Tuesday, 21 July 2026 |
শিরোনাম
Road Transport Minister reaffirms Bangladesh’s commitment to halving road traffic deaths by 2030 বাংলাদেশে ২০৩০ সালের মধ্যে সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণহানি অর্ধেকে নামিয়ে আনার অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রীর ধুমকেতু ছিনিয়ে নেয় সম্মোহনী টিয়েম্পো: ইয়ামালের উদ্দেশ্যে ফুটবল পদাবলি Dr. Titumir calls for UN-led debt relief mechanism to safeguard investment in children and women Commerce Minister meets ECOSOC President and Vice-President to advance Bangladesh’s smooth LDC graduation নিউইয়র্কে ইকোসকের সভাপতি ও সহ-সভাপতির সঙ্গে বাণিজ্যমন্ত্রী মুক্তাদিরের বৈঠক: এলডিসি উত্তরণে আন্তর্জাতিক সমর্থন জোরদারের আহ্বান শিশু ও নারীর কল্যাণে বিনিয়োগ সুরক্ষায় ঋণসংকট মোকাবিলায় জাতিসংঘের নেতৃত্বে আন্তর্জাতিক ব্যবস্থা গড়ে তোলার আহ্বান ড. তিতুমীরের বাংলাদেশ মুক্তিযোদ্ধা সংসদ নিউইয়র্ক স্টেট কমান্ড ইউএসএ’র সাবেক কোষাধ্যক্ষ বীর মুক্তিযোদ্ধা মজিবের আত্মার মাগফিরাত কামনায় দোয়া ও স্মরণ সভা Trump Admin Rescinds Public Charge Rule BOROUGH PRESIDENT GIBSON ANNOUNCES SIGNIFICANT INVESTMENTS IN THE BRONX
সব ক্যাটাগরি

ইব্রাহীম চৌধুরী খোকনের প্রান্তরে পান্থজন : ভ্রমণ, অন্তর্জাত্রা ও প্রবাসী চেতনার মায়াময় পাঠ

অনলাইন ডেস্ক পঠিত: 181 বার

প্রকাশিত: March 24, 2026 | 11:45 PM

মিহিরকান্তি চৌধুরী : বাংলা ভ্রমণসাহিত্যের দীর্ঘ ঐতিহ্যে একদিকে যেমন পথের বর্ণনা, প্রকৃতির চিত্ররূপ এবং ইতিহাসের সংমিশ্রণ দেখা যায়, অন্যদিকে কিছু কিছু গ্রন্থ সেই সীমা অতিক্রম করে হয়ে ওঠে মানুষের অন্তর্জগতের দলিল। ইব্রাহীম চৌধুরী খোকনের প্রান্তরে পান্থজন সেই দ্বিতীয় ধারার একটি উল্লেখযোগ্য সংযোজন—যেখানে পথ শুধু বাহ্যিক নয়, বরং অন্তর্মুখীও; প্রান্তর শুধু ভৌগোলিক নয়, বরং মানসিকও। এই মানসিক প্রান্তরে লেখক স্পর্শ করেন স্মৃতি, নস্টালজিয়া, পরিচয়ের টানাপোড়েন এবং প্রবাসী জীবনের সূক্ষ্ম অনিশ্চয়তা, যা পাঠককে গভীরভাবে ভাবায়।
গ্রন্থটির নামেই নিহিত আছে এক ধরনের দ্বৈততা ও কৌতূহল—‘প্রান্তর’ এবং ‘পান্থজন’। পাঠের শুরুতেই স্পষ্ট হয়, এই প্রান্তর আসলে উত্তর আমেরিকার বিস্তৃত ভূখণ্ড—যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডা। আর পান্থজন? তিনি একক কোনো চরিত্র নন; তিনি লেখক নিজে, তাঁর সহযাত্রী, প্রবাসী বাঙালি, এমনকি পাঠকও। এই বহুমাত্রিক ‘পান্থজন’-এর মধ্য দিয়েই লেখক নির্মাণ করেছেন এক জীবন্ত অভিজ্ঞতার জগৎ, যেখানে প্রত্যেকেই নিজের প্রতিচ্ছবি খুঁজে পেতে পারে এবং নিজের যাত্রাকেও নতুন করে চিনতে শেখে।
ভ্রমণ থেকে অন্তর্জাত্রা : আখ্যানের নির্মাণশৈলী
গ্রন্থের প্রথম অধ্যায়েই যে বাসযাত্রার বর্ণনা পাওয়া যায়—নিউ জার্সি থেকে ডেট্রয়েট পর্যন্ত দীর্ঘ ষোলো ঘণ্টার পথ—তা নিছক ভ্রমণবৃত্তান্ত নয়। বরং এটি এক ধরনের অস্তিত্ববাদী অভিজ্ঞতা, যেখানে যাত্রাপথ ধীরে ধীরে রূপ নেয় আত্মঅন্বেষণের পরিসরে। বাসের জানালার বাইরে দৃশ্য যেমন বদলায়—আলো থেকে অন্ধকার, শহর থেকে জনশূন্য পথ—তেমনি লেখকের ভেতরের চিন্তাজগতও স্তরে স্তরে রূপান্তরিত হয়। বাহ্যিক গন্তব্যের পাশাপাশি অন্তর্গত গন্তব্যও এখানে সমান গুরুত্ব পায়।
এখানে দেখা যায়, লেখক লিখছেন—জীবন যেন একটি বাসযাত্রা, যার শুরু জানা, কিন্তু শেষ কোথায় তা অনিশ্চিত। এই উপমাটি পুরো গ্রন্থের এক কেন্দ্রীয় রূপক হিসেবে কাজ করে এবং পাঠককে ভাবনার গভীরে নিয়ে যায়। প্রতিটি স্টেশন, প্রতিটি বিরতি, প্রতিটি সহযাত্রী যেন জীবনের একেকটি অনুষঙ্গ—কখনো স্মৃতি, কখনো অনিশ্চয়তা, কখনো বা ক্ষণিকের সম্পর্কের উষ্ণতা। এই রূপকধর্মিতা আখ্যানকে দিয়েছে এক দার্শনিক গভীরতা।
বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য ‘হ্যারিসবার্গের হলুদ আলোতে আত্মপরিচয়ের ছায়া’ অংশটি। এখানে লেখক শুধু একটি শহরের বর্ণনা দেননি, বরং আধুনিক পশ্চিমা সমাজে পরিচয় সংকট, নিরাপত্তাহীনতা এবং সামাজিক বিভাজনের সূক্ষ্ম প্রশ্ন তুলেছেন। প্রবাসী জীবনের অভিজ্ঞতায় তিনি উপলব্ধি করেন—পরিচয় কেবল পাসপোর্টে সীমাবদ্ধ নয়, বরং তা ভাষা, সংস্কৃতি, চেহারা ও মানসিকতার জটিল সমন্বয়। একজন প্রবাসী হিসেবে তাঁর আত্মসচেতনতা, তাঁর ভেতরের দ্বিধা ও অনিশ্চয়তা—এসবই অত্যন্ত সংবেদনশীল ভঙ্গিতে ফুটে উঠেছে, যা পাঠককে গভীরভাবে নাড়া দেয়।
প্রবাসজীবনের নান্দনিকতা ও বাস্তবতার দ্বন্দ্ব
“প্রান্তরে পান্থজন”–এর অন্যতম শক্তি হলো প্রবাসজীবনের দ্বৈত চিত্র তুলে ধরা। একদিকে আছে প্রবাসীদের সাংস্কৃতিক টান, ভাষার প্রতি মমতা, আত্মপরিচয়ের সন্ধান; অন্যদিকে আছে বাস্তব জীবনের কঠিনতা, একাকিত্ব, আর্থিক চাপ ও অনিশ্চয়তা। এই দুই বিপরীত স্রোতের সংঘাতে গড়ে ওঠে প্রবাসী জীবনের প্রকৃত রূপ—যেখানে স্বপ্ন ও সংগ্রাম পাশাপাশি হাঁটে।
মিশিগানের অধ্যায়ে লেখক দেখিয়েছেন, কীভাবে বাঙালি অভিবাসীরা নিজেদের শ্রম, মেধা ও সংগ্রামের মাধ্যমে একসময় ভেঙে পড়া শহরকে নতুন করে প্রাণ দিয়েছে। ডেট্রয়েট, হ্যামট্রামিক বা ট্রয়ের মতো শহরগুলোতে গড়ে উঠেছে এক নতুন ‘বাংলাদেশ’। এখানে শুধু অর্থনৈতিক সাফল্য নয়, রয়েছে স্মৃতি, ইতিহাস এবং আত্মপরিচয়ের পুনর্গঠন; রান্নাঘরের গন্ধ, ভাষার টান এবং উৎসবের উচ্ছ্বাস মিলিয়ে তৈরি হয়েছে এক স্বদেশী আবহ।
অন্যদিকে কানাডার প্রেক্ষাপটে লেখক তুলে ধরেছেন এক ভিন্ন বাস্তবতা—উচ্চ জীবনযাত্রার খরচ, চাকরির অনিশ্চয়তা এবং প্রবাসীদের হতাশা। “কানাডা তার আপনজন ধরে রাখতে পারছে না”—এই পর্যবেক্ষণ শুধু একটি দেশের অর্থনৈতিক চিত্র নয়, বরং এক বৃহত্তর অভিবাসন-বাস্তবতার প্রতিচ্ছবি, যেখানে স্বপ্নের দেশও কখনো কখনো হয়ে ওঠে কঠিন পরীক্ষার মঞ্চ।
গদ্যের স্বাদ : কাব্যিকতা ও কথ্যতার মেলবন্ধন
ইব্রাহীম চৌধুরীর গদ্যের সবচেয়ে বড়ো বৈশিষ্ট্য হলো তার কাব্যিকতা। তিনি কেবল বর্ণনা করেন না, তিনি দৃশ্য নির্মাণ করেন—শব্দের মাধ্যমে যেন একেকটি দৃশ্যপট চোখের সামনে ভেসে ওঠে। তাঁর বাক্যে আছে সংগীতের ছন্দ, স্মৃতির আবেশ এবং কথোপকথনের স্বাভাবিকতা; ফলে গদ্য কখনোই ভারী মনে হয় না, বরং স্বতঃস্ফূর্ত প্রবাহে এগিয়ে চলে। এই মেলবন্ধন পাঠককে একাধারে ভাবায়, আবার আপন করে নেয়।
যেমন, বাসযাত্রার এক অংশে তিনি লিখছেন—রাত, সহযাত্রীদের ঘুম, জানালার বাইরের অন্ধকার—সব মিলিয়ে যেন এক থিয়েটার, যেখানে প্রত্যেকে আলাদা চরিত্র। এই চিত্রকল্প পাঠককে শুধু দৃশ্য দেখায় না, বরং সেই নীরবতার গভীরতাও অনুভব করায়।
আবার ‘সাওয়ার পাম’-এর প্রসঙ্গে শৈশবের বরইয়ের স্মৃতি টেনে আনা—এ এক অনন্য নস্টালজিক মুহূর্ত। এখানে একটি বিদেশি ফল হয়ে ওঠে দেশজ স্মৃতির প্রতীক, যা প্রবাসী মননের আবেগকে আরও তীব্র করে তোলে। এই ধরনের সূক্ষ্ম, মানবিক ও অনুভবনির্ভর পর্যবেক্ষণই বইটিকে করে তোলে জীবন্ত, আন্তরিক এবং দীর্ঘস্থায়ী প্রভাবসঞ্চারী।
মানুষের গল্প : এই গ্রন্থের প্রকৃত কেন্দ্র
এই বইয়ের সবচেয়ে বড়ো শক্তি এর মানুষজন। লেখক কোথাও স্থাপত্য, শহর বা প্রকৃতিকে এককভাবে গুরুত্ব দেননি; বরং প্রতিটি স্থানের কেন্দ্রে রেখেছেন মানুষকে—তাদের জীবন, অভ্যাস, অনুভূতি ও নীরব সংগ্রামকে। ফলে ভ্রমণ এখানে দৃশ্যের নয়, মানুষের অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে অর্থবহ হয়ে ওঠে।
বাসস্টেশনের কৃষ্ণাঙ্গ বৃদ্ধা, ল্যাপটপে ডুবে থাকা তরুণী, প্রেমিক-প্রেমিকা, কিংবা একাকী প্রৌঢ়—এইসব চরিত্রগুলো খুব অল্প কথায় জীবন্ত হয়ে ওঠে। তারা যেন বিশ্বমানবতার প্রতীক—পরিচয়হীন, তবুও অদ্ভুতভাবে ঘনিষ্ঠ। লেখকের পর্যবেক্ষণ এত সূক্ষ্ম যে, পাঠক সহজেই তাদের মুখ, ভঙ্গি, এমনকি নীরবতাও অনুভব করতে পারে।
একইভাবে মিশিগানে প্রবাসী বাঙালিদের সঙ্গে সাক্ষাৎ, রানার পরিবারের আন্তরিক আতিথেয়তা, কিংবা টরন্টোর আড্ডার প্রাণবন্ত পরিবেশ—সবকিছুই মানবিক উষ্ণতায় ভরপুর। এইসব মুহূর্তে লেখক যেন পাঠককে পাশে বসিয়ে গল্প বলেন, দূরত্ব ঘুচিয়ে দেন সহজ, আত্মীয়সুলভ ভাষায়।
সাংস্কৃতিক সেতুবন্ধন : ভাষা, সাহিত্য ও উৎসব
টরন্টোর বঙ্গ সম্মেলন এবং প্রবাসী সাহিত্যচর্চার বর্ণনা এই গ্রন্থের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক। এখানে লেখক দেখিয়েছেন, প্রবাসে থেকেও কীভাবে মানুষ ভাষা ও সংস্কৃতির সঙ্গে গভীর সংযোগ বজায় রাখে—আয়োজন, আড্ডা ও চর্চার মাধ্যমে নিজেদের শিকড়কে জীবিত রাখে।
টরন্টো শহরটি তাঁর চোখে হয়ে ওঠে এক বহুভাষিক, বহুসাংস্কৃতিক মেলবন্ধনের স্থান, যেখানে ভিন্ন ভাষা ও সংস্কৃতি পাশাপাশি সহাবস্থান করে। ‘Toronto International Festival of Authors’-এর প্রসঙ্গ তুলে তিনি দেখিয়েছেন, বাংলা সাহিত্যও এখন বিশ্বমঞ্চে নিজের স্বতন্ত্র অবস্থান তৈরি করছে।
বঙ্গ সম্মেলনের বর্ণনায় যে আবেগ, যে আন্তরিকতা ও মিলনের আনন্দ ফুটে ওঠে, তা প্রমাণ করে—প্রবাসে বাংলা ভাষা কেবল স্মৃতির আশ্রয় নয়, বরং একটি জীবন্ত, গতিশীল ও সৃজনশীল চর্চা, যা মানুষকে একসূত্রে বেঁধে রাখে।
লেখকের ব্যক্তিত্বের প্রতিফলন
ইব্রাহীম চৌধুরী খোকনের দীর্ঘ সাংবাদিকতা ও রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা তাঁর লেখাকে দিয়েছে এক বিশেষ গভীরতা। তিনি কেবল পর্যটক নন, তিনি একজন তীক্ষ্ণ পর্যবেক্ষক—যিনি দৃশ্যের আড়ালে থাকা বাস্তবতাকে ধরতে পারেন। তাঁর চোখে ধরা পড়ে সমাজের অন্তর্গত টানাপোড়েন, মানুষের মানসিকতা, রাষ্ট্রীয় নীতির সূক্ষ্ম প্রভাব এবং সময়ের নীরব পরিবর্তন।
গ্রামের জীবন থেকে শুরু করে আন্তর্জাতিক প্রবাসজীবন—এই বিস্তৃত অভিজ্ঞতা তাঁর লেখাকে করেছে বহুমাত্রিক ও পরিপক্ব। তাঁর লেখায় যেমন আছে স্মৃতির কোমলতা, তেমনি আছে বিশ্লেষণের দৃঢ়তা; যেমন আছে আবেগের উষ্ণতা, তেমনি আছে বাস্তবতার নির্মোহ ও নির্ভীক উপস্থাপন। ফলে তাঁর গদ্য একাধারে হৃদয়গ্রাহী ও চিন্তাপ্রবণ হয়ে ওঠে।
দার্শনিকতা : যাত্রা বনাম গন্তব্য
এই গ্রন্থের একটি গুরুত্বপূর্ণ দার্শনিক উপপাদ্য হলো—গন্তব্যের চেয়ে যাত্রাই বড়ো। লেখক বারবার দেখিয়েছেন, মানুষের জীবনে প্রকৃত অভিজ্ঞতা গন্তব্যে নয়, বরং পথ চলার ভেতরেই সঞ্চিত হয়। সেই চলার মধ্যেই তৈরি হয় স্মৃতি, সম্পর্ক, উপলব্ধি এবং আত্মপরিচয়ের নতুন স্তর।
বাসযাত্রা, ট্রেনযাত্রা, স্টেশন, অপেক্ষা—এইসব প্রতীক শুধু ভ্রমণের উপাদান নয়, বরং জীবনের বৃহত্তর অর্থের রূপক। এগুলো মানুষের অনিশ্চয়তা, প্রত্যাশা ও অন্তর্গত যাত্রাকে প্রকাশ করে। শেষ পর্যন্ত মনে হয়, এই বইটি কোনো নির্দিষ্ট গন্তব্যের গল্প নয়; এটি এক চলমান অনুসন্ধানের গল্প, যেখানে পৌঁছানো নয়, চলাটাই মুখ্য।
সাংবাদিকতার দৃষ্টিতে গদ্যের গভীরতা
এই গ্রন্থের ভাষা ও ভাবের গভীরতা নিঃসন্দেহে এর প্রধান আকর্ষণ, আর সেই গভীরতার পেছনে কাজ করেছে লেখকের দীর্ঘ সাংবাদিকতার অভিজ্ঞতা ও তীক্ষ্ণ পর্যবেক্ষণশক্তি। একজন সাংবাদিক হিসেবে ইব্রাহীম চৌধুরী খোকন ঘটনাকে কেবল দেখে যান না; তিনি তার ভেতরের সুর, অন্তর্লীন টানাপোড়েন এবং নীরব সত্যগুলো অনুধাবন করেন। ফলে তাঁর বর্ণনায় প্রতিটি দৃশ্য, প্রতিটি মানুষ, এমনকি প্রতিটি ক্ষুদ্র মুহূর্তও একটি বৃহত্তর বাস্তবতার সঙ্গে সংযুক্ত হয়ে ওঠে।
আত্মমনস্ক অংশগুলোর বিস্তারও এই সাংবাদিকসুলভ গভীর অন্বেষণেরই ফল—যেখানে তিনি কেবল তথ্য দেন না, বরং সেই তথ্যের মানবিক তাৎপর্য খুঁজে দেখেন। দীর্ঘ পথচলার অভিজ্ঞতা তাঁকে শিখিয়েছে মানুষের গল্প শুনতে, নীরবতার ভাষা বুঝতে এবং প্রান্তিক অভিজ্ঞতাকেও কেন্দ্রীয় করে তুলতে। ফলে আখ্যানের প্রবাহে যে ধীরতা ও মননশীলতা তৈরি হয়, তা আসলে এক ধরনের সচেতন নির্মাণ যা পাঠককে তাড়াহুড়া না করে গভীরভাবে উপলব্ধি করতে সাহায্য করে।
এইভাবে তাঁর সাংবাদিকতার মাটি থেকেই গড়ে উঠেছে এই গদ্যের ভেতরের শক্তি—যেখানে তথ্য, অনুভব ও বিশ্লেষণ একত্রে মিশে এক জীবন্ত, বিশ্বাসযোগ্য এবং গভীর সাহিত্যিক অভিজ্ঞতার জন্ম দেয়।
উপসংহার : প্রান্তরের মধ্য দিয়ে মানুষের কাছে ফেরা
প্রান্তরে পান্থজন শেষ পর্যন্ত একটি ভ্রমণকাহিনী নয়; এটি এক মানবিক দলিল। এখানে প্রান্তর মানে দূর দেশ, আবার মানুষের ভেতরের বিস্তৃত শূন্যতাও—যেখানে স্মৃতি, একাকিত্ব এবং আকাঙ্ক্ষা মিলে তৈরি করে এক জটিল মানচিত্র। পান্থজন মানে যাত্রী, আবার অনুসন্ধানী মনও—যে পথ চলতে চলতেই নিজেকে খুঁজে পায়।
ইব্রাহীম চৌধুরী খোকন তাঁর লেখায় দেখিয়েছেন—মানুষ যেখানে যায়, নিজের ভেতরটাকেও সঙ্গে করে নিয়ে যায়। প্রবাসে থেকেও সে দেশ খোঁজে, ভাষা খোঁজে, শিকড় খোঁজে; কখনো স্মৃতির ভেতর, কখনো মানুষের সান্নিধ্যে, কখনো বা নিঃসঙ্গ মুহূর্তে। এই গ্রন্থ পাঠককে শুধু ভ্রমণের আনন্দ দেয় না; তাকে ভাবতে শেখায়, অনুভব করতে শেখায়, নিজের ভেতরে তাকাতে বাধ্য করে।
সব মিলিয়ে, প্রান্তরে পান্থজন সমকালীন বাংলা ভ্রমণসাহিত্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ সংযোজন—যেখানে পথের গল্প, মানুষের গল্প এবং আত্মপরিচয়ের গল্প একাকার হয়ে গেছে। এই বই শেষ করে মনে হয়—আমরাও যেন একেকজন পান্থজন, আর আমাদের জীবনও দীর্ঘ, অনিশ্চিত, অথচ অপূর্ব যাত্রা; যেখানে প্রতিটি বাঁক নতুন কোনো উপলব্ধির দুয়ার খুলে দেয়।
আমি গ্রন্থটির পাঠকপ্রিয়তা কামনা করি।
গ্রন্থ-পরিচিতি : প্রান্তরে পান্থজন — ইব্রাহীম চৌধুরী খোকনের ভ্রমণকাহিনি। প্রকাশকাল: ফেব্রুয়ারি ২০২৬; প্রকাশক: মোস্তফা সেলিম, উৎস প্রকাশন। প্রচ্ছদ: নির্ঝর নৈঃশব্দ; মুদ্রণ: সানজানা প্রিন্টার্স, ৮১/১ নয়াপল্টন, ঢাকা-১০০০। নয়টি অধ্যায়ে ৯৬ পৃষ্ঠার এই গ্রন্থের মূল্য ৩০০ টাকা (১০ মার্কিন ডলার)। উৎসর্গ : সাংবাদিক ও গণমাধ্যম সংগঠক সেলিম খান।
লেখক পরিচিতি : মিহিরকান্তি চৌধুরী, লেখক, অনুবাদক ও নির্বাহী প্রধান, টেগোর সেন্টার, সিলেট।

বিজ্ঞাপন / স্পন্সরড কন্টেন্ট
সর্বশেষ সংবাদ
Situs Streaming JAV