উত্তর আমেরিকার সবচেয়ে জনপ্রিয় বাঙালী সংগীত তারকা শাহ মাহবুব
আকবর হায়দার কিরন :সাম্প্রতিক কালে উত্তর আমেরিকায় সবচেয়ে জনপ্রিয় বাঙালী সংগীত তারকা বলতে একবাক্যে শাহ মাহবুব কেই বোঝায়। দেশীয় অনুষ্ঠানের পাশাপাশি ভারতীয়দের অনুষ্ঠানেও সমান দাপটে ঘণ্টার পর ঘন্টা গান করে মাতিয়ে রাখতে দেখা যায় অসম্ভব প্রতিভাধর শাহ মাহবুব কে। এবারের পুজোর সময় কোলকাতার বাঙালীদের আয়োজনে এক জনাকীর্ণ পুজোতে একনাগাড়ে দেড় ঘণ্টার বেশী গান করেন মাহবুব। একই অনুষ্ঠানে জনপ্রিয় ভারতীয় গায়ক বাবুল সুপ্রিয় সহ আরও বেশ ক’জন শিল্পী উপস্থিত ছিলেন। শাহ মাহবুবের এত জনপ্রিয়তার পেছনে আরেকটি ব্যাপার বিশেষ ভাবে ভুমিকা পালন করে। এবং তা হোল তাঁর অত্যন্ত বিনয়ী আচার ব্যবহার। তার ফলে অনেক সময় দেখা যায় কোন অনুষ্ঠানে তাকে যে সম্মানী দেয়ার কথা বলে আমন্ত্রন করা হয় উদ্যোক্তারা তার চেয়ে অনেক বেশী দিয়ে নিজেদের আনন্দ এবং কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন। ঢাকায় গেলে শাহ মাহবুব কে অত্যন্ত ব্যস্ত সময় কাটাতে হয় বিভিন্ন টিভি চ্যানেল এর লাইভ অনুষ্ঠান করা নিয়ে। ঢাকায় লেখাপড়া করতে এসে কারো কাছে ধর্না না দিয়ে নিজের যোগ্যতায় তিনি বিটিভি এবং বাংলাদেশ বেতারে এনলিস্টেড হন নিয়মিত সংগীত শিল্পী হিসেবে। শিশুকাল থেকেই সৃষ্টিকর্তার অপার কৃপায় শাহ মাহবুব সংগীতকে ভালোবেসে যে যাত্রা শুরু করেছেন সেই যাত্রা অন্তহীন রয়েছে। সম্প্রতি নিউ ইয়র্কে বর্তমান সময়ের অন্যতম জনপ্রিয় এই শিল্পীর সাথে আমার বিশেষ আলাপচারিতা হয়।
শাহ মাহবুবঃ আমার শুরু কিভাবে জানতে ছেয়েছেন। আসলে পারিবারিবারিক ভাবেই সংগীত এর প্রতি আমার আজন্ম ভালোবাসা। ৪ বছর বয়স থেকেই গান গাওয়া শুরু হয়। আমার দাদার বাড়ি বগুড়ায় এবং নানার বাড়ি গাইবান্ধায়।আমাদের বাড়ির চারদিকে ছিল অনেকগুলো হিন্দু বাড়ি। প্রতিবেশী নারায়ণ চন্দ্র মণ্ডল এর কাছে হাতে খড়ি। তিনি আমাদের এলাকায় গানের শিক্ষক ছিলেন। স্বপন কাকাদের বাড়িতে আমি প্রাইভেট ও পড়তাম। তাঁদের বাড়ির হারমোনিয়াম দিয়ে গান শিখতাম। তাছাড়া আমার বাবা মা ভাই বোন ও খুব সংগীতঅন্ত প্রান।
একটি মজার কথা শেয়ার করি , যেহেতু আমি মামার বাড়িতে বড় হয়েছি তাই ছোট বেলা থেকে এমন একটা ধারনা ছিল- যাঁদের গোঁফ বা দাঁড়ি আছে তাঁরা সবাই নানা এবং যাঁদের কিছুই নেই তাঁরা আমার মামা ।তাই যেকোনো অনুষ্ঠান থাকলে তাঁরা আমাকে ভালোবেসে টানাটানি করতেন, আমাকে দিয়ে গান গাওয়াতেন। আপনারা জানেন আমাদের উত্তর বঙ্গ ভাওআইয়া গানের জন্য বিশেষ ভাবে বিখ্যাত। যে গানকে আমাদের আঞ্চলিক ভাষার গানও বলা চলে। ভরতখালি কালী মন্দিরে শ্যামা সংগীত গেয়ে আমার কোন অনুষ্ঠানে গান করার শুভ সুচনা হয়। আমি গেয়েছিলাম কাজি নজরুলের লেখা একটি শ্যামা সংগীত। যখন আমার বয়স প্রায় ৬ তখন আমি প্রথম মঞ্চে গান করি। মরমী শিল্পী আবদুল আলীমের বিখ্যাত গান’ কল কল ছল ছল নদী করে টল মল’। এই গানের রচয়িতা হলেন নাদিরা বেগমের বাবা আবদুল আজিজ। এরপর করেছি আব্বাস উদ্দিনের গাওয়া ‘কিও বন্ধু কাজল ভোমরারে’। এরপর আস্তে আস্তে বড় হতে থাকি, স্কুল এ যাই, কিন্তু সঙ্গীতের সাথে ভালোবাসা অটুট থাকে।
স্কুল এবং কলেজ এ মোটামুটি বেশ মনযোগী ছাত্র হিসেবে নিজেকে ধরে রাখার পাশাপাশি গানটাকেও কখনোই ছাড়িনি। কিন্তু গান করা হতো মুলত গ্রামের অনুষ্ঠান গুলোতেই । এই সময় একবার আমাদের ওখানে আসেন ওস্তাদ অবনী মোহন দে, তিনি সিরাজগঞ্জের হলেও ঢাকায় থাকতেন। তাঁর মেয়েকে আমাদের এলাকায় বিয়ে দেয়ার কারনে মাঝমাঝে আসতেন।তিনি কারো মাধ্যমে আমার খোঁজ পেয়ে খবর দেন এবং আমার গান শুনে খুব মুগ্ধ হন। আমি তাঁর কাছে ক্লাসিক্যাল তালিম নেয়া শুরু করি। তিনি এক মাস কিংবা ১৫ দিন পরপর আসতেন। আগেই বলেছি আমার ছোটবেলায় নারায়ণ চন্দ্র মন্ডলের কাছে সারগামের হাতেখড়ি হয়। কিন্তু পরিপূর্ণ সংগীত শেখা শুরু হয় ওস্তাদ অবনী মোহনের কাছে। কলেজ জীবন শেষ করে ৯৬ সালের ২১ ফেব্রুয়ারী আমি ঢাকায় চলে আসি আরও পড়াশুনোর উদ্দেশ্য নিয়ে।জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আমি অর্থনীতিতে অনার্স এবং মাস্টার্স করি। এখানে বলে রাখি, এর মাঝে আমার এক বিরাট পারিবা্রকি বিপর্যয় ঘটে গেছে। ইন্টার পাশ করার পর আমি বাবাকে হারাই ১২ নভেম্বর। বাবার শোকে আমার নানা মারা যান ১৬ তারিখ। আমার ম্যাট্রিক এবং ইন্টার এর ফলাফল বেশ ভালো ছিল বলে আমার নানার স্বপ্ন ছিল আমাকে একজন আইনজীবী বানাবার। তাঁদের আকস্মিক তিরোধান আমার জীবনকে বেশ এলোমেলো করে দেয়।আমার নানা ছিলেন অনেক বিত্তবান , তিনি মারা যাবার পর সরকার তাঁর অনেক জমিজমা এবং হাঁট অধিগ্রহন করে।এই সব কারনে আমার পরিবারের উপর অর্থনৈতিক চাপ পড়ে। প্রসঙ্গক্রমে উল্লেখ করা যেতে পারে, আমি বগুড়ার ঐতিহ্যবাহী শাহ পরিবারের সন্তান। আমার বাবার নাম শাহ আব্দুর রহিম, দাদার নাম শাহ আব্দুর রহমান। শারিয়াকান্দিতে আমাদের আদিবাস। বিয়ের কারনে আমার বাবা নানার এলাকা গাইবান্ধায় বসবাস শুরু করেন।
ঢাকায় এসে আমি থাকতাম আমার মামা সম্পর্কের কিছু আপন মানুষের সাথে। তাঁদের সহযোগিতায় আমি আব্বাস উদ্দিন একাডেমীতে ভর্তি হই। আমার কোন হারমোনিয়াম ছিলোনা তবে ভালই বাজাতে পারতাম। এখানে ভর্তি হয়েও তাঁদেরটা দিয়েই গান করতাম। বাড়িতে থাকতে অবনী কাকারটা দিয়েই গান করতাম। বলতে ভুলে গিয়েছিলাম, আমি কাকা এবং বাবার সাথে খুব ছোট্ট বেলায় মঞ্চে অভিনয়ও করেছি। হয়তোবা সেই জন্যেই আমি সবসময় স্টেজ ফ্রী , কখনো জড়তা বোধ করিনা। আব্বাস উদ্দিন একাডেমী পরিচালিত হতো মোস্তফা জামান আব্বাসীর তত্ত্বাবধানে। উচ্চাঙ্গ সংগীত সেখাতেন ওস্তাদ সায়ীদ হোসেন। পল্লীগীতি এবং নজ্রুল গীতিতে ছিলেন আজিজুল ইসলাম এবং ইদ্রিস আলী। সেখানে প্রথম বর্ষের ছাত্র থাকাকালে আমি একদিন গান করছিলাম হারমোনিয়াম বাজিয়ে। তখন পাশ দিয়ে হেঁটে যাচ্ছিলেন বড়দের ক্লাস এর শিক্ষক আজিজুল ইসলাম। উনি আমার গান শুনে এগিয়ে এসে বলেন তুমি আব্বাস উদ্দিনের আরেকটি গান করো তিনি জানতে চান আমি রেডিওতে গান করি কিনা। আমি বললাম , স্যার আমিতো সবে ঢাকায় এলাম। তিনি আমাকে তাঁর একটি কার্ড দিয়ে বাসায় যেতে বললেন। মোস্তফা জামান আব্বাসিকেও জানালেন যে আমাকে তিনি প্রমোট করতে চান।
ওস্তাদ আজিজুল ইসলাম আমাকে ২৫টি গান শেখান। তিনি একদিন রেডিও তে গান গাওয়ার অডিশনের একটি কন্ট্রাক্ট ফর্ম বাড়িতে নিয়ে আসেন এবং তাতে আমাকে দিয়ে সই করিয়ে নেন। ৯৬ সালের শেষের দিকে ঢাকা বেতারের জন্য অডিশন দেই। আমার গান শেষ হতেই কাঁচের ওপার থেকে ইঙ্গিতে ডাকলেন বিচারকরা। তাঁরা আমার মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে বলেন তুমি পাশ, তোমাকে আর গান গাইতে হবেনা। এরপর খুব দ্রুত পুলিশ ভেরিফিকেশন হয়ে যায় ,কন্ট্রাক্ট চলে আসে। আমি রেডিও তে এনলিস্টেড আর্টিস্ট হয়ে যাই। এবার ঢাকায় মঞ্চে গান করা এবং তার পেছনে যাঁদের বিশেষ অবদান রয়েছে সেদিকে একটু ফিরে তাকাই। একদিন শিল্পকলা অ্যাকাডেমি তে উত্তর বঙ্গ ফাউন্ডেশন আয়োজিত একটি অনুষ্ঠানে গান করছিলাম। আমাকে সবাই ওয়ান মোর বললেও বেশী গান করার সময় ছিলোনা । গান শেষ হতেই এক ভদ্রলোক আমার দিকে এগিয়ে এলেন এবং সস্নেহে বললেন ‘তোমার নাম মাহবুব এবং আমার নামের মধ্যেও মাহবুব আছে’। এই অসাধারণ আন্তরিক মানুষটি হলেন মাহবুবুল হায়দার মোহন, সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোটের কেন্দ্রীয় নেতা এবং ক্রান্তি শিল্পী গোষ্ঠীর সভাপতি। তিনি আমাকে বলেন, তুমি খুব ভালো গান করো, এই রইলো আমার নাম্বার, কল দেবে। অত্যন্ত বেদনার ব্যপার হোল তিনি আজ আমাদের ভেতর আর নেই। তাঁর অকাল প্রয়ান হয়েছে বটে কিন্তু বাংলাদেশের আনাচ কানাচ থেকে ঢাকায় আসা অসংখ্য শিল্পসেবীর হৃদয়ে তিনি চিরঞ্জীব হয়ে থাকবেন, প্রয়োজনের সময় সঠিক দিকনির্দেশনা এবং সহযোগিতার জন্যে। মুক্তিযুদ্ধের স্বপক্ষের গান, জাগরনের গানের একজন দিকপাল হিসেবে মোহন ভাইয়ের নাম ছিল খুব সুপরিচিত। এরপর দেখা যেতো জাতীয় পর্যায়ের সব বড় বড় অনুষ্ঠানে গান গাইবার জন্যে আমার নাম দিয়ে তারপর আমাকে ফোনে জানাতেন।
৯৭ এর প্রথম দিকে রেডিও তে নিয়মিত গান করলেও মঞ্চে তখনো তেমন সক্রিয় ছিলামনা আমি।ি ্থক ওই সময়টায় মোহন ভাই আমাকে আগলে রাখেন আপন বড় ভাইয়ের মতো। একজন মহান মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে ক্রান্তির মাধ্যমে মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে মাথায় রেখে সারাদেশে ঘুরে বেড়িয়েছেন জাগরনের গান গান গেয়ে।্তিিন আমাকে শুরুতেই বলেন ‘তুমি ক্রান্তির সাথে কিছুদিন থাকো, আমি তোমাকে জাতীয় পর্যায়ে প্রোমোট করবো। আমি অর্থনীতিতে পড়াশুনো এবং ছাত্র পড়ানো নিয়ে অনেক ব্যস্ত থাকলেও ক্রান্তির অনুষ্ঠানে অংশ নিতাম। মানবিক বিভাগ থেকে গিয়ে অর্থনীতিতে পড়া বেশ কঠিন হলেও আমার চেষ্টার কোন কমতি ছিলোনা। তাঁর কারনে ধানমন্ডির রবীন্দ্র সরোবর এর মতো স্থানেও গান গাইবার সুযোগ আমার হয়।
এদিনে আব্বাস উদ্দিন একাডেমীতে আমার শেখাও অব্যহত থাকে, আমি নজরুল গীতি, উচ্চাঙ্গ, আব্বাস উদ্দিনের গান ইত্যাদিতে ৫ বছরের কোর্স করি। ইতিমধ্যে ঘটে যাওয়া আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের উল্লেখ করতে চাই এই পর্যায়ে। আমার সাথে একটি পিচ্ছি মেয়ে গানের ক্লাস এ পড়তো। ওর বাবা বিটিভিতে কাজ করতেন। মেয়েটি তার বাবাকে বলে ভাইয়া অনেক সুন্দর গান করে এবং রেডিও তে নিয়মিত গায়। এই গল্প শুনে তার বাবা একদিন তাঁর স্ত্রী সহ এসে আমার গান শুনে বলেন’ তুমি টিভিতে অডিশন দিলেই পাশ করবে। ৯৮ সালে আমি যখন তৃতীয় বর্ষ অনার্সের ছাত্র তখন আমি টিভিতে অডিশন দিয়ে সহজেই পাশ করি। রেডিও এবং টিভি উভয় জায়গায় নিয়মিত গান করতে শুরু করার পর থেকে ঢাকায় লোকসংগীত এবং উচ্চাঙ্গ সংগীতের এমন কোন সংগীত ব্যক্তিত্ব নেই যাঁদের সংস্পর্শে আমার আসা হয়নি। যেমন যশোর এর মাগুড়ার হাফিজুর রহমান, যিনি ‘নাতি খাতি বেলা গেলো’ থেকে শুরু করে অনেক বিখ্যাত গানের রচয়িতা , মলয় কুমার গাঙ্গুলী, রথিন্দ্রনাথ রয় দাদা, আব্বাস উদ্দিন পরিবারের সবাই, মমতাজ আলি খান সংগীত একাডেমীতে তাঁর মেয়ে রুপা খান , ভাওআইয়া একাডেমী , ভাওআইয়া অঙ্গন, আবসুল আলীমের পরিবার, ওস্তাদ আজিজুল ইসলাম , নাদিরা বেগম, ইন্দ্রমোহন রাজবংশী , ওস্তাদ সফি মণ্ডল সহ আরও অনেকে। তাঁরা অনেক ভালোবেসে আমাকে গান দিতেন এবং আমি সেইগুলো কণ্ঠে তুলে গাইতাম টিভিতে। সবচেয়ে মজার ব্যাপার হোল এই সব গান তাঁদের কাছ থেকে নেয়া এবং গাওয়ার পেছনে কোন অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড জড়িত ছিলোনা। হয়তোবা আমার আন্তরিক আগ্রহ এবং ঐকান্তিকতা তাঁদের আগ্রহী করে আমাকে এইভাবে সাহায্য করতে। একটি ব্যাপারে আমি সবসময় সতর্ক থাকি এবং তা হোল আমার নমনীয়তা এবং গুণীদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধাবোধ। আমি মনে করি জীবনে এর চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আর কিছুই হতে পারেনা।
এখানে বলে রাখি, আমি ইতিমধ্যে মোটামোটি ভালভাবেই পড়াশুনো শেষ করি এবং বাংলাদেশের একজন বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ ও গবেষক ডঃ আতিউর রহমানের গবেষণা সহকারী হিসেবে খ্যাতনামা প্রতিষ্ঠান বিআইডিএস ( বাংলাদেশ ইন্সটিটিউট অব ডেভেলপমেন্ট স্টাডিস) এ যোগ দেই। এবং পরে ডঃ আতিউর রহমানের বেসরকারি উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠান ‘সমুন্নয়’ এ কাজ করি। এখানে বিশেষ ভাবে উল্লেখ্য যে তিনি প্রান্তজনদের নিয়ে এবং তাদের বাজেট নিয়ে কাজ করতেন। প্রান্তজনদের কিভাবে উন্নয়নের মূলধারায় নিয়ে যাওয়া যায়- এই বিষয়টাকে মাথায় নিয়ে ।একজন গরিবের অর্থনীতিবিদ হিসেবে ডঃ আতিউর রহমানের লেখা বিভিন্ন প্রকাশনার সঙ্গে যুক্ত থাকবার সুযোগ আমার হয়েছে। আমি নিজেও তাঁর গবেষণা সহকারী হিসেবে দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে ছুটে বেড়িয়েছি। এখানে লাভ হয়েছে দুদিকেই। একদিকে খুব কাছ থেকে সাধারন খেটে খাওয়া মানুষদের জীবন যাপন অবলোকন করা, তাদের জন্য কাজ করা আর তাদের সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের নির্যাস আহরন করা। দেশের আনাচে কানাচের লোক সংস্কৃতি এবং সংগীত সংগ্রহ করে সেগুলো লালন করে নিজের কণ্ঠে ধারন করার কাজটিও কিন্তু পাশাপাশি চালিয়ে গেছি।
আমি সুনামগঞ্জের হাওরে বেশ ক’মাস কাটাই। তখন আমার সুযোগ হয় বাউল সম্রাট শাহ আবদুল করিমের সংস্পর্শে আসার। ঠিক একই ভাবে গেছি নেত্রকোনা, উত্তর বঙ্গের চিলমারি বন্দর, কুষ্টিয়ায় লালন শাহের মাজার, রাজশাহী অঞ্চলে গিয়ে গম্ভীরা গানের সাথে পরিচয় ইত্যাদি সবকিছু মিলিয়ে আমার নিজের দেশকে এবং নিজেকে নতুন করে জানবার সুযোগ হয়। ওখানে কাজ করার সময় ৯৮ সালে কাকতালীয় ভাবে আমার ভাগ্যে আমেরিকার ডিভি লটারি লেগে যায় । দেশ ছাড়বার আগ মুহূর্ত পর্যন্ত অবশ্য আমি ডঃ আতিউর রহমানের গবেষণার কাজে সহযোগিতার কাজে করেছি, এমনকি এখনো জড়িত রয়েছি।
২০০৮ সালের ১৭ ডিসেম্বর আমি যুক্তরাষ্ট্রের পেনসিলভেনিয়া এসে পৌঁছাই। সেখানে অনেকদিন আগে থেকে বসবাসরত আমার কাজিনদের কাছে এসে উঠি। এখানে উল্লেখ করা যেতে পারে, যে সময়টায় আমি দেশ ছাড়ি তখন রেডিও, টিভি, বিজ্ঞাপনের অসংখ্য জিঙ্গেল এ কণ্ঠ দেয়া ইত্যাদি নিয়ে সত্যি খুব ব্যস্ত ছিলাম। এত কর্মময় জীবনকে পেছনে ফেলে আসা বেশ কষ্টের ব্যাপার ছিল বৈকি । মজার ব্যাপার হোল, রথীন দা নিউ ইয়র্ক চলে আসার পর তাঁর জুনিয়র হিসেবে তাঁর সব বিখ্যাত গান আমাকে করতে হতো বিভিন্ন অনুষ্ঠানে। এই প্রসঙ্গে আবারও মনে এলো মোহন দা’র নাম। যাঁদের ভালোবাসা এবং সহযোগিতায় আমার জীবনে যখন একটি দারুন ঊর্ধ্বগতি ঠিক ওই সময়টায় চলে আসা খুব সহজ কাজ ছিলোনা। পেনসিভেনিয়া আসার পর ২১শে ফেব্রুয়ারি উপলক্ষে ডাক্তারদের আয়োজনে একটি বিশেষ অনুষ্ঠানে আমি প্রথম গান করি। এই প্রসঙ্গে একটি অত্যন্ত মজার ঘটনার কথা বলি। আমি যেদিন বাংলাদেশ থেকে আসি সেদিন বিমান বন্দরে আমাকে রিসিভ করার কথা ছিল আমার বোনের কিন্তু অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে থাকায় কাকতালীয় ভাবে আমাকে নিতে আসেন স্বাধীন বাংলা বেতারের মহান কণ্ঠশিল্পী কাদেরী কিবরিয়া। আমার যে কি ভালো লেগেছিল কি বলব। একুশের অনুষ্ঠানের আগে আমি অবশ্য তাঁর সাথে ৩১স্ট নাইটএ একটি অনুষ্ঠানে গান করি। বিমান বন্দর থেকে ২০ মিনিটের ড্রাইভ এ কাদেরি কিবরিয়া আমার চেহারা দেখেই বলেন ‘তোমাকে চেনা চেনা লাগছে’। আমার জিনিসপত্রের ভেতর অনেক যতœ করে বয়ে হারমোনিয়াম ও তাঁর চোখে পড়ে। তিনি এই ফাঁকে আমাকে বেশ কিছু মূল্যবান উপদেশ দেন। একুশের অনুষ্ঠানে গান গাইবার আগে আয়োজকদের অনুরোধ করি একজন ভালো তবলাবাদক যোগাড় করতে। নিউ ইয়র্কের স্বনামধন্য খুশবু আলমের সাথে এই সুবাদে পরিচয় হয়। আমার ভাষার গানগুলো সবাই খুব পছন্দ করেন এবং বেশ কটি গান আমাকে গাইতে হয়। খুশবু ভাই সেদিন বলেন তোমার জন্যে সঠিক জায়গা হবে নিউ ইয়র্ক। এরপর রথিন দা, শহীদ হাসান ভাই , তপন মোদক দাদা এবং বিটিভিতে আমার সিনিয়র আর্টিস্ট জিনাত রেহানা রতœা – এঁদের ভালোবাসাপূর্ণ আহবানে সাড়া দিয়ে একই বছরের ২৩ অক্টোবর আমি নিউ ইয়র্ক চলে আসি। সবচেয়ে বেশী তাগিদ দেন প্রিয় খুশবু আলম ভাই। তিনি অবশ্য বাংলাদেশ এবং কোলকাতা থেকে আসা অনেক শিল্পীর নিয়মিত পৃষ্ঠপোষকতা করে থাকেন।
নিউ ইয়র্ক আসার পর আমার গানবাজনা চলতে থাকে। আবেদন করার প্রায় ২ বছর পর আমার কাজ হয় সোনালী এক্সচেঞ্জ কোম্পানিতে। এই সরকারি প্রতিষ্ঠানে আমার শ্রদ্ধেয় সিইও জনাব আতাউর রহমান সহ সব সহকর্মীরা আমাকে সবসময় গানবাজনার ব্যাপারে আন্তরিক সহযোগিতা করে থাকেন। প্রবাসে গান করতে গিয়ে আমি সিলেট, চট্টগ্রাম , নোয়াখালী ইত্যাদি সহ অন্যান্য এলাকার গানগুলো নিয়মিত করে থাকি। আমার খুব ভালো লাগে আঞ্চলিক গান করতে এবং দর্শক শ্রোতাদের ফিডব্যাক দেখে মনে হয় তাঁরাও পছন্দ করেন। এখানকার বিশিষ্ট প্রমোটার আলমগীর খান আলম, জামান মনির সহ যারা বাংলাদেশ থেকে শিল্পী নিয়ে আসেন তাঁরাও কেন জানি আমাকে খুব পছন্দ করেন। পাশাপাশি বিভিন্ন মিডিয়ার কর্মকর্তা এবং সাংবাদিকরাও আমার সাথে খুব ভালো ব্যবহার করেন এবং আমাকে অনেক উৎসাহিত করেন। এই সব কারনেই হয়তোবা পথচলা অব্যহত রয়েছে। এখানে আমি বিশেষভাবে উল্লেখ করতে চাই, আমার গান শেখা অব্যহত রয়েছে, আমি প্রতিনিয়ত শিখছি। আমি পণ্ডিত রমেশ মিশ্রের কাছে কিছুকাল শেখার সুযোগ পেয়েছি। শিখেছি দাদা তপন বৈদ্য এর কাছে। অতি সম্প্রতি আমার সুযোগ ঘটেছে পরম শ্রদ্ধেয় পণ্ডিত রামকানাই দাশের কাছে কিছু বিশেষ লেশন নেয়ার। তাঁর লেখা এবং সুরে নতুন কিছু গান আমি অচিরেই প্রবাসের সংগীত প্রেমীদের উপহার দিতে পারব বলে আশা করছি। আমি অনেকদিন ধরে আশা পোষণ করছিলাম পণ্ডিত রামকানাই দাশের কাছে শেখার। সেই সুযোগ সম্প্রতি আমার এক বড় ভাই করে দিয়েছেন। গান নিয়ে এই প্রবাসে আমি ভালো কিছু করতে চাই।
শাহ মাহবুব এর ২টি একক এলবাম ইতিমধ্যে প্রকাশিত হয়েছে। এর একটিতে বিশেষ ভাবে স্থান পেয়েছে উত্তর বঙ্গের লোক সংগীত। এছাড়া মরমী শিল্পী আবদুল আলীমের ছেলেদের সাথে সহ আরও অনেক শিল্পীর সাথে রয়েছে বেশ ক’টি মিক্সড অ্যালবাম। মাহবুব বলেন , আমার ভেতর এখনো কাদামাটি লেগে আছে, তাই ফোক গান করতেই বেশী স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করি। ছোটবেলায় বাবা আমাকে ঘাড়ে চড়িয়ে ভাঙ্গা নদীর পাড় দিয়ে যেতে যেতে উদাস গলায় মরমী গানগুলো গাইতে গাইতে হেঁটে বেড়াতেন। দেশ থেকে দূরে থাকলে আমরা দুটো জিনিস বেশী মিস করি এবং তা হোল মাটি এবং মা। আমার দৃঢ় বিশ্বাস এই গানগুলো একজন প্রবাসী শোনেন তখন তাঁর মনের ভেতর অন্য রকম এক অনুভুতির জন্ম হয়। এমনকি দেখা যায় , দেশের অনেক খ্যতনামা আধুনিক গানের সংগীত শিল্পীও প্রবাসে এলে ফোক গানগুলোই করেন।
প্রবাসে গান করার ক্ষেত্রে শাহ মাহবুব কে অনেকেই সহযোগিতা করেন। এখানকার বিশিষ্ট সিনিয়র সংগীত শিল্পীরা, জনপ্রিয় ২টি ব্যান্ড সারগাম ও নিউ ইয়র্ক হারমনি এবং পণ্ডিত কিশান মহারাজ সংগীত একাডেমীর কর্ণধার তপন মোদক সহ প্রতিটি সংগীত দল তাকে সমানভাবে সহযোগিতা করেন। তবে তিনি বিশেষ ভাবে উল্লেখ করলেন পার্থ গুপ্ত, তানভীর শাহীন ও জহির উদ্দিন লিটনের নাম। এবারের পুজোয় লিটনের মাধ্যমেই তিনি কোলকাতার প্রবাসীদের এক বিরাট অনুষ্ঠানে বাবুল সুপ্রিয়র মতো বিখ্যাত শিল্পীর পাশাপাশি প্রায় দেড় ঘণ্টা একনাগাড়ে গান করেন। শাহ মাহবুব বলেন, প্রতিটি মানুষের আলাদা আলাদা ধর্ম বিশ্বাস আছে কিন্তু সবচেয়ে বড় হোল মানব্ধরম।আমি যখন যেখানে যাই সেখানকার পরিবেশ অনুযায়ী গান করি। যেমন আমি পুজোয় গেলে হিন্দু ধর্মের গানগুলো করি, যা আমি খুব ছোটবেলায় ও করেছি। শুরুতে মায়ের আগমনী গান করলেও পরে আমি শুরু করি ফোক গান। অনুষ্ঠানে উপস্থিথ অবাঙালী দর্শকরাও আমার গানের তালে তালে নেচেছেন। এমনকি নিউ ইয়র্কের বাইরে আয়োজিত পুজোর অনুষ্ঠান গুলোতেও সবসময় শাহ মাহবুব এর আমন্ত্রন আসে।
শাহ মাহবুবকে মাঝে মাঝে দেখা যায় নিউ ইয়র্কে অবস্থিত সাউথ এশিয়ান মিউজিক সোসাইটি স্টুডিয়োতে গিয়ে জাম্মিং করতে, এ বিষয়ে জানতে চাওয়া হলে তিনি বলেন, সংগীতময় পরিবেশে থাকলে একজন মানুষকে কোন খারাপ কিছু সহজে স্পর্শ করতে পারেনা। বাংলাদেশে সংগীত চর্চার ক্ষেত্রে যেমন পরিবেশ পেতাম ঠিক তেমন কিছু একটা প্রবাসে এসে খুজছিলাম। একটা বসার জায়গা, গানের জায়গা যেখানে অনেক ভালো মানুষ থাকবেন। একদিন হুট করে সাউথ এশিয়ান মিউজিক সোসাইটিতে গিয়ে দেখি ঠিক আমার মনের সাথে অনেক মিলের কিছু সুন্দর মানুষ সেখানে রয়েছেন। আমি যখনি সেখানে যাই, গান করি, আড্ডা মারি- সব কিছুর মুলে থাকে গানবাজনা এবং শুদ্ধ সংস্কৃতি চর্চা। আমাদের দেশের গানকে কিভাবে প্রবাসে আরও জনপ্রিয় করা যায় তা নিয়ে ওঁদের চিন্তা ভাবনা আমাকে মুগ্ধ করে। তাছাড়া মুলধারার সাথে আমাদের সংগীতকে সম্পৃক্ত করার জন্যে তাঁদের যে ঐকান্তিক প্রচেষ্টা তাঁর সাথে আমিও আছি। আর তাই সপ্তাহে অন্তত এক বা দুই দিন আমি যাই সাউথ এশিয়ান মিউজিক সোসাইটিতে। শাহ মাহবুবের লাইভ কনসার্টে ইদানিং একটি বিশেষ সমস্যা হচ্ছে এবং তা হোল দর্শক শ্রোতাদের ব্যাপক নাচানাচি। অনেক বয়স্ক , এমনকি বিশিষ্ট জনদেরও দেখা যায় তাঁর গানের সাথে নাচতে। প্রবাসের সুপরিচিত আইন উপদেস্টা মোহাম্মদ এন মজুমদার , জনপ্রিয় চিকিৎসক ফেরদৌস খন্দকার কে দেখা গেছে মাহবুবের গানের সাথে নাচতে। এ ব্যাপারে মন্তব্য করতে গিয়ে তিনি বলেন, কোন অনুষ্ঠানে যোগ দিতে এসে দেখা যায় একজন পেশাজীবীও হয়তো গানের তালে তালে ফিরে যান তাঁর শৈশবে কিংবা ছাত্র জীবনে। বিষয়টি একেবারে স্বতঃস্ফূর্ত, শাহ মাহবুবের কোন কেরামতি নেই ! তবে একজন শিল্পী হিসেবে আমার জন্যে এটা বিরাট পাওয়া। কিছু কিছু গান আছে যেগুলো যুগ যুগ বিদেশে থাকলেও একজন বাঙালী ভুলতে পারেননা, কোনোদিন ভুলতে পারবেন না । যেমন শাহ আবদুল করিমের গান যখন করি মনে হয় আমার মনের কথা গুলোই তাতে প্রতিফলিত হচ্ছে। আলাপচারিতার শেষে শিল্পী শাহ মাহবুব বলেন আমি গানের মাধ্যমেই আপনাদের সবার হৃদয়ে চিরঞ্জীব হতে চাই। তিনি বলেন, আমি একজন সামান্য গায়ক, এখনো শিল্পী হতে পারিনি, কারন শিল্পী হওয়া অনেক বিশাল ব্যাপার। আমি আপনাদের সাথে দুটো মনের কথা বলতে পেরে নিজেও অনেক অনুপ্রাণিত বোধ করছি। একটি কথা আমি সবশেষে বলতে চাই, প্রবাসে এখন যে ধারায় সংগীত চর্চা হচ্ছে তা কোন অংশেই দেশের চেয়ে কম নয়। এখানে অনেক বড় বড় শিল্পী আছেন, সংগীত গুরু রয়েছেন।
- যুক্তরাষ্ট্রে ঈদুল ফিতর ২০ মার্চ শুক্রবার
- নারীর ক্ষমতায়ন ও ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে বাংলাদেশ অঙ্গীকারবদ্ধ : ড. খলিলুর রহমান
- নিইউয়র্কে টাইমস স্কয়ারের মঙ্গল শোভাযাত্রায় যোগ দিচ্ছেন ম্যানহাটান বরো প্রেসিডেন্ট ব্র্যাড হোয়েলম্যান
- নিউইয়র্কে স্ট্রিট ভেন্ডরদের জন্য নতুন আইন কার্যকর; জেল শাস্তি বাতিল, আরোপ করা হবে জরিমানা
- New York Attorney General James Leads Bipartisan Coalition Suing Predatory Lender OneMain for Scheme to Trap Consumers in Debt
- নিউইয়র্ক স্টেট সিনেট হাউসে ‘বাংলাদেশ ডে’ উদযাপন ২৩ মার্চ : আহ্বায়ক কমিটি গঠন
- বাংলাদেশে আওয়ামীলীগসহ সকল রাজনৈতিক দলের স্বাভাবিক রাজনীতির পরিবেশ সৃষ্টি করার দাবি নিউজার্সি স্টেট আওয়ামী লীগের
- নিউইয়র্কে ‘অল কাউন্টি হেলথকেয়ার গ্রুপ’র বার্ষিক ইন্টারফেইথ ইফতার পার্টি













