নর্থ ক্যারোলিনার গ্রিনসবরো অ্যাকুয়াটিক সেন্টারে মারম্যানিয়া’ উৎসব : মৎস্যকুমারী যেন বাস্তবে
তরিকুর রহমান সজীব : হ্যান্স অ্যান্ডারসেনের মারমেইড বা মৎস্যকুমারীর রূপকথা পড়েননি, এমন মানুষ বোধহয় খুব কমই পাওয়া যাবে। অর্ধেক মানুষ আর অর্ধেক মাছ মিলিয়ে তৈরি হওয়া মৎস্যকুমারী বিশ্বব্যাপী পৌরাণিক কাহিনীগুলোতেও এক গুরুত্বপূর্ণ স্থান দখল করে রেখেছে। যুগে যুগে মানুষের কল্পনায় এসব মৎস্যকুমারী হাজির হয়েছে নানা রূপে। মৎস্যকুমারী হওয়ার ইচ্ছাও যুগে যুগে পোষণ করে এসেছে মানুষ। কিন্তু প্রকৃত অর্থে মৎস্যকুমারী হওয়ার তো কোনো সুযোগ নেই মানুষের সামনে। তাহলে কি পৌরাণিক আর রূপকথার কাহিনীর মৎস্যকুমারী অধরাই থেকে যাবে মানুষের কাছে? মানুষ হারতে জানে না। নিজের চাওয়াকে বাস্তবে রূপ দেয়ার জন্য মানুষের প্রচেষ্টাও থেমে থাকে না কখনও। সত্যি সত্যি কল্পলোকের মৎস্যকুমারী হওয়া সম্ভব না হলেও তাই কৃত্রিম লেজ লাগিয়ে মৎস্যকুমারীর মতো বেশ নিয়েই মৎস্যকুমারী সেজে মানুষকে আনন্দ দেয়ার কাজ করে যাচ্ছেন অনেকেই। এমন মৎস্যকুমারীদের নিয়ে তৈরি হয়েছে বিভিন্ন দল। আর এমন মৎস্যকুমারীদের অংশগ্রহণে ‘মারম্যানিয়া’ নামের এক বিশাল উৎসবও অনুষ্ঠিত হয় প্রতি বছর। এ বছরে এ উৎসব অনুষ্ঠিত হয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের নর্থ ক্যারোলিনার গ্রিনসবরো অ্যাকুয়াটিক সেন্টারে। আর সেখানে হাজির হয়েছিল বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা মৎস্যকুমারী। অবশ্য কেবল মৎস্যকুমারী বললে ভুল হবে, কেননা নারীদের পাশাপাশি পুরুষরাও অর্ধেক মানুষ, অর্ধেক মৎস্য সেজে থাকে, যাদের বলা হয় ‘মারমেন’ বা মৎস্যমানব। শিশুরাও পিছিয়ে নেই এমন কল্পলোকের চরিত্র সাজতে। তাদের বলা হয়ে থাকে ‘মারচিলড্রেন’ বা মৎস্যশিশু। এসব মৎস্যকুমারী, মৎস্যমানব আর মৎস্যশিশুর রং-বেরঙের লেজের সঙ্গে সঙ্গে ছিল রূপকথার বিভিন্ন চরিত্রের সাজ। তাতে করে বর্ণিল এক উৎসবে মেতে ওঠে গ্রিনসবরো অ্যাকুয়াটিক সেন্টার। উৎসবে অংশ নেয়া দর্শনার্থীদের নিজেদের নানা কসরতে মুগ্ধ করেছে মৎস্যকুমারী, মৎস্যমানব আর মৎস্যশিশুরা। পুলের স্বচ্ছ পানিতে তাদের রঙিন পাখনা ডানা মেলে যেন পানির মধ্যেই তৈরি করে রংধনুর আবহ। পানির নিচে খোলা চোখে সাঁতার কাটতে কাটতে হাসি দিয়ে দর্শনার্থীদের মুগ্ধ করার কাজটি আপাতদৃষ্টিতে সহজ মনে হলেও বিষয়টি অতটা সহজ নয়। এর জন্য প্রয়োজন প্রচুর সময়, চর্চা আর অধ্যবসায়। উৎসবে আসা হাননা মারমেইড নামে পরিচিত হাননা ফ্রেজার তার দীর্ঘ ১৩ বছরের অভিজ্ঞতা থেকে বলেন, ‘পানির নিচে এভাবে দম ধরে রাখা খুব চ্যালেঞ্জের কাজ। আপনার মস্তিষ্ক আপনাকে বলবে শ্বাস নিতে। কিন্তু তা করতে গেলেই বিপদ। আপনাকে মাথা ঠাণ্ডা রাখতে হবে।’ হাননা জানান, পানির নিচে দম ধরে রাখার ক্ষমতাকে তিনি চর্চার মাধ্যমে দ্বিগুণ করতে পেরেছেন। এখন তিনি অনায়াসেই তিন মিনিট পর্যন্ত পানির নিচে থাকতে পারেন।
আরেক মারমেইড শ্যানন রোউচ। মারমেইড শ্যানন নামেই পরিচিত তিনি। আগে থেকেই তিনি বিভিন্ন জন্মদিনের পার্টিতে মৎস্যকুমারী সেজে আনন্দ দিতেন। শখের বসে করতে থাকা এই কাজ থেকে ভালো আয়ও হতো তার। আর সে কারণেই তিনি টেলিভিশন সাংবাদিকতা ছেড়ে দিয়ে প্রশিক্ষণ নিয়ে শিশুদের সাঁতার শেখানো শুরু করেন। পাশাপাশি মৎস্যকুমারী সেজে আনন্দ দেয়ার কাজ তো ছিলই। পরে তিনি মারমেইড কমিউনিটির সন্ধান পান। সেখানে এসে আরও বিস্তৃত পরিসরে কাজের সুযোগ পান তিনি। তার কাছে মৎস্যকুমারী সেজে আনন্দ দেয়ার মূল জায়গাটি হলো দর্শকদের কল্পলোকে নিয়ে যাওয়া। তিনি বলেন, ‘শিশুরা যখন আমাকে মৎস্যকুমারী রূপে দেখে, তাদের চোখে-মুখে জাদুর এক জগৎ দেখার নির্মল উচ্ছ্বাস ফুটে ওঠে। তাদের কল্পনার জগতে নিয়ে যাওয়াটা সত্যিই আনন্দের।’
বিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময় থেকেই মৎস্যকুমারী হয়ে আনন্দ দেয়ার কাজটিকে পেশা হিসেবে নেয়ার চল শুরু হয়। জানা যায়, ১৯৪৭ সালে যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডায় মৎস্যকুমারীদের নিয়ে প্রথম একটি লাইভ শো অনুষ্ঠিত হয়। এরপর থেকেই ধীরে ধীরে গড়ে উঠতে থাকে দল। প্রবীণ মৎস্যকুমারীদের একজন মারলা স্পিলেনবার্গ। ১৯৬৯ সাল থেকে ১৯৭২ সাল পর্যন্ত তিনি পানির নিচে ‘সিন্ডারেলা’ কাহিনীতে একজন রূপকথার দেবীর ভূমিকায় অভিনয় করতেন। ‘মারমেইড অন দ্য মুন’ নামের আরেকটি কল্পকাহিনীতেও তিনি অভিনয় করতেন। এতদিন পরে এসে মারমেইড কমিউনিটির প্রসার দেখে তিনি একদিকে যেমন খুশি, অন্যদিকে তেমনই বিস্মিত। এখন তো পেশাদার মৎস্যকুমারী হতে চাওয়া মেয়েদের সংখ্যা অনেক। তবে তাদের তাড়াহুড়া করতে নিষেধ করেন স্পিলেনবার্গ। তার মতে, খুব ভালো করে প্রশিক্ষণ না নিয়ে মৎস্যকুমারীর ভূমিকায় নামলে তাতে বিপদই বাড়বে।
মৎস্যকুমারীদের ভিড়ে মৎস্যমানবের সংখ্যাও নেহায়েত কম নয়। তবে এ জগৎটা মৎস্যকুমারীদের চাহিদা এবং প্রতিপত্তিই বেশি। তার পরও মৎস্যমানব হিসেবে পেশা গড়ার সুযোগকে জনপ্রিয় করে যেতে কাজ করছেন ক্রিশ্চিয়ান ও’ব্রকি। মারমেন ক্রিশ্চিয়ান নামে পরিচিত এই মৎস্যমানব বলেন, ‘কেন কেবল মেয়েরাই সব মজা লুটবে? যারা মৎস্যমানব হতে আগ্রহী তাদের উদ্দেশে বলছি, আপনাদের ইচ্ছা হলে আপনারাও লেজ লাগিয়ে ইচ্ছামতো সাঁতার কাটবেন। নিজেরা আনন্দ নেবেন, অন্যদেরও আনন্দ দেবেন।’
পেশা হিসেবে মৎস্যকুমারী বা মৎস্যমানব যেমন জনপ্রিয় হয়ে উঠছে, তেমনি এটি লেজ নির্মাতাদের জন্যও বড় বাজার তৈরি করছে। সাধারণ কাপড়ের তৈরি হালকা কৃত্রিম লেজ ১০ ডলার দামেই পাওয়া যায়। তবে সিলিকনের তৈরি ভারি কৃত্রিম লেজের দাম সাড়ে তিন হাজার ডলার পর্যন্ত হতে পারে। কোনো কোনো মৎস্যকুমারী এখন নিজেরা চমৎকার সব ডিজাইনের লেজ তৈরিতেও সময় ব্যয় করছে। তাদের একজন কেরিয়েল জো-অ্যালেন বা মারমেইড ক্যারিয়েল। বাড়িতে বসে নিজ হাতেই তিনি তৈরি করেন এসব লেজ। রকমারি সব পুঁতি আর নানা ধরনের বস্তু দিয়ে তিনি লেজের জন্য তৈরি করেন কৃত্রিম আঁশ। সম্পূর্ণ হাতে তৈরি এসব লেজের একেকটি তৈরিতে তার সময় লাগে প্রায় চার মাস। আর এগুলোর প্রতিটি তিনি বিক্রি করেন প্রায় তিন হাজার ডলারে। তিনি জানান, তৈরির পর কিছু কিছু লেজের ওজন দাঁড়ায় প্রায় ৫০ পাউন্ড বা ২৫ কেজির মতো। আর এগুলো খুব আঁটসাঁট হওয়ায় পড়তে প্রায় আধঘণ্টার মতো সময় লেগে যায়।
মৎস্যকুমারী বা মৎস্যমানবের এ পেশাকে সবাই অবশ্য নিছক আনন্দদানের জন্যই গ্রহণ করেননি। বিভিন্ন সামুদ্রিক বিপন্ন প্রাণীদের অবস্থার কথা তুলে ধরতেও কাজ করছেন কিছু কিছু মৎস্যকুমারী-মৎস্যমানব। তারা সমুদ্রের পরিবেশ ও সামুদ্রিক প্রাণীদের রক্ষা করার জন্য এ পেশাকে আন্দোলনে রূপ দিতে কাজ করে যাচ্ছেন। মারমেইড হাননা যেমন এর আগে অভিনয় করেছেন পরিবেশবাদী ভিডিও ‘মানতা’স লাস্ট ড্যান্স’-এ। এ ছবিতে বিপন্নপ্রায় মানতা রে প্রাণীর অবস্থা তুলে ধরা হয়েছে। ২০১৪ সালে মানতা রে বিপন্নপ্রায় প্রাণীর তালিকাভুক্ত হয়। তার পেছনেও ভূমিকা রেখেছে এ ভিডিও। এভাবেই নিজেদের সামুদ্রিক পরিবেশ ও সামুদ্রিক প্রাণী রক্ষায় নিয়োজিত রাখার আকাঙ্ক্ষার কথা জানান হাননা। তার মতো আরও অনেক মৎস্যকুমারীই এভাবে অবদান রেখে যাচ্ছেন সামুদ্রিক প্রাণী রক্ষায়।[সূত্র : সিএনএন] মানবজমিন
- New York Attorney General James Secures Reimbursements for T-Mobile Customers Whose Rates Were Unjustly Raised
- নিউইয়র্কে বাংলাদেশ সোসাইটির নির্বাচনে কুনু-ফিরোজ পরিষদের সাত দফা ইশতেহার ঘোষণা; কমিউনিটি সেন্টার প্রতিষ্ঠা, সাশ্রয়ী ফিউনারেল সেবা, বিমানের সরাসরি ফ্লাইট ও আর্থিক স্বচ্ছতায় অঙ্গীকার
- ফিলিস্তিনিদের আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকারের প্রতি বাংলাদেশের পূর্ণ সমর্থন: জাতিসংঘে রাষ্ট্রদূত আইরিন খান
- নিউইয়র্কে বাংলাদেশ সোসাইটির নির্বাচনে প্রথমবারের মতো বিতর্ক, গুরুত্ব পেল স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি
- New York Attorney General James Warns New Yorkers About AI-Generated Election Misinformation Ahead of November Elections
- Bangladesh calls for global treaty to protect victims of crimes against humanity
- নিউইয়র্কে জাতিসংঘে মুহাম্মদ নওশাদ জমির এমপি: মানবতাবিরোধী অপরাধ প্রতিরোধে শক্তিশালী আন্তর্জাতিক সনদ প্রণয়নের আহ্বান
- সোশ্যাল মিডিয়ার তথ্য গোপন করলে যুক্তরাষ্ট্রের ভিসা প্রত্যাখ্যান, আবেদনপত্রে চাওয়া তথ্য সঠিক ও সম্পূর্ণভাবে দেওয়ার নির্দেশনা মার্কিন দূতাবাসের