যুক্তরাষ্ট্রে বহিষ্কার আতঙ্কে লক্ষাধিক বাংলাদেশি
সাবেদ সাথী, নিউইয়র্ক: মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের অবৈধ অভিবাসী দমনে নতুন নির্দেশনা জারির পর যুক্তরাষ্ট্রজুড়ে আতঙ্ক বিরাজ করছে। হোমল্যান্ড সিকিউরিটি বিভাগের নতুন নির্দেশনায় অভিবাসন আইনের শক্ত প্রয়োগের কথা ঘোষণা করা হয়। এর পর থেকে বৈধ কাগজপত্র নেই এমন অভিবাসীরা রয়েছে বহিষ্কার ও ধরপাকড় আতঙ্কে, যার মধ্যে রয়েছে লক্ষাধিক অবৈধ বাংলাদেশি। ইতিমধ্যে এমন অভিবাসীদের গ্রেপ্তার ও বহিষ্কার করা শুরু হয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের হোমল্যান্ড সিকিউরিটি দপ্তরের মন্ত্রী জন কেলি স্বাক্ষরিত ওই নীতিমালায় বলা হয়েছে, ‘দোষী সাব্যস্ত হয়েছে এমন ব্যক্তি ছাড়াও যারা নাগরিক কল্যাণ সুবিধা গ্রহণের ক্ষেত্রে মিথ্যা সোশ্যাল সিকিউরিটি নম্বর ব্যবহার করেছে বা সড়ক পরিবহন আইন ভঙ্গের দায়ে অভিযুক্ত হয়েছে, এমন অবৈধ অভিবাসীরাও বহিষ্কৃত হতে পারে।
তবে হোমল্যান্ড সিকিউরিটি বিভাগ বলছে, অভিবাসী কমিউনিটিতে অমূলক ভয় পাওয়ার কোনো কারণ নেই। নতুন নির্দেশনার মাধ্যমে প্রচলিত আইনেরই বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। অভিবাসন বিভাগ ভেবেচিন্তে আইনের প্রয়োগ করবে। সবার সঙ্গে মানবিক আচরণ করবে।
যুক্তরাষ্ট্রে বৈধ কাগজপত্রবিহীন বাংলাদেশিদের কোনো সঠিক সংখ্যা নেই। তবে ধারণা করা হচ্ছে, যুক্তরাষ্ট্রে অবৈধ বাংলাদেশিদের সংখ্যা প্রায় এক লাখের মতো। এর মধ্যে শুধু নিউইয়র্কেই বসবাস করছে ৫০ হাজার অবৈধ বাংলাদেশি। এ ছাড়া ক্যালিফোর্নিয়া, টেক্সাস, ফ্লোরিডা, শিকাগো, জর্জিয়া, নিউ জার্সি, পেনসিলভানিয়া অঙ্গরাজ্যে রয়েছে প্রচুর অবৈধ বাংলাদেশি।
নিউ ইয়র্কে গত বৃহস্পতিবার পর্যন্ত প্রায় অর্ধশত অবৈধ অভিবাসীকে আটক করা হয়েছে। তবে এই ব্যক্তিদের মধ্যে কোনো বাংলাদেশি নেই। গত বছর দুই দফায় অর্ধশতাধিক বাংলাদেশি অভিবাসীকে বহিষ্কৃত করা হয়েছিল, তাদের ব্যাপারে আদালত রাজনৈতিক আশ্রয় দিতে অস্বীকার করেছেন। তবে ট্রাম্পের বর্তমান বহিষ্কারাদেশের সঙ্গে তাদের কোনো সম্পর্ক নেই। তবে বৈধ কাগজপত্র না থাকার কারণে চাকরি ত্যাগ অথবা বাসস্থান বিক্রির উদ্যোগ গ্রহণ না করার পরামর্শ দিয়েছে অভিবাসীদের নিয়ে কাজ করা সংস্থা ‘ড্রাম’।
ড্রামের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, অভিবাসী বাংলাদেশিরা যারা বহিষ্কারের আশঙ্কায় ভীত, তাদের সাহায্যের জন্য তারা জরুরি আইনি সাহায্যের ব্যবস্থা নিতে যাচ্ছে। এদিকে ট্রাম্প প্রশাসন কাগজপত্রবিহীন অভিবাসীদের অপরাধের বিষয়ে ব্যাপক প্রচারের ব্যবস্থা নিচ্ছে। তারা অপরাধী হিসেবে চিহ্নিত এমন অভিবাসীদের ব্যক্তিগত পরিচয় গোপন রাখার যে নিয়ম বর্তমানে চালু রয়েছে, তা রদ করার এবং অভিবাসীদের গ্রেপ্তারের ব্যাপারে স্থানীয় পুলিশকে ব্যাপক ক্ষমতা দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
মার্কিন নাগরিক অধিকার ইউনিয়নের (এসিএলইউ) নিউ ইয়র্ক শাখার নির্বাহী পরিচালক ডোনা লিবারম্যান এক বিবৃতিতে বলেছেন, ট্রাম্পের নতুন বহিষ্কারাদেশ বাস্তবায়িত হলে নিউ ইয়র্ক শহরে হাজার হাজার অভিবাসী পরিবার বিপদের মুখে পড়বে। পরিবারের সদস্যরা একে অপর থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়বে।
এসিএলইউ জানিয়েছে, টেক্সাসে কাগজপত্রহীন অভিবাসীদের সাহায্য করার জন্য তারা ইতিমধ্যে জরুরি টেলিফোন-সেবা চালু করেছে। বিভিন্ন স্থানীয় মানবাধিকার ও আইনি সংস্থার যৌথ উদ্যোগে স্থাপিত এই হটলাইনে যেকোনো ব্যক্তি টেলিফোনের মাধ্যমে আইনি সাহায্য পাবে। অভিবাসীপ্রধান অন্যান্য শহরেও এ ধরনের আইনি সাহায্য প্রদানের ব্যবস্থা করা হচ্ছে।
নিউইয়র্কের ইউএস সুপ্রিম কোর্টের অ্যাটর্নি নাজমুল আলম বলেন, ‘শুধু নিউ ইয়র্কেই নয়, যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন প্রান্তে বসবাসকারী অবৈধ বাংলাদেশিরা ট্রাম্পের অবৈধ অভিবাসী দমনে নতুন নির্দেশনা জারির পর আতঙ্কিত হয়ে পড়েছে। ’
অ্যাটর্নি নাজমুল আলম আরো বলেন, ‘অবৈধ বাংলাদেশিদের সঠিক কোনো তালিকা কোথাও নেই। তবে অনুমান করা হয়, যুক্তরাষ্ট্রজুড়েই রয়েছে অবৈধ বাংলদেশি। এদের সংখ্যা এক লাখের বেশি। আর নিউ ইয়র্কের মধ্যেই বাস করছে প্রায় ৫০ হাজার, বাকি ৫০ হাজার ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে।
নাজমুল আলম আরো বলেন, ‘ট্রাম্পের জারি করা বর্তমান আইনটি একটি ব্ল্যাংকেট বা চাদরের মতো। যে কেউ যেকোনো সময় এ আইনের আওতায় জড়িয়ে পড়তে পারে। বাংলাদেশি হোক বা যেকোনো দেশের নাগরিকই হোক—প্রত্যেকেই তাদের নিজ নিজ অপরাধের কথা জানে। এসব মানুষ কোনো কারণে পুনরায় পুলিশের হাতে ধরা পড়লে বা আটক হলে তাদের জন্য বিরাট সমস্যা দেখা দিতে পারে। আগে যাদের ছোটখাটো অপরাধ নথিভুক্ত রয়েছে তাদেরও বহিষ্কারের ক্ষেত্রে হয়তোবা কোনো প্রকার ছাড় দেবে না।
নিউইয়র্কে বাংলাদেশ সোসাইটির নবনির্বাচিত সভাপতি কামাল আহমেদ বলেন, ‘কিছুদিন আগে সাত মুসলিমপ্রধান দেশের অভিবাসীদের যুক্তরাষ্ট্রে যাতায়াত বন্ধ করার ঘোষণা শুনেই বাংলাদেশিরা আতঙ্কিত হয়ে পড়েছিল। এ বিষয়ে বেশ কয়েকজন আইনজীবীকে নিয়ে সোসাইটির উদ্যোগে তাত্ক্ষণিক একটি সেমিনার করে বাংলাদেশি প্রবাসীদের আইনি পরামর্শ দেওয়ার ব্যবস্থা করেছিলাম। বর্তমান নতুন আইন জারির পর বাংলাদেশিদের মধ্যে নানা ধরনের ভয় ও আতঙ্ক বিরাজ করছে। ট্রাম্পের নতুন আইন নিয়ে প্রতিদিন অনেকেই আমাকে জিজ্ঞাসা করেন কী হচ্ছে বা কী হবে?’
বাংলাদেশি আমেরিকান ডেমোক্র্যাটিক লিগের সভাপতি ও ডেমোক্র্যাটিক ন্যাশনাল কমিটির সদস্য খোরশেদ খন্দকার বলেন, ‘ট্রাম্পের অবৈধ অভিবাসী দমনে নতুন নির্দেশনা জারির পর অবৈধ বাংলাদেশিরা ভীতসন্ত্রস্ত হয়ে পড়েছে। এসব বাংলাদেশি পথেঘাটে নানা ধরনের প্রশ্ন করছে তাদের ভাগ্যে কী ঘটবে? আমি এসব বাংলাদেশিকে অন্য কোনো লোকজনের সঙ্গে কথা না বলে সৎ ও বিশ্বস্ত আইনজীবীদের পরামর্শ নিতে বলব। ’
যুক্তরাষ্ট্রে এক কোটি ১০ লাখ অবৈধ অভিবাসী আছে বলে মনে করা হয়। নতুন নির্দেশনা আসার পর হোমল্যান্ড সিকিউরিটির পক্ষ থেকে মার্কিন সংবাদমাধ্যমকে বলা হয়েছে, নতুন নির্দেশনা ব্যাপকভাবে লোক তাড়ানোর জন্য ব্যবহার করা হবে না। কার্যত এমন কাজ করার জন্য প্রয়োজনীয় লোকবলও তাদের নেই। জরুরি ভিত্তিতে আরো ১০ থেকে ১৫ হাজার লোক নেওয়া হচ্ছে। সীমান্ত দিয়ে আসা অবৈধ অভিবাসীদের বিতাড়ন-প্রক্রিয়া দ্রুত করার জন্য অতিরিক্ত লোকবল প্রয়োজন।
নতুন নির্দেশনায় বলা হয়েছে, অপরাধে জড়িত অবৈধ অভিবাসীদের বিতাড়ন করা হবে। অপরাধে জড়িত হওয়া এবং অপরাধে দণ্ডপ্রাপ্তদের মধ্যে ব্যাপক ফারাক রয়েছে। হোমল্যান্ড সিকিউরিটি বিভাগের কর্মকর্তারা এ ক্ষেত্রে নির্ধারণ করবেন, অপরাধে জড়িত অভিবাসী জনগণের জন্য হুমকির কারণ এবং এ কারণে তাকে বিতাড়িত করা হবে। নির্দেশনার এ অংশটিতে অভিবাসন কর্মকর্তা এবং হোমল্যান্ড সিকিউরিটি এজেন্টদের ব্যাপক ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে বলে মনে করা হচ্ছে।
প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার আমলেও যুক্তরাষ্ট্র থেকে ব্যাপকভাবে অবৈধ অভিবাসী বিতাড়ন করা হয়। ২০১৩ সালে এ বিতাড়নের সংখ্যা চার লাখ ৩৪ হাজারে পৌঁছে। যদিও প্রেসিডেন্ট ওবামার ক্ষমতার মেয়াদের শেষ দিকে, ২০১৫ সালে যুক্তরাষ্ট্র থেকে বিতাড়নের সংখ্যা ছিল তিন লাখ ৩৩ হাজার। প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার ‘ডেফারড অ্যাকশন’ নামের কর্মসূচিতে প্রায় সাড়ে সাত লাখ অবৈধ অভিবাসীকে সাময়িক বৈধতা দেওয়া হয়েছিল। যেসব অপ্রাপ্ত বয়স্ক লোকজন পরিবারের সঙ্গে বা বিভিন্নভাবে এসে যুক্তরাষ্ট্রে এসে আটকা পড়েছিল, তাদের ডেফারড অ্যাকশন কর্মসূচির আওতায় আনা হয়েছিল।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনী প্রচারণার শুরু থেকেই ডোনাল্ড ট্রাম্প জানিয়েছিলেন, তিনি প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হলে ২০ থেকে ৩০ লাখ অভিবাসী, যারা ‘বড় ধরনের’ অপরাধের সঙ্গে যুক্ত, এমন ব্যক্তিদের অগ্রাধিকারের ভিত্তিতে বহিষ্কারের ব্যবস্থা গ্রহণ করবেন। কিন্তু নতুন নির্দেশ অনুযায়ী দেশের অধিকাংশ কাগজপত্রবিহীন অভিবাসী বহিষ্কারের আওতায় পড়তে পারে। অভিবাসী ও বিভিন্ন রাজনৈতিক গ্রুপের তরফ থেকে এই নির্দেশের বিরুদ্ধে ইতিমধ্যে প্রবল প্রতিরোধ সৃষ্টি হয়েছে।
- নিউইয়র্কে অ্যাসাল ওজোন পার্ক চ্যাপ্টারের ইফতার ও অভিষেক
- নিউইয়র্কে বাংলাদেশ ল সোসাইটি ইউএসএ’র ইফতার মাহফিল: খারাপ কাজ থেকে দূরে থাকার আহ্বান
- BOROUGH PRESIDENT GIBSON HOSTS FOURTH ANNUAL BRONX IFTAR DINNER DIALOGUE UNDER THE THEME “UNITY IN DIVERSITY”
- নিউইয়র্কে মানসিক সংকটে থাকা যুবককে গুলি: পুলিশ প্রশিক্ষণ এবং মানসিক সংকটসংক্রান্ত ৯১১ কল
- নিউইয়র্কে গ্রী ম্যাকানিকেল ইয়াঙ্কার্স এর ইফতার ও দোয়া মাহফিল
- নিউইয়র্কে যুক্তরাষ্ট্র বঙ্গমাতা পরিষদ’র ইফতার ও দোয়া মাহফিল
- নিউইয়র্কে ঢাকা জেলা অ্যাসোসিয়েশনের ইফতার ও দোয়া মাহফিল অনুষ্ঠিত
- বাংলাদেশ সোসাইটি অব ব্রঙ্কস নিউইয়র্ক ইনকের কোরআন তেলাওয়াত প্রতিযোগিতা ও ইফতার মাহফিল








