‘বাবার কবরে মাটি দেয়ার সময়ও মনে হয়নি তিনি আর ফিরবেন না’- তানজিম আহমদ সোহেল তাজ
|
লুৎফর রহমান: তানজিম আহমদ সোহেল তাজ। জেল হত্যাকাণ্ডে শহীদ তাজউদ্দিন আহমদের কনিষ্ঠ সন্তান। নৃশংস সেই হত্যকাণ্ডের সময় তার বয়স ছিল মাত্র ৫ বছর।
পিতার মমতা আর স্নেহ বুঝে ওঠার আগেই তাকে হারান তিনি। ঘটনার সময় পিতাকে হারানোর বেদনা তেমনটা বুঝতে না পারলেও এখন সেই নৃশংস হত্যাকাণ্ডের স্মৃতি তাড়িয়ে বেড়ায় তাকে। পিতার মৃত্যুর ৩৫ বছর পরও হন্তারকরা শাস্তি না পাওয়ায় বড় কষ্ট পান শহীদ পরিবারের এই সন্তান। পিতৃহত্যার বিচার, অভিশপ্ত ৩রা নভেম্বরের ঘটনা এবং পিতৃস্নেহ ছাড়া বেড়ে ওঠার বিভিন্ন বিষয় নিয়ে সোহেল তাজ গতকাল একান্তে কথা বলেছেন মানবজমিন-এর সঙ্গে। জানিয়েছেন, মাত্র ৫ বছর বয়সে পিতাকে হারালেও তার স্মৃতি আর রেখে যাওয়া চেতনাই এখন তার পথ চলার শক্তি। সততা আর দেশপ্রেমের অনন্য এক উদাহরণ ছিলেন তার পিতা। ৫ বছরের একটি ছোট্ট শিশুকেও তিনি শেখাতে চেষ্টা করেছেন দেশপ্রেম আর সততার শিক্ষা। তিনি বলেছেন, ৩৫ বছরেও জাতির শ্রেষ্ট সন্তানদের হত্যার বিচার না হওয়াটা দুঃখজনক। এখন সময় এসেছে এই হত্যাকাণ্ডের বিচার করে জাতিকে কলঙ্কমুক্ত করা। ঘাতকদের বিচার হলে শহীদ পরিবার কিছুটা হলেও শান্তি পাবে। তার মূল্যায়নে জাতীয় চার নেতা প্রত্যেকে ছিলেন দেশের জন্য নিবেদিতপ্রাণ, দেশপ্রেমিক নেতা। তারা স্বাধীনতার পর একটি যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশকে গড়ার কাজে আত্মনিয়োগ করেছিলেন। তারা প্রত্যেকে ছিলেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের আদর্শের সৈনিক। ৩রা নভেম্বর হত্যাকাণ্ডের স্মৃতিচারণ করে সোহেল তাজ বলেন, বাবার সঙ্গে যেসব স্মৃতি তার সব মনে নেই। আর বাবা যা বোঝাতে চেয়েছিলেন তার সব তখন বুঝে ওঠাও সম্ভব হয়নি। তবে এমন অনেক স্মৃতি আছে যা এখন মনে খুব দাগ কাটে। এখন মনে হয় এই সময়কার রাজনীতিবিদদের তুলনায় আমার বাবা ছিলেন অনন্য। এখন অনেকে মানুষের হাত তালি নেয়ার জন্য বাইরে এক রূপ দেখান আর ভেতরে তাদের অন্যরূপ থাকে। তিনি বলেন, এখন মনে হয় ব্যক্তি আব্বু ছিলেন অসাধারণ দেশপ্রেমিক ও সৎ মানুষ। তিনি বলেন, বাবার সঙ্গে একটি স্মৃতি আমার খুব দাগ কাটে। তখন বাংলাদেশ টেলিভিশন রাত ১০টায় বন্ধ হয়ে যেতো। বন্ধ হওয়ার সময় জাতীয় সংগীত বাজানো হতো। বাবা প্রতিদিন আমাকে নিয়ে খবর দেখতেন। জাতীয় সংগীত বাজার সময় তিনি সোজা দাঁড়িয়ে যেতেন। আমাকেও দাঁড়াতে বলতেন। প্রতিদিনই বাবার সঙ্গে সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে জাতীয় সংগীতের প্রতি সম্মান দেখাতাম। আরও একটি ঘটনা আমাকে খুব নাড়া দেয়। তখন আমরা ধানমন্ডির বাসায় থাকি। বাবা তখন অর্থমন্ত্রীর পদ থেকে পদত্যাগ করেছেন। একদিন রাতের খাবার খাওয়ার সময় আমি বায়না ধরলাম মাছ খাবো না। ছোট্ট বয়সে যা হয়। তখন বাবা আমাকে খাবারের টেবিল থেকে তুলে বারান্দায় নিয়ে গেলেন। আদর করতে-করতে বললেন, বাবা দেশের অনেক মানুষ ঠিকমতো খেতে পারে না। অনেকে মাছ-ভাতই পায় না। স্বাধীনতার জন্য লক্ষ লক্ষ মানুষ জীবন দিয়েছে। বাবার এই কথায় আমার ছোট্ট মনও গলে গিয়েছিল। বাবার সেই কথা আমার বোঝার বয়স তখন ছিল না। বুঝিওনি। কিন্তু এখন তার এই কথাগুলো ভীষণ নাড়া দেয়। তিনি বলেন, আমি ছিলাম পরিবারের সবার ছোট। ছোট বলে বাবার কাছ থেকে বেশি আদর পেয়েছি। তবে তিনি অযথা আহ্লাদ বা প্রশ্রয় দিতেন না। অযথা কোন আবদার করলে শাসন করতেন। প্রথম স্কুলে ভর্তি হওয়ার স্মৃতিচারণ করে তিনি বলেন, আমার স্কুলে ভর্তি হওয়ার বিষয়টি মনে খুব গেঁথে আছে। আমার যখন স্কুলে ভর্তি হওয়ার বয়স হলো তখন বাবা আমাকে জিজ্ঞেস করলেন কোন স্কুলে ভর্তি হবো। একদিন তিনি গাড়িতে করে আমাকে বিভিন্ন স্কুলে নিয়ে গেলেন। বাসায় এসে বললেন কোন স্কুলটি আমার পছন্দ হয়েছে। আমার পছন্দের স্কুলেই আমাকে ভর্তি করানো হবে। বাবা তাই করেছিলেন। এখন মনে হয় শিশু বয়সেই বাবা আমাকে দায়িত্ববোধ শেখাতে চেষ্টা করেছেন। দেশপ্রেমের শিক্ষা দিতে চেষ্টা করেছেন। সেদিনের স্মৃতিচারণ করে সোহেল তাজ বলেন, বাবার মৃত্যুর পর যখন বাবার লাশ আমাদের বাড়িতে আনা হলো তখন আমাদের বাড়িতে হাজার হাজার লোক জড়ো হয়েছে। সবার সঙ্গে আমিও দাঁড়িয়ে আমার পিতার লাশ দেখছি। আমি তখন বুঝতে পারছিলাম না আব্বু মারা গেছেন না বেঁচে আছেন। শুধু ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে দেখেছি। বাড়ির দোতলায় যখন মায়ের কাছে যাই তখন দেখি মা কাঁদছেন। মায়ের কান্না দেখে আমিও কেঁদেছি। সবার সঙ্গে আমাকেও নেয়া হয়েছিল বনানী কবরস্থানে। বাবাকে কবরে শোয়ানোর পর কে একজন এসে বললেন- তুমি তোমার বাবার কবরে প্রথম মাটি দাও। আমি প্রথম মাটি দিয়েছিলাম। তখন বিশ্বাস হয়নি যে বাবা আর ফিরে আসবেন না। অনেকে সান্ত্ব্বনা দেয়ার জন্য বলতেন বাবা বিদেশে গেছেন। তখন তা বিশ্বাসও করতাম। এ ধরনের বহু কষ্ট আর যন্ত্রণা নিয়ে আমরা বড় হয়েছি। তিনি বলেন, আমরা চার পরিবারের সন্তানরা আমাদের বাবাকে হারিয়েছি। শেখ হাসিনা হারিয়েছেন তার পিতা-মাতাসহ পরিবারের অন্য সদস্যদের। এসব ঘটনায় আমরা যা হারিয়েছি জাতি এর চেয়ে বেশি কিছু হারিয়েছে। পিতা হত্যার বিচারের বিষয়ে সোহেল তাজ বলেন, নানা প্রেক্ষাপটে এই বিচারে বিলম্ব হয়েছে। এখন দেশে দিন বদলের সরকার মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও সুশাসন প্রতিষ্ঠা ও ভিশন ২০২১ লক্ষ্য নিয়ে নির্বাচনী ইশতেহার দিয়েছে। এ লক্ষ্য অর্জনের পূর্বশর্ত হলো ন্যায়বিচার এবং আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা। দিনবদল করতে হলে এমনভাবে মানুষের আস্থা তৈরি করতে হবে যাতে মানুষ বুঝতে পারে তারা ন্যায়বিচার পাবে। এজন্য ৩রা নভেম্বরের মতো বড় বড় হত্যাকাণ্ডের বিচার করতে হবে। এসব বিচার সঠিক ও সুষ্ঠুভাবে হলে মানুষ বুঝতে পারবে দেশে ন্যায়বিচার হবে। তিনি বলেন, বঙ্গবন্ধু হত্যা মামলার বিচার হয়েছে। যুদ্ধাপরাধীদের বিচার শুরু হয়েছে। এতে সুশাসনের প্রতি মানুষের আস্থার ভিত তৈরি হয়েছে। আমরা আশাবাদী ৩রা নভেম্বরের ঘটনারও বিচার হবে।
|
সর্বশেষ সংবাদ
- নিউইয়র্কে গোল্ডেন এইজ হোম কেয়ারের ইফতার মাহফিল
- নিউইয়র্ক বাংলাদেশি আমেরিকান লায়ন্স ক্লাবের ইফতার ও দোয়া মাহফিল অনুষ্ঠিত
- নিউইয়র্কসহ যুক্তরাষ্ট্রের উত্তর-পূর্বাঞ্চলে ৭ মার্চ ঘড়ির কাঁটা এক ঘন্টা এগিয়ে যাবে
- নিউইয়র্কে জ্যামাইকা বাংলাদেশ ফ্রেন্ডস সোসাইটির বার্ষিক ইফতার ও দোয়া মাহফিল
- Radwan Chowdhury Announces Candidacy for Montgomery County Council At-Large, Launches “Five-Pillar Blueprint” for Accountable Governance.
- New York Attorney General James Reminds New Yorkers of SNAP Work Requirements
- নিউইয়র্কে ডিজিটাল ওয়ান ট্র্যাভেলস এবং বাংলা ট্র্যাভেলস এর ইফতার মাহফিল
- রূপসী চাঁদপুর ফাউন্ডেশন নিউইয়র্ক ইনক’র ইফতার ও দোয়া মাহফিল অনুষ্ঠিত








