অযোধ্যার বিতর্কিত জমি হিন্দু-মুসলিম দু’পক্ষের,এলাহাবাদ হাইকোর্টের রায়

নুরুল ইসলাম/শাহেদ হোসেন
অবশেষে অযোধ্যার বাবরি মসজিদের বিরোধপূর্ণ জমি তিন ভাগে ভাগ করে দুই ভাগ হিন্দুদের ও এক ভাগ মুসলমানদের দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে ধ্বংসকৃত বাবরি মসজিদের স্থানটিও পেয়েছে হিন্দুরা। গতকাল উত্তর প্রদেশের এলাহাবাদ হাইকোর্টের লক্ষেষ্টৗ বেঞ্চ বিতর্কিত জমিটির মালিকানা নিয়ে ৬০ বছর আগে দায়ের করা মামলার রায়ে এ নির্দেশ দিয়েছেন। এলাহাবাদ হাইকোর্টের তিন বিচারপতি এসইউ খান, সুধীর আগরওয়াল ও ডিবি শর্মা এ রায় দেন। তবে বিচারপতি শর্মা অন্য দুই বিচারপতির সঙ্গে ভিন্নমত পোষণ করে আরও আগ বাড়িয়ে বিরোধপূর্ণ গোটা জমি হিন্দুদের বলে অভিমত ব্যক্ত করেছেন।
এ রায়ের পর এক বিবৃতিতে ভারতের প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিং দেশবাসীকে শান্ত থাকার আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি বলেন, ভারতের জনগণের প্রতি আমার পূর্ণ আস্থা রয়েছে। দেশের ধর্মনিরপেক্ষ ভ্রাতৃত্ব ও সহিষ্ণুতার ঐতিহ্যের প্রতি আমার রয়েছে পূর্ণ আস্থা। ভারতের ক্ষমতাসীন দল কংগ্রেস হাইকোর্টের রায়কে স্বাগত জানিয়ে বলেছেন, এ রায়ে কোনো পক্ষেরই জয়-পরাজয় হয়নি। প্রধান বিরোধী দল বিজেপিসহ ভারতের হিন্দু সম্প্রদায় এ রায়কে স্বাগত জানিয়েছে। দলের সিনিয়র নেতাদের সঙ্গে বৈঠক করে বিজেপি নেতা এলকে আদবানি বলেছেন, এ রায় ভারতের জাতীয় অখণ্ডতার পক্ষে এক নতুন অধ্যায়।
অন্যদিকে হাইকোর্টের রায়ে খুশি হতে পারেননি দিলি্ল জামে মসজিদের ইমাম সৈয়দ আহমেদ বোখারী। তিনি বলেন, সাক্ষ্য প্রমাণ ও দলিলপত্র বিবেচনায় না নিয়ে আদালত শুধু অন্ধ বিশ্বাসের ভিত্তিতেই এই রায় দিয়েছেন। তিনি বলেন, ‘আমরা বাবরি মসজিদ পুনঃনির্মাণের দাবি ত্যাগ করব না।’ গতকাল ‘নো একসেস জোন’ বা প্রবেশ নিষিদ্ধ এলাকা ঘোষণা করে এলাহাবাদ হাইকোর্টে লক্ষেষ্টৗ বেঞ্চের তিন বিচারপতি দুই-এক সংখ্যাগরিষ্ঠতায় এ রায়
প্রদান করেন। রায়ে অযোধ্যায় বাবরি মসজিদ এলাকার ২ দশমিক ৭৭ একর বিরোধপূর্ণ জায়গাকে সমান তিন ভাগে ভাগ করে দু’ভাগ হিন্দুদের দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়। বাকী এক ভাগ দেওয়া হয় মুসলমানদের ।এ অংশের মালিকানা থাকবে মামলার অন্যতম পক্ষ সুনি্ন ওয়াকফ বোর্ডের হাতে।হিন্দুদের দু’ ভাগের মধ্যে এক ভাগ দেয়া হয়েছে হিন্দু মহাসভাকে এবং আরেক ভাগ মামলার অন্যতম পক্ষ স্থানীয় নির্মোহি আখড়াকে। ধ্বংসকৃত ঐতিহাসিক বাবরি মসজিদের স্থান যে এলাকটিকে হিন্দুরা রাম জন্মভ্থমি বলে দাবি করে তার মালিকান চলে গেছে হিন্দুদের হাতে । ১৯৯২ সালে বাবরি মসজিদ ধ্বংস করার পর কট্রর হিন্দুরা সেখানে রাম মুর্তি স্থাপন করে একটি অস্থায়ী মন্দির নির্মান করেছিল। হাইকোর্টের রায়ে গোটা ২ দশমিক ৭৭ একর এলাকার ওপর তিন মাসের স্থিতাবস্থা জারি করে বলা হয়, জায়গাটি সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোকে তিন মাস পর ভাগ করে দেওয়া হবে। এ রায়ের মাধ্যমে ভারতের মুসলমানদের সংগঠন সুনি্ন ওয়াকফ বোর্ড এবং হিন্দুদের সংগঠন নির্মোহি আখড়ার ষাট বছরের পুরনো চারটি মামলার নিষ্পত্তি হলো। বলা যায়, গোটা ২ দশমিক ৭৭ একর জায়গাকে ওয়াকফের জায়গা দাবি করে সুনি্ন ওয়াকফ বোর্ডের করা মামলা এ রায়ের মাধ্যমে খারিজ হয়ে গেল। আদালতের একশ’ মিটার এলাকার ভেতরে মামলা সংশ্লিষ্টদের ছাড়া এমনকি সাংবাদিকদেরও ঢুকতে না দেওয়ার নজিরবিহীন কড়াকড়ির মধ্যে এলাহাবাদ হাইকোর্টের লক্ষেষ্টৗ বেঞ্চে স্থানীয় সময় বিকেল ৪টার পর মামলার রায় দেন বিচারপতি এস ইউ খান, সুধীর আগারওয়াল ও ধর্মবীর শর্মা। পরে লক্ষেষ্টৗ জেলা ম্যাজিস্ট্রেট অনীল কুমার সাগর বাইরে এসে সাংবাদিকদের সামনে রায় পড়ে শোনান। তবে তার আগে হিন্দু পক্ষের আইনজীবী বিজেপি নেতা রবিশংকর প্রসাদও রায়ের অংশ বিশেষ সাংবাদিকদের জানিয়ে দেন। রায় ঘোষণার কিছুক্ষণ পরই ভারতের প্রধানমন্ত্রী মনমহোন সিং এবং আইনমন্ত্রী ভিরাপ্পামইলি দেশবাসীকে এ রায় মেনে নিয়ে শান্ত থাকার আহ্বান জানান। আর বিজেপি নেতা এলকে আদভানি বলেছেন, এ রায় ভারতের অখণ্ডতার পক্ষে এক নতুন অধ্যায়। হিন্দু কট্টরপন্থি দল আরএসএস প্রধান মোহন ভগবত তার প্রতিক্রিয়ায় বলেছেন, এ রায়ে কোনো পক্ষেরই কোনো লাভ বা ক্ষতি হয়নি।
এলাহাবাদ হাইকোর্টের রায়ে অযোধ্যার বিরোধপূর্ণ জায়গায় বাবরি মসজিদের স্বীকৃতি দেওয়া হয়নি। তবে হিন্দু পক্ষের দাবি অনুসারে রাম জন্মভূমির স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। রায়ে বলা হয়েছে, ওই এলাকায় বর্তমানে যে রাম মূর্তিগুলো রয়েছে সেগুলো সরানো হবে না। সে জন্যই আরএসএস প্রধান মোহন ভগবত রায়ের পরই মুসলমানসহ সবাইকে ওই এলাকায় রামমন্দির নির্মাণে সহায়তা করার আহ্বান জানিয়েছেন। এদিকে এনডিটিভির এক খবরে বলা হয়, বাবরি মসজিদের দাবিতে সুনি্ন ওয়াকফ বোর্ডের পক্ষে অন্যতম মামলাকারী মোহাম্মদ হাসিম আনসারি এ রায় মেনে নিয়েছেন। তবে বার্তা সংস্থা এএফপির খবরে বলা হয়, মামলায় বাবরি মসজিদ অ্যাকশন কমিটির অন্যতম আইনজীবী জাফর আয়াব জিলানি সাংবাদিকদের বলেছেন, তারা এ রায়ে পুরোপুরি সন্তুষ্ট নন। মুসলমান পক্ষের আইনজীবীরা জানান, রায়ে এলাকাটিকে ৩ ভাগ করার কথা বলা হলেও আসলে দুই-তৃতীয়াংশই পেয়েছে হিন্দুরা । আর মুসলমানরা পেয়েছে এক-তৃতীয়াংশ। জাফর আয়াব জিলানি জানান, রায়ে মুসলমানদের কিছু দাবির ন্যায্যতার স্বীকৃতি মেলেনি।
অন্যদিকে অযোধ্যার রাম জন্মভূমি ট্রাস্ট এ রায়কে মহাআনন্দের বলে অভিহিত করেছে। ট্রাস্টের সভাপতি নৃত্যগোপাল দাস মহারাজ রায়ের প্রতিক্রিয়া জানিয়ে বলেন, ‘আমি অত্যন্ত খুশি যে, আদালত ঐতিহাসিক সত্যের স্বীকৃতি দিয়েছেন এবং এটা হিন্দু সম্প্রদায়ের জন্য মহাআনন্দের বিষয়।’ তবে মহারাজ জানান, এলাকাটির এক-তৃতীয়াংশ মুসলমানদের দেওয়ার আদেশের বিরুদ্ধে তারা সুপ্রিম কোর্টে আপিল করবেন। তিনি বলেন, ‘মুসলমানদের যে অংশ দেওয়া হয়েছে আমরা সেই অংশটিও দাবি করব।’ তিনি মুসলমানদের প্রতি শান্তিপূর্ণভাবে হাইকোর্টের রায় মেনে নেওয়ার আহ্বান জানান।
অন্যদিকে রায় ঘোষণার পরই হিন্দুদের বিভিন্ন সংগঠন বিজয় দাবি করে অযোধ্যায় আনন্দ মিছিল শুরু করে। আরএসএস প্রধান মোহন ভগবত বলেন, হাইকোর্টের এ রায় অযোধ্যায় রামমন্দির নির্মাণের পথকে সুগম করে দিয়েছে। এদিকে ভারতের ক্ষমতাসীন কংগ্রেস পার্টি তাদের প্রাথমিক প্রতিক্রিয়ায় বলেছে, হাইকোর্টের এ রায়ে কারও জয়-পরাজয় হয়নি।
এলাহাবাদ হাইকোর্টের লক্ষেষ্টৗ বেঞ্চের তিন বিচারপতির সংখ্যাগরিষ্ঠ রায়ে বলা হয়, অযোধ্যার বিরোধপূর্ণ জায়গাটি একটি যৌথ সম্পত্তি। এর মালিক দাবি উত্থাপনকারী তিন পক্ষই। তারা হচ্ছে হিন্দু মহাসভা, নির্মোহি আখড়া ও সুনি্ন ওয়াকফ বোর্ড। তবে বিচারপতি এস ইউ খান তার রায়ে বলেন, ১৫২৮ সালে মোগল সম্রাট বাবরের নিযুক্ত শাসক মীর বাকী তাসখন্দির নির্মাণ করা বাবরি মসজিদ কোনো মন্দির ধ্বংস করে তৈরি হয়নি। তবে মন্দিরের ধ্বংসস্তূপের ওপর তৈরি হয়েছিল। উত্তর প্রদেশ সরকারের প্রধান কেঁৗসুলি দেবেন্দ্র উপেন্দ্র জানান, বিচারপতি এস ইউ খান এবং সুধীর আগারওয়াল জায়গাটিকে তিন পক্ষের মধ্যে সমান তিন ভাগে ভাগ করার রায় দিয়েছেন। আর বিচারপতি ডিবি শর্মা তার রায়ে বলেছেন, পুরো জায়গাটিই হিন্দুদের। তিনি তার রায়ে সুনি্ন ওয়াকফ বোর্ডের দাবি পুরোপুরি নাকচ করে দেন। তবে তিন বিচারপতির বেঞ্চই এ ব্যাপারে একমত হন যে, বিরোধপূর্ণ কাঠামোর মূল কেন্দ্রবিন্দুটি পাবে হিন্দু মহাসভা। যেখানে ১৯৪৯ সালে প্রথমবার রামমূর্তি স্থাপন করা হয়েছিল এবং পরে ১৯৯২ সালের ৬ ডিসেম্বর বাবরি মসজিদ ধ্বংস করার পর আবার রামমূর্তি বসানো হয়েছিল। অর্থাত বাবরি মসজিদের স্থানটির মালিকানা পেয়ে গেল হিন্দুরা।মুসলমানদের দেওয়া হয়েছে মুল কাঠামোর বাইরের এক তৃতীয়াংশ জায়গা । আর সীতারামই এবং রাম চম্বুতারা এলাকাটি দেওয়া হয়েছে নির্মোহি আখড়াকে। হাইকোর্ট বেঞ্চ তিন মাসের স্থিতাবস্থার নির্দেশ দিয়ে সংশ্লিষ্ট সব পক্ষকে সমঝোতার ভিত্তিতে এলাকাটি সমান তিন ভাগে ভাগ করে নিজেদের ভাগ চিহ্নিত করে নেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন।
- New York Attorney General James Secures Reimbursements for T-Mobile Customers Whose Rates Were Unjustly Raised
- নিউইয়র্কে বাংলাদেশ সোসাইটির নির্বাচনে কুনু-ফিরোজ পরিষদের সাত দফা ইশতেহার ঘোষণা; কমিউনিটি সেন্টার প্রতিষ্ঠা, সাশ্রয়ী ফিউনারেল সেবা, বিমানের সরাসরি ফ্লাইট ও আর্থিক স্বচ্ছতায় অঙ্গীকার
- ফিলিস্তিনিদের আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকারের প্রতি বাংলাদেশের পূর্ণ সমর্থন: জাতিসংঘে রাষ্ট্রদূত আইরিন খান
- নিউইয়র্কে বাংলাদেশ সোসাইটির নির্বাচনে প্রথমবারের মতো বিতর্ক, গুরুত্ব পেল স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি
- New York Attorney General James Warns New Yorkers About AI-Generated Election Misinformation Ahead of November Elections
- Bangladesh calls for global treaty to protect victims of crimes against humanity
- নিউইয়র্কে জাতিসংঘে মুহাম্মদ নওশাদ জমির এমপি: মানবতাবিরোধী অপরাধ প্রতিরোধে শক্তিশালী আন্তর্জাতিক সনদ প্রণয়নের আহ্বান
- সোশ্যাল মিডিয়ার তথ্য গোপন করলে যুক্তরাষ্ট্রের ভিসা প্রত্যাখ্যান, আবেদনপত্রে চাওয়া তথ্য সঠিক ও সম্পূর্ণভাবে দেওয়ার নির্দেশনা মার্কিন দূতাবাসের