত।
ভালোবাসা এবং সেবা দিয়ে নারীরা বিপথগামী পুরুষকে পথে আনতে পারেন। সুতরাং পুরুষকে সংশোধন করা নারীর দায়িত্ব।
প্রত্যাখ্যান, বিশ্বাসঘাতকতা পুরুষ সহ্য করতে পারেন না, তাই পুরুষ প্রতিশোধপরায়ণ হয়ে পড়েন এবং নারীর প্রতি সহিংস আচরণ করেন। নেশাগ্রস্ত হয়েও পুরুষ সহিংস আচরণ করে থাকেন।
নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন ট্রাইব্যুনাল ২০০৩-এর অধীনে রংপুর ও ফরিদপুর জেলখানার মামলার সাজাপ্রাপ্ত আসামি এই ১৮ জনের মধ্যে নয়জন ধর্ষণ, তিনজন অপহরণ, দুজন এসিড নিক্ষেপ ও চারজন যৌতুকের মামলায় সাজাপ্রাপ্ত হন। ২০-৫০ বছরের মধ্যে এঁদের মধ্যে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা ছিল ১৭ জনের। সাক্ষর ছিলেন একজন। এঁদের মধ্যে চারজনের আর্থিক অবস্থা ভালো ছিল। অন্যরা নিম্ন ও নিম্ন-মধ্যবিত্ত পরিবারের ছিলেন। অন্যদিকে ১৩ জন স্বঘোষিত পারিবারিক সহিংসতাকারীর মধ্যে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা ছিল সাতজনের। সাক্ষর ছিলেন ছয়জন। এঁরা সবাই ছিলেন নিম্ন-মধ্যবিত্ত পরিবারের সদস্য। বয়স ছিল ২১ থেকে ৮০ বছরের মধ্যে। সহিংস আচরণ করেছেন এমন দুজন পুরুষ ব্যক্তির ওপর ২০০৮ সালে যে প্রশ্নপত্র ব্যবহার করা হয়, পরে সে প্রশ্নপত্রটিই অভিজ্ঞ গবেষকদের মতামতের ভিত্তিতে সংশোধন ও চূড়ান্ত করে বর্তমান গবেষণায় ব্যবহার করা হয়।
গবেষণায় সাজাপ্রাপ্ত আসামিদের সঙ্গে জেলখানার ভেতরে সাক্ষাৎকার নেওয়া হয়েছে। সাক্ষাৎকার গ্রহণের সময় কমপক্ষে এক থেকে তিন ঘণ্টা স্থায়ী ছিল। প্রত্যেক অংশগ্রহণকারীর সঙ্গে তিন থেকে সাতটি সেশন করা হয়। প্রথম আলো
- ওয়ার্ল্ড হিউম্যান রাইটস ডেভেলপমেন্ট ইউএসএর সাধারণ সম্পাদক ড. সাদিয়া আফরিন এরা
- চরমোনাই পীরের যুক্তরাষ্ট্র সফর উপলক্ষে নিউইয়র্কে দোয়া মাহফিল, কুরআন-সুন্নাহর আলোকে বয়ান
- New York Attorney General James Secures Reimbursements for T-Mobile Customers Whose Rates Were Unjustly Raised
- নিউইয়র্কে বাংলাদেশ সোসাইটির নির্বাচনে কুনু-ফিরোজ পরিষদের সাত দফা ইশতেহার ঘোষণা; কমিউনিটি সেন্টার প্রতিষ্ঠা, সাশ্রয়ী ফিউনারেল সেবা, বিমানের সরাসরি ফ্লাইট ও আর্থিক স্বচ্ছতায় অঙ্গীকার
- ফিলিস্তিনিদের আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকারের প্রতি বাংলাদেশের পূর্ণ সমর্থন: জাতিসংঘে রাষ্ট্রদূত আইরিন খান
- নিউইয়র্কে বাংলাদেশ সোসাইটির নির্বাচনে প্রথমবারের মতো বিতর্ক, গুরুত্ব পেল স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি
- New York Attorney General James Warns New Yorkers About AI-Generated Election Misinformation Ahead of November Elections
- Bangladesh calls for global treaty to protect victims of crimes against humanity